উত্তম কুমারের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী ২৪ জুলাই


আজ বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮০ সালের এই দিনে সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমান এই মহানায়ক। নিজের অভিনয়, মেধা ও যোগ্যতাবলে জীবদ্দশায় উত্তম কুমার নিজেকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার অভিনীত ছবির বেশির ভাগই ছিল দর্শকনন্দিত। বিশেষ করে তার ও সুচিত্রা সেনের জুটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে দর্শক হৃদয়ে।

বাংলা চলচ্চিত্রের অনেক দিন পার হয়ে গেলেও এ জুটির জনপ্রিয়তাকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি অন্য কোন জুটি। ১৯২৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর বৃটিশ ভারতের কলকাতার আহরিটোলা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন উত্তম কুমার। সে সময় তার নাম রাখা হয়েছিল অরুণ কুমার চ্যাটার্জি। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে পা রেখে বনে যান উত্তম কুমার।

নীতিন বোস পরিচালিত ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় এ কালজয়ী অভিনেতার। এ ছবির মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি, যার ফলে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর একাধিক ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি। পরবর্তীতে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি গড়ে অভিনয় শুরু করেন উত্তম কুমার। ছবিটি ছিল নন্দিত ও ব্যবসা সফল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এ জুটি ৩০টি ছবিতে কাজ করেন।

এ ছবিগুলোর বেশির ভাগই ছিল ব্যবসা সফল। সুচিত্রা সেন ছাড়াও সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরী, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, মাধবী মুখার্জি, শর্মিলী ঠাকুর, অঞ্জনা ভৌমিক, অপর্ণা সেন ও সুমিত্রা মুখার্জির সঙ্গে জুটি বেঁধেও ব্যাপক সফলতা পান উত্তম। বাংলা ছবিতে যখন সর্বোচ্চ তারকা খ্যাতিতে অবস্থান করছিলেন উত্তম কুমার তখন তার ডাক আসে হিন্দি চলচ্চিত্র থেকেও। তার অভিনীত হিন্দি ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ছোটি সি মূলকাত, অমানুষ, আনন্দ আশ্রম, দরিয়া প্রভৃতি।

এদিকে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে প্রায় ২০৯টি ছবিতে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিল দর্শকনন্দিত ও ব্যবসা সফল। তার উল্লেখযোগ্য বাংলা ছবির মধ্যে রয়েছে সাড়ে চুয়াত্তর, দৃষ্টিদান, সাগরিকা, শিল্পী, হারানো সুর, ইন্দ্রানী, সবার উপরে, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, মায়ামৃগ, থানা থেকে আসছি, কুহক, এন্থনি ফিরেঙ্গি, অপরিচিতা, নায়ক, চিড়িয়াখানা, ধনি মেয়ে, জীবন-মৃত্যু প্রভৃতি। এসব ছবির মাধ্যমে নিজেকে বাংলা চলচ্চিত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন উত্তম কুমার। যার ফলে ভক্ত-দর্শক তাকে মহানায়ক উপাধিতে ভূষিত করেন। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য একাধিকবার সেরা নায়ক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

এছাড়াও পেয়েছেন দেশ বিদেশের অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। অভিনয় ছাড়াও পরবর্তীতে প্রযোজক, পরিচালক, সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবেও কাজ করেছেন উত্তম কুমার। ব্যক্তিগত জীবনে গৌরী চ্যাটার্জিকে বিয়ে করেছিলেন উত্তম কুমার। গৌতম চ্যাটার্জি নামে তার এক ছেলে রয়েছে। ১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান মহানায়ক উত্তম কুমার। মৃত্যুর এতো বছর পার হয়ে গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার কাছাকাছিও এখন পর্যন্ত কেউ যেতে পারেনি।

মহানায়ক সম্মান প্রত্যাখ্যান তিন অভিনেতার
কলকাতা প্রতিনিধি: মহানায়ক উত্তম কুমারের মৃত্যুদিনে আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকার মহানায়কের নামে পুরস্কার দিচ্ছে। তিনটি বিভাগে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আজীবন সম্মাননা, মহানায়ক সম্মান ও চলচ্চিত্র পুরস্কার। এসব পুরস্কারের সঙ্গে স্মারক ও আর্থিক মূল্যও দেয়া হচ্ছে। বিশেষ সম্মানও দেয়া হচ্ছে এবার।

এই সম্মান এবার পাবেন প্রবীণ অভিনেতা চিন্ময় রায় ও পার্থ মুখোপাধ্যায়। তবে পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বাম ঘনিষ্ঠ এবং সরকারের সমালোচক অভিনেতা ও শিল্পীরা। বাদ পড়েছেন সব্যসাচী চক্রবর্ত্রী ও কৌশিক সেনের মতো অভিনেতারা। তবে ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় ও পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানা গেছে। এই তিনজনই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। রাজ্য সরকারের দেয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তিনি এ পুরস্কারকে বোগাস বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। মহানায়কের মৃত্যু দিনে গোটা টলিউডকে একমঞ্চে শামিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর তাই পুরস্কারও দেয়া হচ্ছে অসংখ্য অভিনেতা ও শিল্পীকে। এমনকি এ বছর প্রযোজক সংস্থাকেও পুরস্কৃত করা হবে। এবারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে অরোরা ফিল্ম, শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস, নিউ থিয়েটার্স ও আর পি বনশন এন্ড কোংকে। সারা জীবনের স্বীকৃতি দেয়া হবে মাধবী মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায়, দীপঙ্কর দে, রঞ্জিৎ মল্লিক ও পরিচালক গৌতম ঘোষকে। মহানায়ক পুরস্কার পাচ্ছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, তাপস পাল প্রমুখ। আর চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবেন দেব, জিৎ, কোয়েল, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, রাইমা, স্বস্তিকা থেকে পরম, শ্বস্তত, মমতাশঙ্কর, রচনাসহ প্রায় সবাই।

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ


বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ

ডঃ কাজী নাসির উদ্দীন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে মার্কিন সমাজের আচার ব্যবহারের অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে লক্ষ্যগোচর হচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে মা দিবস আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মার্কিনী প্রথায় ছেলেবন্ধু (বয়ফ্রেন্ড) ও মেয়েবন্ধু (গার্লফ্রেন্ড) গড়ে উঠছে এই রকম বন্ধুত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না অচিরেই হয়তো শুনতে পাবো যে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যুবক-যুবতীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে ।

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গেছে এবং তরুণ-তরুণীরা বন্ধুত্বের দাবীতে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আর একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে অপরিসীম আনন্দ উপভোগ করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেও এই মার্কিনী অনুকরণের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকাদের গানের সঙ্গে নাচ যোগ করে দিতে হয় অর্থাৎ নেচে নেচে গান না গাইলে সে গান জনপ্রিয় হয় না বসে বসে গান গাওয়াটাতো এখন অতীতের ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে আমাদের দেশের সংগীত শিল্পীরা চিরকাল গলা আর হৃদয়াবেগের মিশ্রণে মনের আকুলতা প্রকাশ করে এসেছে দেহকে সেখানে টেনে আনার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় নি অবশ্য আমি এ ব্যাপারে সচেতন, যে কোন সংগীত চর্চায় গলা ও হৃদয়ের সঙ্গে দৈহিক অঙ্গভঙ্গী ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, যেমন বাউল গান ও লালন গীতি কিনতু নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক গান যদি নেচে নেচে গাইতে হয়, তবে কেমন হয় ? পাঠকরাই বিবেচনা করুন এছাড়া দেশের তরুণীরা এখন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর ওড়না ছেড়ে দিয়ে বেপরোয়াভাবে শার্ট আর জিন্স-এর প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

বলা বাহুল্য যে সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো তা হুবহু মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ মাত্র এক কথায় বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও সংস্কৃতি কেন এমন হলো ? পাশ্চাত্যে আরো অনেক দেশতো রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঐ সমস্ত দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র মার্কিনী সংস্কৃতি গ্রাস করে নিয়েছে বাংলাদেশকে আরো আশ্চর্য্যরে বিষয় এই যে পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিতে পারেনি উপরন্তু পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশে আমি মার্কিনী সংস্কৃতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা লক্ষ্য করেছি জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে স্পেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম স্পেন, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা আমেরিকানদের রাখাল বালক (Cow Boy)হিসেবে অভিহিত করে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে বলা হয়ে থাকে আমেরিকানরা অসভ্য আর অসংস্কৃত সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে আমেরিকার সংস্কৃতি এতো প্রিয় হয়ে গেল কেন যে, এ বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

কোন একটি দুর্বল দেশকে যদি কোন একটি সবল দেশ চিরদিনের জন্যে অধীনস্থ করে রাখতে চায় তাহলে দুর্বল দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপনিবেশকে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য এই ধ্বংস যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছিলো নিজেদেরকে কিšতু জাগ্রত প্রহরীর মতো সে সমস্ত উপনিবেশের বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির অপলাপ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলো আর তারই ফলশ্রুতিতে সেই সমস্ত দেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান আজও ঘটেনি নতুন মুখোশ পরে সাহায্য সহযোগিতার অজুহাতে আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা দুর্বল দেশগুলোর উপর নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছে সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে একটি দেশকে দখল করা যায় সাময়িকভাবে কিনতু সে দেশটিকে জয় করা যায় না যতদিন পর্যন্ত না সে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, গর্ব আর অহংকারকে চূর্ণ করা যায় ততদিন পর্যন্ত সে দেশের মানুষকে বশীভূত করা যায় না একটি জাতির গৌরব, গর্ব আর অহংকারকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম ধ্বংস করতে হবে সে জাতির সংস্কৃতিকে মহা ধ্বংসযজ্ঞে বর্তমানে আত্মনিয়োগ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কেন ? যেহেতু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার আত্মমর্যাদা দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে বাংলাদেশ সকল গৌরবকে দিয়েছে জলাঞ্জলি সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশকে জয় করার এই হচ্ছে মোক্ষম সময় এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলদেশকে রুখে দাঁড়াতে হবে যেমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিভিন্ন জাতি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

সংস্কৃতি চেতনা যাদের খুব প্রখর তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই রকম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতিকে অধীনস্থ করা কঠিন আমার নিজের দেশবাসীরাই যদি অতি আগ্রহের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীর অপসংস্কৃতির অনুকরণে উৎসাহী হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীকে দোষ দিয়ে লাভ কি ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যটাতো দেশবাসীর সহায়তায় সহজেই হাসিল হয়ে যায় কিনতু কেন যে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই মার্কিনী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে রুখে না দাঁড়িয়ে বরং স্বাগত জানালো সে বিষয়টা এবার একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রে বিপরীত আকর্ষণ (Opposite attracts) করে বলে একটা তত্ত্ব আছে এর সারমর্ম এই যে তরুণ-তরুণীরা তার সম্পূর্ণ বিপরীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বাংলাদেশ আমেরিকার সম্পূর্ণ বিপরীত ক্রান্তিতে অবস্থান করছে অর্থাৎ আমেরিকায় যখন দিন বাংলাদেশে তখন রাত আমেরিকা পৃথিবীর একটি মহাপরাক্রমশালী দেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্বল দেশ আমেরিকা পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশ সমূহের তালিকাভুক্ত আর বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বিপরীত বটে, আর সে কারণেই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী খুবই স্বাভাবিক কিনতু এই স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাটাকে দুর্বল পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে তত্ত্ব প্রকাশ পায় তার নাম হলো হীনমন্যতা বোধ ইংরেজীতে যাকে বলে Inferiority complex এই হীনমন্যতা বোধের শিকারে পরিণত হয়ে যারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মহান সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা শুধু নিজেদেরকেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে না, তারা সমগ্র জাতিকে দেউলিয়া করে দেশের স্বাধীনতাকে করে বিপন্ন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের জন্মলাভের জন্য ওরা নিজেরাও যথার্থভাবে দায়ী নয় আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে দায়ী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের দেশের দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থান্বেষী কর্ণধাররা তাদের নিজেদের আখের গোছানোর কাজে এবং বিদেশী প্রভুদের পদলেহনে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে দেশাত্মবোধের কোন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হননি ।

বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অনেকে আবার মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণের স্বপক্ষে তাদের মনের মধ্যে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তারা বলেন, বিদেশী সংস্কৃতিতে যদি কোন ভালো জিনিস থাকে তবে তাকে গ্রহণ করতে দোষ কি ? এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই একটি দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতিকে বুঝায় আমাদের সংস্কৃতির যে বিষয়টি আমরা সবচেয়ে ভালো মনে করি আমেরিকানরাতো সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে না তাহলে ওদের ভালো জিনিসটা আমাদের গ্রহণ করতে হবে কেন ? তাছাড়া আপাততঃ যাকে ভালো মনে হয় সংস্কৃতির অঙ্গনে তার উৎপত্তি ও বিকাশের কারণটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মার্কিন মুল্লুকে মা দিবস ও বাবা দিবসের উদ্ভবের কারণ বিশ্লেষণ করা যাক আমেরিকায় সন্তান-সন্ততিরা তাদের ষোল (১৬) বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গৃহ ত্যাগ করে তারপর কালে ভদ্রে কখনো সখনো মা-বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয় সেই দেখা সাক্ষাতের জন্যে আবার আগে থেকেই দিনক্ষণ নির্ধারণ (appointment) করে নিতে হয় তাছাড়া আমেরিকার ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাস করে না এই সমস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদেরকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্যে বৎসরে একবার মা-বাবার খোঁজ খবর নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে সুতরাং আপাততঃ এটাকে একটা ভালো জিনিস মনে হলেও এর মূলে ভালো কিছুই নেই আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিটি দিনই মা-বাবার দিন প্রতিটি মূহুর্তে আমরা মা-বাবার সেবা করতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি এমন কি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় নিজেদের ঘর সংসার নিয়ে যখন আমরা আলাদাভাবে বসবাস করি তখনও মা-বাবা বেঁচে থাকলে আমরা যখন তখন মা-বাবার কাছে ছুটে যাই মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের কোন অনুমতি নিতে হয় না আমাদেরকে একবার মায়ের বাড়ি আর একবার বাপের বাড়ি দৌড়াতে হয় না আমরা মা-বাবাকে এক সঙ্গে পাই সব সময় সুতরাং ঘটা করে আমেরিকার মতো বৎসরে একবার মা আর একবার বাবার সেবা করাটা বাংলাদেশের সভ্যতা ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে কতো অবাস্তব তা সহজেই বোধগম্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশে বসবাস করি এখন আর ৩০ বছর যাবত আমি আমেরিকায় বসবাস করছি আমেরিকায় আসার পর এদেশের সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি যে কতো উন্নত, পরিশীলিত আর আমরা যে কি এক মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী তা আমার চোখে পড়ে দেশ থেকে বের না হলে দেশকে চেনা যায় না এটা শুধু আমার একার অভিমত নয় আমার মতো অনেকেই যারা কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেছেন তারা সবাই মার্কিনী সংস্কৃতির অন্তঃসারশূন্যতা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন আর তাদের নিজের বাংলাদেশে এই অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন অতি সম্প্রতি হলিউড থেকে প্রকাশিত ”একুশ” পত্রিকায় চাঁদ সুলতানা মাহবুব কামরুন-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ”ঘুরে এলাম কিছু সময় বা ঝটিকা সফর”-এ সেই দুঃখ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ”একটা ব্যাপার খুব চোখে লাগলো, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফ্রীডমে বিদেশকেও হার মানিয়েছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মোহনা ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে” অন্যত্র ”নব্য সভ্যতার যুগে পুরাতন কালচার সব হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে ছেলেমেয়েরা সুরে বেসুরে ওদের ইচ্ছামতো গান গাচ্ছিলো আমি তখন একমনে খুঁজছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরানো অতীতকে” বড়ই দুঃখের বিষয় সেই অতীত দ্রুত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই বোধ হয় প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অত প্রাণান্তকর প্রয়াস অথচ আমাদের প্রিয় দেশবাসী তরুণ-তরুণীরা নির্বিচারে বিদেশী অপসংস্কৃতিতে অবগাহন করে পরম পুলক অনুভব করছে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে ? কবে কিভাবে আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের অবসান ঘটবে ? কবে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কুঁড়ে ঘরে থেকেও শিল্পের বড়াই করতে শিখবে, কবে ওরা বুক ফুলিয়ে বলবে, ”নিক হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা” ? সে কথাই আজ ভাবছি।

একুশ পত্রিকা,

লস এঞ্জেলেস, জুলাই ৪ ২০০৭ ইস্যুঃ উপ-সম্পাদকীয়ঃ

সিনেমা আবিষ্কারের ১১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও যদি সিনেমা নামক নন্দনকলার এই দিকটি আমাদের দেশে আজও উপেক্ষিত থাকে তাহলে আগামী দিনগুলোতে আদৌ আমরা সুস্থ, সুন্দর, ভালো এবং নান্দনিক ছবি নির্মাণ করতে পারব কি না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়:বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র


বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-১ম পর্ব

চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্র

Publish On 04/11/2010 ফ্লোরা সরকার ●

‘The time of pain is the time of the making’. ~Theodorous Angelopoulas.Filmmaker, Greece.

‘নৈতিকতা হচ্ছে ভবিষ্যতের নান্দনিকতা’- ভ্লা.ই.লেনিন।

[1]বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে আলোচনা করলে আমরা বিশ্ব চলচ্চিত্র থেকে কতটা দূরে বা কাছে অবস্থান করছি তা অনুধাবন করা সহজ হবে। দূরত্বের মাপকাঠির এই ফলাফল হয়তো আমাদের বিশ্ব চলচ্চিত্রের কাছে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে তা অনুধাবন করতে পারি। কারণ সিনেমা আবিষ্কারের ১১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও যদি সিনেমা নামক নন্দনকলার এই দিকটি আমাদের দেশে আজও উপেক্ষিত থাকে তাহলে আগামী দিনগুলোতে আদৌ আমরা সুস্থ, সুন্দর, ভালো এবং নান্দনিক ছবি নির্মাণ করতে পারব কি না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়। সন্দেহের সেই বিন্দু থেকেই শুরু করা যায়। যেহেতু বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে আমাদের আলোচনার সূত্রপাত তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সম্যক ধারণা নেওয়ার পর আমরা তার আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করব। তাই শুরুতেই হলিউডের চলচ্চিত্রজগতে চলে যাওয়া যাক। কেননা সিনেমার সূত্রপাত ফরাসি দেশে ঘটলেও শুরুর আগেও কিছু শুরু থাকে আর সেই শুরুটা আমরা মার্কিন মুলুকেই ঘটতে দেখি।

চেষ্টাটা অনেক দিন ধরেই চলছিল। কী করে স্থির ছবিকে চলমান এবং গতিময় করা যায়-সেই সমস্যার প্রাথমিক সমাধান করলেন অ্যাডওয়ার্ড মুইব্রিজ। আদতে ব্রিটিশ হলেও থাকতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার সময় ১৮৭৩ সালে তিনি পরপর ২৪টি ক্যামেরা বসিয়ে একটি ছুটন্ত ঘোড়ার ছবি তুললেন। ছবিকে চলমান করার এটিই সম্ভত প্রথম প্রয়াস। মুইব্রিজ তার যন্ত্রের নাম দিলেন জুপ্রাস্কিস্কোপ। এভাবে চলন্ত ছবিকে ধরে রাখার আরও বেশকিছু যন্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে উনণততর আরও যন্ত্র আবিষ্কার হতে থাকল। অবশেষে অগস্তে লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের নামে দুই ফরাসি ভাই মিলে তৈরি করলেন সিনেমাটোগ্রাফ। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের সেই দিনটিতে প্রথম দর্শকরা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখলেন এবং সেই দিন থেকেই বিজ্ঞানী ও চলন্ত ছবির খেলনা বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সিনেমা সেসব কুশলীদের হাতে চলে গেল যাদের আমরা বলি প্রযোজক, পরিবেশক ও দর্শক।

প্রথম দিকের বেশির ভাগ ছবি নিউইয়র্কে নির্মিত হলেও ১৯০৭ সালের দিকে ফিল্ম নির্মাতাদের চোখ পড়ল ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণে মেক্সিকো সীমান্তঘেঁষা হলিউডে। নির্বাক যুগের ফিল্ম নির্মাতাদের মধ্যে যিনি সব থেকে সৃজনক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন সেই ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ নির্মাণ করেন ‘বার্থ অব এ নেশন’ (এই ছবিটি গ্রিফিথকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি), ইনটলারেন্সসহ আরো অনেক ছবি। ইনটলারেন্স ছবির মূল প্রতিপাদ্য ছিল-অসহিষ্ণুতাই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় বিষবৃক্ষ, অসহিষ্ণুতাই মানুষকে ঠেলে দেয় অশান্তি এবং হিংসার পথে। এ সময়ে ওয়েস্টার্ন ছবির চাহিদাই ছিল সব থেকে বেশি। যা পরবর্তীতে পৃথিবীর আরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া সিরিয়াস এবং অ্যাকশনধর্মী ছবির পাশাপাশি কমেডির চাহিদাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল যথেষ্ট।

সেই স্বর্ণযুগের কমেডি ছবির শ্রেষ্ঠতম ফসল চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন (চার্লি চ্যাপলিন) অভিনীত প্রথম ছবি ‘মেকিং আ লিভিং’ তৈরি হলো ১৯১৪ সালে। প্রথম দিকে অন্যের ছবিতে অভিনয় করলেও পরের দিকে নিজেই ছবি পরিচালনায় যান এবং একে একে দ্য ট্র্যাম্প, গোল্ডরাশ, মডার্ন টাইমসসহ প্রায় আশিটি ছবি নির্মাণ এবং একই সঙ্গে অভিনয় করেন। ভাঁড়ামি নয়, হাসির অন্তরালে যে করুণা গোপন থাকে সেই করুণ রসে দর্শকের মন আর্দ্র করাই ছিল চার্লির উদ্দেশ্য। সেই সময়ে আরো কিছু কমেডি অভিনেতার আবির্ভাব ঘটে যেমন-হ্যারাল্ড লয়েড, লরেল ও হার্ডি, বাস্টার কিটন।

ওয়েস্টার্ন বা কমেডির মতোই মার্কিন চলচ্চিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারা তথ্যচিত্র। এ ব্যাপারে প্রথমেই আসে রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির নাম। বস্তুত তিনি হচ্ছেন তথ্যচিত্রের জনক। তার সব থেকে বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘নানুক অব দ্য নর্থ’ মুক্তি পায় ১৯২২ সালে। এরপর ‘মোয়ানা’, ‘টাবু’ ‘হোয়াইট স্যাডোস অব দ্য সাউথ সি’সহ বেশকিছু তথ্যচিত্র। বিশ্বে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনোহরণকারী প্রথম চরিত্র যদি হয় চার্লি চ্যাপলিন তাহলে দ্বিতীয়টি ওয়াল্ট ডিজনির মিকি মাউজ। অ্যানিমেটেড কার্টুন ছবির স্রষ্টা সেই ওয়াল্টার এলিয়াস ডিজনির প্রথম ছবি ‘অ্যালিস ইন কার্টুনল্যান্ড’ (১৯২৪) ব্যর্থ হলেও মিকি মাউজ চরিত্রের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ডিজনির ছবি প্রসার ঘটে যায়। সবাক যুগের আমেরিকার প্রথম ছবি ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ মুক্তি পায় ১৯২৭ সালে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯২৯ সালের ‘মহামন্দার’ আগে পর্যন্ত গোটা মার্কিন সাম্রাজ্যে চলচ্চিত্রের যে প্রসার ঘটে তা কল্পনাতীত। তবে মন্দার খুব বেশি প্রভাব মার্কিন চলচ্চিত্রে পড়ল না। ১৯৩০ সালে নির্মিত হলো পৃথিবী বিখ্যাত ছবি লুইস মাইলস্টোনের ‘অল কোয়ায়েট ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেভাবে না পড়ায় ছবির গতি অব্যাহত থাকল। তবে পরিবর্ধিত সমাজবোধের ঢেউ ছবির গায়ে এসে লাগল বেশ ভালোভাবেই। চল্লিশের দশকে নির্মিত হতে লাগল নতুন ধারার ছবি-‘দ্য নিও রিয়ালিজম’। এ ধারায় যোগ দিতে লাগলেন জন ফোর্ড, বিলি ওয়াইল্ডার, ওরসনওয়েল্সসহ আরো অনেক নির্মাতা। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে স্টুডিও সিস্টেমের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় হলিউডের তথাকথিত স্বর্ণযুগ। তা ছাড়া টেলিভিশনের আবির্ভাবও সে জন্য কতকটা দায়ী। ষাটের দশকে বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক সংস্থার অধিগ্রহণ শুরু হয় চলচ্চিত্র সংস্থার ওপর। আশির দশকে বিজ্ঞাননির্ভর ছবির নতুন জোয়ার ওঠে। স্টিভেন স্পিলবার্গের মতো পরিচালকের আবির্ভাব ঘটে। নির্মিত হয় ‘ইটি’, ‘জুরাসিস পার্ক’ এর মতো বিখ্যাত ছবি। বর্তমান পর্যন্ত যা অব্যাহত আছে। তবে হলিউডি ছবির প্রধান যে বৈশিষ্ট্য প্রথম থেকে লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে-বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা।

পৃথিবীর প্রথম নারী চিত্রপরিচালক একজন ফরাসি-নাম আলিস গি ব্লাশে। লুমিয়ের ভাতৃদ্বয় তথ্যচিত্র এবং বাস্তববাদী সিনেমার জন্মদাতা হলেও মেলিয়ে ছিলেন ফরাসি দেশের প্রথম গল্পনির্ভর থিয়েট্রিকাল সিনেমার নির্মাতা। প্রথম দিকে তাদের চেষ্টায় ফরাসি সিনেমা এগিয়ে গেলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ছবি করার মতো অর্থবান বড় কোনো কোম্পানি আর রইল না। কিন্তু অর্থের এই অভাবই ফরাসি সিনেমায় একটি অন্তর্বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বড় মূলধনের অভাবে ছবি করতে যারা এগিয়ে এলেন তাদের বেশির ভাগই ছিলেন শখের বসে আসা প্রযোজক, যাদের অনেকেই আর দ্বিতীয় ছবি করেননি। পরিচালকরা পেলেন অবাধ স্বাধীনতা এবং ছবিতে শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নতুন স্টাইল। ইমপ্রেশনিজম, সুরিয়ালিজম, দাদাইজম ইত্যাদির প্রভাবে নির্মিত হলো অনেক আভঁ গার্দ ছবি যা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে চর্চার উপযুক্ত। সে সময়ের আভঁ গার্দ স্টাইলের ছবির মধ্যে রনে ক্লের ‘Entr’acte’ (১৯২৪) এবং সালভাদর দালি ও লুই বুনুয়েলের যৌথভাবে নির্মিত ‘An Andalusian Dog’ (১৯২৮) অন্যতম। ওই একই বছরে নির্মিত কার্ল থিওডর ডেয়ারের ‘The Passion of Joan of Arc’ সেই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি।

ফরাসি দেশে সবাক চিত্র আসার পর একমাত্র জঁ ককতো ছাড়া বাকি সবাই আভঁ গার্দ ঐতিহ্য ত্যাগ করে গল্প বলার রীতিতে পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু করলেন। ফরাসি সিনেমার সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত যুগ হলো ‘নুভেল ভাগ’ বা ‘নব তরঙ্গ’, যার শুরু হয় ষাটের দশকে। ‘নুভেল ভাগ’ আন্দোলনটির অন্যতম ভিত্তি ‘কলমের মতো স্বাধীনভাবে ক্যামেরা ব্যবহারের তত্ত্ব’। নব তরঙ্গপন্থীদের মতে পরিচালক একজন illustrator, creator নন। অঁদ্রে বাজ্যাঁ, বুনুয়েল, গোদার, ফ্রঁসোয়া ত্রুফো এই ধারার ছবির পুরোধায় ছিলেন। তাই গোদারের কাছে সিনেমা আবেগশূন্য বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ আর বুনুয়েল সমাজের অন্তরসারশূন্যতা বারবার নিরাবরণ করেছেন। নব তরঙ্গ গোষ্ঠীভুক্ত না থাকলেও রবের ব্রেসঁ ছিলেন ফরাসি তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রে একক ও অনন্য চিত্রপরিচালক। বর্তমান সময়ের ফরাসি সিনেমার সবচেয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক রাউল রুইজ। রুইজের দেশ চিলি হলেও ১৯৭৪ সালে ফ্রান্সে আসেন এবং আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যে ছবি নির্মাণ করেন। এ ছাড়া আছেন জঁ ক্লোদ ব্রিসো, মোরিস পিয়ালাসহ আরো অনেকে। ভালো সিনেমা সম্পর্কে জনসচেতনতাই ফরাসি সিনেমার বড় সম্পদ।

ইতালির ছবির জগতে ‘নিউ রিয়ালিজম’ বা ‘নয়া বাস্তববাদী’ আন্দোলনের আগে অনেক ধারার ছবি প্রচলিত ছিল। যেমন পৌরাণিক ফিল্ম, কমেডি ফিল্ম, ‘ফাম ফাতাল’ ‘হোয়াইট টেলিফোন ফিল্ম’ ইত্যাদি। ফাসিতন্ত্রে দুই ধরনের ছবি তৈরি হতো-‘পিঙ্ক’ ও ‘ব্ল্যাক’। ‘ব্ল্যাক’ ফিল্ম ছিল প্রকৃত ফাসি ফিল্ম আর ‘পিঙ্ক’ ফিল্ম চলতি ভাষায় ‘হোয়াইট টেলিফোন’ নামে পরিচিত ছিল : পাতি সেন্টিমেন্ট, কোমল রোমান্স আর চড়া মেলোড্রামায় ভরা অনেকটা আমাদের দেশের তথাকথিত বাংলা ছায়াছবি এবং টিভি নাটকের মতো। তুলনামূলক শিল্পের বিচারে, নির্বাক ও ফাসিস্ত চলচ্চিত্রের চরিত্র ছিল অপেরাধর্মী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নয়া-বাস্তববাদী আন্দোলন তাকে মুক্ত করে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে ছিল না কোনো সৌন্দর্যের স্থান। বিশ্বযুদ্ধে নির্মম পরাজয়ের পর ইতালি বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও অবমানিত। আলবার্তো লাতুয়াদা একবার লিখেছিলেন, ‘আমাদের পোশাক শতছিন্ন? তবে দেখুক সবাই এই ছিন্ন পোশাক। আমরা পরাজিত তবে দেখা যাক এই পরাজয়ের চেহারা’। রোসেলিনি নেমে পড়লেন একেবারে রাস্তায়, আন্তোনিওনি নির্মাণ করলেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘পিপল অব পো রিভার’। তবে নয়া-বাস্তববাদের প্রধান প্রবক্তা, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক হিসেবে ডি সিকা এবং জাভাতিনিকেই ধরা হয়। ডি সিকার বিখ্যাত ছবি ‘বাইসাইকেল থিভস্’ সম্পর্কে ফরাসি নন্দনতাত্ত্বিক অঁদ্রে বাজাঁ বলেছেন ‘বাইসাইকেল থিভস’ বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রথম নিদর্শন। এতে না আছে কোনো অভিনেতা না কোনো কাহিনী না কোনো সেট। অর্থাৎ বাস্তবের নিখুঁত ভ্রম সৃষ্টিতে (তথাকথিত) সিনেমাই আর নেই। এভাবে নয়া-বাস্তববাদীদের হাত ধরে আমরা জাভাতিনি, রোসোলিনি, আন্তনিওনি, ফেলিনি, ডি সিকার মতো বিখ্যাত পরিচালকদের পাই। যাদের হাত ধরে ইতালির আধুনিক পরিচালকরা তাদের ছবি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছেন।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পোলিশরা প্রধানত সাহিত্যনির্ভর ছবি নির্মাণ করেন। সামাজিক প্রসঙ্গটাই জরুরি নির্মাতাদের কাছে। বিষয় হিসেবে যুদ্ধকে তারা ভোলেননি। কিন্তু যুদ্ধকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হতে লাগল। পরাজয়ের মুখে আত্মোৎসর্গ রূপে নয়, জোর দেওয়া হলো জয়ের সম্ভাবনার ওপর, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ওপর। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ আটকে থাকা, সরকারি শাসনে নিয়ন্ত্রিত ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটল। এতে ছবি করিয়েদের মধ্যে একটা পারস্পরিক নির্ভরতা যেমন নিয়ে এল তেমনি পরিচালকরা প্রশাসনের কর্তৃত্বমুক্ত হয়ে কাজ করার স্বাধীনতা পেলেন। বিশ্ব পেল ওয়াজদা, রোমান পোলানস্কি, ক্রিস্তফ জানুসি, ক্রিজটফ কিয়েসলোভস্কির মতো মহান পরিচালকদের। হাঙ্গেরির ছবিগুলোতে অতীত এবং বর্তমানের বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। দৈনন্দিন সমস্যা থেকে দূরে গিয়ে সিনেমা এখানে পলায়নী-মনোবৃত্তির পরিচয় দেয়নি বরং সমকালীন সমস্যাকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে চেয়েছে এখানকার সিনেমা। যে কারণে গেজা রাদভানি নির্মিত ‘Somewhere in Europe’ (১৯৪২) ইতালীয় নয়া-বাস্তববাদী ছবি Rome, Open city ev Bicycle Thieves এর সমতুল্য ধরা হয়। ১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয় জলটান ফাবরি। ষাটের দশকে আরো কিছু তরুণ পরিচালকের আগমন ঘটে যারা পূর্বসূরিদের ধারায় ছবি নির্মাণ অব্যাহত রাখেন। চেক চলচ্চিত্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি জানানো হয় ষাটের দশকের গোড়ায়। এই সময়ে ফরাসি নবতরঙ্গের ঢেউ এসে লাগে সেখানে। এখানকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী চিত্রপরিচালক চিটিলোভা। বুলগেরীয় চলচ্চিত্র শুরু থেকেই সাহিত্যনির্ভর। যারা ছবি করছিলেন তারা বুঝে গিয়েছিলেন যে সিনেমার জন্য প্রবাদ, পুরাণ, ইতিহাস, লোককথা বা জাতীয় সংগ্রামের দিকেই হাত বাড়াতে হবে। ১৯৫১ সালে জানডভের ‘এলার্ম’ ছবি থেকেই শুরু হলো বুলগেরীয় চলচ্চিত্রের নতুন যুগ। যুগোশ্লাভিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছোট কিন্তু এই ছোট ইন্ডাস্ট্রি অনেক বড় কান্ডকারখানা করেছে। সত্তরের দশকে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে তাদের ছবি দেখাবার পর ভেনিসেই বলতে শোনা যায়-‘One of the Greats among the small.’

ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্কের কার্ল থিয়োডোর ড্রেয়ারকে নির্বাক যুগের শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৫৫ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভেলে তার নির্মিত ‘ওয়ার্ড’ ছবিটি পুরস্কৃত হয়। অপর একটি দেশ সুইডেনে আমরা পাই সিনেমার রাজার রাজা ইঙ্গমার বার্গম্যানকে। বার্গম্যানের ছবি সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবহিত যা একটু কম অবহিত তা হলো বার্গমানের নির্মিত বিখ্যাত ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’ ছবির সেই বুড়ো চরিত্রের ইসাক বোর্গ যিনি করেছিলেন সেই চিত্রপরিচালক ভিক্টর সিস্ট্রোমকে (১৮৭৯-১৯৬০) সুইডিশ ছবির জনক বলা হয়।

১৯০৭ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে রাশিয়ায় হাজারের বেশি কাহিনী চিত্র তোলা হয়, কিন্তু তার মধ্যে স্মরণীয় ছবি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ১৯২১ সালে লেনিনের ‘নয়া অর্থনীতি’ ঘোষণার পরপরই বিদেশী ছবির আমদানি ঘটে। একে একে মস্কো এবং দেশের অন্যত্র রাষ্ট্রীয় ও সমবায়ভিত্তিক ফিল্ম কোম্পানি গড়ে উঠতে থাকে। বিশের দশক ছিল সোভিয়েত চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ, তেমনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক স্মরণীয় দিকচিহ্ন। নির্মিত হলো ‘ক্রেন্স আর ফ্লাইং’ এর মতো যুগান্তকারী সৃষ্টি। আগমন ঘটল, সের্গেই আইজেনস্টাইন, আলেকজান্দার দভঝেঙ্কো, পুদোভকিনের মতো বিশাল মাপের চিত্রপরিচালকদের। আইজেনস্টাইনের বিখ্যাত মনতাজ তত্ত্ব যেন ফিল্ম ফর্ম এবং ফিল্ম সেন্সকে বদলে দিল। তার নির্মিত স্ট্রাইক, ব্যাটলশিপ পটেমকিন, ইভান দ্য টেরিবলসহ সব ছবি এখনো চলচ্চিত্র স্কুলগুলোতে ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্যে দেখানো এবং শেখানো হয়। ১৯৩০ সালে মুক্তি পায় দভঝেঙ্কোর কালোত্তীর্ণ ছবি ‘আর্থ’। পঞ্চাশের দশকে চেখভ, কুপরিন, গোর্কির পাশাপাশি শেকস্পিয়রের ধ্রুপদী সাহিত্যের চিত্ররূপ দেওয়া হয়। পুদোভকিন করলেন গোর্কির ‘মাদার’ ও য়ুৎকেভিচ ‘ওথেলো’। এর পরের প্রজন্মে আমরা তারকাভস্কির মতো বড় মাপের পরিচালককে পাই। তারকাভস্কি যেন সেলুলয়েডে মোড়া মহাকাব্যিক কবি।

আমেরিকা, ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং সোভিয়েত রাশিয়ার চলচ্চিত্রের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও তাদের বিশ্বনন্দিত চিত্রনির্মাতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ পর্বের আপাত সমাপ্তি এখানে। এর পরের পর্বে আমরা এশিয়া, অফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র সম্পর্কে আলোচনার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার আশা রাখছি।

সংস্কৃতির এ জগৎটা একটি বড় ইন্ডাস্ট্রি। তাই সবার উচিত, তাদের আয়ের সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করা।


সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয় জরিপ শেষ

এইচ মামুন

প্রথমবারের মতো দেশের জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধি হারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয়। এ জন্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয় জরিপের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। আগামী বছর ফেব্রুয়ারি নাগাদ এ জরিপের চূড়ান্ত ফল জানা যাবে। অন্যদিকে সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয়ের পরিমাণ জানতে সংস্কৃতি ও বিনোদনমূলক কর্মকা ৈবিষয়ক স্টাডি শীর্ষক এ জরিপ কাজ শুরু হয় ২০ অক্টোবর এবং শেষ হয় ২৬ অক্টোবর। দেশের ৫৮টি জেলা ও ৬টি সিটি করপোরেশনে জরিপ চালানো হচ্ছে। নাট্যদল ও নাট্যশিল্পী, নাচের দল ও নৃত্যশিল্পী, সার্কাস দল ও শিল্পী, ব্যান্ড দল ও ব্যান্ডশিল্পী, লেখক, অভিনেতা, সঙ্গীতশিল্পী, চলচ্চিত্র পরিচালক, নির্মাতা, বাদক, প্রযোজক, উপস্থাপক, সেট নির্মাতা এবং চিত্রশিল্পীর আয় জরিপের আওতায় আসবে। এ কাজে ৮৪ জন তথ্য সংগ্রহকারী সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে গিয়ে তাদের আয়ের জরিপ করছেন। এছাড়া ৬ জন বিভাগীয় ও ২৫ জন আঞ্চলিক সমন্বয়কারী জরিপ তদারকির কাজে নিয়োজিত।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস বিভাগের যুগ্ম পরিচালক এবং জাতীয় হিসাব মূল্য ও পরিসংখ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) লুৎফন নাহার যায়যায়দিনকে জানান, জাতীয় আয়ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয় যুক্ত করার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হচ্ছে আয় জরিপ। এরপর অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে ফলাফল চূড়ান্ত করা হবে। ধাপগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তথ্য সংগ্রহের পর ডাটা এডিটিং, তারপর ডাটা প্রোগ্রাম তৈরি, ডাটা এন্ট্রি, তারপর টেবিল পস্ন্যানের পর ডাটা অ্যানালাইসিস রিপোর্ট তৈরি হলে টেকনিক্যাল কমিটির মিটিং এবং ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হবে। এতগুলো ধাপ পার হতে অনেক সময় লাগবে। আশা করছেন, আগামী বছর ফেব্রুয়ারির দিকে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া সম্্‌ভব। তিনি আরো বলেন, এ জরিপের ফলাফল পাওয়া গেলে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান কতটুকু, তা নির্ণয় করা যাবে।

বিশিষ্ট অভিনেতা ও ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের (আইটিআই) বিশ্ব সভাপতি রামেন্দু মজুমদার যায়যায়দিনকে জানান, দেরিতে হলেও সরকারের এটি ভালো উদ্যোগ। কেননা এটি তো আয়ই। অনেক আগেই জাতীয় আয়ের সঙ্গে তাদের আয় যুক্ত হওয়া উচিত ছিল। কারণ, সাংস্কৃতিক কর্মীরা জিডিপিতে যে অবদান রেখে চলছে, তার কোনো হিসাব এতদিন ছিল না। এটি ঠিক নয়। সংস্কৃতির এ জগৎটা একটি বড় ইন্ডাস্ট্রি। তাই সবার উচিত, তাদের আয়ের সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জিডিপি হিসাব করা হয় মূলত যা কিছু অর্থনৈতিকভাবে বিনিময় হয়, তার সবকিছু ধরেই। সেদিক থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের যেগুলো অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো অবশ্যই জিডিপিতে আসা উচিত। যেগুলো বিনা পয়সায় শুধু বিনোদনের জন্য করা হয়, সেগুলো এমনিতেই বাদ পড়বে। তবে সরকার সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয় জরিপের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি আরো আগে করা দরকার ছিল। যাহোক এখন শুরু হয়েছে, সেটিই বড় কথা।

বিশিষ্ট নাট্যপরিচালক মান্নান হীরা বলেন, নিঃসন্দেহে সরকারের এটি ভালো উদ্যোগ। এতদিন দেশে সাংস্কৃতিক কর্মীদের আয়ের কোনো হিসাব ছিল না। এ জরিপের ফলে একটি রেকর্ড থাকবে সরকারের হাতে। তাছাড়া অনেকেই রয়েছেন ঠিকমতো আয়কর দেন না, তাদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। পাশাপাশি অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাদের আয় যোগ্যতার চেয়েও অনেক বেশি। সুতরাং এ বিষয়েও একটি পরিমাপের মধ্যে আসা উচিত। এ ধরনের জরিপের মাধ্যমে এটি সম্্‌ভব হবে।

বিশিষ্ট অভিনেতা ও বৈশাখী টেলিভিশনের সাবেক অনুষ্ঠান প্রধান মজিবুর রহমান দিলু এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। তবে মনে করেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদের অর্থনৈতিক বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আটকে আছে। অশিল্পী বহু লোক কাজ করতে এসে অনেক টাকা আয় করছেন। জিডিপিতে এ খাতের অবদান কতটুকু, তা বের করা দরকার। তাই আয় জরিপ হওয়া উচিত।

রাজধানীর লোকনাট্য দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুলস্নাহ আল হারুন বলেন, এ উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা সবাই যে আয় করেন তা নয়। কেননা যারা নাট্যদল চালান বা মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত, তারা মূলত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান। সবারই অন্য পেশা আছে। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে নাটক তৈরি ও প্রদর্শন করেন। সেখানে আয় কী হিসাব করা হবে, তা ভেবে পাচ্ছেন না। নাট্যদলগুলো চলে এর সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের পকেটের টাকা চাঁদা দিয়ে। বিদেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া হয়। এ দেশে তো তার কোনো বালাই নেই।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য bangla desh Share Market