স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তা


স্নেহময় অভিভাবকত্ব যৌন-রসাত্মক টাইম
তরুণীর বুকের দুধ শিশুকে খাওয়ানো নিয়ে তোলপাড় চলছে। ঘটনাটি ঘটেছে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়া ওই ছবিটি নিয়ে। বিষয়টি স্নেহময় অভিভাবকত্ব হিসেবে ধরে নিলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যত দোষ নন্দ ঘোষ হলে সমস্যা। আর সমস্যাটা হয়েছে প্রকাশ্যে পত্রিকার পাতায় দুধ খাওয়ানের দৃশ্য নিয়ে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে সাহসী স্নেহময় অভিভাবকত্বধারী সেই নারীর নাম লিন গ্রুমেট। বিতর্ক উঠেছে এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের বলে। কথা উঠেছে বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না।

তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এক তরুণী। এটাই ছিল এ সপ্তাহের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। ‘স্নেহময় অভিভাবকত্ব’ শিরোনামের প্রতিবেদনটির জন্য তোলা হয়েছিল ছবিটি। আর এটা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিতর্কে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা এ ম্যাগাজিনটি। অনেকেই উৎসাহিত করেছেন সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তাকে। আবার অনেকেই প্রকাশ করেছেন ভীত ও সন্দেহমূলক অভিব্যক্তি।

তবে লস অ্যাঞ্জেলেস নিবাসী গ্রুমেট তার তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে খুবই স্বাভাবিক ও জৈবিক ব্যাপার বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি তার মা তাকে ছয় বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাইয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষকে বুঝতে হবে যে এটা জৈবিকভাবে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। মানুষ এটা যত বেশি দেখবে, ততই আমাদের সংস্কৃতিতে এটা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে। আমি এখন তেমনটাই আশা করছি। আমি চাই মানুষ এটা দেখুক।

তবে টাইম ম্যাগাজিনের এ প্রচ্ছদ নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে। এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের উদ্রেক করবে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শিশুটি যখন বড় হবে, তখন তাকে অনেক বিদ্রƒপের মুখে পড়তে হবে। বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না, এসব বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। আরকানসাস নিবাসী ছয় সন্তানের জননী ববি মিলার বলেছেন, এমনকি একটা গরুও জানে কখন তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস ত্যাগ করা দরকার। আর প্রচ্ছদটি সম্পর্কে তার অভিমত, ‘এটাকে কেন এখানে আনতে হবে? এটা হাস্যকর।বিপরীতে টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষেও দাঁড়িয়েছেন শিশুযতœবিষয়ক কিছু সংগঠন। বেস্ট ফর বেবিস নামের একটি সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেটিনা ফোর্বস বলেছেন, এ প্রচ্ছদটা মূলধারার আমেরিকানদের কিছুটা কম রোগে ভুগতে সাহায্য করবে। নারীরা তাদের যে কোনো বয়সী সন্তানকেই বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। আর এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় এটাই।

নবজাতক চুরি ও বিকিকিনি


রাজধানীতে জামাই-বউ কেনা-বেচা

সরোজ মেহেদী: বৃহস্পতিবার, ১০ মে ২০১২: জামাই-বউ কেনা-বেচায় সক্রিয় সিন্ডিকেট। জামাইয়ের দাম লাখ টাকা। আর বউয়ের দাম মাত্র ৩০ হাজার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই চলছে এ ‘জামাই-বউ’ বেচা-কেনা। আর নবজাতক ছেলের সাংকেতিক নাম ‘জামাই’। আর মেয়ে হলো ‘বউ’। বাজারে জামাইয়ের কদরই বেশি। লাখ টাকার কমে কন্টাক্ট হয় না। বউয়ের বাজার তুলনামূলক খারাপ। তবে ত্রিশ হাজার টাকা কমে বউও মিলে না। নবজাতক বিকিকিনি বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে এমন তথ্য । অভিযোগ রয়েছে, ঢামেকের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ওয়ার্ড মাস্টারের যোগসাজশেই হচ্ছে এসব। নবজাতক কেনাবেচায় ছেলে শিশুর চাহিদা বেশি হলেও ‘সুশ্রী’ ধরনের মেয়ে শিশুর চাহিদাও নেহাত কম নয়। নিঃসন্তান ধনাঢ্য দম্পতিরা নবজাতক কেনাবেচার চক্রের কাছে জামাই-বউ পেতে অগ্রিম অর্থ ‘বায়না’ করে। বায়না দেয়ার এ চুক্তিগুলো করা হয় মূলত রাজধানীর বিভিন্ন মেটার্নিটি সেন্টারে। সাধারণভাবে এসব সেন্টারেই পাওয়া যায় অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারীদের। এ রকম কেউ না কেউ প্রায় প্রতিদিনই গর্ভপাত ঘটানোর জন্য এসব স্থানে আসেন। ঢামেক ছাড়াও রাজধানীর অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে সক্রিয় এ চক্র। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে তাদের পেইড এজেন্ট হিসেবে কাজ করে বহিরাগত কিছু মহিলা। স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া আয়াদের সঙ্গে মিশে শিশু চুরি করে তারা। ঢামেক হাসপাতালে যে সব মা গর্ভের সন্তানকে ফেলে রেখে চলে যায় তাদেরও তুলে নিয়ে বিক্রি করে এ চক্র। পুরান ঢাকার চানখাঁরপুর, নবাব কাটারা রোড, নাজিম উদ্দিন রোড, নিমতলী, আজিমপুর, নবাবগঞ্জ কমিউনিটি সেন্টার এলাকার বেশির ভাগ মেটার্নিটি সেন্টারে আড়ালে-আবডালে চলছে এ ব্যবসা। শিশু চুরির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী বাগিয়ে নেয়ার কাজও করে বহিরাগত কথিত আয়ারা। শিশু পাচাকারীদের কয়েকজন নিজেরাই এখন মেটার্নিটি ক্লিনিক খুলে বসেছে। তবে এসব ক্লিনিকের কোন সরকারি অনুমতিপত্র নেই। কোনটার সামনে আবার সাইনবোর্ডও নেই। সাধারণ রোগীদের কাছে তাদের পরিচয় ডাক্তার আর হাসপাতালগুলোতে দালাল। 

তাদের রয়েছে একটি নিজস্ব চক্র। চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, দালালদের কাছে খোদ প্রশাসনও অসহায়। নিজ ক্লিনিকে শিশুসহ ধরা পড়ে এ চক্রের একজন ২০০৯ সালে কোতোয়ালি থানায়, আরেকজন কয়েকবার বংশাল থানা ও অপরজন লালবাগ থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খেটেছে। জামিনে বেরিয়ে এসে আবার পুরোদমে ব্যবসা চালাচ্ছে তারা। 

নবজাতক চুরি বা বিকিকিনি চক্রের সদস্যরা মূলত ঢামেক হাসপাতালে আয়া পরিচয়ে কাজ করে চলছে। চিকিৎসা নিতে আসা নতুন রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে বাগিয়ে নেয়া এদের প্রধান কাজ হলেও মওকা পেলে নবজাতক চুরি ও বিক্রি করার কাজও করে সমানতালে। ঢামেক কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় বিভিন্ন সময় কিছু বহিরাগতকে হাসপাতালে অস্থায়ী আয়া হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়। এ সুযোগে তারা কোন অবৈধ কাজ অথবা অপরাধমূলক কাজ করছে কিনা তা দেখার সুযোগ কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হয় না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অস্থায়ী আয়াদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহায়তা করে হাসপাতালের এক শ্রেণীর ওয়ার্ড বয়, সর্দার ও ওয়ার্ড মাস্টার। ঢামেক হাসপাতালে বহিরাগত আয়া হিসেবে যারা কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে ওষুধ পাচার, শিশু চুরিসহ নানা সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ এরই মধ্যে এ ধরনের অপরাধে জেলও খেটেছে। সূত্র জানায়, দালালদের একটা গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করে লাইলী নামের একজন। তাকে প্রায়ই জরুরি বিভাগের গেটে অন্য বহিরাগত মহিলাদের সঙ্গে বসে থাকতে দেখা যায়। এখানে বসে থেকেই রোগীর গতি-প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করে তারা। গত ২৩শে এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রসূতি ওয়ার্ড থেকে চুরি হয় লিপি বেগমের নবজাতক পুত্রসন্তান। এ বছরের ১৮ই মার্চ ঢাকা মেডিকেলে আরও একটি শিশু চুরি হয়। এ ঘটনায় নাদিম নামে একজন ধরাও পড়ে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় এসব সমস্যা হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় আামদের বাধ্য হয়ে কিছু বহিরাগতকে কাজ করার সুযোগ দিতে হয়। তারাই নানা অপকর্ম করে। তিনি বলেন, হাসপাতালে রোগী বাড়লেও জনবল কমেছে। আমরা সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের জন্য আবেদন করেছি। নতুন নিয়োগ হলে এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।  লালবাগ জোনের ডিসি এএম খুরশীদ হোসেন বলেন, এসব ব্যবসার ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহ. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ সংক্রান্ত কোন তথ্য আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেবো।
Source: http://www.mzamin.com/details.php?nid=MzE5Ng==&ty=MA==&s=MTg=&c=MQ==

সুস্থ ও সবল থাকতে চান?


সুস্থ ও সবল থাকতে চান? পরিবারের সবার সাথে একসঙ্গে খান।

রিফাত ইসলাম, সুইডেন
পরিবারের সবাই একসঙ্গে
 খেতে বসা মানেই হাসি খুশী থাকা, সুস্থ থাকা। কি সবাইকে নিয়ে খেতে বসবেন তো? পরিবার কে সময় দিন, পরিবারের সঙ্গ উপভোগ করুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারগুলোর উচিত সকলে একত্র হয়ে খাবার গ্রহণের রীতি অনুসরণ করা। বর্তমান বিশ্বে শহুরে শিক্ষিত পরিবারগুলোর মধ্যে ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেলে স্বাস্থ্য ঠিক থাকে। একসঙ্গে খেলে মানসিকতাও উন্নত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউজার্সির অনুষদ রাটজারসের গবেষক এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে এর আগে ৬৮ বার বিজ্ঞানসম্মত তথ্য প্রকাশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পরিবারের অভিভাবকরা কর্মব্যস্ত থাকেন তাদের সন্তানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুখে যা ভালো লাগে সে খাবারই বেশি খেয়ে থাকে। কিন্তু পরিবারের সবাই যখন একসঙ্গে বসে খাবার গ্রহণ করেন তখন একে অন্যের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখেন। ফলে কোনটা কার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হবে সে বিষয়ে সবাই খেয়াল রাখেন।

সন্তানদের নিয়ে ব্যবসায়ী বা চাকরিজীবী বাবা-মার মধ্যাহ্ন বা নৈশভোজ একসঙ্গে করার তেমন সুযোগ তৈরি হয় না। এটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। গবেষকরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা, আস্থা, প্রেম এবং দৈনন্দিন মতবিনিময়ের জন্য দুপুরে ও রাতে বা অন্তত একবার পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে খাদ্যগ্রহণ করা উচিত। মানসিক প্রশান্তি প্রাপ্তির পাশাপাশি যা সবার শরীরকে সুস্থ ও সবল রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাইরে খাওয়ার প্রবণতার হার বেড়ে যাওয়ায় এ নিয়ে এক গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সচরাচর বাইরে সুষম খাদ্য গ্রহণের সুযোগ থাকে না বললেই চলে। পরিবর্তে ফাস্টফুড বা অন্য সস্তা খাবার গ্রহণের দিকে সবাই ঝুঁকে পড়ে।

যেনতেনভাবে ক্ষুধা নিবৃত্তি করাই তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ভিটামিন, ক্যালসিয়াম বা আঁশ জাতীয় খাবার যেমন শাকসবজি, ফল খাদ্য তালিকায় অনুপস্থিত তাকে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এ ধরনের খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। 

বাইরে নিয়মিত খাদ্য গ্রহণ মোটা হওয়ার অন্যতম কারণও বটে। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন, বাবা-মাকে সন্তান ও পরিবারের বয়জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খেলে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং পরিববারে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে। এ ধরনের সংস্কৃতি একান্নবর্তী পরিবারগুলোর মধ্যে বেশি ছিল।

পরিবার যত ছোট হয়ে আসছে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ বা সম্পর্ক আগের মতো থাকছে না। পরিবারের সন্তানদের মানসিক গঠন বিকাশের জন্য আত্মীয়তার মেলবন্ধন সৃষ্টি করা আবশ্যক। বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এ ধরনের সম্প্রীতি গড়ে তোলা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন।

——————————————————————
আপনার সন্তানকে কখনোই যা বলবেন না :

লিখেছেন কানিজ ফাতিমা

সব বাবা-মা ই চান তার সন্তানটি সেরা হোক,  সব কিছুতে ভালো হোক, চৌকস হোক৷ এজন্য তারা অনেক চেষ্টা করেন, ত্যাগ করেন, সময় দেন, সামর্থ অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করেন৷ এরপর ও যখন কাঙ্খিত ফল পান না তখন কষ্ট পান , মুষড়ে পড়েন৷ তারা তাদের কষ্টের এ অনুভুতি প্রকাশ করেন  বিভিন্ন ভাবে –

  • কেউ  রাগ করেন
  • কেউ চেচামেচি করেন
  • কেউ অভিযোগ করেন
  • কেউ  Nagging করেন ….

 যে কারণে  তারা রাগ, চেচামেচি, অভিযোগ বা Nagging করেন তার যৌক্তিকতা আছে৷ বাবা-মা সন্তানের ভালো চান বলেই  এগুলো করেন , কিন্তু তারা যে এই রাগ চেচামেচি করছেন, তার ফল কি হচ্ছে ? – অবশ্যই খারাপ৷ অর্থাত- কারণ যুক্তিযুক্ত হলেই আপনার কাজ ভালো ফল আনবে  তা নয় ৷ কারণ যুক্তযুক্ত হতে হবে এবং  Action positive হতে হবে – তবেই result positive হবে ৷ 

ভালো কারণ + Positive Action = Positive Result

ভালো কারণ + Negative Action = Negative Result

একটি কেস স্টাডি বলছি –

তাহমিদের বয়স ৭ বছর ৷ সে চঞ্চল প্রকৃতির ছেলে ৷ ফলে চেয়ারে অনেকক্ষণ বসে থেকে নিবিষ্ট মনে পড়তে বা লিখতে পছন্দ করে না ৷ লিখতে বসলে প্রথম দিকে হাতের লেখা ভালই হয় – কিন্তু কিছুদুর গিয়ে আকাবাঁকা হতে শুরু করে ৷ তার মা অনেক চেষ্টা করেছে , অনেক অনেক চেষ্টা -নানা রকম চেষ্টা ৷ এতে কিছুটা কাজ হয় , কিন্তু ততটা না ৷

অথচ পাশের বাসার তাদভীনের হাতের লেখা কত সুন্দর ৷ শান্ত হয়ে বসে সে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে ফেলছে , তার মাকে তেমন কষ্ট করতে হয় না ৷ ফলে তাহমিদের মা রেগে গিয়ে বলেন-

 ” তোকে নিয়ে কত চেষ্টা করলাম , কোনো কাজই হয় না ”

” তোকে দিয়ে কিছু হবে না ”

” এটাই পারিস না , জীবনে কি করবি?”

” এরকম করলে আর কিন্তু ভালবাসবনা ”

” পাশের বাসার ছেলেটি কত ভালো, আর তুই ….. ”

” তুই তো কিছুই শিখতে চাস না ”

তাহমিদের মা ফোনে তার বোনকে দুঃখ করে বলেন –

” ওকে নিয়ে এত চেষ্টা করি , কিছুতেই কিছু হয় না ..”

তাহমিদের মা এর এ কথা গুলো বলার কারণ কি? – তিনি মনে করছেন এভাবে বললে তাহমিদ শুধরে যাবে৷ কিন্তু আসলে ফল কি হচ্ছে ? 

  • তাহমিদ  আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে – আসলেই কি তার মধ্যে কোনো যোগ্যতায় নাই?
  • সে চেষ্টা করার Motivation হারিয়ে ফেলছে
  • সে মনে করছে তার মার কাছে সে মূল্যহীন ৷ এ বয়সে তার মা-বাবা আর স্কুলের বন্ধুরাই তার কাছে গোটা  বিশ্ব ৷ তার মনে হচ্ছে তার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরছে , তার বিশ্বের বড় অংশটাই অন্ধকার হয়ে গেছে ….
  • সে নিজের অজান্তেই rude ভাবে কথা বলতে শিখছে … ফলে  সেও অন্যদেরকে এভাবেই  আঘাত করে কথা বলবে …

    এ কেস স্টাডি থেকে আমরা কি জানলাম-

আমরা দেখলাম এই কথা গুলো বলার পেছনে আপনার উদ্দেশ্য ছিল তাহমিদের উন্নতি করা , ভালো করা৷ কিন্তু ফল হচ্চ্ছে উল্টো -তার ক্ষতি হচ্ছে ৷

আপনি এত কষ্ট করার পর কি সন্তানের ক্ষতি চান? যদি না চান , তাহলে আর একটু ধৈর্য্য বাড়ান৷ আপনার যত কষ্টই হোক কখনই আপনার সন্তানকে এটা বলবেন না যে- 

  • তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না …
  • তোমার মত ছেলে/মেয়ে আমার দরকার নাই ..

 কখনই তার সঙ্গে ওর  সমবয়সী কারো তুলনা করবেন না ৷ যদি কাউকে মডেল হিসাবে সামনে রাখতে চান তাহলে  মহত মানুষদের ছোট বেলার গল্প বলতে পারেন বা তার থেকে বড় কারো কথা বলতে পারেন ৷ বড়দের অনুকরণ করতে বাচ্চারা পসন্দ করে কিন্তু সমবয়সী কাউকে না ৷

অন্যের  কাছে  তার  নামে কখনও অভিযোগ করবেন না , অন্তত তখন করবেননা যখন সে তা শুনতে পায় ৷ এতে বাচ্চারা মনে করে মা (বা বাবা ) তার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে না   ..তার বদনাম করে …৷ এতে তার মন খারাপ হয় এবং তার Self Esteem কমে যায় ৷ তবে এর মানে এই না যে আপনি বাচ্চার সমস্যা নিয়ে অন্যের সঙ্গে আলোচনা করবেন না ৷ বাচ্চাদের সমস্যা গোপন না রেখে অভিজ্ঞ কারো সাথে এ নিয়ে আলোচনা করলে সুফল পাওয়া যায় ৷ তবে এক্ষত্রে যা মনে রাখতে হবে  তাহলো এটা বাচ্চার সামনে কখনই করা যাবে না ৷ এমনকি তাকে পাশের ঘরে রেখেও না – অনেক সময় মনে হয় তারা শুনছে না বা খেলা নিয়ে ব্যস্ত আছে …কিন্তু আসলে তারা শোনে৷ তার সম্পর্কে negative কোনো কথার একটি শব্দ ও যদি তার কানে যায় তাহলে  সে আপনার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে , মনে করবে ” মা মনে হয় সব সময়েই আমার নামে এসব কথা বলে…” ৷ তাছাড়া বাচ্চারা তার সম্পর্কে বাবা- মার মন্তব্য শুনতে খুবই আগ্রহী ৷ আপনি তার সম্পর্কে কিছু বলতে শুরু করলেই সে কান খাড়া করে তা শুনে , কিন্তু ভান করে যে সে আপনার কথায় একেবারেই মনোযোগ দিচ্ছে না ৷ কাজেই তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলুন ” তাহমিদ অনেক চেষ্টা করে …সে আগের চেয়ে উন্নতি করছে …আর একটু চেষ্টা করলে সে অনেক ভালো করবে …” ৷  নিজের সম্পর্কে এ রকম মন্তব্য শুনলে বাচ্চারা তাদের চেষ্টা বাড়িয়ে দিবে এবং আপনার সঙ্গে তার সম্পর্ক সদৃঢ় হবে ৷

মনে রাখবেন আপনার সঙ্গে আপনার বাচ্চার সম্পর্ক অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে তার সঠিক Development এর জন্য বেশী জরুরী৷

শেষ কথা:

এ কথা গুলো বলা যত সহজ করা তত সহজ না ৷ আসলেই এটা কঠিন একটি কাজ … একটু চিন্তা করুন – আপনি কি চাচ্ছেন ? সন্তান মানুষ করতে…এটা স্বাভাবিক একটি চাওয়া কিন্তু ছোট চাওয়া না ৷ পৃথিবীর  সবথেকে কঠিন কাজটি  আপনি করছেন- Human Resource Development ৷ পৃথিবীর সবথেকে উন্নত জীবকে গড়ছেন আপনি ৷ এটা অন্য যে কোনো কাজের চেয়ে Challenging৷ কাজেই অন্য যেকোনো কাজের চেয়ে বেশী ধৈর্য  ও বুধিমত্তার  প্রয়োজন এ কাজে ৷ এবং সেটা আপনাকেই করতে হবে -কারণ, আপনি আপনার সন্তানের ভালো চান 

%d bloggers like this: