প্রগাঢ় বেদনা চোখে নিয়ে/বন্ধু এসে বলে আজ তার/সাহায্য যে কতো দরকার/যখন মৃত্যুপুরী তারই দেশ। গিটারের সাহায্যে হৃদয় নিংড়ে দেওয়া আকুতি যিনি প্রকাশ করে গেছেন তার কি মৃত্যু আছে!


বাংলাদেশের বন্ধু
একরামুল হক শামীম

George Harrison

George Harrison

“When you’ve seen beyond yourself, then you may find, peace of mind is waiting there.” ~ George Harrison

বাংলাদেশ বাংলাদেশ_ পাশাপাশি বসিয়ে সুর দিলেই যে মানুষটির কথা মনে পড়ে তিনি জর্জ হ্যারিসন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বুঝেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের হাহাকার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্বাস্তু মানুষদের সহায়তার জন্য একটি কনসার্ট আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন রবিশঙ্কর। সেই ভাবনা জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগেই বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। জর্জ হ্যারিসন উদ্যোগী হয়ে জোগাড় করেছিলেন শিল্পীদের, নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেন ভাড়া নিয়েছিলেন। নিজের ম্যানেজার এলন ক্লাইনকে পুরো অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। হ্যারিসন পরে লিখেছেন, বাংলাদেশের যুদ্ধাবস্থা ও উদ্বাস্তুদের দুর্ভোগ সবাইকে উপলব্ধি করানোর জন্যই বাংলাদেশ গানটি লিখেছিলেন তিনি। এ রকম একটি গান লেখার প্রস্তাব করেছিলেন লিয়ন রাসেন। তিনবার খসড়া শেষে তৈরি হয় সেই গান : প্রগাঢ় বেদনা চোখে নিয়ে/বন্ধু এসে বলে আজ তার/সাহায্য যে কতো দরকার/যখন মৃত্যুপুরী তারই দেশ।

১৯৬৬ সাল থেকেই রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের বন্ধুত্ব। রবিশঙ্করের কাছ থেকে সেতার শেখেন হ্যারিসন। বন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আয়োজন করেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী এক কনসার্টের_ কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ওই একবারই জর্জ হ্যারিসন তার তারকাখ্যাতি ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করেছিলেন এবং তা করেছিলেন বাংলাদেশের জন্যই। এর জন্যই মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীখ্যাত শিল্পীদের এক মঞ্চে হাজির করা সম্ভব হয়েছিল। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ হাজির হয়েছিলেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল ও রিঙ্গো স্টারের মতো শিল্পীরা। সুরের ঝঙ্কারে মাতিয়ে দিয়েছিলেন উপস্থিত শ্রোতাদের। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর এই কনসার্টই ছিল হ্যারিসনের সরাসরি অংশগ্রহণ করা প্রথম অনুষ্ঠান। কনসার্টের গানের একটি সংকলন কিছুদিন পরেই ১৯৭১ সালে বের হয় এবং ১৯৭২ সালে এই অনুষ্ঠানের একটি চলচ্চিত্র প্রকাশিত হয়। কনসার্ট ও অন্যান্য বিষয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২,৪৩,৪১৮.৫১ মার্কিন ডলার, যা ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থীদের সাহায্যার্থে প্রদান করা হয়। পরে ২০০৫ সালে নতুন আকারে ডিভিডি প্রকাশ পায়। তাছাড়াও ১৯৮২ সালে একটি মার্কিন টিভি অনুষ্ঠানে জর্জ হ্যারিসন কয়েক লাখ ডলারের একটি চেক তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের শিশুদের জন্য।

১৯৪৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন জর্জ হ্যারিসন। তাকে বিশ্ববাসী চিনেছে বিটলসের একজন হিসেবে। চার বিটলস সদস্যের অন্যতম হ্যারিসন। মূলত তিনি বিটলস ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬০-এ শুরু হয়েছিল বিটলস নামের ব্যান্ডের যাত্রা। কয়েক বছরের মধ্যেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে বিটলস। সঙ্গীত যে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রাকে, সমাজ ও রাজনীতিকে নতুন স্রোতে প্রবাহিত করে দিতে পারে, তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল বিটলস। ১৯৭০ সালে ভেঙে যায় পৃথিবীখ্যাত এই ব্যান্ড দল। তারপরও একক শিল্পী হিসেবে জর্জ হ্যারিসনের খ্যাতি থেমে থাকেনি। ব্যক্তিগত জীবনে জর্জ হ্যারিসন কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। কিছুটা রহস্যাবৃত থাকতেই ভালোবাসতেন তিনি। জন লেনন বলেছিলেন, জর্জ নিজে কোনো রহস্য নয়, কিন্তু ওর ভেতরে তো অনন্ত রহস্য।

The Concert for Bangladesh

The Concert for Bangladesh

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্য জর্জ হ্যারিসন কতটা করেছিলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই ভাবনা কখনও হয়নি। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের কথা, বাংলাদেশের মানুষের কথা। বিশ্ববাসীর সাড়া মিলেছিল দ্রুত। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে জর্জ হ্যারিসন কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান পাননি। কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হ্যারিসনকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। হাজার মাইল দূরে থেকে যে দেশটির জন্য প্রগাঢ় মমতায় সুরের আশ্চর্য ঝঙ্কার তুলেছিলেন নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে, সেই দেশ দেখার সুযোগ মেলেনি তার! অবশ্য বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি একটি উদ্যোগ নিয়েছে_ মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা প্রদান। দেরিতে হলেও এটি একটি শুভ উদ্যোগ।

২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। বিটলস ব্যান্ডের একটি গানের শিরোনাম_ ‘হোয়েন আই অ্যাম সিক্সটি ফোর।’ কিন্তু সেই ৬৪-এর আগেই পৃথিবী ছেড়েছেন হ্যারিসন। কিন্তু গিটারের সাহায্যে হৃদয় নিংড়ে দেওয়া আকুতি যিনি প্রকাশ করে গেছেন তার কি মৃত্যু আছে! আজও তিনি স্মরণীয়। বাংলাদেশের মানুষ আজও তাকে স্মরণ করে পরম কৃতজ্ঞতায়।
The Concert For Bangladesh was the event title for two benefit concerts organized by George Harrison and Ravi Shankar, held at noon and at 7:00 p.m. on August 1, 1971, playing to a total of 40,000 people at Madison Square Garden in New York City. Organized for the relief of refugees from East Pakistan (now independent Bangladesh) after the 1970 Bhola cyclone and during the 1971 Bangladesh atrocities and Bangladesh Liberation War, the event was the first benefit concert of this magnitude in world history. It featured an all-star supergroup of performers that included Ravi Shankar, Bob Dylan, Eric Clapton, George Harrison, Billy Preston, Leon Russell, Badfinger, and Ringo Starr.

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

Advertisements

প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?


প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?

মঈনুল আলম

আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘ক্ষমা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে আইনমন্ত্রী বলেন, অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর হয় তো জানা নেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে তার শাসনামলের শুরুর দিকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এ জাতিকে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’তে প্রবেশ করিয়েছিলেন। তারপর এ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক প্রয়োগ করেছে আওয়ামী লীগ।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দেখিয়ে অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান খুনের অপরাধে মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালতে সে মৃতুøদণ্ড বহাল থাকা অবস্থায় ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমা করে তাদের মুক্তি দিয়ে ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার’ অপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মুক্তিপ্রাপ্ত মৃতুøদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে তাদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র প্রতি আওয়ামী লীগের উচ্ছ্বসিত সমর্থনের প্রকাশ্য প্রদর্শন বা ‘পাবলিক ডিসপ্লে’ করে। এর দেড়-দুই মাসের মাথায় মহাজোটের আইনমন্ত্রী ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ার’ কথা বললেন কেন? এতে ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমাকারী মহান ব্যক্তিটির মনে কি এমন প্রশ্ন আসবে না যা মধ্যযুগীয় এক কবি এই পদ দিয়ে ব্যক্ত করেছেনঃ ‘আমি গাই কী, আর আমার সারিন্দা বলে কী?’ ২৪ অক্টোবর নয়া দিগন্ত-এ প্রকাশিত আমার ‘মহাজোট সরকারের সুমতি হচ্ছে?’ শীর্ষক লেখাটিতে বলেছিলাম, ‘এই আইনমন্ত্রী প্রায় নিজেই বোঝেন না তিনি কী বলছেন।…’ আইনমন্ত্রীর উপরোল্লিখিত বয়ান থেকে অনেকেই আমার মন্তব্যটিকে সঠিক বলেই ধরবেন।

‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি’র অনুসরণে মহাজোট সরকার এ বছরের প্রথম দিকে খুন ও অন্যান্য জঘন্য অপরাধে বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগরত কয়েক হাজার দাগি অপরাধীর অবশিষ্ট কারামেয়াদ ক্ষমা করে দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিয়েছে। মিডিয়াতে সে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি হতে দেশে হত্যা, গুম, ডাকাতি, ভূমিদখল, শিক্ষক পেটানো, সাংবাদিক পেটানো, অ্যাডভোকেট পেটানো, পুলিশ পেটানো, ইভটিজিং ইত্যাদি অপরাধ দারুণভাবে বিস্তার লাভ করেছে। মহাজোট সরকারের কারাগার থেকে হাজারে হাজারে কয়েদি ছেড়ে দেয়াকে দেশে ব্যাপকভাবে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র এমন সব অপূর্ব দৃষ্টান্তের পর বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী হঠাৎ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে আনার তাগিদের কথা বললেন কেনো? ভাষার ভাবধারায় ‘ক্ষমা’র বিপরীত শব্দ হচ্ছে ‘প্রতিশোধ’ অথবা ‘প্রতিহিংসা’। ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে এনে তিনি কি তার বিপরীত সংস্কৃতি অর্থাৎ ‘প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার সংস্কৃতি’র দিকে জাতিকে চালানোর ইশারা দিলেন?

বাকশালে ফিরে আসার ইঙ্গিত?
আইনমন্ত্রী বারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ফলে ‘সামরিক শাসন ও মার্শাল ল’ বলতে কিছু নেই। এ রায়ে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।’ কিন্তু ক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে যে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, সেই চতুর্থ সংশোধনীর কী হলো?

সেই কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী বাতিল না করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে যাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবীসহ একাধিক আইনজীবী বলেছেন, হাইকোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও চতুর্থ সংশোধনীর বাকশাল ব্যবস্থা পুনর্বহাল বা নাবহাল সম্পর্কে কিছু বলেননি। ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের সাথে সাথে ’৭২ সালের আদি সংবিধান পুনঃস্থাপিত হয়েছে। এতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে’ বলে কতৃর্êস্থানীয় মহল থেকে যা বলা হচ্ছে, পর্যবেক্ষক ও আইন-অভিজ্ঞ মহল তাকে অত্যন্ত ‘সরলীকৃত’ উক্তি বলে মনে করছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, আপিল বিভাগের রায়ে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটি কি বাতিল হয়ে গেছে? নাকি সামরিক বিধির যে ধারাগুলোকে জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে বলে রায়ে বলবৎ রাখা হয়েছে, তাতে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধি ধারাটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? রায়ের যতটুকু মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে এ ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ‘বাকশালের চিন্তা-চেতনা ও দর্শনকে আমরা এখনো ধারণ করি। একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে বাকশালের চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা কাজ করতে চাই’ বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে তা দেশ ও জাতির জন্য অশুভ সঙ্কেত রূপে প্রতিভাত হচ্ছে।

আপিল বিভাগের রায়ের ফলে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটিও বাতিল হয়ে গেছে, যার ফলে দেশে ‘থিওরিটিক্যালি’ বাকশাল ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, যদিও মহাজোট সরকার এখন প্রকাশ্যে তা বলছে না। ক্ষমতাসীন মহল থেকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা দেশবাসীকে একটি ভ্রান্তিতে রাখার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, আসল উদ্দেশ্য হলো­ সময় ও সুযোগ বুঝে সংবিধানে একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মহাজোট পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশে বাকশালীয় ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে­ এই যুক্তি দেখিয়ে বাকশালের অনুরূপ একটি শাসনব্যবস্থা জারি করতে পারে দেশে।

দেশবাসী ভোলেনি, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র­ এই চারটি আদর্শের ওপর প্রণীত বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি পার্লামেন্টারি পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির একদলীয় বাকশাল সরকার প্রবর্তন করে দেশের পদাসীন প্রেসিডেন্টকে বরখাস্ত করে নিজে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটির এমন অভাবিত লাঞ্ছনা দেখে সেদিন জাতি হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

একই সাথে দেশে শুধু একটিমাত্র রাজনৈতিক দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে গেল! বাকশাল নামীয় নবগঠিত দলটির সদস্যরা ব্যতীত বাংলাদেশের আর কোনো নাগরিকের জন্য রাজনীতি করা বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে হিটলার যেমন তার দল নাৎসি পার্টিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে এবং ইতালিতে মুসোলিনি তার দলটিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে দেশে ফ্যাসিস্টিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একনায়কত্ব কায়েম করেছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার তৃতীয় উদাহরণ স্থাপন করল।

বিধান জারি হয়েছিল, জাতীয় সংসদের তৎকালীন কোনো সদস্য প্রস্তাবিত বাকশাল দলটিতে যোগদান না করলে তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের মৌল গণতান্ত্রিক অধিকারের কী জঘন্য লঙ্ঘন!!
এই ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কার্যকর করার ব্যাপারে কোনো বিচার করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের থাকল না এবং এ ব্যবস্থার পর্যালোচনা অথবা সমালোচনা করার কোনো অধিকার সংসদের থাকল না। কী অকল্পনীয়ভাবে বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং সংসদের সার্বভৌমত্বকে হরণ করা হলো!

আরো বিধান করা হয়েছিল, বাকশালব্যবস্থার কোনো সমালোচনা করা যাবে না। তার পরও অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনা-সমালোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য সরকারের মালিকানায় চারটি দৈনিক সংবাদপত্র রেখে দেশের সব সংবাদপত্র ও পত্রপত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল! কী বিবেকবর্জিত আঘাতে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধূলিসাৎ করা হলো!

একই সময়ে আদেশ-নির্দেশ দিয়ে এবং বাকশালী ‘দালাল’দের দিয়ে ভয় দেখিয়ে অথবা প্রলোভন দিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যদের, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, শিক্ষায়তনের শিক্ষক ও কর্মচারীদের এবং ছাত্রছাত্রীদের, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকর্মীদের, শিল্পকারখানা ও পরিবহন শিল্প ইত্যাদির শ্রমিক-কর্মচারীদের, কৃষিজীবীসহ সব পেশাজীবীকে বাকশালের সদস্য হতে বাধ্য করা হয়েছিল। বস্তুত আওয়ামী লীগের এসব কর্মকাণ্ড দিয়ে দশ কোটি মানুষের ত্যাগে অর্জিত প্রাণের বাংলাদেশ বাস্তবে ‘বাকশালদেশ’-এ পরিণত হয়েছিল।

সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সত্য হলো, সামরিক শাসন এবং তার অনুসরণে একাধিক স্বৈরশাসনের বদৌলতে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে, সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বিচার বিভাগ তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে, যার ফলে হাইকোর্ট আজ এই রায়ে সামরিক শাসনগুলো অবৈধ ছিল বলে রায় দিতে পেরেছেন। বাকশাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সামরিক শাসন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ এবং ‘ফেইট অ্যাকমপ্লি’র যুক্তিতে অপরিহার্য হয়েছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আপিল বিভাগের রায়ে সামরিক বিধির যে ধারাগুলো জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলবৎ রাখা হয়েছে। বাকশাল শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটানো কি জনস্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না? রায়ে এ প্রশ্নটির উত্তর দেখা যায় না। সামরিক শাসন যদি সব সময়েই অবৈধ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যাতে সামরিক শাসন আসতে না পারে তার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত বিধান আনতে হবে। যেটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে তা হলো­ কোনো রাজনৈতিক সরকার যেন কোনোভাবেই এবং কোনো অজুহাতেই নির্যাতনকারী স্বৈরশাসন অথবা চরম নিপীড়নকারী একনায়কত্ব অথবা একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, সংবিধানে তার কার্যকর নিষেধ-বিধান থাকতে হবে। পাশাপাশি যে রাজনৈতিক সরকার দেশে একনায়কত্ব অথবা বাকশাল নামে একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জারি করেছিল, তাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে এমনভাবে শাস্তি দিতে হবে, যাতে তাদের মুখে বাকশাল ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা আর উচ্চারিত না হয়।
লেখকঃ প্রবীণ সাংবাদিক, ও কলামিস্ট