বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ


বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ

ডঃ কাজী নাসির উদ্দীন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে মার্কিন সমাজের আচার ব্যবহারের অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে লক্ষ্যগোচর হচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে মা দিবস আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মার্কিনী প্রথায় ছেলেবন্ধু (বয়ফ্রেন্ড) ও মেয়েবন্ধু (গার্লফ্রেন্ড) গড়ে উঠছে এই রকম বন্ধুত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না অচিরেই হয়তো শুনতে পাবো যে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যুবক-যুবতীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে ।

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গেছে এবং তরুণ-তরুণীরা বন্ধুত্বের দাবীতে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আর একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে অপরিসীম আনন্দ উপভোগ করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেও এই মার্কিনী অনুকরণের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকাদের গানের সঙ্গে নাচ যোগ করে দিতে হয় অর্থাৎ নেচে নেচে গান না গাইলে সে গান জনপ্রিয় হয় না বসে বসে গান গাওয়াটাতো এখন অতীতের ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে আমাদের দেশের সংগীত শিল্পীরা চিরকাল গলা আর হৃদয়াবেগের মিশ্রণে মনের আকুলতা প্রকাশ করে এসেছে দেহকে সেখানে টেনে আনার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় নি অবশ্য আমি এ ব্যাপারে সচেতন, যে কোন সংগীত চর্চায় গলা ও হৃদয়ের সঙ্গে দৈহিক অঙ্গভঙ্গী ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, যেমন বাউল গান ও লালন গীতি কিনতু নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক গান যদি নেচে নেচে গাইতে হয়, তবে কেমন হয় ? পাঠকরাই বিবেচনা করুন এছাড়া দেশের তরুণীরা এখন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর ওড়না ছেড়ে দিয়ে বেপরোয়াভাবে শার্ট আর জিন্স-এর প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

বলা বাহুল্য যে সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো তা হুবহু মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ মাত্র এক কথায় বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও সংস্কৃতি কেন এমন হলো ? পাশ্চাত্যে আরো অনেক দেশতো রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঐ সমস্ত দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র মার্কিনী সংস্কৃতি গ্রাস করে নিয়েছে বাংলাদেশকে আরো আশ্চর্য্যরে বিষয় এই যে পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিতে পারেনি উপরন্তু পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশে আমি মার্কিনী সংস্কৃতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা লক্ষ্য করেছি জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে স্পেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম স্পেন, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা আমেরিকানদের রাখাল বালক (Cow Boy)হিসেবে অভিহিত করে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে বলা হয়ে থাকে আমেরিকানরা অসভ্য আর অসংস্কৃত সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে আমেরিকার সংস্কৃতি এতো প্রিয় হয়ে গেল কেন যে, এ বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

কোন একটি দুর্বল দেশকে যদি কোন একটি সবল দেশ চিরদিনের জন্যে অধীনস্থ করে রাখতে চায় তাহলে দুর্বল দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপনিবেশকে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য এই ধ্বংস যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছিলো নিজেদেরকে কিšতু জাগ্রত প্রহরীর মতো সে সমস্ত উপনিবেশের বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির অপলাপ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলো আর তারই ফলশ্রুতিতে সেই সমস্ত দেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান আজও ঘটেনি নতুন মুখোশ পরে সাহায্য সহযোগিতার অজুহাতে আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা দুর্বল দেশগুলোর উপর নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছে সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে একটি দেশকে দখল করা যায় সাময়িকভাবে কিনতু সে দেশটিকে জয় করা যায় না যতদিন পর্যন্ত না সে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, গর্ব আর অহংকারকে চূর্ণ করা যায় ততদিন পর্যন্ত সে দেশের মানুষকে বশীভূত করা যায় না একটি জাতির গৌরব, গর্ব আর অহংকারকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম ধ্বংস করতে হবে সে জাতির সংস্কৃতিকে মহা ধ্বংসযজ্ঞে বর্তমানে আত্মনিয়োগ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কেন ? যেহেতু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার আত্মমর্যাদা দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে বাংলাদেশ সকল গৌরবকে দিয়েছে জলাঞ্জলি সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশকে জয় করার এই হচ্ছে মোক্ষম সময় এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলদেশকে রুখে দাঁড়াতে হবে যেমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিভিন্ন জাতি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

সংস্কৃতি চেতনা যাদের খুব প্রখর তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই রকম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতিকে অধীনস্থ করা কঠিন আমার নিজের দেশবাসীরাই যদি অতি আগ্রহের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীর অপসংস্কৃতির অনুকরণে উৎসাহী হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীকে দোষ দিয়ে লাভ কি ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যটাতো দেশবাসীর সহায়তায় সহজেই হাসিল হয়ে যায় কিনতু কেন যে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই মার্কিনী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে রুখে না দাঁড়িয়ে বরং স্বাগত জানালো সে বিষয়টা এবার একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রে বিপরীত আকর্ষণ (Opposite attracts) করে বলে একটা তত্ত্ব আছে এর সারমর্ম এই যে তরুণ-তরুণীরা তার সম্পূর্ণ বিপরীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বাংলাদেশ আমেরিকার সম্পূর্ণ বিপরীত ক্রান্তিতে অবস্থান করছে অর্থাৎ আমেরিকায় যখন দিন বাংলাদেশে তখন রাত আমেরিকা পৃথিবীর একটি মহাপরাক্রমশালী দেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্বল দেশ আমেরিকা পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশ সমূহের তালিকাভুক্ত আর বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বিপরীত বটে, আর সে কারণেই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী খুবই স্বাভাবিক কিনতু এই স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাটাকে দুর্বল পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে তত্ত্ব প্রকাশ পায় তার নাম হলো হীনমন্যতা বোধ ইংরেজীতে যাকে বলে Inferiority complex এই হীনমন্যতা বোধের শিকারে পরিণত হয়ে যারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মহান সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা শুধু নিজেদেরকেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে না, তারা সমগ্র জাতিকে দেউলিয়া করে দেশের স্বাধীনতাকে করে বিপন্ন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের জন্মলাভের জন্য ওরা নিজেরাও যথার্থভাবে দায়ী নয় আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে দায়ী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের দেশের দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থান্বেষী কর্ণধাররা তাদের নিজেদের আখের গোছানোর কাজে এবং বিদেশী প্রভুদের পদলেহনে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে দেশাত্মবোধের কোন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হননি ।

বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অনেকে আবার মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণের স্বপক্ষে তাদের মনের মধ্যে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তারা বলেন, বিদেশী সংস্কৃতিতে যদি কোন ভালো জিনিস থাকে তবে তাকে গ্রহণ করতে দোষ কি ? এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই একটি দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতিকে বুঝায় আমাদের সংস্কৃতির যে বিষয়টি আমরা সবচেয়ে ভালো মনে করি আমেরিকানরাতো সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে না তাহলে ওদের ভালো জিনিসটা আমাদের গ্রহণ করতে হবে কেন ? তাছাড়া আপাততঃ যাকে ভালো মনে হয় সংস্কৃতির অঙ্গনে তার উৎপত্তি ও বিকাশের কারণটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মার্কিন মুল্লুকে মা দিবস ও বাবা দিবসের উদ্ভবের কারণ বিশ্লেষণ করা যাক আমেরিকায় সন্তান-সন্ততিরা তাদের ষোল (১৬) বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গৃহ ত্যাগ করে তারপর কালে ভদ্রে কখনো সখনো মা-বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয় সেই দেখা সাক্ষাতের জন্যে আবার আগে থেকেই দিনক্ষণ নির্ধারণ (appointment) করে নিতে হয় তাছাড়া আমেরিকার ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাস করে না এই সমস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদেরকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্যে বৎসরে একবার মা-বাবার খোঁজ খবর নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে সুতরাং আপাততঃ এটাকে একটা ভালো জিনিস মনে হলেও এর মূলে ভালো কিছুই নেই আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিটি দিনই মা-বাবার দিন প্রতিটি মূহুর্তে আমরা মা-বাবার সেবা করতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি এমন কি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় নিজেদের ঘর সংসার নিয়ে যখন আমরা আলাদাভাবে বসবাস করি তখনও মা-বাবা বেঁচে থাকলে আমরা যখন তখন মা-বাবার কাছে ছুটে যাই মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের কোন অনুমতি নিতে হয় না আমাদেরকে একবার মায়ের বাড়ি আর একবার বাপের বাড়ি দৌড়াতে হয় না আমরা মা-বাবাকে এক সঙ্গে পাই সব সময় সুতরাং ঘটা করে আমেরিকার মতো বৎসরে একবার মা আর একবার বাবার সেবা করাটা বাংলাদেশের সভ্যতা ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে কতো অবাস্তব তা সহজেই বোধগম্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশে বসবাস করি এখন আর ৩০ বছর যাবত আমি আমেরিকায় বসবাস করছি আমেরিকায় আসার পর এদেশের সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি যে কতো উন্নত, পরিশীলিত আর আমরা যে কি এক মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী তা আমার চোখে পড়ে দেশ থেকে বের না হলে দেশকে চেনা যায় না এটা শুধু আমার একার অভিমত নয় আমার মতো অনেকেই যারা কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেছেন তারা সবাই মার্কিনী সংস্কৃতির অন্তঃসারশূন্যতা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন আর তাদের নিজের বাংলাদেশে এই অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন অতি সম্প্রতি হলিউড থেকে প্রকাশিত ”একুশ” পত্রিকায় চাঁদ সুলতানা মাহবুব কামরুন-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ”ঘুরে এলাম কিছু সময় বা ঝটিকা সফর”-এ সেই দুঃখ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ”একটা ব্যাপার খুব চোখে লাগলো, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফ্রীডমে বিদেশকেও হার মানিয়েছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মোহনা ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে” অন্যত্র ”নব্য সভ্যতার যুগে পুরাতন কালচার সব হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে ছেলেমেয়েরা সুরে বেসুরে ওদের ইচ্ছামতো গান গাচ্ছিলো আমি তখন একমনে খুঁজছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরানো অতীতকে” বড়ই দুঃখের বিষয় সেই অতীত দ্রুত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই বোধ হয় প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অত প্রাণান্তকর প্রয়াস অথচ আমাদের প্রিয় দেশবাসী তরুণ-তরুণীরা নির্বিচারে বিদেশী অপসংস্কৃতিতে অবগাহন করে পরম পুলক অনুভব করছে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে ? কবে কিভাবে আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের অবসান ঘটবে ? কবে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কুঁড়ে ঘরে থেকেও শিল্পের বড়াই করতে শিখবে, কবে ওরা বুক ফুলিয়ে বলবে, ”নিক হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা” ? সে কথাই আজ ভাবছি।

একুশ পত্রিকা,

লস এঞ্জেলেস, জুলাই ৪ ২০০৭ ইস্যুঃ উপ-সম্পাদকীয়ঃ

অনবদ্য কবিতা সন্ধ্যা ২০১২


Bangladesh Reders & Writers Forum
Kobita Shondha in Los Angeles 2012
Full Program:

কবিতার ভাষা হোক সমাজ বদলের হাতিয়ার।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অপ-সংস্কৃতির মোকাবেলা করার শপথে লস এঞ্জেলেস এ বাংলাদেশ রিডার্স এন্ড রাইটার্স ফোরামের অনবদ্য কবিতা সন্ধ্যা

Picture Link:

Visit us on FaceBook একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে : টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা


সিডনির মেলব্যাগ

টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা
অ জ য় দা স গু প্ত

eve-teasing

eve-teasing

বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এখানকার বাঙালী তথা বাংলাদেশীদের মধ্যে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার বিস্তারও লক্ষণীয়। এ বিষয়ে এখানকার তারুণ্য অর্থাৎ ভিন দেশে বড় হওয়া প্রজন্মের মতামত জানাটা মন্দ কিছু নয় বরং জরুরী বটে। এ দেশের মতো পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও খোলামেলা দেশে বেড়ে ওঠা তরুণ-তরুণীদের সম্পর্ক অবারিত। টিজিংয়ের মতো প্রাগৈতিহাসিক বিষয়ের চর্চা চলে না এখানে। তাই বলে এটা ভাবা ঠিক নয়, টিজিং নেই এদেশে। আছে, তবে তা কখনই বিশাল বা মহামারী আকার ধারণ করতে পারে না।

কেন পারে না? সমাজ শৃঙ্খলার প্রশ্নে উদার ও অবারিত জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনও আছে তার যোগ্য ভূমিকায়। গেল হপ্তান্তে আমরা গিয়েছিলাম বিশ্বখ্যাত বন্ডাই বিচে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের টু্যরিস্টে ঠাসা সৈকত। সমুদ্র সৈকত হলেও আয়তনে এক ফালি। কক্সবাজারের তুলনায় শিশু। ওই এক খণ্ড সৈকতে হামলে পড়া সৈকতচারীদের দেখেই বোঝা যায় মানুষ এখানে আসতে কতটা উদগ্রীব। আধুনিক দেশের বিচ কালচার যা, তাই আছে, তারই রেওয়াজ চলছে পূর্ণ মাত্রায়। নগ্ন বক্ষিকা থেকে স্বল্পবাস। কিন্তু কোথাও মানা পেরুনোর অভিপ্রায় বা লক্ষণ দেখা যায় না। আমাদের সাথে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত এক আত্মীয়। আবুধাবিতে জীবনের সিংহভাগ কাটিয়ে দেয়া মানুষটি মূলত রৰণশীল সমাজের প্রত্যক্ষদর্শী। অথচ সে তিনিই নীরবতা ভেঙ্গে মতামত রাখলেন। মুরুব্বি ও অভিভাবক ভদ্রলোকটিকে নিয়ে আমরা কিঞ্চিৎ বিব্রতবোধ করছিলাম। হাজার হোক বাঙালী রক্ত, বাংলা সংস্কৃতির শেকড়ে বসবাস আমাদের। চোখের সহ্য ক্ষমতা পরিমিত, দর্শনের অভিজ্ঞতাও সীমিত। কিন্তু আধুনিক মনস্ক অভিভাবকটি তাঁর যৌক্তিক ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে দিলেন সময়ানুগামী হতে বয়স কোন বাধা হতে পারে না। তাঁর মতে, উদারতার চর্চা আর খোলা হাওয়া বইতে দিলে অন্ধকার বাসা বাঁধতে পারে না। ভয় পায় আঁধারের জীব, ঠিক তাই, সে কারণেই চোখ সওয়া এ সমাজে আক্রমণ ও আগ্রাসনের হার কম। বিচ কালচারে অভ্যসত্ম হতে আগত ষোড়শী থেকে বালিয়াড়িতে চোখ বুজে রোদ শুষে নেয়া বৃদ্ধটি নিরাপদ, নিরাপদ টিনএজ শিশু-কিশোর বা কিশোরী। অবস্থা এমন কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

আমি জানি, এতটা উদারনৈতিক সমাজ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাথেও তা যায় না। কিন্তু হাজার বছরের পুরনো ধ্যান-ধারণাও এখন অচল। সে যুগ যেমন বিগত তেমনি তার প্রভাবও এখন বিলীয়মান। মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি ও সভ্যতা এখন গলাগলি সম্পর্ক। তারা চলছে পরস্পরের হাত ধরে। ঘরে ঘরে উঁকি দেয়া, জানালা-দরজা খুলে ঢুকে পড়া বিশ্বায়নে পৃথিবী এসেছে হাতের মুঠোয়। এরও দুটো দিক। একদিকে বিজ্ঞান ও আধুনিকতা অন্য প্রান্তে অন্ধকার আশ্রিত বাণিজ্য। দেশের তারুণ্য দুটোকেই গ্রহণ করছে। শেষেরটার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণও তাই স্বভাবধর্ম। এ স্বভাবকে বাগে আনতে হলে, পোষ্য করে রাখতে হলে তাকে আধুনিক জীবনের প্রতি যত্নবান ও উৎসাহী করে তোলার বিকল্প দেখি না। পঞ্চাশ ষাট দশকের পুরনো সমাজও রৰণশীলতার আবরণে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট যাপিত জীবন যেমনি অসম্ভব, তেমনি অবাস্তব।

এ জায়গাটিতে প্রবাসী প্রজন্মের উদাহরণ অবশ্যই সাহায্য যোগাতে পারে। এদের প্রথম দর্শনে উদভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, শৃঙ্খলাহীন, অতি খোলামেলা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এদের সংস্পর্শ, সংযোগ ও কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলে এ ধারণা বদলে যেতে বাধ্য। সিংহভাগই ছুৎ বাই ছেলেমেয়ের প্রভেদ রেখাসহ কুসংস্কার মুক্ত মুক্তমনের তরম্নণ-তরম্নণী। এদের বন্ধুত্ব নির্মল, সখ্য পাপহীন, পাপহীন বলেই তারম্নণ্য ভেদ জানে না। এক সাথে ঘুরে বেড়ায়, এক পাতে আহার করে, এক টিকেটে উড়ে বেড়ায়। দেশে যা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। সবকিছু হচ্ছে, হবেও। তবু একটা দেয়ালের মধ্যেই বসবাস করে চলেছে তারা। সে দেয়ালটির অনেক নাম, কখনও সে সমাজ, কখনও সে রাজনীতি, কখনও ইভটিজিং, কখনও বা আত্মহনন।

সমাজ বিনির্মাণ বা ভেঙে গড়ার কাজটি যাদের হাতে সেই সব খ্যাতিমান ও তালেবর ব্যক্তিরা বিদেশে আসেন, দেখে যান, কিন্তু তা কাজে লাগাতে চান না অথবা অনিচ্ছুক। সে প্রয়োজনও নেই তাঁদের। এঁদের সন্তান-সন্তুতি মূলত প্রবাসী। উদার দেশের উষ্ণতা নিয়ে বড় হওয়া ভিনদেশী বাঙালী, সমস্যার জায়গা অর্থাৎ মাতৃভূমিতে বড় হওয়া তারুণ্য উচ্ছন্নে গেলেও কি ভাল পথে থাকলেই বা কি! কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, চলেও না। জাতিগত পরিচয়, জন্ম, পিতা-মাতা বা অন্য যে কোন সূত্রে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ দেশ ও প্রবাসী প্রজন্মের মতবিনিময়, ভাব বিনিময় ও ঐক্য আজ জরুরী। এরা এক সাথে মিললে ইভটিজিংয়ের মতো দৈত্য পরাভূত হতে বাধ্য। সহজ হয়ে উঠবে অনেক সমস্যার সমাধান, মেলানোর দায়িত্বটা কি কেউ নেবেন?