দুর্ঘটনারোধে চালকদের দক্ষ ও সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই


গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধের বিরুদ্ধে নামছে মোবাইল কোর্ট


১৩ জুলাই: গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আজ জানিয়েছেন। মিরসরাইয়ে ট্রাক উল্টে ৪২ ছাত্রসহ ৪৪ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির কয়েকদিন পর এ ঘোষণা দিলেন তিনি।
সাহারা খাতুন আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। এ সংক্রান্ত আইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের অভাবে গাড়ি চালকদের মধ্যে এ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের মোটর ভেহিকেল অধ্যাদেশ মোতাবেক এ ধরনের অপরাধের জন্য গাড়ি চালককে পাঁচশ টাকা জরিমানা বা এক মাস কারাদণ্ড কিংবা উভয়ই হতে পারে।
অবশ্য পুলিশ বলছে, এ আইন বাস্তবায়ন করার মতো জনশক্তি তাদের নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করার সময় সাহারা খাতুন বলেন, এ ধরনের অপরাধীদের খুঁজে বের করার ওপর ভ্রাম্যমাণ আদালত বিশেষ গুরুত্বারোপ করবে। তিনি আরো জানান, মোটর ভেহিকেল অধ্যাদেশের কঠোর বাস্তবায়ন করবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সড়কে সঠিক ট্রাফিক চিহ্ন না থাকার কারণে অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হলে সাহারা খাতুন বলেন, সড়ক চিহ্ন বসানোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগিরই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবে।

গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলার বিরুদ্ধে দুর্বল আইন

শাহীন রহমান ॥ একটি পরিচিত বাণী পরিবহনের পেছনে লেখা থাকে। এসব বাণীর মধ্যে একটি জনপ্রিয় বাণী হলো একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না। গাড়ি চালাতে সাবধানতা অবলম্বন করুন। কিন্তু এসব বাণী কেউ মেনে চলে, না বাণিজ্যিক উদ্দেশ ব্যবহার করা হয় তা নিয়ে হয়ত প্রশ্ন রয়েছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত অযৌক্তিক কারণে দেশে যে হারে দুর্ঘটনা বাড়ছে তাতে কান্নার রোল হয়ত কোনদিন থামবে না। পরিবহণে চলতে গেলে চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো কারও চোখ এড়ায় না। প্রতিবাদ করে লাভ হয়নি কোনদিন। উল্টো প্রতিবাদ করায় যাত্রীদের হয়রানির শিকার হতে হয় হরহামেশায়। কিন্তু যারা বেপরোয়া গাড়ি চালায়, এসব চালকের অনেকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। হেলপার হয়ে ড্রাইভারের কাজ করা, চলন্ত গাড়িতে চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার একটি স্বভাবে পরিণত হয়েছে। চলন্ত অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিরম্নদ্ধে আইন থাকলে তার কোন প্রয়োগ নেই। শুধু দুর্ঘটনা ঘটলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তৎপর হতে দেখা যায়। তখন হয়ত গাড়ি চালাতে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। কিছুদিন গেলে যে লাউ সেই কদুতে পরিণত হয়। আবার সবকিছু হয়ে যায় আগের মতো। কিন্তু মাঝখানে যে তরতাজা প্রাণগুলো হারিয়ে যায় তা কোনদিন ফিরে পাবার নয়। দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁদের পরিবারের কান্না যে কতদিন চলে তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। তাই হয়ত তাদের কান্না নিয়ে অন্যদের কোন মাথা ব্যথা নেই। ফুটবল খেলা দেখে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার অর্ধশত স্কুল ছাত্রের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবেন কেউ। অথচ তাদের লাশ হয়ে ফেরার পেছনেও রয়েছে চালকের বেপরোয়া, খামখেয়ালি আর স্বেচ্ছাচারিভাবে গাড়ি চালানো। আইন না মেনে গাড়ি চালানোর কারণে এত কচি প্রাণের অপমৃতু্য ঘটল। চালক মোবাইল ফোনে কথা বলায় গিয়ে ব্রিজ থেকে গাড়ি খাদে পড়ে গিয়ে প্রাণ দিতে হলো তাদের। এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিরম্নদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। আইনে জেল জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইন মানার প্রবণতা কারও মধ্যে লৰ্য করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন অমান্য করে গাড়ি চালানোর কারণে দেশে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।
সম্প্রতি গাড়ি চালানোর সময় চালকের মোবাইলে কথা বলা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। অথচ চলনত্ম অবস্থায় চালক মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণেই বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে, অনেকে মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন চলনত্ম অবস্থায় চাকলের কথা বলাকে। রাজধানীসহ সারাদেশে হরহামেশা এ চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবহনের চালক ছাড়াও মোটরসাইকেল আরোহীকে প্রায়ই চলন্ত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়। এভাবে কথা বলার কারণে রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি যেসব বড় দুর্ঘটনা ঘটছে তার প্রধান কারণও এই মোবাইল ফোনের ব্যবহার।
চলন্তু অবস্থায় চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা রোধ করতে ২০০৭ সালে মোটরযান আইনের সংশোধন করা হয়। ওই বছর ১২ জুলাই গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা না বলার ব্যাপারে মোটরযান আইনের ১১৫(বি) ধারার সংশোধন করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমনকি আইনে এয়ারফোন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইন অমান্য করলে ৫শ’ টাকা জেল জরিমানার করার বিধান রয়েছে। কিন্তু হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপৰ ব্যবস্থা নিতে দেয়া যায়নি। ভারতেও এধরনের একটি আইন রয়েছে। আইন অমান্য করলে ২ হাজার টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের জেলা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভারতের আইনের সঙ্গে বাংলাদেশের আইনের পার্থক্য হলো বাংলাদেশের আইনটি যেমন দুর্বল, তেমনি এর কোন প্রয়োগ নেই।
সম্প্রতি যে সব বড় দুর্ঘটনা ঘটছে তার পেছনে রয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় চালক প্রায় অসতর্ক অবস্থায় থাকে। এছাড়া পাশে বসা অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় অসতর্ক হয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালায়। গত সোমবার চট্টগ্রামে ট্রাক খাদে পড়ে ৪১ স্কুলছাত্রের নিহত হবার পেছনেও রয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী চালক চলনত্ম অবস্থায় কথা বলছিল। তখন তার অসকর্ত হওয়ার কারণে ট্রাকটি এলামেলো চলছিল। একপর্যায়ে দ্রম্নতগতিতে ট্রাকটি সেতুর ওপর উঠে প্রচণ্ড ধাক্কা খায় তখনই ঘটে যায় স্মরণকালের ভয়াবহ দুঘর্টনা।
এ মাসের ২ তারিখে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটে নোয়াখালীতে। এ ঘটনায় ৭ শিৰার্থীর করম্নণ মৃতু্য হয়। জানা যায়, নিহত ছাত্রছাত্রীর মধ্যে একলাশপুর হাইস্কুলের এবং নোয়াখালী সরকারী মহিলা কলেজের ছাত্রী। এ ঘটনায় নিহত অপরজন চালক স্বয়ং। শিৰার্থীদের মধ্যে দুজন ছিল সহোদর। প্রত্যৰদর্শীদের ভাষ্যমতে চালক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালাচ্ছিল। একপর্যায়ে বাসটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ছয় শিৰার্থী প্রাণ হারায়। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামের লোহাগড়ায় দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন মারা যায়। এ দুর্ঘটনার পেছনেও ছিল চালকের মোবাইল ফোনের ব্যবহার। ওই বছরের ২৯ মে লোহাগড়ার চুনতি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। হানিফ এন্টারপ্রাইজের বেপরোয়া গতির বাসটি একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দিলে এক পরিবারের তিনজন নিহত হয়। আহত বা বেঁচে যাওয়া বাসের যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী চালক চলনত্ম অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আগামী ২৪ তারিখে ডাকা হয়েছে সড়ক উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। জানা গেছে চালকদের সচেতন করতে এ বৈঠকে প্রয়োজনীয় পদৰেপ নেয়া হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান মো. আয়ুবুর রহমান খান জনকণ্ঠকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সারাদেশে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। চালককের প্রশিৰণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বিআরটিএর পৰ থেকে। আগামী ২৪ জুলাই সড়ক উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে বিসত্মারিত আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনারোধে চালকদের দক্ষ ও সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। তার আন্দোলনের প্রেৰিতে দেশের নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের জন্য সরকারীভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মোবাইল ফোনের ব্যবহার রোধে মাত্র ৫শ’ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তাও কার্যকর করা হচ্ছে না। জরিমানার বিধান ৫শ’ টাকার বেশি করে এসব চালকের কঠোর শাসত্মির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বাসত্মবায়ন করা না গেলে দুর্ঘটনারোধ করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এসব বেপরোয়া চালকের পেছনে রয়েছে তাদের শক্তিশালী সংগঠন। কোনরকম দুর্ঘটনায় চালক একবার প্রাণে বেঁচে গেলে তাদের বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে সংগঠনগুলো। ফলে তাদের আর শাসত্মির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। [একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, একুশ নিউজ মিডিয়া Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchange

Advertisements

ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলেছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে।


রাজধানীর অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাবে

শব্দদূষণ


এফএনএস (মাহতাব শফি) : রাজধানীতে বেড়েই চলছে শব্দদূষণ। নীতিমালা আছে কিন্তু তার কোন প্রতিকার নেই। রাজধানী ঢাকা শুধু নয়। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই বর্তমানে এই শব্দ দূষণের শিকার। ফলে আগামী প্রজন্ম হারাচ্ছে শ্রবণশক্তি। শ্রবণশক্তিই নয়, শব্দ দূষণের কারণে উচ্চরক্ত চাপ, মাথাধরা, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, অনিদ্রা ও ফুসফুসে সহ নানা রকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত শব্দ দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা নষ্ট হয়, সন্তান সম্ভাবনা মায়েদের যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ মারাÍক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, যানবাহনের শব্দ দূষণে ষ্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ায় বহুমাত্রায়। এক জরিপে উঠে আসা রাজধানী ঢাকার শব্দ দূষণের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যা সত্যিই আতংকজনক। সারা বিশ্বে এপ্রিল মাসের শেষ বুধবার পালিত হয় ‘আর্ন্তজাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস’। সারা বিশ্বেই এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে তেমন সচেতন নয়।
বাংলাদেশে রয়েছে শব্দ দূষণ নীতিমালা। ২০০৬ সালে প্রণীত এই নীতিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হলো ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। একই ভাবে, নীরব এলাকার জন্য এই শব্দসীমা যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় ৭৫ ও ৭০ ডেসিবেল সর্বোচ্চ শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর উপরে শব্দ সৃষ্টি করা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিধিমালা মানা হচ্ছে না।
একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি বেসরকারী সংগঠনের পরিচালিত গবেষনায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় শব্দদূষণ মাত্রা ১০২ ডেসিবেল, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ৯৩ ডেসিবেল, বাংলামোটর এলাকায় ৯২ ডেসিবেল, সদরঘাট এলাকায় ৮৮ ডেসিবেল, ফার্মগেট এলাকায় ৯৩ ডেসিবেল, শাহবাগ এলাকায় ৮৬ ডেসিবেল, মহাখালীতে ৯৪ ডেসিবেল, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ১০১ ডেসিবেল, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৯৫ ডেসিবেল, গুলিস্তান এলাকায় ৯২ ডেসিবেল এবং স্কয়ার হাসপাতাল এলাকায় ১০৪ ডেসিবেল। যেখানে সবোর্চ্চ শব্দসীমা যত তার দ্বিগুণ শব্দ দূষণ করা হচ্ছে।
রাস্তায় বেরুলেই দেখা যায় এই শব্দ দূষণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। রিক্সা ওভারটেক করতে চায় বাসকে, বাস ওভারটেক করতে চায় প্রাইভেট কারকে, প্রাইভেট কার ওভারটেক করতে চায় এ্যাম্বুলেন্সকে। আর এসব প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে প্যাঁ পুঁ শব্দে হর্ণ বাজানো।
উন্নত দেশগুলো অবশ্য শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি কঠিন রোগের উৎস ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ, এর মধ্যে অন্যতম শব্দদূষণ। শব্দদূষণের ফলে সৃষ্ট সমস্যাবলীর ভিতরে রয়েছে কানে কম শোনা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং সামাজিক ভীতি। এছাড়া অস্থিরতা, উচ্চরক্তচাপ ও শব্দভীতি অন্যতম।
রাজধানীতে শুধু গাড়ির হর্নই নয় জনসভায় ব্যবহৃত মাইকগুলোও একে অন্যের চাইতে জোরে চিৎকাররত। মার্কেটে বাজছে উচ্চশব্দের গান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর একটি ভি,আই,পি সড়কে হর্ণ বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তা বেশী দিন কার্যকর রাখতে পারেনি। শুধুমাত্র একটা শব্দদূষণ বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়া সরকারের আর কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না। এগিয়ে আসছে না কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, যদি টানা ৮ ঘন্টা ৯০ থেকে ১০০ ডেসিবেল শব্দ প্রতিদিন শোনা হয়, তাহলে ২৫ বছরের মধ্যে শতকরা ৫০ জনের বধির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শব্দ দূষণ চোখ ও মাথার বিভিন্ন সমস্যার জন্যও দায়ী। শহরের বেশীরভাগ মানুষই মাথার যন্ত্রণায় ভোগে-যার অন্যতম কারণ শব্দ দূষণ। এছাড়া ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক এমনকি লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঢাকা শহরে যেভাবে শব্দ দূষণ বেড়ে চলেছে তাতে এ শহরের অর্ধেক মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে ৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত কমে যাবে।
মানুষের ব্যক্তিগত অদূরদর্শী কার্যকলাপ, যোগাযোগ ব্যবস্থার অপরিকল্পিত বিস্তার, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্র“টি এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের বিবর্তিত শব্দের ব্যাপকতায় শব্দ দূষণ বর্তমান সময়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায়, পরিবহন পদ্ধতিতে এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত সুনির্দিষ্ট তীব্রতা সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বাস, ট্রেন, জাহাজ, শিল্প-কারখানা থেকে বের হওয়া শব্দ এবং ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারের শব্দের তীব্রতা নির্দেশিত মাত্রায় বা তার নিচে বজায় রাখা উচিত। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন। যানবাহন থেকে বের হওয়া শব্দের ব্যাপকতা এবং তীব্রতা হ্রাসের জন্য আইন করে উন্নত প্রযুক্তির ডিজেল ইঞ্জিন এবং এক্সসট গ্যাস পাইপে সাইলেন্সারের ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।
সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যান্ড সঙ্গীতের আয়োজন করা হয়ে থাকে। যার ফলে এ সময় অনাকাক্সিক্ষতভাবে শব্দ দূষণ সৃষ্টি হয়ে আশেপাশে থাকা শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীসহ প্রায় প্রত্যেকেরই ঘুমের বিঘœ ঘটছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে দরকার জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।
১৯৯৭ সালের পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এসব জায়গায় মোটরগাড়ির হর্ণ বাজানো বা মাইকিং করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ এ আইনের তোয়াক্কা কেউ করে না। ঢাকা সিটির সাইলেন্টস জোনেও আইনশৃংখলা বাহিনীর সামনেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাইক বাজিয়ে দেদারসে ঔষধ বিক্রির নামে যন্ত্রণাদায়ক অশ্লীল কথামালায় মাইকিং করতে দেখা যায়।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী কোন এলাকা ৬০ ডেসিবেল মাত্রার বেশী শব্দ হলে সেই এলাকা দূষণের আওতায় চিহ্নিত হবে। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী অফিস কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী কক্ষে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, হাসপাতালে ২০ থেকে ৩৫ ডেসিবেল, রেস্তোরায় ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা সহনীয়। ৬০ ডেসিবেল শব্দ মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে এবং ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।
উচ্চশব্দ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও অসচেতনার কারণে রাজধানীতে শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে ৯৫ ভাগ মানুষ। অবশ্য এ শব্দ দূষণের অন্যতম কারণ হিসাবে গাড়ির হর্ণকেই দায়ী করলেন বিষেজ্ঞরা।
শব্দদূষণ বন্ধে বিধিমালা বাস্তবায়নে গাড়িচালকদের মধ্যে সচেতনতার পাশাপাশি পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মাধ্যমে গাড়ীর হর্ণ বাজানোর জন্য সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত। শব্দদূষণ বন্ধে পুলিশ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং জেলা প্রশাসনের পরিচালিত মোবাইল কোর্টগুলোতে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ণ এর ব্যবহার রোধে আরও কার্যকারী প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আইনৃ´খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, অপ্রয়োজনে হর্ণ বাজালে মোটরযান অধ্যাদেশের আওতায় ২শ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এ জরিমানা চালককে দিতে হয় না বলে চালকরা এ অপরাধ করেই যাচ্ছে। শব্দ দূষণ রোধে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে এর কোন প্রয়োগ নেই।
প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষ। রাস্তায় নামছে নতুন নতুন গাড়ি। তৈরি হচ্ছে নতুন স্থাপনা। আর এই বাড়তি মানুষের চাহিদার জোগান দিতে বেড়েছে শব্দ দূষণের মাত্রা এবং বাড়তে বাড়তে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাড়ি চালক ও গাড়ির মালিকগণকে শব্দ দূষণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিতকরণসহ জনসচেতনতা সৃষ্টি, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত বিধান এবং শব্দ দূষণ বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ করতে হবে। বিশেষ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সেক্স, যৌন, যৌনতা, অপরাধ, একুশ নিউজ মিডিয়া, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchange

বাঙালির বুদ্ধিজীবিতার ইতিহাস সুবিধাবাদিতার ইতিহাস


জাতীয় সংকটে সুশীলরা কোথায়?

সোয়াদ আহমদ ● কেউ কথা বলছেন না, কয়েকজন বলছেন। তারা মোটে গুটি কয়। জাতীয় সম্পদ পাচার হচ্ছে, জাতীয় স্বার্থ লুণ্ঠিত হচ্ছে, গণমানুষের সঙ্গে নিদারুণ প্রতারণা হচ্ছে, রাষ্ট্রশক্তি বিক্রি করে দিচ্ছে গণমানুষের ভবিষ্যৎ – এসব অহরাত্রি ক্লান্তিহীনভাবে বলে চলেছেন আমাদেরই কয়জন। আনু মুহাম্মদ, এম এম আকাশরা লড়ছেন, সঙ্গে আছে বিশাল সংখ্যার রাজনীতি সচেতন এক তরুণ শ্রেণী। তরুণরা ব্লগে লিখছেন, তর্ক করছেন, গল্প করছেন, স্বপ্ন দেখছেন এবং তৈরি হচ্ছেন। তৈরি হচ্ছেন এক বড় সামাজিক প্রয়োজনে, নিজেদের মতো করে সব গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। অনেককেই ভুলিয়ে রাখতে পেরেছে রঙিন করপোরেট জগত, মাল্টিনেশন কোম্পানি অথবা সুশীল জাতীয়তাবাদের ছায়া, তবে সবাইকে পারেনি। সবাইকে পারা যায় না। এরা টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ফেসবুক সব ছাপিয়ে সময়ের প্রয়োজনে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছায় সচেতন বা অবচেতনভাবে অভিন্ন প্রয়োজনে জড়ো হচ্ছে।

আমাদের অতি চেনা হিসাব মতোই, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নির্ভাবনায় আরাম কেদারায় শুয়ে দু’পা নাচাচ্ছেন। অনেকেই অবাক হয়, যারা ইতিহাস সচেতন তারা অবাক হয় না, তারা এঁদের হাড়ে হাড়ে চেনেন। এই সময়গুলোতেই উনারা কালা এবং বোবা, আর বাকি সময়ে উনাদের মুখে কথার ফুলঝুরি। তেল-গ্যাস নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা বলবেন এর বাইরে আমাদের সুশীলদের বিষয়ে সামান্য গুণকীর্তনের নিমিত্তেই এই লেখার অবতারণা।

বারবার আমরা এই সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রগত সংকট দেখে বিস্মিত হচ্ছি। আমরা এরশাদ সরকারের পতন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের দোহাইয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দানের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীটির শ্রেণীগত প্রতিষ্ঠা দেখি। তখন আমরা আমাদের বিশিষ্ট হেভিওয়েট দেশপ্রেমিক বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেখি। ২৭ জুন ২০১১ তারিখে বিভিন্ন পত্রিকাতে দেয়া শেখ হাসিনার কলামেও তার কথা উল্লেখ করেছেন যে হাবিবুর রহমান ১৯৯৬তেই সুশীল অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিলেন। সেসব তো অনেক পরের কথা। আমরা বেশ খানিক আগে চলে যাব, এদের শ্রেণীগত চরিত্র বোঝার জন্য রাষ্ট্রের সংকটকালীন সময়গুলোর ওপর চোখ বোলালেই চলবে।

বাঙালির বুদ্ধিজীবিতার ইতিহাস সুবিধাবাদিতার ইতিহাস। নিজের ভোগবিলাস ছাড়া এই পরজীবী বুদ্ধিজীবীরা কিছুই বোঝে না। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে সংকটকালীন সময় ’৭১, সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা। এই বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ স্বপ্ন দেখতে জানত না, এদের চোখে কোনোদিন স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি জেগে ওঠেনি। তাই সাহস করে কেউ ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেনি যে, একটি জাতি ঐতিহাসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিতে যাচ্ছে। মনীষা আহমদ ছফা এই বিষয়টাতেই ভীষণ আক্ষেপ করতেন। পশ্চিম বাংলায় এ দেশের কোটি কোটি উদ্বাস্ত্ত বাঙালি যখন মানবেতর জীবন যাপন করছে তখন কলকাতা নগরীতে রাজ সম্মানে আশ্রিত বুদ্ধিজীবীরা আয়েশি জীবন, ভোগবিলাসে মগ্ন থাকতেন, সত্য-মিথ্যা গল্প ফেঁদে মোটা অর্থ কামাতেন। এরা সগৌরবে বিদেশী সাহায্যের অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নিতে লজ্জা পেতেন না। সময়ের প্রয়োজনে এদের অনেকেই যারা একসময় ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী, পাকিস্তান রাষ্ট্র দর্শনের একনিষ্ঠ পুজারী তারাই স্বাধীনতার পর দলে দলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জয়গান গেয়েছেন। অনেক ভারি ভারি বুদ্ধিজীবী আইয়ুব খানের টাকার ঝুলির পেছনে কলম ফেলে দৌড়িয়েছে। এসব শুধুই ইতিহাস নয়, সেদিনের কতিপয় ‘বোকাসোকা’ মানুষ যারা বুদ্ধিকে জীবিকার বাহন হিসেবে নেয়নি, যে কয়জন ‘মূর্খের’ মতো নতুন ভূখন্ড নিয়ে অহর্নিশ স্বপ্ন দেখত, সেই কয়জনের বাইরে বুদ্ধিজীবীদের বিশাল অংশের শেকড়-বাকড় আর তাদের ভাবশিষ্য নিয়েই রচিত আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের ভিত্তিভূমি।

আমরা দেখেছি সময়ের প্রয়োজনে ও পুঁজির বিকাশের স্বার্থেই এরশাদ সরকারের উত্থান ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তি। এরশাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তার পতনও ঘটানো হয়। নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এরা নতুন আরেকটি শ্রেণী তৈরিতে উদ্যোগী হলো। গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মত প্রকাশ তথা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। নতুন শ্রেণীটি হলো এই সংবাদ মাধ্যম আশ্রয়ী বুদ্ধিজীবী শ্রেণী আমাদের এখানে যারা সুশীল সমাজ নামে পরিচিত। এরা অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংস্কৃতি ও চিন্তার ধারক ও বাহক মধ্যবিত্ত ও মধ্যবর্তী শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে অতিমাত্রায় গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। তাদের এই উত্থানের ও গ্রহণযোগ্যতার কারণ রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যর্থতা থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনে জেগে ওঠা হতাশাকে ধরতে পারা। তারা দেশে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার গালভরা কথা বলে, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় উচ্চকণ্ঠ প্রকাশ করে যা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীকে সহজেই আকৃষ্ট করে তোলে। তৃতীয় বিশ্বের নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতা ও অর্থ ছাড়া তেমন কিছু চেনে না এবং তা স্বাভাবিক, খালেদা-হাসিনারা তাই দুর্নীতির ধারক-বাহক। রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক অশ্রদ্ধা, গণতন্ত্র চর্চার অভাব, সহিংস মনোবৃত্তি ইত্যাদি জনমনকে সর্বদা ক্লান্ত ও হতাশ করে রাখে। সেই সুযোগটাই সুশীলরা হাতিয়ে নেয় কৌশলে। এদের আমরা প্রয়াশই দুর্নীতি, সুশাসন প্রভৃতি প্রশ্নে সভা সমিতি, সেমিনার, টক শো, পত্রিকার কলামে বলিষ্ঠ বক্তা ও প্রতিবাদী দেশপ্রেমিক হিসেবে দেখি। যাদের মুখে বুলেটের মতো উচ্চারিত হয় দেশ, জাতি আর স্বাধীনতার কথা। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে আমাদের নেতৃত্ব দেশকে কিছুই দিতে পারেনি এই তাদের মূল বক্তব্য। সব ব্যর্থতার উৎস তারা রাজনীতি আর রাজাকারে খোঁজার প্রয়াস পায়। দেশ বিষয়ক মায়াকান্নায় মুহূর্তে তারা তরুণ শিক্ষিত সমাজকে সিক্ত করে ফেলে। ফের সুশাসন প্রশ্নে আমরা তাদের মূল বক্তব্য খুঁজে পাই, এক অগণতান্ত্রিক রাস্তার নির্দেশনা তারা কৌশলে দিয়ে থাকেন। সেই পথ এক পাপের পথ যে পথ কোনো দিন গণতন্ত্রকে মাটির গভীরে শেকড় গাঁড়তে দেবে না। তাদের সেই ষড়যন্ত্রের শিকার আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর সমাজের তরুণ প্রজন্ম যাদের ফেইসবুকের পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস থাকে এই সব বাক্য। একটা প্রজন্মকে তারা নষ্টের চূড়ান্তে নিয়ে গেছে। যারা এরই মধ্যে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। স্বার্থপর সহিংসতায় তাদের সহপাঠীর মৃত্যু তাদের ভাবিত করে না। ন্যায্য অধিকারের জন্য, শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে তাদের সহযাত্রীদের সংগ্রাম এদের আলোড়িত করে না, তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাক বা ভবিষ্যৎ বংশধরদের কান্না কিছুই এদের কান নাগাদ পৌঁছুতে পারছে না।

এই সুশীল-বুদ্ধিজীবীর অভ্যুত্থানের সুযোগ করে দেয় হাসিনা-খালেদার অগণতান্ত্রিক রাজনীতিই। তারা যত বেপরোয়া হয়ে উঠবে, যত দুর্নীতিগ্রস্ত হবে, যত তাদের রাজনৈতিক চরিত্র স্খলন হবে, ততই সুশীলদের লাভ। তারা তত সহজেই হতাশ জনগণের কাছাকাছি যেতে পারে। সুশীল সমাজ সম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন মাত্রার সহযোগী। নানা কারণে সাম্রাজ্যবাদীরা তৃতীয় বিশ্বের সস্তা চরিত্রহীন রাজনীতিবিদের চাইতেও এই শ্রেণীটিকে বেশি পছন্দ করে এবং এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। তৃতীয় বিশ্বের এই পরিবারতন্ত্র, পুঁজিবাদের বিকাশ ও সম্রাজ্যবাদের প্রসারণে যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি করে। তাই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি চায় একেবারে তাদের নিজের শক্তিই ক্ষমতায় আসুক। সেই নিজের একান্ত শক্তি যে কখনো তার সঙ্গে বেঈমানী করবে না- সেটি হলো এই সুশীল সমাজ। খালেদা-হাসিনাকে তো সামান্য হলেও জনগণের কথা ভাবতে হয়, কিছুটা হলেও জনগণের সামনে দাঁড়াতে হয় কিন্তু এই বুদ্ধিজীবী সুশীল শ্রেণীর সে দায়বদ্ধতাও নেই।

এই নতুন মাত্রার সুশীল সরকারের এক্সপেরিমেন্ট আমরা দেখি ওয়ান-ইলিভেনে। আমেরিকার আশীর্বাদ পুষ্ট সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের অভ্যুত্থান হয় এই দিনটিতে। এক অগণতান্ত্রিক, অরাজনৈতিক ঐতিহাসিক পাপের জন্ম দিল সুশীল সমাজ। আরোপিত ব্যবস্থার নাম দিল সামরিক শক্তি সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার। কিন্তু আসলে এত দুর্নীতি, অন্যায়, দুঃশাসনের পরও জনমনে হাসিনা-খালেদার প্রতি সামান্য হলেও ভালোবাসা অবশিষ্ট ছিল। সে ভালোবাসাই আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন ঘাত, প্রতিঘাত, সংগ্রাম, ছাত্র বিস্ফোরণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণের ভেতর দিয়ে দুর্বলভাবে হলেও নির্বাচিত সরকারের পুনর্জন্ম হয়েছিল বলা যায়। এই অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েই পিএসসি-২০০৮ বা রফতানিমুখী উৎপাদন বণ্টন চুক্তির প্রণয়ন দেখি। সম্ভবত সেই অগণতান্ত্রিক সুশীল সরকার থাকলে এতদিনে গ্যাস পাচারের কাজ শুরু হয়েই যেত। এখন যে আমরা নিদেনপক্ষে প্রতিবাদ, মিছিল বা হরতালের সুযোগ পাচ্ছি সেটা তখন কল্পনাও করা যেত না।

সুশীলরা এখন তাই নিশ্চুপ, এটা তাদেরই অসমাপ্ত কাজ। অস্থিতিশীল, দুর্বল বিএনপির মুখে জোর নেই, তারা নিজেরাই কয়েকবার জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি করেছে এবং জাতীয় কমিটির গণআন্দোলনের সামনে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া তারাও সরকারে থাকলে একই কাজ করত। ভালো মানুষের মুখোশ পরা দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান সুশীলরা শুধু এই প্রশ্ন নয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির যে কোনো শর্তে দেশের অপার মঙ্গল দেখতে পান, জনকল্যাণমুলক খাতসমূহে সরকারি ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ায় তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি খুঁজে পান।

তবে এবার এদের নতুন প্রজন্ম চিনে রাখবে ভালোভাবেই। তারা মনে রাখবে এদের অনেকেই যারা ইউনূসের সম্মান বাঁচাতে দলে দলে মানববন্ধন করেছে, নাকের জল চোখের জল এক করে ফেলেছে আর তাদেরই ষোল কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ সামান্যও ভাবিত করে না। যাদের কাছে একটা নোবেল প্রাইজের ওজন ষোল কোটি মানুষের ওজনের চেয়ে বেশি তাদের নাম লাল কালি দিয়ে লিখে রাখবে আনু মুহাম্মদের উত্তরসূরিরা।

[লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchabge

পুনর্বার নতুন শক্তিতে জেগে উঠুক আমাদের ইতিহাস, আমাদের দেশবোধ, আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।


রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন : একজন নাগরিকের প্রতিবাদ

পিয়াস করিম ● তেসরা জুলাই একটা তুলকালাম কান্ড ঘটে গেল ঢাকায়। জানি আমাদের জাতীয় জীবনে এই অস্থির ঘটনাগুলো নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার পর তো চল্লিশ বছর পায়ে পায়ে কেটে গেল। এই পদযাত্রা সহজ হয়নি কোনো অর্থেই। পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ থাকেনি আমাদের।

যেই স্থিতিটুকু থাকলে জাতি হিসেবে আমাদের সত্তাকে আরো সুসংহত বলে মনে করা যেত- তা আর আমাদের হয়ে উঠলো না। আমাদের ইতিহাসজুড়ে বার বার রক্তপাত ঘটে গেছে, বার বার ঘটে গেছে অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের পালাবদল। আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্রের বিভাজন রেখাটি বার বার ধূসর হয়ে গেছে। জাতি হিসেবে স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট আমাদের পেতে হয়েছে ক্রমাগত। আমরা প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দায়ও যে আমাদের শাসকরা খুব বোধ করেছেন তা নয়।

এই চল্লিশ বছরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর নিপীড়নের অভিজ্ঞতাতেও আমাদের খুব ঘাটতি নেই। আমাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি কিছুতেই। যাদের রক্ষক হওয়ার কথা ছিল তারা ভক্ষক হয়ে উঠেছেন দিনের পর দিন। আমরা চেয়েছি বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা। উল্টো আমাদের ওপর নেমে এসেছে শ্বাসরুদ্ধকর স্বৈরশাসন। আমরা চেয়েছি শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন, কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জুটেছে গুপ্তমৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। আমাদের তরুণরা দৃপ্ত পদে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। তার বদলে লিমনের মতো তরুণকে পা হারাতে হয়েছে।

সুতরাং তেসরা জুলাই যা ঘটে গেল, তাতে বিস্ময়ে চমকে ওঠার কারণ হয়তো আমাদের নেই। জাতি হিসেবে এটুকু স্থূলচর্ম তো আমরা অর্জন করেছে সেই কবেই। কোনো শোকই বুঝি আর শোক নয় আমাদের কাছে, কোনো আঘাতই আর আঘাত নয়।

কিন্তু তবু তেসরা জুলাই আমাদের নতুন করে ভাবাল। এই হাজারো কষ্টের মধ্যেও যে নতুন করে ভাবার, নতুনভাবে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাটুকু আমাদের সুকঠিন অভিজ্ঞতার ফাঁকফোকরের মধ্যে এটুকু সবুজ চারাগাছের মতো নিজেকে জানান দেয় তা হয়তো প্রমাণ করে- এত পরাজয়, এত অবমাননার পরেও জাতি হিসেবে আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

তেসরা জুলাই ঢাকায় আধাবেলা হরতাল ছিল। তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বঙ্গোপসাগরের দুটি গ্যাস ব্লক মার্কিনি বহুজাতিক করপোরেশন কনোকো-ফিলিপসের কাছে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে এই হরতাল ডেকেছিল। হরতাল আইনসম্মত গণতান্ত্রিক অধিকার, অধিকার আদায়ের জন্য একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক মাধ্যম। এই হরতাল কায়েমী স্বার্থের পক্ষের হরতাল ছিল না। পেছনের দুয়ার দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ছিল না এই কর্মসূচি। বাংলাদেশের সম্পদের ওপর বাংলাদেশের জনগণের অধিকার রক্ষার, বাংলাদেশে স্বাধীন গণতান্ত্রিক অর্থনীতি বিকাশের প্রত্যাশার এটি ছিল ন্যয়সঙ্গত এক পদক্ষেপ।

কিন্তু তেসরা জুলাই কাকভোর থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র তার নিপীড়নের থাবা নামিয়ে এনেছিল হরতালকারীদের ওপর। বিনা প্ররোচণায় জাতীয় কমিটির নেতারা একের পর এক গ্রেফতার হয়েছেন। কর্মীদের ওপর নেমে এসেছে পুলিশি নির্যাতনের দানবীয় শক্তি। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি কর্মীরা বেধড়কভাবে লাঠিপেটা হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। টেনেহিঁচড়ে ছেলেমেয়েদের পুলিশি ট্রাকে তোলা হচ্ছে। আমরা দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় ছবি দেখেছি এক তরুণীকে বুট দিয়ে লাথি মারছে জনগণের করের টাকায় প্রতিপালিত পুলিশ।

পল্টন থানায় দেখা হয় অদিতি হকের সঙ্গে। অদিতি নৃবিজ্ঞানী, সঙ্গীতশিল্পী। ওর বাবা-মা আমার ব্যক্তিগত বন্ধু সাইফুল হক এবং বহ্নিশিখা জামেরির সঙ্গে সে গ্রেফতার হয়েছিল। সেই সকালেই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেওয়ায় অদিতিকে ঘাড়ে-পিঠে বেধড়ক মেরেছে পুলিশ। পল্টন আর শাহবাগ থানায় অদিতির মতোই আরো সব তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে দেখা হলো সেই সন্ধ্যায়। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ও দেশপ্রেমিক কর্মীরা রাজপথে থাকতে পেরেছেন। স্বাধীন দেশের ‘‘পিকেটারদের রাস্তায় না দাঁড়াতে দেবার’’ রাষ্ট্রীয় নীতির কারণেই রাজনীতি বুঝি শেষে পথছাড়াই হয়ে গেল।

হরতালের আগের বিকালে জাদুঘরের সামনে সংস্কৃতিকর্মীদের সমাবেশ ছিল এই ইস্যুতে। সেই সমাবেশে আগুনের টুকরোর মতো ছেলেমেয়েদের দেখেছি। এদের কেউ অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি যাবে তেমন সম্ভাবনা নেই, সুবিধার হালুয়া-রুটিতে এদের কারো আগ্রহ নেই। বরং এদের মধ্যে আছে তারুণ্যের সেই জাদুকরী শক্তি-আদর্শের প্রতি সুগভীর বিশ্বাস। এদের চোখের তারায়, এদের কণ্ঠের কাঁপুনিতে সেই বিশ্বাস ঝিকমিক করে জ্বলে উঠেছিল। এইসব তরুণ-তরুণী এস্টাবলিসমেন্টের অংশ হতে চায় না, কায়েমী স্বার্থবুদ্ধি তাদের জীবনবোধের চালিকাশক্তি নয় এখনো। এদের মধ্যে জীবনের ওপর আস্থার সেই অকম্প শিখা, তারুণ্যেই বুঝি যার শুদ্ধতম প্রকাশ সম্ভব। শিক্ষক হিসেবে, পিতা হিসেবে আমার মনে হচ্ছিল এই বিশ্বাস, এই জীবনবোধ যতদিন জাগ্রত থাকবে, আমাদের এই বেনোজলের খরার, মন্বন্তরের দেশটি সব আশাও ততোদিন ফুরোবে না।

এইসব তরুণ-তরুণীদের অনেককেই পরদিন রাজপথে লাঞ্ছিত, প্রহৃত হতে হয়েছে। কিন্তু এই লাঞ্ছনা তো শুধু তরুণ কর্মীদের নয়। এই অবমাননা গণতন্ত্রের, মানবাধিকারের। তেসরা জুলাই আমাদের বহুবার ক্ষত-বিক্ষত হওয়া গণতন্ত্র ঢাকার রাজপথে আবার মুখ থুবড়ে পড়ল।

আসুন, রাষ্ট্র দ্বারা গণতন্ত্রের ওপর এই নিপীড়নের, গণতান্ত্রিক কর্মীদের ওপর এই নিষ্পেষণের আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আসুন আমরা বাংলাদেশের সর্বস্তরের নাগরিকরা প্রতিবাদে সোচ্চার হই। এই প্রতিবাদে আমাদের বিবেক জাগ্রত হোক। পুনর্বার নতুন শক্তিতে জেগে উঠুক আমাদের ইতিহাস, আমাদের দেশবোধ, আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info, dhaka stock exchabge

এটি খুবই দুঃখজনক যে, নিয়মিত করদাতারা ২৫ শতাংশ হারে কর দেবেন, আর ফাঁকিবাজরা মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে পারবেন


শেয়ারবাজারে কালো টাকা রাখতে হবে দুই বছর
শেয়ারবাজারে কালো টাকা রাখতে হবে দুই বছর মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলো। একই সঙ্গে প্রাইমারি শেয়ারে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে প্রদেয় করে ১০ শতাংশ হারে ছাড় (রিবেট) পাওয়া যাবে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। কালো টাকা বিনিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় দুই সপ্তাহ ধরেই শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে তা দু’বছরের জন্য রাখতে হবে। আগামী এক বছর ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। আর কেউ যদি প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগ করেন তাহলে প্রদেয় করের ওপর ১০ শতাংশ হারে রিবেট পাওয়া যাবে। তবে নির্ধারিত দু’বছরের আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা কালো টাকা তুলে নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী ২৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নিতে পারবেন। পুরো বিষয়টি মনিটরিং করবে রাজস্ব বোর্ড। চলতি মাস থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ সুযোগ থাকবে। এনবিআর জানিয়েছে, কালো টাকা বিনিয়োগ করতে হলে এনবিআরকে একটি নির্ধারিত ফরমে ঘোষণা দিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ওই টাকা বিনিয়োগের আগেই ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এ সুযোগ নিতে হলে এনবিআরকে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব দাখিল করতে হবে। শেয়ারবাজারে আগে বিনিয়োগ করা টাকা পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ নেয়া যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ওসমান ইমাম বলেন, শেয়ারবাজারে রাজনৈতিক কারণে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই দু’বার শেয়ারবাজারে ধস নেমেছিল। এ কারণে বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণেই সরকারকে শেয়ারবাজারে কালো টাকার সুযোগ দিতে হয়েছে। এদিকে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা নেয়ার কথা বলেছে। অথচ বাজেট ঘাটতি পূরণে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও সরকার সেটি গ্রহণ করেনি। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি সরকারের অনাগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। তবে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে এটি শেয়ারবাজারে স্বল্প মেয়াদে হয়তো প্রভাব পড়বে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। স্বল্প মেয়াদে প্রভাব পড়ার বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করেছি।
প্রসঙ্গত, গত বছর চারটি সেক্টরে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে— বিএমআরই, শেয়ারবাজার, নতুন শিল্প স্থাপন ও রিয়েল এস্টেট সেক্টর। রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রায় ৯২২ কোটি কালো টাকা সাদা করা হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু শেয়ারবাজার থেকে ৪২৭ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার পর ৩৬ ব্যক্তি তাদের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। এ থেকে সরকার প্রায় ৪৩ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল।
শেয়ারবাজারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে মাত্র এক বছর। ১ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে মূলধন কমপক্ষে দুই বছর বাজারে ধরে রাখতে হবে। অর্থাত্ ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত মূলধন বাজার থেকে উঠাতে পারবে না। বিনিয়োগকারী ওই সময়ের মধ্যে শেয়ার লেনদেন করে শুধু মুনাফা তুলে নিতে পারবেন। কিন্তু মূলধন উঠিয়ে নিতে পারবেন না। চূড়ান্ত নীতিমালায় এ ধরনের নির্দেশনা রয়েছে। এ সুযোগ গ্রহণ করার পর যাতে কোনো ব্যক্তি বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে না পারেন সেজন্যই এ ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকার ঘোষিত সুযোগটি গ্রহণ করতে হলে বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই ঘোষণা দিতে হবে তিনি কি পরিমাণ অর্থ বৈধ করবেন। যে পরিমাণ অর্থ ঘোষণা করা হবে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এনবিআরের তৈরি করা আলাদা ঘোষণাপত্রে নাম, ঠিকানা, ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বরসহ (টিআইএন) সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্য উল্লেখ করার পাশাপাশি বিও অ্যাকাউন্টের বিবরণী ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, নিয়মিত করদাতারা ২৫ শতাংশ হারে কর দেবেন, আর ফাঁকিবাজরা মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে পারবেন। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ শেয়ারবাজারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। কারণ এর আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তারল্য সরবরাহ না বাড়ালে বাজারের স্থিতিশীলতা টিকবে না। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগে ১০ শতাংশ রিবেটের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে, সেটি তিনি সমর্থন করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় নীতিমালা সাপেক্ষে প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। এটি কোম্পানির জন্য ভালো। কারণ আইপিওর চাইতে প্লেসমেন্টে খরচ অনেক কম।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহসানুল ইসলাম টিটো বলেন, এটি সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে বেশি মনিটরিং করা হলে প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়তো বিনিয়োগ আসবে না। প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগে রিবেটের সুযোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি নট ফেয়ার। সুযোগ দেয়া হলে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটে একসঙ্গেই দেয়া উচিত্। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেখানে শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছেন সেখানে আমলারা নানা রকম শর্ত জুড়ে দেয়ায় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হয়তো সফল হবে না।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা।


রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়া ঠিক হচ্ছে না

মাসুদ মজুমদারঃ রাজনীতিতে অনৈতিকতার প্রভাব বাড়ছে। প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার প্রবণতাও প্রবল। ক্ষমতার রাজনীতিতে স্বার্থের বোঝাপড়াও বেড়ে গেছে। ক্ষমতার স্বার্থে যেকোনো অনিয়ম করতেও সরকার এখন প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে মিথ্যাচারও বৈধ হয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধ ইসুকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এটা যেনো প্রতিপক্ষ দলন ও দমানোর মোক্ষম হাতিয়ার। স্পর্শকাতর এ ইসুকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা বলেছে।

১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবি করেনি­ এমন মানুষ বাংলাদেশে নেই। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়ার পর সরকার কার্যত ভড়কে যায়। কারণ আওয়ামী লীগ এ প্যান্ডোরার বাক্স নিয়ন্ত্রণহীনভাবে খুলতে চায়নি। আওয়ামী লীগ ভালো করেই জানে পরিচ্ছন্নভাবে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ইসুটি সামনে আনতে হলে সরকারের অতীত ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে পড়বে। এমনকি বঙ্গবন্ধুও অভিযুক্ত হয়ে যান। জড়িয়ে যায় ভারত। পাকিস্তান তো জড়াবেই। আওয়ামী লীগ এত জটাজালে আটকে যেতে চায় না। কার্যত সরকার আন্তরিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। চায় এই ইসুকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে। রাজনৈতিক মেরুকরণে ইসলামপন্থীরা জাতীয়তাবাদী শক্তির মিত্র। অপর দিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার মতো ধারালো অস্ত্র আওয়ামী লীগের হাতে নেই। জিয়া ইমেজ এখনো ইতিবাচক। তাই আওয়ামী লীগ জিয়া ইমেজের রশি ধরে টান দিতে চেয়েছে। জিয়াকে নিয়ে বিতর্কের আসল মাজেজা মৃত জিয়াও শক্তিমান। বিএনপি’র রাজনীতিতে ধস নামাতে হলে জিয়া ইমেজ ফুটো করে দেয়া জরুরি। অনেক ভুলভ্রান্তি নিয়েই বিএনপি জোট সরকার পরিচালনা করেছে, কিন্তু জাতীয় ইসুতে ও জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টিতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি। প্রতিপক্ষ দমনেও হ্যাটট্রিক করেনি। ফলে ক্ষমতাসীন একটি দল অতীত ক্ষমতা চর্চাকারী অপর একটি দলকে শুধু সাফল্য-ব্যর্থতার নজির টেনেই সমালোচনা ও নিন্দা করতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ব্যর্থতার তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার কারণে সরকারকে অন্য ইসুতে মনোযোগী হতে হয়েছে। সেই ইসুটি যুদ্ধাপরাধ ইসু। মিত্ররা আক্রান্ত কিংবা অভিযুক্ত হলে অপর মিত্র বিব্রত হওয়া স্বাভাবিক। জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারে বিএনপি বিব্রত হয়েছে। সরকার এটাই চেয়েছিল। কারণ এই একটি মাত্র ইসুতে জামায়াত বিব্রতবোধ কাটাতে পারে না। এই ইসুটিকেই সরকার বিরোধী দলকে কাবু করার পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশী-বিদেশী মিত্রদেরও এই ইসুতে কাছে পাওয়ার ভরসা পেয়েছে। অস্তিত্বের স্বার্থে বর্তমান সরকারের সাথে আছে তাবৎ বামপন্থী। আরো সাথে আছে সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ে বামপন্থী ও সেকুলার নামে ধর্মবিদ্বেষী একটি গোষ্ঠী। এরা ধর্মপন্থীদের আদর্শিক শত্রু বিবেচনা করাকে একধরনের প্রগতিশীল ভাবনা মনে করে। তাই বামপন্থীদের আদর্শিক শত্রু এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু কমন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ভারত তার ইমেজ বৃদ্ধি ও স্বার্থ উদ্ধারে নানামুখী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করার জন্য সচেষ্ট। ঐতিহাসিক কারণে ভারত বাংলাদেশের চীনঘেঁষা বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ইসলামপন্থীদের তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক মনে করে। অপর দিকে পশ্চিমা ঘোলা চশমায় ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি মানে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের প্রতি সহমর্মী। পশ্চিমা শক্তির ধারণা এরা একই সাথে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকেও কম পছন্দ করে। তাই পশ্চিমা শক্তি অন্তত কয়েকটি ইসু ভাবনায় জাতীয়তাবাদী-ইসলামি মূল্যবোধ লালনকারীদের তুলনায় সেকুলার ও বামপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। সমর্থন জোগায়। তা ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বীজ বপনের জন্য সেকুলার ও বামপন্থীদের মগজ এখন উর্বর। বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী অবস্থান আজকাল একধরনের ফ্যাশন। যেকোনো জাতীয় স্বার্থবিরোধী সন্ধি-চুক্তিতে এদের ব্যবহার করা সহজ। ক্ষমতার টোপ দিয়ে কেনাকাটাও কঠিন নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সমস্যার জট পাকিয়ে ফেললেও এ কারণেই ভারত ও পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পায়। একধরনের মন্দের ভালো বিবেচনায় মার্কিন লবির একটি অংশও বর্তমান সরকারকে তাদের স্বার্থানুকূল ভাবে। যদিও মার্কিন নীতি এককভাবে দলবিশেষ ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতি ঝুঁকে থাকার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। মার্কিন লবি হয়তো চাইবে না ভারত বাংলাদেশকে একক বাজার ও পশ্চাৎভূমি হিসেবে ব্যবহার করুক। কারণ তেল, গ্যাস, বন্দরসহ ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে মার্কিন স্বার্থ সব ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থের সমান্তরাল হয় না।

আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ প্রকৃত অর্থে যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় না। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে যে ঢোল সহরত করছে সেটাও এক ধরনের রাজনৈতিক তামাশা। এ তামাশাও দেখাতে চায় খণ্ডিতভাবে। বাস্তবে সরকার প্রতীকী অর্থে বিচার নামের প্রহসনের ওপর ভর করে একই তীরে দুটো অর্জন নিশ্চিত করতে চায়। প্রথমত, তারা চায় প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে অকার্যকর প্রতিরোধহীন শক্তি হিসেবে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখতে। একই সাথে আশা করে একই তীর ছুড়ে বিএনপিকে বন্ধুহীন করে রাখতে। দ্বিতীয়ত, জামায়াতকে কোণঠাসা ও কাবু করে রাখার জন্য এত সস্তা দাওয়াই আর নেই। এটা প্রয়োগ করে ভারত ও পশ্চিমা মিত্রদেরও বোঝানো সহজ যে, মহাজোট সরকার জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী এবং মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ সমর্থকদের দমন-পীড়নে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। তারা আশা করেছিল বিএনপি শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেবে। তাতে বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের দোসর বলে প্রচারণা চালানো সহজ হবে। বিএনপি’র দুর্বল অবস্থান সরকারকে অতি উৎসাহী করে তোলে। তারা আশা করে আখ খাওয়ার গল্পের মতো জামায়াতকে কোণঠাসা করে পরে বিএনপিকে দুর্বল করা সহজ হবে। যদিও একধরনের ইনার কন্ট্রাডিকশন নিয়ে আওয়ামী লীগ পথ চলছে। সিদ্ধান্তহীনতাও তাদের ঘিরে ধরে আছে। রাজনৈতিক তামাশা প্রদর্শন করতে গিয়ে যত পথ চলছে সামনে ভুলের মাশুলগুলো পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে। জনগণের আবেগ কাটছে। সমর্থকদের মনোবল দুর্বল হচ্ছে।

সরকার যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ইসুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে তার সর্বশেষ প্রমাণ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গ্রেফতার নাটক। তাকে গ্রেফতার করা হলো মগবাজারে গাড়ি পোড়ানোর মামলায়, যা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ভোঁতা। নাবালক শিশুও বোঝে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পুলিশি সিদ্ধান্তে গ্রেফতার করা হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা ছাড়া এ গ্রেফতার অসম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নৈতিক অবস্থান স্বচ্ছ হলে তাকে প্রথমেই কথিত যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হলো না কেন? বিএনপি প্রথমে এই ইসুটিকে অত্যন্ত হালকাভাবে গ্রহণ করেছে। জামায়াতও ভেবেছে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে। আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের শীতল প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহবোধ করেছে। এ উৎসাহের প্রথম কারণ, তারা লক্ষ করেছে জামায়াতকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। বিএনপিকেও বন্ধুহীন করার ফন্দি কাজ দিয়েছে। বিরোধী দল মাঠ ছেড়েছে। কেউ নয়াপল্টন, কেউ মগবাজারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ উৎসাহ আরো উচ্চাভিলাষের জন্ম দিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এ উচ্চাভিলাষ ও বিরোধী দলকে অবমূল্যায়ন জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।

সাধারণ মানুষ বলাবলি করছে দরাজ গলায় ‘আমরা ক্ষমা করতে জানি’ বলে চিহ্নিত ১৯৫ জনকে ভারতের সাহায্যে জামাই আদরে বিদায় করে দিয়ে সরকার এত বছর পর নিজ দেশের মানুষদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে কেন? অপরাধী যেই হোক তার বিচার হওয়া কাম্য। কিন্তু মূল অপরাধী ছাড়া পাবে, তাদের সহযোগী শাস্তি পাবে, আইন-বিচার, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার কোথাও এর সমর্থন পাওয়া যাবে না। কোথাও এমন নজিরও নেই।

অনেকের মনে প্রশ্ন, সরকার যুদ্ধাপরাধ ইসু কদ্দূর টেনে নিয়ে যাবে। আসলে ইসুটি রাজনৈতিক। এর আইনি পরিসমাপ্তি সম্ভব নয়। এর জের টানা এত সহজ হলে বঙ্গবন্ধুকে ভিন্ন ভূমিকায় দেখা যেত। এখন বিএনপি-জামায়াত জোট ইসুটিকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে সরকার এগোতেই থাকবে। একটা প্রহসনের বিচার মহড়ায় কিছু চিহ্নিত প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সব সুযোগ গ্রহণ করবে। কারণ অসৎ ভাবনা­ অনৈতিক কাজ ও প্রতিহিংসার শেষ থাকে না। যদিও সামগ্রিক ইসুটিকে সরকার বিতর্কিত করে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়ে গেছে।

সাকা চৌধুরীকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার প্রশ্ন নয়। তাকে খাতির-আত্তি করার বিষয়ও নয়। কিন্তু তাকে যে প্রক্রিয়ায় আগের কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ গ্রেফতার রীতি অনুসরণ করে আটক করা হলো, তা কিন্তু খারাপ নজির হয়ে রইল। নির্যাতনের উপমাও মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এ সরকার একমাত্র সরকার নয়। শেষ সরকারও নয়। দেশজাতির সামনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে উপমা সৃষ্টি করে রাখা হলো তা যে বারুদে হাত রাখার শামিল হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে। পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য এ নজির ও উপমা অপকর্ম বৈধতা দেয়ার সনদ হয়ে থাকবে। এ খোঁড়া গর্ত বা কবরে বর্তমান শাসকরা পড়বেন না সেই নিশ্চয়তাই বা কোথায় পাওয়া যাবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়ার প্রকৃতিগত প্রতিক্রিয়া রোধ করা কিভাবে সম্ভব হবে।

নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা বদলের পরও আমরা সংযমহীন বাড়াবাড়ি দেখেছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে­ এমন দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছি। মান্নান সাহেবকে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে, হরতালের সমর্থনে পিকেটিংয়ের সময়। মতিন চৌধুরীকে পুলিশ হামলে পড়ে অপদস্থ করেছে মৌচাকে। নাসিম সাহেবের ওপর পুলিশের হামলার দৃশ্য তো মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। বাবর সাহেবকে নিয়ে কী করা হচ্ছে তার কথা না তোলাই ভালো। তাই সহজেই উচ্চারণ করা যায় এককাল শাশুড়ির, আর এককাল বউয়ের। তা ছাড়া এক মাঘে শীত না যাওয়ার গল্প কে না জানে। তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার জন্য যখন যারা দায়ী তারা সবাই নিন্দনীয় কাজ করেছেন।

আমরা অনুশীলিত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি নিয়ে শঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত (।) একই সাথে বিব্রতও। আমরা সহজ কথায় যে সত্যটি বুঝি, ভিন্ন মত না থাকলে গণতন্ত্র থাকবে না। বিরোধী দল নাই হয়ে গেলে সরকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারবে না। ভিন্ন মত ও বিরোধী দল সহ্য না করার প্রেক্ষাপটে যে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে, তার ষোলো আনা দায়ভার নিতে হবে সরকারকে। তাই ক্ষমতার জোরে পুলিশকে বেপরোয়া বানিয়ে দেয়া কিংবা আইনের ঊর্ধ্বে এলিট ফোর্সকে রক্ষীবাহিনী চরিত্রে নিয়ে যাওয়ার কোনো কুমতলব না থাকাই ভালো।

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা। এর মাধ্যমে অতীতের অনেক ভয়াবহ ও ভীতিজনক স্মৃতির কথা মনে পড়ে। তাই জনগণের হৃৎস্পন্দন বোঝার দায় বাড়ছে। এ দায় পূরণে ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। ব্যর্থ হলে পাদুয়া দৃষ্টান্ত হবে। সরকার বিএসএফ নিয়ে রা করেনি। মিডিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ দেখেও না দেখার ভান করেছে। এটা যেনো ছিল বন্ধুত্বের সহনীয় ‘উৎপাত’। জনগণ অপেক্ষা করেনি। দল ও মতনিরপেক্ষ সাধারণ জনগণ সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ভারতীয় আগ্রাসন ঠেকিয়ে দিয়েছে। জনগণের এ সম্মিলিত শক্তিকে সমীহ না করলে বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার ফলাফল কোনো দিনই ভালো হওয়ার কথা নয়।

এক দশকে জমির দাম বেড়েছে ৭শ’ শতাংশ : অভিমতঃ বাড়িভাড়া প্রসঙ্গ


এক দশকে জমির দাম বেড়েছে ৭শ’ শতাংশ

সমকাল, Wed 22 Dec 2010
গত এক দশকে রাজধানীতে এলাকা ভেদে কাঠা প্রতি জমির দাম বেড়েছে গড়ে ৭০০ শতাংশ। অভিজাত এলাকায় দাম বেড়েছে আরও বেশি। জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণেই ফ্ল্যাটের দাম আকাশছোঁয়া।

Housing in Dhaka


বেসরকারি হাউজিং কোম্পানি শেলটেকের এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল শেলটেক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম সেরাজ। এতে আবাসন খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে ড. তৌফিক বলেন, মূলত জমির অগি্নমূল্যের কারণেই ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে আবাসন একটি সম্ভাবনাময় খাত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। আবাসন খাতের এ সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তার মতে, আবাসন খাতের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়ের অভাব। বিদ্যমান বিধি, আইন ও নীতিমালার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সুষ্ঠু আবাসন শিল্প বিকাশের জন্য সমন্বয় খুবই জরুরি। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু জমি নয়, আবাসন খাতের অন্যান্য উপকরণ ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের দামও বেড়েছে বহুগুণ। গত দশ বছরে ইটের দাম বেড়েছে ৩০০ শতাংশ, সিমেন্ট ২০০ শতাংশ, রড ২৫০ শতাংশ। নির্মাণ সামগ্রীর উচ্চ মূল্যের কারণে ফ্ল্যাটের দামের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার ওপর যোগ হয়েছে জমির দাম। এ প্রসঙ্গে ড. তৌফিক বলেন, ধানমণ্ডিতে এখন প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ১৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমির দামের কারণে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়। ঢাকা শহরে চাপ কমাতে নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ তৌফিক এম সেরাজ বলেন, একটি প্লান পাস করতে রাজউক এক বছর সময় নেয়। অথচ আইনে আছে ৪৫ দিন। এ ধরনের নীতির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, বারিধারায় ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৫০ লাখ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ কোটি টাকা। গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিতে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। মোহাম্মদপুর, উত্তরায় প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা । এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। মিরপুরে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৭ লাখ টাকা, ২০১০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ টাকা। বাসাবোতে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৮ লাখ টাকা, এখন ৩৫ লাখ টাকায়ও সে জমি পাওয়া যায় না। ২০০০ সালে এলাকা ভেদে গড়ে ঢাকা শহরে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত দশ বছরে গড়ে ঢাকা শহরের এলাকা ভেদে জমির দাম বেড়েছে ৭ গুণ বা ৭০০ শতাংশ। ২০০০ সালে প্রতি পিস ইটের দাম ছিল আড়াই টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িছে ৭ টাকা। ২০০০ সালে প্রতি বেগ সিমেন্টের দাম ছিল ১৯৩ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ টাকা। ২০০০ সালে প্রতি টন রডের দাম ছিল ২১ হাজার ৩০০ টাকা, এখন ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত চলি্লশ বছরে বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানিগুলো ১ লাখ ফ্ল্যাট সরবরাহ করেছে। তবে জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় আবাসন সংকট এখন তীব্র। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই সংকট আরও প্রকট। তাই এ শিল্পের রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা।

অভিমতঃ বাড়িভাড়া প্রসঙ্গ

হুসাইন আল জাওয়াদ
বাড়িওয়ালারা ভাড়ার ব্যাপারে কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাদের খেয়াল খুশিমতো ভাড়া নির্ধারণ করেন। বছর যেতে না যেতেই ভাড়াটিয়াদের ওপর চাপিয়ে দেন অতিরিক্ত ভাড়ার নোটিশ। ফলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের মাঝে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। যারা কম আয়ের মানুষ, তাদের হয়তো বাড়িওয়ালার এই অসঙ্গত ভাড়া দিতে না পারায় ছাড়তে হয় বাসা। নয়তো গুনতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। তাদের আয়ের ৬০ ভাগই চলে যায় এই ভাড়ার পেছনে। বাকি টাকা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন চালাতে হয়। এসব মানুষের বেশির ভাগই বেসরকারি চাকরিজীবী এবং কম বেতনভোগী। সরকারি চাকুরেদের বছর বছর বেতন বাড়লেও বেসরকারিদের বেলায় অনেকের ক্ষেত্রেই অন্য রকম নিয়ম। কয়েক বছর পরও বেতন বাড়ান না ওই সব মালিকপক্ষ। বেশির ভাগই তিন থেকে আট হাজার টাকার বেশি বেতন পান না। অথচ অন্যপক্ষে সরকারি একজন পিয়নও এখন পাঁচ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন পান। দেশের ৯৫ শতাংশ লোকই বেসরকারি চাকরিজীবী। সুতরাং শতকরা তিন-চার ভাগ সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ানোর সাথে বাড়িভাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য তরতর করে বেড়ে যায়। যার ভোগান্তির শিকার হয় দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ। এ দিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

বাড়িভাড়ার ব্যাপারে নীতিমালা থাকলেও সে নীতিমালাকে মালিকরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের ইচ্ছামাফিক ভাড়া বাড়াতেই থাকেন। অথবা কেউ সে নীতিমালা সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। এ জন্য কর্তৃপক্ষই দায়ী। ভুক্তভোগী জনগণ এ নীতিমালার প্রয়োগ দেখতে চায়। বেসরকারি নাগরিক সংহতির এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়াকে তাদের আয়ের অর্ধেকই খরচ করতে হচ্ছে ভাড়ার পেছনে।
উচ্চ বাড়িভাড়া ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছে মানবাধিকার সংগঠন। গত ১৭ মে উচ্চ আদালত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করতে সরকারের প্রতি রুলও জারি করেন। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা বলছেন, এতে কোনো লাভ হয়নি। বাড়িভাড়া সংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইনের প্রতি তিন বছর পর আলোচনাসাপেক্ষে এবং বাড়ি সংস্কার করা হলে ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা আছে। কিন্তু তার প্রয়োগ আদৌ দেখা যায় না। নাগরিক সংহতির জরিপে আরো বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের ১৬ শতাংশই বলেছেন, প্রতি ছয় মাস পরপর বাসাভাড়া বাড়ানো হয়। ৪৫ শতাংশ ভাড়াটিয়ার উক্তি, প্রতি এক বছর পরপর ভাড়া বাড়ানো হয়। আর ১৩ শতাংশ বলেছেন, প্রতি এক বছর পরপর ভাড়া বাড়ানো হয় মালিকের ইচ্ছেমতোই।
ক্যাবের এক জরিপে বলা হয়েছে, গত ১৮ বছরে ঢাকা শহরে ভাড়া বেড়েছে ২৮৫ শতাংশ। ১৯৯১ সালের আইনে ভাড়া আদায়ের রসিদ দেয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও কেউ এই আইন মানেন না। (সূত্রঃ প্রথম আলো, ১৫.০৭.১০)

ইত্তেফাকের শিরোনাম ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণহীন’। ১৫ বছরে বেড়েছে তিন গুণ। আইন থাকলেও অকেজো। বাড়িভাড়া বাড়ানো দণ্ডযোগ্য অপরাধ তা জানেন না বহু বাড়ির মালিক। এক শ্রেণীর বাড়িওয়ালা পৌরকর, গ্যাস, বিদুøৎ, পানির মূল্য বাড়ানোর অজুহাতে ঘনঘন অনেকটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাসাবাড়ির ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে নগরীর তিন-চতুর্থাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাড়াটিয়া নির্ধারিত ভাড়া দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মালিক কর্তৃক দুর্বøবহার, পানি দিতে কৃপণতা, ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, পেশিশক্তির ব্যবহার­ এ অভিযোগ বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে। আর ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ জোরপূর্বক বাড়িতে থাকা, নিয়মিত ভাড়া না দেয়া, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ঢাকার একটি জোনের দায়িত্বে থাকা রেন্ট কন্ট্রোলার জানান, নতুন বাড়ি করার পর রেন্ট কন্ট্রোল বিভাগকে জানালে তারা তদন্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করবেন এবং বাড়ির মালিককে সার্টিফিকেট দেয়ার পরই কেবল ভাড়া দেয়া যাবে। এমন আইন দরকার। (ইত্তেফাক, ২৭.০৮.১০)
বাড়িভাড়া বাড়ানো সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করার পরও কোনো বাড়িওয়ালাকে সোচ্চার কিংবা সংশোধন হতে দেখা যায়নি, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাড়িওয়ালারা কেন এবং কোন অসাধু চক্রের ইঙ্গিতে এসব আইনের তোয়াক্কা না করে বাড়িভাড়া বাড়িয়ে চলছেন লাগামহীন, তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল যত দ্রুত বিষয়টি উপলব্ধি করবেন ততই মঙ্গল।
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক, বাংলাবাজার, ঢাকা

%d bloggers like this: