ভালোবাসার শক্তি ও স্বাস্থ্যকুশল


ভালোবাসার শক্তি ও স্বাস্থ্যকুশল


তার নাড়ি দ্রুত হলো, চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, পাকস্থলীর ভেতরে প্রজাপতি উড়তে শুরু করল; যখন সে কাছে এসেছে। সে মনোযোগ দিতে পারে না, তবে খেয়ালও করে না।
সে উচ্ছল, মাথা ঝিমঝিম করছে তার, আনন্দে উৎফুল্ল। একে কি প্রেম বলে?
‘ঠিক তা নয়, তবে হতে পারে এটি সূচনা।’ হুস্টনে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস স্কুল অব পাবলিক হেলথের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইমেরিটাস ব্লেয়ার জাসটিস বলেন, এই আচরণ প্রেম বা ভালোবাসার সূচনা পর্যায়ে হয় সচরাচর, একে বলে ‘প্রেমের মোহে পড়া’।
অন্ধ প্রেমেও নাকি এমন হয়। ‘ভালোবাসা কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে’—এ সম্পর্কে পাঁচটি পুরস্কার বিজয়ী বই লিখে খ্যাত ব্লেয়ার জাসটিস। ভালোবাসা সম্পর্কে আমাদের দেশেও কবি-সাহিত্যিক কত পদ্য ও গদ্য রচনা করেছেন, এ সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসাও কম নয়। ‘ভালোবাসা কারে কয়, সে কি কেবলই যাতনাময়’—এমন অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। ভালোবাসা নিয়ে মজার কথাও আছে: ১৯৮৮ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা রোমান্টিক প্রেমের তিনটি রকমফেরও করেছেন। অন্তরঙ্গতা, দায়বদ্ধতা, প্রতিশ্রুতি, প্যাশন—সব উপকরণ মিলিয়েই রোমান্টিক প্রেম।
ভালোবাসা যখন গবেষণাগারে
কী ধরনের ভালোবাসার অভিজ্ঞতা হবে, তা বড় কথা নয়, ভালোবাসা না থাকার চেয়ে ভালোবাসা থাকা ভালো, তা বড় হিতকরী।
এর মূলে রয়েছে রসায়নের খেলা: শরীরের ওপর এর হিতকরী প্রভাব কম নয়। অনুরাগ ও আসক্তি মগজের রসায়নের মূলে নিহিত।
তেমন একটি রাসায়নিক হলো এনডোর্ফিন। ১৯৭৫ সালে প্রথম আবিষ্কৃত এই রাসায়নিকটি দেহ প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করে, ব্যথা উপশম করে, চাপ প্রশমিত করে, বার্ধক্যের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে। এনডোর্ফিন হর্ষোৎফুল্ল করে আমাদের। ব্যায়াম ও শরীরচর্চা আরও উদ্দীপিত করে এনডোর্ফিন নিঃসরণ। এমনকি দূরপাল্লার দৌড়ে এনডোর্ফিনের জন্য ব্যথা ও অবসন্নতা বোধ ঘটে না, বরং দৌড়ের শেষে নিজেকে মনে হয় নমনীয় ও শক্তিমান।
যখন ভালোবাসা ও এনডোর্ফিন নিঃসরণ উদ্দীপ্ত করে
ভালোবাসার উষ্ণ যন্ত্রণা বরং শক্তি দেয় মানুষকে।
এনডোর্ফিন তীব্রতর হয়; আরও রাসায়নিক ক্রমে চড়া হয়ে ওঠে, আসে আমোদ উৎপাদক হরমোন রাসায়নিক ‘ডোপামিন’ ও নরইপিনেফ্রিন, এই নিউরোট্রান্সমিটারটি ইতিবাচক প্রণোদনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ‘রোমাঞ্চকর ধেয়ে আসা’ কারও জন্য হয় হিতকরী, কাউকে করে বড় উদ্দীপ্ত; কেউ কেউ ভালোবাসাতে হয় আসক্ত।
সিক্রেটস অব দ্য সুপার ইয়ং বইটি লিখে খ্যাত নিউরোসাইকোলজিস্ট ডেভিড উইকস বলেন, জীবনসঙ্গী যাঁরা ঘন-ভালোবাসা করেন প্রায়শ; তাঁদের আয়ু বেশ বাড়ে।
কেবল ঘনিষ্ঠ ভালোবাসা নয়, দৈহিক সংস্পর্শ, নিঃসৃত করে এনডোর্ফিন; যেমন, হরমোন অক্সিটোসিনও। মানুষের মধ্যে বন্ধন স্থাপনে অক্সিটোসিনের ভূমিকা অনন্য। এই দুটো রাসায়নিক প্রাকৃতিক আফিমের মতো কাজ করে; নেশা ধরায় মনে, আসক্তি টানে, সুস্থিত করে রোমান্টিক সম্পর্ক—বলেন ডা. মাইকেল ওডেন্ট।
অন্তরঙ্গ স্পর্শ, যেমন, হাতে হাত ধরা, হাত ধরে হাঁটা, প্রেমিকের গালে টোকা দেওয়া—এমন আন্তরিক ভালোবাসা শরীরে রোগ প্রতিরোধ অ্যান্টিবডি বাড়ায়; গ্রোথ হরমোনকে প্রণোদিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতাল-নার্সারিতে অপরিণত শিশুদের নার্সরা বুকে ধরে গালে টোকা দিলে গ্রোথ হরমোন নিঃসরণ বাড়ে—এই ফলাফল অনেক হাসপাতালকে ‘স্পর্শ করা চর্চা’ চালু করতে উৎসাহিত করেছে, যাতে নিওন্যাটাল নার্সারিতে শিশুরা বেড়ে ওঠে সহজে। বিখ্যাত হূদেরাগ বিজ্ঞানী ডিন অরনিশ লিখেছেন, আমাদের অসুস্থ হওয়া ও ভালো থাকা, আমাদের বিষণ্ন হওয়া, আমাদের সুখী হওয়া—এসব কিছুর মূলে রয়েছে ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা, আমাদের রোগভোগ ও নিরাময় এসবের মূলেও রয়েছে এই দুটো জিনিস। রোগীর হূদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের ওপর খাদ্য, ধূমপান, বংশগতি ও ব্যায়ামের যেমন প্রভাব, ভালোবাসারও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইনস্টিটিউট অব হার্টম্যাথের গবেষকেরা ইদানীং দেখেছেন, মগজের মতো হূদ্যন্ত্রও ইমোশনের মুখোমুখি হলে উৎপন্ন করে হরমোন। ভালোবাসা, প্রেমের প্রভাবে খুব ছন্দময়, সংগতিপূর্ণ হূৎস্পন্দন ঘটে, অথচ নেতিবাচক ইমোশন জন্ম দেয় এলোমেলো স্পন্দন। জীবনসঙ্গীদের মধ্যে প্রেমঘন ভালোবাসা অনেক রোগ প্রতিরোধ করে, দীর্ঘায়ু করে দম্পতিকে। যাঁদের মা-বাবার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক, তাঁদের হূদেরাগ হয় অনেক কম।
দার্শনিক ব্যাখ্যা বাদ দিলেও এর একটি প্রায়োগিক ব্যাখ্যাও আছে। একা জীবনযাপনে অভ্যস্ত যাঁরা, তাঁদের চেয়ে অনেক সুবিধায় থাকেন দম্পতিরা। যেমন, বিবাহিত পুরুষের কথা যদি বলি—স্ত্রীরা সুষম আহার পরিকল্পনা করেন, অনেকে রান্না করেন, চিকিৎসকের কাছে যেতে স্বামীদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং জোরও খাটান। বিবাহিত জীবন যেমন—প্রেমঘন, তেমনি নিরাপদ ও রুচিশীলও বটে। মূলকথা যা শাশ্বত; ভালোবাসার শক্তি স্বাস্থ্যকুশল বাড়ায়।
ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে এমন সংকল্প হোক সবার, ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, এই সুরে, কাছে দূরে জলে স্থলে সর্বত্র।’

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস বারডেম হাসপাতাল, সাম্মানিক অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১২

ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের সাহসী ভুবন


ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের সাহসী ভুবন
Wall Street protesters urge students to boycott loan payments


অ্যামি গুডম্যান • মঙ্গলবার রাত ১টার পর আমাদের কাছে খবর এলো, নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনকারীদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। আমি ‘ডেমোক্রেসিনাউ’ টিমের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে জুকুটি পার্কের দিকে দৌড়ালাম। এই পার্কটির নতুন নামকরণ হয়েছে লিবার্টি স্কয়ার বা স্বাধীনতা চত্বর। গিয়ে দেখি কয়েকশ’ দাঙ্গা পুলিশ ইতোমধ্যেই এলাকাটি ঘিরে ফেলেছে। দেখলাম, পুলিশ একদিকে তাঁবুগুলো ছিঁড়ে ফেলছে আর সিটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের জিনিসপত্রগুলো ময়লার ট্রাকে ছুড়ে মারছে। পুলিশ বেষ্টনির বাইরে পার্কের কেন্দ্রস্থলে ২০০ থেকে ৩০০ আন্দোলনকারীকে হাত বাঁধা অবস্থায় বসে থাকতে দেখলাম। কিছুতেই তারা দুই মাস ধরে দখল করে বসে থাকা জায়গাগুলো ছেড়ে যাবে না। তাদের সবাইকে এক এক করে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা যে ক’জন সংবাদকর্মী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছতে পারলাম তাদের জুকুটি পার্ক সংলগ্ন রাস্তাগুলোর ওপর দাঁড়াতে দেওয়া হলো। তবে আমরা আমাদের ক্যামেরাগুলো চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে দুটি পুলিশ বাস এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো যাতে আমরা ভেতরকার ছবি তুলতে না পারি। আমি আর আমার কয়েকজন সহকর্মী বাস দুটির ফাঁক গলিয়ে এবং ছেঁড়া তাঁবু আর স্লিপিং ব্যাগের স্তূপ পেরিয়ে পার্কের ভেতর ঢুকে পড়লাম। পুলিশ এতবড় একটা ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র মিডিয়ার কাছ থেকে প্রায় আড়ালই করে ফেলছিল।

একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বইয়ের একটি ভাঙা তাক আমার চোখে পড়ল। পার্কের বেশ কিছুটা ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলাম একটি বই পড়ে আছে। বইটির গায়ে ‘ওডব্লিউএসএল’ চিহ্ন সাঁটা ছিল যার মানে হচ্ছে বইটি অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট লাইব্রেরির। এটি এখন পিপলস লাইব্রেরি হিসেবেও পরিচিত। চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল এই লাইব্রেরিটি। সর্বশেষ তথ্য মতে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দান করা ৫ হাজার বইয়ের একটি সংগ্রহ রয়েছে এটির। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা গণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে যে বইটি আমার দৃষ্টিগোচর হলো সেটি পড়েছিল একটি আবর্জনার স্তূপের ওপর। বইটির নাম ‘ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড রিভিজিটেড’। লেখক এলডাস হাকসলি।

রাত গভীর হতে থাকলে হাকসলির বইটি চোখে পড়ার মাহাত্ম্য স্পষ্ট লাগল। তার বিখ্যাত উপন্যাস ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড লেখার ৩০ বছর পর ১৯৫৮ সালে হাকসলি এই বইটি লেখেন। মূল বইটিতে তিনি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষকে হ্যাভস এবং হ্যাভনটস এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। তার বর্ণিত দ্য ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ডের মানুষ আনন্দ, উন্মাদনা, বিজ্ঞাপন আর নেশা জাগানিয়া দ্রব্যাদির সাহচার্যে গা ভাসাবে। যাকে বলে প্রকৃত অর্থেই একটি ভোগবাদী জীবন। এই সমাজের নিচের স্তরের মানুষ ওপরের স্তরের অভিজাত কিছু মানুষকে সব ধরনের সেবা যুগিয়ে যাবে। তবে হাকসলির ব্রেইভ নিউ ওয়ার্ল্ড রিভিজিটেড বইটি কিন্তু উপন্যাসধর্মী রচনা নয়। এটিতে তিনি আধুনিক সমাজের একটি বিবর্ণ ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই বইটির এখানে একটি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। কারণ আমরা দেখেছি যে, বাণিজ্য এবং বিশ্বায়নের আধিপত্যকে বিরোধিতা করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। আন্দোলনকারীদের ক্যাম্প ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

হাকসলি তার বইতে লিখেছেন ‘প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এবং ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়ে গড়ে ওঠা বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক বলতে বোঝায় পার্টির মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণই। সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং বেসামরিক আমলারা ওই মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের আজ্ঞাবাহী হয়ে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী একটি গণতন্ত্রে এই নিয়ন্ত্রণটি রয়েছে অধ্যাপক সি রাইট মিলসের ভাষায় পাওয়ার এলিটদের হাতে। হাকসলি বলছেন, এই পাওয়ার এলিট বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীটি দেশের লাখ লাখ মানুষকে তাদের কারখানা, অফিস এবং স্টোরগুলোতে কর্মে নিয়োজিত করে। অন্যদিকে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী কেনার জন্য এই পাওয়ার এলিটরা আবার লাখ লাখ মানুষকে টাকা ধার দেয় এবং এর মাধ্যমে তাদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

তাছাড়া নিজেদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে প্রতিটি মানুষের চিন্তাভাবনা, আবেগ-অনুভূতি এবং কর্মকান্ডকেও তারা বিপুল পরিমাণে প্রভাবিত করে থাকে। জুকুটি পার্কে পুলিশি হামলা চলার সময় পিপলস লাইব্রেরির কর্মী স্টিফেন বয়ার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতার এড়িয়ে এবং আক্রান্তদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পর তিনি বলছেন, পার্কে আমরা যেসব জিনিস জড়ো করেছিলাম তার সবই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এত সুন্দর একটি লাইব্রেরিও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। লাইব্রেরির সংগ্রহে থাকা ৫ হাজার বইও হারিয়ে গেছে। অনুদান হিসেবে পাওয়া আমাদের তাঁবুগুলোও ছিঁড়ে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের সব অর্জন এরা নস্যাৎ করে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র মিচেল ব্লুমবার্গের অফিস থেকে পরে অবশ্য উপরে কিছু বই সাজিয়ে রাখা একটি টেবিলের ছবি প্রচার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে যে, লাইব্রেরির বইগুলো সংরক্ষিত আছে। তবে পিপলস লাইব্রেরির টুইটারে বলা হয়েছে, কিছু বই অক্ষত আছে দেখে আমরা স্বস্তি বোধ করছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের অন্য বইগুলো কোথায়, আমাদের আচ্ছাদন আর বাক্সগুলোই বা কোথায়? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লাইব্রেরিকে এই আচ্ছাদনগুলো উপহার দিয়েছিলেন ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী বিখ্যাত রক অ্যান্ড রোল শিল্পী প্যাটি স্মিথ।

দখল অবস্থান নেওয়া আরো কিছু স্থানেও ইতোমধ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। ওকল্যান্ডের মেয়র জ্যা কুয়ান বিবিসির কাছে স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ১৮টি নগরীর কর্তৃপক্ষেও সঙ্গে কথা বলেছেন। অন্য আরেকটি খবরে জানা গেছে, এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটিও পরিস্থিতি সম্পর্কে নগরীগুলোর কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্ক স্টেট আদালতের একজন বিচারক এই মর্মে রায় দিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের উৎখাত করার বিষয়টি বহালই থাকবে এবং তারা আর তাঁবু ও স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে জুকুটি পার্কে ফিরে যেতে পারবে না। এই রায় জারির পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ একজন আইনজীবী আমাকে এই মর্মে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন, ‘মনে রাখবেন আন্দোলন কিন্তু এখন রাজপথে অবস্থান নিয়েছে। আদালতকে সব সময়ই শেষ সম্বল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।’ কিংবা প্যাট্টি স্মিথের বিখ্যাত সেই গান ‘জনগণই সর্বশক্তিমান’।

কমন ড্রিমস থেকে ভাষান্তর

আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না •

দুই মাস আগের ঘটনা। মাত্র ২০০ জন মানুষ আমরা তাঁবু গেড়ে বসলাম ওয়াল স্ট্রিটের দোরগোড়ায়। সেই থেকেই অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট একটি জাতীয় এবং এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। একই কায়দায় সারা আমেরিকায় এবং বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন শহর এবং নগরে দখল করে নেওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। এখন এতে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিচ্ছে। ক্রমশ বাড়তে থাকা গণআন্দোলন আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, আমাদের গণতন্ত্র এবং আমাদের ভবিষ্যতের চেহারাটাই তাৎপর্যপূর্ণভাবে পাল্টে দিতে শুরু করেছে।

এই গণআন্দোলনকে প্রতিহত করতে পুলিশি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে আমরা কিন্তু এতটুকুও দমে যাইনি। আমাদের শক্তি এখন তুঙ্গে। আমাদের মনোবল অনমনীয়। ক্রমেই বাড়তে থাকা এই আন্দোলন কেবল একটি প্রতিবাদ মাত্র নয়, তার চেয়েও বড় কিছু। এটি দখল করে নেওয়ার চেয়েও বেশি কিছু এবং এটিকে কেবল একটি কৌশল হিসেবে দেখলেই চলবে না। শারীরিকভাবে যারা দখল কার্যে অংশ নিতে পেরেছেন এই আন্দোলনে ‘আমরা’ শব্দটি দিয়ে তাদের চেয়ে আরো বড় একটি পরিসরকে বোঝানো হয়েছে। এই আন্দোলনে যারা সহযোগিতা প্রদান করেছেন, যারা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা যারা কোনো না কোনোভাবে নাগরিক সমাজের এই কর্মকান্ডে যুক্ত হয়েছেন তারা সবাই এই আন্দোলনের অংশ।

আমাদের জীবন বিপন্নকারী সংকটের মুহূর্তে আমরা যেমন সবাই একত্রে মিলে আমেরিকার অন্তর্নিহিত শক্তিকে আবিষ্কার করে সেই সংকট মোকাবিলা করি এবারের এ আন্দোলনও তারচেয়ে কম কিছু নয়। এমন একটি আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায় না। কিছু রাজনীতিক আমাদের হয়তো শারীরিকভাবে আমাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে নিতে পারেন, গণজমায়েত ভেঙে দিতে পারেন। বলপ্রয়োগের এই প্রচেষ্টায় তারা হয়তো সফলও হবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমরা এখন একটি আদর্শিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ। আমাদের ভাবনার জায়গাটি অনেক বেশি শক্তিশালী। আমরা চাই, আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আমাদের সেবা দেবে। কেবল ধনসম্পদ আর ক্ষমতাবানদের নয়, সেবা দেবে রাষ্ট্রের সব নাগরিককে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের এই চিন্তার সঙ্গে সব মানুষই সহমত পোষণ করে। কারণ আমাদের প্রতিনিধি পরিষদ কংগ্রেস ওয়াল স্ট্রিটের ঘটনা দেখেও না দেখার ভান করেছে, তারা ঘরে ঘরে জন্ম নেওয়া অসন্তোষ, প্রতিবেশীর হৃদয়ের আর্তনাদ, অর্থনৈতিক কারণে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কষ্টের কাহিনীকে অবজ্ঞা করেছে। আমরা একটি গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখি। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট এবং আমরা ৯৯%-এর আন্দোলনে সেই স্বপ্ন মূর্ত হতে শুরু করেছে।

১০০ মানুষ জেলে বসে আছেন। আজ সকালেই একজন বিচারক রায় দিয়েছেন যে, আমরা আমাদের জিনিসপত্র ফিরে পাওয়ার অধিকার রাখি, অধিকার রাখি আমাদের অবস্থানে ফিরে যাওয়ারও। তবে মেয়র ব্লুমবার্গ ঘোষণা দিয়েছেন, পার্কটি বন্ধই থাকবে। তাতে অবশ্য কিছুই আসে যায় না। আমরা আবারো রাস্তার দখল নেব। আমরা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানগুলো দখল করে নেব। সর্বত্র আমরা এ কাজ করব। কারণ আমরা জানি যে, আমাদের চিন্তাকে হত্যা করা যাবে না।

কমন ড্রিমস থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা।


রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়া ঠিক হচ্ছে না

মাসুদ মজুমদারঃ রাজনীতিতে অনৈতিকতার প্রভাব বাড়ছে। প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার প্রবণতাও প্রবল। ক্ষমতার রাজনীতিতে স্বার্থের বোঝাপড়াও বেড়ে গেছে। ক্ষমতার স্বার্থে যেকোনো অনিয়ম করতেও সরকার এখন প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে মিথ্যাচারও বৈধ হয়ে গেছে। যুদ্ধাপরাধ ইসুকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার বানানো হয়েছে। এটা যেনো প্রতিপক্ষ দলন ও দমানোর মোক্ষম হাতিয়ার। স্পর্শকাতর এ ইসুকে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা বলেছে।

১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবি করেনি­ এমন মানুষ বাংলাদেশে নেই। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়ার পর সরকার কার্যত ভড়কে যায়। কারণ আওয়ামী লীগ এ প্যান্ডোরার বাক্স নিয়ন্ত্রণহীনভাবে খুলতে চায়নি। আওয়ামী লীগ ভালো করেই জানে পরিচ্ছন্নভাবে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ইসুটি সামনে আনতে হলে সরকারের অতীত ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে পড়বে। এমনকি বঙ্গবন্ধুও অভিযুক্ত হয়ে যান। জড়িয়ে যায় ভারত। পাকিস্তান তো জড়াবেই। আওয়ামী লীগ এত জটাজালে আটকে যেতে চায় না। কার্যত সরকার আন্তরিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। চায় এই ইসুকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে। রাজনৈতিক মেরুকরণে ইসলামপন্থীরা জাতীয়তাবাদী শক্তির মিত্র। অপর দিকে ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বিএনপি। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার মতো ধারালো অস্ত্র আওয়ামী লীগের হাতে নেই। জিয়া ইমেজ এখনো ইতিবাচক। তাই আওয়ামী লীগ জিয়া ইমেজের রশি ধরে টান দিতে চেয়েছে। জিয়াকে নিয়ে বিতর্কের আসল মাজেজা মৃত জিয়াও শক্তিমান। বিএনপি’র রাজনীতিতে ধস নামাতে হলে জিয়া ইমেজ ফুটো করে দেয়া জরুরি। অনেক ভুলভ্রান্তি নিয়েই বিএনপি জোট সরকার পরিচালনা করেছে, কিন্তু জাতীয় ইসুতে ও জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টিতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি। প্রতিপক্ষ দমনেও হ্যাটট্রিক করেনি। ফলে ক্ষমতাসীন একটি দল অতীত ক্ষমতা চর্চাকারী অপর একটি দলকে শুধু সাফল্য-ব্যর্থতার নজির টেনেই সমালোচনা ও নিন্দা করতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান ব্যর্থতার তলানিতে পৌঁছে যাওয়ার কারণে সরকারকে অন্য ইসুতে মনোযোগী হতে হয়েছে। সেই ইসুটি যুদ্ধাপরাধ ইসু। মিত্ররা আক্রান্ত কিংবা অভিযুক্ত হলে অপর মিত্র বিব্রত হওয়া স্বাভাবিক। জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারে বিএনপি বিব্রত হয়েছে। সরকার এটাই চেয়েছিল। কারণ এই একটি মাত্র ইসুতে জামায়াত বিব্রতবোধ কাটাতে পারে না। এই ইসুটিকেই সরকার বিরোধী দলকে কাবু করার পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশী-বিদেশী মিত্রদেরও এই ইসুতে কাছে পাওয়ার ভরসা পেয়েছে। অস্তিত্বের স্বার্থে বর্তমান সরকারের সাথে আছে তাবৎ বামপন্থী। আরো সাথে আছে সাংস্কৃতিক কর্মী পরিচয়ে বামপন্থী ও সেকুলার নামে ধর্মবিদ্বেষী একটি গোষ্ঠী। এরা ধর্মপন্থীদের আদর্শিক শত্রু বিবেচনা করাকে একধরনের প্রগতিশীল ভাবনা মনে করে। তাই বামপন্থীদের আদর্শিক শত্রু এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শত্রু কমন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ভারত তার ইমেজ বৃদ্ধি ও স্বার্থ উদ্ধারে নানামুখী প্রভাব বলয় সৃষ্টি করার জন্য সচেষ্ট। ঐতিহাসিক কারণে ভারত বাংলাদেশের চীনঘেঁষা বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি ও ইসলামপন্থীদের তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধক মনে করে। অপর দিকে পশ্চিমা ঘোলা চশমায় ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী শক্তি মানে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের প্রতি সহমর্মী। পশ্চিমা শক্তির ধারণা এরা একই সাথে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকেও কম পছন্দ করে। তাই পশ্চিমা শক্তি অন্তত কয়েকটি ইসু ভাবনায় জাতীয়তাবাদী-ইসলামি মূল্যবোধ লালনকারীদের তুলনায় সেকুলার ও বামপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। সমর্থন জোগায়। তা ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বীজ বপনের জন্য সেকুলার ও বামপন্থীদের মগজ এখন উর্বর। বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী অবস্থান আজকাল একধরনের ফ্যাশন। যেকোনো জাতীয় স্বার্থবিরোধী সন্ধি-চুক্তিতে এদের ব্যবহার করা সহজ। ক্ষমতার টোপ দিয়ে কেনাকাটাও কঠিন নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সমস্যার জট পাকিয়ে ফেললেও এ কারণেই ভারত ও পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পায়। একধরনের মন্দের ভালো বিবেচনায় মার্কিন লবির একটি অংশও বর্তমান সরকারকে তাদের স্বার্থানুকূল ভাবে। যদিও মার্কিন নীতি এককভাবে দলবিশেষ ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতি ঝুঁকে থাকার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। মার্কিন লবি হয়তো চাইবে না ভারত বাংলাদেশকে একক বাজার ও পশ্চাৎভূমি হিসেবে ব্যবহার করুক। কারণ তেল, গ্যাস, বন্দরসহ ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে মার্কিন স্বার্থ সব ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থের সমান্তরাল হয় না।

আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ প্রকৃত অর্থে যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় না। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে যে ঢোল সহরত করছে সেটাও এক ধরনের রাজনৈতিক তামাশা। এ তামাশাও দেখাতে চায় খণ্ডিতভাবে। বাস্তবে সরকার প্রতীকী অর্থে বিচার নামের প্রহসনের ওপর ভর করে একই তীরে দুটো অর্জন নিশ্চিত করতে চায়। প্রথমত, তারা চায় প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে অকার্যকর প্রতিরোধহীন শক্তি হিসেবে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে রাখতে। একই সাথে আশা করে একই তীর ছুড়ে বিএনপিকে বন্ধুহীন করে রাখতে। দ্বিতীয়ত, জামায়াতকে কোণঠাসা ও কাবু করে রাখার জন্য এত সস্তা দাওয়াই আর নেই। এটা প্রয়োগ করে ভারত ও পশ্চিমা মিত্রদেরও বোঝানো সহজ যে, মহাজোট সরকার জঙ্গিবাদ-মৌলবাদবিরোধী এবং মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ সমর্থকদের দমন-পীড়নে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। তারা আশা করেছিল বিএনপি শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেবে। তাতে বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের দোসর বলে প্রচারণা চালানো সহজ হবে। বিএনপি’র দুর্বল অবস্থান সরকারকে অতি উৎসাহী করে তোলে। তারা আশা করে আখ খাওয়ার গল্পের মতো জামায়াতকে কোণঠাসা করে পরে বিএনপিকে দুর্বল করা সহজ হবে। যদিও একধরনের ইনার কন্ট্রাডিকশন নিয়ে আওয়ামী লীগ পথ চলছে। সিদ্ধান্তহীনতাও তাদের ঘিরে ধরে আছে। রাজনৈতিক তামাশা প্রদর্শন করতে গিয়ে যত পথ চলছে সামনে ভুলের মাশুলগুলো পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে। জনগণের আবেগ কাটছে। সমর্থকদের মনোবল দুর্বল হচ্ছে।

সরকার যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ইসুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে তার সর্বশেষ প্রমাণ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গ্রেফতার নাটক। তাকে গ্রেফতার করা হলো মগবাজারে গাড়ি পোড়ানোর মামলায়, যা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ভোঁতা। নাবালক শিশুও বোঝে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পুলিশি সিদ্ধান্তে গ্রেফতার করা হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা ছাড়া এ গ্রেফতার অসম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের নৈতিক অবস্থান স্বচ্ছ হলে তাকে প্রথমেই কথিত যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হলো না কেন? বিএনপি প্রথমে এই ইসুটিকে অত্যন্ত হালকাভাবে গ্রহণ করেছে। জামায়াতও ভেবেছে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করবে। আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের শীতল প্রতিক্রিয়ায় উৎসাহবোধ করেছে। এ উৎসাহের প্রথম কারণ, তারা লক্ষ করেছে জামায়াতকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। বিএনপিকেও বন্ধুহীন করার ফন্দি কাজ দিয়েছে। বিরোধী দল মাঠ ছেড়েছে। কেউ নয়াপল্টন, কেউ মগবাজারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ উৎসাহ আরো উচ্চাভিলাষের জন্ম দিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, এ উচ্চাভিলাষ ও বিরোধী দলকে অবমূল্যায়ন জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।

সাধারণ মানুষ বলাবলি করছে দরাজ গলায় ‘আমরা ক্ষমা করতে জানি’ বলে চিহ্নিত ১৯৫ জনকে ভারতের সাহায্যে জামাই আদরে বিদায় করে দিয়ে সরকার এত বছর পর নিজ দেশের মানুষদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে কেন? অপরাধী যেই হোক তার বিচার হওয়া কাম্য। কিন্তু মূল অপরাধী ছাড়া পাবে, তাদের সহযোগী শাস্তি পাবে, আইন-বিচার, মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার কোথাও এর সমর্থন পাওয়া যাবে না। কোথাও এমন নজিরও নেই।

অনেকের মনে প্রশ্ন, সরকার যুদ্ধাপরাধ ইসু কদ্দূর টেনে নিয়ে যাবে। আসলে ইসুটি রাজনৈতিক। এর আইনি পরিসমাপ্তি সম্ভব নয়। এর জের টানা এত সহজ হলে বঙ্গবন্ধুকে ভিন্ন ভূমিকায় দেখা যেত। এখন বিএনপি-জামায়াত জোট ইসুটিকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে সরকার এগোতেই থাকবে। একটা প্রহসনের বিচার মহড়ায় কিছু চিহ্নিত প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সব সুযোগ গ্রহণ করবে। কারণ অসৎ ভাবনা­ অনৈতিক কাজ ও প্রতিহিংসার শেষ থাকে না। যদিও সামগ্রিক ইসুটিকে সরকার বিতর্কিত করে লেজেগোবরে অবস্থায় নিয়ে গেছে।

সাকা চৌধুরীকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার প্রশ্ন নয়। তাকে খাতির-আত্তি করার বিষয়ও নয়। কিন্তু তাকে যে প্রক্রিয়ায় আগের কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ গ্রেফতার রীতি অনুসরণ করে আটক করা হলো, তা কিন্তু খারাপ নজির হয়ে রইল। নির্যাতনের উপমাও মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এ সরকার একমাত্র সরকার নয়। শেষ সরকারও নয়। দেশজাতির সামনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে উপমা সৃষ্টি করে রাখা হলো তা যে বারুদে হাত রাখার শামিল হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে। পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য এ নজির ও উপমা অপকর্ম বৈধতা দেয়ার সনদ হয়ে থাকবে। এ খোঁড়া গর্ত বা কবরে বর্তমান শাসকরা পড়বেন না সেই নিশ্চয়তাই বা কোথায় পাওয়া যাবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি পালটে দেয়ার প্রকৃতিগত প্রতিক্রিয়া রোধ করা কিভাবে সম্ভব হবে।

নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা বদলের পরও আমরা সংযমহীন বাড়াবাড়ি দেখেছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে­ এমন দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছি। মান্নান সাহেবকে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে, হরতালের সমর্থনে পিকেটিংয়ের সময়। মতিন চৌধুরীকে পুলিশ হামলে পড়ে অপদস্থ করেছে মৌচাকে। নাসিম সাহেবের ওপর পুলিশের হামলার দৃশ্য তো মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। বাবর সাহেবকে নিয়ে কী করা হচ্ছে তার কথা না তোলাই ভালো। তাই সহজেই উচ্চারণ করা যায় এককাল শাশুড়ির, আর এককাল বউয়ের। তা ছাড়া এক মাঘে শীত না যাওয়ার গল্প কে না জানে। তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার জন্য যখন যারা দায়ী তারা সবাই নিন্দনীয় কাজ করেছেন।

আমরা অনুশীলিত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি নিয়ে শঙ্কিত, উৎকণ্ঠিত (।) একই সাথে বিব্রতও। আমরা সহজ কথায় যে সত্যটি বুঝি, ভিন্ন মত না থাকলে গণতন্ত্র থাকবে না। বিরোধী দল নাই হয়ে গেলে সরকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারবে না। ভিন্ন মত ও বিরোধী দল সহ্য না করার প্রেক্ষাপটে যে অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে, তার ষোলো আনা দায়ভার নিতে হবে সরকারকে। তাই ক্ষমতার জোরে পুলিশকে বেপরোয়া বানিয়ে দেয়া কিংবা আইনের ঊর্ধ্বে এলিট ফোর্সকে রক্ষীবাহিনী চরিত্রে নিয়ে যাওয়ার কোনো কুমতলব না থাকাই ভালো।

সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে পারছে না। সময়মতো পাঠ্যবই নেই, ভোজ্যতেল হাওয়া, বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, জনশক্তি রফতানিতে ধস, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে, পোশাক শিল্পে আগুন জ্বলছে, পাটগুদাম পুড়ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে চলছে জুয়াখেলা। এর মাধ্যমে অতীতের অনেক ভয়াবহ ও ভীতিজনক স্মৃতির কথা মনে পড়ে। তাই জনগণের হৃৎস্পন্দন বোঝার দায় বাড়ছে। এ দায় পূরণে ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। ব্যর্থ হলে পাদুয়া দৃষ্টান্ত হবে। সরকার বিএসএফ নিয়ে রা করেনি। মিডিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ দেখেও না দেখার ভান করেছে। এটা যেনো ছিল বন্ধুত্বের সহনীয় ‘উৎপাত’। জনগণ অপেক্ষা করেনি। দল ও মতনিরপেক্ষ সাধারণ জনগণ সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ভারতীয় আগ্রাসন ঠেকিয়ে দিয়েছে। জনগণের এ সম্মিলিত শক্তিকে সমীহ না করলে বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করার ফলাফল কোনো দিনই ভালো হওয়ার কথা নয়।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?


রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক

বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?


বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?
মোহাম্মদ শাহজাহান

Published: 2010-10-23

ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক জ্যাম

Traffic JAM in Dhaka


বেশ ক’বছর আগের ঘটনা। ঢাকার রাস্তাঘাটের চালচিত্রের উপর একটি টিভি প্রতিবেদনের রিপোর্ট দেখছিলাম। রিপোর্টার জনৈক রিকশাওয়ালাকে তিনি কেন ট্রাফিক নিয়ম ভেঙ্গে বেপরোয়া গতিতে তার রিক্সা চালিয়ে নিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন করলে, রিক্সাওয়ালা মহোদয় বুক চিতিয়ে দুর্বিনীত ভংগীতে তাকে যে জবাবটি দিয়েছিলো, তার সে জবাবেরই অংশ উপরে উদ্বৃত এ লেখাটির শিরোনাম।

বাংলাদেশে কে নিয়ম মেনে চলে? একটি অতি স্বাভাবিক কিন্তু পীড়াদায়ক প্রশ্ন বটে। এক কথায় এর জবাব হতে পারে, না, কেউই এখানে নিয়ম মেনে চলেনা। কারণ নিয়ম ভাংগাটাই যেন এখন এখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো বিশদভাবে বললে বলতে হয়, নিয়ম কানুন যা আছে বাংলাদেশে সব কিতাব আছে, বাস্তবে ঐসব নিয়ম পালনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়ও পরিলক্ষিত হয়না।

রিক্সাচালকের উপরোক্ত বাক্যের মাধ্যমে আমাদের দেশের বর্তমান সমাজের একটি অতি সত্য কিন্তু তিক্ততম অবস্থার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। সোজা কথায় বলতে হয় সমাজের একেবারে উপরতলা হতে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নিয়মনীতি ভাংগার এ প্রতিযোগিতা চলছে, অবিরাম গতিতে। আর সেকারণেই একজন রিক্সাচালক হয়েও লোকটি অত্যন্ত নির্বিকার ও দৃঢ় ভংগীতে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছে। রিক্সাচালক হয়েও দেশের ভেঙ্গে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তার এ প্রতীতি জম্মেছে যে তার এমন অপ্রিয় সত্য ভাষন শুনে কেউ একথা বলবেনা, ‘বলে কি লোকটা, চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’। প্রকৃতপক্ষে তার এই অপ্রিয় সত্য ও বেপরোয়া মন্তব্যের মাঝেই প্রোথিত আছে, আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এবং ধ্বসে পড়া রাজনৈতিক অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় নিয়ম কেন ভাঙ্গা হয়, নিয়ম ভাঙ্গার সাহস কোথা থেকে আসে, তখন এর জবাবে বলা যায়, ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা, স্বার্থপরতা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ এবং লালসা চরিতার্থ করার বাসনা হতে, সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পরকাল ও সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়ডরের অভাবেই সাধারণতঃ মানুষ নিয়ম ভাংগে, নিয়ম ভেংগে অবৈধ উপায়ে অপরের স্বার্থের হানি ঘটিয়ে বিভিন্ন সুবিধাদি হাতিয়ে নেয়। ছোট ছোট নিয়ম বা আইন ভাংতে ভাংতে একদিন সে অতি বড় ক্রিমিনাল (গডফাদার) হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার ভয়ে কম্পমান থাকে এলাকার জনগন। সরকারের আইন কানুনের ভয়ের চাইতেও বেশী প্রভাবশালী ও ক্ষমতাময় প্রভাব বিস্তার করে এসব গডফাদারগন নিজ নিজ এলাকায়। এ মহাযজ্ঞে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে চলে আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক পটভূমি, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী-উপদেষ্টা কর্তৃক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্বন্ধে অসত্য ও বিরূপ মন্তব্য করে অন্যায়কারীদেরকে আস্কারা দেয়া, ভগ্নপ্রায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ইত্যাদি। আজ যারা সমাজের উচ্চাসনে বসে আছেন, অলংকৃত করে আছেন দেশের বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদ, অথবা বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি, তাঁরা কেউই (হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া) দেশের পবিত্র সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি ভাংগার ক্ষেত্রে অপর কারো থেকে পিছেয়ে নেই।

নিয়ম ভাংগার এ ম্যারাথন দৌড়ে সবাই চায় তার সামনের ব্যক্তিটিকে কিভাবে ল্যাং মেরে পিছিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে তার প্রতিবেশীকে টাকা পয়সায়, অর্থ-সম্পদে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে, দৈনন্দিন আদান প্রদানে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে এমন ক্ষমতাধর হওয়া যায় যে, সমাজের অন্য সবাইকে তার পেছনে জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর বোল বলিয়ে নিজেকে একজন কেউকেটা জাতীয় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। নিয়ম ভাংগার এই দৌড়ে তার দ্বারা সমাজে কি কি সব অনাচার ও অপরাধ ছড়াচ্ছে,বা দেশ ও জাতির জন্য তা কি ভয়াবহ পরিনাম ডেকে আনছে, তা সে ভাবতেও চায়না, বরং সত্যি কথা বলতে কি, দেশের চাইতেও সে এখানে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে। তার এই স্বার্থপর নীতি চরিতার্থ করার পথে সে যাকেই পাবে তাকেই কুচলে দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাঁধবেনা, হোক না সে আপন রক্ত সম্পর্কেরই কেউ, নিজের মায়ের পেটের ভাই, স্বামী (মহিলার ক্ষেত্রে), কিংবা স্বয়ং তার জম্মদাতা অথবা জম্মদাত্রী মা।

যারা শুধুমাত্র নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য, নিজের ভবিষ্যৎ আরাম আয়েশের পথ সুগম করার লক্ষ্যে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে, এবং অন্যদিকে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বে অবহেলা করে সরকার তথা দেশের জনগনের অর্থ এবং সম্পত্তির সীমাহীন অপচয় করে চলে, তারা কোনভাবেই রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের বড় বড় পদ দখল করে রাখার যোগ্য হতে পারেনা। বরং তাদের স্থান হওয়া উচিৎ পুরান ঢাকার লোহার গেট দেয়া লাল ইটের তৈরী বড় দালান। তাদের প্রথম অপরাধ, তারা জনগনের খেদমতের প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় বসে জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয়। তাদের দ্বিতীয় অপরাধ, তারা অসৎ উপায়ে দেশের খেটে খাওয়া জনগনের ট্যাক্সে গঠিত সরকারের তহবিল তসরূপ করে দেশকে আরো গরীব হবার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, এবং তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তারা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও অসৎ পন্থা অবলম্বন করেন বলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য সব কর্মচারীগনও অনিয়মের গলিঘুপচিতে চলতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তাদের বসদের পদাংক অনুসরণ করে গোটা সিস্টেম এর মধ্যেই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, এবং অসততার সয়লাব ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে দিয়ে, দেশের সার্বিক প্রশাসন ব্যবস্থাকে একেবারে পংগু করে ছাড়ে।

এটাতো একটি সহজ সরল বিষয় যে, কোন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা যদি নিজে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত হন, তবে ক্রমে ক্রমে তার অধীনস্থ সব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাই ঘুষ খাওয়াটাকে জায়েজ মনে করে নির্বিবাদে সে অপকর্মটিকে নিজেদের দৈনন্দিন অফিসিয়াল কর্মসূচীর একটি অংগ বানিয়ে নিবে। ঠিক যেমন একজন পিতা যদি নিজে নামাজী না হন তাহলে তার সন্তান সন্ততি কেউই নামাজী হতে পারেনা। দু’টি ক্ষেত্রেই পরবর্তীদের চাইতে পূর্ববর্তীদের পাপ দ্বিগুন হবে, কারণ প্রথমতঃ বড় হিসাবে তাদের দায়িত্ব ছিল অন্যায় অনিয়মকে প্রশ্রয় না দেয়া, কোথাও কোন অন্যায় ঘটতে দেখলে তা রোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া। তাতো তিনি করেনই নি, বরং উল্টো নিজেই অনিয়মের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছেন, এবং এভাবে তার অধীনস্থদেরও এর প্রতি আহবান করেছেন। ফলে তারাও তাকে অনুসরণ করেছে। ফলশ্রুতিতে নিজের পাপের বোঝা যেমন তাঁরা কাঁধে নিচ্ছেন তেমনি অপরের করা পাপেরও সমান অংশীদার হচ্ছেন। পবিত্র হাদিস শরীফেও আছে, মানুষের একাধারে করতে থাকা ছোট ছোট অন্যায় বা ভূলগুলোই ক্রমান্বয়ে তাকে বড় অন্যায়ের প্রতি টেনে নিয়ে যায়। আর তার দ্বারা সংঘটিত অন্যায় কাজ তার উত্তরসূরীদের মাঝে সংক্রমনে যেহেতু তারই অবদান বেশী, তাই পরবর্তিদের অন্যায় কর্মের পাপের বোঝা অন্যায়কারীর সাথে সাথে তাদের উপরও সমান ভাবে বর্তাবে।

রিক্সাওয়ালার উচ্চারিত সে কথাটুকুতে ফিরে যাই। একমাত্র ট্রাফিক নিয়মকানুন ভাংগার ক্ষেত্রেই যদি একটু তীক্ষ্ণ নজর দেয়া যায় তো দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নিয়ম ভাংগার ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতে নিয়েছে। দূর্নীতিতে বিশ্বসেরা হওয়ার রেকর্ড তো কাগজে কলমে বেশ কয়েকবারই হতভাগা এ দেশের কপালে জুটেছে। ৫/৬ বছর পুরনো এক সমীক্ষা মতে ঢাকা শহরে প্রায় চার লক্ষ রিকশার কোন বৈধ লাইসেন্সই নেই। এভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্যান্য যানবাহনেরও বহু সংখ্যকের বৈধ লাইসেন্স ও জরুরী কাগজপত্রে ভীষন ঘাটতি রয়েছে। কাগজপত্র থাকলেও সেসব কতটুকু খাঁটিঁ সে ব্যাপারটিও আবার বিবেচনার দাবী রাখে। অসহ্য ট্রাফিক জ্যামের কারণে বাসে করে মিরপুর হতে গুলিস্তানের দূরত্ব পাড়ি দিতে আপনার কম পক্ষে দেড় থেকে দু’ ঘন্টা সময় লাগবেই। অথচ জ্যামবিহীন রাস্তায় এ দূরত্ব অতিক্রম করতে আধা ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা নয়। আবার নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে এ দেড় দু’ ঘন্টা সময়ে একজন বাসযাত্রীকে কি কি ভোগান্তির সম্মূখীন হতে হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নীচে দেয়া গেলঃ

বাস, কার বা সি.এন.জি-গুলোর যথাস্থানে না দাঁড়িয়ে প্রায় সিকি কি.মি. জুড়ে এলোমেলোভাবে দাঁড়ানো, সি.এন.জি/ট্যাক্সি ক্যাবগুলো মিটার ব্যবহার না করা ও মিটারের চাইতে দ্বিগুন-তিনগুন ভাড়া হাঁকা, ট্রাফিক রুলের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গাড়ী চালানো, সামনের গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে মারাত্মক সব দুর্ঘটনার জম্ম দেয়া (কদিন আগের সাভারের আমিনবাজারের দুর্ঘটনাটি ছিল এ ওভারটেকেরই করুণ পরিণতি), নির্দিষ্ট স্টপেজে না দাঁড়িয়ে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, বিরতিহীন লেবেল এঁটে দিয়ে যাত্রীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে প্রায় সবক্ষেত্রেই সবিরাম গাড়ি চালানো, অফ-পিক আওয়ারে স্টপেজগুলোতে দু’মিনিটের বিরতিস্থলে দশ-পনের মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ানো, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বাস চালানো, পুরুষ যাত্রী কিংবা বাস চালক নির্বিশেষে মহিলা সীটের প্রতি কোন সম্মান না দেখিয়ে, নারী-পুরুষের ঠেলাঠেলিতে আর গাদাগাদিতে গাড়ীতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, কোন স্টপে যাত্রীদের অবতরন শেষ না হতেই গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দেয়া যাতে করে নারী ও শিশু যাত্রীরা অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়, মা-বোনদের হাত ধরে হেলপারদের অযথা টানাহেঁচড়া করার অশোভনীয় দৃশ্য।

আরো আছ। মটরযানের সাথে পাল্লা দিয়ে রিক্সাগুলোর মাঝরাস্তা বরাবর অথবা রাস্তার প্রায় সবটুকুই দখল করে চলাচল করা, যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরকেই দু’কথা শুনিয়ে দেয়া, কে কার আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সিগন্যালের মোড়ে চতুমূর্খী রিক্সা, বাস ও কারের জট পাকিয়ে দিয়ে ত্রাহি মধূসুদন অবস্থার সৃষ্টি, আর কতো বলবো? একবিংশ শতাব্দিতে এসেও ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে এখনো মান্ধাতা আমলেরই প্রতিনিধিত্ব করে চলছে, সে ব্যাপারটি দেখার ও যেন কেউ নেই। রাস্তাঘাটের হতদরিদ্র অবস্থার কথা এখানে আর বলছিনা, মনে হয় সময় এসেছে, নাগরিকদের নাগরিক সুবিধার অবর্তমানে সরকারকে ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করার জোর প্রচারণা চালানোর। সেদিন বেশী দূর নয়।

মহানগরীর রাজপথে চলাকালীন যাত্রীসাধারণের দূর্ভোগের একটি খন্ডচিত্র আমি আমার স্বল্পজ্ঞানের পরিধিতে সবার জন্য তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ফিরিস্তিখানা আর বেশী দীর্ঘ করে ট্রাফিকের যন্ত্রনায় এমনিতেই কাতর নগরবাসীর মনের জ্বালা আর বাড়াতে চাইনা। ‘কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে’, জনৈক রিক্সাচালকের এ উক্তির সূত্র ধরে আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের আরো কিছু অনিয়ম তথা নিয়ম ভাংগার ইতিকথা সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের সাথে সমভাবে ভাগাভাগি করে নেয়ার ইচ্ছা রেখে শেষ করছি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা


অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা

আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক
০০ জাকিরুল ইসলাম

মহামন্দার ধাক্কায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে ধরাশায়ী সেখানে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগাণ্ডায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার ২ শতাংশ যা তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়েও বেশি। চলতি এবং আগামী ২০১১ সালে এ হার আরো বেশি হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতি বিশেস্নষকরা। আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক। এমনকি ব্রাজিল, রাশিয়া, মেক্সিকো ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর চেয়েও বর্ধিত অংকের।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফ যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে তা হলো মাথাপিছু আয়। দেখা গেছে, আফ্রিকানদের মাথাপিছু গড় আয় ভারতীয়দের চেয়ে বেশি। আফ্রিকা ডজনখানেক দেশে জাতীয় মাথাপিছু গড় আয় চীনের চেয়েও বেশি। আরো আশ্চর্যের বিষয় আফ্রিকার দেশগুলোতে লোভনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেই তেল ও হীরার মতো কাঁচামালের বিকিকিনি। গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে জিডিপি অর্জিত হয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মূলে ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের পণ্য উৎপাদন এবং সেবাখাত।

গত বছর বিশ্বজুড়ে মহামন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছে এশিয়ার দুই দেশ চীন ও ভারত কিন্তু আফ্রিকার কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে অর্জিত হলেও তা থেকে গেছে সবার অগোচরে। দুনর্ীতির রাহুগ্রাস সত্ত্বেও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব আর তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। তাই কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সংশোধিত রিপোর্ট যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করার মতো। রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রেট লেকের পাশর্্ববতর্ী বিশেষ করে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় এমনকি হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার সৃঙ্গ) নামে পরিচিত খরাপীড়িত অঞ্চলে তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এদেশের অর্জিত প্রবৃদ্ধি এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ চীন ও ভারতকেও চমকে দিয়েছে।

আইএমএফ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী তাতে আফ্রিকার একশ কোটির মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতিমধ্যে পেঁৗছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। অবাক করার মতো বিষয়, মধ্য আয়ের শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এমন লোকের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক, ট্যাক্সিচালক, গৃহপরিচারিকা এমনকি রাস্তার ধারে অস্থায়ী অবকাঠামোতে বসে ব্যবসা করে এমন ক্ষুদে দোকানীর সংখ্যাও অনেক।

আফ্রিকা রাইজিং গ্রন্থের লেখক বিজয় মাজাবান তার ব্যাখ্যায় উলেস্নখ করেছেন, দুনর্ীতি ও অপশাসনের জন্য বদনাম থাকলেও তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আফ্রিকায় ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব। আর তার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। ফলে কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘আফ্রিকা ইনফ্রাস্টাকচার কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে আফ্রিকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশ। তাছাড়া এয়ারলাইন্স ও স্থলপথে পণ্য পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ার বাজারে ছাড়ায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে সংশিস্নষ্ট খাতগুলোতে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে চীনে এবং ভারতে। আরো একটি বিষয় উলেস্নখ্য ঐ সমীক্ষায় বলা হয়েছে বুরুন্ডি ও মালাউয়ে দক্ষ জনশক্তির বড়ই অভাব। তবে ঘানা, বোতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা ভিন্ন। উলিস্নখিত দেশ তিনটিতেই শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েকটি রিপোর্টে এ ব্যাপারে মিলেছে অভূতপূর্ব তথ্য। জানা গেছে, শুধু গত বছরই বিদেশে শিক্ষা সমাপনী শেষে নাইজেরিয়ায় ফিরেছে ১০ হাজার দক্ষ ভোক্তাজীবী। এঙ্গোলায় প্রতি বছর ফিরছে উলেস্নখযোগ্য দক্ষ পেশাজীবী, যারা দেশে ফিরে স্থানীয় শ্রমবাজারে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। এসব পারিপাশ্বর্িক অবস্থায় বিশ্বের কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভারতের পরই দক্ষ জনশক্তির অঞ্চল হবে আফ্রিকার দেশগুলো। যার পথ বেয়ে দ্রুতই আরো বিকশিত হবে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্টে বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে।

কেননা তার রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৯৫৪টি আফ্রিকান কোম্পানী অর্জিত মুনাফা গড়ে ১১ শতাংশ। একই সময়ে সমান সংখ্যক চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশীয় কোম্পানীর চেয়ে যা বেশি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এশিয়ার তুলনায় সহজলভ্য ও কম খরচে শ্রমিক নিয়োগ। এর মধ্যে আফ্রিকান মোবাইল অপারেটরদের মুনাফার হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে ইউনিলিভার, নেসলে ও সুইসপোর্ট ইন্টারন্যাশনালের মতো বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর মুনাফার পরিমাণও ঈর্ষণীয়। তাই ২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ কমে গেলেও আফ্রিকায় এ চিত্র উল্টো। ঐ বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে বরং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। অর্থের অংকে যা ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ১৯০ কোটি) ডলার। সর্বশেষ শিল্প ও বাণিজ্য বান্ধব আফ্রিকা দুনর্ীতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

মানসিক রোগীর সংখ্যা দেশে ১৬ শতাংশ : পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী


দেশে ১৬ শতাংশ লোক মানসিক রোগী ঢাবিতে গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে মানসিক রোগী

mental health in bangladesh

০০ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের ৬০ ভাগ লোক বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে ১৬ দশমিক ১ ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোক এবং ১৮ দশমিক ৩৫ ভাগ শিশু-কিশোর মানসিক রোগ ও সমস্যায় ভুগছে। এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য দেশে মাত্র ১২৩জন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন। এছাড়া, ৩২জন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও ১০১জন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রয়েছেন।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি (বিসিপিএস) এবং ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনব্যাপী গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব তথ্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরো বলেন, দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং এবং সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কের জন্য কোন প্রশিক্ষণ কোর্স নেই। বাংলাদেশে মানসিক রোগ বিষয়ে অজ্ঞতা ও কু-সংস্কার এবং মানসিক রোগীর প্রতি অবহেলা সর্বত্র বিদ্যমান। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে সর্বত্র সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো: গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো: জহির উদ্দিন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠন সম্ভব নয়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করে পরিবারের শান্তি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রত্যেক স্কুলে একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগের চিন্তা করছে।

ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাই সামাজিক সহিংসতা, দুর্নীতি, ইভটিজিং, প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এসব লোককে সুস্থ করে সুন্দর জাতি গঠন করা সম্ভব।

উলেস্নখ্য, দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় গোলটেবিল আলোচনা, কর্মশালা ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন মানসিক অবস্থা পরিমাপের সুযোগ রয়েছে।

দেশে মানসিক রোগী দেড় কোটি!

Sunday, 29 August 2010 সোলায়মান তুষার:

দেশে পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী। বিপুল সংখ্যক মানুষ সমস্যায় থাকলেও তাদের চিকিৎসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত একমাত্র হাসপাতালটি মানসিক রোগীর ভারে নতজানু। তাতেও নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কয়েকটি সংস্থার জরিপে দেশে পরিণত বয়সের এক কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন মানুষ মানসিক রোগে ভোগছেন।

এরমধ্যে গুরুতর অর্থাৎ একেবারে পাগল ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৮ জন। এছাড়া উদ্বেগজনক জটিলতায় ভোগছেন ৮৩ লাখ ৫ হাজার ৩৭০ জন। বিষণ্নতায় ভোগছেন ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৯ জন। মাদকাসক্ত পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাগুলো যৌথভাবে দেশের ১৮ বয়সের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষের ওপর জরিপ করে। জরিপ অনুযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ১৬.১ ভাগ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে উদ্বেগজনিত ৮.৪ ভাগ, বিষণ্নতায় ৪.৬ ভাগ, গুরুতর মানসিক সমস্যায় ১.১ ভাগ ও মাদকাসক্ত রোগে ভোগছেন ০.৬ ভাগ মানুষ।

জাতিসংঘের ২০০৯ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৯০ লাখ। উইকিপিডিয়ায় ‘ডেমোগ্রাফিক অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখা থেকে জানা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের লোকের সংখ্যা মোট নয় কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ চার কোটি ৭৮ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৪ জন। মহিলা চার কোটি ৫৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৪ জন। যা মোট জনসংখ্যার ৬১ ভাগ। আর ৬৫ বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ১৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। আর মহিলা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৫ জন। যা মোট জনসংখ্যার চার ভাগ। জন্মের পর থেকে ১৪ বছর বয়সের লোকজন মোট জনসংখ্যার ৩৪.৬ ভাগ। জরিপে এ সংখ্যা ধরা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ লোকের চিকিৎসার জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ রোগীর জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক কর্মরত। এরমধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত ১১৫ জন। যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০৭ ভাগ। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট রয়েছে একটি। তাতে ১৫০টি শয্যা রয়েছে। মানসিক হাসপাতাল রয়েছে একটি। তাতে পাঁচশ’ শয্যা রয়েছে। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মাত্র ০.৪ ভাগ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্তবিভাগ রয়েছে ৩১টি। তাতে ৮১৩টি শয্যা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভাগ রয়েছে একটি। তাতে ২০টি শয্যা রয়েছে। সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক রয়েছে দুটি। মাদকাসক্তি বিষয়ে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে চারটি ও বেসরকারি ১৬৪টি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারি ব্যয় স্বাস্থ্য বাজেটের ০.৪৪ ভাগ।

মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষ বিচিত্র ধরনের সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে ৪৪টি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। ১০ থেকে ১২টি সমস্যা গুরুতর। যেসব সমস্যা মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, এডজাস্টমেন্ট সমস্যা, সম্পর্কগত সমস্যা, অহেতুক ভয়, বিশ্বাসের অভাব, মনোযোগের সমস্যা, মনোগত সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মেহজাবিন হক বলেন, মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার পর যত্ন নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার দিক দিয়ে আমরা খুবই পিছিয়ে আছি। তিনি বলেন, সমপ্রতি যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তা একপ্রকার মানসিক রোগ থেকেই হয়েছে।

মানুষের বিকৃত রুচির দিকে প্রবণতা বাড়ছে। এটা একটা সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি তাতে কারও সুস্থ থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, আমাদের হাজারও রকম সমস্যা রয়েছে। এসবের সঙ্গে মানসিক সমস্যা যোগ দিয়ে আরও প্রবল আকার ধারণ করেছে। সমপ্রতি যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তাতে এটাই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র পরামর্শক সালেহ সিদ্দিকী বলেন, অনেক ধরনের রোগী রয়েছে। তিনি বলেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সমস্যা আরও বাড়ছে। মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হচ্ছে। এরফলে প্রায় প্রত্যেকের মধ্যে একপ্রকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি দেশে সমপ্রতি যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে তা মানসিক সমস্যার জন্যই।

বিশেষ প্রতিবেদন
দীর্ঘস্থায়ী রোগ মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে

দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, হূদরোগ বা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হলে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ একপর্যায়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুরারোগ্য বা প্রাণঘাতী জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের হতাশা দূর করার দায়িত্ব একাধারে চিকিৎসক, পরিবার ও সমাজের। কিন্তু দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতা ও ব্যবস্থা কোনোটিই নেই বললেই চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর বিশ্বের ৬০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ। সময়ের পরিবর্তনে জীবনাচরণসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশেও এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। রোগের গতিপ্রকৃতি, বিছানায় পড়ে থাকা, চিকিৎসার ব্যয়ভার, দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা—এসবের কথা ভেবে মানুষ শঙ্কিত বোধ করে। অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। গভীর হতাশা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিক রোগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, দেহ-মন এক সুতোয় বাঁধা বলেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগের সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। পরিবার ও সমাজের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অমনোযোগের কারণে শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য-জটিলতা চোখের আড়ালে থেকে যায়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটির উদ্ধৃতি দিয়ে মোহিত কামাল বলেন, এই অসচেতনতা ও অমনোযোগের কারণে আগামী ১০ বছরে বিশ্বে ৩৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে অসহায়ভাবে। এর বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোয়।

হূদরোগের আতঙ্ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হূদরোগ বিশেষজ্ঞ সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের (হূদযন্ত্রে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়া) পর অনেক মানুষ ভয় পায়। অনেকে মনে করেন, “আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছি। যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব না।” আসে হতাশা। এগুলো সাধারণ প্রবণতা।’

তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পর ৭০ শতাংশ রোগীই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পরামর্শ দিয়ে সজল ব্যানার্জি বলেন, এসব রোগীকে জীবনের আলো দেখানোই চিকিৎসকের দায়িত্ব। হূদরোগ চিকিৎসার পাশাপাশি হতাশা কমানো চিকিৎসারই অংশ। তিনি বলেন, ‘আমি আমার রোগীদের বলি, “এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার যে আপনি বেঁচে আছেন। তবে আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমার পরামর্শ মেনে চললে নতুন জীবন ফিরে পাবেন।”

সজল ব্যানার্জি জানান, রোগী ও তাঁর পরিবারের লোকদের সঙ্গে পরামর্শ (কাউন্সেলিং) করা দরকার। সময় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, সমস্যা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। এই কথা বলা চিকিৎসারই অংশ।

এ বিশেষজ্ঞ জানান, একটি ক্ষুদ্র অংশের হতাশা এতটাই গভীর হয় যে তাদের মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীর দেখেন হূদরোগ চিকিৎসক আর মনের চিকিৎসা করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

যন্ত্রণা থেকে হতাশা: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আলী হোসেন বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগেন। ওষুধে অনেক সময় সেই যন্ত্রণার উপশম হয় না। ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা সবকিছুর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন রোগী। আসে হতাশা।

আলী হোসেন বলেন, রোগীর সমস্যা যেন পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, সেই উদ্যোগ চিকিৎসককেই নিতে হয়। তিনি দুটি উদাহরণ দেন। অনেকের পরীক্ষার আগে হাঁপানি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভয় দূর করার দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে। অনেক বয়স্ক মানুষের ক্রনিক ব্রংকাইটিস আছে। শীতের সময় তা বাড়ে। অনেক সময় মানসিক কারণেও রোগটি বেড়ে যায়। সুতরাং পরিবারের এখানেও দায়িত্ব নেওয়ার আছে।

দীর্ঘদিন থেকে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা করছেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, এমডিআর যক্ষ্মায় (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট—বহু ওষুধ প্রতিরোধী) আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। নিয়মিত ১৮ থেকে ২৪ মাস ওষুধ খেতে হয়। ওষুধের খরচ, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাতায়াত রোগী এবং পরিবারকে হতাশ করে তোলে। আলী হোসেন বলেন, এসব রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসক ও সমাজের দায়িত্ব। শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে মানুষ সুস্থ হয় না। মানসিক সহায়তা বড় দরকার। প্রয়োজনে রোগীকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে।

সমাজের মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলী হোসেন আরও বলেন, সমাজেরও প্রস্তুত হওয়ার দরকার আছে। কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে গেলে অনেকেই তাঁকে মানসিক রোগী বা ‘পাগল’ ভাবতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থূলতা থেকেও বিষণ্নতা: বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত মোটা মানুষ কোনো কাজ ঠিকমতো, সময়মতো করতে পারে না। কাজের মান ঠিক থাকে না। মোটা মানুষ এ জন্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন। এসব কারণে অনেকে সমাজ ও পরিবারের কাছে নিজেকে অপাঙেক্তয় মনে করে। একসময় তারা হতাশ হয়ে পড়ে।

খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ঘামের কারণে অতিরিক্ত স্থূল মানুষের শরীরের অনেক স্থানে ঘা বা চর্মরোগ হয়। সহজে তা ভালো হয় না। ডায়াবেটিস রোগীদের বারবার প্রস্রাব করতে হয়। অনেকের রাতে ভালো ঘুম হয় না। এ থেকেও হতাশা জন্মে।

এ দেশে স্থূলতা বিষয়ে পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তবে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থূলতায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, স্থূলতার জন্য কাজ করতে না পারা মানুষ শুধু খায় আর ঘুমায়। এতে তাদের খাওয়া বেড়ে যায়। একসময় তারা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

মোটা মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দিন জানান, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে।

মোহিত কামাল বলেন, প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে একজন বিষণ্নতায় ভোগে। বিষণ্নতার কারণে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে ৩০ শতাংশ। আবার ডায়াবেটিসের সঙ্গে বিষণ্নতা যুক্ত হলে চিকিৎসা-খরচ বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ।

এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্লিনিক ও হাসপাতালে কাউন্সেলিংয়ের আয়োজন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য শেয়ার বাজার Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market