কোন পথে আরব বিশ্ব


কোন পথে আরব বিশ্ব
তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
আরব বিশ্বের রাজনীতি এখন কোন পথে? গেল বছরের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলির দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে তাতে গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুই শেষ কথা নয়। বরং পরিবর্তন আসছে সিরিয়ায়, সেখানে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দিন যত যাচ্ছে, দেশটিতে গণঅসন্তোষ তত বাড়ছে। গত প্রায় আট মাস ধরে সেখানে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট আসাদকে কিছুটা নমনীয় মনে হয়। গত ২ নভেম্বর কায়রোতে আরব লিগের প্রস্তাবনায় সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তির ভবিষ্যত্ ইতোমধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেননা চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ব্যবহার করেছে এবং একটি ঘটনায় ২৪ জন মানুষ হোমসে শহরে মারা গেছে। চলতি সপ্তাহে কায়রোতে সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আলাপ শুরু হওয়ার কথা। এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেক কিছুই এখন নির্ভর করছে। বলা ভালো, আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ ১৯৭১ সাল থেকেই সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। বাথ পার্টির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। ২০০০ সালে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান বাশার আল আসাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তনের ঢেউ গিয়ে লেগেছে বাহরাইনেও। সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শাসক হামাদ বিন ঈসা আল খলিফার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। গত ৪ নভেম্বর রাজধানী মানামায় বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন। পুলিশের গুলিতে একজন বিক্ষোভকারী মারাও গেছেন। তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে বাহরাইন পর্যন্ত সর্বত্রই সরকার পতনের আন্দোলন হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারের পরিবর্তন হয়েছে এবং একটি গণতান্ত্রিক ধারাও সেখানে শুরু হয়েছে। তিউনিসিয়ায় সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং একটি ইসলামিক শক্তি সেখানে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এন্নাহদার বিজয় আরব বিশ্বে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। লিবিয়ায় গণ-আন্দোলনের মুখে গাদ্দাফির পতন হয়নি। একটি গৃহযুদ্ধে এবং বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপে গাদ্দাফির সরকারের পতনই শুধু হয়নি, গাদ্দাফি নিজে নিহতও হয়েছেন। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়াতে কোন ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী আট মাসের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন আছে অনেক। যদি লিবিয়াতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তা হলে আরেকজন স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। মুস্তাফা আবদেল জলিলের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সেখানে যুদ্ধ পরিচালক করেছে এবং গাদ্দাফি-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে থাকবে। অতীতে আবদেল জলিল গাদ্দাফির বিচারমন্ত্রী ছিলেন। পক্ষ ত্যাগ করে তিনি বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেন। কিন্তু জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে সেখানেই বসবাস করেন। সম্ভবত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। জলিলের চেয়ে জিবরিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের খুব কাছের ব্যক্তি হবেন। যুদ্ধের কারণে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে চলে গেছে। গাদ্দাফি নিজেও অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন। ন্যাটোর বিমান থেকেও বিদ্রোহীদের জন্য অস্ত্র ফেলা হয়েছিল। এসব অস্ত্রের হদিস পাওয়া খুব কঠিন হবে। বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ওইসব অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে। এই অস্ত্র আল কায়দার কাছে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ফলে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় অস্ত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, যা গণতন্ত্রের উত্তরণে কোনো সাহায্য করবে না। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় ইসলামী জঙ্গিরা অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বেশ কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপের খবর পাওয়া যায়, যারা গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে; যেমন, বলা যেতে পারে Islamic Fighting Group (IFG), Abu Ubaidah-bin Januah Brigade, Abdel Hakim Belhadj Group, Tripoli Military Council কিংবা Salafi Group-এর কথা। এদের কারও কারও সঙ্গে আল কায়দার যোগাযোগ রয়েছে বলেও ধরে নেওয়া হয়। এক সময় IFG-কে পশ্চিমা শক্তি সমর্থন করেছিল। ১৯৯৬ সালে গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলনে IFG-কে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী দাঁড়ায় সেটা দেখার বিষয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যা দরকার, তা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনা, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা-যা লিবিয়াতে নেই। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। এখন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সদস্যরা একাধিক দলের জন্ম দিতে পারেন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারেন। লিবিয়ায় বেকার সমস্যা প্রকট। জনগোষ্ঠীর ৩০ ভাগ বেকার। লিবিয়ায় বিশাল তেলের রিজার্ভ থাকলেও তেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। লিবিয়ার জনগোষ্ঠীর ৪০ ভাগ হচ্ছে তরুণ। এদেরকে মূল ধারায় নিয়ে আসা, চাকরির ব্যবস্থা করা হবে কঠিন কাজ। না হলে এখানে চিরস্থায়ী একটি অস্থিতিশীলতা থাকবেই। লিবিয়া গোত্রকেন্দ্রিকভাবে বিভক্ত। গোত্রের লোকজন একত্রিত হয়ে মরুভূমি তথা পাহাড়ের নিচে বসবাস করেন। এরা আধুনিকমনস্ক নন। গাদ্দাফি যে গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা গাদ্দাফির মৃত্যুকে সহজভাবে নেবেন না। ফলে একধরনের বিরোধিতা থেকেই যাবে। উপরন্তু দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিরোধের জন্ম হয়েছে। তেল কূপগুলো পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চল থেকে। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়বে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর আগ্রহ মূলত লিবিয়ার তেল ও গ্যাসের কারণে। বিশ্বের রিজার্ভের ৩৫ ভাগ তেল রয়েছে লিবিয়ায়, যার পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ব্যারেল। গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে ১ হাজার ৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন তেল উত্তোলিত হতো এক দশমিক তিন মিলিয়ন ব্যারেল থেকে এক দশমিক ছয় মিলিয়ন ব্যারেল। ভূমধ্যসাগরের নিচ দিয়ে পাইপের সাহায্যে এই গ্যাস যায় ইতালিতে (ত্বেবহংঃত্বধস চরঢ়বষরহব)। লিবিয়ার অভ্যন্তরে মাত্র এক ডলারে তেল পাওয়া যেত। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের মূল্য ৮০ ডলার। সুতরাং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থটা কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। লিবিয়ার পুনর্গঠনের নামে তখন লিবিয়াতে ব্যবসা খুঁজবে মার্কিনি কোম্পানিগুলো। আর লিবীয় সরকারকে তেল বিক্রি করে (অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করে) পুনর্গঠনের বিল পরিশোধ করতে হবে। ঠিক যেমনটি হয়েছে ইরাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিতে লিবিয়ার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেন্টাগন যে দীর্ঘ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তাতে লিবিয়া একটি ফ্যাক্টর। লিবিয়ার প্রশাসনকে যদি হাতে রাখা যায়, তা হলে উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলে পার্শ্ববর্তী শাদ ও নাইজারও নিয়ন্ত্রণে আসবে। শাদ ও নাইজারে রয়েছে তেল ও ইউরেনিয়াম, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। একুশ শতকে যে নতুন আফ্রিকার জন্ম হতে যাচ্ছে, সেখানে ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের। কঙ্গো, রুয়ান্ডা, আইভরি কোস্ট ছিল একসময় ফ্রান্সের কলোনি। ফরাসি ভাষা এখানে সরকারি ভাষা। এ অঞ্চলে তখন বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। ইতোমধ্যেই আফ্রিকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন একটি মিলিটারি কমান্ড অঋজওঈঙগ। এ জন্য লিবিয়ায় ‘বন্ধুপ্রতিম’ সরকারের খুব প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফির মত্যু এই হিসাবটা সহজ করে দিল। লিবিয়ার ঘটনাবলি দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের সরকারকে উত্খাত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র রাখে। তবে অবশ্যই সেই সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের হতে হবে। অতীতে গাদ্দাফিকে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ইরাকে সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযানের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র গাদ্দাফিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় গাদ্দাফিকে চলে যেতে হল। এভাবে একটি স্বাধীন দেশে ন্যাটোর বিমানবহর দিয়ে হামলা কোনো আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদন করে না। এটা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ। নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় তথাকথিত ‘গণহত্যা’(?) ঠেকাতে ন্যাটোর বিমান হামলার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের কোনো অনুমতি দেয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদে এ কথাগুলো আর কেউ বলবে না। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আফ্রিকায় সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তন হল।

প্রশ্ন হচ্ছে, সমগ্র আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তন কি সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে? তিউনিসিয়ায় এন্নাহদা পার্টির উত্থান সেখানে একটি ‘তুরস্ক মডেলের’ জন্ম দিতে যাচ্ছে। তুরস্কে ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। তুরস্কে ইসলামপন্থীরা কট্টরপন্থী নন। এরা আল কায়দাকে সমর্থনও করে না। বরং আল কায়দার রাজনীতিকে সমালোচনা করে। আধুনিকমনস্ক তুরস্কের নেতৃত্ব ইসলামিক বিশ্বে নতুন এক ইমেজ নিয়ে এসেছে। এন্নাহদার নেতা ঘান্নুচি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের রাজনীতির অনুসারী। এ কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। একসময় মিসরের ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ঘান্নুচি। এখন সেখান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। ‘তুরস্ক মডেল’ এখন তার কাছে আদর্শ। আগামী ২৮ নভেম্বর মিসরে সংসদ নির্বাচন। সেখানে ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোন পর্যায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার বিষয়। সামরিক জান্তা প্রধান ফিল্ড মার্শাল তানতাবি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। দেশটিতে অশান্ত পরিস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। এখানে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা পরিচালনা করা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। ইয়েমেনের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখেননি। তুলনামূলক বিচারে আল কায়দা অনেক শক্তিশালী ইয়েমেনে। এখানে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিজয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তরুণ সমাজ সেখানে সালেহবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তাদের কোনো সংগঠন নেই। তবে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে একটা ভয় থেকেই গেল। সিরিয়াতেও এদের তত্পরতা রয়েছে।
স্পষ্টতই আরব বিশ্বে ইসলামিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। ১৯৫২ সালে মিসরে জামাল আবদুন নাসেরের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম হয়েছিল, যা ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিটি আরব রাষ্ট্রে। এখন তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রমনা একটি ইসলামিক শক্তির উত্থান সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে যায় কি না সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tareque.rahman(a)aol.com

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

দুর্ঘটনারোধে চালকদের দক্ষ ও সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই


গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধের বিরুদ্ধে নামছে মোবাইল কোর্ট


১৩ জুলাই: গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আজ জানিয়েছেন। মিরসরাইয়ে ট্রাক উল্টে ৪২ ছাত্রসহ ৪৪ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির কয়েকদিন পর এ ঘোষণা দিলেন তিনি।
সাহারা খাতুন আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত আইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের অভাবে গাড়ি চালকদের মধ্যে এ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মোটর ভেহিকেল অধ্যাদেশ মোতাবেক এ ধরনের অপরাধের জন্য গাড়ি চালককে পাঁচশ টাকা জরিমানা বা এক মাস কারাদণ্ড কিংবা উভয়ই হতে পারে।
অবশ্য পুলিশ বলছে, এ আইন বাস্তবায়ন করার মতো জনশক্তি তাদের নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করার সময় সাহারা খাতুন বলেন, এ ধরনের অপরাধীদের খুঁজে বের করার ওপর ভ্রাম্যমাণ আদালত বিশেষ গুরুত্বারোপ করবে। তিনি আরো জানান, মোটর ভেহিকেল অধ্যাদেশের কঠোর বাস্তবায়ন করবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সড়কে সঠিক ট্রাফিক চিহ্ন না থাকার কারণে অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হলে সাহারা খাতুন বলেন, সড়ক চিহ্ন বসানোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগিরই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবে।

গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলার বিরুদ্ধে দুর্বল আইন

শাহীন রহমান ॥ একটি পরিচিত বাণী পরিবহনের পেছনে লেখা থাকে। এসব বাণীর মধ্যে একটি জনপ্রিয় বাণী হলো একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না। গাড়ি চালাতে সাবধানতা অবলম্বন করুন। কিন্তু এসব বাণী কেউ মেনে চলে, না বাণিজ্যিক উদ্দেশ ব্যবহার করা হয় তা নিয়ে হয়ত প্রশ্ন রয়েছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত অযৌক্তিক কারণে দেশে যে হারে দুর্ঘটনা বাড়ছে তাতে কান্নার রোল হয়ত কোনদিন থামবে না। পরিবহণে চলতে গেলে চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো কারও চোখ এড়ায় না। প্রতিবাদ করে লাভ হয়নি কোনদিন। উল্টো প্রতিবাদ করায় যাত্রীদের হয়রানির শিকার হতে হয় হরহামেশায়। কিন্তু যারা বেপরোয়া গাড়ি চালায়, এসব চালকের অনেকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। হেলপার হয়ে ড্রাইভারের কাজ করা, চলন্ত গাড়িতে চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার একটি স্বভাবে পরিণত হয়েছে। চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিরম্নদ্ধে আইন থাকলে তার কোন প্রয়োগ নেই। শুধু দুর্ঘটনা ঘটলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তৎপর হতে দেখা যায়। তখন হয়ত গাড়ি চালাতে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। কিছুদিন গেলে যে লাউ সেই কদুতে পরিণত হয়। আবার সবকিছু হয়ে যায় আগের মতো। কিন্তু মাঝখানে যে তরতাজা প্রাণগুলো হারিয়ে যায় তা কোনদিন ফিরে পাবার নয়। দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁদের পরিবারের কান্না যে কতদিন চলে তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। তাই হয়ত তাদের কান্না নিয়ে অন্যদের কোন মাথা ব্যথা নেই। ফুটবল খেলা দেখে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার অর্ধশত স্কুল ছাত্রের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবেন কেউ। অথচ তাদের লাশ হয়ে ফেরার পেছনেও রয়েছে চালকের বেপরোয়া, খামখেয়ালি আর স্বেচ্ছাচারিভাবে গাড়ি চালানো। আইন না মেনে গাড়ি চালানোর কারণে এত কচি প্রাণের অপমৃতু্য ঘটল। চালক মোবাইল ফোনে কথা বলায় গিয়ে ব্রিজ থেকে গাড়ি খাদে পড়ে গিয়ে প্রাণ দিতে হলো তাদের। এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিরম্নদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। আইনে জেল জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইন মানার প্রবণতা কারও মধ্যে লৰ্য করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন অমান্য করে গাড়ি চালানোর কারণে দেশে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।
সম্প্রতি গাড়ি চালানোর সময় চালকের মোবাইলে কথা বলা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অথচ চলনত্ম অবস্থায় চালক মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণেই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, অনেকে মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন চলনত্ম অবস্থায় চাকলের কথা বলাকে। রাজধানীসহ সারাদেশে হরহামেশা এ চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবহনের চালক ছাড়াও মোটরসাইকেল আরোহীকে প্রায়ই চলন্ত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়। এভাবে কথা বলার কারণে রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি যেসব বড় দুর্ঘটনা ঘটছে তার প্রধান কারণও এই মোবাইল ফোনের ব্যবহার।
চলন্তু অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা রোধ করতে ২০০৭ সালে মোটরযান আইনের সংশোধন করা হয়। ওই বছর ১২ জুলাই গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা না বলার ব্যাপারে মোটরযান আইনের ১১৫(বি) ধারার সংশোধন করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি আইনে এয়ারফোন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইন অমান্য করলে ৫শ’ টাকা জেল জরিমানার করার বিধান রয়েছে। কিন্তু হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপৰ ব্যবস্থা নিতে দেয়া যায়নি। ভারতেও এধরনের একটি আইন রয়েছে। আইন অমান্য করলে ২ হাজার টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের জেলা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভারতের আইনের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনের পার্থক্য হলো বাংলাদেশের আইনটি যেমন দুর্বল, তেমনি এর কোন প্রয়োগ নেই।
সম্প্রতি যে সব বড় দুর্ঘটনা ঘটছে তার পেছনে রয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় চালক প্রায় অসতর্ক অবস্থায় থাকে। এছাড়া পাশে বসা অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় অসতর্ক হয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালায়। গত সোমবার চট্টগ্রামে ট্রাক খাদে পড়ে ৪১ স্কুলছাত্রের নিহত হবার পেছনেও রয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী চালক চলনত্ম অবস্থায় কথা বলছিল। তখন তার অসকর্ত হওয়ার কারণে ট্রাকটি এলামেলো চলছিল। একপর্যায়ে দ্রম্নতগতিতে ট্রাকটি সেতুর ওপর উঠে প্রচণ্ড ধাক্কা খায় তখনই ঘটে যায় স্মরণকালের ভয়াবহ দুঘর্টনা।
এ মাসের ২ তারিখে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। এ ঘটনায় ৭ শিৰার্থীর করম্নণ মৃতু্য হয়। জানা যায়, নিহত ছাত্রছাত্রীর মধ্যে একলাশপুর হাইস্কুলের এবং নোয়াখালী সরকারী মহিলা কলেজের ছাত্রী। এ ঘটনায় নিহত অপরজন চালক স্বয়ং। শিৰার্থীদের মধ্যে দুজন ছিল সহোদর। প্রত্যৰদর্শীদের ভাষ্যমতে চালক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালাচ্ছিল। একপর্যায়ে বাসটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ছয় শিৰার্থী প্রাণ হারায়। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন মারা যায়। এ দুর্ঘটনার পেছনেও ছিল চালকের মোবাইল ফোনের ব্যবহার। ওই বছরের ২৯ মে লোহাগড়ার চুনতি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। হানিফ এন্টারপ্রাইজের বেপরোয়া গতির বাসটি একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দিলে এক পরিবারের তিনজন নিহত হয়। আহত বা বেঁচে যাওয়া বাসের যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী চালক চলনত্ম অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আগামী ২৪ তারিখে ডাকা হয়েছে সড়ক উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। জানা গেছে চালকদের সচেতন করতে এ বৈঠকে প্রয়োজনীয় পদৰেপ নেয়া হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান মো. আয়ুবুর রহমান খান জনকণ্ঠকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সারাদেশে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। চালককের প্রশিৰণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বিআরটিএর পৰ থেকে। আগামী ২৪ জুলাই সড়ক উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে বিসত্মারিত আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনারোধে চালকদের দক্ষ ও সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তার আন্দোলনের প্রেৰিতে দেশের নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের জন্য সরকারীভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মোবাইল ফোনের ব্যবহার রোধে মাত্র ৫শ’ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তাও কার্যকর করা হচ্ছে না। জরিমানার বিধান ৫শ’ টাকার বেশি করে এসব চালকের কঠোর শাসত্মির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাসত্মবায়ন করা না গেলে দুর্ঘটনারোধ করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এসব বেপরোয়া চালকের পেছনে রয়েছে তাদের শক্তিশালী সংগঠন। কোনরকম দুর্ঘটনায় চালক একবার প্রাণে বেঁচে গেলে তাদের বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে সংগঠনগুলো। ফলে তাদের আর শাসত্মির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। [একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, একুশ নিউজ মিডিয়া Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchange

ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলেছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে।


রাজধানীর অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাবে

শব্দদূষণ


এফএনএস (মাহতাব শফি) : রাজধানীতে বেড়েই চলছে শব্দদূষণ। নীতিমালা আছে কিন্তু তার কোন প্রতিকার নেই। রাজধানী ঢাকা শুধু নয়। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই বর্তমানে এই শব্দ দূষণের শিকার। ফলে আগামী প্রজন্ম হারাচ্ছে শ্রবণশক্তি। শ্রবণশক্তিই নয়, শব্দ দূষণের কারণে উচ্চরক্ত চাপ, মাথাধরা, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, অনিদ্রা ও ফুসফুসে সহ নানা রকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত শব্দ দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা নষ্ট হয়, সন্তান সম্ভাবনা মায়েদের যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ মারাÍক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, যানবাহনের শব্দ দূষণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায় বহুমাত্রায়। এক জরিপে উঠে আসা রাজধানী ঢাকার শব্দ দূষণের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যা সত্যিই আতংকজনক। সারা বিশ্বে এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার পালিত হয় ‘আর্ন্তজাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস’। সারা বিশ্বেই এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে তেমন সচেতন নয়।
বাংলাদেশে রয়েছে শব্দ দূষণ নীতিমালা। ২০০৬ সালে প্রণীত এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একই ভাবে, নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উপরে শব্দ সৃষ্টি করা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিধিমালা মানা হচ্ছে না।
একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি বেসরকারী সংগঠনের পরিচালিত গবেষনায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় শব্দদূষণ মাত্রা ১০২ ডেসিবেল, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ৯৩ ডেসিবেল, বাংলামোটর এলাকায় ৯২ ডেসিবেল, সদরঘাট এলাকায় ৮৮ ডেসিবেল, ফার্মগেট এলাকায় ৯৩ ডেসিবেল, শাহবাগ এলাকায় ৮৬ ডেসিবেল, মহাখালীতে ৯৪ ডেসিবেল, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ১০১ ডেসিবেল, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৯৫ ডেসিবেল, গুলিস্তান এলাকায় ৯২ ডেসিবেল এবং স্কয়ার হাসপাতাল এলাকায় ১০৪ ডেসিবেল। যেখানে সবোর্চ্চ শব্দসীমা যত তার দ্বিগুণ শব্দ দূষণ করা হচ্ছে।
রাস্তায় বেরুলেই দেখা যায় এই শব্দ দূষণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। রিক্সা ওভারটেক করতে চায় বাসকে, বাস ওভারটেক করতে চায় প্রাইভেট কারকে, প্রাইভেট কার ওভারটেক করতে চায় এ্যাম্বুলেন্সকে। আর এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে প্যাঁ পুঁ শব্দে হর্ণ বাজানো।
উন্নত দেশগুলো অবশ্য শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি কঠিন রোগের উৎস ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ, এর মধ্যে অন্যতম শব্দদূষণ। শব্দদূষণের ফলে সৃষ্ট সমস্যাবলীর ভিতরে রয়েছে কানে কম শোনা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক ভীতি। এছাড়া অস্থিরতা, উচ্চরক্তচাপ ও শব্দভীতি অন্যতম।
রাজধানীতে শুধু গাড়ির হর্নই নয় জনসভায় ব্যবহৃত মাইকগুলোও একে অন্যের চাইতে জোরে চিৎকাররত। মার্কেটে বাজছে উচ্চশব্দের গান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর একটি ভি,আই,পি সড়কে হর্ণ বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তা বেশী দিন কার্যকর রাখতে পারেনি। শুধুমাত্র একটা শব্দদূষণ বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া সরকারের আর কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না। এগিয়ে আসছে না কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, যদি টানা ৮ ঘন্টা ৯০ থেকে ১০০ ডেসিবেল শব্দ প্রতিদিন শোনা হয়, তাহলে ২৫ বছরের মধ্যে শতকরা ৫০ জনের বধির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শব্দ দূষণ চোখ ও মাথার বিভিন্ন সমস্যার জন্যও দায়ী। শহরের বেশীরভাগ মানুষই মাথার যন্ত্রণায় ভোগে-যার অন্যতম কারণ শব্দ দূষণ। এছাড়া ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক এমনকি লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলেছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে।
মানুষের ব্যক্তিগত অদূরদর্শী কার্যকলাপ, যোগাযোগ ব্যবস্থার অপরিকল্পিত বিস্তার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্র“টি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের বিবর্তিত শব্দের ব্যাপকতায় শব্দ দূষণ বর্তমান সময়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায়, পরিবহন পদ্ধতিতে এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত সুনির্দিষ্ট তীব্রতা সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বাস, ট্রেন, জাহাজ, শিল্প-কারখানা থেকে বের হওয়া শব্দ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের শব্দের তীব্রতা নির্দেশিত মাত্রায় বা তার নিচে বজায় রাখা উচিত। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন। যানবাহন থেকে বের হওয়া শব্দের ব্যাপকতা এবং তীব্রতা হ্রাসের জন্য আইন করে উন্নত প্রযুক্তির ডিজেল ইঞ্জিন এবং এক্সসট গ্যাস পাইপে সাইলেন্সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।
সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যান্ড সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়ে থাকে। যার ফলে এ সময় অনাকাক্সিক্ষতভাবে শব্দ দূষণ সৃষ্টি হয়ে আশেপাশে থাকা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীসহ প্রায় প্রত্যেকেরই ঘুমের বিঘœ ঘটছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে দরকার জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
১৯৯৭ সালের পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব জায়গায় মোটরগাড়ির হর্ণ বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ এ আইনের তোয়াক্কা কেউ করে না। ঢাকা সিটির সাইলেন্টস জোনেও আইনশৃংখলা বাহিনীর সামনেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাইক বাজিয়ে দেদারসে ঔষধ বিক্রির নামে যন্ত্রণাদায়ক অশ্লীল কথামালায় মাইকিং করতে দেখা যায়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী কোন এলাকা ৬০ ডেসিবেল মাত্রার বেশী শব্দ হলে সেই এলাকা দূষণের আওতায় চিহ্নিত হবে। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী অফিস কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালে ২০ থেকে ৩৫ ডেসিবেল, রেস্তোরায় ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা সহনীয়। ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।
উচ্চশব্দ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও অসচেতনার কারণে রাজধানীতে শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে ৯৫ ভাগ মানুষ। অবশ্য এ শব্দ দূষণের অন্যতম কারণ হিসাবে গাড়ির হর্ণকেই দায়ী করলেন বিষেজ্ঞরা।
শব্দদূষণ বন্ধে বিধিমালা বাস্তবায়নে গাড়িচালকদের মধ্যে সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে গাড়ীর হর্ণ বাজানোর জন্য সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত। শব্দদূষণ বন্ধে পুলিশ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং জেলা প্রশাসনের পরিচালিত মোবাইল কোর্টগুলোতে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ণ এর ব্যবহার রোধে আরও কার্যকারী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আইনৃ´খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, অপ্রয়োজনে হর্ণ বাজালে মোটরযান অধ্যাদেশের আওতায় ২শ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এ জরিমানা চালককে দিতে হয় না বলে চালকরা এ অপরাধ করেই যাচ্ছে। শব্দ দূষণ রোধে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে এর কোন প্রয়োগ নেই।
প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষ। রাস্তায় নামছে নতুন নতুন গাড়ি। তৈরি হচ্ছে নতুন স্থাপনা। আর এই বাড়তি মানুষের চাহিদার জোগান দিতে বেড়েছে শব্দ দূষণের মাত্রা এবং বাড়তে বাড়তে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাড়ি চালক ও গাড়ির মালিকগণকে শব্দ দূষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিতকরণসহ জনসচেতনতা সৃষ্টি, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত বিধান এবং শব্দ দূষণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ করতে হবে। বিশেষ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সেক্স, যৌন, যৌনতা, অপরাধ, একুশ নিউজ মিডিয়া, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchange

বাঙালির বুদ্ধিজীবিতার ইতিহাস সুবিধাবাদিতার ইতিহাস


জাতীয় সংকটে সুশীলরা কোথায়?

সোয়াদ আহমদ ● কেউ কথা বলছেন না, কয়েকজন বলছেন। তারা মোটে গুটি কয়। জাতীয় সম্পদ পাচার হচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ লুণ্ঠিত হচ্ছে, গণমানুষের সঙ্গে নিদারুণ প্রতারণা হচ্ছে, রাষ্ট্রশক্তি বিক্রি করে দিচ্ছে গণমানুষের ভবিষ্যৎ – এসব অহরাত্রি ক্লান্তিহীনভাবে বলে চলেছেন আমাদেরই কয়জন। আনু মুহাম্মদ, এম এম আকাশরা লড়ছেন, সঙ্গে আছে বিশাল সংখ্যার রাজনীতি সচেতন এক তরুণ শ্রেণী। তরুণরা ব্লগে লিখছেন, তর্ক করছেন, গল্প করছেন, স্বপ্ন দেখছেন এবং তৈরি হচ্ছেন। তৈরি হচ্ছেন এক বড় সামাজিক প্রয়োজনে, নিজেদের মতো করে সব গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। অনেককেই ভুলিয়ে রাখতে পেরেছে রঙিন করপোরেট জগত, মাল্টিনেশন কোম্পানি অথবা সুশীল জাতীয়তাবাদের ছায়া, তবে সবাইকে পারেনি। সবাইকে পারা যায় না। এরা টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ফেসবুক সব ছাপিয়ে সময়ের প্রয়োজনে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছায় সচেতন বা অবচেতনভাবে অভিন্ন প্রয়োজনে জড়ো হচ্ছে।

আমাদের অতি চেনা হিসাব মতোই, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নির্ভাবনায় আরাম কেদারায় শুয়ে দু’পা নাচাচ্ছেন। অনেকেই অবাক হয়, যারা ইতিহাস সচেতন তারা অবাক হয় না, তারা এঁদের হাড়ে হাড়ে চেনেন। এই সময়গুলোতেই উনারা কালা এবং বোবা, আর বাকি সময়ে উনাদের মুখে কথার ফুলঝুরি। তেল-গ্যাস নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা বলবেন এর বাইরে আমাদের সুশীলদের বিষয়ে সামান্য গুণকীর্তনের নিমিত্তেই এই লেখার অবতারণা।

বারবার আমরা এই সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রগত সংকট দেখে বিস্মিত হচ্ছি। আমরা এরশাদ সরকারের পতন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের দোহাইয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দানের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীটির শ্রেণীগত প্রতিষ্ঠা দেখি। তখন আমরা আমাদের বিশিষ্ট হেভিওয়েট দেশপ্রেমিক বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেখি। ২৭ জুন ২০১১ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকাতে দেয়া শেখ হাসিনার কলামেও তার কথা উল্লেখ করেছেন যে হাবিবুর রহমান ১৯৯৬তেই সুশীল অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। সেসব তো অনেক পরের কথা। আমরা বেশ খানিক আগে চলে যাব, এদের শ্রেণীগত চরিত্র বোঝার জন্য রাষ্ট্রের সংকটকালীন সময়গুলোর ওপর চোখ বোলালেই চলবে।

বাঙালির বুদ্ধিজীবিতার ইতিহাস সুবিধাবাদিতার ইতিহাস। নিজের ভোগবিলাস ছাড়া এই পরজীবী বুদ্ধিজীবীরা কিছুই বোঝে না। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে সংকটকালীন সময় ’৭১, সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা। এই বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ স্বপ্ন দেখতে জানত না, এদের চোখে কোনোদিন স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি জেগে ওঠেনি। তাই সাহস করে কেউ ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেনি যে, একটি জাতি ঐতিহাসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিতে যাচ্ছে। মনীষা আহমদ ছফা এই বিষয়টাতেই ভীষণ আক্ষেপ করতেন। পশ্চিম বাংলায় এ দেশের কোটি কোটি উদ্বাস্ত্ত বাঙালি যখন মানবেতর জীবন যাপন করছে তখন কলকাতা নগরীতে রাজ সম্মানে আশ্রিত বুদ্ধিজীবীরা আয়েশি জীবন, ভোগবিলাসে মগ্ন থাকতেন, সত্য-মিথ্যা গল্প ফেঁদে মোটা অর্থ কামাতেন। এরা সগৌরবে বিদেশী সাহায্যের অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নিতে লজ্জা পেতেন না। সময়ের প্রয়োজনে এদের অনেকেই যারা একসময় ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী, পাকিস্তান রাষ্ট্র দর্শনের একনিষ্ঠ পুজারী তারাই স্বাধীনতার পর দলে দলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জয়গান গেয়েছেন। অনেক ভারি ভারি বুদ্ধিজীবী আইয়ুব খানের টাকার ঝুলির পেছনে কলম ফেলে দৌড়িয়েছে। এসব শুধুই ইতিহাস নয়, সেদিনের কতিপয় ‘বোকাসোকা’ মানুষ যারা বুদ্ধিকে জীবিকার বাহন হিসেবে নেয়নি, যে কয়জন ‘মূর্খের’ মতো নতুন ভূখন্ড নিয়ে অহর্নিশ স্বপ্ন দেখত, সেই কয়জনের বাইরে বুদ্ধিজীবীদের বিশাল অংশের শেকড়-বাকড় আর তাদের ভাবশিষ্য নিয়েই রচিত আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের ভিত্তিভূমি।

আমরা দেখেছি সময়ের প্রয়োজনে ও পুঁজির বিকাশের স্বার্থেই এরশাদ সরকারের উত্থান ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তি। এরশাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তার পতনও ঘটানো হয়। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এরা নতুন আরেকটি শ্রেণী তৈরিতে উদ্যোগী হলো। গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মত প্রকাশ তথা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। নতুন শ্রেণীটি হলো এই সংবাদ মাধ্যম আশ্রয়ী বুদ্ধিজীবী শ্রেণী আমাদের এখানে যারা সুশীল সমাজ নামে পরিচিত। এরা অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংস্কৃতি ও চিন্তার ধারক ও বাহক মধ্যবিত্ত ও মধ্যবর্তী শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে অতিমাত্রায় গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। তাদের এই উত্থানের ও গ্রহণযোগ্যতার কারণ রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যর্থতা থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনে জেগে ওঠা হতাশাকে ধরতে পারা। তারা দেশে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার গালভরা কথা বলে, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় উচ্চকণ্ঠ প্রকাশ করে যা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীকে সহজেই আকৃষ্ট করে তোলে। তৃতীয় বিশ্বের নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতা ও অর্থ ছাড়া তেমন কিছু চেনে না এবং তা স্বাভাবিক, খালেদা-হাসিনারা তাই দুর্নীতির ধারক-বাহক। রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, গণতন্ত্র চর্চার অভাব, সহিংস মনোবৃত্তি ইত্যাদি জনমনকে সর্বদা ক্লান্ত ও হতাশ করে রাখে। সেই সুযোগটাই সুশীলরা হাতিয়ে নেয় কৌশলে। এদের আমরা প্রয়াশই দুর্নীতি, সুশাসন প্রভৃতি প্রশ্নে সভা সমিতি, সেমিনার, টক শো, পত্রিকার কলামে বলিষ্ঠ বক্তা ও প্রতিবাদী দেশপ্রেমিক হিসেবে দেখি। যাদের মুখে বুলেটের মতো উচ্চারিত হয় দেশ, জাতি আর স্বাধীনতার কথা। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে আমাদের নেতৃত্ব দেশকে কিছুই দিতে পারেনি এই তাদের মূল বক্তব্য। সব ব্যর্থতার উৎস তারা রাজনীতি আর রাজাকারে খোঁজার প্রয়াস পায়। দেশ বিষয়ক মায়াকান্নায় মুহূর্তে তারা তরুণ শিক্ষিত সমাজকে সিক্ত করে ফেলে। ফের সুশাসন প্রশ্নে আমরা তাদের মূল বক্তব্য খুঁজে পাই, এক অগণতান্ত্রিক রাস্তার নির্দেশনা তারা কৌশলে দিয়ে থাকেন। সেই পথ এক পাপের পথ যে পথ কোনো দিন গণতন্ত্রকে মাটির গভীরে শেকড় গাঁড়তে দেবে না। তাদের সেই ষড়যন্ত্রের শিকার আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর সমাজের তরুণ প্রজন্ম যাদের ফেইসবুকের পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস থাকে এই সব বাক্য। একটা প্রজন্মকে তারা নষ্টের চূড়ান্তে নিয়ে গেছে। যারা এরই মধ্যে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। স্বার্থপর সহিংসতায় তাদের সহপাঠীর মৃত্যু তাদের ভাবিত করে না। ন্যায্য অধিকারের জন্য, শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে তাদের সহযাত্রীদের সংগ্রাম এদের আলোড়িত করে না, তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাক বা ভবিষ্যৎ বংশধরদের কান্না কিছুই এদের কান নাগাদ পৌঁছুতে পারছে না।

এই সুশীল-বুদ্ধিজীবীর অভ্যুত্থানের সুযোগ করে দেয় হাসিনা-খালেদার অগণতান্ত্রিক রাজনীতিই। তারা যত বেপরোয়া হয়ে উঠবে, যত দুর্নীতিগ্রস্ত হবে, যত তাদের রাজনৈতিক চরিত্র স্খলন হবে, ততই সুশীলদের লাভ। তারা তত সহজেই হতাশ জনগণের কাছাকাছি যেতে পারে। সুশীল সমাজ সম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন মাত্রার সহযোগী। নানা কারণে সাম্রাজ্যবাদীরা তৃতীয় বিশ্বের সস্তা চরিত্রহীন রাজনীতিবিদের চাইতেও এই শ্রেণীটিকে বেশি পছন্দ করে এবং এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। তৃতীয় বিশ্বের এই পরিবারতন্ত্র, পুঁজিবাদের বিকাশ ও সম্রাজ্যবাদের প্রসারণে যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি করে। তাই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চায় একেবারে তাদের নিজের শক্তিই ক্ষমতায় আসুক। সেই নিজের একান্ত শক্তি যে কখনো তার সঙ্গে বেঈমানী করবে না- সেটি হলো এই সুশীল সমাজ। খালেদা-হাসিনাকে তো সামান্য হলেও জনগণের কথা ভাবতে হয়, কিছুটা হলেও জনগণের সামনে দাঁড়াতে হয় কিন্তু এই বুদ্ধিজীবী সুশীল শ্রেণীর সে দায়বদ্ধতাও নেই।

এই নতুন মাত্রার সুশীল সরকারের এক্সপেরিমেন্ট আমরা দেখি ওয়ান-ইলিভেনে। আমেরিকার আশীর্বাদ পুষ্ট সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের অভ্যুত্থান হয় এই দিনটিতে। এক অগণতান্ত্রিক, অরাজনৈতিক ঐতিহাসিক পাপের জন্ম দিল সুশীল সমাজ। আরোপিত ব্যবস্থার নাম দিল সামরিক শক্তি সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার। কিন্তু আসলে এত দুর্নীতি, অন্যায়, দুঃশাসনের পরও জনমনে হাসিনা-খালেদার প্রতি সামান্য হলেও ভালোবাসা অবশিষ্ট ছিল। সে ভালোবাসাই আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন ঘাত, প্রতিঘাত, সংগ্রাম, ছাত্র বিস্ফোরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের ভেতর দিয়ে দুর্বলভাবে হলেও নির্বাচিত সরকারের পুনর্জন্ম হয়েছিল বলা যায়। এই অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েই পিএসসি-২০০৮ বা রফতানিমুখী উৎপাদন বণ্টন চুক্তির প্রণয়ন দেখি। সম্ভবত সেই অগণতান্ত্রিক সুশীল সরকার থাকলে এতদিনে গ্যাস পাচারের কাজ শুরু হয়েই যেত। এখন যে আমরা নিদেনপক্ষে প্রতিবাদ, মিছিল বা হরতালের সুযোগ পাচ্ছি সেটা তখন কল্পনাও করা যেত না।

সুশীলরা এখন তাই নিশ্চুপ, এটা তাদেরই অসমাপ্ত কাজ। অস্থিতিশীল, দুর্বল বিএনপির মুখে জোর নেই, তারা নিজেরাই কয়েকবার জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছে এবং জাতীয় কমিটির গণআন্দোলনের সামনে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া তারাও সরকারে থাকলে একই কাজ করত। ভালো মানুষের মুখোশ পরা দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান সুশীলরা শুধু এই প্রশ্ন নয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির যে কোনো শর্তে দেশের অপার মঙ্গল দেখতে পান, জনকল্যাণমুলক খাতসমূহে সরকারি ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ায় তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুঁজে পান।

তবে এবার এদের নতুন প্রজন্ম চিনে রাখবে ভালোভাবেই। তারা মনে রাখবে এদের অনেকেই যারা ইউনূসের সম্মান বাঁচাতে দলে দলে মানববন্ধন করেছে, নাকের জল চোখের জল এক করে ফেলেছে আর তাদেরই ষোল কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ সামান্যও ভাবিত করে না। যাদের কাছে একটা নোবেল প্রাইজের ওজন ষোল কোটি মানুষের ওজনের চেয়ে বেশি তাদের নাম লাল কালি দিয়ে লিখে রাখবে আনু মুহাম্মদের উত্তরসূরিরা।

[লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchabge

পুনর্বার নতুন শক্তিতে জেগে উঠুক আমাদের ইতিহাস, আমাদের দেশবোধ, আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।


রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন : একজন নাগরিকের প্রতিবাদ

পিয়াস করিম ● তেসরা জুলাই একটা তুলকালাম কান্ড ঘটে গেল ঢাকায়। জানি আমাদের জাতীয় জীবনে এই অস্থির ঘটনাগুলো নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর তো চল্লিশ বছর পায়ে পায়ে কেটে গেল। এই পদযাত্রা সহজ হয়নি কোনো অর্থেই। পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ থাকেনি আমাদের।

যেই স্থিতিটুকু থাকলে জাতি হিসেবে আমাদের সত্তাকে আরো সুসংহত বলে মনে করা যেত- তা আর আমাদের হয়ে উঠলো না। আমাদের ইতিহাসজুড়ে বার বার রক্তপাত ঘটে গেছে, বার বার ঘটে গেছে অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের পালাবদল। আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্রের বিভাজন রেখাটি বার বার ধূসর হয়ে গেছে। জাতি হিসেবে স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট আমাদের পেতে হয়েছে ক্রমাগত। আমরা প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দায়ও যে আমাদের শাসকরা খুব বোধ করেছেন তা নয়।

এই চল্লিশ বছরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর নিপীড়নের অভিজ্ঞতাতেও আমাদের খুব ঘাটতি নেই। আমাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি কিছুতেই। যাদের রক্ষক হওয়ার কথা ছিল তারা ভক্ষক হয়ে উঠেছেন দিনের পর দিন। আমরা চেয়েছি বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা। উল্টো আমাদের ওপর নেমে এসেছে শ্বাসরুদ্ধকর স্বৈরশাসন। আমরা চেয়েছি শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন, কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জুটেছে গুপ্তমৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। আমাদের তরুণরা দৃপ্ত পদে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। তার বদলে লিমনের মতো তরুণকে পা হারাতে হয়েছে।

সুতরাং তেসরা জুলাই যা ঘটে গেল, তাতে বিস্ময়ে চমকে ওঠার কারণ হয়তো আমাদের নেই। জাতি হিসেবে এটুকু স্থূলচর্ম তো আমরা অর্জন করেছে সেই কবেই। কোনো শোকই বুঝি আর শোক নয় আমাদের কাছে, কোনো আঘাতই আর আঘাত নয়।

কিন্তু তবু তেসরা জুলাই আমাদের নতুন করে ভাবাল। এই হাজারো কষ্টের মধ্যেও যে নতুন করে ভাবার, নতুনভাবে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাটুকু আমাদের সুকঠিন অভিজ্ঞতার ফাঁকফোকরের মধ্যে এটুকু সবুজ চারাগাছের মতো নিজেকে জানান দেয় তা হয়তো প্রমাণ করে- এত পরাজয়, এত অবমাননার পরেও জাতি হিসেবে আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

তেসরা জুলাই ঢাকায় আধাবেলা হরতাল ছিল। তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বঙ্গোপসাগরের দুটি গ্যাস ব্লক মার্কিনি বহুজাতিক করপোরেশন কনোকো-ফিলিপসের কাছে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে এই হরতাল ডেকেছিল। হরতাল আইনসম্মত গণতান্ত্রিক অধিকার, অধিকার আদায়ের জন্য একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক মাধ্যম। এই হরতাল কায়েমী স্বার্থের পক্ষের হরতাল ছিল না। পেছনের দুয়ার দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ছিল না এই কর্মসূচি। বাংলাদেশের সম্পদের ওপর বাংলাদেশের জনগণের অধিকার রক্ষার, বাংলাদেশে স্বাধীন গণতান্ত্রিক অর্থনীতি বিকাশের প্রত্যাশার এটি ছিল ন্যয়সঙ্গত এক পদক্ষেপ।

কিন্তু তেসরা জুলাই কাকভোর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র তার নিপীড়নের থাবা নামিয়ে এনেছিল হরতালকারীদের ওপর। বিনা প্ররোচণায় জাতীয় কমিটির নেতারা একের পর এক গ্রেফতার হয়েছেন। কর্মীদের ওপর নেমে এসেছে পুলিশি নির্যাতনের দানবীয় শক্তি। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি কর্মীরা বেধড়কভাবে লাঠিপেটা হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। টেনেহিঁচড়ে ছেলেমেয়েদের পুলিশি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। আমরা দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় ছবি দেখেছি এক তরুণীকে বুট দিয়ে লাথি মারছে জনগণের করের টাকায় প্রতিপালিত পুলিশ।

পল্টন থানায় দেখা হয় অদিতি হকের সঙ্গে। অদিতি নৃবিজ্ঞানী, সঙ্গীতশিল্পী। ওর বাবা-মা আমার ব্যক্তিগত বন্ধু সাইফুল হক এবং বহ্নিশিখা জামেরির সঙ্গে সে গ্রেফতার হয়েছিল। সেই সকালেই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেওয়ায় অদিতিকে ঘাড়ে-পিঠে বেধড়ক মেরেছে পুলিশ। পল্টন আর শাহবাগ থানায় অদিতির মতোই আরো সব তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে দেখা হলো সেই সন্ধ্যায়। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ও দেশপ্রেমিক কর্মীরা রাজপথে থাকতে পেরেছেন। স্বাধীন দেশের ‘‘পিকেটারদের রাস্তায় না দাঁড়াতে দেবার’’ রাষ্ট্রীয় নীতির কারণেই রাজনীতি বুঝি শেষে পথছাড়াই হয়ে গেল।

হরতালের আগের বিকালে জাদুঘরের সামনে সংস্কৃতিকর্মীদের সমাবেশ ছিল এই ইস্যুতে। সেই সমাবেশে আগুনের টুকরোর মতো ছেলেমেয়েদের দেখেছি। এদের কেউ অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি যাবে তেমন সম্ভাবনা নেই, সুবিধার হালুয়া-রুটিতে এদের কারো আগ্রহ নেই। বরং এদের মধ্যে আছে তারুণ্যের সেই জাদুকরী শক্তি-আদর্শের প্রতি সুগভীর বিশ্বাস। এদের চোখের তারায়, এদের কণ্ঠের কাঁপুনিতে সেই বিশ্বাস ঝিকমিক করে জ্বলে উঠেছিল। এইসব তরুণ-তরুণী এস্টাবলিসমেন্টের অংশ হতে চায় না, কায়েমী স্বার্থবুদ্ধি তাদের জীবনবোধের চালিকাশক্তি নয় এখনো। এদের মধ্যে জীবনের ওপর আস্থার সেই অকম্প শিখা, তারুণ্যেই বুঝি যার শুদ্ধতম প্রকাশ সম্ভব। শিক্ষক হিসেবে, পিতা হিসেবে আমার মনে হচ্ছিল এই বিশ্বাস, এই জীবনবোধ যতদিন জাগ্রত থাকবে, আমাদের এই বেনোজলের খরার, মন্বন্তরের দেশটি সব আশাও ততোদিন ফুরোবে না।

এইসব তরুণ-তরুণীদের অনেককেই পরদিন রাজপথে লাঞ্ছিত, প্রহৃত হতে হয়েছে। কিন্তু এই লাঞ্ছনা তো শুধু তরুণ কর্মীদের নয়। এই অবমাননা গণতন্ত্রের, মানবাধিকারের। তেসরা জুলাই আমাদের বহুবার ক্ষত-বিক্ষত হওয়া গণতন্ত্র ঢাকার রাজপথে আবার মুখ থুবড়ে পড়ল।

আসুন, রাষ্ট্র দ্বারা গণতন্ত্রের ওপর এই নিপীড়নের, গণতান্ত্রিক কর্মীদের ওপর এই নিষ্পেষণের আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আসুন আমরা বাংলাদেশের সর্বস্তরের নাগরিকরা প্রতিবাদে সোচ্চার হই। এই প্রতিবাদে আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। পুনর্বার নতুন শক্তিতে জেগে উঠুক আমাদের ইতিহাস, আমাদের দেশবোধ, আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchabge

‘‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চেয়ে কে বেশি দেশপ্রেমিক এবং দেশের স্বার্থের বিষয়টা আমার চেয়ে কে বেশি ভাবে?’’ -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


‘দেশপ্রেমিক’ এবং টোকাইদের আখ্যান

পিয়াস করিম ● প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার আরো অনেক বক্তব্যের মতোই এই প্রশ্নটিই কোনো আলগা, অসতর্ক উচ্চারণ কিনা আমরা জানি না। কিন্তু নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নকে খুব হালকাভাবেই নেই কি করে?

১৮ জুন ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান কার্যালয় ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চেয়ে কে বেশি দেশপ্রেমিক এবং দেশের স্বার্থের বিষয়টা আমার চেয়ে কে বেশি ভাবে?’’ যেই মনোভঙ্গি থেকে একজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান জানান দেন যে তার চেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক আর কেউ হতে পারে না, সেই ভঙ্গিটিকে ঠিক গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। এই ঘোষণাটির মধ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে এক ধরনের ঔদ্ধত্য ‘আমার চেয়ে বড় আর কেউ নয়’ এই দৃষ্টিভঙ্গিটি। একজন ফার্দিনান্দ মার্কোস, একজন পিনোসে কিংবা একজন হোসনি মোবারকের কাছে এই বক্তব্যটি প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু একজন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির কাছ থেকেও এই কথা আমাদের শুনতে হবে?

জানতে ইচ্ছে করে এই আমার চেয়ে বড় কেউ নয়, এই অহংবোধের, এই দম্ভোক্তির রাজনৈতিক ভিত্তিটি কোথায়? একজন সাধারণ নাগরিক কি দেশপ্রেমের মাত্রায় তার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন না? বাংলাদেশের যে কৃষক উদয়াস্ত শ্রম করেও তার ফসলের ন্যায্য দাম পান না, সেই শ্রমিককে মানবেতর কাজের পরিবেশে প্রতিদিনের দিনযাপনের গ্লানি সয়ে সয়ে নিজেকে ক্রমান্বয়ে ক্ষয় করে ফেলতে হয়, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বড় দেশপ্রেম দাবি করার অধিকার তার নেই? দেশপ্রেমের কোন মাপকাঠিতে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের মেপে থাকেন? ক্ষমতাহীনরা তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের চেয়ে চিরকাল পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হন। হায় ঈশ্বর, এখন দেশপ্রেমিকত্বের প্রতিযোগিতাতেও তাদের পিছিয়ে থাকতে হবে! ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তিতে ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া অধিকার থাকে। এখন দেশপ্রেমের ওপরও তাদের মৌরসী পাট্টা! এখন দেশপ্রেমে বড় হওয়ার অধিকারটুকুও বুঝি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল! সত্যি কি বিচিত্র এই দেশ আমাদের, আর বিচিত্রতর আমাদের দেশপ্রেমের অধিপতি বয়ান।

দুই.

‘দেশপ্রেম’ তো অবিতর্কিত প্রত্যয় নয় কোনো। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশপ্রেমিক নয় তা নিয়ে একটা বিতর্ক তো ছিলই সবসময়। সেই ১৭৭৫ সালে আত্মম্ভরী ভুয়া দেশপ্রেমিকদের সমালোচনা করতে গিয়ে স্যামুয়েল জনসন বলেছিলেন- ‘Patriotism is the last resort of the scoundrel.’ ইতিহাসের প্রেক্ষিত পাল্টে গেছে, কিন্তু দেশপ্রেমের অহংকারী বয়ানের পুনরাবৃত্তি তো ঘটেই চলেছে।

পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকেরা আমাদের বাঙালিদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বারবার। আমরা ভারতের দালাল, আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র ও আদর্শের প্রতি যথেষ্ট বিশ্বস্ত নই, পাকিস্তানের অধিপতি আখ্যানে এই অভিযোগগুলো বারবার উত্থাপিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের পাকিস্তানি অধিপতি আখ্যানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ একটি প্রতিবাদী দেশপ্রেমের আখ্যান নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তান নামক দেশের ধারণার মধ্যে ঘুন ধরে গিয়েছিল অনেকদিন ধরেই। ভাষার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, স্বাধিকারের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, জনগণের সার্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন এক দেশের কল্পনা নির্মিত হচ্ছিল আমাদের চৈতন্যে, আমাদের বাস্তবতায়। একাত্তরে সেই চেতনার প্রবল শক্তিধর বিস্ফোরণ ঘটেছিল। আমরা নতুন দেশের, নতুন দেশপ্রেমের স্বপ্নলোককে একটা বাস্তব অবয়ব দিতে পেরেছিলাম।

কিন্তু সেই বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত একটি অসম্পূর্ণ বাস্তবতা থেকে গেছে, একাত্তরের অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মতোই। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বতন্ত্র নিজ দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্মিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বস্ত্তগত রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে যেই স্বপ্নের দেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল তা আমাদের হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। জনগণের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অধিকার এখনো সুদূরপরাহত। আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের কোন স্পষ্ট ভিত্তি এখনো দাঁড়া হয়নি।

কিন্তু এই ব্যর্থতার দায়ভাগ তো বাংলাদেশের জনগণের নয়। আমাদের বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বিশুদ্ধ পানির সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, দ্রব্যমূল্য সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাবনার পৃথিবী ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না আর কোথাও, আমাদের জাতীয় সম্পদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না, সামাজিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের চোখের আড়ালে অসম চুক্তি হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সীমান্তে পাখি শিকারের মতো হত্যা করা হচ্ছে আমাদের নাগরিকদের – এর সব দায়ভার কি আমাদের জনগণের?

কোন যোগ্যতায়, কোন রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে আমাদের শাসকশ্রেণীর প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, তাদের চেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক আর কেউ হতে পারে না?

তিন.

দেশপ্রেম নিয়ে এই উদ্ধত ঘোষণার সঙ্গে ইদানীং হয়েছে আরেকটি প্রসঙ্গ। শাসক শ্রেণীর সাম্প্রতিক বয়ানের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ‘টোকাই’ চরিত্রটি। শিল্পী রফিকুন্নবীর এই অসামান্য সৃষ্টিটি বাংলাদেশের ছিন্নমূল পথশিশুদের প্রতিনিধি। আমাদের শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সবচেয়ে নিচে এদের অবস্থান। রাষ্ট্র এবং সমাজ এদের গৃহ দিতে পারেনি, শিক্ষার সুযোগ দিতে পারেনি, জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর কোন সংস্থান করতে পারেনি। এই বঞ্চিত, নিপীড়িত শিশুরা আমাদের সমাজের অসঙ্গতির, ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে এসেছে রফিকুন্নবীর দক্ষ তুলির অাঁচড়ে।

কিন্তু বঞ্চনা ছাড়াও টোকাইয়ের চরিত্রে রয়েছে অন্য একটি মাত্রা। টোকাইয়ের রয়েছে প্রবল বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক, সমাজের অসঙ্গতিকে বোঝার জন্য প্রখর অন্তর্দৃষ্টি (ইংরেজিতে একেই বুঝি wit বলে)।

শাসকশ্রেণীর তো এক অর্থে মতাদর্শগত আধিপত্য থাকেই, মার্কস থেকে গ্রামসী পর্যন্ত ইতিহাসের নক্ষত্র পুরুষরা তা বলেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও আমাদের জানবার বিষয় যে কোনো অধিপতি মতাদর্শই সমাজের প্রতিটি অংশের ওপর তার চূড়ান্ত আধিপত্য বজায় রাখতে পারে না। মতাদর্শগত আধিপত্য সবসময়ই তাই একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প। সমাজের কোথাও না কোথাও আধিপত্যের বাইরে ভিন্ন মতাদর্শের, প্রতিরোধের সম্ভাবনা আর বাস্তবতা থেকেই যায়। এই আধিপত্যবিরোধী মতাদর্শ, এই প্রতিরোধ আসে সমাজের প্রান্তে যাদের অবস্থান সেই মানুষ থেকেই। টোকাইয়ের wit সেই প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। টোকাই তাই একই সঙ্গে বঞ্চনা আর প্রতিরোধের যুগল প্রতিনিধি।

রফিকুন্নবী টোকাইয়ের চিত্রিত আখ্যানটি তৈরি করেছিলেন সমাজের একটি ক্রিটিক হিসেবে। কিন্তু আমাদের বুর্জোয়া, মধ্যবিত্ত আখ্যান টোকাইয়ের এই ক্রিটিক্যাল দিকটি ধারণ করেনি। টোকাই এখানে হয়ে উঠেছে উপেক্ষার, টিটকারির, অপমানের প্রতীক। সেই পথশিশুরা শ্রেণী সমাজের অন্তর্নিহিত বৈষম্যের ফল, তাদেরকে বুর্জোয়া আখ্যান দেখে উপহাসের লক্ষ্যবস্ত্ত হিসেবে।

বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ২০ জুন সংসদে টোকাইয়ের এই বুর্জোয়া অর্থটিকেই ব্যবহার করেছেন। জাতীয় তেল-গ্যাস কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন – কোথাকার মনু মোহাম্মদ, আনু মুহাম্মদ মিলে টোকাইদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করেছে।

‘মনু মোহাম্মদ-আনু মুহাম্মদ’ প্রকাশটির মধ্যে নাম বিকৃতির কুৎসিত রুচি তো রয়েছেই কিন্তু এর চেয়েও বেশি এতে রয়েছে শাসকশ্রেণীর ঔদ্ধত্য আর অসংবেদনশীলতা। হাছান মাহমুদের পক্ষে যেটা বোঝা সম্ভব নয়, তার সংকীর্ণ রাজনৈতিক বোধের কারণেই হয়তো, টোকাইদের সংগঠন আখ্যা দিয়ে তিনি জাতীয় কমিটিকে অপমান করতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী তার এই বক্তব্যে কোন কায়েমী স্বার্থের প্রতিধ্বনি তুললেন সেটা তো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই। কিন্তু একই গুরুত্বের সঙ্গে যা আমাদের মনোযোগ দাবি করে তা হচ্ছে এই অসংযত বক্তব্যের মধ্য দিয়েই নিজের অনিচ্ছায় তিনি জাতীয় কমিটির জনভিত্তির সত্যটিকেই প্রকাশ করে দিলেন। জাতীয় কমিটি যদি সত্যিই টোকাইদের সংগঠিত করতে পারে তাহলে তো তা একটি বড় মাপের অর্জন। কারণ এই দেশটি তো হাছান মাহমুদ কিংবা তার নেত্রী শেখ হাসিনার নয়। আমাদের কারোই পৈতৃক সম্পত্তি নয় দেশটি। অনেকাংশেই পিতৃমাতৃহীন টোকাইদের চেয়ে আমাদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দেশপ্রেম বেশি এটাও তো দাবি করা যাবে না।

২৪ জুন রাতে একুশে টেলিভিশনের ‘একুশের রাতে’ অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে বললেন, তিনি তো ঠিকই বলেছেন। আনু মুহাম্মদ তো টোকাই-ই। টোকাই অর্থ তো গরিব মানুষ। আনু মুহাম্মদ তো গরিব মানুষই।

সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পেছনে কোনো সচেতন Irony ছিল কিনা জানি না। কিন্তু তা থাকুক না থাকুক, বুঝে হোক না হোক, তিনি কিন্তু আনু মুহাম্মদকে সম্মানিত করলেন। প্রতিমন্ত্রী ‘টোকাই’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছিলেন নেতিবাচক উপহাস আর উপেক্ষা অর্থে। সংসদ সদস্য রনি, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে ‘টোকাই’ প্রত্যয়টির সমাজতাত্ত্বিক বৃত্তটিকে বিস্তৃত করে দিলেন। ‘টোকাই’ আজকে শুধু ছিন্নমূল পথশিশু নয়। আমরা যারা নিপীড়িত, বঞ্চিত, যাদের জীবন রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণীর হাতে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, যাদের সম্পদ তাদের সম্মতি না নিয়েই বিদেশী করপোরেশনের কাছে বিকিয়ে যায়, আমরা সবাই আজকে ‘টোকাই’। আনু মুহাম্মদ, তার বন্ধু ও সমর্থকরা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করছেন, সবচেয়ে বড় কথা, শাসকশ্রেণীর বাইরে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকই আজকে টোকাই।

আন্তনিও নেগ্রি বিশ্লেষন করে দেখিয়েছেন পুঁজিবাদের বর্তমান পর্যায়ে শোষণের কেন্দ্র শুধু আর কারখানাতে সীমাবদ্ধ নেই। গোটা সমাজজুড়ে গড়ে উঠেছে এক সামাজিক কারখানা। শ্রমিকের সংজ্ঞাও শুধু কারখানার বৃত্তে আটকে নেই। সারা সমাজজুড়ে তৈরি হয়েছে সামাজিক শ্রমের নতুন ধারণা। একইভাবে কিন্তু বাংলাদেশে ‘টোকাই’দের ধারণাও আজ বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।

চার.

যদি আজকে আমাদের সমাজের দ্বন্দ্ব শাসকশ্রেণীর ‘দেশপ্রেমিক’ আর টোকাইদের মধ্যে এসে ঠেকে, আমাদের পক্ষপাতিত্বকেও আজ স্পষ্ট করে আমাদের বুঝে নিতে হবে। যেই ‘দেশপ্রেমিক’রা আমাদের হতাশা, নিপীড়ন আর ব্যর্থতার দিকে বারবার ঠেলে দিচ্ছে তাদের পক্ষে নয়, ইতিহাসকে আজকে নির্মাণ করতে হবে টোকাইদের পক্ষেই।

শাসকশ্রেণীর ‘দেশপ্রেমিক’ প্রতিনিধিরা, আপনাদের জন্য আমাদের টোকাইদের একটি বার্তা আছে। আপনারা বাংলাদেশের জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন তো? মার্কস যেমন বলেছিলেন বুর্জোয়ারা তাদের নিজেদের কবর খনন করেছে প্রলেতারিয়েত তৈরি করে আপনারাও তেমনি কোটি কোটি টোকাই তৈরি করে ফেলেছেন আপনাদের শোষণ-নিপীড়নের সীমাহীন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের সমুদ্রের সম্পদ আপনারা বিক্রি করে দিয়েছেন, বিদেশী বাঁধ আর অসম পানি বণ্টনের চুক্তি আমাদের নদী শুকিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের তেরশ’ নদীর বহতা স্রোতের মতো, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো টোকাইরা এই দেশের মালিকানা দাবি করতে যদি আজকে ধেয়ে আসে, আপনাদের ভুল ‘দেশপ্রেমের’ বালির বাঁধ দিয়ে কি তা রুখতে পারবেন?
[উপ-সম্পাদকীয়, সাপ্তাহিক বুধবার]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, ঢাকা ষ্টক একচেঞ্জ ডিএসই

এক বছরের পুঁজিবাজার ।। অনেক অঘটন ইতিহাস হয়ে থাকবে


এক বছরের পুঁজিবাজার ।। অনেক অঘটন ইতিহাস হয়ে থাকবে

শেয়ার বিজ্‌ রিপোর্টঃ পুঁজিবাজারের ইতিহাসে গত বছরটি ছিল বাজার সম্প্রসারণ, লেনদেন ও সূচকের অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের বছর। এ সময়ে সিকিউরিটিজ হাউজগুলো রাজধানীর গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলা শহরে। ফলে তৃণমূল পর্যায় থেকে টাকা আসতে শুরম্ন করে শেয়ারবাজারে। আর হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা সামাল দিতে শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে ব্যর্থ হয় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এ সময় ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে উদাসীন ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক অবস্থান করে ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্টে। এদিন লেনদেনের পরিমাণ (টাকায়) দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা এবং বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭১ কোটি টাকায়। অনেকের চোখে ওই দিনটি ছিল ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে স্বর্ণালি দিন।

এরপর ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে শুরম্ন হয় দরপতনের পালা। এদিন লেনদেন শুরম্নর মাত্র ৭৫ মিনিটের মধ্যে সূচক ৫৪৭ পয়েন্ট বা সাড়ে ৬ শতাংশ কমে যায়। এদিন বেলা ২টার দিকে সূচক আবার ৫৯৩ পয়েন্ট বেড়ে ৮৬২৬·৫৫ পয়েন্টে পৌঁছায়। দিনের শেষভাগে তা আবার নেমে আসে ৮৪৫১·৫৯ পয়েন্টে। যা আগের দিনের চেয়ে ১৩৪ পয়েন্ট কম। দেশের পঁুজিবাজারে সূচক ওঠানামার এ রকম ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এর আগে ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর শেয়ার কেলেঙ্কারির সময় সর্বোচ্চ ২৩৩ পয়েন্ট বা ৬ শতাংশের মতো সূচক কমেছিল।

গত এক বছরে পুঁজিবাজারের উত্থান প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিএসইর সাবেক সিইও সালাহ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, গত এক বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতায় বাজারে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা পঁুজিবাজারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে তারল্য সংকট দেখা যাচ্ছে তা কাটিয়ে ওঠা না গেলে আবারো এমন দুংসময় আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তিনি আরো বলেন, গত অর্থবছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা এবং চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হয়েছে। এতে অনেকে ড়্গতিগ্রস্তô হয়েছেন আবার অনেকে লাভবানও হয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাই বেশি।

ডিএসইর প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী এ ব্যাপারে বলেন, গত অর্থবছরে ডিমান্ড ও সাপস্নাইয়ের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হয়েছে। তবে আগামী বছর এ ২টির সমন্বয় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন বাজার আবার দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতায় ফিরে আসবে।

বাজার বিশেস্নষণে দেখা যায়, গত বছরের সর্বোচ্চ বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭১ কোটি ৪১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, সূচক ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্ট এবং আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ৩ হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বছর শেষে মূলধন ৮২ হাজার ৬৮২ কোটি ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৯ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকায়, সূচক ২ হাজার ৮০০ পয়েন্ট কমে ৬ হাজার ১১৭ পয়েন্ট এবং আর্থিক লেনদেন ২ হাজার ২৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ২১ হাজার টাকা কমে দাঁড়ায় ৯৫৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়।

জানা যায়, ২০০৯ সালে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল তার রেশ ২০১০ সালেও ছিল। চলতি বছরও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাজারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা সবার। সরকার পঁুজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে আইনি সংস্ড়্গার, কারসাজি চক্রকে শাস্তিôর আওতায় আনতে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ, এসইসির পুনর্গঠনসহ নানামুখী সিদ্ধান্ত নেয়। ড· এম খায়রম্নল হোসেনকে চেয়ারম্যান করে পুনর্গঠিত এসইসি, ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজারবান্ধব বাজেট নিয়ে শুরম্ন হলো আরেকটি বছরের যাত্রা। চলতি বছর নতুন নেতৃত্বে পুঁজিবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরবে- এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, dhaka stock exchange

ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা


ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা
ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা

এ এইচ রানাঃ তারল্য সংকট, মুদ্রাবাজারে অস্থিরতাসহ পুঁজিবাজারের বিপর্যয়ে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। এতে করে অনেকেরই ধারণা ছিল ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা কমে আসতে পারে। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অধিকাংশ ব্যাংক বছরের প্রথমার্ধে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে। যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটসহ নানা সমস্যার বিষয় উপস্থাপন করা হলেও বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) অধিকাংশ ব্যাংকই রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা করেছে। চলতি বছরের জুন ক্লোজিং শেষে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার প্রাথমিক তথ্য এ চিত্রে উঠে এসেছে। জুন ক্লোজিং শেষে ব্যাংকগুলো প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের পরিচালন মুনাফার হিসাব-নিকাশ করেছে। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ড়্গেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন পুরোদমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আসবে। যে কারণে বছর শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে মনে করছেন বিশেস্নষকরা। এদিকে বরাবরের মতো অর্ধবার্ষিক হিসাবে পরিচালন মুনাফার পরিমাণের দিক থেকে সর্বাধিক আয় হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। ৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৪৯৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফার দিক থেকে ইসলামী ব্যাংকের পরই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৫৭ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৫৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ১৫০ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময় করেছিল ১১০ কোটি টাকা। একইভাবে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ১৫৮ কোটি, গত বছর ছিল ১৩০ কোটি, শাহজালাল ব্যাংক করেছে ১৬৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৬০ কোটি, যমুনা ব্যাংক করেছে ১৫০ কোটি, এসআইবিএল করেছে ১৩৫ কোটি, গত বছর ছিল ১০৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ১৩৩ কোটি,গত বছর ছিল ১৩৯ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংক করেছে ১০৬ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ৮০ কোটি, তবে এক্সিম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ব্যাংকটি এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ১০২ কোটি, অথচ গত বছর একই সময় ছিল ২১০ কোটি, একইভাবে মিউচুøয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক করেছে ৬৫ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ১০৪ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ৭৮ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ৩০ কোটি, বেসিক ব্যাংক করেছে ১৩৬ কোটি, গত বছর ছিল ৬২ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক করেছে ৪৯০ কোটি, গত বছর ছিল ৩৬৫ কোটি, প্রাইম ব্যাংক করেছে ৪০৫ কোটি, গত বছর ছিল ৩৩৫ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক করেছে ৩২৫ কোটি, গত বছর ছিল ২৯৫ কোটি, পূবালী ব্যাংক করেছে ২৮০ কোটি, গত বছর ছিল ২৮৪ কোটি, ইউসিবিএল করেছে ২৮০ কোটি, গত বছর ছিল ২২৬ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক করেছে ২৫০ কোটি, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ২৪৫ কোটি, গত বছর ছিল ২২০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক করেছে ২৩০ কোটি, গত বছর ছিল ২৫০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া করেছে ২১৫ কোটি, গত বছর ছিল ২১৪ কোটি, এনসিসিবিএল করেছে ২০১ কোটি, গত বছর ছিল ১৮৫ কোটি, এবি ব্যাংক করেছে ২০০কোটি, গত বছর ছিল ২০০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক করেছে ১৯৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৮১ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক করেছে ১৮৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৪০ কোটি, ওয়ান ব্যাংক করেছে ১৮০ কোটি, গত বছর ছিল ১৬৪ কোটি, সিটি ব্যাংক করেছে ১৮০ কোটি, আল-আরাফাহ্‌ ব্যাংক করেছে ১৭৭ কোটি, গত বছর ছিল ১৪০ কোটি ও উত্তরা ব্যাংক বছরের প্রথমার্ধে পরিচালন মুনাফা করেছে ১৭০ কোটি, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৪০ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পরিচালন মুনাফা প্রকাশের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফা প্রকাশ করতে পারে না। এ বিধিনিষেধ এসেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) থেকে। এসইসি মূল্য সংবেদনশীল বিবেচনায় এ তথ্য প্রকাশ করতে দিতে চায় না। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাতে সম্মতি দিয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে যারা প্রতিনিয়ত কেনাবেচা করেন এবং যাদের হাতে কোনো ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে, তারা ব্যক্তি যোগাযোগের মাধ্যমেই এ তথ্য আগেভাগে পেয়ে থাকেন। সে ড়্গেত্রে সংবাদপত্রে তথ্য প্রকাশিত হলে সব বিনিয়োগকারী একই তথ্য পেতে পারেন।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী পরিচালন মুনাফা প্রকাশ একটি সাধারণ নিয়মের বিষয়। তবে নিট মুনাফাই ব্যাংকের প্রকৃত আয়। বছর শেষে পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরড়্গণ এবং কর (৪২·৫ শতাংশ) বাদ দিয়ে নিট মুনাফার হিসাব হয়। উপরন্তু প্রাথমিকভাবে পাওয়া এ তথ্য-উপাত্ত কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কেননা কোনো কোনো ব্যাংকের জুন হিসাব শেষ হলেও এর অনেক ধরনের হিসাব চূড়ান্তô করতে আরো কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।

ফলে এতে মুনাফার টাকা কমে বা বেড়ে যেতে পারে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীকে অপেড়্গা করতে হয় নিট বা প্রকৃত মুনাফার হিসাব পাওয়া পর্যন্তô।

সব মিলিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও অধিকাংশ ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করতে সড়্গম হয়েছে। পুঁজিবাজারে বিপর্যয় নেমে না এলে পরিচালন মুনাফার পরিমাণ আরো বাড়তো। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ড়্গেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় মনোভাবের কারণে পুঁজিবাজার যেমন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সড়্গম হবে, ঠিক তেমনি বছর শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশিস্নষ্টরা।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, dse, cse, dhaka stock exchange

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা।


রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়া ঠিক হচ্ছে না

মাসুদ মজুমদারঃ রাজনীতিতে অনৈতিকতার প্রভাব বাড়ছে। প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার প্রবণতাও প্রবল। ক্ষমতার রাজনীতিতে স্বার্থের বোঝাপড়াও বেড়ে গেছে। ক্ষমতার স্বার্থে যেকোনো অনিয়ম করতেও সরকার এখন প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে মিথ্যাচারও বৈধ হয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধ ইসুকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এটা যেনো প্রতিপক্ষ দলন ও দমানোর মোক্ষম হাতিয়ার। স্পর্শকাতর এ ইসুকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা বলেছে।

১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবি করেনি­ এমন মানুষ বাংলাদেশে নেই। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়ার পর সরকার কার্যত ভড়কে যায়। কারণ আওয়ামী লীগ এ প্যান্ডোরার বাক্স নিয়ন্ত্রণহীনভাবে খুলতে চায়নি। আওয়ামী লীগ ভালো করেই জানে পরিচ্ছন্নভাবে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ইসুটি সামনে আনতে হলে সরকারের অতীত ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে পড়বে। এমনকি বঙ্গবন্ধুও অভিযুক্ত হয়ে যান। জড়িয়ে যায় ভারত। পাকিস্তান তো জড়াবেই। আওয়ামী লীগ এত জটাজালে আটকে যেতে চায় না। কার্যত সরকার আন্তরিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। চায় এই ইসুকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে। রাজনৈতিক মেরুকরণে ইসলামপন্থীরা জাতীয়তাবাদী শক্তির মিত্র। অপর দিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার মতো ধারালো অস্ত্র আওয়ামী লীগের হাতে নেই। জিয়া ইমেজ এখনো ইতিবাচক। তাই আওয়ামী লীগ জিয়া ইমেজের রশি ধরে টান দিতে চেয়েছে। জিয়াকে নিয়ে বিতর্কের আসল মাজেজা মৃত জিয়াও শক্তিমান। বিএনপি’র রাজনীতিতে ধস নামাতে হলে জিয়া ইমেজ ফুটো করে দেয়া জরুরি। অনেক ভুলভ্রান্তি নিয়েই বিএনপি জোট সরকার পরিচালনা করেছে, কিন্তু জাতীয় ইসুতে ও জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টিতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি। প্রতিপক্ষ দমনেও হ্যাটট্রিক করেনি। ফলে ক্ষমতাসীন একটি দল অতীত ক্ষমতা চর্চাকারী অপর একটি দলকে শুধু সাফল্য-ব্যর্থতার নজির টেনেই সমালোচনা ও নিন্দা করতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ব্যর্থতার তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার কারণে সরকারকে অন্য ইসুতে মনোযোগী হতে হয়েছে। সেই ইসুটি যুদ্ধাপরাধ ইসু। মিত্ররা আক্রান্ত কিংবা অভিযুক্ত হলে অপর মিত্র বিব্রত হওয়া স্বাভাবিক। জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারে বিএনপি বিব্রত হয়েছে। সরকার এটাই চেয়েছিল। কারণ এই একটি মাত্র ইসুতে জামায়াত বিব্রতবোধ কাটাতে পারে না। এই ইসুটিকেই সরকার বিরোধী দলকে কাবু করার পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশী-বিদেশী মিত্রদেরও এই ইসুতে কাছে পাওয়ার ভরসা পেয়েছে। অস্তিত্বের স্বার্থে বর্তমান সরকারের সাথে আছে তাবৎ বামপন্থী। আরো সাথে আছে সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ে বামপন্থী ও সেকুলার নামে ধর্মবিদ্বেষী একটি গোষ্ঠী। এরা ধর্মপন্থীদের আদর্শিক শত্রু বিবেচনা করাকে একধরনের প্রগতিশীল ভাবনা মনে করে। তাই বামপন্থীদের আদর্শিক শত্রু এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু কমন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ভারত তার ইমেজ বৃদ্ধি ও স্বার্থ উদ্ধারে নানামুখী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করার জন্য সচেষ্ট। ঐতিহাসিক কারণে ভারত বাংলাদেশের চীনঘেঁষা বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ইসলামপন্থীদের তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক মনে করে। অপর দিকে পশ্চিমা ঘোলা চশমায় ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি মানে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের প্রতি সহমর্মী। পশ্চিমা শক্তির ধারণা এরা একই সাথে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকেও কম পছন্দ করে। তাই পশ্চিমা শক্তি অন্তত কয়েকটি ইসু ভাবনায় জাতীয়তাবাদী-ইসলামি মূল্যবোধ লালনকারীদের তুলনায় সেকুলার ও বামপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। সমর্থন জোগায়। তা ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বীজ বপনের জন্য সেকুলার ও বামপন্থীদের মগজ এখন উর্বর। বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী অবস্থান আজকাল একধরনের ফ্যাশন। যেকোনো জাতীয় স্বার্থবিরোধী সন্ধি-চুক্তিতে এদের ব্যবহার করা সহজ। ক্ষমতার টোপ দিয়ে কেনাকাটাও কঠিন নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সমস্যার জট পাকিয়ে ফেললেও এ কারণেই ভারত ও পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পায়। একধরনের মন্দের ভালো বিবেচনায় মার্কিন লবির একটি অংশও বর্তমান সরকারকে তাদের স্বার্থানুকূল ভাবে। যদিও মার্কিন নীতি এককভাবে দলবিশেষ ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতি ঝুঁকে থাকার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। মার্কিন লবি হয়তো চাইবে না ভারত বাংলাদেশকে একক বাজার ও পশ্চাৎভূমি হিসেবে ব্যবহার করুক। কারণ তেল, গ্যাস, বন্দরসহ ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে মার্কিন স্বার্থ সব ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থের সমান্তরাল হয় না।

আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ প্রকৃত অর্থে যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় না। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে যে ঢোল সহরত করছে সেটাও এক ধরনের রাজনৈতিক তামাশা। এ তামাশাও দেখাতে চায় খণ্ডিতভাবে। বাস্তবে সরকার প্রতীকী অর্থে বিচার নামের প্রহসনের ওপর ভর করে একই তীরে দুটো অর্জন নিশ্চিত করতে চায়। প্রথমত, তারা চায় প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে অকার্যকর প্রতিরোধহীন শক্তি হিসেবে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখতে। একই সাথে আশা করে একই তীর ছুড়ে বিএনপিকে বন্ধুহীন করে রাখতে। দ্বিতীয়ত, জামায়াতকে কোণঠাসা ও কাবু করে রাখার জন্য এত সস্তা দাওয়াই আর নেই। এটা প্রয়োগ করে ভারত ও পশ্চিমা মিত্রদেরও বোঝানো সহজ যে, মহাজোট সরকার জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী এবং মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ সমর্থকদের দমন-পীড়নে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। তারা আশা করেছিল বিএনপি শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেবে। তাতে বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের দোসর বলে প্রচারণা চালানো সহজ হবে। বিএনপি’র দুর্বল অবস্থান সরকারকে অতি উৎসাহী করে তোলে। তারা আশা করে আখ খাওয়ার গল্পের মতো জামায়াতকে কোণঠাসা করে পরে বিএনপিকে দুর্বল করা সহজ হবে। যদিও একধরনের ইনার কন্ট্রাডিকশন নিয়ে আওয়ামী লীগ পথ চলছে। সিদ্ধান্তহীনতাও তাদের ঘিরে ধরে আছে। রাজনৈতিক তামাশা প্রদর্শন করতে গিয়ে যত পথ চলছে সামনে ভুলের মাশুলগুলো পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে। জনগণের আবেগ কাটছে। সমর্থকদের মনোবল দুর্বল হচ্ছে।

সরকার যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ইসুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে তার সর্বশেষ প্রমাণ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গ্রেফতার নাটক। তাকে গ্রেফতার করা হলো মগবাজারে গাড়ি পোড়ানোর মামলায়, যা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ভোঁতা। নাবালক শিশুও বোঝে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পুলিশি সিদ্ধান্তে গ্রেফতার করা হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা ছাড়া এ গ্রেফতার অসম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নৈতিক অবস্থান স্বচ্ছ হলে তাকে প্রথমেই কথিত যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হলো না কেন? বিএনপি প্রথমে এই ইসুটিকে অত্যন্ত হালকাভাবে গ্রহণ করেছে। জামায়াতও ভেবেছে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে। আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের শীতল প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহবোধ করেছে। এ উৎসাহের প্রথম কারণ, তারা লক্ষ করেছে জামায়াতকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। বিএনপিকেও বন্ধুহীন করার ফন্দি কাজ দিয়েছে। বিরোধী দল মাঠ ছেড়েছে। কেউ নয়াপল্টন, কেউ মগবাজারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ উৎসাহ আরো উচ্চাভিলাষের জন্ম দিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এ উচ্চাভিলাষ ও বিরোধী দলকে অবমূল্যায়ন জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।

সাধারণ মানুষ বলাবলি করছে দরাজ গলায় ‘আমরা ক্ষমা করতে জানি’ বলে চিহ্নিত ১৯৫ জনকে ভারতের সাহায্যে জামাই আদরে বিদায় করে দিয়ে সরকার এত বছর পর নিজ দেশের মানুষদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে কেন? অপরাধী যেই হোক তার বিচার হওয়া কাম্য। কিন্তু মূল অপরাধী ছাড়া পাবে, তাদের সহযোগী শাস্তি পাবে, আইন-বিচার, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার কোথাও এর সমর্থন পাওয়া যাবে না। কোথাও এমন নজিরও নেই।

অনেকের মনে প্রশ্ন, সরকার যুদ্ধাপরাধ ইসু কদ্দূর টেনে নিয়ে যাবে। আসলে ইসুটি রাজনৈতিক। এর আইনি পরিসমাপ্তি সম্ভব নয়। এর জের টানা এত সহজ হলে বঙ্গবন্ধুকে ভিন্ন ভূমিকায় দেখা যেত। এখন বিএনপি-জামায়াত জোট ইসুটিকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে সরকার এগোতেই থাকবে। একটা প্রহসনের বিচার মহড়ায় কিছু চিহ্নিত প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সব সুযোগ গ্রহণ করবে। কারণ অসৎ ভাবনা­ অনৈতিক কাজ ও প্রতিহিংসার শেষ থাকে না। যদিও সামগ্রিক ইসুটিকে সরকার বিতর্কিত করে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়ে গেছে।

সাকা চৌধুরীকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার প্রশ্ন নয়। তাকে খাতির-আত্তি করার বিষয়ও নয়। কিন্তু তাকে যে প্রক্রিয়ায় আগের কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ গ্রেফতার রীতি অনুসরণ করে আটক করা হলো, তা কিন্তু খারাপ নজির হয়ে রইল। নির্যাতনের উপমাও মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এ সরকার একমাত্র সরকার নয়। শেষ সরকারও নয়। দেশজাতির সামনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে উপমা সৃষ্টি করে রাখা হলো তা যে বারুদে হাত রাখার শামিল হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে। পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য এ নজির ও উপমা অপকর্ম বৈধতা দেয়ার সনদ হয়ে থাকবে। এ খোঁড়া গর্ত বা কবরে বর্তমান শাসকরা পড়বেন না সেই নিশ্চয়তাই বা কোথায় পাওয়া যাবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়ার প্রকৃতিগত প্রতিক্রিয়া রোধ করা কিভাবে সম্ভব হবে।

নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা বদলের পরও আমরা সংযমহীন বাড়াবাড়ি দেখেছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে­ এমন দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছি। মান্নান সাহেবকে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে, হরতালের সমর্থনে পিকেটিংয়ের সময়। মতিন চৌধুরীকে পুলিশ হামলে পড়ে অপদস্থ করেছে মৌচাকে। নাসিম সাহেবের ওপর পুলিশের হামলার দৃশ্য তো মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। বাবর সাহেবকে নিয়ে কী করা হচ্ছে তার কথা না তোলাই ভালো। তাই সহজেই উচ্চারণ করা যায় এককাল শাশুড়ির, আর এককাল বউয়ের। তা ছাড়া এক মাঘে শীত না যাওয়ার গল্প কে না জানে। তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার জন্য যখন যারা দায়ী তারা সবাই নিন্দনীয় কাজ করেছেন।

আমরা অনুশীলিত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি নিয়ে শঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত (।) একই সাথে বিব্রতও। আমরা সহজ কথায় যে সত্যটি বুঝি, ভিন্ন মত না থাকলে গণতন্ত্র থাকবে না। বিরোধী দল নাই হয়ে গেলে সরকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারবে না। ভিন্ন মত ও বিরোধী দল সহ্য না করার প্রেক্ষাপটে যে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে, তার ষোলো আনা দায়ভার নিতে হবে সরকারকে। তাই ক্ষমতার জোরে পুলিশকে বেপরোয়া বানিয়ে দেয়া কিংবা আইনের ঊর্ধ্বে এলিট ফোর্সকে রক্ষীবাহিনী চরিত্রে নিয়ে যাওয়ার কোনো কুমতলব না থাকাই ভালো।

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা। এর মাধ্যমে অতীতের অনেক ভয়াবহ ও ভীতিজনক স্মৃতির কথা মনে পড়ে। তাই জনগণের হৃৎস্পন্দন বোঝার দায় বাড়ছে। এ দায় পূরণে ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। ব্যর্থ হলে পাদুয়া দৃষ্টান্ত হবে। সরকার বিএসএফ নিয়ে রা করেনি। মিডিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ দেখেও না দেখার ভান করেছে। এটা যেনো ছিল বন্ধুত্বের সহনীয় ‘উৎপাত’। জনগণ অপেক্ষা করেনি। দল ও মতনিরপেক্ষ সাধারণ জনগণ সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ভারতীয় আগ্রাসন ঠেকিয়ে দিয়েছে। জনগণের এ সম্মিলিত শক্তিকে সমীহ না করলে বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার ফলাফল কোনো দিনই ভালো হওয়ার কথা নয়।

উইকিলিকসের প্রকাশিত বেশ কিছুসংখ্যক তারবার্তায় বাংলাদেশ


আ’লীগের জয়ে খুশি ভারত, ডেথ স্কোয়াড, মাদরাসা সংস্কারে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন

উইকিলিকসের চাঞ্চল্যকর তথ্য

উইকিলিকসের সদ্য ফাঁস করা এক তারবার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন কর্তৃক সরকারি ‘ডেথ স্কোয়াড’ নামে অভিহিত বাংলাদেশী আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাবকে ব্রিটিশ সরকার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। মার্কিন দূতাবাসের ফাঁস হওয়া তারবার্তার বরাত দিয়ে উইকিলিকস আরো বলেছে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদস্যরা ইনভেস্টিগেটিভ ইন্টারভিউ টেকনিকস ও ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’-এর ওপর ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ লাভ করেছে। এ বাহিনীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত লোককে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বন্দীদের ওপর রুটিনমাফিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

উইকিলিকসের ফাঁস করা অন্য এক তারবার্তায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার পাঠক্রম পরিবর্তনে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে। এ ছাড়া ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়েছিল।

গোপন নথি ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন। পিনাক রঞ্জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিকে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানোই হবে ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার। ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ। পিনাক রঞ্জন বলেন, মন্ত্রী যৌথ টাস্কফোর্স গঠনে শেখ হাসিনার আহ্বানকে স্বাগত জানাবেন। ভারত যদিও মূলত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের দিকেই নজর দেবে, তবুও শেখ হাসিনা খুবই ভারতঘেঁষা­ এ অভিযোগ থেকে তাকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা আড়াল দিতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনে জোর দেয়ার কারণটি উপলব্ধি করছে। অবশ্য হাইকমিশনার টাস্কফোর্সটি যাতে আরেকটি আঞ্চলিক কথার দোকান (টক শপ) না হয়ে ফলপ্রসূ টাস্কফোর্সে পরিণত হয়, সে ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উইকিলিকসের এসব তথ্যের উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে এসব তথ্য পরিবেশন করে।

ফুলবাড়ী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়েছিল বলে উইকিলিকসের ফাঁস করা গোপন নথিতে বলা হয়েছে। এই নথির ভিত্তিতে গার্ডিয়ানে বলা হয়েছে, গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীর সাথে বাংলাদেশে নিযু্‌ক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বৈঠক করেন।

‘বৈঠকে মরিয়ার্টি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল কোল মাইনিং ম্যানেজমেন্টকে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে বলেন’। তিনি বলেন, কয়লা উত্তোলনে উন্মুক্ত পদ্ধতিই সর্বোত্তম পন্থা। এ প্রতিষ্ঠানই ২০০৬ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ফুলবাড়ী থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ওই বিক্ষোভে সেনাদের গুলিতে তিনজন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো কয়লা প্রকল্পটি চালু করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। মানবাধিকার কর্মীদের বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির আশঙ্কায় বিষয়টি নিয়ে এখনো ব্যাপক বিতর্ক চলছে।

পরে আরেকটি তারবার্তায় মরিয়ার্টি ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখ করেন, ফুলবাড়ী প্রকল্পের পেছনে থাকা এশিয়া এনার্জি কোম্পানির ৬০ শতাংশ মার্কিন বিনিয়োগ। এশিয়া এনার্জি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতকে বলেন, তারা খুবই আগ্রহী যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার এ প্রকল্পের ব্যাপারে অনুমোদন দেবে। তবে মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, তৌফিক-ই-ইলাহী স্বীকার করেন, কয়লাখনিটি রাজনৈতিকভাবে খুবই স্পর্শকাতর।

মাদরাসায় পরিবর্তনে সক্রিয় যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র

উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার পাঠক্রম পরিবর্তনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে। ‘সামষ্টিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের’ অংশ হিসেবে দেশ দু’টি মাদরাসা পাঠক্রমকে প্রভাবিত করতে চায়।

উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, মাদরাসার পাঠক্রম পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (ডিএফআইডি) একত্রে কাজ করছে। এক তারবার্তায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোর জন্য একটি মান পাঠক্রম তৈরি ও প্রয়োগের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কিভাবে দেয়া হবে তা দুই দেশের সমন্বিত পরিকল্পনায় আছে বলে বার্তায় জানান মরিয়ার্টি। মাদরাসা ‘পাঠক্রম উন্নয়ন পরিকল্পনা’র অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড’র দেয়া এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়।

লন্ডনের মুসলিম ইনস্টিটিউটের ড. গিয়াসউদ্দিন সিদ্দিক স্বীকার করেন, ডিএফআইডি’র উদ্যোগটি ছিল দক্ষিণ এশিয়া ইসলামের চরমপন্থা রোধের জন্য। তিনি বলেন, ‘এটি অনেক পুরনো সমস্যা’। ‘অনেক আগেই অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোর পাঠক্রমের দিকে নজর দেয়া উচিত ছিল। ডিএফআইডি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৬৪ হাজার মাদরাসা রয়েছে। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রথাগত বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না তাদের সন্তানরা প্রায়ই বিনামূল্যে মাদরাসায় শিক্ষার সুযোগ পায়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে প্রায় ১৫ হাজার অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসা নিয়ে সচেতন বর্তমান সরকার। এসব মাদরাসায় অন্যগুলোর তুলনায় শিক্ষার গড় মান ভালো নয়। ‘মাদরাসার বিরুদ্ধে সন্তানদের চরমপন্থী করে তোলার অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।’

‘গত সপ্তাহে মাদরাসার অর্থের উৎস তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সরকার’, উল্লেখ করে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরির মাদরাসায় ঘাঁটি গাড়ছে­ এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়।

ডেথ স্কোয়াডকে সহযোগিতা

উইকিলিকসের প্রকাশিত বেশ কিছুসংখ্যক তারবার্তায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারের সন্ত্রাসবাদ দমনসংক্রান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। একটি তারবার্তায় এটা পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবকে মানবাধিকার বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কোনো সহায়তা দেবে না এবং মার্কিন আইনানুযায়ী এটা করা হবে অবৈধ। কেননা র‍্যাব সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ ঘটনার সাথে জড়িত এবং এ জন্য তাদের কোনো ধরনের শাস্তি পেতে হয় না।

ছয় বছর আগে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী সে থেকে এ পর্যন্ত এ বাহিনীটি ‘ক্রসফায়ারের’ নামে সহস্রাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে র্যাবের মহাপরিচালক বলেছিলেন, তার সদস্যদের হাতে ক্রসফায়ারে ৫৭৭ জন মারা গেছেন। এ বছর মার্চে তিনি এ সংখ্যা ৬২২ জনে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

গার্ডিয়ানে বলা হয়, তারবার্তায় এ বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে যে, ব্রিটিশ ও আমেরিকা উভয়ই বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমন কর্মকাণ্ড জোরদারে এ বাহিনীকে সহায়তা দিতে তাদের সঙ্কল্পের কথা জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হচ্ছে এই যে, বিগত দশকে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে র্যাবের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনোভাব ইতিবাচক। সাধারণ মানুষ তাদের সপ্রশংস ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন। একটি তারবার্তায় বলা হয়েছে, ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি এ মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে র‍্যাব এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং এক দিন এটি ইউএস ফেডারেল বুøরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) বাংলাদেশী সংস্করণে পরিণত হবে।’

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য একটি তারবার্তায় আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তারা র‍্যাবকে ১৮ মাস ধরে ইন্টারভিউয়ের অনুসন্ধানী কৌশল ও কর্মতৎপরতা পরিচালনার বিধির মতো কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। র্যাবের জন্য প্রশিক্ষণ সহায়তাসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাজ্য সরকার দেশটিকে মানবাধিকারসংক্রান্ত কতগুলো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে র্যাবের প্রশিক্ষণ প্রধান মেসবাহ উদ্দিন গার্ডিয়ানকে বলেছেন, গত গ্রীষ্মে কাজে যোগদানের পর থেকে তিনি এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অবহিত নন।

তারবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিন বছর আগে লেবার সরকারের আমলে র্যাবে প্রশিক্ষণকার্যক্রম শুরু হয়। তবে র‍্যাব কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার পাঁচ মাস পর অক্টোবরে তারা কতগুলো কোর্স ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছেন। মন্ত্রীরা এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছেন কি না তার জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ ও অন্যদের সন্ত্রাসবাদ দমনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তারবার্তায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা করেন, মার্কিন সরকার র্যাবের বিরুদ্ধে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অঙ্গীকারের কারণে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এই অভিযোগের কারণে এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ কিংবা অন্য কোনো সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ততা হারিয়েছে। মার্কিন আইনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পার পেয়ে যাওয়া বিদেশী কোনো সামরিক ইউনিটকে মার্কিন অর্থসহায়তা দেয়া যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রবাবরই র্যাবের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। আর বাংলাদেশী মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তো ২০০৪ সালের মার্চ মাসে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটি যেসব বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে তার বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ রেখেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর উদ্বেগের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘আমরা সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার অপারেশনাল দিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি না। সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আমাদের আইন ও মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অন্তত ব্রিটিশ প্রশিক্ষণের কিছু কর্মরত ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এসব ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা পুলিশিং ক্যাপাসিটি ও মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল পুলিশিং ইমপ্রুভমেন্ট এজেন্সির (এনপিআইএ) পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করেন। র্যাবের সাম্প্রতিক ফোর্সগুলো পরিচালিত হয় ওয়েস্টমার্সিকা ও হামবারসাইড পুলিশের কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এনপিআইএ বাংলাদেশ পুলিশ ও র‍্যাবকে কারিগরি কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সহযোগিতা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে­ ফরেনসিক সচেতনতা, অপরাধ সংগঠনের স্থান সংরক্ষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ উদ্ধার প্রভৃতি। সমগ্র প্রশিক্ষণে আমরা এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি, সাক্ষী, সন্দেহজনক ব্যক্তি ও ভিকটিমের মানবাধিকারকে সর্বাধিক সম্মান জানাতে হবে। আমাদের সহযোগিতার লক্ষ্য হচ্ছে পুলিশের পেশাগত মানোন্নয়ন। পুলিশ যাতে গণতান্ত্রিক আচরণ ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয় প্রশিক্ষণে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশের একাধিক সরকার র্যাবের হাতে হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটানোর ব্যাপার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে র্যাবের বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর তারা সে আগের ধারাই অব্যাহত রেখেছে। গত বছর অক্টোবর মাসে বিবিসি আয়োজিত একটি আলোচনায় নৌপরিবহনমন্ত্রী এম শাহজাহান বলেছিলেন, এমন কিছু কর্মকাণ্ড আছে যেগুলোর বিচার দেশের আইন দ্বারা সম্ভব নয়। সে কারণে সরকারকে বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হতে পারে। যে পর্যন্ত না সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির মূলোৎপাটন করা যাবে সে পর্যন্ত ক্রসফায়ার নামের এই কর্মটি চলার দরকার আছে।

আওয়ামী লীগের জয়ে খুশি ভারত

গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন।

গোপন নথি ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন।

পিনাক রঞ্জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এফ মারিয়ার্টিকে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানোই হবে ভারতের অগ্রাধিকার। ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ। পিনাক বলেন, মন্ত্রী যৌথ টাস্কফোর্স গঠনে শেখ হাসিনার আহ্বানকে স্বাগত জানাবেন। ভারত যদিও মূলত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের দিকেই নজর দেবে, তবুও শেখ হাসিনা খুবই ভারতঘেঁষা­ এ অভিযোগ থেকে তাকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা আড়াল দিতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনে জোর দেয়ার কারণটি উপলব্ধি করছে। অবশ্য হাইকমিশনার টাস্কফোর্সটি যাতে আরেকটি আঞ্চলিক কথার দোকান (টক শপ) না হয়ে ফলপ্রসূ টাস্ক ফোর্সে পরিণত হয়, সে ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। ভারত প্রায়ই অভিযোগ করে থাকে­ আন্তর্জাতিক ইসলামি সন্ত্রাসীরা প্রায়ই বাংলাদেশকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করে এবং ভারতে বোমা ও বিভিন্ন ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রায়ই সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে। নয়াদিল্লি আরো জানায়, বাংলাদেশকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহারকারী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামসহ (উলফা) ভারতের চরমপন্থী গ্রুপগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য ঢাকার আরো কিছু করা দরকার।

উইকিলিকসের আরেক নথিতে বলা হয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং ‘ট্র্যাক ২’ প্রোগ্রামের বিষয়টি বিবেচনা করছে যাতে সুশীলসমাজ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আরো ব্যাপক সমন্বয় সাধন করবে। পিনাক বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি ‘সব সময়ই সাদরে গ্রহণযোগ্য’। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর জন্য শেখ হাসিনার সন্ত্রাস প্রতিরোধবিষয়ক একজন ‘জার’ নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবেও ভারতীয় হাইকমিশনার ইতিবাচক সাড়া দেন। শেখ হাসিনার র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ভেঙে দেয়া উচিত হবে না বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে একমত হন পিনাক রঞ্জন (সন্ত্রাস প্রতিরোধের জন্য র‍্যাব বাংলাদেশের প্রধান বাহিনীতে পরিণত হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি গঠন করায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এই বাহিনী নিয়ে সংশয় পোষণ করতেন)।

পিনাক বলেন, নির্বাচনের পরপরই এক বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মৃতপ্রায় রেলব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগের জন্য খুব আগ্রহ ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে ছিল ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার সাথে বাংলাদেশী রেললাইনের পুনঃসংযোগ সাধন। পিনাক রঞ্জন উল্লেখ করেন, তিনি ১২-১৩ তারিখে পানিসম্পদবিষয়ক মন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেনের সাথেও বৈঠক করেছেন (এর পরপরই বাংলাদেশী মিডিয়া খবর প্রকাশ করে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভারত থেকে আসা নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে বিতর্ক অবসানে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে শিগগিরই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে)।

ভারতীয় হাইকমিশনার আরো বলেন, ভারত আগরতলায় নতুন প্রতিষ্ঠিত ৭৫০ মেগাওয়াটের নতুন বিদুøৎকেন্দ্র থেকে মারাত্মক জ্বালানি সঙ্কটে থাকা বাংলাদেশে ২৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদুøৎ বিক্রির প্রস্তাব দেবে। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, বিদুøতের দাম নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি এবং বাংলাদেশকে তার জাতীয় বিদুøৎ গ্রিডের সাথে ওই প্লান্টের সংযোগসাধনের জন্য ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। পিনাক রঞ্জন ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ভারতীয় কোম্পানিগুলো নতুন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগের বিষয়টি নির্ভর করছে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার তাদের সামর্থø ও প্রযুক্তিকেন্দ্র গঠনের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনের ওপর।

[নয়া দিগন্ত ডেস্ক]

%d bloggers like this: