প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি


প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি

এম এম মুসা ‘ভোট ও ভাতের অধিকার দারিদ্র্যবিমোচনের হাতিয়ার’ এই স্লোগানকে ধারণ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ‘দিনবদলের সনদ’ নামে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ইশতেহারে ২৩ দফা কাজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসা, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি বন্ধ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূরীকরণ, দারিদ্র্যবিমোচন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, প্রশাসনিক গতিশীলতা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম অঙ্গীকার। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাঁচটি বিষয়সহ ২৩ দফা প্রতিশ্রুতির সবকটিতেই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং দিয়ে যাচ্ছে সরকার। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। গত বছরের জুন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কোনো সময়ই খাদ্যমূল্যস্ফীতি নয় শতাংশের নিচে নামেনি, কখনো কখনো এটি ১০ শতাংশের উপরে উঠেছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী সেপ্টেম্বরে খাদ্যমূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে নয় দশমিক ৭২ শতাংশ। মহাজোট ক্ষমতা নেওয়ার সময় যে মোটা চাল বিক্রি হতো ২৪ টাকায় এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ৩৩ টাকায়। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। এ সময়ে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ও বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত, বিশ্ব দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, অকার্যকর সংসদ, প্রশাসনে দলীয়করণ, কর্মকর্তাদের মারধর, গণপিটুনি, যৌনসন্ত্রাসহ হেন জায়গা নেই যেখানে পরিস্থিতি খারাপ হয়নি।


আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার। মজুদদারি-মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া ও টিসিবিকে শক্তিশালী করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার বাস্তবায়ন হয়নি। মজুদদারি-মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দেয়া আশ্বাস শুধুই কথায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। টিসিবিকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দলঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ ও অতিরিক্ত দামে খাবারের অনুপযোগী পণ্য আমদানি করা হয়েছে। দুই বছরে মোটা থেকে সরু-সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের প্রকাশিত তথ্যমতে, মজাজোট ক্ষমতায় আসার প্রথম সপ্তাহে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ছিল ২৪-২৫ টাকা যা এখন ৩২-৩৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরু চালের দাম ছিল ৩২-৪০ টাকা যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৬-৪৮ টাকায়। মহাজোট ক্ষমতা নেওয়ার সময় প্রতি কেজি আটা ও ময়দা বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ২২-২৭ এবং ২৮-৩২ টাকায়, এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ২৮-৩২ ও ৩৩-৩৮ টাকায়। ৭০ টাকা লিটারের সয়াবিন তেল এখন ১১৩, ৩০ টাকা কেজির চিনি ৬০, ৮০ টাকা কেজির ডাল ১২০, ২০ টাকার পেয়াজ ৫০, ৩০ টাকা কেজির রসুন ২০০, ৪০ টাকার আদা ১৮০ এবং ১৬০ টাকার গরুর মাংস ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রায় দুই বছরে ভোগ্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম ১০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

২০১৩ সালের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে চার কোটিতে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দুই বছরে সেটি বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও’র হিসাব অনুযায়ী, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ছয় কোটি এক লাখ মানুষ ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে কম খাদ্য গ্রহণ করে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের আট কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে যাদের দৈনিক আয় এক দশমিক ২৫ ডলারের কম। এই সংখ্যা আগামী বছর আরো বাড়বে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের দারিদ্রে্যর মাত্রা কমপক্ষে এক শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে দুই বছরে নতুন প্রায় আট হাজার লোক কোটিপতির তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তাহীন দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন খাতে সরকারের দিনপ্রতি মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র সাড়ে ছয় টাকা। এ সময়ে কাবিখা, ভিজিডি, ভিজিএফ প্রভৃতি কার্যক্রমে দলীয় কর্মীদের প্রাধান্য ও খাবারের অযোগ্য খাদ্য সরবরাহ করায় বিক্ষোভ করেছে মানুষ। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দুই কোটি ৮০ লাখ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দুই কোটি ৪০ লাখে নামিয়ে আনবে। কিন্তু জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী দুই বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে ২০ লাখ।

বিশ্বমন্দার প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ। প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায়, বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি, কমেছে জনশক্তি ও পণ্য রফতানি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে জনশক্তি রফতানি কমেছে প্রায় চার লাখ। ২০০৯ সালের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ৭৭ হাজার ২৩৮ জন শ্রমিক কম বিদেশ গেছেন। অপরদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন বিদেশ থেকে ৩৬ হাজার ৩৫ জন শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। জনশক্তি রফতানি হ্রাস ও বিদেশ থেকে শ্রমিক ফেরত আসার কারণে চলতি অর্থবছরের জুন থেকে রেমিট্যান্সের গতি নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ২২৬ কোটি নয় লাখ টাকা কম রেমিট্যান্স এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ আয়ের টাকা, পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূল করার কথা ইশতেহারে উল্লেখ থাকলেও প্রথম বাজেটেই সরকার অবৈধ ও কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ প্রদান করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবনমন, টেন্ডারবাজি ও দখল, ঋণখেলাপিদের পুনর্বাসন, চাঁদাবাজি, জমি দখল এখন নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দুদক আইন সংশোধন করে এর স্বাধীনতা ও ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ এবং প্রতিষ্ঠানটিকে বিরোধী রাজনীতিকদের নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত থাকলেও দুদক নীরব। কমিটি করে সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে দায়ের করা দুর্নীতির মামলা, এমনকি খুন-রাহাজানির ন্যায় ফৌজদারি মামলাও তুলে নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিবাণিজ্য, সিটবাণিজ্যের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে দেশব্যাপী ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা গেছেন ৭০ জন, আহত হয়েছেন আরো প্রায় ১১ হাজার।

সরকারি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন ও পুরনো কেন্দ্রগুলো সংস্কার করে ২০১১ সালের মধ্যে উৎপাদন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীতের অঙ্গীকার করেছিল মহাজোট। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই অঙ্গীকার থেকে সরে এসে বেসরকারি খাতে উচ্চ খরচসমৃদ্ধ বিদ্যুৎ উৎপাদনে মনোনিবেশ করে তারা। এতে ছেদ পড়ে যায় সরকারি খাতে নিম্ন খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন। সংস্কারের অভাবে খুলনা, কাপ্তাই, ঘোড়াশালসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি হিসাবেই প্রতিদিন বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সংকটও তীব্র হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে আট মাসেরও বেশি সময় ধরে নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে। এদিকে ১৭টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিলেও সময়মতো কোনো প্রতিষ্ঠানই বিদ্যুৎ দিতে পারেনি। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে এবং জ্বালানি সরবরাহের কারণে রাষ্ট্রকে প্রতিবছর আট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার গচ্চা দিতে হবে। বিনা টেন্ডারে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে দায়মুক্তি বিল, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, উচ্চমূল্যে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাল্ব বিতরণ, ঘড়ির কাঁটা ঘোরানোর মাধ্যমে সময়ের পরিবর্তন, কোটি টাকার রোডশো, এসি বন্ধ ও তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রির নিচে না রাখা, কর্মকর্তাদের ড্রেসকোড নির্ধারণ, নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখা, মার্কেটের সময়সূচির পরিবর্তনসহ নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলেও এসব কর্মসূচিতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছিল সেটি থেকেও সরে এসেছে। হরতাল প্রতিহত করার নামে বিরোধীদলীয় হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সরকারি বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের ওয়াদাও রাখেনি সরকার বরং নতুন মাত্রা লাভ করেছে। যুক্ত হয়েছে গুম ও বেওয়ারিশ লাশ। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হিসাবে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত খোদ রাজধানী থেকে প্রায় দুই হাজার বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২৫৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত খুন হয়েছে সাত হাজার ৬৩৪ জন। পুলিশের হিসাবেই অপহরণ হয়েছে এক হাজার ৫৭৮ জন, চুরি হয়েছে ১৬ হাজার ১৮৪টি, ডাকাতি হয়েছে তিন হাজার ৭৬৯টি, বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৫ হাজার ৫৩৮ জন নারী, নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে দুুই হাজার ৩২৯টি শিশু, অচেতন করে লুটের ঘটনা ঘটেছে ৪৮ হাজার ২১টি এবং পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছে ৭৩৯ জন। অধিকারের তথ্যানুযায়ী জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর, ২০১০ সময়কালে ১১৯ ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। অজ্ঞাতনামা হাজার হাজার নিরীহ লোককে আসামি বানিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। চাঁদাবাজির কারণে ঢাকা, যশোরসহ বিভিন্ন জেলার বাসমালিক সমিতি ধর্মঘটও পালন করেছে। মানবাধিকার কমিশন ক্রসফায়ারকে আইনবহির্ভূত হত্যাকান্ড বলে উল্লেখ করেছে।

অধিকারে তথ্যমতে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে বর্তমান বছরের অক্টোবর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছে ৪৪০ জন, চলতি বছরে প্রথম নয় মাসে পুলিশি হেফাজতে মারা গেছে ৮৭ জন। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর এই নয় মাসে ২৯৭ জন নারী যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ১৯০ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং ৮৫ জন বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে ৬৪ জন মহিলা ও ৩৩ বালিকাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত৪৩৫টি নারী যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এতে ২২ জন আতহত্যা করেছেন। শুধু অক্টোবরেই নারী উৎপীড়ক সন্ত্রাসীর হাতে শিক্ষক, মা ও নানাসহ চারজন খুন হয়েছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন জাতীয় সংসদে বলেছেন, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন এই ছয় মাসে সারা দেশে এক হাজার ৫৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত করার অঙ্গীকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে মারা গেছেন ১২ জন ছাত্র, আহত ও হয়রানির শিকার হয়েছেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, বন্ধ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, নষ্ট হয়েছে শিক্ষাঘণ্টা। মহাজোট ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজারেরও বেশি। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১০ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন সহস্রাধিক।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার কথা বলা হলেও পরিবর্তনের কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি দুই বছরে। সংসদ চলছে বিরোধী দলবিহীন অবস্থায়। সংসদ কার্যকর করার ব্যাপারে উদাসীনতা, সংসদে রীতিবিরুদ্ধ ভাষার ব্যবহার নতুন মাত্রা লাভ করেছে। জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী জনসমক্ষে বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতে দেওয়া হবে না।’ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ওপর নির্মম পুলিশি নির্যাতন এবং সংগঠনটির মিছিলের ওপর ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। মন্ত্রী, এমপিদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশের ওয়াদা করেছিল আওয়ামী লীগ। সেই ওয়াদা এখনো পূরণ হয়নি। এমপিদের বিনাশুল্কে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অনুমতি ও প্রথা ভেঙে এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রতিটি এমপিকে কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে প্রতিষ্ঠিত সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে নামকরণ করা হয়েছে, এতে অপচয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। শুধু জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনে খরচ হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।

প্রশাসনে দলীয়করণ, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতা নয়-দলীয় পরিচয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে প্রমোশন, পদ ও নিয়োগ। গোপালগঞ্জে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মোদাচ্ছের আলী বলেছেন, ”আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত কর্মীদের মধ্য থেকে সাড়ে ১৩ হাজার জনকে কমিউনিটি হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের বাইরে কেউ যাতে সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।” এদিকে চলতি বছরের ২৫ নভেম্বর রংপুরে একটি কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, ”পদোন্নতি কোনো অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। এটি দেওয়া হয় সরকারি নিজস্ব চিন্তাচেতনা থেকে।” সরকার ২৩ মাস মেয়াদে প্রায় ১০ হাজার নিয়োগ স্থগিত করেছে। ১২ মে ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, ”পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগে দলীয় লোকজন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও পুলিশ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে দলীয় ছেলেমেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।”

দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন হলেও বর্তমান সরকারের অনীহার কারণে আজও সেটি কার্যকর হয়নি। উপজেলা পরিষদ কার্যকর করার দাবিতে অনশন পালন করেন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা। এ ছাড়া ১ আগস্ট পদত্যাগেরও হুমকি দেন তারা। এ সময়ে এলাকার উন্নয়ন স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাত থেকে এমপিদের হাতে অর্পণ করা হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

কৃষির উপকরণ সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। বাজারে বেশি দামে সরকারি সার ও বীজ বিক্রি এবং বীজ ও সার না পেয়ে বিভিন্ন জেলায় কৃষকের বিক্ষোভের খবর ছিল বছরজুড়ে পত্রিকার পৃষ্ঠায়। বিদ্যুতের অভাবে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়া সত্ত্বেও আউশ, আমন ও বোরোসহ কোনো মৌসুমেই সরকার প্রাক্কলিত চাল কিনতে পারেনি। সিডর ও আইলা উপদ্রুত এলাকায় জনসাধারণের জন্য কোনো কার্যক্রমই গ্রহণ করেনি সরকার। ইশতেহারে ২০১০ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি ১০০ শতাংশ করার কথা থাকলেও এখনো ছয় থেকে আট শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় না। ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি সরকার। এখনো নিরক্ষতার হার ৩৫ শতাংশ। তিন মাসের মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ঘোষণা দেওয়ার সাত মাস পার হলেও সেটি প্রণীত হয়নি। ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটিতে রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইতোমধ্যে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। শ্রমনীতি প্রণয়ন, বেতনবৈষম্য দূরীকরণ, ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ, স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন এবং ভূমিহীন, হতদরিদ্র, ক্ষেতমজুর ও শ্রমিকদের জন্য রেশনিং চালু করার প্রতিশ্রুতির কোনো অগ্রগতি নেই। প্রায় ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিকাঠামো এখনো নির্ধারণ হয়নি। দ্রুততার সঙ্গে শিল্পপুলিশ গঠন করা হলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন চালু করেনি সরকার। দুই বছরে শ্রম-অসন্তোষ বেড়েছে। এ সময়ে পুলিশ ও শ্রমিক সংঘর্ষে মারা গেছেন ১৫ জন পোশাকশ্রমিকসহ অর্ধশতাধিক।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ১৯তম দফায় ‘সকল প্রকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের অবাধ চলাচল সুনিশ্চিত ও সংরক্ষণ করা হবে’-বলা থাকলেও সেটি হয়নি। দলীয় বিবেচনায় ১০-১২টি টিভি চ্যানেল চালুর অনুমতি দিলেও চালুকৃত চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্ধ করে দেওয়া সিএসবি নিউজ চ্যানেল চালুর অনুমতি দেওয়া হয়নি। দৈনিক আমার দেশ বন্ধ এবং সম্পাদককে গ্রেফতার করে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় সরকার। বিগত বছরগুলোতে সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়নের দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সালের মার্চে ইউটিউবসহ বেশকিছু ওয়েবসাইটে বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত ফেসবুক বন্ধ করে দেয় সরকার। গত বছর অধিকার পরিচালিত নির্যাতন প্রতিরোধে মানবাধিকারকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও গণসচেতনতামূলক অনুমোদিত প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আটজন সাংবাদিক খুন হওয়াসহ এক হাজারের ওপর সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

শেষ কথা : মহাজোট ক্ষমতায় আসার আগে তাদের দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখন আর মনোযোগী নয়। সরকারের দৃষ্টি এখন এজেন্ডাবহির্ভূত বিষয়গুলোতেই বেশি। সরকার একদিকে ভারতকে তড়িঘড়ি করে বিনাশুল্কে ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট দিতে ব্যস্ত, তেমনি তাদের আগ্রহ নির্যাতন-নিপীড়ন এবং জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করায়। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ফাঁকাবুলি রাজনৈতিক দলের ওপর জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার অভাবকে বিপজ্জনকভাবে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সরকার ও জনগণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। [ এম এম মুসা ● সাপ্তাহিক বুধবার musamiah@gmail.com ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

%d bloggers like this: