দীর্ঘ প্রবাসবাসে আনমনে যে নস্টালজিয়ার জন্ম হয়, শিকড়ের টানে তা যে কত দৃঢ় এবং কতটা গভীরে প্রোথিত, প্রবাস জীবনে স্বদেশের সাথে গ্রন্থিত রজ্জু যার হৃদয়বৃন্তে নেই, তার পক্ষে এই যন্ত্রণার আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।


ভেতরে কেবলই হিংসার চাষবাস

নাসীর মাহমূদ

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো একটা অবাস্তব অর্থ প্রদানকারী প্রবচনের সাথে অনেকেরই পরিচয় রয়েছে। এই প্রবচনটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েই লাখ টাকার স্বপ্নকে কিছুটা হলেও বাস্তব করে তুলেছিলেন যেই ব্যক্তিটি তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ প্রবাসবাসে আনমনে যে নস্টালজিয়ার জন্ম হয়, শিকড়ের টানে তা যে কত দৃঢ় এবং কতটা গভীরে প্রোথিত, প্রবাস জীবনে স্বদেশের সাথে গ্রন্থিত রজ্জু যার হৃদয়বৃন্তে নেই, তার পক্ষে এই যন্ত্রণার আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কবি নজরুল জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতেন। তার ওই হাসি ফাঁসির মঞ্চেও যে হাসা যায়, তা সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে বুঝতে পারছি প্রবাসে এসে। প্রবাস মানেই যন্ত্রণা, প্রবাস মানেই কষ্ট। এই অবস্থান থেকে যখন বাংলাদেশী হিসেবে গর্ব করার মতো কোনো খবর পৃথিবীময় ছড়িয়ে যায়, তখন নজরুলের ওই হাসিটা একান্ত বাস্তব হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে, ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশ অথবা অহঙ্কারী অস্ট্রেলিয়াকে যখন খেলায় হারায় তখনো তা বাস্তব হয়ে ওঠে। ড. ইউনূসের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি তেমনই এক নজরুলি হাসির বাস্তবতা। প্রবাসে বাংলাদেশীরা যত ভালো পদেই কাজ করুন না কেন, তাদের মর্যাদা তৃতীয় বিশ্ব অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের ঊর্ধ্বে নয়। তবু এ ধরনের গর্ব করার মতো আশ্চর্য সন্দেশ থার্ড ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার মতো একটা আত্ম-পরিতৃপ্তি এনে দেয়। নোবেল বলে কথা, বাংলাদেশী বলে কথা। যারা আমাদের ঝড়ের দেশ, বন্যার দেশ, অভাবের দেশ বলে তাচ্ছিল্যের ভাব দেখায়, তাদের বুক ফুলিয়ে বলতে পারা যায় নতুন সংযোজনীর কথা­ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত দেশ। ড. ইউনূস তখন আর ব্যক্তি থাকেন না, হয়ে যান সমগ্র দেশের কিংবা বলা ভালো সমগ্র বিশ্বের। নোবেল পুরস্কারের বিশ্ব শিরোপা তিন বাঙালি পরলেও ড. ইউনূসকে নিয়ে আমাদের গর্ব আগের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। এই অভিব্যক্তির ফলে যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়াবে তার উত্তরটাও বেশ দীর্ঘ। আজ তা আমাদের আলোচ্য নয়। আলোচ্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেশোত্তীর্ণ এই বিশ্বব্যক্তিত্বকে আমি সুদূর প্রবাস থেকে জানাই সালাম এবং আন্তরিক অভিনন্দন।

দুইঃ হিংসুক শুকায় প্রতিবেশীর সুখে। নিজের নাক কেটে হলেও তাই প্রতিবেশীর সুখ নষ্ট করা চাই। এ রকম অদ্ভুত সব চিন্তা আর প্রবাদ নদীর স্রোতময় ধ্রুপদী সঙ্গীতে ভরা, নিবিড় সবুজে ঘেরা, ফুল-পাখি আর বিচিত্র নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বাংলাদেশে কী করে জন্মাল তা বুঝে আসে না। অজানা সেই লতাতন্তুজাল টেনে বের করা আমার কাজ নয়, আমার বরং দেখতে ইচ্ছে করে ঈর্ষা আর হিংসামুক্ত বাংলাদেশ। যে বৃক্ষটি সাতচল্লিশের কৃত্রিম ঝড়ে দ্বিখণ্ডিত হলো, সেই ঝড় পশ্চিমাংশের জলের দু’পাড়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল দু’টি বীজ। একাত্তরের পর আজ দুই হাজার দশে এসে দেখছি ওপারের বীজটি ফলে-ফুলে সজ্জিত। যদিও অতিথি পাখিরা এসে খেয়ে যাচ্ছে সব। তবু বৃক্ষটির শিকড়জুড়ে আছে পরমাণুর আপাত শক্তি। আর এপারের বীজটি থেকে যে বৃক্ষটি বেড়ে উঠেছিল তার শিকড়জুড়ে ইঁদুরের বসতি। প্রতি কয়েক বছর পরপর তার শেকড় ও ডালপালা কেটে যে যার মতো নিয়ে যাচ্ছে। এখন তাই বনসাই হয়ে আছে সে। আমাদের দেশের মালিরা এই বাগানের সেবার বিচিত্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজে যোগ দিয়ে অবশেষে বাগান উজাড় করে ফেলে। পিতৃত্ব কিংবা যে দোহাই যা দিয়েই কাজে লাগুক না কেন, ভেতরে কেবলই হিংসার চাষবাস। কারো বেশি কারো কম। তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কিংবা বলা ভালো, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেভাবে এখন হিংসার চাষ হচ্ছে, সে রকম বাম্পার ফলন বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে আর হয়নি। সাবাস বাংলাদেশ। হিংসা তাই এখন ডিজিটাল মাত্রা পেয়েছে, অনন্য শিরোপা লাভ করেছে। অনেকেই বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতির হিংসার চাষবাস প্রথমে হয়েছে নির্বাচনে, তারপর পিলখানা হয়ে মইনুল রোডে। আর উৎপাদিত এই হিংসাপণ্য ডিজিটালি পৌঁছে গেছে বাংলার ঘরে ঘরে। চারদিকে তাই এখন হিংসার জয়োল্লাস। হিংসাটা ভয়ঙ্কর। প্রতিবেশীর বাগানে ফুল সুগন্ধি ছড়ায়, আমার কেন তা নেই, তাই ফুলের ওই বাগানটি ধ্বংস করে দিতে হবে­ এরই নাম হিংসা। ঈর্ষাটা কিন্তু মন্দ নয়। প্রতিবেশীর বাগানের মতো আমারও একটি বাগান চাই এবং সেখানেও ফুটুক ফুল, ছড়াক সুগন্ধি­ এই হলো ঈর্ষা। তাই হিংসার বদলে ঈর্ষার চাষ হলে বাগানটা ফুলে-ফলে আরো রঙিন আরো শ্যামল হয়ে উঠত। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ বাড়ির প্রতিইঞ্চি মাটিতে, প্রতিটি ধূলিকণায় এখন হিংসার চাষ। তাই এ মাটিতে গড়ে না কিছুই, কেবলই ভাঙে। ভাঙে বৃক্ষ, ভাঙে বাগান, ভাঙে আবহমান ঐতিহ্য আর স্মৃতিময় ডালপালা। আমরা ভাঙনের এই সংস্কৃতির অবসান চাই। আবহমান এই ভাঙনের পরিবর্তে গড়ার প্রবণতায় ঋদ্ধ সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক আমাদের মন আর মনন­ সে রকম সুস্থতার চর্চা দেখতে চাই। একজনের নোবেল শিরোপা কেড়ে নিয়ে কিংবা তার ওপর নোংরামির নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে অর্জনকে ্লান না করে আমরা আরো বেশি নোবেল অর্জনের চেষ্টা দেখতে চাই। দেখতে চাই আরো অনেক অনেক প্রাপ্তি যোগ। মনে রাখা উচিত, সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয়, দিতে জানতে হয়। সম্মান দেয়ার মাঝে, আচার-আচরণের মাঝে, কথাবার্তার মাঝে মন-মানসিকতা এবং আভিজাত্যের পরিচয় ফুটে ওঠে। যাদের নিজেদের সম্মান-সম্ভ্রমের অভাব আছে, কেবল তারাই আরেকজনের সম্মানের ব্যাপারে তোয়াক্কা করে না। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসবের চর্চা হলে নিু পর্যায়ে যে বেয়াদবির ধারার সূচনা ঘটবে তা বোধ হয় এখন আর কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়। কেননা দেশবাসী এখন নিজেদের সব অস্তিত্ব দিয়ে তা অনুভব করছে। ড. ইউনূস সোনার মেকুরের মতো কারো দুধের বাটি খেয়ে যাননি। বরং একটা ধারণা এনে দিয়েছেন, দিতে চাচ্ছেন। অনেকেই তার সোশ্যাল বিজনেস নিয়ে কিংবা বিদেশীদের ঋণ প্রদান নীতিতে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নেতিবাচক কথা বলছেন। সমসাময়িক অনেক অর্থনীতিবিদকেও দেখছি ড. ইউনূসের নতুন এই বিজনেস না বোঝার ভান করছেন অনেকটা সচেতনভাবে অচেতন থাকার মতো। ড. ইউনূসের সহজ কথাটি হলো­ বিদেশীরা যেসব ঋণ দেয় সেসব টাকা গঠনমূলক কিংবা লাভজনক কোনো কাজে ব্যবহার করার সুযোগ তারা দেয় না। সে জন্য ঋণের ফলে সাহায্যগ্রহীতা দেশের কোনো লাভ হয় না, বরং তার মাথায় ঋণের বোঝা বেড়েই যেতে থাকে। কিন্তু ‘সামাজিক ব্যবসা তহবিল’ সৃষ্টি করা গেলে গ্রহীতা দেশের মধ্যে ওই তহবিলের টাকা ক্রমান্বয়ে বাড়বে, দেশের সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন উদ্ভাবনীমূলক সামাজিক ব্যবসার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ড. ইউনূস বলতে চাচ্ছেন বিদেশী দাতাদের উদ্দেশ করেঃ ‘কর্মচঞ্চল এই হাতে দান নয়, কাজের সুযোগ করে দাও’। এই দৃষ্টিভঙ্গি বা ধারণা দোষণীয় তো নয়ই বরং প্রশংসনীয় এবং ধন্যবাদার্হ বলেই মনে করি।

এবার আসা যাক ড. ইউনূস সম্পর্কে উত্থিত কিছু আপত্তি প্রসঙ্গে। ড. ইউনূস একজন মানুষ, মেধাবী মানুষ। তিনি অতিমানব বা ফেরেশতা নন। তিনি তাই দোষের ঊর্ধ্বে নন। আমরা যারা অপরের দোষ ধরে অভ্যস্ত তারা নিজেদের কথা ভাবি না। একটিবার আত্মসমালোচনা করি না। ড. ইউনূস যা কিছুই করেছেন তা দেশের জন্য অমঙ্গল নয় মঙ্গলই বয়ে এনেছে, সম্মান বয়ে এনেছে। এই সম্মান আর মর্যাদায় দেশের ভেতরে এবং বাইরে অনেকেই হিংসার চর্চা করে থাকতে পারেন। এই চিন্তাটি মাথায় রেখে আমরা কি পারি না কারা এসব করছে, কেন করছে, কাদের ইঙ্গিতে করছে­ সেসব নিয়ে তদন্ত করতে? একটা শ্রেণীকে দেখা যায় ড. ইউনূসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন রকম হাইপোথিসিস দাঁড় করাচ্ছে। কোনো একটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছে কিংবা নিশ্চিত না হয়ে হুট করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে অরুচিকর, হীনম্মন্য, হিংসুক কোনো মন্তব্য করা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা উচিত। বাইরের কেউ এসে আমাদের ঘরের বিষয়ে মাতব্বরি করলে আমাদের সম্মান বাড়ে কী কমে সেটাও কি একবার ভেবে দেখা যায় না? ঘরের উত্থাপিত সমস্যাকে পরের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেদের ভেতরে মীমাংসার পরিবর্তে কারা একে বিতর্কিত ইসুø বানিয়ে বিশ্বব্যাপী আমাদের অর্জনকে ্লান করে দিতে চাচ্ছে তাদের বরং শনাক্ত করা উচিত। নিজেদের ঘরের ব্যাপারে বাইরের কাউকে নাক গলাতে দেয়াই ঠিক নয়। আমাদের ভাবতে হবে, চাঁদের গায়ে দূর থেকে যেসব কলঙ্ক দেখা যায়, সেসব সত্ত্বেও তার জ্যোৎস্নায় কোনোরকম কলঙ্ক থাকে না। আনন্দিত যে ড. ইউনূস তার গায়ের কলঙ্ককে অস্বীকার করার লক্ষ্যে সুষ্ঠু তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। দেশপ্রেমী যেকোনো নাগরিকও তার এই দৃঢ়তায় আনন্দিত হবে সেটাই স্বাভাবিক।
nasir.radio@gmail.com

আর যুদ্ধ নয়: ন্যাশ নাসরীন No More War – Nash Nasrin


আর যুদ্ধ নয়: ন্যাশ নাসরীন No More War – Nash Nasrin ভিডিওঃ জাহান হাসান

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

গাছের গুঁড়ির কান্না কষ্ট দেখে বিরহী বাতাস হুহু করছে, বেদনার্থ বৃষ্টি ঝরছে ঝির ঝির, শোকার্ত পাখি আতঙ্কে চলে যাচ্ছে নিরাপদ নগরে। বাতাস অভিশাপ দিচ্ছে, বৃক্ষ ঘৃণিত-ঘাতককে দেবে না অক্সিজেন।


মানুষ এতো নির্মম নিকৃষ্ট কেনো?

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

Beyond The Mango Juice

Beyond The Mango Juice

প্রবাসী জীবনে নানা কারণে মন খারাপ হয়। সত্যি কয়েকদিন যাবৎ মন খারাপ। ক’বছর পর এবার ঢাকায় ফিরে ধাক্কা খেয়েছি! একী হাল আমার প্রিয় শহরের! গোলাম মোর্তুজা উপস্থাপিত চ্যানেল আই-এর সংবাদপত্র প্রতিদিন অনুষ্ঠানে সেই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভিজে যাচ্ছিল।

দেশের একটি ভালো সংবাদ শুনলে মনটা যেমন আনন্দে ভরে উঠে! আর তেমনি মন্দ সংবাদে বিষণ্ণতা কাজ করে। গত বছর প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা বললেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার।’ হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই তাই। যদি আমরা আরো সচেতন এবং যত্নবান হই, তাহলে এই শ্লোগান বাস্তবায়ন করা মোটেও কঠিন নয়। কারণ, পরিবেশ নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক হয়েছে। সেই আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত এবং ছোঁয়া পাওয়া নানাভাবে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছিলেন, গাছেরও প্রাণ আছে। তাই তাদেরকেও খুন করা হয়। আর সেই খুনের কথা ভেবেই মনটা বিষণ্ণ। যদি সবুজ হত্যার তান্ডবের শাস্তি ৩ বছর এবং ৫০ হাজার অর্থ জরিমানার বিধান পাস হয়েছে। তা-ও মন তৃপ্তি পায় না।
এটিএন বাংলা অথবা এনটিভিতে গত ১৬ নভেম্বর খবরে দেখলাম, উত্তরাঞ্চলে রাতের আঁধারে উঠতি আমের বাগান কেটে সর্বনাশ করে দেয়া হয়েছে। শত শত গাছ ‘লাশ’ হয়ে উপুড় হয়ে মাথা থুবড়ে আছে। বেঁচে থাকলে দু’বছর পর ফলন দিতো।

কোনো মর্মান্তিক এই নিষ্ঠুরতা? মানুষ কেনো এতো নির্মম আর নিকৃষ্ট প্রাণী! এটা কীসের প্রতিহিংসা? এ প্রতিহিংসা ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

রাজনৈতিক প্রশ্নটি এ জন্যই জাগলো যে, ওই বৃক্ষ হত্যার মাত্র একদিন আগেই আম গাছকে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা দেয়া হয়। ১৫ নভেম্বর ২০১০-এ মন্ত্রিসভার বৈঠকে কদম, তমাল, পলাশ, শিমুল, তাল, হিজলকে ছাড়িয়ে ‘আম গাছ’ জাতীয় মর্যাদায় স্বীকৃতি পেলো। যেমন জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় পাখি দোয়েল, তেমনি আম এখন জাতীয় বৃক্ষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর দৃষ্টান্ত আছে। উদাহরণ স্বরূপ- কানাডার মেপল, জাপানে শাকুরা, ভারতে বট, ভূটানে সাইপ্রেস, পাকিস্তানে সেড্রাস ডিওড়ব, লেবাননে সেডর, শ্রীলঙ্কার নাগেশ্বর, সৌদীতে খেঁজুর, কিউবায় রয়েল পাম, আয়ারল্যান্ডে ভূঁইচাপা সারিতে স্থান করে নিলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী আম গাছ। ( দ্র: দৈনিক আমার দেশ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)

নানাভাবে আম গাছকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ- মূল্যায়ণ করা হয়। যেমন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্তগামী হয়েছিল, আবার মেহেরপুর আম বাগানে ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়ে উদিত হয়েছে আরেক সূর্য, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতেও আম গাছের উল্লেখ আছে, উল্লেখ আছে বাল্মিকীর রামায়ন, কালিদাসের মেঘ দূতসহ প্রচলিত ছড়ায়- ঝড়ের দিনে মামার বাড়ি আম কুড়াতে সুখ। এসব ঐতিহাসিক, সামাজিক বিবেচনায় স্বাধীনাতার ৩৯ বছর পর আজ আম গাছ স্বীকৃতি অর্জন করলো। দুঃখজনক হলেও, সত্য তার পরের দিনই আম গাছ নিহত হলো শত্রুর হাতে। মানুষ হয়ে আমরা মিলেমিশে থাকতে পারিনা, অথচ ‘আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাঁড় যেন। মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’ কবি বন্দে আলী মিয়ার এই পঙক্তি থেকে আমরা কী কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করবো না?

শুধু আম গাছের বেদনাই নয়, ঈদের পর পত্র-পত্রিকা নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলাম প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের দুঃসংবাদ!
যেমন: ক॥ ফের গাছ কাটছে জাবি প্রশাসন,
খ॥ ভালুকায় এক হাজার আকাশ মনি কর্তন,
গ॥ বিষ প্রয়োগে ২০০ কবুতর মৃত,
ঘ॥ সরকারি গাছ কেটে সাবাড় করেছে দুবৃর্ত্তরা,
ঙ॥ সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে দুবৃর্ত্তরা।

মন খারাপের মাত্রা কানাডার শীতের মতো বৃদ্ধি পেয়ে মাইনাসে চলে গেল।
প্রথম খবরটি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত সড়ক দ্বীপের ঝাঁউ-দেবদারুসহ ৩০ প্রজাতির গাছ ঈদের ছুটি ফাঁকে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে, কেটে ফেলা হয়েছে শহীদ মিনারে পাশের বট ও কড়ই গাছটিও! (দ্র: বাংলা নিউজ ২৪ ডটকম, ২১ নভেম্বর ২০১০)
‘বৃক্ষহত্যাকারী’ মাননীয় ভিসি শরীফ এনামুল কবির বলেছেন, গাছ নয়, আগাছা কেটেছি! বাহ কী চমৎকার বাজে কথা। তাঁর এক কথার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই।

...maybe global warming needed a simple solution!

...maybe global warming needed a simple solution!

দ্বিতীয় সংবাদটি উৎসস্থল ময়মনসিংহের ভালুকার নারাঙ্গী গ্রামে বিরোধপূর্ণ প্রতিহিংসায় প্রায় হাজার খানেক আকাশ মনি কেটে সাবার করে দিয়েছে প্রতিপক্ষের। (দ্র: গাছের দোষ কী?… দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা) অর্থাৎ বাড়া ভাতে ছাই। অপরদিকে যশোরের মনিরামপুরে বিভিন্ন সড়কের পাশের ৭ লক্ষ টাকার গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তেরা (দ্র: দৈনিক সমকাল, ২২ নভেম্বর, ২০১০, ঢাকা)।

অপর সংবাদটি বৃক্ষ নিয়ে নয়, গৃহপালিত পাখি, কবুতর নিয়ে। নওগাঁর রানী নগর গ্রামে এক ইমাম সাহেব সরিষার সাথে বিষ মিশিয়ে তা খেতে বপন করেছেন এবং তা খেয়ে ২০০ কবুতর গণহারে মারা গেছে। কিন্তু তিনি তা গ্রামবাসীকে পূর্বে অবহতি করেন নি। (দ্র: শীর্ষ নিউজ, ২১ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)। এখন বিশ্ব বাঘ সম্মেলন হচ্ছে। বাঘের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অপরদিকে প্রতিনিয়ত শিকার করে শেষ করা হচ্ছে বাঘ। এ সম্পর্কে নাইবা বললাম। মনে পড়লো,ছোটবেলার কথা। আমাদের গ্রামের আশে পাশে ফলন্ত তরতাজা বেগুন গাছ, সজিব মরিচ ক্ষেত রাতে দুবৃত্তরা কেটে সাবার করে দিতো। ভোর বেলা সেই মৃত বেগুন ক্ষেত দেখে মনটা হু হু করে উঠতো। সে তো পাকিস্তান আমলের কথা। এখন তো আমার সোনার বাংলা। সোনার দেশের মানুষেরা পশুর চেয়ে অধম হচ্ছে কেনো? সেই জন্যই কী রবি ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছেন; রেখেছ বাঙালি করে/ মানুষ করো নি! আমরা কবে প্রকৃত মানুষ হবো?

আরো একটি বিষয় মনে পড়লো,একবার স্থানীয় দুর্বৃত্ত কসাই চামড়ার লোভে আমাদের দু’টো গরুকে রাতের আঁধারে গোয়ালঘরে বিষ মিশানো কাঠালপাতা খাইয়ে মেরে ফেলে। আমরা তা বুঝতে পেরে গরু দু’টো কসাইকে না দিয়ে, চামড়া কেটে কেটে মাটিতে পুতে রাখি। ২ বছর আগে সিলেটের শাহজালাল মাজারে পুকুরের পুরনো কচ্ছপ, শোল, গজার মাছগুলোও কে বা কারা বিষ প্রয়োগ করে মেরেছিল। এসব ঘটনার তো শেষ নেই। আরো পিছিয়ে গেলে দেখবো,স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে মিন্টু রোডের এবং শের-এ বাংলা নগরের বিশাল বিশাল অপূর্ব সবুজতায় পূর্ণ পুরনো বৃক্ষগুলো কেটে সাবার করে দিয়ে ছিলেন। কথিত আছে এরশাদকে গাছ থেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। তাই বৃক্ষ কর্তন উৎসব!

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

বৃক্ষের প্রতি দুর্বলতা আমার আজন্মের। তাই ‘একি কান্ড! পাতা নেই’ শীর্ষক পরিবেশ বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫-এ। এছাড়াও গাছ নিয়ে আমার অনেক কবিতা আছে। আমার মিরপুরস্থ বাসার ‘নীমগাছ এবং কাকবন্ধু’ (দ্র: নীড়ে, নীরুদ্দেশে, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৮, স্বরব্যঞ্জন, ঢাকা) এবং ‘নিমগাছ’ (দ্র: ঘৃণিত গৌরব, প্রকাশকাল এপ্রিল, ২০০৫ জাগৃতি প্রকাশনী,ঢাকা)-কবিতা দু’টো নানা কারণে আমার প্রিয় কবিতা।
আমি ২০০৪-এ ফ্রাস্কফোর্ট বইমেলা থেকে বার্লিন গেছি কবি দাউদ হায়দারের সাথে দেখা করার জন্য। তখন ঢাকায় আমার বাড়ি নির্মাণের কাছ চলছে। হঠাৎ মনে পড়লো, ডেভলপার গাছটি কেটে ফেলবে। আমি দ্রুত বার্লিন থেকে ফোন করে অনুরোধ করি, যেন নিমগাছটি না কাটা হয়। এখনো নীম গাছটি বেঁচে আছে।

হাসিনা সরকার যখন প্রথমবার ক্ষমতায়, তখন বন ও পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী ছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তাঁর প্রটোকল অফিসার হিসেবে কয়েক মাস কাজ করেছি। সে সময় সচিব ছিলেন আহবাব আহমদ। তিনি প্রায়ই আমার পরিবেশ বিষয়ক কবিতা আবৃত্তি করতেন, বলতেন-‘একদিন আমরা সবুজ ছেড়ে বাতাসের ওপারে চলে যাবো।’

হ্যাঁ, বৃক্ষ যে নির্মল বাতাস দিচ্ছে অর্থাৎ অক্সিজেন দিচ্ছে, তার জন্য কী আমাদের কিছুই করার নেই। জিয়া উদ্যান নামান্তরে চন্দ্রিমা উদ্যানের অনেকগুলো গাছ কেটে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। তখনও রাতের আঁধারে সবুজগাছের প্রাণ হরণ করা হয়েছিল। পরদিন প্রাত: ভ্রমণে গিয়ে মতি ভাই অর্থাৎ প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বৃষ্টি ভেজা সকালে করুন দৃশ্য দেখেন এবং পরদিন তাঁর দৈনিকে প্রথম পাতায় একটি মর্মস্পশী প্রতিবেদন লিখেছেন। যা আমাকেও স্পর্শ করে হৃদয়ে নাড়া দেয়। সেই সময় লিখেছিলাম ‘বৃক্ষ কর্তনের পঙক্তি’ শীর্ষক একটি কবিতা। কবিতাটি নিন্মরূপ-
বৃক্ষ কর্তনের শোকে বাতাসগুলো এলোমেলো, পাখিগুলোর মন খারাপ, ছায়াগুলো আর সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হবে না লিলিপুট কিংবা গালিভার। চন্দ্রিমার স্বর্গীয় জোছনায় পরিরা এসে খুঁজে পাবে না মায়াবী রাত্রির ছায়ার স্নিগ্ধতা। বৃষ্টিগুলো বোনের মনের মতো, রোদগুলো ভাইয়ের মতো ‘ভাই-বোন’ খেলবে না পাতাগুলোর সাথে, সবুজ ছাতা হাতে। বাতাস, বৃষ্টি, পাখি, রোদ, ছায়াসমূহ, আর কখনো কানামাছি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুটের আনন্দে মাতবে না চন্দ্রিমা উদ্যান।

গাছের গুঁড়ির কান্না কষ্ট দেখে বিরহী বাতাস হুহু করছে, বেদনার্থ বৃষ্টি ঝরছে ঝির ঝির, শোকার্ত পাখি আতঙ্কে চলে যাচ্ছে নিরাপদ নগরে। বাতাস অভিশাপ দিচ্ছে, বৃক্ষ ঘৃণিত-ঘাতককে দেবে না অক্সিজেন। আজ আর কবিতায় নয়। আজকের কন্ঠের প্রতিফলন ঘটালাম এই সামান্য গদ্যটির মাধ্যমে। লেখাটির সমাপ্তি টানার পূর্বে শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই- রাজশাহীর আম গাছ হত্যাকারীকে নয় বা ভালুকার আকাশমনির খুনীকে নয়, অথবা নওগাঁর কবুতর নিধনকারীকে নয়, প্রশ্নটি শুধু মাননীয় জাবির উপাচার্যকে- স্যার, আপনি কী ভাবে রাতের আঁধারে নিষ্ঠুরভাবে খুন করলেন গাছগুলোকে ?
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল (কানাডা থেকে)

Saifullah Mahmud Dulal

Saifullah Mahmud Dulal

God has cared for these trees, saved them from drought, disease, avalanches, and a thousand tempests and floods. But he cannot save them from fools ~ John Muir আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

ওবামা কি ক্লিনটনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন?


ওবামা কি ক্লিনটনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন?
সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী

ওবামা

ওবামা

আমেরিকার মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের দিন ক্যালিফোর্নিয়ার সেন ডিয়েগো শহরে পেঁৗছালাম। আমাদের দেশের মতো এ দেশে নির্বাচনের দিন ছুটি থাকে না, যে যাঁর মতো কাজ করে যান_শুধু কাজের ফাঁকে একবার ভোট দিয়ে আসেন। যাঁরা বেশি ব্যস্ত বা যেতে অপারগ, তাঁরা ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠান।

সন্ধ্যা থেকে নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করল। টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখানো হলো প্রায় সারা রাত। ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তাঁর দল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে একটা বড় ধাক্কা দিয়েছেন। ওবামাকে সরাসরি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ভোটাররা তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিশেষ করে তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কারনীতিতে সন্তুষ্ট নন। এই চরম মন্দার কালে ভোটাররা তাঁদের চাকরি ও বাড়ি হারাচ্ছেন রেকর্ড-গতিতে। সেখানে ওবামার বিভিন্ন পরিকল্পনা তাঁদের কোনো সহায়তা দিতে পারেনি। তাঁরা নিম্নকক্ষ বা হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের গরিষ্ঠতা রিপাবলিকান পার্টিকে আবারও ফিরিয়ে দিয়েছেন। সিনেটে অতি অল্প সিটের ব্যবধানে ডেমোক্রেটিক দলের হাতে কর্তৃত্ব রেখেছেন। বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান পার্টি থেকে।

ডেমোক্র্যাটদের কেন এই ভরাডুবি? কেন অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ভোটাররা বেশ ক্ষিপ্ত, তাঁদের চাকরি নেই, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তার ওপর ওবামা সরকার যেভাবে বড় ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও গাড়ি কম্পানিকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন_তাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারেনি। আমেরিকানরা প্রাইভেট সেক্টরে বিশ্বাসী ও তারা ‘বড় সরকার’ বা সরকারি হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। কারণ, বড় সরকার মানে বেশি ট্যাঙ্। রিপাবলিকান ও বিশেষ করে তাদের কট্টরপন্থী ‘টি-পার্টি’ আন্দোলন জনগণের এই উষ্মা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সক্ষম হলো। অপরদিকে ডেমোক্র্যাটরা তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নীতিগুলোকে ঠিকমতো তুলে ধরতে পারল না। ফলে যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তা-ই হলো। আমেরিকান ভোটাররা উদারপন্থীদের প্রত্যাখ্যান করে রক্ষণশীলদের আবার কর্তৃত্ব দিলেন। ২০০৬ ও ২০০৮ সালের তুলনায় আমেরিকা আরো ডানে সরে গেল।

অতি কট্টর রক্ষণশীলপন্থী ‘টি-পার্টি’ আন্দোলনকে সারা পলিন বেশ জাগিয়ে তুললেন। তাঁরা রিপাবলিকান দলের মধ্যপন্থীদের কোণঠাসা করে দিলেন। শতকরা ৪০ ভাগ ভোটার তাঁদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এই মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের ফলাফলকে সঠিকভাবে বুঝে শিক্ষা নিতে হবে সব পক্ষকে_ওবামা এবং ডেমোক্রেটদেরও; একই সঙ্গে রিপাবলিকান ও ‘টি-পার্টি’ আন্দোলনের নেতাদের। যাঁরা সঠিক শিক্ষা নেবেন, তাঁদের ভবিষ্যতে লাভ হবে সবচেয়ে বেশি।

নির্বাচনের পরদিন প্রেসিডেন্ট ওবামা এক খোলাখুলি প্রেস কনফারেন্সে স্বীকার করে নিলেন, তাঁর দলের বিরাট পরাজয় হয়েছে, কারণ তাঁরা তাঁদের ভোটারদের অনুভূতি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। ভোটারদের সঙ্গে তাঁদের যে দৃঢ়সংযোগ ছিল, তা দুই বছরের মাথায় হারিয়ে ফেলেছেন। ওবামা আরো স্বীকার করলেন যে তার অর্থনৈতিক সংস্কার নীতিগুলো মন্দা কাটাতে পারেনি। পারেনি তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে।

ওবামা দুঃখিত হলেও হতাশ নন। তিনি ঘোষণা দিলেন, তিনি রিপাবলিকান দলের সিনেট নেতা ম্যাককেইন ও হাউস নেতা বোহনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং সব দলের সঙ্গে মিলেমিশে ভবিষ্যতে কাজ করার দৃঢ়-আগ্রহ দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বীকার করলেন যে কাজটা সহজ হবে না এবং সব ক্ষেত্রে হয়তো ঐকমত্য সৃষ্টি করা যাবে না। আপাতত জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বাবলম্বিতা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করার বিষয়টিই বেছে নিয়েছেন। রিপাবলিকান নেতাদের সরকারের বিপক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেন, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগটিকে তাঁর ভোটাররা ঠিকমতো অনুধাবন করেনি।

তাঁর স্বাস্থ্য ও চিকিৎসানীতির পুরনো বিতর্কে ফিরে যেতে চান না, তবে এ ব্যাপারে কোনো পরিবর্তনে তিনি আলোচনা করতে প্রস্তুত_জানালেন ওবামা। ওবামা আরো স্মরণ করিয়ে দিলেন, প্রেসিডেন্ট রিগ্যান এবং ক্লিনটনও এ ধরনের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনে হেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার তাঁদের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ফিরে পান। কথা হচ্ছে, ওবামা কি ক্লিনটনের দৃষ্টান্ত মেনে নেবেন? ক্লিনটন ১৯৯৪ সালের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের পর তার উদারপন্থী নীতি থেকে সরে গিয়ে মধ্যপন্থা বেছে নিয়েছিলেন। ফলে কখনো তিনি রিপাবলিকানদের সঙ্গে আপস করেন, কখনো বা তাঁদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত খেলা ‘ট্রায়েঙ্গুলেশন’ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খেলেছেন ও তাঁর পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করেছিলেন।

১৬ বছর পর ওবামা কি সেই পথ ধরবেন? এ মুহূর্তে ওবামা তা জনসম্মুখে তুলে ধরতে চান না। এখনো তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে ছোট করে আনতে চান না। মধ্যপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলাতে চান না। কিন্তু রাজনীতিবিদ ওবামা ভালো করেই জানেন, সবার সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনার ভিত্তিতেই তিনি ভবিষ্যতে তাঁর রাজনৈতিক জীবন পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন। তিনি এটাও বেশ ভালোভাবেই জানেন, আমেরিকার জনগণের মতামত খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। অতীতে এর ভিত্তিতেই তিনি বড় বড় নেতাকে হারিয়ে হোয়াইট হাউসে পেঁৗছেছেন। তিনি জানেন, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়েই তাঁকে এগোতে হবে। যেহেতু তাঁর পুনর্নির্বাচনের আর দুই বছর বাকি_রাজনীতিবিদ ওবামা নিশ্চয়ই দক্ষতার সঙ্গে এগোবেন। বাকি সব নেতার মতো তিনিও নিশ্চয়ই তাঁর রাজনৈতিক জীবন কাটাতে সব প্রচেষ্টাই নেবেন। অবশ্য কতটুকু সক্ষম হবেন_তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
লেখক : সাবেক পররাষ্ট্র সচিব

jahan hassan ekush tube bangla desh জাহান হাসান, লস এঞ্জেলেস. বাংলাদেশ. বাংলা, আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, একুশ

বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে : টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা


সিডনির মেলব্যাগ

টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা
অ জ য় দা স গু প্ত

eve-teasing

eve-teasing

বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এখানকার বাঙালী তথা বাংলাদেশীদের মধ্যে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার বিস্তারও লক্ষণীয়। এ বিষয়ে এখানকার তারুণ্য অর্থাৎ ভিন দেশে বড় হওয়া প্রজন্মের মতামত জানাটা মন্দ কিছু নয় বরং জরুরী বটে। এ দেশের মতো পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও খোলামেলা দেশে বেড়ে ওঠা তরুণ-তরুণীদের সম্পর্ক অবারিত। টিজিংয়ের মতো প্রাগৈতিহাসিক বিষয়ের চর্চা চলে না এখানে। তাই বলে এটা ভাবা ঠিক নয়, টিজিং নেই এদেশে। আছে, তবে তা কখনই বিশাল বা মহামারী আকার ধারণ করতে পারে না।

কেন পারে না? সমাজ শৃঙ্খলার প্রশ্নে উদার ও অবারিত জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনও আছে তার যোগ্য ভূমিকায়। গেল হপ্তান্তে আমরা গিয়েছিলাম বিশ্বখ্যাত বন্ডাই বিচে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের টু্যরিস্টে ঠাসা সৈকত। সমুদ্র সৈকত হলেও আয়তনে এক ফালি। কক্সবাজারের তুলনায় শিশু। ওই এক খণ্ড সৈকতে হামলে পড়া সৈকতচারীদের দেখেই বোঝা যায় মানুষ এখানে আসতে কতটা উদগ্রীব। আধুনিক দেশের বিচ কালচার যা, তাই আছে, তারই রেওয়াজ চলছে পূর্ণ মাত্রায়। নগ্ন বক্ষিকা থেকে স্বল্পবাস। কিন্তু কোথাও মানা পেরুনোর অভিপ্রায় বা লক্ষণ দেখা যায় না। আমাদের সাথে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত এক আত্মীয়। আবুধাবিতে জীবনের সিংহভাগ কাটিয়ে দেয়া মানুষটি মূলত রৰণশীল সমাজের প্রত্যক্ষদর্শী। অথচ সে তিনিই নীরবতা ভেঙ্গে মতামত রাখলেন। মুরুব্বি ও অভিভাবক ভদ্রলোকটিকে নিয়ে আমরা কিঞ্চিৎ বিব্রতবোধ করছিলাম। হাজার হোক বাঙালী রক্ত, বাংলা সংস্কৃতির শেকড়ে বসবাস আমাদের। চোখের সহ্য ক্ষমতা পরিমিত, দর্শনের অভিজ্ঞতাও সীমিত। কিন্তু আধুনিক মনস্ক অভিভাবকটি তাঁর যৌক্তিক ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে দিলেন সময়ানুগামী হতে বয়স কোন বাধা হতে পারে না। তাঁর মতে, উদারতার চর্চা আর খোলা হাওয়া বইতে দিলে অন্ধকার বাসা বাঁধতে পারে না। ভয় পায় আঁধারের জীব, ঠিক তাই, সে কারণেই চোখ সওয়া এ সমাজে আক্রমণ ও আগ্রাসনের হার কম। বিচ কালচারে অভ্যসত্ম হতে আগত ষোড়শী থেকে বালিয়াড়িতে চোখ বুজে রোদ শুষে নেয়া বৃদ্ধটি নিরাপদ, নিরাপদ টিনএজ শিশু-কিশোর বা কিশোরী। অবস্থা এমন কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

আমি জানি, এতটা উদারনৈতিক সমাজ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাথেও তা যায় না। কিন্তু হাজার বছরের পুরনো ধ্যান-ধারণাও এখন অচল। সে যুগ যেমন বিগত তেমনি তার প্রভাবও এখন বিলীয়মান। মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি ও সভ্যতা এখন গলাগলি সম্পর্ক। তারা চলছে পরস্পরের হাত ধরে। ঘরে ঘরে উঁকি দেয়া, জানালা-দরজা খুলে ঢুকে পড়া বিশ্বায়নে পৃথিবী এসেছে হাতের মুঠোয়। এরও দুটো দিক। একদিকে বিজ্ঞান ও আধুনিকতা অন্য প্রান্তে অন্ধকার আশ্রিত বাণিজ্য। দেশের তারুণ্য দুটোকেই গ্রহণ করছে। শেষেরটার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণও তাই স্বভাবধর্ম। এ স্বভাবকে বাগে আনতে হলে, পোষ্য করে রাখতে হলে তাকে আধুনিক জীবনের প্রতি যত্নবান ও উৎসাহী করে তোলার বিকল্প দেখি না। পঞ্চাশ ষাট দশকের পুরনো সমাজও রৰণশীলতার আবরণে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট যাপিত জীবন যেমনি অসম্ভব, তেমনি অবাস্তব।

এ জায়গাটিতে প্রবাসী প্রজন্মের উদাহরণ অবশ্যই সাহায্য যোগাতে পারে। এদের প্রথম দর্শনে উদভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, শৃঙ্খলাহীন, অতি খোলামেলা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এদের সংস্পর্শ, সংযোগ ও কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলে এ ধারণা বদলে যেতে বাধ্য। সিংহভাগই ছুৎ বাই ছেলেমেয়ের প্রভেদ রেখাসহ কুসংস্কার মুক্ত মুক্তমনের তরম্নণ-তরম্নণী। এদের বন্ধুত্ব নির্মল, সখ্য পাপহীন, পাপহীন বলেই তারম্নণ্য ভেদ জানে না। এক সাথে ঘুরে বেড়ায়, এক পাতে আহার করে, এক টিকেটে উড়ে বেড়ায়। দেশে যা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। সবকিছু হচ্ছে, হবেও। তবু একটা দেয়ালের মধ্যেই বসবাস করে চলেছে তারা। সে দেয়ালটির অনেক নাম, কখনও সে সমাজ, কখনও সে রাজনীতি, কখনও ইভটিজিং, কখনও বা আত্মহনন।

সমাজ বিনির্মাণ বা ভেঙে গড়ার কাজটি যাদের হাতে সেই সব খ্যাতিমান ও তালেবর ব্যক্তিরা বিদেশে আসেন, দেখে যান, কিন্তু তা কাজে লাগাতে চান না অথবা অনিচ্ছুক। সে প্রয়োজনও নেই তাঁদের। এঁদের সন্তান-সন্তুতি মূলত প্রবাসী। উদার দেশের উষ্ণতা নিয়ে বড় হওয়া ভিনদেশী বাঙালী, সমস্যার জায়গা অর্থাৎ মাতৃভূমিতে বড় হওয়া তারুণ্য উচ্ছন্নে গেলেও কি ভাল পথে থাকলেই বা কি! কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, চলেও না। জাতিগত পরিচয়, জন্ম, পিতা-মাতা বা অন্য যে কোন সূত্রে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ দেশ ও প্রবাসী প্রজন্মের মতবিনিময়, ভাব বিনিময় ও ঐক্য আজ জরুরী। এরা এক সাথে মিললে ইভটিজিংয়ের মতো দৈত্য পরাভূত হতে বাধ্য। সহজ হয়ে উঠবে অনেক সমস্যার সমাধান, মেলানোর দায়িত্বটা কি কেউ নেবেন?

’৭২-এর ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে এম এ জলিলের রাজনীতিতে পদার্পণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা


মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার উজিরপুর থানা সদরে মামার বাড়িতে মেজর জলিলের জন্ম। এর তিন মাস আগেই পিতা জনাব আলী মারা যান।

শুরু থেকে তিনি জীবনের কঠোরতার মুখোমুখি হন। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসাই ছিল তার একমাত্র পাথেয়। ১৯৬০ সালে মেজর জলিল উজিরপুর ডব্লিউবি ইনস্টিটিউশন থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন। ওই সময় তিনি পথের কাঙাল ও রীতি নামে দু’টি উপন্যাস লেখেন। তবে পাণ্ডুলিপি দু’টি হারিয়ে যায়।

১৯৬১ সালে জলিল ইয়াং ক্যাডেটে ভর্তি হন। পাকিস্তানের মারিতে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কাকুলে সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কমিশন লাভ করেন এবং আর্টিলারিতে যোগ দেন। ওই বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ১২ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে মেজর জলিল সামরিক একাডেমি থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। পরে তিনি মুলতান থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি নেন। অসুস্থ মাকে দেখতে এক মাসের ছুটি নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে আসেন।

২৫ মার্চের কালরাত পাকিস্তানের চেহারাটাই পাল্টে দেয়। ২৬ মার্চ থেকেই মেজর জলিল মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বরিশাল ও পটুয়াখালীকে তিনি মুক্ত অঞ্চল হিসেবে রাখতে সক্ষম হন। ৭ এপ্রিল মেজর জলিল খুলনা রেডিও স্টেশন মুক্ত করতে অপারেশন চালান। ২১ এপ্রিল অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সুন্দরবনের পথ ধরে ভারতে যান। ফিরে এসে ৯ নম্বর সেক্টরের প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮ ডিসেম্বর বরিশালে মেজর জলিলকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ২১ ডিসেম্বর বরিশাল হেমায়েত উদ্দীন খেলার মাঠে বিশাল জনসভায় তিনি ভাষণ দেন। এই দু’টি জনসভায় অভূতপূর্ব লোক সমাগম হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সম্পদ ও পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র লুটপাট করে নিয়ে যেতে থাকে। যশোরে লুটের মাল বয়ে নেয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িবহরকে বাধা দেয়ায় ৩১ ডিসেম্বর মেজর জলিলকে গ্রেফতার এবং যশোর সেনানিবাস অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি নির্জন বাড়িতে তাকে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ

১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মেজর জলিল মুক্তি লাভ করেন। সেক্টর কমান্ডারদের প্রায় সবাইকেই খেতাব দেয়া হলেও তাকে বঞ্চিত করা হয়। ’৭২-এর ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে এম এ জলিলের রাজনীতিতে পদার্পণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

১৯৭৩ সালে সংসদ নির্বাচনে বরিশালের বাকেরগঞ্জ-উজিরপুরসহ পাঁচটি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তার বিজয় ছিল নিশ্চিত। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তাকে বিজয়ী হতে দেয়নি। বলা যায়, রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন মেজর জলিল। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি করলে জাসদের বহু নেতাকর্মী নিহত হন। মেজর জলিল নিজেও হন আহত। তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ২৩ নভেম্বর তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুøনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য মেজর জলিলের মৃতুøদণ্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রায় সাড়ে চার বছর কারাভোগের পর ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে তিনি টাঙ্গাইলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা সায়মা আকতারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা সারাহ ও ফারাহ।

১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর তিনি জাসদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তার কৈফিয়ত ও কিছুকথা গ্রন্থে লিখেছেনঃ ‘দলীয় জীবনে জাসদের নেতাকর্মীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়ার ফলে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধে পরিচালিত সমাজদেহ থেকে নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সমাজে বসবাসরত জনগণকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি সাংস্কৃতিক জীবন এবং মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মোটেও সক্ষম হয়নি। প্রচলিত পারিবারিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনধারা থেকে কেবল নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখলেই বিকল্প সংস্কৃতি জন্ম নেয় না, বরং এ ধরনের রণকৌশল অবলম্বন সমাজে প্রচলিত নীতি, নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি তাচ্ছিল্য, উপহাস ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবী আন্দোলনের বিপক্ষে চলে যায়।

‘ইসলাম ধর্ম এ দেশের শতকরা ৯০ জন গণমানুষের কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়, ইসলাম ধর্মভিত্তিক নীতি-নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-পর্ব, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং এ দেশের সাধারণ গণমানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনার সাথে ইসলাম ধর্ম অঙ্গাঙ্গিভাবেই জড়িত। জন্ম-পর্ব থেকে শুরু করে জানাজা পর্যন্ত ইসলামের নীতি-নির্দেশের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন। এমন একটি জীবন দর্শনকে অবহেলা, উপেক্ষা কিংবা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে চলার নীতিকে বাস্তবসম্মত কিংবা বিজ্ঞানসম্মত বলা যায় না। প্রগতিশীল আন্দোলনের স্বার্থেই ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন অত্যাবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি। কারণ ইসলাম শোষণ-জুলুম, অন্যায়, অসুন্দরসহ সব রকম স্বৈরশাসন এবং মানুষের ওপর প্রভুত্বের ঘোর বিরোধী। ইসলাম পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, রাজতন্ত্র উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ সব সম্পদের মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই। মানুষ হচ্ছে তার কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমানতদার বা কেয়ারটেকার।’

মেজর জলিল এমন কিছু গ্রন্থ লিখে গেছেন, যা আমাদের জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণে দিকনির্দেশনার কাজ করবে। তার একটি গ্রন্থের নাম অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা দেশপ্রেমের বলিষ্ঠ ও উচ্চকিত স্লোগানে রূপান্তরিত হয়েছে। তার লেখা আটটি গ্রন্থ হলোঃ ১. সীমাহীন সমর (মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ডায়রি), ২. মার্কসবাদ (প্রবন্ধ), ৩. সূর্যোদয় (রাজনৈতিক উপন্যাস), ৪. কৈফিয়ত ও কিছু কথা (প্রবন্ধ), ৫. দাবী আন্দোলন দায়িত্ব (প্রবন্ধ), ৬. দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন দর্শন (প্রবন্ধ), ৭. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (প্রবন্ধ), ৮. A Search for Identity (Essays)..
জাসদ থেকে পদত্যাগের মাত্র ১৬ দিন পর মেজর জলিল ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন। এ সময় তিনি মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে গৃহবন্দী করা হয়। এক মাস ছিলেন বন্দী। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকার তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখে। এর আগে মেজর জলিল লিবিয়া, লেবানন, ইরান, ব্রিটেন ও পাকিস্তানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৮৮ সালের ১১ নভেম্বর মেজর জলিল পাকিস্তান যান। ১৬ নভেম্বর রাজধানী ইসলামাবাদে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ২২ নভেম্বর তার লাশ ঢাকায় আনা হয়। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেজর জলিলের লাশ দাফনের মাধ্যমে মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে লাশ দাফন শুরু হয়েছে। তিনি মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা রেখে গেছেন।