ভাইব্রেশন অফ লাইফ, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান


একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন
 

মুর্তজা বশীর

চিত্রশিল্পী

পেইন্টিং, মুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার নানা ফর্মে কাজ করেছেন মুর্তজা বশীর। বাংলাদেশের চিত্রকলায় অগ্রগণ্য অবস্থান তার। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। উর্দু মুভি ‘কারোয়া’র চিত্রনাট্য লিখেছেন। হুমায়ুন কবীরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আলমগীর কবিরের মুভি ‘নদী ও নারী’তে কাজ করেছেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। গবেষক হিসেবে মদ্রা ও শিলালিপির আলোকে রচনা করেছেন বাংলার হাবশি সুলতানদের ইতিহাস। শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে। এতো কিছুর পরও ফটোগ্রাফি, ডাকটিকেট সংগ্রহের মতো শখের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অবিরাম পাঠ করে চলেছেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বইপত্র। তারুণ্যের দীপ্তি তাকে রাখে সদাচঞ্চল। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী শিল্পী চান ৯৩ বছরের জীবন। নির্মাণ করতে চান চারটি ডকুমেন্টারি মুভি। দ্রুত ঘুরে আসতে চান বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্নস্থল। তার জন্ম ঢাকায়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট, আশুতোষ মিউজিয়াম, ফ্লোরেন্সের দ্যেল বেলেস্ন আরটি, প্যারিসের ইকোলে ন্যাশনাল সুপিরিয়র দ্য বোজার্ট ও আকাদেমি গোয়েৎস-এ। ভ্রমণ করেছেন নানা দেশ, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলার লোকশিল্প। ১৯৯৮ সালে চিটাগং ইউনিভার্সিটি থেকে অবসর নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকছেন। কর্ম উদ্যোগী এ শিল্পী কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। দু’দফায় আয়োজিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন নিজের শিল্প, জীবন ও নন্দনতত্ত্ব ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা ও আমি মাহবুব মোর্শেদ। ২০০৭ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এখানে পুনর্মুদ্রিত হলো।

সাধারণভাবে আমরা জানি মুখ্যত বেঙ্গল স্কুলের মাধ্যমেই বাংলায় আধুনিক চিত্রকলা চর্চার সূচনা ঘটেছে। বেঙ্গল স্কুলের পর পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে বঙ্গীয় শিল্পধারা বলে কি কিছু তৈরি হয়েছে?

এ প্রসঙ্গে একটি কথা সর্বপ্রথম বলা উচিত যে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্পী মনে করেন, শিল্পকলার ভাষা হলো আন্তর্জাতিক। অতএব, আন্তর্জাতিকতা তার শিল্পে থাকতে হবে। এখানে একটি জিনিস আমার কাছে বেখাপ্পা লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা আমি স্বীকার করি, কিন্তু সে ভাষায় তো মাটির গন্ধ থাকতে হবে। আমরা আমেরিকার অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের কাজ দেখি, তারা রঙ ছিটিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে, রাগের সঙ্গে চওড়া ব্রাশ দিয়ে ইচ্ছামতো আঁকাজোকা করেছে। কেন? আমেরিকার সোসাইটি ছিল ভাঙনমুখী। বাবা ছেড়ে চলে গেছে, মা ছেড়ে চলে গেছে। এই যে টোটাল একটা এলিয়েনেটেড সমাজ। মানুষ সেখানে অনেকটা যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছে। ভেতরের এ রাগের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি শিল্পীদের রঙ ব্যবহারে, সেটার মধ্যে এক ধরনের অ্যাঙ্গার প্রকাশিত হচ্ছে। সাইড বাই সাইড আমরা দেখছি ওই সময় সাহিত্য ক্ষেত্রে বিট জেনারেশন। বিলেতে অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। জন অসবর্ন বিলেতে লুক ব্যাক ইন অ্যাংগার লিখলেন। সঙ্গে আরো অনেকে জন ওয়াইন, ফিলিপ লারকিন, কিংসলি অ্যামিস। পাশ্চাত্যের ওই সেন্সে এখনো কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ এলিয়েনেটেড হয়নি, এখনো যৌথ পরিবার। বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে থাকে। টোটালি এলিয়েনেটেড মানুষের পার্সেন্টেজ খুব কম। এখানে শিল্পকলার আন্তর্জাতিক ভাষার চিন্তাধারার ফলে দেখা গেল, এসব চিত্রকলায় মাটির গন্ধ আর দেশজ রঙ থাকলো না।

এর আরেকটি কারণ হলো, শিল্প সংগ্রাহক বলতে যা বোঝায়, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। শিল্প সংগ্রাহকরা যতোক্ষণ না আর্টকে একটি পণ্য হিসেবে লগি্ন করবে, ততোক্ষণ এখানে আর্ট ওইভাবে বিকশিত হবে না। এখানে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আমাদের দেশে আর্ট সংগ্রাহক গড়ে ওঠেনি। এখানে ছবির বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে অনেকটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন হিসেবে। ঘরের দেয়ালের রঙ, পর্দার রঙ, কার্পেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ফলে শিল্পীদের কাজেও উজ্জ্বল রঙের প্রয়োগ আমরা দেখি না।

বাংলার নিজস্ব ঘরানা গড়ে ওঠেনি, কারণ আমরা কথায় বলি আমরা বাঙালি, কিন্তু বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা কতোটুকু জানি? এটার জন্য অনেক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে ছোটবেলাতেই যোগসূত্র স্থাপন করে দিতে হবে।

তারপরও আমাদের এখানে যে একেবারেই কাজ হচ্ছে না, তা নয়। আমাদের কামরুল হাসান লোকশিল্প, কালীঘাটের চিত্রকলা ইত্যাদির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। রশীদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রির ফর্ম আমাদের নিজস্ব লোকশিল্প লক্ষ্মীর সরা থেকে নিচ্ছেন। আবার কাইয়ুম চৌধুরীকে আমরা দেখলাম, একদিকে কালীঘাট থেকে নিচ্ছেন, অন্যদিকে তার মধ্যে জ্যামিতিক যে বিন্যাস আমার মতে, সেটা অনেকটা জামদানি শাড়ির মতো। এরকম হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন বলে তো আমি দেখছি না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপিয়ান ঘরানার শিল্পী ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, আমার শিল্পকলায় মাটির গন্ধ নেই, দেশের গন্ধ নেই তখন আমার মনে হলো, একজন কৃষকের প্রধান কাজ হলো জমিটাকে চেনা। জমিটাকে চিনলেই সে সঠিক বীজটা রোপণ করতে পারবে। একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন।

ঐতিহ্যে হাত দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার আগে দুজন অলরেডি সেখানে হাত দিয়ে কাজ করেছেন। একজন যামিনী রায়, আরেকজন কামরুল হাসান। আমার কাছে মনে হলো, এরা বিরাট দুটি পাহাড় এবং এ পাহাড়কে অতিক্রম করার মতো শক্তিশালী শিল্পীসত্তা আমার নেই। দেখলাম, আমার কাজে যদি কামরুল হাসান বা যামিনী রায়ের গন্ধ থাকে, তবে সেটা একজন আত্মম্ভরী শিল্পীর জন্য প্রশংসার কথা নয়। ঠিক করলাম, আমার পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা ও আমার ঐতিহ্যকে যদি মেলবন্ধনে আনতে পারি, তাহলে আমি ওদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো এবং আমি সেভাবে বেশকিছু ফিগারেটিভ কাজ ২৫ বছর পর ১৯৯৩-তে শুরু করি। তবে এখনো মনে হয়, বাংলাদেশে আমরা ছবি আঁকছি ঠিকই, কিন্তু নামটা যদি মুছে ফেলা যায় তবে শিল্পীর আইডেন্টিটি দেখা খুব মুশকিল। এখানে মূল ব্যাপার হলো, আমার ঐতিহ্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমার ঐতিহ্যকে জানতে হবে, তার মধ্যে অবগাহন করে যদি শিল্প সৃষ্টি করা হয়, তাহলেই একটি নিজস্ব শিল্পধারা গড়ে উঠবে।

আমাদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়গুলো গভীর অভিনিবেশে পাঠ করেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণামূলক কাজও করেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে ইতিহাসের মতো বিষয়ের প্রতি আপনার আগ্রহের সূচনা কিভাবে ঘটলো?

আমি মনেপ্রাণে ইউরোপিয়ান চিন্তাধারায় আক্রান্ত ছিলাম। আমার বয়স যখন ২২ বছর, আমি এক রাতে বাড়ি ফিরিনি। আমার বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বাড়িতে ফিরলে না কেন? আমি বড় হয়েছি। এটা আমাদের সমাজে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে হয় না। আমার বাবা আমাকে ইটালিতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আমি ঢাকায় ফিরে আসার পর যখন কোনো চাকরি পেলাম না, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম করাচি চলে যাবো। আমি যখন কাপড়-চোপড় গোছাচ্ছি, আমার বাবা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আমাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলে না? আমি বললাম, নো, আমি গ্রোন আপ। কিন্তু ১৯৮০ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পকলা একাডেমী আমাকে জাপানে ফুকোকা সিটিতে একটি সেমিনারে পাঠালো, আমার ইন্টারপ্রেটার মেয়েটি ছিল সুন্দরী, তরুণী, বেশভুষায় আধুনিক। আমি যখন তার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম, সে কিন্তু হাত বাড়ালো না। সে তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাথাটা ঝুঁকিয়ে আমাকে অভিবাদন জানালো। এটা আমাকে ভীষণভাবে আহত করলো। আমার তখন ঈশপের গল্প মনে হলো। একটা কাক ময়ূরের পুচ্ছ পরেছিল। সে কাকও হতে পারেনি, ময়ূরও হতে পারেনি। আমার মনে হলো, বাংলাদেশ তো বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ নয়; এটি এ উপমহাদেশেরই অংশ এবং এ উপমহাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। লোকজ উপাদান ও জলবায়ুর প্রভাব থাকতে হবে কিন্তু ধারাবাহিকতা তো অস্বীকার করা যায় না। তখন আমার জানার ইচ্ছা হলো, আমি কে, আমি কী, কোত্থেকে এসেছি। এটি যখন আমার মাথায় ঢুকলো, তখন দেখা গেল আমি আসলেই আর কোনো ছবি আঁকতে পারছি না। আমি ‘৮০ থেকে ‘৮৪ পর্যন্ত কোনো ছবি আঁকিনি। সেসময় আমি নিজেকে খোঁজার জন্য এ দেশের ধর্মীয় গ্রন্থ, ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, পুরাণ-এগুলো পড়া শুরু করলাম।

তারপর ১৯৯০ থেকে ‘৯৭ এ সাতটি বছরে আমি গবেষণা করতে শুরু করলাম। আমার কাছে খুব অবাক লেগেছিল, বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে চারজন অ্যাবেসিনিয়ান। এরা এসেছিল দাস হিসেবে। এরা পরে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। আমি ওই সময় একটি বই করি, ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ নামে।

আমার মতে, ইউনিভার্সিটিগুলোর ইতিহাস বিভাগে মুদ্রাতত্ত্ব ও শিলালিপি সম্পর্কে পাঠদান করা উচিত। তাহলে এ দেশের ইতিহাস, মুদ্রা, সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। ইউনিভার্সিটি লেভেলে এগুলো পাঠ্য থাকলে সামাজিক কাঠামো বোঝা যেতো। আমরা মুখে বাঙালি বললে তো হবে না, সংস্কৃতিকে তো লালন-পালন করতে হবে।

ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চা আপনার শিল্পে কি ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে?

অবশ্যই ফেলেছে। ভবিষ্যতে আমার মনে হয়, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। যেটা আমার এখনো আসেনি, এখনো আমি একটা ফিগারের বেশি আঁকি না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে টেরাকোটা দেখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। টেরাকোটার একেকটা ফলকে যেভাবে কয়েকটা ফিগারকে অর্গানাইজ ও কম্পোজ করা হয়েছে সেগুলো আমি দেখেছি, যা আমার আঁকায় কাজে লাগবে। আধুনিক চিত্রকলায় টেক্সচার একটা এলিমেন্ট, এখানে যেহেতু কোনো রঙ ছিল না অতএব, আঁচড় কেটে শাড়ির নানারকম টেক্সচার করা হতো। এগুলো হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।

আপনি বলছিলেন যদি ৯৩ বছর বাঁচেন তবে আপনার শিল্প একটা পরিণত পর্বে পেঁৗছতে পারবে।

আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত, এ ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি শিখছি। কিন্তু সময়কে উত্তরণ করার মতো যে শিল্প, সেটা কিন্তু আমি সৃষ্টি করতে পারিনি। এই যে জ্ঞান আহরণ করছি এটা প্রয়োগ করার মতো যদি আরো বয়স আমি পাই, তাহলে আমি সফল হতে পারি। আমি আমার মাটি আমার দেশের রঙ এসব ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।

এই যে বাংলাদেশ, এর প্রকৃতি যদি দেখি, সব জেলার সব সবুজ কিন্তু এক নয়। সবুজের রঙ জায়গায় জায়গায় পাল্টে যায়। উত্তরবঙ্গের সবুজ কিন্তু একরকম, দক্ষিণবঙ্গের সবুজ অন্যরকম, আবার ডিস্ট্রিক্টওয়াইজ রমণীদের শাড়ির রঙ পাল্টে যায়। সব অঞ্চলে বেগুনি রঙ পাওয়া যাবে না। অনেক অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি আছে। সব অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি নেই। তবে কমন যে রঙ আমি সব অঞ্চলে দেখেছি, সেটা হলো নীল ও সবুজ। সিম্পল একটা দা’র ডিজাইন অঞ্চল ভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়। নৌকার শেপ, গলুই অঞ্চলভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়।

সবক্ষেত্রেই আমরা দেখছি নিজস্বতার একটা ব্যাপার কাজ করে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে উপলব্ধিটা এখন অনেক গভীরভাবে কাজ করছে। যেটা সিক্সটিজে অনুভূত হয়নি।

আমি কিন্তু এ বিষয়ে একমত নই। এখনো কিন্তু শিল্পীরা আমাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে ওইভাবে অনুসন্ধান করছে না, যতোটা আন্তর্জাতিক শিল্পকলার প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে।

এটা কেন হচ্ছে? আপনি বহুদিন শিক্ষকতা করেছেন। আপনার কি মনে হয় আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে গলদটা রয়ে গেছে? নাকি আমাদের অগ্রজ শিল্পীদের অনুসরণ করতে গিয়েই এটা হচ্ছে?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে কী পড়ানো হচ্ছে? আমরা পড়াচ্ছি ওয়েস্টার্ন আর্ট-একেবারে পৃমিটিভ থেকে লেটেস্ট পর্যন্ত। কিন্তু ওরিয়েন্টাল আমরা পড়াচ্ছি ঠিকই, সেখানে ইনডিয়ারটাতে জোর দিচ্ছি, ছুঁয়ে যাচ্ছি জাপান-চায়নাকে। আমার মতে, আমাদের পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তন করতে হবে। আমার বারোক, রকোকো বিস্তারিত জানার দরকার নেই। রেনেসাঁ জানলেই আমার জন্য যথেষ্ট। তারপর আসবো রিয়ালিস্ট পিরিয়ডে, তারপর ইমপ্রেশনিস্ট পর্বে। ইন বিটুইনগুলো আমরা টাচ করবো। আমি এশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ায় কী আর্ট হচ্ছে তা আমি জানি না। মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে কী হচ্ছে তাও আমরা জানি না। ইনডিয়ার আধুনিক আর্ট আমরা জানি না-যতোটা জানি অজন্তা, ইলোরা, রাজপুর, কাংড়া। তাও ভাসা ভাসা। ওরিয়েন্টাল আর্টের মধ্যে পার্সিয়ান আর্টকে ইমপর্টেন্স দেয়া উচিত, তারপর ইনডিয়ান আর্ট। কালীঘাট ও পাল চিত্রকলা আরো ডিটেইল পড়ানো দরকার। নেপাল, মিয়ানমার, শ্রী লংকা, থাইল্যান্ড, জাপান, চায়না-এগুলোকে ইলাবোরেটলি পড়ানো দরকার। ইউরোপিয়ানটা শিখবো শিল্পকলার ধারাবাহিকতা জানার জন্য।

পপ আর্ট নিয়ে এতো পড়ার দরকার নেই। জানার জন্য পড়বো। সাহিত্যেও একই ঘটনা, পাশর্্ববর্তী দেশের সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কিন্তু তেমন জানি না। আমাদের এখন পুরো জিনিসটার জন্য একটি ভিশন দরকার।

কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, আন্তর্জাতিক কি লোকাল ফর্ম, যে ফর্মেরই একটি ছবি তৈরি হোক, শিল্পবোদ্ধা ও রসগ্রাহীর অভাবে সেটা ব্যাপকমাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছতে বা গৃহীত হতে পারছে না। এখানে শিল্প সমালোচনার অবস্থাও খুব সুখকর নয়।

শিল্পকলার আন্দোলন বলতে যা বোঝায়, সেটা কিন্তু আমাদের এখানে দরকার নেই। এটা প্রথম যুগে দরকার ছিল। ১৯৫০ সালে যখন ঢাকা লিটন হলে ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী হলো, তখন দেখা গেছে ঘোড়ার গাড়ি করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে এসেছে। কারণ, ঢাকায় তখন বিনোদনের অভাব তাই একটা নতুন জিনিস চিত্রকলা দেখতে তারা এসেছে।

আমাদের ছাত্র অবস্থায় আমরা দর্শককে প্রাণপণে ফর্ম সম্পর্কে নানা কথা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন কেউ প্রদর্শনী দেখতে এলে তাকে আমি বোঝাই না। তার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হলো, সেটা আমি বোঝার চেষ্টা করি। আর্ট ক্রিটিসিজম বলতে যে জিনিসটি বোঝায়, সেটি আমাদের দেশে এখনো গ্রো-আপ করেনি।

বাংলাদেশের আর্ট বিকশিত করতে চাইলে সরকারের একটি প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মতো গরিব দেশে বিনোদনের অভাব। এ অভাবের কারণেই তরুণসমাজ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় যদি একটি আর্ট গ্যালারি থাকতো তাহলে ছোটবেলা থেকে বাচ্চারা আর্টের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারতো। আর্ট তো আমাদের দেশে একটি অভিনব জিনিস। সরকারের তো প্রচুর পরিত্যক্ত সম্পত্তি আছে, সেখানে হতে পারে অথবা শিল্পকলা একাডেমির একটি ঘরে হতে পারে। নিয়ম করতে হবে, এতে ছবি যারা দান করবে, সেটা হবে ইনকামট্যাক্স ফ্রি। এখানে শিল্পীদের একটি রেয়াত দিতে হবে। তাহলে আর্টিস্টরা বেনিফিটেড হবে। আজ শিল্পীদের কমপ্রোমাইজ করতে হচ্ছে, বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের জন্য ড্রয়িংরুম-বেডরুমের পর্দা ও কার্পেটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকতে হচ্ছে। এর থেকে তারা মুক্তি পেতো।

আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস, গল্পে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে পেইন্টিংয়ে তার কতোটা এসেছে? জিরো জিরো ওয়ান পার্সেন্ট। এতো বড় ভাষা আন্দোলনের কাজ কোথায়। ‘৫২ সালে আমি একটি লিনোকাট করেছি, আমিনুল ইসলাম একটি করেছেন। তারপর আর কোথায়? এগুলোর প্রতি আর্টিস্টদের আগ্রহ তৈরি হলো না কেন? আমি আগে বলতাম, আর্টিস্টরা হলো পরগাছার মতো। পরগাছা শব্দটা শুনতে খুব খারাপ লাগে। এ জন্য আমি এখন বলি আর্টিস্টরা হলো অর্কিডের মতো। অর্কিডও কিন্তু এক ধরনের পরগাছা।

আপনার সামপ্রতিক কাজগুলোর প্রসঙ্গে আসি। ডানা সিরিজ আঁকছেন আপনি এখন। এর মূল মেটাফোর প্রজাপতির ডানা। এটা কেন বেছে নিলেন?

শিল্পী হবো এটি কিন্তু কোনোদিন আমার বাসনা ছিল না। আমার আর্ট ভালো লাগে। বাসায় প্রচুর আর্টের বই ছিল। আমি ছোটবেলা থেকে এগুলো দেখতাম। কিন্তু প্যারিসে যখন পিকাসো, মাতিস, ভ্যানগগের ছবিগুলো দেখলাম, আমার মনে হলো এ ছবিগুলো আমার চেনা। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে ওগুলো দেখেছি। আর্ট শেখার জন্য কিন্তু আমি আর্ট ইন্সটিটিউটে ভর্তি হইনি। আর্টের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময়। আমি সবসময় মনে করতাম, এখনো মনে করি যে, এ সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। ফলে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে আমি বিশ্বাসী নই। যখন আমার বন্ধুরা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে চলে গেল আমি কিন্তু মনে-প্রাণে নিতে পারিনি। কিন্তু নিজেকে আবার খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমি বোধহয় আধুনিক নই। কিন্তু আমি তো সমাজকে বিশ্বাস করি। এখানে আমার মধ্যে একটা টানাপড়েন চলতে থাকলো। তখন আইয়ুব খানের সময়। দেশে একটা দমবন্ধ অবস্থা। আমি উপলব্ধি করলাম, আর্থ-সামাজিক কারণে কোথায় যেন একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। দেখলাম, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে। তখন আমি ওয়াল সিরিজ শুরু করলাম। ওয়াল সিরিজ আমি এঁকেছি ৯২টা।

যুদ্ধের সময় সপরিবারে পালিয়ে গিয়েছি প্যারিসে। সেখানে বসে আঁকলাম এপিটাফ ফর দি মারটারস। ছবিতে দেখালাম যোদ্ধারা মাঠে পড়ে আছে, আমার মনে হলো এদের কথা কেউ বলবে না। সবাই তার পার্টির লোককে নাম ফলকে আনবে। বাংলাদেশে এতো লোক মারা গেছে সবাই তো আর পার্টির লোক না; সাধারণ মানুষ। তখন এসব অজানা অচেনা শহীদদের উদ্দেশ্যে আমি ছবি আঁকা শুরু করলাম। পাথরের নুড়ি নিয়ে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো যোদ্ধা মারা যেতো, তখন তার মাথার কাছে একটা পাথর রাখা হতো। পাথরটা কিন্তু তখন আর পাথর নয়। ওটা একটা সিম্বল, উন্মুক্ত আত্মার, এটাকে মেনহির বলে। এ সিরিজ ‘৭৬ সাল পর্যন্ত আমি ৩৭টার মতো এঁকেছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু আঁকলাম। এরপরের মেজর সিরিজ উইং।

উইং শুরু করলাম ১৯৯৮ থেকে। দেখলাম মানুষের মধ্যে খুব হতাশা। মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষ যে বাংলাদেশ চেয়েছিল, সে বাংলাদেশ পায়নি। যুবক সমাজ ফ্রাস্ট্রেটেড। পত্রিকা খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই। তখন আমার মনে হলো, জীবনের জয়গান গাইতে হবে। আমি তখন দেখলাম প্রজাপতি জীবনের একটা স্পন্দন, লাইফ। যা স্ট্যাগনেন্ট নয়। এখানে ওখানে বসছে-উড়ছে। তখন আমার মাথায় এলো, প্রজাপতির অংশ আঁকার কথা। ভাইব্রেশন অফ লাইন, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান-এটিকে চিত্রায়িত করতে চাইলাম। আজ পর্যন্ত এঁকেছি ৯২টি। আমার মনে হয় ১১৫-১২০ পর্যন্ত যাবে। এরপর আমি যেটা আঁকার পরিকল্পনা করছি সেটা হলো, ওয়ালেরই আরেকটি ইন্টারপ্রেটেশন।

ওয়াল সিরিজটার মধ্যে একটা গুমোট ভাব ছিল। দমবন্ধ অবস্থা ছিল। পস্নাস্টার খসে গেছে, শ্যাওলা ধরেছে, ইট বেরিয়ে এসেছে। এখন আমার তো বয়স হয়েছে। স্মৃতি কিন্তু খুব মিষ্টি, বেদনার হলেও কিন্তু মিষ্টি। আমি মাঝখানে মেমোরি বলে কিছু কাজ করেছিলাম। এখন রেমিনিসেন্ট বলে একটা সিরিজ করবো। আমি ঢাকা, প্যারিস, ভেনিস, ফ্লোরেন্সে যে দেয়ালগুলো দেখেছি, সেখান থেকে অাঁকবো। এর মধ্যে কিন্তু হতাশা নেই। একটা বেদনা-বিধুর কথা। যেমন দেয়ালগুলোতে অনেক লেখা ছিল নানা রঙের। তারপর সাদা রঙ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় রঙগুলো দেখা যাচ্ছে। এটা আকার পস্ন্যান আছে। এটা আমি আঁকবো উইংটা শেষ করার পর। ফিগারেটিভ কাজও আমি করবো। ইস্ট-ওয়েস্টের যে মেলবন্ধন আমি করতে চেয়েছিলাম এটি পরিপূর্ণ হয়নি। একটি প্রদর্শনী আমার সব ফিগারেটিভ কাজ দিয়ে করতে চাই। বাংলাদেশের যে কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট এটা হয়তো করতে সাহস পাবে না। অবশ্য এ জন্য সুস্বাস্থ্য দরকার, আয়ু দরকার। সুস্বাস্থ্য আমার হাতে, কোনো অনিয়ম আমি করি না। কিন্তু আয়ু তো আমার হাতে নেই। আমি কী করবো?

http://30boxes.com/widget/8430731/JahanHassan/fbe55cb44992143598a6dadd06e09354/0/

পৃথিবীর মোট ভাষার অর্ধেক আজ হারিয়ে যেতে বসেছে


নৃ-জাতিগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতি

উপমহাদেশে নৃ-জাতিগোষ্ঠীর আবির্ভাব কবে ঘটেছিল তা সঠিক করে বলা মুশকিল। ইংরেজ শাসনামলে চা-বাগনে কাজ কিংবা রেললাইন বসানোর কাজ করতে করতে অনেক নৃ-জাতিগোষ্ঠী স্থায়ী আবাস গড়ে এ দেশে। সময়ের পরিক্রমায় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি নৃ-গাষ্ঠীর মধ্যে শুধুমাত্র চাকমা ও মারমা বাদে ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চংগ্যা, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়া, খিয়াং ও খুমী সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি খুবই সংকটের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে আদিমতম ভয়, বিস্ময়, বিধ্বংস ভীতি এবং লৌকিক-অলৌকিক বিশ্বাসের মাঝে সুন্দরবনে দূর অতীতে শেকড় গেড়েছে পুন্ড্র, পৌন্ড্র, ক্ষত্রিয় বা পৌদ শ্রেণীভুক্ত কৌম্য জীবনযাত্রার মানুষেরা। কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসা প্রান্তিক নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখেছেন আরেফীন করিম

শত প্রতিকূলতা আর ঝড় ঝঞ্ঝার মাঝেও বেঁচে ছিলেন বোয়া সিনিয়র। আন্দামান নিকোবরের গ্রেট আন্দামানিজ গোত্রের_প্রায় লক্ষাধিক বছরের প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর শেষ বংশধর এই ব্যক্তিটি সম্প্রতি মারা গেছেন। আর তার সাথে সাথেই যেমন বিলুপ্তি ঘটে বো’ ভাষার তেমনি কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়, একটি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাস। দুনিয়াজুড়ে এমনি ঘটনা পূর্বেও দেখা গেছে। দুঃখজনক ও বেদনাতুর এমনি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশেও। এদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভাষা আজ হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে। এ কথা বললে বোধ করি অতু্যক্তি হবে না, যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে কোনো কোনো নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতি হুমকী তথা বিলুপ্তির পথে রয়েছে। বিশেষ করে উলেস্নখ করার বিষয় হলো, যে সংবিধানে সরকার আবার ফিরে যেতে যাচ্ছে, সেখানেও নৃ-জাতি গোষ্ঠীর মানুষের ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতি তথা সমধিকার সম্বন্ধে স্পষ্টত তেমন কোনো ধারা-উপধারা নেই। অন্যদিকে এদেশের সুধী সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল কর্তাব্যক্তিরা- যারা শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করেন তথা বাণী কপচান তারা যতটা আগ্রহী স্প্যানিশ, ফরাসি, লাতিন, গ্রিক, ইতালিয়ান, ইংরেজি, আরবি ও ফরাসি’র শিল্প ও সংস্কৃতির সমকালীন ও ঐতিহ্যগত খোঁজখবর নিয়ে, আবার তারা ততটাই উদাসীন বাড়ির কাছের পড়শির শিল্প ও সংস্কৃতির বিষয়ে। মাঝে মাঝে অবশ্য সভা সেমিনারে তারা বক্তব্য রাখেন। তৃপ্তির ঢেঁকুর বলতে এতটুকুই। আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এসব জাতি গোষ্ঠীর আছে নিজস্ব ঐতিহ্য-পুরাণ, কিংবদন্তি-রূপকথা, যা সমৃদ্ধ করতে পারে আমাদের সাংস্কৃতিক রুচিকে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ৪৫টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৫ লক্ষ। এ কথা দুঃখজনক হলেও সত্য_সংবিধানে তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই_কিংবা অন্যভাবে বললে স্বীকৃতি নেই। আদমশুমারি-অনুসারে ১৯৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১১টি নৃতাত্তি্বক জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে_চাকমা ২, ৩৯, ৪১৭ জন, মারমা ১,৪২,৩৩৪ জন, ত্রিপুরা ৫২,৯৪২ জন, ম্রো ২২,১৬৭ জন, তঞ্চংগ্যা ১৯,২২১ জন, বম ৬,৯৮৭ জন, পাংঘোয়া ৩,২২৭ জন, চাক ২,০০০ জন, ঘিয়াং ১৯৫০ জন, খুমী ১,২৪১ জন এবং লুসাই ৬৬২ জন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ৯টি জাতিসত্তার মোট জনসংখ্যা এক লক্ষেরও নিচে। ভাষা নিয়ে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, যে ভাষার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ লক্ষের নিচে তারা হারিয়ে যাবে বিলুপ্তি শব্দের মাঝে। পৃথিবীর মোট ভাষার অর্ধেক আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে হারিয়ে যাচ্ছে ১২টি ভাষা। পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী আসন করে নিচ্ছে।

সময়ে বন্দি কলরবের মাঝে কখনো কখনো খরা, বন্যা, গোর্কি, সুনামি, ভূমিকম্প, অগ্নু্যৎপাত, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, গণহত্যাজনিত দুর্ভোগ এবং অন্যান্য দুর্গতির জন্য হঠাৎ একটি ভাষাগোষ্ঠী লোপ পেয়ে যেতে পারে। ব্যাপক দেশত্যাগ কিংবা অন্যদেশ থেকে শরণার্থী বা অভিবাসীদের সংস্কৃতির বিড়ম্বনা বৃদ্ধি পেতে পারে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আগমনে-স্থানীয় সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ইউরোপে উপনিবেশ পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় প্রধান ভাষা ছিলো ২৫০টি। শত শত আঞ্চলিক ভাষার মাঝে বর্তমানে সেখানে ১৭টি নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বেঁচে রয়েছে। সাধারণত তার ধর্ম ও ভাষার সঙ্গে নিজের স্বরূপ নির্ণয় করে থাকে। একটি ভাষার মৃতু্য হলে একটি সংস্কৃতির মৃতু্য ঘটে। সংস্কৃতির বাহক হচ্ছে ভাষা। ভাষার মৃতু্য হলে সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় সেই ভাষায় রচিত কাহিনী, গল্প, রূপকথা, কিংবদন্তি, ছড়া, কবিতা, গান, ইতিহাস, ঐতিহ্যসহ সবকিছু।

বাংলাদেশের সংবিধানে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে উলেস্নখ করা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। দেশে বসবাসকারী অন্য কোনো সম্প্রদায়ের কথা এখানে উলেস্নখ করা হয়নি। অথচ বাংলা ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামেই রয়েছে ১১টি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা। অন্যদিকে কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বড়গুনায় বসবাস করে ‘রাখাইন’ সম্প্রদায়। তাদের রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা ‘বর্মী’। একই ভূখণ্ডে বসবাস করলেও নিজস্ব সংস্কৃতিকে তারা সঠিকভাবে উদযাপন করতে পারছে না। এখানে হুমকি শব্দটি ব্যবহার না করে বরং বলা যায়, করাল কালের রক্তচক্ষু। অথচ এ সকল আদিবাসী জাতিসত্তার রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আদিবাসীদের মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। সংবিধানের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ শীর্ষক শিরোনামে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।’ এখানে শুধুমাত্র জাতীয় ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির কথা উলেস্নখ করা হয়েছে। সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্বন্ধে তেমন কিছু বলা হয়নি। ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রণীত চুক্তির ২৭ ধারায় বলা হয়েছে ‘যদি কোনো দেশে আঞ্চলিক, ভাষাভিত্তিক বা ধমর্ীয় এমন জনগোষ্ঠী থাকে, যারা এই দেশে সংখ্যালগিষ্ঠ, তবে তাদের ক্ষেত্রে এই অধিকার অস্বীকার করা যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি উপভোগ, নিজস্ব ধর্ম অবলম্বন ও প্রচার এবং নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা যাবে না।’

১৯৯৫ সালের আদিবাসীদের অধিকারসমূহের খসড়া ঘোষণায় বলা হয়েছে যে, ‘সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিতে বিভিন্ন জাতি যে অবদান রাখে তা মানবজাতির এক যৌথ অধিকার।’ ২০০১ সালের ইউনেস্কো জেনারেল কনফারেন্সের ৩১ তম অধিবেশনে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর একটি সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হয়। আবার ২০০২’এর ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৫৬/১৬২ নম্বর প্রস্তাবটি পাস করিয়ে ভরসা দেয় যে, জাতিসংঘ লক্ষণ ও সংরক্ষণের উপায় হিসেবে বহুভাষিতা অসুরণ করবে।’ এতোকিছুর পরও শুধুই হোঁচট খাচ্ছে নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতি। ইতিহাসের বিবর্তনে নানা সম্প্রদায়, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে বাংলাদেশের অধীন ১৪৪৫ বর্গকিলোমিটার অধু্যষিত সুন্দর বনাঞ্চলে। দূর অতীতে পুন্ড্রু, পৌন্ড্র, ক্ষত্রিয় শ্রেণীভুক্ত কৌম জীবনযাত্রার মানুষের সংখ্যাধিক্য ছিলো এখানে। ক্রমে খাদ্যান্বেষণে, বসবাসের সন্ধানে, লুটপাটের লোভে, ধর্ম প্রচারের অজুহাতে এবং শাসন-শোষণের নিমিত্তে এখানে বসত গড়ে তোলে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, মগ-ফিরিঙ্গি ও নানা শ্রেণীর তফসিলি জাতি-উপজাতি। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বেদে-বাউল, ডগবানিয়া, মুণ্ডা বা বুনোরা। পাশাপাশি সমাজ বিন্যাস ঘটে উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের হিন্দু, মুসলমান, রাজন্য, জোতদার, মহাজন, প্রান্তিক চাষি ও নানা পেশাভিত্তিক শ্রেণীর মানুষের। তারই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের বিচিত্র সার্বভৌম পরিকাঠামোর ওপর গড়ে ওঠে মিশ্র লোকজীবনের সংস্কৃতি। আদব আদি মুণ্ডারা যে ভাষা, ধর্ম, বিশ্বাস ও সংস্কারের সংস্কৃতি বয়ে এনেছিল, আজকের মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মাঝে তার ছিটেফোঁটা রয়েছে। আর হারিয়েছে তাদের আদিম স্বভাব, ভাষা, ধর্ম ও পূজা-পার্বণ। কালে কালে গ্রহণ করেছে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি। সুন্দরবনে মুন্ডারা আজ পরিণত হয়েছে অপজাত সম্প্রদায়ে। তাদের দেখভাল করার যেমন কেউ নেই তেমনি সমাজেও তাদের অধিকার নেই। এক ভগবান তাদের উপাস্য হলেও হিন্দুদের সব পূজা-আর্চনায় তাদের করতে হয়। শুধু শীতকালের ‘শারোল পূজা’ই একমাত্র নিজস্ব কৃষ্টি হয়ে আজ বেঁচে রয়েছে মুণ্ডাদের মাঝে।

নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর সমঅধিকারই নয়, তাদের ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ আরো জোলালো ভাবে করা প্রয়োজন। শুধু রাষ্ট্রের একার এই দায়িত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের উপর এই কর্তব্য বর্তায়। আমরা কখনোই চাই না গ্রেট আন্দামানিজ গোত্রের ভাষা ‘বো’র ন্যায় কিংবা প্রতি বছর হারিয়ে যেতে বসা ১১টি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মতো আমাদের নৃতাত্তি্বক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা তথা শিল্প ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাক। শাশ্বত এক সত্য হয়ে এই সকল জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আরো বিকশিত হোক, বাঙালি সংস্কৃতির রুচিতে তারা আনুক নতুনত্ব এই প্রত্যাশা।

যুদ্ধক্লান্ত জীবনে এতো কবিতা আসে কী করে! ওদের তো দেশ নেই, ঘর নেই, মেঘের মতোই বেসে বেড়ায়, তারপরও এত আনন্দময় কী করে হয় জীবন?


সারা আকাশ আর কালো বোরখা

নু রু ল ক রি ম না সি ম

আরো কয়েকদিন থেকে গেলে হয়তো ভালো হতো। প্রবাসের বন্ধুরাও সেরকম ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ওয়াহিদ মাহমুদের মন সাড়া দিচ্ছিল না, তার মন উড়ে গিয়েছিল ঢাকার ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কের ছিমছাম একতলা অফিসে, তার একান্ত পৃথিবীতে। টরন্টো থেকে বিমানে উঠলেন আলো-অাঁধারের এক অপরূপ ভোরবেলা। এখন তীব্র শীত নেই। অসম্ভব গরমও নেই। এখন ফুরফুরে বাতাস আর চমৎকার আবহাওয়ার দিন।

সবসময়ই তার বিমানযাত্রা সুপ্রসন্ন হয়। এটা বহুবার ওয়াহিদ লক্ষ করে অভিভূত হয়েছে। এবং যেহেতু সে মার্কসিস্ট, সে তার অজানা ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এবারও জানালার একান্ত পাশের সিট পেল। অন্য সিটগুলোতে তার পাশে বসলো একজন ভারতীয়, একজন আইরিশ। ওই দুজনের আলাপচারিতায় সে জানতে পারল ওরা বিজনেস পার্টনারও আবুধাবির এক কোম্পানির। ওয়াহিদের চিরকালের শখ বিমানের জানালায় বসে মেঘের অনিশ্চিত বিচরণ দেখা। ঠিক যেন জীবনের মতো। মাঝে মাঝে সে অবাক হয়। মেঘেরা যেমন অবয়ব বদলায়, রং বদলায় সেও যদি তেমনটি পারত, জীবন অন্যরকম হতো তাহলে। তার জীবন অনিশ্চয়তার দোলায় কেবলই দুলছে। ভালো চাকরি পেয়েছিল, করেনি। মন্ত্রী ডেকে ব্যবসা দিতে চেয়েছিলেন, কোথায় যেন তার অাঁতে ঘা লাগল কী কারণে, সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দেয়নি। রাজনৈতিক পার্টিতে ডেকেছিল, যায়নি। সৃজনশীল প্রকাশনা আর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি তার প্রিয়তম পেশা। সে সেল্ফ অ্যাম্পলয়েড থাকতে ভালোবাসে। তা ছাড়া আছে বিশাল পৈতৃক সম্পত্তি। সেই উৎস থেকে কম টাকা আসে না প্রতি মাসে! লেবানিজ এয়ারহোস্টেসের সুরেলা কণ্ঠে তার কল্পনা আর ভাবনা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেল পানীয়ের। কিছুক্ষণ পর হালকা ব্রেক ফাস্ট। সেইসাথে বিশেষ অনুরোধে পানীয় পেল। লেবাননের মেয়েটি সি্নগ্ধ ও মায়াবী, ঠিক তার সেক্রেটারি বীথিকার মতো। হঠাৎ সে কথা মনে হতেই দুষ্ট করে মনটা নিভে গেল। বাইরে তখন সূর্যের আলো হঠাৎ নিভে গেছে, মেঘে মেঘে ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে সারা আকাশ। তার ভেতর দিয়ে মেঘ কেটে কেটে এগোচ্ছে ভিনদেশি এই বিমানটি।

বীথিকা হঠাৎ কী এক অজানা কারণে দেশ ত্যাগ করে চলে গেল। শুনেছে লন্ডনে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। তার হাজবেন্ড ভীষণ ভালোবাসত, বলা চলে একটু বেশি ভালোবাসত। সব সময় বাইরের ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে আগলে রাখতে চাইত। একটু বেশি পজিটিভ ছিল। এটা বীথিকার ভালো লাগত না। তাদের কারো বছরের দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তান নেই। বীথিকার মনে সব সময়ই সন্তানের জন্য একটা হাহাকার ছিল। সব কথা তার বস ওয়াহিদ মাহমুদকে বলত; কিন্তু লন্ডন যাওয়ার কথাটা বলেনি। তার স্বামীও জানতো না ব্যাপারটা। এক ডিভোর্সি বান্ধবী, যে আগেই চলে গিয়েছিল, জানা যায় সমস্ত ব্যবস্থা সেই করেছিল।

সোনালি রংয়ের পানীয় দিয়ে সোনালি চুল দুলিয়ে সি্নগ্ধ সুন্দর এয়ারহোস্টেস চলে গেল। ধন্যবাদ দিয়ে ওয়াহিদ বলল : না, তোমার চক্ষু দুইটি সত্যিই অপূর্ব সুন্দর। ইওর আইস আর বিউটিফুল। মেয়েটি শব্দ করে হাসল। অজস্র চুড়ি যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটির ভারি নিতম্ব দুলে উঠলো। উদ্ধত বুক যেন তীব্র কটাক্ষ হানলো। মেয়েটি বললো, ‘ইহা আমার চক্ষুদ্বয় নহে, ইহা সুন্দর তোমার দৃষ্টি যা আমাকে দেখে।’ ভোরের চমৎকার আলোর মতো এতক্ষণের জমে থাকা মেঘমেদুর বেদনা উড়ে গেল। তার মনে হলো, এরা কি জন্মগত কবি। যুদ্ধক্লান্ত জীবনে এতো কবিতা আসে কী করে! ওদের তো দেশ নেই, ঘর নেই, মেঘের মতোই বেসে বেড়ায়, তারপরও এত আনন্দময় কী করে হয় জীবন?

বোরখা ও নেকাব

বোরখা ও নেকাব

দীর্ঘ যাত্রা শেষে আবুধাবিতে ট্রানজিট। আধ ঘণ্টার। ওয়াহিদ নামল না। একটি সিলেটি পরিবার তার পাশের সিটে এসে বসলো। ভদ্রলোকের মুখে সামান্য দাড়ি। তার স্ত্রীর সারা শরীর কালো বোরখায় ঢাকা, শুধু চাঁদের মতো অপূর্ব মুখাবয়বটুকু বের করা। এতো সুন্দর মুখ অনেকদিন দেখেনি। বাংলাদেশের মেয়েরাও এরকম সুন্দর ও সি্নগ্ধ হতে পারে, তা ভেবে ভালো লাগে। এয়ারহোস্টেস মেয়েটির চেয়ে সুন্দর ও মায়াবী। চোখ দুটো কালো ও প্রেমময়। ঠোঁট দুটো পেলব, অনেকদিন সম্ভবত সেখানে চুমু পড়েনি। ভদ্রলোক সিলেটি। তিনি নিজে যেঁচে কথা বললেন। স্ত্রী-কন্যার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সব সিলেটিরা রক্ষণশীল নয়, ওয়াহিদের বিস্ময় জাগল। কথায় কথায় ওয়াহিদের বেশ কয়জন সিলেটি বন্ধুদের চিনতে পারলেন ভদ্রলোক। বিমান যাত্রার এই ভাসমান আড্ডা আরো জমে উঠল। ঢাকার স্মৃতি, সিলেটের স্মৃতি, টরন্টোর স্মৃতি_কত ছবি, কত কথা ওয়াহিদের লন্ডনের হারিয়ে যাওয়া যৌবনের দিনগুলো অবচেতনে নক করতে লাগল। এক সিলেটি বাসায় আশির দশকে সে পেয়িংগেস্ট হিসেবে ছিল। এসএসসিতে পড়ত। থাকত দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের বালামের কাছে ফোর্টস্কিউ রোডের একতলা লালইটের ছবির মতো এক বাড়িতে। হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল, দেশ তাকে গভীরভাবে টানল। সে পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে চলে এলো বাংলাদেশে। সিলেটি ভদ্রলোকের কোনো কথা তার কানে ঢুকছে না। আর ঢুকবে না পরবর্তী মুহূর্তগুলোতে। সে কোথায় কোন সুদূরে যেন হারিয়ে গেছে। তার আর উদ্ধার নেই, তার আর মুক্তি নেই।

বিমান ঢাকা এয়ারপোর্টের হাইওয়ে স্পর্শ করেছে। সবাই নেমে যাচ্ছে। সিলেটি পরিবারটিও বিদায় নিয়ে নেমে গেল। মহিলা শব্দহীন রহস্যময় হাসলেন। সেও। এখানেই কি সব কিছু শেষ! হঠাৎ সেলফোন বেজে উঠল। মহিলার কল এসেছে। তিনি হেসে হেসে খুব মৃদুস্বরে কী যেন বলছেন। সিলেটি ভদ্রলোক অস্থির, বিরক্ত এবং ক্ষেপে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ওয়াহিদের কাছে এসে অভিযোগ করলেন_অনেকটা সে রকম কণ্ঠ, ‘ওমরাও করাইয়া আনলাম, তবুও মাগির টেলিফোনের অভ্যাস গেল না।’

বিশ্বচরাচরের কোনোদিকে খেয়াল নেই, কালো বোরখা পরা মহিলাটি নিরন্তর কথা বলে যাচ্ছে_যেন এ আলাপচারিতা সহসা শেষ হওয়ার নয়।

—————————————————————————————————————————–

আকাশপথের খাবার : চলছে গবেষণা



বিমানের ভেতরের পরিবেশ কিছুটা ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ার মতো। কারণ যখন নাক বন্ধ হয়ে ঘ্রাণশক্তির সমস্যা হয়, স্বাদের অনুভূতিও কমে যায়। কম বায়ুচাপে আকাশপথে কফি খেতে খারাপ লাগে, তবে যাত্রীদের কাছে টমেটোর সস স্বাদু মনে হয়
জার্মানির লুফ্থহানসা এয়ারলাইন্স এবং এর ক্যাটারিং সহযোগী এলএসজি ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটকে অনুরোধ করেছে যে, ১০ হাজার মিটার উঁচুতে কোন ধরনের খাবার ভালো লাগবে এবং কোনটি লাগবে না।

ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, আকাশ ভ্রমণে বর্তমান প্রচলিত খাবার হতে হবে কড়া ধরনের অর্থাৎ ঝালে-মসলায় ভরা যারা আকাশপথে ভ্রমণ করেন তারা প্রত্যেকেই জানেন যে, বিমানের ভেতরের আবহাওয়া এবং পরিবেশটি কেমন থাকে। বিমানের ভেতর আর্দ্রতা থাকে মাত্র ১৫ শতাংশ। বিমানের শব্দে আরোহীদের চারপাশে ঠিক যেন মেলা থাকে এক ধোঁয়াটে সাদা চাদর। আর বায়ুচাপে শরীরের তরল হয় ঊর্ধ্বমুখী। এ রকম পরিস্থিতিতে তৃষ্ণা বেড়ে যায়, শ্বাস কম প্রবাহিত হয় এবং ঘ্রাণশক্তির ব্যাঘাত ঘটে। সম্প্রতি জার্মানির ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বিমানে পরিবেশন করা খাবার সম্পর্কে এক মজার তথ্য প্রকাশ করেছেন। আর তা হলো, আকাশপথে ভ্রমণের সময় বিমানের খাবারে লবণ, ঝাল এবং মসলাযুক্ত খাবার আরও বেশি দরকার। ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. ফ্লোরিয়ান মায়ার এ বিষয়গুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন এবং সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধান করছেন। তিনি বলেন, বিমানের ভেতরের পরিবেশটা কিছুটা ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ার মতো। কারণ তখন নাক বন্ধ হয়ে ঘ্রাণশক্তির সমস্যা হয়, স্বাদের অনুভূতিও কমে যায়। বায়ুচাপ কমে গেলেও এমনটিই ঘটে।

জার্মানির লুফ্থহানসা এয়ারলাইন্স এবং এর ক্যাটারিং সহযোগী এলএসজি এ কারণেই ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেছিল যে, ১০ হাজার মিটার উঁচুতে কোন ধরনের খাবার ভালো লাগবে এবং কোনটি লাগবে না। জানা গেছে, এ গবেষণার জন্য একটি বিমানের সামনের অংশে ৩০ মিটার দীর্ঘ টিউব আকৃতির চেম্বার তৈরি করা হয়েছে। এই চেম্বারটির ভেতরের বায়ুচাপটি নিয়ন্ত্রিত এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। ফ্লোরিয়ান মায়ার এ ব্যাপারে বলেন, এখানে আর্দ্রতার পরিমাণ রাখা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। আকাশে থাকার সময় বিমানের ভেতরে যে পরিবেশটি থাকে, তেমন পরিবেশই তারা তৈরি করেছেন এই চেম্বারটিতে। তিনি আরও বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়েও এর ভেতরের চাপটি কম রাখা হয়েছে। ভূপৃষ্ঠে বায়ুচাপ থাকে ৯৫০ হেক্টো প্যাসকল, কিন্তু বিমান যখন আকাশে থাকে তখন এর ভেতরের বায়ুচাপটি থাকে ৭৫০ থেকে ৮০০ হেক্টো প্যাসকল। আর এই টিউব আকৃতির চেম্বারটির ভেতরে আকাশ ভ্রমণে বিমানের ভেতরের পরিবেশটি যেমন থাকে, ঠিক তেমন পরিবেশই তৈরি করা হয়েছে। ঠিক যেভাবে বিমানের আসনগুলো কাঁপে এবং শব্দ হয়, এখানেও একইরকমভাবে কাঁপন এবং শব্দ হয়। শুধু তা-ই নয়, বিমানে দেওয়া খাবারের মেন্যুর মতোই এখানে খাবার দেওয়া হয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে ফ্রাউনহফার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, আকাশ ভ্রমণে বর্তমান প্রচলিত খাবার হতে হবে কড়া ধরনের অর্থাৎ ঝালে-মসলায় ভরা। ড. ফ্লোরিয়ান মায়ারের মতে, মসলাদার খাবার যেমন থাই বা ইন্ডিয়ান খাবার এ পরিবেশে দারুণ মানানসই হবে। আর এর কারণ হচ্ছে, এই খাবারের স্বাদটি সবসময় এক থাকে। এর মসলাদার ঝাল ঝাল ভাবটি কখনও কমে যায় না। কিন্তু সাধারণ খাবারে বাড়তি মসলা ঢেলে দিয়ে তবেই স্বাদ বাড়াতে হয়। অবশ্য লুফ্থহানসা তার বিমানের খাবারের মেন্যুতে বাড়তি কোনো সুরুয়া জাতীয় খাবার যুক্ত না করলেও এর ক্যাটারিং সার্ভিসটি ইতিমধ্যেই তাদের সরবরাহকৃত ব্রেডরোলে যুক্ত করেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, আকাশ ভ্রমণে যাত্রীরা টমেটোর সস বেশি খায়। আর কেন তারা টমেটোর সস বেশি খায় এ প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছিলেন গবেষকরা। লুফ্থহানসা এয়ারলাইন্স তার বিমানের খাবারের সঙ্গে বছরে শুধু ১৭ লাখ লিটার টমেটোর সসই সরবরাহ করে থাকে। টমেটোর এই সস একই সঙ্গে লবণ আর ঝালের কাজ করলেও ড. মায়ার বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, বায়ুচাপের সঙ্গে সঙ্গে টমেটোর স্বাদও বদলাতে থাকে। তাই মাটিতে বা ভূপৃষ্ঠে টমেটোর জুসের যে বদনাম রয়েছে সেটির স্বাদই আকাশপথে ভ্রমণের সময় সুস্বাদু হয়ে ওঠে। ড. মায়ার আরও বলেছেন, কম বায়ুচাপের কারণে আকাশপথে কফি খেতে একেবারেই খারাপ লাগে।

যে কোনো ডেজার্টে আরও চিনি ঢেলে তারপর এর মিষ্টি ভাবটা আনতে হয়। অনেক বিমানেই প্যাক করা স্যান্ডউইচ, কিছু মাঝারি ধরনের সাদামাটা খাবার সামান্য পরিবেশন করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন কোনো ঝাল-মসলাদার খাবার কিংবা স্বাদ বাড়ায় এমন মুখরোচক খাদ্য বিমানের খাবার মেন্যুতে যুক্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত খাবারের মেন্যুতে টমেটোর সস বা জুস টিকে থাকছে। আকাশপথে ভ্রমণের নতুন খাবার নিয়ে গবেষকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুব শিগগিরই চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হবে এবং ভোজনরসিকরাও মেপে মেপে কম মসলায় রাঁধা সব খাবারের পরিবর্তে ঝাল ও মসলাদার বিভিন্ন খাবার খেয়ে রসনায় তৃপ্তি আনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রদীপ সাহা

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

শিল্প সৃষ্টি ও নান্দনিকতা : শিল্প সৃষ্টি বুঝতে তার সৌন্দর্য অনুধাবন করতে বা রূপরস উপভোগ করতে সর্বোপরি মূল্যায়নে উলিস্নখিত সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই জরুরি


শিল্প সৃষ্টি ও নান্দনিকতা

আহমদ রফিক

শিল্পের নন্দনতাত্তি্বক ধারণা নিয়ে জটিলতার শেষ নেই। এর শুরু সেই প্রাচীনকাল থেকে। প্রাচ্যে সংস্কৃত সাহিত্যে রসতত্ত্বের ব্যাখ্যায় যেমন নন্দনতত্ত্বের উদ্ভাস তেমনি পাশ্চাত্যে গ্রীক দার্শনিকদের কাব্যতত্ত্ব বিচারে অপরিহার্যভাবে নান্দনিকতার বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। প্রসঙ্গত অ্যারিস্টটলে শিল্পতাত্তি্বক বিবেচনা স্মরণ করার মত। যেমন, কবিতা, জীবনের প্রতিরূপ ধারন করেও সৃষ্টিকর্মের ক্ষেত্রে যে বিশেষ রূপের অভিব্যক্তি ঘটায় (প্রাচ্যের রসতত্ত্বের অনুরূপ)। সেখানেই নান্দনিকতার প্রকাশ বা বিচার্যবিষয়।

ভরতীয় নন্দনতত্ত্বে রূপরস সৌন্দর্য আনন্দ ইত্যাদির বিচার-বিশেস্নষণে ‘রস’ শব্দটিরই বহুবিভাজিত প্রাধান্য। ভরতের নাট্যশাস্ত্র বিচারে রসের নানারূপ নিয়ে অভিনবগুপ্ত থেকে একাধিক আলংকারির বিচার ও জিজ্ঞাসা বিষয়টিকে যথেষ্ট জটিল করে তুলেছেন। রস বিচারে শৃঙ্গার হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভুত ইত্যাদি মূলে শৃঙ্গার বীর, বীভৎস ও রৌদ্ররসের উপস্থিতির কথা ভরতের নাট্যশাস্ত্র উপলক্ষে বলা হলেও এদের শৈল্পিক রূপের প্রকাশে শৃঙ্গার কৌতুক, করুণ, বীর, বীভৎস, বিস্ময়, যেমন অস্বীকার করা চলে না তেমনি বিবেচনা করতে হয় দুঃখ-বেদনা, ক্রোধ, ভয়, বিরক্তি, আনন্দ, উলস্নাস, ইত্যাদি অভিব্যক্তির, তা সে নাটকে হোক বা হোক কবিতাও অন্যান্য শিল্পকলার শাখায়।

অবশ্য একই বিষয়ে অর্থাৎ রস বিচারে অভিনব গুপ্তের উলেস্নখ করে বিলেতি বিশ্বকোষে প্রধান অনুভূতি হিসাবে আনন্দ, হাস্য, দুঃখ, ক্রোধ, ভয়, বিরক্তি, বীর ও বিনয় নির্ভর আট প্রকার রসের কথা বলা হয়েছে। এগুলোরও প্রকাশ ঘটতে পারে একাধিক রূপে এবং সেই সূত্রে নান্দনিক অভিজ্ঞতার উদ্ভব। উলিস্নখিত একাধিক রসের বিভিন্ন রূপ প্রকৃতিভেদ ও অনুষঙ্গ নিয়ে নন্দনতত্ত্ববিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ। শান্ত রসের পাশাপাশি কেউ কেউ ভক্তিকেও রস হিসাবে বিবেচনা করতে আগ্রহী।

অবশ্য রূপ যে রসের ধারক এ বিষয়ে মতভেদ যথেষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও বিতর্ক রয়েছে একে উৎস হিসাবে গ্রহণের ক্ষেত্রে। কিন্তু ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে রূপ থেকে তথা বস্তুরূপ থেকে যে রসের উদ্ভাস সে কথা কি অস্বীকার করা চলে? বিশেষ করে শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রেতো মোটেই চলে না। তা সে সম্পর্কে সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রকারগণ যাই বলুন না কেন। এসব ক্ষেত্রে ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। রূপ প্রসঙ্গে ঐ সূত্র ধরে তাই বিতর্ক বিস্তর। রূপ বস্তুনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও ভাববাদী দার্শনিকেরা অনেকেই এর চৈতন্যনির্ভর বিমূত অস্তিত্বে বিশ্বাসী। তাদের বিচারে রূপ কেবল বস্তু নিরপেক্ষই নয়, জ্ঞানেরও অতীত হতে পারে। অর্থাৎ রূপে- অরূপে একাকার। কিন্তু তাদের উলিস্নখিত ধারণা অর্থাৎ রূপের বস্তুনিরপেক্ষ ধারণার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ তাদের বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় না, তত্ত্বই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে। স্বাভাবতেই বস্তুনিরপেক্ষ রূপ যা কারো কারো ভাষায় শুদ্ধ রূপ নিতান্তই অভিজ্ঞতার অতীত। সেজন্যই যুক্তিবাদী কারো কারো কাছে এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আশ্চর্য যে, এই রূপ অপরূপের ভাববাদী তত্ত্বের ক্ষেত্রে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মধ্যে বড় একটা অমিল দেখা যায় না, বৃথাই অভিযোগ ওঠে যে, প্রাচ্যদেশীয় অর্থাৎ ভারতীয় সৈনিক বা জাপানি নন্দনতাত্তি্বকদের ধারনায় ভাববাদিতার প্রভাব সর্বাধিক।

তাই পাশ্চাত্যে নন্দনতত্ত্বের বিষয়গত গুণগত বিচারের পাশাপাশি এর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে জটিলতার প্রকাশ যথেষ্ট, বিতর্ক বিস্তর। এমনকি রূপ থেকে সুন্দরের ব্যাখ্যায় পশ্চাত্য নন্দনতত্ত্ববিদগণের বক্তব্য যেমন সহজ-সরল বা স্বচ্ছ নয়, তেমনি তাতে ভাববাদিতার প্রকাশও পরিমেয় নয়। তাই নন্দনতত্ত্ব সৌন্দর্য ও অভিরুচির দার্শনিক সমীক্ষা, এমন একটি সংজ্ঞায় পূর্ণতার সন্ধান মেলে না।

শিল্প সৃষ্টির বিভিন্ন শাখা বা চারুকলার মত বিষয় সামনে রেখে সুন্দর-অসুন্দর, শুভ-অশুভ, কল্যাণ-অকল্যাণ বা অনুরূপ দ্বান্দ্বিক নিরিখে নান্দনিকতার শৈল্পিক মূল্যায়ন একটি বাস্তব ধারা হওয়া সত্ত্বেও নন্দনতত্ত্বের সার্বিক বিচারে স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট মতবাদ তৈরি করতে গিয়ে তাত্তি্বকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে দার্শনিকতার আশ্রয় নিয়েছেন যা বিষয়টিকে জটিল থেকে জটিলতর করছে মাত্র। কিন্তু দার্শনিকদের তাত্তি্বক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য নন্দনতাত্তি্বক নীতিমালা বা গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বরং এর ফলে তৈরি হয়েছে শিল্প সৃষ্টির মূল্যায়নে নানাতত্ত্ব এবং প্রকরণ, বিষয়, অভিব্যক্তি আবেগ শৈলী ইত্যাদি নানাদিক থেকে শিল্পকর্মের নন্দনতাত্তি্বক বিচার বিতর্কের আবর্ত সৃষ্টি করেছে। এডমন্ড বার্কের নন্দনতাত্তি্বক ধারণায় মহৎ ও সুন্দরের ব্যাখ্যা যেমন নন্দনতত্ত্বের অবস্থান স্বচ্ছ করে তুলতে পারেনি তেমনি পারেনি কান্টের বস্তুবিচারের ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা হেসেলীয় দর্শনের দ্বিচারিতা। শিল্পকর্ম অনুভবগ্রাহ্য বিষয় হওয়ার কারণে এর মধ্যে বস্তুধর্মিতার প্রকাশ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক গুণধমর্ী রূপায়ণ।

এ ক্ষেত্রে ভাববাদী দার্শনিকেরা বরাবরই বিষয় ও প্রকরণ বিচারে প্রকরণ তথা কর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। কেউ আবার উলিস্নখিত বিষয় ও আঙ্গিক অবিচ্ছিন্ন সত্তা হিসাবে বিবেচনা করেছেন। যেখানে কর্ম হয়ে উঠেছে প্রধান। চিত্রসমালোচক ক্লাইভ বেল তাই শিল্প সৃষ্টিকে সিগনিফিকেন্ট কর্মরূপে দেখেন।

আর সে তাৎপর্যপূর্ণ ফর্মে পরম সত্তার আভাস পান। শিল্প সৃষ্টির মূল্যায়নে ভাববাদিতার এ চরম রূপায়ন একাধিক শিল্পী দার্শনিককে শিল্প বিচারে ফর্মের ফর্মালিজমে পথ হারাতে দেখা গেছে। ‘রূপ বর্ণ ও স্থান’ এমন এক ত্রিমাত্রিকতায় শিল্প সৃষ্টিতে রসের উদ্ভব, অর্থাৎ বিষয়বস্তুহীন রূপরসের উদ্ভব এ ধরনের বক্তব্য নান্দনিকতার প্রেক্ষাপটে উচ্চারিত হয়েছে।

অবশ্য অপেক্ষাকৃত অনুগ্র তাত্তি্বকদের মতে শিল্পকর্মের অন্তর্নিহিত কিছু স্থায়ী গুণ নান্দনিক অনুভব সৃষ্টি করে যা শিল্প সুন্দরের ব্যাখ্যায় ব্যবহূত হতে পারে। এ পথেই এক পা বাড়িয়ে বেনেদিত্তো ক্রোচে শিল্পকর্মের নান্দনিকতার ব্যাখ্যা ‘ংবহংড়ৎু বসনড়ফরসবহঃ’ -এর প্রতি নির্বিচার সমর্থন যোগান। তাঁর মতে শিল্প সৃষ্টিতে প্রাকৃত ঘটনা বা বস্তুধর্মের কোন স্থান নেই। শিল্পকর্ম বরং স্বজ্ঞা তা অন্তর্জ্ঞানের সাহায্যে সৃষ্টি যা পাঠক বা দর্শকের নান্দনিক অনুধাবনের বিষয় হয়ে ওঠে।

এ ধরনের তত্ত্বেও শিল্পের নন্দনতাত্তি্বক অনুধাবন স্পষ্ট হওয়া দূরে থাক তাতে ভাববাদিতার অস্পষ্টতাই প্রধান হয়ে ওঠে, কখনো সেখানে অধ্যাত্মবাদিতার মেঘও এসে জমা হয় যা ঐশী চেতনার পরমকে ডেকে আনে। হেগেল তাই শিল্প সৃষ্টির নান্দনিক ব্যাখ্যায় শিল্পধারার বৈশিষ্ট্যানুযায়ী আধ্যাত্মিক বিষয়ের বিবেচনার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। শিল্পবিচারে হেগেল-কথিত এ অধ্যাত্মবাদিতার জোয়ারে তাঁর বহুনন্দিত দ্বান্দিকতার সূত্র অজানালোকে ভেসে যায়।

একই ভাবে নিরাসক্ত ভাবনার নন্দনতাত্তি্বক অভিজ্ঞতা সৌন্দর্য বিচারের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় ভাববাদী ফর্মের আলোয়। প্রসঙ্গত কন্ট কথিত নান্দনিক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় বিষয়টিকে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ বস্তুধর্মিতার নিরিখে বিচার করেই লেখেন ‘আমার মতে নন্দনতত্ত্বের মূল কথা হল নান্দনিক অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার বিচার বিশেস্নষণ করা, সাধারণ রীতিনীতি বিশেষ করে বৈশিষ্ট্যগুলো দেখানোই তাত্তি্বকের প্রধান কর্তব্য।’

আবার এমন ধারণারও প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় যে, নান্দনিক অভিজ্ঞতা বিষয়-নির্ভর হয়েও মনও কল্পনাসহ নিছক ব্যক্তি চৈতন্য নির্ভর। এমনকি রূপ কিংবা সৌন্দর্যের ধারণাও ব্যক্তি চেতনা নির্ভর। শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এমন চিন্তা কাজ করে শিল্প সর্বস্বতার নন্দনতত্ত্বে প্রাধান্য পায়। কল্পনা শিল্প সৃষ্টির আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া হিসাবে উঠে আসে।

হিউমের বিচারে এ প্রক্রিয়ায় নান্দনিক অভিজ্ঞতা থেকে ভাব তথা ‘আইডিয়া’র উদ্ভাস। কাষ্ট অবশ্য কল্পনাকে নন্দনতাত্তি্বক অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাকার করে দেখতে আগ্রহী। তাঁর ধারণায় স্বজ্ঞা ও ধারণার (ওহঃঁরঃরড়হ ও ঈড়হপবঢ়ঃ) সমন্বয়ের পেছনে রয়েছে কল্পনা- যা শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার রূপ পরিগ্রহ করে।

শিল্প সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে নান্দনিকতা তথা শিল্পতত্ত্বের নান্দনিকতা নিয়ে এ ধরনের বিভিন্ন মতবাদের প্রকাশ প্রধানত ভাববাদিতার প্রধান্য ঘটাতেই দেখা গেছে যে কথা একাধিক প্রসঙ্গে উলিস্নখিত। এমন কথাও বলা হয় যে, শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে শিল্পীর উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা বিচার্য বিষয় নয়, সৃষ্টিই বিচার্য বিষয়। অর্থাৎ কোনো শিল্প সৃষ্টির গুণগত, সৌন্দর্যগত বা তাৎপর্যগত বিষয় শিল্পীর চিন্তা ভাবনা-নিরপেক্ষতায় বিচার-ব্যাখ্যাই নন্দনতাত্তি্বক দিক থেকে সঠিক।

শিল্প সৃষ্টিকে যদি আবেগের অভিব্যক্তি (রুশো) হিসাবে মেনে নেওয়া হয় তাহলে সেখানে সৌন্দর্য বা সঙ্গীতের প্রকাশ আর ব্যক্তি-নিরপেক্ষ, চৈতন্য নিরপেক্ষ থাকে না। এমন কি থাকে না কান্ট-কথিত নৈতিক ও আধ্যাতি্বক তাৎপর্যের নান্দনিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও। শিলার থেকে হেগেল সবাই শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইতিহাস ও বুদ্ধিবৃত্তির সত্যকে স্বীকার করেও রোমান্টিক ভাববাদিতাকেই প্রধান করে তুলেছেন। সেই সূত্রে টেনে এনেছেন আধ্যাতি্বকতা, ঐশীচেতনা, পরম বা শাশ্বতীর কল্পনা। আবার সৌন্দর্য সঙ্গীত ও আনন্দও নানা সূত্রে যুক্ত হয়ে নান্দনিক বিচারের ক্ষেত্রটিকে জটিল করে তুলেছে। কারো কারো মতে, এজন্য দায়ী নন্দনতত্ত্বের ওপর দার্শনিকতার প্রবল প্রভাব।

শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে সৌন্দর্য যেমন বিচার্য বিষয় তেমনি-এর নন্দনতাত্তি্বক বিশেস্নষণে আরো একাধিক উপাদান বিবেচনায় চলে আসে। যেমন আনন্দ নামীয় অনুভবের বিষয়টি। সৌন্দর্যের বিচার-বিশেস্নষণ করতে গিয়ে জর্জ সান্তায়ন আনন্দকে সৌন্দর্যের সঙ্গে একাকার নিয়েছেন। সুন্দর আনন্দের উৎস এবং সেদিক থেকে নান্দনিক অনুভবেরও মূল কথা। ‘মানুষের সর্বকর্মের ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত হয়েই সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ। আর সেক্ষেত্রে তার রূপ ও অভিব্যক্তি দুই পাশর্্বমুখ হিসাবে বিবেচিত হবার যোগ্য। এক্ষেত্রে তিনি ভাবানুষঙ্গের বিষয়টিতে গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন যে, অভিব্যক্তিবাদের মূল কথা হল বস্তুগত উপাদান থেকে উদ্ভূত সৌন্দর্য, আনন্দ ইত্যাদির প্রকাশ বা অভিব্যক্তি এবং এদুইয়ে মিলেমিশেই নান্দনিক অভিজ্ঞতা তথা নান্দানিক আনন্দের প্রকাশ।

আধুনিক নন্দনতত্ত্বে ক্রোচের প্রভাব যথেষ্ট হলেও বস্তুবাদী বা মার্কসবাদী তাত্তি্বকগণ তা গ্রহণ করার পক্ষপাতী নন। বিশেষ করে ক্রোচে যেখানে বিষয় ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রেও ‘ইনটুইশন’ বা অন্তর্জ্ঞানকে প্রধান করে তোলেন সেখানেই আপত্তি ও বিতর্ক দেখা দেয়। ক্রোচেশিষ্য কলিউডকে নিয়েও প্রায় একই ধরনের তাত্তি্বক সমস্যা। সমস্যা যেমন অভিব্যক্তি নিয়ে, উপায় (সবধহং) এবং লক্ষ্য তথা সমাপন নিয়ে- বিশেষ করে লক্ষ্য বা সমাপন (বহফ) যেখানে আপনাতেই আপনি সম্পূর্ণ- তেমনি সমস্যা কল্পনার ভূমিকা নিয়েও। কল্পনা সেখানে অভিজ্ঞতাকেও অতিক্রম করে যায়।

ললিতকলার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ অবশ্য আনন্দ প্রসঙ্গে, সৌন্দর্য প্রসঙ্গে কথাটা তার মত করেই বলেছেন। তার বিচারে শিল্প সৃষ্টির লক্ষ্য উপলব্ধির আনন্দ, বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ী এক হয়ে যাওয়াতে যে আনন্দ, অনুভূতির গভীরতা দ্বারা বাহিরের সঙ্গে অন্তরের একাত্মবোধ যতটা সত্য হয় সেই পরিমাণে জীবনে আনন্দের সীমানা বেড়ে চলতে থাকে, অর্থাৎ নিজেরই সত্তার সীমানা।’ সৌন্দর্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন ‘অনুভূতির বাইরে রসের কোনো অর্থই নেই। সৌন্দর্যরসের সঙ্গে অন্য সকল রসেরই মিল হচ্ছে ঐখানে যেখানে সে আমাদের অনুভূতির সামগ্রী।’

অন্যত্র (ঞযব সবধহরহম ড়ভ অৎঃ) রবীন্দ্রনাথ শিল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলেছেন ‘নির্বস্তুক রূপরস সত্য বিজ্ঞান ও অধিবিদ্যার অন্তর্গত হতে পারে কিন্তু বাস্তব জগৎ শিল্পকলারই ভুবন। শিল্পের নান্দনিকতা প্রসঙ্গে আমরা যে সৌন্দর্যের কথা বলি তা সাধারণ অর্থে নয় সৌন্দর্যবোধের গভীরতর অর্থেই বলে থাকি যা কবির ভাষায় ‘সত্যই সৌন্দর্য, সৌন্দর্যই সত্য’ হিসাবে উচ্চারিত।’ বাস্তবের পরিপ্রেক্ষিতেই অর্থাৎ জীবন চিত্রণের বাস্তবতায় শিল্পসৃষ্টির সৌন্দর্য আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে।’

এ বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ অনেকাংশে তার নান্দনিকতার প্রকাশ্যে বাস্তববাদী, কিন্তু অন্যত্র একাধিক রচনায় প্রাসঙ্গিক ভাববাদিতার প্রকাশও রয়েছে। এজরা পাউন্ডের নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক একটি কবিতার আলোচনা শেষে রবীন্দ্রনাথ (আধুনিক কাব্য) শিল্পসৃষ্টিতে পরিস্ফূট সৌন্দর্যকে ‘নৈর্ব্যক্তিক’ আখ্যা দিয়েছেন একই ছেলের চোখে সুন্দরী মেয়েও মার্কিন মাছের সৌন্দর্যে উপলব্ধির প্রসঙ্গ টেনে। সেই সঙ্গে তার বহুকথিত ‘বিষয়ীর আত্মতা ও বিষয়ের আত্মতা’র প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন।

আবার সাহিত্যতত্ত্বের ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথ এমন কথাও বলেছেন যে, প্রাকৃত সৌন্দর্য তখনই সুন্দর যখন তার সঙ্গে ‘মনের দান মেশে’ সৌন্দর্য তখন ‘মনোহর’ হয়ে ওঠে। আরো বলেছেন ‘আনন্দময় রূপস্বস্তিতে বিশ্বের সঙ্গে ব্যক্তির একাত্মতা’র কথা। কিন্তু প্রায় একই সঙ্গে বলেছেন পরমপুরুষের সঙ্গে ব্যক্তির পারস্পরিকতার কথা।

যার মাধ্যমে সত্যের অসীম রহস্য, সৌন্দর্যের অনির্বচনীয়তা উদ্ভাসিত হয়। এতদসত্ত্বেও শিল্পের নন্দনতাত্তি্বক ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণে রবীন্দ্রনাথকে মধ্যপন্থী বলা হয়েছে। এজন্য যে বস্তুগত ও পরমের পারস্পরিকতার মতই, সৌন্দর্য ও আনন্দের জাগতিক উপলব্ধির মতই রবীন্দ্রনাথ শিল্প সৃষ্টিকে সয়াতি করেন ঘটনা (ভধঁঃং) ও ভাবের (রফবধং) আবেগময় প্রকাশ হিসাবে। পাশ্চাত্য নন্দনতাত্তি্বকদের কথিত ংবহংড়ৎু বসনড়ফরসবহঃ রবীন্দ্রনাথে এসে অধিকতর মাত্রায় ব্যক্তিনির্ভর, অভিজ্ঞতা নির্ভর, উপলব্ধি নির্ভর হয়ে ওঠে। এজন্যই শিল্পসৃষ্টির নান্দনিকতা বিচারে রবীন্দ্রনাথকে মধ্যপন্থা বলা সঙ্গত।

শিল্পের নন্দনতাত্তি্বক ধারণা সম্পর্কে মার্কসবাদীদের প্রত্যয় যে শিল্পসর্বস্বতার বিরোধী, পরম ও ঐশী সৌন্দর্য অবিশ্বাসী বরং সমাজসত্তা ও সামাজিক বাস্তবতার সত্যে বিশ্বাসী সেসব কথা বহু আলোচিত। তবে একথাও সত্য যে শিল্প সৃষ্টির নান্দনিকতা বিচারে মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব একাধিক ধারনায় বিভক্ত তা সত্ত্বেও আর্নস্ট বস্নক গিয়োর্গ লুকাচ বা বেট্রোল্ডব্রেস্ট থেকে ওয়ল্টার বেঞ্জামিনা থিয়োডোর অ্যাডোর্নো প্রমুখ মার্কসবাদী শিল্পতাত্তি্বকগণ মতের ভিন্নতার মধ্য দিয়ে মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের ধারা তৈরি করেছেন বিশেষত লুকাচ।

এদের বক্তব্যে নীতিগত পরস্পর বিরোধিতা সত্ত্বেও এরা মোটামুটিভাবে ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে শিল্পসৃষ্টির নান্দনিক রূপচরিত্র নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। লুকাচ অবশ্য উলিস্নখিত দ্বিমাত্রিকতার সঙ্গে শ্রেণীচেতনার বিষয়টি অন্তভর্ুক্ত করেছেন এবং শিল্পের চরিত্র বিচারে এদিকে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অন্যদিকে হেগেলীয় ভাববাদী সূত্র প্রভাবিত বস্নক তার অন্য সতর্থদের সঙ্গে একই পথে যাত্রা শুরু করেও অংশত অধ্রুতাবাদী, অংশত, শোপেদ হাওয়ারীও তত্ত্বে প্রভাবিত যেজন্য তার নন্দনতাত্তি্বক শিল্প বিচার লুকাচের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন। শেষ পর্যন্ত দুই সঙ্গীর শৈল্পিক অবস্থান দুই ভিন্ন মেরুতে।

অবশ্য ব্রেঘট সমাজ বাস্তবতার অনুসারী ও শ্রেণীচেতনায় বিশ্বাসী হয়েও লুকাচের তুলনায় শিল্প সৃষ্টির নান্দনিকতা বিচারে অনেকটাই উদার ও সহনশীল। অবশ্য তিনি টলাটয় বা ব্যালমক থেকে একাধিক জীবনবাদী বুর্জোয়া কথাশিল্পীর সৃষ্টির ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে ভিন্ন কারণে লুকাচের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অভিনত্ত্ব সৃষ্টির পক্ষপাতী। সেজন্য মতাদর্শগত চৌসুপির বাইরে শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে শর্তাধীন অবস্থায়ও শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

আর সেকারণেই তিনি শিল্পসাতে অন্তপুরে স্বগতভাষণ (রহঃবৎরড়ৎ সড়হড়ষড়মঁব) বা মন্তাজ বা অনুরূপ প্রাকরণিক কৌশল ব্যবহারের বিরোধিতা করেন না।

করেন না যতক্ষণ সেসব সৃষ্টিতে সমাজ বাস্তবতার সত্য প্রকাশ পায়। তার মঞ্চনাটক তাই সমাজবাস্তবতার প্রকাশ ঘটিয়েও নন্দনতাত্তি্বক বিচারে ভিন্নমতবাদীদের প্রশংসা কুড়াতে পেরেছে। লুকাচের নন্দনতাত্তি্বক ধ্যান-ধারণা অবশ্য বহুলাংশে ব্রেখটীয় ধারণার সঙ্গে মেলে না। বলা বাহুল্য বিষয়টি দীর্ঘ আলোচনার। এ আলোচনা যেমন বাস্তববাদ বনাম আধুনিকতা নিয়ে তেমনি কথিত ভাববাদী নন্দনতত্ত্ব বনাম মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব নিয়ে যেখানে জড়িত একাধিক ধীমান, একাধিক শিল্প প্রতিভা, এরা সবাই সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্ব। এমন কি জড়িত ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও নববাস্তববাদের ধারণা এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে নান্দনিকতার বিবেচনা।

শিল্পের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে এমনি ধারার বিতর্ক, ভিন্নমত ও জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে এক কথায় বলা চলে যে শিল্প সৃষ্টির নান্দনিক মূল্য নির্ভর করে এর স্বচ্ছতার ওপর। বিষয় নিষ্ঠা ও উপভোগ্য সৌন্দর্যের ওপর অস্পষ্টতা বা বিশৃংখলা তথা নৈরাজ্যের ওপর নয়। তবু অবশেষে সিদ্ধান্তে পেঁৗছাতে কেউ কেউ হয়তো ঐ দুই বিপরীতের দ্বন্দ্ব স্বীকার করে নেন যেমন নভোবিজ্ঞনীরা মেনে নেন মহাবিশ্বের ধারণায় শৃংখলা ও বিশৃংখলার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের বিষয়টি।

এ ছাড়াও মনে রাখা দরকার যে দেশকাল ও সমাজ বিচারে যেমন শিল্পের তত্ত্বগত ধারণা বদলায় তেমনি পরিবর্তন ঘটে নন্দনতাত্তি্বক ধারণারও। বদলায় আধুনিকতার চরিত্ররূপও। তাই শিল্পস্থষ্টির মূল্যায়নে বা তার নান্দনিকতার নির্ধারণ ব্যক্তিক ও সামুহিক প্রেক্ষাপট বিচার যেমন অনিবার্য তেমনি অপরিহার্য সমকালের নিরিখে বিষয় ও প্রকরণগত বিচার-বিবেচনাও। অর্থাৎ একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সর্বমাত্রিক বিচারই ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত। শিল্প সৃষ্টি বুঝতে তার সৌন্দর্য অনুধাবন করতে বা রূপরস উপভোগ করতে সর্বোপরি মূল্যায়নে উলিস্নখিত সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই জরুরি। তা না হলে একদেশদশর্ী সংকীর্ণতাই প্রধান হয়ে ওঠে।

ব্যাংকিং শিল্পে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ – এম আবদুল মোমিন


ব্যাংকিং শিল্পে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ
এম আবদুল মোমিন
বর্তমান সরকারের প্রগতিশীল পরিকল্পনায় অন্যতম আলোচিত হল ‘পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ’ বা ‘পিপিপি’। সরকারের আছে সরকারি কোষাগার, ভৌতিক ও অবকাঠামোগত সম্পদ; সেগুলোর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক ও বিপণন ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়নে দড়্গতার সমন্বয় হলে যেকোন বড় প্রজেক্ট অপেড়্গাকৃত সুচারু ও সাশ্রয়ীভাবে করা সম্্‌ভব। এটাই পিপিপি’র মূলমন্ত্র।
গত এক বছরে আমরা পিপিপি উদ্যোগ দেখেছি মূলত অবকাঠামো এবং জ্বালানি খাতে-  ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণ, রাজধানীতে উড়াল-ট্রেন কিংবা পাতাল রেল, তাপ বিদুøৎকেন্দ , গভীর সমুদ্রবন্দর ইত্যাদি। এগুলোর বেশিরভাগের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে আমাদের আরও দুই-তিন বছর লেগে যাবে। অবশ্য সারাবিশ্বেই পিপিপি প্রধানত এই ধরনের খাতে হয়ে থাকে। পাশের দেশ ভারতের কথাই ধরা যেতে পারে। সে দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় দুইশ’ পিপিপি’র ভেতর কেবল ১টি রয়েছে আবাসন খাতে, আর ১টি খনি ও উৎপাদন খাতে, বাকি সবই ওই অবকাঠামো কিংবা জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ।
অথচ অন্যান্য খাতেও যে পিপিপি হতে পারে, তা দেখিয়ে দিল সম্প্রতি রূপালী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক দেশজুড়ে তাদের গ্রাহকদের জন্য স্বল্পতম সময়ে আধুনিক এটিএম সুবিধা দেয়ার জন্য দেশের অন্যতম প্রগতিশীল ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং শিল্পে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক সহযোগী হয়েছে রূপালী ব্যাংকের। অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রূপালী ব্যাংকের সম্মানিত গ্রাহকদের আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানে এটিএম বুথ স্থাপন করতে যাচ্ছে। সম্প্রতি এই উপলড়্গে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড· আতিউর রহমান বলেন, ‘সব কিছুরই পরিবর্তন আসে ধীরে। সবার প্রচেষ্টার কারণেই আজকের এই উদ্যোগ সম্্‌ভব হয়েছে। আমি আশা করি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য ব্যাংকও এ ধরনের প্রকল্পে এগিয়ে আসবে।’ সম্মেলনে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড· আহমেদ আল-কবির ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উদ্দিন এবং ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এই প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য ২ লাখ এটিএম কার্ড ইসুø করবে কোন ফি ছাড়াই। প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্র্যাক ব্যাংক ৫০টি এটিএম স্থাপন করবে রূপালী ব্যাংকের প্রস্তাবিত স্থানে। তবে গ্রাহকদের জন্য তার চেয়ে বড় সুবিধা হবে যে তারা একই সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের দুই শতাধিক ও অমনিবাস নেটওয়ার্কের ৭ শতাধিক এটিএম ব্যবহার করতে পারবেন এখনই। শুধু তাই নয়, ‘অমনিবাস’ নেটওয়ার্কের আওতায় যেকোন পিওএস মেশিনেও তারা কার্ড চার্জ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারবেন।
দেশের আপামর ব্যাংকিং জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই রূপালী ব্যাংকের সেবা দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করে আসছে। গ্রাহকদের জন্য এই আধুনিক এটিএম সুবিধার মাধ্যমে দিন বা রাতের যেকোন সময়, সপ্তাহের যেকোন দিন রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকরা তাদের সুবিধানুযায়ী এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। তাও পারবেন অত্যন্ত কম খরচে।
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী বলেন, ‘দেশের উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক সাধারণ গ্রাহকদের কাছে আধুনিক ব্যাংকিং তথা প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং পৌঁছে দিতে হবে। যা কিনা বাংলাদেশ ব্যাংকেরও অন্যতম লড়্গ্য। কিন্তু এই লড়্গ্য, কারও একার পড়্গে অর্জন করা সম্্‌ভব নয়। আর এখানেই আমাদের যাত্রা সবে শুরু।