আমেরিকায় আমার ছাত্রজীবনঃ


আমেরিকায় আমার ছাত্রজীবনঃ
অল্প-স্বল্প গল্প

কানিজ ফাতিমা সুমাইয়া
অনেক দিন ধরে সিসিবিতে কিছু একটা লেখার তাগিদ বোধ করছি। কিন্তু ব্যস্ত আমেরিকান জীবনে সময় কোথায় একটু স্থির হয়ে বসে মনের মধ্যে ছড়ানো ছিটানো ভাবনাগুলো কাগজে কলমে তুলে ধরার? তবে গত সপ্তাহ থেকে আমার ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে। ইউনিভার্সিটিতে কোয়ার্টারব্রেক আর ক্রিস্টমাসের ছুটি একসাথে পড়ায় বেশ বড়সড় একটা ছুটি পেয়েছি এবার। সকালে ৬টার সময়, সূর্য ওঠারও আগে আজকাল উঠতে হয়না। আর রাতে টাইম-টেবিল ধরে ১০টার মধ্যে ঘুমাতেও হচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে জীবন বেশ ভালোই কাটছে আমার।

কি দিয়ে লেখা শুরু করবো ভাবতে গিয়ে মনে হলো আমেরিকায় আমার ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম কোয়ার্টারের অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করি। গত ফল থেকে ক্যালিফোর্নিয়া ষ্টেট ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্স প্রোগ্রাম শুরু করেছি। আর সবার মত আমিও খুব এক্সাইটেড ছিলাম আমার নতুন ছাত্রজীবন নিয়ে। ক্যাম্পাস কেমন হবে, প্রফেসররা কেমন হবে, সর্বোপরি কারা আমার নতুন বন্ধু হবে এইসব ভেবে। অতঃপর আমার সব কৌতুহলের অবসান ঘটল ২২ সেপ্টেম্বর প্রথম ক্লাসে। ক্লাসটি ছিল Physical Anthropology and Anatomy। আমি যথারীতি ক্লাস শুরু হওয়ার আধঘন্টা আগেই ক্লাসরূমের গিয়ে উপস্থিত। প্রথম ক্লাস বলে কথা! কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে ছাত্রছাত্রীরা আসা শুরু করলো। যথাসময়ে প্রফেসর গিলবার্ট ক্লাসে ঢুকলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে বন্ধুমহলে কিছু আজব শব্দের প্রচলন ছিল, যেমন খুব সুন্দর অথবা অদ্ভুত কিংবা অন্যরকম কিছু দেখলে সবাই বলতাম ‘টাস্কি খাইছি’। সেদিনও ক্লাসে প্রফেসরকে দেখার পর পাশের ক্লাসমেটটিকে আমার খুব কানেকানে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল “মামা, টাস্কি খাইলাম রে“।

প্রফেসর গিলবার্ট হাফহাতা একটা গেঞ্জির সাথে একটা হাফপ্যান্ট পড়ে ক্লাসে উপস্থিত! এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেই হাফপ্যান্টের ঝুল কোনভাবেই ৭/৮ ইঞ্চির বেশি হবেনা। শুধু তাই নয়, তার ঝাকড়া দোলানো কটকটে লাল কোকড়া চুলগুলো দেখে সবার প্রথম আমার মনে যে চিত্রটি ভেসে উঠলো সেটি ছিল আফ্রিকা এবং ব্রাজিলের গহীন জঙ্গলে আবিষ্কৃত ওরাং ওটাং নামের মানুষসদৃশ এক প্রানীর ছবি। ধরে নেওয়া হয়, আধূনিক সভ্য মানবজাতির পূর্বপুরুষ ছিল তারা। কিন্তু পরক্ষণেই তার কপালে তোলা রোদচশমা দেখে আমার বিভ্রম ভাংল যে তিনি আমাদের আধূনিক মানবগোত্রেরই একজন। ইন্ডিয়ানা-ব্লুমিংটনের মত প্রথমসারির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট প্রফেসরের সেই আজব বেশভূষা এবং পারসোনালিটির প্রেজেন্টেশন আমাকে রীতিমত হতভম্ব করেছিল। শুধু তাই নয়, পুরো কোয়ার্টারে যতদিন আমি তার ক্লাস করেছি, কোনদিনই তার হাফপ্যান্টের ঝুল আর বাড়তে দেখিনি।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রথম দিকে আমি ডঃ গিলবার্টের ক্লাসে খুব অস্বস্তিতে ভুগতাম। তার এই আজব বেশভূষা দেখে আমি প্রায়ই ভাবতাম যে তার মধ্যে কোন পার্সোনালিটি-ডিসওর্ডার আছে, কিংবা বছরের পর বছরে গবেষোপণার জন্য বনে বাদারে শিম্পাঞ্জী আর গরিলাদের মাঝে থাকতে থাকতে তার উপরও এদের আছর পড়েছে। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকল, আমি ক্রমান্বয়ে আবিষ্কার করতে থাকলাম তার জ্ঞানের গভীরতা, শেখানোর সহজতর পদ্ধতি আর ছাত্রছাত্রীদের মনে তা’ চিরস্থায়ী করে রাখবার কলা-কৌশল। ছোটবেলা থেকে আমার একটা অভ্যাস ছিল ক্লাসে কোনকিছু বুঝতে না পারলে প্রশ্ন করা। প্রফেসর গিলবার্টের ক্লাসেও আমি বহুদিন বিভিন্ন বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছি। সত্যকথা বলতে, প্রত্যেকবারই তার চমকপ্রদ এবং যথার্থ উত্তরগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। এবং আমার মনের মধ্যে তার সম্পর্কে গড়ে ওঠা নেতিবাচক ধারণাগুলোকে ভুল প্রমাণিত করেছে। তার ক্লাসে আমি ফিজিক্যাল এনথ্রপলোজী কতটুকু শিখেছি জানিনা। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে আমরা সচরাচর যেসব ষ্টেরিওটাইপড ধারণা নিয়ে চলি সেগুলো যে কতখানি ভুল তা’ অনুধাবন করতে শিখেছি। যেমন, রাস্তাঘাটে, বাসে, ট্রেনে চলতে ফিরতে আফ্রিকান-আমেরিকান্দের আজগুবি পোষাক-আশাক এবং আচরণ দেখে আগে ভাবতাম এরা বোধহয় স্বাভাবগত কারণেই এমন। কিন্তু আমেরিকায় ওদের নির্যাতনের ইতিহাস এবং ওদের প্রতি Discrimination গুলো জানতে পাড়ায় ওদের প্রতি যে নেতিবাচিক ধারণগুলো ছিল, তা’ ভেঙ্গে গেছে। এখন আমি ওদেরকেও সাধারণ মানুষের মতোই মনে করি।

আমার আরেকটি ক্লাস ছিল Anthropology of Race and Racism.এক কথায় বর্ণ এবং বর্ণবাদ। বাংলাদেশে থাকতে যে ব্যাপারটি নিয়ে কোনদিন আমি মাথা ঘামাইনি সেই বিষয়টি যে আমেরিকান সমাজে এত গুরুত্বপূর্ন সেটা আমেরিকার মাটিতে প্রথম পা’ রেখেই বুঝেছি। নিউইয়র্কের jfk এয়ারপোর্ট এ বিশাল বড় এমিগ্রেশ্ন লাইনে দাঁড়িয়ে আছি হঠাত ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পিছনের প্যাসেঞ্জারকে উদ্দেশ্য করে বলল-” the guy behind the brown lady”। এটা ছিল আমেরিকার মাটিতে আমার প্রথম racist অভিজ্ঞতা। খুব অবাক হলাম একজন সরকারী অফিসারের মুখ থেকে এমন একটা কমেন্ট শুনে। সত্যি কথা বলতে কি এর আগে বাংলাদেশে থাকতে আমার গায়ের বর্ণ যে বাদামি এটা আলাদা করে উপলব্ধি করি নাই। বাংলাদেশে আমি শ্যাম বর্ণ বলেই জানতাম যা কিনা শতকরা ৮০% বাংগালীর গায়ের রং। কিন্তু পৃথিবীর আরেক প্রান্তে গিয়ে আমার পরিচয় যে এত ভিন্ন বিষয়টি আমি সেদিন প্রথম jfk এয়ারপোর্ট এ আবিস্কার করলাম।

যাই হোক, আসা যাক আমার আসল গল্পে।- আমার Race and Racism কোর্সের প্রফেসর ছিলেন একজন এশিয়ান মহিলা, নাম Cngin Choar Sin। তার নাম এবং চেহারা দেখে তার আইডেন্টিটি বের করা খুবই মুশকিল। কোর্সটি নেবার আগে তার নাম দেখে আমার ধারণা হয়েছিল তিনি নিশ্চয়ই চাইনিজ অথবা জাপানীজ। কিন্তু ক্লাস করতে গিয়ে প্রথম দিনেই আমি কনফিউজড হয়ে গেলাম। যদিও তার চেহারা দেখতে চাইনিজদের মতো, কিন্তু গায়ের রঙ আমাদের মতো বাদামী। তিনি একই সাথে ইংরেজীর পাশাপাশি তাগালগ (ফিলিপাইনের ভাষা), তামিল, মালে, এবং চাইনিজ বলতে পারেন। একদিন ক্লাসে ষ্টুয়ার্ট হলের Old and New Identities পড়াচ্ছেন, আমি কৌতুহল দমাতে না পেরে তাকে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, তার আইডেন্টিটি কি? তিনি আমাকে যে উত্তর দিয়েছিলেন তা ছিলোঃ “I was born in Taiwan, but grew up at a Tamil neighborhood in Malaysia, and my father is a Chinese and my mother is a Malaysian Muslim. Now you decide what is my identity”. এখন আপনারাই বলুন আমি বা আমরা তাকে কিভাবে আইডেন্টিফাই করবো?

আমেরিকার স্বাধীনতার পর থেকেই এইদেশে আইডেন্টিটি, এথনিসিটি, ন্যাশনালিটি ব্যাপারগুলো নিয়ে অনেক আন্দোলন এবং লেখালেখি চলছে। এবং প্রফেসর নিং এর মত কনফিউজিং কেস এদেশে অগণিত। খোদ আমেরিকার সরকারও সেনসাসে এই ব্যাপারটাকে এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারেনি। ডঃ নিং এর ক্লাসে আমার বিভিন্ন সহপাঠীদের মুখ থেকে তাদের রেস, এথনিসিটি, ন্যাশনালিটি নিয়ে বিভিন্ন সময় যেসব কনফিউশন তৈরী হয়, তা’ নিয়ে গল্প, আলোচনা এবং বিতর্ক শুনেছি। কখনো দেখতাম তারা একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসতে পারতো, আবার কখনো পারতো না। কিন্তু যেদিন ক্লাস শেষ হলো, সেদিন মনে হয়েছে এই কোর্সটা শুধুমাত্র এন্থ্রোপলোজির ছাত্র-ছাত্রীদের ছাড়াও আর সকল গ্রাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের জন্যই বাধ্যতামূলক করা দরকার।

আমার আরেকটা কোর্স ছিল  Academic Writing and Publishing. প্রফেসর জেমস ব্রাডির তত্বাবধানে পুরো কোয়ার্টার জুড়ে আমাদেরকে গলদঘর্ম হতে হয়েছে মেইনষ্ট্রীম আমেরিকান লেখনী রপ্ত করতে। খোদ আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এবং বড় হওয়া ছাত্রছাত্রীরা এই ক্লাসে নাকানি-চুবানি খেয়েছে। সেখানে সদ্য অভিবাসী আমার অবস্থা ছিলো আরো করূণ। প্রায় প্রতিটি এসাইনমেন্টে আমার লেখায় ডঃ ব্রাডি লালকালির অপারেশন চালাতো। আর প্রতিটি ক্লাসেই আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, আমি কি আদৌ ইংরেজী লেখা শিখেছিলাম? দিশেহারা আমি কোন কূলকিনারা না পেয়ে ছোটবেলায় ক্লাস নাইনের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ইংরেজীতে ৯১ পাওয়ার স্মৃতি দিয়ে মনকে স্বান্তনা দিতাম। সেদিন বেলাল স্যার বলেছিলেন তার পনের বছরের শিক্ষকতার জীবনে সেটাই ছিল সর্বোচ্চ নম্বর! অথচ আজ ডঃ ব্রাডির লালকালির দাপটে আমার এসাইনমেন্টের কালো শব্দগুলো রীতিমত মলিন হয়ে যায়। সবার এসসাইনমেন্ট যেখানে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ড্রাফটেই আপ্রুভ হতো, সেখানে আমার লাগল চার/পাঁচ ড্রাফট। উল্লেখ্য যে, এই ক্লাসে প্রতি সপ্তাহে দুইটা করে এসাইনমেণ্ট জমা দিতে হতো, যা’র কোনটাই সাত থেকে দশ পৃষ্ঠার কম নয়। আর আমার জন্য কষ্টের বোঝা ত’ ছিন এমনিতেই আরো তিনগুণ। আমার মনে হয়, ঢাবি’র চার বছরে যতখানি লিখেছিলাম, এই তিন মাসে তারও থেকে বেশি লিখাছি। এত কষ্টের পর গতপরশু ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে এই ক্লাসের গ্রেডটি ‘এ’ দেখে মনে হলো যে, ‘কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে’ কথাটি যে বলেছে সে আসলেই একটা জিনিয়াস।

সবশেষে একটা বিষয়ে যা’ না লেখলেই নয়। আমাদের অনেকের মনেই আমেরিকা সম্পর্কে নানা বিদ্বেষ, ঘৃণা জমে আছে। এবং সেসবের পেছনে হয়তো অনেক যৌক্তিক কারণও আছে। কিন্তু এখানকার শিক্ষার উচ্চমান নিয়ে আমার মনে হয় কারো মনে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আমার গত এক কোয়ার্টারের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এদের শিক্ষাব্যবস্থা খুবই বাস্তবমুখী এবং যুগুপোযোগী। সমসাময়িক বিষয়গুলোকে তারা পাঠ্যক্রমের মধ্যে নিয়ে এসেছে। ক্লাসরুমের পাঠদান পদ্ধতিও অনেক উন্নততর যেখানে শিক্ষকের সাথে ছাত্রের অনেক বেশি আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এরফলে ছাত্রছাত্রীরা তাদের নিজস্ব মতামত গঠন করার এবং তা’ তুলে ধরার সুযোগ পায়, সার্বিকভাবে জীবনে সাফল্যের জন্য যেটা খুবই দরকারী।

Source: http://banglabarta.dk/details.php?cid=1&id=2578

%d bloggers like this: