লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে


[প্রবাস প্রতিবেদন] তারেক রহমানের বিলেতের দিনকাল

  

ইসহাক কাজল লন্ডন থেকে

তারেক রহমান তথা তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনে বসবাস করছেন। তাকে নিয়ে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাধারণ জনসমাজে কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি তো বটেই, বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৫ বছর আগে বিলেতে এসে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার যে খরচ তার যোগান কোথা থেকে আসছে তাও এক রহস্য কমিউনিটির কাছে। বিশেষ করে তার রাজকীয় চলাফেরার খবর অনেকের কাছেই রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন যেখানে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি করে দিন যাপন করেছেন, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবী প্রচণ্ড অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে, সেখানে তারেক রহমান বিনা আয়ে এমন রাজকীয়ভাবে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে চলেন কীভাবে?
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথমে লন্ডনে আসেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে বাসা থেকে বের না হলেও মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন শপিং মলসহ বিনোদন কেন্দ্রে দেখেছেন অনেকে। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে ওয়েলিংটন হসপিটালে কিংবা তার প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও অনেকের নজরে এসেছেন এই রহস্যময় রাজনীতিক নেতা। ক্ষমতা হারানোর পর নির্যাতনে তারেকের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৯ নম্বর হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কঠিন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ের বিয়েতে তারেক রহমান জনপ্রকাশ্যে এলে তাকে ছড়ি হাতে দেখে ডাক্তারদের সেই কথাই মনে হয়েছে অনেকের।

লন্ডনে শুরুর সময়
২০০৮ সালে লন্ডনে আসার পর পর তারেক রহমান ছিলেন তৎকালীন যুক্তরাজ্য বিএনপির একচ্ছত্র নেতা কমর উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। সেই সময় তারেক রহমান কমর উদ্দিনের এনফিল্ড টাউন ও সাউথ গেইট এই দুই এলাকার মাঝামাঝি এলাকায় এক বাসায় থাকতেন। কমর উদ্দিন লন্ডনে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কমর উদ্দিনের প্রায় বারোটির মতো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে। তারেক রহমান যে বাসায় ওঠেন কমর উদ্দিন সেই বাড়ি ক্রয় করেন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিলাসবহুল এই বাড়ির মাসিক মর্টগেজ দিতে হতো ৩৩৫ পাউন্ড যা ক্রেডিট ক্রাঞ্চে কমে গিয়ে ২২০ পাউন্ডে নেমে আসে। তারেক রহমানকে এই মর্টগেজের টাকাও দিতে হয় না। উপরন্ত লন্ডনে তারেকের বাড়ির খরচও চালাতেন কমর উদ্দিন। লন্ডনে আসার পর কমর উদ্দিনের নিজের ব্যবহারকৃত জাগুয়ার গাড়িটি তারেককে দিয়ে দেন। মাসিক ৮০০ পাউন্ড বেতনে ড্রাইভার শরীফুল ইসলাম চাকরি পান। পরে তারেক নিজেও দুইটি গাড়ি কিনেন, ক্যাব্রিজ হিথ রোডের রূড থেকে। একটি হলো বিএম ডাব্লিউ সেভেন সিরিজ আরেকটি হচ্ছে অডি। এসময় তারেক রহমান প্রধানত বাসাতেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মেয়ে জাইমাকে স্কুল থেকে আনতে ড্রাইভারের সঙ্গে বের হতেন।
পাশাপাশি মাঝে মাঝে তার পরিবার নিয়ে বাসার গ্রোসারি কেনাকাটা করতেন পন্ডার্স এন্ডের টেসকো থেকে। কমর উদ্দিনের রেস্টুরেন্টের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও তার কেনাকাটায় সাহায্য করতেন। প্রায় দিনই রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্রেরণ করা হতো। এছাড়াও প্রতিমাসে লেক সাইডের ব্লু ওয়াটার এবং সেন্ট্রাল লন্ডনের সেলফ্রিজেসে শপিং করতেন বলে জানা গেছে। যেতেন সেলফ্রিজেস এর হোম এক্সেসরিজেও। সেলফ্রিজ ও ব্লু ওয়াটার হচ্ছে ইউকের সবচাইতে বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল শপিং মল। মিলিয়নিয়াররাই মূলত সেখানে কেনাকাটা করে থাকেন। তারেক প্রায়ই পুরো পরিবার নিয়ে উডগ্রীন সিনে ওয়ার্ল্ডে সিনেমা দেখতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আপ্টন পার্কের বলিনেও সিনেমা দেখতে আসতেন বলে জানা গেছে।

বর্তমান জীবন
কমর উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তারেক রহমান থাকেন সারের কিংসটনে। এ এলাকার লোকাল অথরিটির তথ্য অনুযায়ী ৩-৪ বেডরুমের এক বাসার মাসিক ভাড়া ১২শ’ থেকে শুরু করে ৫ হাজার পাউন্ড। সি ব্যান্ডের বাসার জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স ১৪৭৪ পাউন্ড ৬৭ পেন্স। বিদ্যুৎ গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল ন্যূনতম ১৫০ পাউন্ড। তার পরিবারের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ন্যূনতম ১শ’ পাউন্ড। এছাড়া লন্ড্রি, পোশাক-আশাক, পত্রপত্রিকা এবং মোবাইল ও টেলিফোনসহ আরও প্রায় ৭-৮শ’ পাউন্ড খরচ হয়ই। সব মিলিয়ে ৪ হাজার পাউন্ডের নিচে তার মতো লাইফ স্টাইল চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিশেষত এই এলাকায় আরও রাঘব বোয়ালরা থাকেন। এই এলাকাতেই থেকে গেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এখনো পাকিস্তানের সাবেক সেনা শাসক পারভেজ মোশাররফ বসবাস করছেন কিংসটনে।
এরই মধ্যে একবার তিনি ২০০৮-এ লন্ডনে এসে বার এট ল ডিগ্রি (ব্যারিস্টার) সম্পাদন করবেন বলে মনস্থির করেন। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেনি। তারেক যেহেতু বাংলাদেশের গ্রাজুয়েট তাই লন্ডনে তাকে প্রথমে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এক্সেশন পাননি। সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভারসিটি ও কুইন মেরী তারেককে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পরে তিনি জিডিএল করে শর্ট-কাটে বার এট ল করতে চেয়েও পারেননি।

নেই কোনো আয়ের উৎস
গত প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন থাকলেও তারেক রহমান কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেমন কোনো কাজে নিয়োজিত হতেও পারেন না। তাকে বাইরে দেখাও যায় না খুব একটা। স্ত্রী জুবাইদা গুলশান আরাও তেমন কোনো কাজ করেন না। উপরন্তু এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্রিটেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারেক রহমান। এর সুবাদে ব্রিটেনে অবাধে চলাচলের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো সরকারি অর্থায়ন বা বেনিফিট পাবেন না তারেক। দেশেও তার এবং তার মা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা আছে। তারেকের ইনকামের একমাত্র স্বীকৃত উৎস হিসেবে ধরা যায় তার মা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংসদের বেতন। তবে তা দিয়ে লন্ডনে এই বিলাসী জীবনের একাংশও বহন করা সম্ভব কি না সন্দেহ।

মাথার উপর মামলার বোঝা 
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ তারেক রহমানের ওপর ঝুলছে ১৪টি মামলার খড়গ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন চলে আসার পর তা বাতিল করে বর্তমান সরকার। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পলাতক বিবেচনায় একাধিক মামলায় তারেক রহমানের জামিন বাতিল করে আদালত। এছাড়াও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৫টি মামলা ঝুলছে সেগুলোর মধ্যে ২৩টি মামলাই তত্ত্বাবধায়ক আমলে দায়ের করা।

যুক্তরাজ্য নেতৃবৃন্দ যা বলেন
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির নেতৃবৃন্দের মতামত জানতে চাইলে তারা অনেক কথা বলেছেন।
 
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে আশ্রয় পেয়ে ছিলেন। লন্ডনে জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাকে একটি হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। দারুণ অর্থকষ্টে একেবারে নিঃস্ব কপর্দকহীন অবস্থায় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবীর কথা তো কারো অজানা নয়। ইদি আমিনকে সৌদি আরবে ঝাড়–দারের চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছিল আর রেজা শাহ পাহলেবীর অবস্থাও খুবই করুণ ছিল। তারেক রহমান হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ
  নিজের করে নেয়া অনৈতিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিকল্প ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। সেই অর্থ দিয়েই তারেক রহমান লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থ পাচারের ঘটনাটি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। রাজনৈতিক পাওয়ার বা শক্তি বিক্রি করেই তারেক রহমান এই অঢেল অবৈধ অর্থ ও বিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে যেমন একদিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণের আদালতেও একদিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই দিন বেশি দূরে নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে তারেক রহমানের বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেনাবেচার রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। স্বগর্বে তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি চর্চা কঠিন করে ছাড়বেন। সে ধারা অক্ষুণ
œ রেখে তারেক রহমান একই পথ অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ সম্পদ লুটপাট করে সাহসী তারুণ্যের অহঙ্কারকে কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার সূচনা করেন। হাওয়া ভবনকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র করে তারেক-কোকো-মামুন এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। লুটের সেই অর্থেই তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি। তাই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। লন্ডনে দীর্ঘদিন কী অবস্থায়, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় তিনি আছেন তা জনগণের জানার অধিকার পর্যায়ে পড়ে। এখানে অবস্থানের ব্যয়ভার কীভাবে তিনি নির্বাহ করেন সে সত্যও প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব দুর্নীতি মামলা তার ওপর হয়েছে, সৎ সাহস থাকলে বাংলাদেশে গিয়ে সেগুলোর মোকাবেলা করা উচিত। সন্ত্রাসী চক্র আর দুর্নীতিবাজরা মিডিয়া থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তারেক রহমান
  মিডিয়াকে ভয় করেন কেন? লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে একজন রাজনীতিক হিসেবে সে সত্য তার প্রকাশ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এমএ মালিক বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন সংগঠক ও কর্মী হিসেবে এ সত্য আমার অজানা নয় যে তারেক রহমান নিজের সকল ব্যয়ভার নিজেই বহন করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। তার পিতা জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তাই তাকে কারও দয়া দাক্ষিণ্যের উপর ভরসা করে লন্ডনে বসবাস করতে হবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া মনিরুল আলম এ ব্যাপারে কোনো প্রকার রাখঢাক না করে বলেন, তারেক রহমানের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তার খাওয়াপরার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না। সিলেটি ভাষায় তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পোয়া। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন নিজের শক্তি ও সামর্থ্য।ে আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে অনেকেই আছেন যারা আমাদের রেস্টুরেন্টে ভাত খেয়ে, থেকে লালিতপালিত হয়েছেন। অনেকের হাত খরচের অর্থ আমরা যুগিয়েছি। তারা এখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে আছেন বলে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রও নেই। দেখেও না দেখার ভান করেন। আর তারেক জিয়া আমাদের নেতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগামী দিনের বীর সেনানী তিনি যদি অর্থকষ্টে থাকেন তাহলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা প্রাণ উজাড় করে শর্তহীনভাবে তাকে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে জাতির কাণ্ডারি হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করুন সে প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেছেন, কিছু কিছু বিষয়ে রাজনীতি না এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য তারেক রহমান লন্ডন এসেছিলেন। এখনো তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শেই লন্ডনে তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে সে ব্যাপারে উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা গুঁড়ে বালি। বিষয়টি তদন্ত করা তো দূরের কথা বর্তমান সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর একটি মামলা দায়ের করে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে।

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7532

প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?


প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?

মঈনুল আলম

আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘ক্ষমা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে আইনমন্ত্রী বলেন, অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর হয় তো জানা নেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে তার শাসনামলের শুরুর দিকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এ জাতিকে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’তে প্রবেশ করিয়েছিলেন। তারপর এ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক প্রয়োগ করেছে আওয়ামী লীগ।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দেখিয়ে অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান খুনের অপরাধে মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালতে সে মৃতুøদণ্ড বহাল থাকা অবস্থায় ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমা করে তাদের মুক্তি দিয়ে ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার’ অপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মুক্তিপ্রাপ্ত মৃতুøদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে তাদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র প্রতি আওয়ামী লীগের উচ্ছ্বসিত সমর্থনের প্রকাশ্য প্রদর্শন বা ‘পাবলিক ডিসপ্লে’ করে। এর দেড়-দুই মাসের মাথায় মহাজোটের আইনমন্ত্রী ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ার’ কথা বললেন কেন? এতে ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমাকারী মহান ব্যক্তিটির মনে কি এমন প্রশ্ন আসবে না যা মধ্যযুগীয় এক কবি এই পদ দিয়ে ব্যক্ত করেছেনঃ ‘আমি গাই কী, আর আমার সারিন্দা বলে কী?’ ২৪ অক্টোবর নয়া দিগন্ত-এ প্রকাশিত আমার ‘মহাজোট সরকারের সুমতি হচ্ছে?’ শীর্ষক লেখাটিতে বলেছিলাম, ‘এই আইনমন্ত্রী প্রায় নিজেই বোঝেন না তিনি কী বলছেন।…’ আইনমন্ত্রীর উপরোল্লিখিত বয়ান থেকে অনেকেই আমার মন্তব্যটিকে সঠিক বলেই ধরবেন।

‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি’র অনুসরণে মহাজোট সরকার এ বছরের প্রথম দিকে খুন ও অন্যান্য জঘন্য অপরাধে বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগরত কয়েক হাজার দাগি অপরাধীর অবশিষ্ট কারামেয়াদ ক্ষমা করে দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিয়েছে। মিডিয়াতে সে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি হতে দেশে হত্যা, গুম, ডাকাতি, ভূমিদখল, শিক্ষক পেটানো, সাংবাদিক পেটানো, অ্যাডভোকেট পেটানো, পুলিশ পেটানো, ইভটিজিং ইত্যাদি অপরাধ দারুণভাবে বিস্তার লাভ করেছে। মহাজোট সরকারের কারাগার থেকে হাজারে হাজারে কয়েদি ছেড়ে দেয়াকে দেশে ব্যাপকভাবে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র এমন সব অপূর্ব দৃষ্টান্তের পর বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী হঠাৎ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে আনার তাগিদের কথা বললেন কেনো? ভাষার ভাবধারায় ‘ক্ষমা’র বিপরীত শব্দ হচ্ছে ‘প্রতিশোধ’ অথবা ‘প্রতিহিংসা’। ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে এনে তিনি কি তার বিপরীত সংস্কৃতি অর্থাৎ ‘প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার সংস্কৃতি’র দিকে জাতিকে চালানোর ইশারা দিলেন?

বাকশালে ফিরে আসার ইঙ্গিত?
আইনমন্ত্রী বারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ফলে ‘সামরিক শাসন ও মার্শাল ল’ বলতে কিছু নেই। এ রায়ে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।’ কিন্তু ক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে যে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, সেই চতুর্থ সংশোধনীর কী হলো?

সেই কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী বাতিল না করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে যাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবীসহ একাধিক আইনজীবী বলেছেন, হাইকোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও চতুর্থ সংশোধনীর বাকশাল ব্যবস্থা পুনর্বহাল বা নাবহাল সম্পর্কে কিছু বলেননি। ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের সাথে সাথে ’৭২ সালের আদি সংবিধান পুনঃস্থাপিত হয়েছে। এতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে’ বলে কতৃর্êস্থানীয় মহল থেকে যা বলা হচ্ছে, পর্যবেক্ষক ও আইন-অভিজ্ঞ মহল তাকে অত্যন্ত ‘সরলীকৃত’ উক্তি বলে মনে করছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, আপিল বিভাগের রায়ে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটি কি বাতিল হয়ে গেছে? নাকি সামরিক বিধির যে ধারাগুলোকে জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে বলে রায়ে বলবৎ রাখা হয়েছে, তাতে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধি ধারাটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? রায়ের যতটুকু মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে এ ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ‘বাকশালের চিন্তা-চেতনা ও দর্শনকে আমরা এখনো ধারণ করি। একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে বাকশালের চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা কাজ করতে চাই’ বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে তা দেশ ও জাতির জন্য অশুভ সঙ্কেত রূপে প্রতিভাত হচ্ছে।

আপিল বিভাগের রায়ের ফলে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটিও বাতিল হয়ে গেছে, যার ফলে দেশে ‘থিওরিটিক্যালি’ বাকশাল ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, যদিও মহাজোট সরকার এখন প্রকাশ্যে তা বলছে না। ক্ষমতাসীন মহল থেকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা দেশবাসীকে একটি ভ্রান্তিতে রাখার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, আসল উদ্দেশ্য হলো­ সময় ও সুযোগ বুঝে সংবিধানে একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মহাজোট পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশে বাকশালীয় ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে­ এই যুক্তি দেখিয়ে বাকশালের অনুরূপ একটি শাসনব্যবস্থা জারি করতে পারে দেশে।

দেশবাসী ভোলেনি, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র­ এই চারটি আদর্শের ওপর প্রণীত বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি পার্লামেন্টারি পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির একদলীয় বাকশাল সরকার প্রবর্তন করে দেশের পদাসীন প্রেসিডেন্টকে বরখাস্ত করে নিজে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটির এমন অভাবিত লাঞ্ছনা দেখে সেদিন জাতি হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

একই সাথে দেশে শুধু একটিমাত্র রাজনৈতিক দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে গেল! বাকশাল নামীয় নবগঠিত দলটির সদস্যরা ব্যতীত বাংলাদেশের আর কোনো নাগরিকের জন্য রাজনীতি করা বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে হিটলার যেমন তার দল নাৎসি পার্টিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে এবং ইতালিতে মুসোলিনি তার দলটিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে দেশে ফ্যাসিস্টিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একনায়কত্ব কায়েম করেছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার তৃতীয় উদাহরণ স্থাপন করল।

বিধান জারি হয়েছিল, জাতীয় সংসদের তৎকালীন কোনো সদস্য প্রস্তাবিত বাকশাল দলটিতে যোগদান না করলে তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের মৌল গণতান্ত্রিক অধিকারের কী জঘন্য লঙ্ঘন!!
এই ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কার্যকর করার ব্যাপারে কোনো বিচার করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের থাকল না এবং এ ব্যবস্থার পর্যালোচনা অথবা সমালোচনা করার কোনো অধিকার সংসদের থাকল না। কী অকল্পনীয়ভাবে বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং সংসদের সার্বভৌমত্বকে হরণ করা হলো!

আরো বিধান করা হয়েছিল, বাকশালব্যবস্থার কোনো সমালোচনা করা যাবে না। তার পরও অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনা-সমালোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য সরকারের মালিকানায় চারটি দৈনিক সংবাদপত্র রেখে দেশের সব সংবাদপত্র ও পত্রপত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল! কী বিবেকবর্জিত আঘাতে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধূলিসাৎ করা হলো!

একই সময়ে আদেশ-নির্দেশ দিয়ে এবং বাকশালী ‘দালাল’দের দিয়ে ভয় দেখিয়ে অথবা প্রলোভন দিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যদের, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, শিক্ষায়তনের শিক্ষক ও কর্মচারীদের এবং ছাত্রছাত্রীদের, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকর্মীদের, শিল্পকারখানা ও পরিবহন শিল্প ইত্যাদির শ্রমিক-কর্মচারীদের, কৃষিজীবীসহ সব পেশাজীবীকে বাকশালের সদস্য হতে বাধ্য করা হয়েছিল। বস্তুত আওয়ামী লীগের এসব কর্মকাণ্ড দিয়ে দশ কোটি মানুষের ত্যাগে অর্জিত প্রাণের বাংলাদেশ বাস্তবে ‘বাকশালদেশ’-এ পরিণত হয়েছিল।

সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সত্য হলো, সামরিক শাসন এবং তার অনুসরণে একাধিক স্বৈরশাসনের বদৌলতে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে, সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বিচার বিভাগ তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে, যার ফলে হাইকোর্ট আজ এই রায়ে সামরিক শাসনগুলো অবৈধ ছিল বলে রায় দিতে পেরেছেন। বাকশাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সামরিক শাসন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ এবং ‘ফেইট অ্যাকমপ্লি’র যুক্তিতে অপরিহার্য হয়েছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আপিল বিভাগের রায়ে সামরিক বিধির যে ধারাগুলো জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলবৎ রাখা হয়েছে। বাকশাল শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটানো কি জনস্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না? রায়ে এ প্রশ্নটির উত্তর দেখা যায় না। সামরিক শাসন যদি সব সময়েই অবৈধ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যাতে সামরিক শাসন আসতে না পারে তার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত বিধান আনতে হবে। যেটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে তা হলো­ কোনো রাজনৈতিক সরকার যেন কোনোভাবেই এবং কোনো অজুহাতেই নির্যাতনকারী স্বৈরশাসন অথবা চরম নিপীড়নকারী একনায়কত্ব অথবা একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, সংবিধানে তার কার্যকর নিষেধ-বিধান থাকতে হবে। পাশাপাশি যে রাজনৈতিক সরকার দেশে একনায়কত্ব অথবা বাকশাল নামে একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জারি করেছিল, তাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে এমনভাবে শাস্তি দিতে হবে, যাতে তাদের মুখে বাকশাল ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা আর উচ্চারিত না হয়।
লেখকঃ প্রবীণ সাংবাদিক, ও কলামিস্ট