লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে


[প্রবাস প্রতিবেদন] তারেক রহমানের বিলেতের দিনকাল

  

ইসহাক কাজল লন্ডন থেকে

তারেক রহমান তথা তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনে বসবাস করছেন। তাকে নিয়ে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাধারণ জনসমাজে কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি তো বটেই, বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৫ বছর আগে বিলেতে এসে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার যে খরচ তার যোগান কোথা থেকে আসছে তাও এক রহস্য কমিউনিটির কাছে। বিশেষ করে তার রাজকীয় চলাফেরার খবর অনেকের কাছেই রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন যেখানে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি করে দিন যাপন করেছেন, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবী প্রচণ্ড অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে, সেখানে তারেক রহমান বিনা আয়ে এমন রাজকীয়ভাবে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে চলেন কীভাবে?
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথমে লন্ডনে আসেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে বাসা থেকে বের না হলেও মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন শপিং মলসহ বিনোদন কেন্দ্রে দেখেছেন অনেকে। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে ওয়েলিংটন হসপিটালে কিংবা তার প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও অনেকের নজরে এসেছেন এই রহস্যময় রাজনীতিক নেতা। ক্ষমতা হারানোর পর নির্যাতনে তারেকের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৯ নম্বর হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কঠিন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ের বিয়েতে তারেক রহমান জনপ্রকাশ্যে এলে তাকে ছড়ি হাতে দেখে ডাক্তারদের সেই কথাই মনে হয়েছে অনেকের।

লন্ডনে শুরুর সময়
২০০৮ সালে লন্ডনে আসার পর পর তারেক রহমান ছিলেন তৎকালীন যুক্তরাজ্য বিএনপির একচ্ছত্র নেতা কমর উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। সেই সময় তারেক রহমান কমর উদ্দিনের এনফিল্ড টাউন ও সাউথ গেইট এই দুই এলাকার মাঝামাঝি এলাকায় এক বাসায় থাকতেন। কমর উদ্দিন লন্ডনে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কমর উদ্দিনের প্রায় বারোটির মতো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে। তারেক রহমান যে বাসায় ওঠেন কমর উদ্দিন সেই বাড়ি ক্রয় করেন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিলাসবহুল এই বাড়ির মাসিক মর্টগেজ দিতে হতো ৩৩৫ পাউন্ড যা ক্রেডিট ক্রাঞ্চে কমে গিয়ে ২২০ পাউন্ডে নেমে আসে। তারেক রহমানকে এই মর্টগেজের টাকাও দিতে হয় না। উপরন্ত লন্ডনে তারেকের বাড়ির খরচও চালাতেন কমর উদ্দিন। লন্ডনে আসার পর কমর উদ্দিনের নিজের ব্যবহারকৃত জাগুয়ার গাড়িটি তারেককে দিয়ে দেন। মাসিক ৮০০ পাউন্ড বেতনে ড্রাইভার শরীফুল ইসলাম চাকরি পান। পরে তারেক নিজেও দুইটি গাড়ি কিনেন, ক্যাব্রিজ হিথ রোডের রূড থেকে। একটি হলো বিএম ডাব্লিউ সেভেন সিরিজ আরেকটি হচ্ছে অডি। এসময় তারেক রহমান প্রধানত বাসাতেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মেয়ে জাইমাকে স্কুল থেকে আনতে ড্রাইভারের সঙ্গে বের হতেন।
পাশাপাশি মাঝে মাঝে তার পরিবার নিয়ে বাসার গ্রোসারি কেনাকাটা করতেন পন্ডার্স এন্ডের টেসকো থেকে। কমর উদ্দিনের রেস্টুরেন্টের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও তার কেনাকাটায় সাহায্য করতেন। প্রায় দিনই রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্রেরণ করা হতো। এছাড়াও প্রতিমাসে লেক সাইডের ব্লু ওয়াটার এবং সেন্ট্রাল লন্ডনের সেলফ্রিজেসে শপিং করতেন বলে জানা গেছে। যেতেন সেলফ্রিজেস এর হোম এক্সেসরিজেও। সেলফ্রিজ ও ব্লু ওয়াটার হচ্ছে ইউকের সবচাইতে বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল শপিং মল। মিলিয়নিয়াররাই মূলত সেখানে কেনাকাটা করে থাকেন। তারেক প্রায়ই পুরো পরিবার নিয়ে উডগ্রীন সিনে ওয়ার্ল্ডে সিনেমা দেখতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আপ্টন পার্কের বলিনেও সিনেমা দেখতে আসতেন বলে জানা গেছে।

বর্তমান জীবন
কমর উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তারেক রহমান থাকেন সারের কিংসটনে। এ এলাকার লোকাল অথরিটির তথ্য অনুযায়ী ৩-৪ বেডরুমের এক বাসার মাসিক ভাড়া ১২শ’ থেকে শুরু করে ৫ হাজার পাউন্ড। সি ব্যান্ডের বাসার জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স ১৪৭৪ পাউন্ড ৬৭ পেন্স। বিদ্যুৎ গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল ন্যূনতম ১৫০ পাউন্ড। তার পরিবারের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ন্যূনতম ১শ’ পাউন্ড। এছাড়া লন্ড্রি, পোশাক-আশাক, পত্রপত্রিকা এবং মোবাইল ও টেলিফোনসহ আরও প্রায় ৭-৮শ’ পাউন্ড খরচ হয়ই। সব মিলিয়ে ৪ হাজার পাউন্ডের নিচে তার মতো লাইফ স্টাইল চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিশেষত এই এলাকায় আরও রাঘব বোয়ালরা থাকেন। এই এলাকাতেই থেকে গেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এখনো পাকিস্তানের সাবেক সেনা শাসক পারভেজ মোশাররফ বসবাস করছেন কিংসটনে।
এরই মধ্যে একবার তিনি ২০০৮-এ লন্ডনে এসে বার এট ল ডিগ্রি (ব্যারিস্টার) সম্পাদন করবেন বলে মনস্থির করেন। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেনি। তারেক যেহেতু বাংলাদেশের গ্রাজুয়েট তাই লন্ডনে তাকে প্রথমে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এক্সেশন পাননি। সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভারসিটি ও কুইন মেরী তারেককে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পরে তিনি জিডিএল করে শর্ট-কাটে বার এট ল করতে চেয়েও পারেননি।

নেই কোনো আয়ের উৎস
গত প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন থাকলেও তারেক রহমান কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেমন কোনো কাজে নিয়োজিত হতেও পারেন না। তাকে বাইরে দেখাও যায় না খুব একটা। স্ত্রী জুবাইদা গুলশান আরাও তেমন কোনো কাজ করেন না। উপরন্তু এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্রিটেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারেক রহমান। এর সুবাদে ব্রিটেনে অবাধে চলাচলের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো সরকারি অর্থায়ন বা বেনিফিট পাবেন না তারেক। দেশেও তার এবং তার মা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা আছে। তারেকের ইনকামের একমাত্র স্বীকৃত উৎস হিসেবে ধরা যায় তার মা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংসদের বেতন। তবে তা দিয়ে লন্ডনে এই বিলাসী জীবনের একাংশও বহন করা সম্ভব কি না সন্দেহ।

মাথার উপর মামলার বোঝা 
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ তারেক রহমানের ওপর ঝুলছে ১৪টি মামলার খড়গ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন চলে আসার পর তা বাতিল করে বর্তমান সরকার। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পলাতক বিবেচনায় একাধিক মামলায় তারেক রহমানের জামিন বাতিল করে আদালত। এছাড়াও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৫টি মামলা ঝুলছে সেগুলোর মধ্যে ২৩টি মামলাই তত্ত্বাবধায়ক আমলে দায়ের করা।

যুক্তরাজ্য নেতৃবৃন্দ যা বলেন
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির নেতৃবৃন্দের মতামত জানতে চাইলে তারা অনেক কথা বলেছেন।
 
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে আশ্রয় পেয়ে ছিলেন। লন্ডনে জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাকে একটি হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। দারুণ অর্থকষ্টে একেবারে নিঃস্ব কপর্দকহীন অবস্থায় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবীর কথা তো কারো অজানা নয়। ইদি আমিনকে সৌদি আরবে ঝাড়–দারের চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছিল আর রেজা শাহ পাহলেবীর অবস্থাও খুবই করুণ ছিল। তারেক রহমান হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ
  নিজের করে নেয়া অনৈতিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিকল্প ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। সেই অর্থ দিয়েই তারেক রহমান লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থ পাচারের ঘটনাটি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। রাজনৈতিক পাওয়ার বা শক্তি বিক্রি করেই তারেক রহমান এই অঢেল অবৈধ অর্থ ও বিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে যেমন একদিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণের আদালতেও একদিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই দিন বেশি দূরে নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে তারেক রহমানের বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেনাবেচার রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। স্বগর্বে তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি চর্চা কঠিন করে ছাড়বেন। সে ধারা অক্ষুণ
œ রেখে তারেক রহমান একই পথ অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ সম্পদ লুটপাট করে সাহসী তারুণ্যের অহঙ্কারকে কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার সূচনা করেন। হাওয়া ভবনকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র করে তারেক-কোকো-মামুন এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। লুটের সেই অর্থেই তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি। তাই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। লন্ডনে দীর্ঘদিন কী অবস্থায়, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় তিনি আছেন তা জনগণের জানার অধিকার পর্যায়ে পড়ে। এখানে অবস্থানের ব্যয়ভার কীভাবে তিনি নির্বাহ করেন সে সত্যও প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব দুর্নীতি মামলা তার ওপর হয়েছে, সৎ সাহস থাকলে বাংলাদেশে গিয়ে সেগুলোর মোকাবেলা করা উচিত। সন্ত্রাসী চক্র আর দুর্নীতিবাজরা মিডিয়া থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তারেক রহমান
  মিডিয়াকে ভয় করেন কেন? লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে একজন রাজনীতিক হিসেবে সে সত্য তার প্রকাশ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এমএ মালিক বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন সংগঠক ও কর্মী হিসেবে এ সত্য আমার অজানা নয় যে তারেক রহমান নিজের সকল ব্যয়ভার নিজেই বহন করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। তার পিতা জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তাই তাকে কারও দয়া দাক্ষিণ্যের উপর ভরসা করে লন্ডনে বসবাস করতে হবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া মনিরুল আলম এ ব্যাপারে কোনো প্রকার রাখঢাক না করে বলেন, তারেক রহমানের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তার খাওয়াপরার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না। সিলেটি ভাষায় তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পোয়া। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন নিজের শক্তি ও সামর্থ্য।ে আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে অনেকেই আছেন যারা আমাদের রেস্টুরেন্টে ভাত খেয়ে, থেকে লালিতপালিত হয়েছেন। অনেকের হাত খরচের অর্থ আমরা যুগিয়েছি। তারা এখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে আছেন বলে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রও নেই। দেখেও না দেখার ভান করেন। আর তারেক জিয়া আমাদের নেতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগামী দিনের বীর সেনানী তিনি যদি অর্থকষ্টে থাকেন তাহলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা প্রাণ উজাড় করে শর্তহীনভাবে তাকে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে জাতির কাণ্ডারি হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করুন সে প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেছেন, কিছু কিছু বিষয়ে রাজনীতি না এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য তারেক রহমান লন্ডন এসেছিলেন। এখনো তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শেই লন্ডনে তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে সে ব্যাপারে উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা গুঁড়ে বালি। বিষয়টি তদন্ত করা তো দূরের কথা বর্তমান সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর একটি মামলা দায়ের করে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে।

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7532

এটাই হওয়ার কথা ছিল? মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়া সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সীমাহীন ধৈর্য দেখতে পাই আমরা। ধৈর্য নেই কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে।


এটাই হওয়ার কথা ছিল?

হা সা ন মা মু ন

বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে যেভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে, আইনগত ভিত্তি থাকলেও সেটাকে সরকারের বলপ্রয়োগ বলে মনে হতে পারে। সরকার পক্ষ থেকে অবশ্য আভাস দেয়া হচ্ছিল, নোটিশের মাধ্যমে নির্ধারিত ১২ নভেম্বরের পর তাকে আর ওখানে অবস্থান করতে দেয়া হবে না। এর পক্ষে মামলাটিতে হাইকোর্টের রায়ের কথাও জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল। কিছুটা বিস্ময়কর যে, বেগম জিয়ার পক্ষে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হলেও সরকারের সম্্‌ভাব্য উচ্ছেদ অভিযান বন্ধে তার কাছে স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়নি। কেন চাওয়া হয়নি, তার কোন ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত দেননি বেগম জিয়ার আইনজীবীরা। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ‘হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে’ সরকারকে যে অভিযান পরিচালনা করতেই হবে, তাকে ঘিরে মানুষের সহানুভূতি কাড়তে ও রাজনৈতিক ইসুø তৈরি করতেই স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়নি। এও বলতে হবে, সরকার এর সুযোগ নিয়ে একদিনও দেরি করেনি বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে। সেটি করলে নাকি আদালত অবমাননা হতো!

এমন অনেক দৃষ্টান্তই দেয়া যাবে, যেখানে আদালতের রায় বা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকার রীতিমতো গড়িমসি করছে। আদালতের কাছে গিয়ে রায় বাস্তবায়নে সরকারের সময় প্রার্থনার দৃষ্টান্তও কম নেই। ওইসব ক্ষেত্রে হয়তো ব্যাপক মানুষ বা অর্থনীতির স্বার্থ জড়িত। বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে আরও ক’টা দিন পর উচ্ছেদ করলে এমন কী জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হতো- সংশ্লিষ্টরা কি তা বুঝিয়ে বলতে পারবেন? ঈদের বেশি বাকি নেই। তার চেয়ে বড় কথা, উচ্চতর আদালত মামলাটির শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন। সেটিকে এক ধরনের স্থগিতাদেশ ধরে নিয়ে অপেক্ষা করলে তাকে শুধু আদালতের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ বলেই প্রচার করা যেত না- জনগণের মনে হতো, সরকার তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেও ধৈর্য ধরতে জানে। জনগণ দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষভাবে ভুগে দাবি জানানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়া সন্ত্রাসীদের বিষয়েও তার সীমাহীন ধৈর্য দেখতে পাই আমরা। ধৈর্য নেই কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে। বিএনপির বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ তোলা যাবে, হয়তো বেশিই যাবে। কিন্তু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তো আশা করে আছে- কোন না কোন পক্ষ, কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও থেকে ধৈর্যের চর্চাটি শুরু করবেন। ‘সুযোগের সদ্ব্যবহারের’ চেষ্টা থেকে নিজেদের বিরত রেখেও এ চর্চা শুরু করা দরকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, বিশেষত আমাদের মতো দেশে যেখানে সরকার সাংবিধানিকভাবেই অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী, সেখানে তার কাছেই এ দাবি বেশি করে উচ্চারিত হবে।

বোঝাই যাচ্ছিল, বর্তমান সরকার বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে আর থাকতে দেবে না। তাকে ওই বাড়ি বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়াগত ত্রুটি তারা বের করেছেন সফলভাবেই। হাইকোর্টে তা গ্রাহ্যও হয়েছে। হয়েছে বলেই তারা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের দেয়া নোটিশ বাতিল করেননি। বিএনপিরও অনেকে এখন বলবেন, সরকারের অ্যাকশনের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়াটা ঠিক হয়নি। উচ্চ আদালতও সঠিকভাবে চলছে না বলে তারা বলা যায় রোজ বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। অনেকে মনে করেন, বেগম জিয়ার উচিত ছিল সরকারের মনোভাব বুঝে; জনমত, নৈতিকতা ইত্যাদিও বিবেচনায় নিয়ে নোটিশ পাওয়ার পরপরই ওই বাসভবন ছেড়ে দেয়া। বিএনপির একটি অংশ নাকি চাইছিল আদালতে না গিয়ে এ ইসুøতে রাজপথ উত্তপ্ত করতে। দলে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বেগম জিয়া নিশ্চয়ই ওটা অনুমোদন করেননি। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করাটাও তারই সিদ্ধান্ত নিশ্চয়। স্থগিতাদেশ না নিয়ে তিনি যে ১২ নভেম্বরের পরও ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেটা কার সিদ্ধান্ত? তিনি কি জানতেন না, সরকার তাকে ওই বাড়িছাড়া করতে ব্যগ্র? ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে তিনি যেভাবে ওই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, তাতে মানুষের সহানুভূতি তিনি পাবেন। তবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে সরকার সমর্থকদের সহানুভূতি কতটা তার পক্ষে যাবে, সে প্রশ্ন রয়েছে। এমন মানুষও কম নেই, যারা মনে করেন একজন নিহত রাষ্ট্রপতির বিধবা স্ত্রী হিসেবে তিনি অনেক বেশি পেয়েছেন ও নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভেতরেও এমন মনোভাবের লোক সময়ান্তরে বেড়ে গেছে বলেই মনে হয়। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন, বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা হবে সেখানে।

পরে যাই করা হোক, আপাতত বেগম জিয়ার নামে বরাদ্দ ওই বিশাল বাড়ি ও জমি দখলে নিয়েছে সরকার। সুপ্রিমকোর্টে নিষ্পত্তির পর অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যে কাজটি তারা নির্বিঘ্নেই করতে পারতেন, সেটি করেছেন দৃষ্টিকটুভাবে। প্রকৃত ঘটনা ঢেকে রাখতে কিছুটা বিকৃত প্রচারণারও আশ্রয় নেয়া হয়েছিল বলতে হবে। এ নিবন্ধ যেদিন লেখা হচ্ছে, সেদিন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকে বিএনপিও এর যথাযথ জবাব দেয়নি। ঈদের বাজারে লোকে যখন গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটছে এবং কোরবানির পশু পরিবহনেও ব্যস্ত অনেকে, তখন এ ধরনের কর্মসূচি কেউ পছন্দ করবে না। সকাল-সন্ধ্যার হরতালকে অর্ধদিবস করা হলেও বোঝা যেত, তারা রাজনৈতিক বিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। জনস্বার্থে দীর্ঘ সময়ের জন্য ডাকা হরতাল পালনেরও সামর্থø কি অর্জন করতে পেরেছে বিএনপি? বেগম জিয়াকে ওভাবে উচ্ছেদের প্রতিবাদে কিছু অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটালেও দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভও সংঘটিত করতে পারেননি তারা।

সরকার নাকি ভেবেছিল, ঈদের আগে বিএনপি ওই উচ্ছেদের প্রতিবাদে অন্তত হরতাল ডাকবে না। বিএনপি ও বেগম জিয়াও কি ভেবেছিলেন, সুপ্রিমকোর্টে শুনানির আগে সরকার ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করবে না? দু’পক্ষই যদি তাই ভেবে থাকে, তাহলে বলতে হবে তারা পরস্পরকে কম চেনে। তবে দু’দলই এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চেনা। জনগণের অন্তত বড় দলনিরপেক্ষ অংশটি চায়, চেনা দৃশ্যপটে তারা কিছু পরিবর্তন অন্তত আনুন।
হাসান মামুনঃ সাংবাদিক