লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে


[প্রবাস প্রতিবেদন] তারেক রহমানের বিলেতের দিনকাল

  

ইসহাক কাজল লন্ডন থেকে

তারেক রহমান তথা তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনে বসবাস করছেন। তাকে নিয়ে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাধারণ জনসমাজে কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি তো বটেই, বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৫ বছর আগে বিলেতে এসে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার যে খরচ তার যোগান কোথা থেকে আসছে তাও এক রহস্য কমিউনিটির কাছে। বিশেষ করে তার রাজকীয় চলাফেরার খবর অনেকের কাছেই রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন যেখানে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি করে দিন যাপন করেছেন, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবী প্রচণ্ড অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে, সেখানে তারেক রহমান বিনা আয়ে এমন রাজকীয়ভাবে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে চলেন কীভাবে?
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথমে লন্ডনে আসেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে বাসা থেকে বের না হলেও মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন শপিং মলসহ বিনোদন কেন্দ্রে দেখেছেন অনেকে। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে ওয়েলিংটন হসপিটালে কিংবা তার প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও অনেকের নজরে এসেছেন এই রহস্যময় রাজনীতিক নেতা। ক্ষমতা হারানোর পর নির্যাতনে তারেকের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৯ নম্বর হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কঠিন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ের বিয়েতে তারেক রহমান জনপ্রকাশ্যে এলে তাকে ছড়ি হাতে দেখে ডাক্তারদের সেই কথাই মনে হয়েছে অনেকের।

লন্ডনে শুরুর সময়
২০০৮ সালে লন্ডনে আসার পর পর তারেক রহমান ছিলেন তৎকালীন যুক্তরাজ্য বিএনপির একচ্ছত্র নেতা কমর উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। সেই সময় তারেক রহমান কমর উদ্দিনের এনফিল্ড টাউন ও সাউথ গেইট এই দুই এলাকার মাঝামাঝি এলাকায় এক বাসায় থাকতেন। কমর উদ্দিন লন্ডনে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কমর উদ্দিনের প্রায় বারোটির মতো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে। তারেক রহমান যে বাসায় ওঠেন কমর উদ্দিন সেই বাড়ি ক্রয় করেন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিলাসবহুল এই বাড়ির মাসিক মর্টগেজ দিতে হতো ৩৩৫ পাউন্ড যা ক্রেডিট ক্রাঞ্চে কমে গিয়ে ২২০ পাউন্ডে নেমে আসে। তারেক রহমানকে এই মর্টগেজের টাকাও দিতে হয় না। উপরন্ত লন্ডনে তারেকের বাড়ির খরচও চালাতেন কমর উদ্দিন। লন্ডনে আসার পর কমর উদ্দিনের নিজের ব্যবহারকৃত জাগুয়ার গাড়িটি তারেককে দিয়ে দেন। মাসিক ৮০০ পাউন্ড বেতনে ড্রাইভার শরীফুল ইসলাম চাকরি পান। পরে তারেক নিজেও দুইটি গাড়ি কিনেন, ক্যাব্রিজ হিথ রোডের রূড থেকে। একটি হলো বিএম ডাব্লিউ সেভেন সিরিজ আরেকটি হচ্ছে অডি। এসময় তারেক রহমান প্রধানত বাসাতেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মেয়ে জাইমাকে স্কুল থেকে আনতে ড্রাইভারের সঙ্গে বের হতেন।
পাশাপাশি মাঝে মাঝে তার পরিবার নিয়ে বাসার গ্রোসারি কেনাকাটা করতেন পন্ডার্স এন্ডের টেসকো থেকে। কমর উদ্দিনের রেস্টুরেন্টের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও তার কেনাকাটায় সাহায্য করতেন। প্রায় দিনই রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্রেরণ করা হতো। এছাড়াও প্রতিমাসে লেক সাইডের ব্লু ওয়াটার এবং সেন্ট্রাল লন্ডনের সেলফ্রিজেসে শপিং করতেন বলে জানা গেছে। যেতেন সেলফ্রিজেস এর হোম এক্সেসরিজেও। সেলফ্রিজ ও ব্লু ওয়াটার হচ্ছে ইউকের সবচাইতে বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল শপিং মল। মিলিয়নিয়াররাই মূলত সেখানে কেনাকাটা করে থাকেন। তারেক প্রায়ই পুরো পরিবার নিয়ে উডগ্রীন সিনে ওয়ার্ল্ডে সিনেমা দেখতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আপ্টন পার্কের বলিনেও সিনেমা দেখতে আসতেন বলে জানা গেছে।

বর্তমান জীবন
কমর উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তারেক রহমান থাকেন সারের কিংসটনে। এ এলাকার লোকাল অথরিটির তথ্য অনুযায়ী ৩-৪ বেডরুমের এক বাসার মাসিক ভাড়া ১২শ’ থেকে শুরু করে ৫ হাজার পাউন্ড। সি ব্যান্ডের বাসার জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স ১৪৭৪ পাউন্ড ৬৭ পেন্স। বিদ্যুৎ গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল ন্যূনতম ১৫০ পাউন্ড। তার পরিবারের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ন্যূনতম ১শ’ পাউন্ড। এছাড়া লন্ড্রি, পোশাক-আশাক, পত্রপত্রিকা এবং মোবাইল ও টেলিফোনসহ আরও প্রায় ৭-৮শ’ পাউন্ড খরচ হয়ই। সব মিলিয়ে ৪ হাজার পাউন্ডের নিচে তার মতো লাইফ স্টাইল চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিশেষত এই এলাকায় আরও রাঘব বোয়ালরা থাকেন। এই এলাকাতেই থেকে গেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এখনো পাকিস্তানের সাবেক সেনা শাসক পারভেজ মোশাররফ বসবাস করছেন কিংসটনে।
এরই মধ্যে একবার তিনি ২০০৮-এ লন্ডনে এসে বার এট ল ডিগ্রি (ব্যারিস্টার) সম্পাদন করবেন বলে মনস্থির করেন। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেনি। তারেক যেহেতু বাংলাদেশের গ্রাজুয়েট তাই লন্ডনে তাকে প্রথমে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এক্সেশন পাননি। সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভারসিটি ও কুইন মেরী তারেককে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পরে তিনি জিডিএল করে শর্ট-কাটে বার এট ল করতে চেয়েও পারেননি।

নেই কোনো আয়ের উৎস
গত প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন থাকলেও তারেক রহমান কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেমন কোনো কাজে নিয়োজিত হতেও পারেন না। তাকে বাইরে দেখাও যায় না খুব একটা। স্ত্রী জুবাইদা গুলশান আরাও তেমন কোনো কাজ করেন না। উপরন্তু এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্রিটেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারেক রহমান। এর সুবাদে ব্রিটেনে অবাধে চলাচলের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো সরকারি অর্থায়ন বা বেনিফিট পাবেন না তারেক। দেশেও তার এবং তার মা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা আছে। তারেকের ইনকামের একমাত্র স্বীকৃত উৎস হিসেবে ধরা যায় তার মা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংসদের বেতন। তবে তা দিয়ে লন্ডনে এই বিলাসী জীবনের একাংশও বহন করা সম্ভব কি না সন্দেহ।

মাথার উপর মামলার বোঝা 
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ তারেক রহমানের ওপর ঝুলছে ১৪টি মামলার খড়গ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন চলে আসার পর তা বাতিল করে বর্তমান সরকার। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পলাতক বিবেচনায় একাধিক মামলায় তারেক রহমানের জামিন বাতিল করে আদালত। এছাড়াও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৫টি মামলা ঝুলছে সেগুলোর মধ্যে ২৩টি মামলাই তত্ত্বাবধায়ক আমলে দায়ের করা।

যুক্তরাজ্য নেতৃবৃন্দ যা বলেন
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির নেতৃবৃন্দের মতামত জানতে চাইলে তারা অনেক কথা বলেছেন।
 
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে আশ্রয় পেয়ে ছিলেন। লন্ডনে জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাকে একটি হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। দারুণ অর্থকষ্টে একেবারে নিঃস্ব কপর্দকহীন অবস্থায় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবীর কথা তো কারো অজানা নয়। ইদি আমিনকে সৌদি আরবে ঝাড়–দারের চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছিল আর রেজা শাহ পাহলেবীর অবস্থাও খুবই করুণ ছিল। তারেক রহমান হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ
  নিজের করে নেয়া অনৈতিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিকল্প ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। সেই অর্থ দিয়েই তারেক রহমান লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থ পাচারের ঘটনাটি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। রাজনৈতিক পাওয়ার বা শক্তি বিক্রি করেই তারেক রহমান এই অঢেল অবৈধ অর্থ ও বিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে যেমন একদিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণের আদালতেও একদিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই দিন বেশি দূরে নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে তারেক রহমানের বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেনাবেচার রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। স্বগর্বে তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি চর্চা কঠিন করে ছাড়বেন। সে ধারা অক্ষুণ
œ রেখে তারেক রহমান একই পথ অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ সম্পদ লুটপাট করে সাহসী তারুণ্যের অহঙ্কারকে কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার সূচনা করেন। হাওয়া ভবনকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র করে তারেক-কোকো-মামুন এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। লুটের সেই অর্থেই তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি। তাই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। লন্ডনে দীর্ঘদিন কী অবস্থায়, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় তিনি আছেন তা জনগণের জানার অধিকার পর্যায়ে পড়ে। এখানে অবস্থানের ব্যয়ভার কীভাবে তিনি নির্বাহ করেন সে সত্যও প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব দুর্নীতি মামলা তার ওপর হয়েছে, সৎ সাহস থাকলে বাংলাদেশে গিয়ে সেগুলোর মোকাবেলা করা উচিত। সন্ত্রাসী চক্র আর দুর্নীতিবাজরা মিডিয়া থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তারেক রহমান
  মিডিয়াকে ভয় করেন কেন? লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে একজন রাজনীতিক হিসেবে সে সত্য তার প্রকাশ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এমএ মালিক বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন সংগঠক ও কর্মী হিসেবে এ সত্য আমার অজানা নয় যে তারেক রহমান নিজের সকল ব্যয়ভার নিজেই বহন করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। তার পিতা জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তাই তাকে কারও দয়া দাক্ষিণ্যের উপর ভরসা করে লন্ডনে বসবাস করতে হবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া মনিরুল আলম এ ব্যাপারে কোনো প্রকার রাখঢাক না করে বলেন, তারেক রহমানের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তার খাওয়াপরার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না। সিলেটি ভাষায় তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পোয়া। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন নিজের শক্তি ও সামর্থ্য।ে আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে অনেকেই আছেন যারা আমাদের রেস্টুরেন্টে ভাত খেয়ে, থেকে লালিতপালিত হয়েছেন। অনেকের হাত খরচের অর্থ আমরা যুগিয়েছি। তারা এখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে আছেন বলে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রও নেই। দেখেও না দেখার ভান করেন। আর তারেক জিয়া আমাদের নেতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগামী দিনের বীর সেনানী তিনি যদি অর্থকষ্টে থাকেন তাহলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা প্রাণ উজাড় করে শর্তহীনভাবে তাকে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে জাতির কাণ্ডারি হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করুন সে প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেছেন, কিছু কিছু বিষয়ে রাজনীতি না এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য তারেক রহমান লন্ডন এসেছিলেন। এখনো তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শেই লন্ডনে তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে সে ব্যাপারে উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা গুঁড়ে বালি। বিষয়টি তদন্ত করা তো দূরের কথা বর্তমান সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর একটি মামলা দায়ের করে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে।

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7532

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ


বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ

ডঃ কাজী নাসির উদ্দীন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে মার্কিন সমাজের আচার ব্যবহারের অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে লক্ষ্যগোচর হচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে মা দিবস আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মার্কিনী প্রথায় ছেলেবন্ধু (বয়ফ্রেন্ড) ও মেয়েবন্ধু (গার্লফ্রেন্ড) গড়ে উঠছে এই রকম বন্ধুত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না অচিরেই হয়তো শুনতে পাবো যে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যুবক-যুবতীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে ।

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গেছে এবং তরুণ-তরুণীরা বন্ধুত্বের দাবীতে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আর একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে অপরিসীম আনন্দ উপভোগ করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেও এই মার্কিনী অনুকরণের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকাদের গানের সঙ্গে নাচ যোগ করে দিতে হয় অর্থাৎ নেচে নেচে গান না গাইলে সে গান জনপ্রিয় হয় না বসে বসে গান গাওয়াটাতো এখন অতীতের ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে আমাদের দেশের সংগীত শিল্পীরা চিরকাল গলা আর হৃদয়াবেগের মিশ্রণে মনের আকুলতা প্রকাশ করে এসেছে দেহকে সেখানে টেনে আনার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় নি অবশ্য আমি এ ব্যাপারে সচেতন, যে কোন সংগীত চর্চায় গলা ও হৃদয়ের সঙ্গে দৈহিক অঙ্গভঙ্গী ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, যেমন বাউল গান ও লালন গীতি কিনতু নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক গান যদি নেচে নেচে গাইতে হয়, তবে কেমন হয় ? পাঠকরাই বিবেচনা করুন এছাড়া দেশের তরুণীরা এখন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর ওড়না ছেড়ে দিয়ে বেপরোয়াভাবে শার্ট আর জিন্স-এর প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

বলা বাহুল্য যে সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো তা হুবহু মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ মাত্র এক কথায় বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও সংস্কৃতি কেন এমন হলো ? পাশ্চাত্যে আরো অনেক দেশতো রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঐ সমস্ত দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র মার্কিনী সংস্কৃতি গ্রাস করে নিয়েছে বাংলাদেশকে আরো আশ্চর্য্যরে বিষয় এই যে পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিতে পারেনি উপরন্তু পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশে আমি মার্কিনী সংস্কৃতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা লক্ষ্য করেছি জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে স্পেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম স্পেন, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা আমেরিকানদের রাখাল বালক (Cow Boy)হিসেবে অভিহিত করে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে বলা হয়ে থাকে আমেরিকানরা অসভ্য আর অসংস্কৃত সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে আমেরিকার সংস্কৃতি এতো প্রিয় হয়ে গেল কেন যে, এ বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

কোন একটি দুর্বল দেশকে যদি কোন একটি সবল দেশ চিরদিনের জন্যে অধীনস্থ করে রাখতে চায় তাহলে দুর্বল দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপনিবেশকে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য এই ধ্বংস যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছিলো নিজেদেরকে কিšতু জাগ্রত প্রহরীর মতো সে সমস্ত উপনিবেশের বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির অপলাপ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলো আর তারই ফলশ্রুতিতে সেই সমস্ত দেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান আজও ঘটেনি নতুন মুখোশ পরে সাহায্য সহযোগিতার অজুহাতে আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা দুর্বল দেশগুলোর উপর নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছে সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে একটি দেশকে দখল করা যায় সাময়িকভাবে কিনতু সে দেশটিকে জয় করা যায় না যতদিন পর্যন্ত না সে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, গর্ব আর অহংকারকে চূর্ণ করা যায় ততদিন পর্যন্ত সে দেশের মানুষকে বশীভূত করা যায় না একটি জাতির গৌরব, গর্ব আর অহংকারকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম ধ্বংস করতে হবে সে জাতির সংস্কৃতিকে মহা ধ্বংসযজ্ঞে বর্তমানে আত্মনিয়োগ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কেন ? যেহেতু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার আত্মমর্যাদা দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে বাংলাদেশ সকল গৌরবকে দিয়েছে জলাঞ্জলি সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশকে জয় করার এই হচ্ছে মোক্ষম সময় এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলদেশকে রুখে দাঁড়াতে হবে যেমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিভিন্ন জাতি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

সংস্কৃতি চেতনা যাদের খুব প্রখর তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই রকম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতিকে অধীনস্থ করা কঠিন আমার নিজের দেশবাসীরাই যদি অতি আগ্রহের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীর অপসংস্কৃতির অনুকরণে উৎসাহী হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীকে দোষ দিয়ে লাভ কি ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যটাতো দেশবাসীর সহায়তায় সহজেই হাসিল হয়ে যায় কিনতু কেন যে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই মার্কিনী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে রুখে না দাঁড়িয়ে বরং স্বাগত জানালো সে বিষয়টা এবার একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রে বিপরীত আকর্ষণ (Opposite attracts) করে বলে একটা তত্ত্ব আছে এর সারমর্ম এই যে তরুণ-তরুণীরা তার সম্পূর্ণ বিপরীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বাংলাদেশ আমেরিকার সম্পূর্ণ বিপরীত ক্রান্তিতে অবস্থান করছে অর্থাৎ আমেরিকায় যখন দিন বাংলাদেশে তখন রাত আমেরিকা পৃথিবীর একটি মহাপরাক্রমশালী দেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্বল দেশ আমেরিকা পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশ সমূহের তালিকাভুক্ত আর বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বিপরীত বটে, আর সে কারণেই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী খুবই স্বাভাবিক কিনতু এই স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাটাকে দুর্বল পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে তত্ত্ব প্রকাশ পায় তার নাম হলো হীনমন্যতা বোধ ইংরেজীতে যাকে বলে Inferiority complex এই হীনমন্যতা বোধের শিকারে পরিণত হয়ে যারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মহান সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা শুধু নিজেদেরকেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে না, তারা সমগ্র জাতিকে দেউলিয়া করে দেশের স্বাধীনতাকে করে বিপন্ন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের জন্মলাভের জন্য ওরা নিজেরাও যথার্থভাবে দায়ী নয় আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে দায়ী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের দেশের দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থান্বেষী কর্ণধাররা তাদের নিজেদের আখের গোছানোর কাজে এবং বিদেশী প্রভুদের পদলেহনে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে দেশাত্মবোধের কোন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হননি ।

বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অনেকে আবার মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণের স্বপক্ষে তাদের মনের মধ্যে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তারা বলেন, বিদেশী সংস্কৃতিতে যদি কোন ভালো জিনিস থাকে তবে তাকে গ্রহণ করতে দোষ কি ? এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই একটি দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতিকে বুঝায় আমাদের সংস্কৃতির যে বিষয়টি আমরা সবচেয়ে ভালো মনে করি আমেরিকানরাতো সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে না তাহলে ওদের ভালো জিনিসটা আমাদের গ্রহণ করতে হবে কেন ? তাছাড়া আপাততঃ যাকে ভালো মনে হয় সংস্কৃতির অঙ্গনে তার উৎপত্তি ও বিকাশের কারণটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মার্কিন মুল্লুকে মা দিবস ও বাবা দিবসের উদ্ভবের কারণ বিশ্লেষণ করা যাক আমেরিকায় সন্তান-সন্ততিরা তাদের ষোল (১৬) বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গৃহ ত্যাগ করে তারপর কালে ভদ্রে কখনো সখনো মা-বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয় সেই দেখা সাক্ষাতের জন্যে আবার আগে থেকেই দিনক্ষণ নির্ধারণ (appointment) করে নিতে হয় তাছাড়া আমেরিকার ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাস করে না এই সমস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদেরকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্যে বৎসরে একবার মা-বাবার খোঁজ খবর নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে সুতরাং আপাততঃ এটাকে একটা ভালো জিনিস মনে হলেও এর মূলে ভালো কিছুই নেই আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিটি দিনই মা-বাবার দিন প্রতিটি মূহুর্তে আমরা মা-বাবার সেবা করতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি এমন কি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় নিজেদের ঘর সংসার নিয়ে যখন আমরা আলাদাভাবে বসবাস করি তখনও মা-বাবা বেঁচে থাকলে আমরা যখন তখন মা-বাবার কাছে ছুটে যাই মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের কোন অনুমতি নিতে হয় না আমাদেরকে একবার মায়ের বাড়ি আর একবার বাপের বাড়ি দৌড়াতে হয় না আমরা মা-বাবাকে এক সঙ্গে পাই সব সময় সুতরাং ঘটা করে আমেরিকার মতো বৎসরে একবার মা আর একবার বাবার সেবা করাটা বাংলাদেশের সভ্যতা ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে কতো অবাস্তব তা সহজেই বোধগম্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশে বসবাস করি এখন আর ৩০ বছর যাবত আমি আমেরিকায় বসবাস করছি আমেরিকায় আসার পর এদেশের সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি যে কতো উন্নত, পরিশীলিত আর আমরা যে কি এক মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী তা আমার চোখে পড়ে দেশ থেকে বের না হলে দেশকে চেনা যায় না এটা শুধু আমার একার অভিমত নয় আমার মতো অনেকেই যারা কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেছেন তারা সবাই মার্কিনী সংস্কৃতির অন্তঃসারশূন্যতা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন আর তাদের নিজের বাংলাদেশে এই অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন অতি সম্প্রতি হলিউড থেকে প্রকাশিত ”একুশ” পত্রিকায় চাঁদ সুলতানা মাহবুব কামরুন-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ”ঘুরে এলাম কিছু সময় বা ঝটিকা সফর”-এ সেই দুঃখ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ”একটা ব্যাপার খুব চোখে লাগলো, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফ্রীডমে বিদেশকেও হার মানিয়েছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মোহনা ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে” অন্যত্র ”নব্য সভ্যতার যুগে পুরাতন কালচার সব হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে ছেলেমেয়েরা সুরে বেসুরে ওদের ইচ্ছামতো গান গাচ্ছিলো আমি তখন একমনে খুঁজছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরানো অতীতকে” বড়ই দুঃখের বিষয় সেই অতীত দ্রুত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই বোধ হয় প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অত প্রাণান্তকর প্রয়াস অথচ আমাদের প্রিয় দেশবাসী তরুণ-তরুণীরা নির্বিচারে বিদেশী অপসংস্কৃতিতে অবগাহন করে পরম পুলক অনুভব করছে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে ? কবে কিভাবে আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের অবসান ঘটবে ? কবে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কুঁড়ে ঘরে থেকেও শিল্পের বড়াই করতে শিখবে, কবে ওরা বুক ফুলিয়ে বলবে, ”নিক হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা” ? সে কথাই আজ ভাবছি।

একুশ পত্রিকা,

লস এঞ্জেলেস, জুলাই ৪ ২০০৭ ইস্যুঃ উপ-সম্পাদকীয়ঃ

কোন পথে আরব বিশ্ব


কোন পথে আরব বিশ্ব
তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
আরব বিশ্বের রাজনীতি এখন কোন পথে? গেল বছরের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলির দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে তাতে গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুই শেষ কথা নয়। বরং পরিবর্তন আসছে সিরিয়ায়, সেখানে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দিন যত যাচ্ছে, দেশটিতে গণঅসন্তোষ তত বাড়ছে। গত প্রায় আট মাস ধরে সেখানে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট আসাদকে কিছুটা নমনীয় মনে হয়। গত ২ নভেম্বর কায়রোতে আরব লিগের প্রস্তাবনায় সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তির ভবিষ্যত্ ইতোমধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেননা চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ব্যবহার করেছে এবং একটি ঘটনায় ২৪ জন মানুষ হোমসে শহরে মারা গেছে। চলতি সপ্তাহে কায়রোতে সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আলাপ শুরু হওয়ার কথা। এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেক কিছুই এখন নির্ভর করছে। বলা ভালো, আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ ১৯৭১ সাল থেকেই সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। বাথ পার্টির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। ২০০০ সালে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান বাশার আল আসাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তনের ঢেউ গিয়ে লেগেছে বাহরাইনেও। সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শাসক হামাদ বিন ঈসা আল খলিফার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। গত ৪ নভেম্বর রাজধানী মানামায় বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন। পুলিশের গুলিতে একজন বিক্ষোভকারী মারাও গেছেন। তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে বাহরাইন পর্যন্ত সর্বত্রই সরকার পতনের আন্দোলন হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারের পরিবর্তন হয়েছে এবং একটি গণতান্ত্রিক ধারাও সেখানে শুরু হয়েছে। তিউনিসিয়ায় সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং একটি ইসলামিক শক্তি সেখানে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এন্নাহদার বিজয় আরব বিশ্বে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। লিবিয়ায় গণ-আন্দোলনের মুখে গাদ্দাফির পতন হয়নি। একটি গৃহযুদ্ধে এবং বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপে গাদ্দাফির সরকারের পতনই শুধু হয়নি, গাদ্দাফি নিজে নিহতও হয়েছেন। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়াতে কোন ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী আট মাসের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন আছে অনেক। যদি লিবিয়াতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তা হলে আরেকজন স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। মুস্তাফা আবদেল জলিলের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সেখানে যুদ্ধ পরিচালক করেছে এবং গাদ্দাফি-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে থাকবে। অতীতে আবদেল জলিল গাদ্দাফির বিচারমন্ত্রী ছিলেন। পক্ষ ত্যাগ করে তিনি বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেন। কিন্তু জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে সেখানেই বসবাস করেন। সম্ভবত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। জলিলের চেয়ে জিবরিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের খুব কাছের ব্যক্তি হবেন। যুদ্ধের কারণে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে চলে গেছে। গাদ্দাফি নিজেও অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন। ন্যাটোর বিমান থেকেও বিদ্রোহীদের জন্য অস্ত্র ফেলা হয়েছিল। এসব অস্ত্রের হদিস পাওয়া খুব কঠিন হবে। বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ওইসব অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে। এই অস্ত্র আল কায়দার কাছে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ফলে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় অস্ত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, যা গণতন্ত্রের উত্তরণে কোনো সাহায্য করবে না। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় ইসলামী জঙ্গিরা অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বেশ কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপের খবর পাওয়া যায়, যারা গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে; যেমন, বলা যেতে পারে Islamic Fighting Group (IFG), Abu Ubaidah-bin Januah Brigade, Abdel Hakim Belhadj Group, Tripoli Military Council কিংবা Salafi Group-এর কথা। এদের কারও কারও সঙ্গে আল কায়দার যোগাযোগ রয়েছে বলেও ধরে নেওয়া হয়। এক সময় IFG-কে পশ্চিমা শক্তি সমর্থন করেছিল। ১৯৯৬ সালে গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলনে IFG-কে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী দাঁড়ায় সেটা দেখার বিষয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যা দরকার, তা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনা, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা-যা লিবিয়াতে নেই। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। এখন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সদস্যরা একাধিক দলের জন্ম দিতে পারেন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারেন। লিবিয়ায় বেকার সমস্যা প্রকট। জনগোষ্ঠীর ৩০ ভাগ বেকার। লিবিয়ায় বিশাল তেলের রিজার্ভ থাকলেও তেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। লিবিয়ার জনগোষ্ঠীর ৪০ ভাগ হচ্ছে তরুণ। এদেরকে মূল ধারায় নিয়ে আসা, চাকরির ব্যবস্থা করা হবে কঠিন কাজ। না হলে এখানে চিরস্থায়ী একটি অস্থিতিশীলতা থাকবেই। লিবিয়া গোত্রকেন্দ্রিকভাবে বিভক্ত। গোত্রের লোকজন একত্রিত হয়ে মরুভূমি তথা পাহাড়ের নিচে বসবাস করেন। এরা আধুনিকমনস্ক নন। গাদ্দাফি যে গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা গাদ্দাফির মৃত্যুকে সহজভাবে নেবেন না। ফলে একধরনের বিরোধিতা থেকেই যাবে। উপরন্তু দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিরোধের জন্ম হয়েছে। তেল কূপগুলো পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চল থেকে। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়বে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর আগ্রহ মূলত লিবিয়ার তেল ও গ্যাসের কারণে। বিশ্বের রিজার্ভের ৩৫ ভাগ তেল রয়েছে লিবিয়ায়, যার পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ব্যারেল। গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে ১ হাজার ৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন তেল উত্তোলিত হতো এক দশমিক তিন মিলিয়ন ব্যারেল থেকে এক দশমিক ছয় মিলিয়ন ব্যারেল। ভূমধ্যসাগরের নিচ দিয়ে পাইপের সাহায্যে এই গ্যাস যায় ইতালিতে (ত্বেবহংঃত্বধস চরঢ়বষরহব)। লিবিয়ার অভ্যন্তরে মাত্র এক ডলারে তেল পাওয়া যেত। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের মূল্য ৮০ ডলার। সুতরাং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থটা কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। লিবিয়ার পুনর্গঠনের নামে তখন লিবিয়াতে ব্যবসা খুঁজবে মার্কিনি কোম্পানিগুলো। আর লিবীয় সরকারকে তেল বিক্রি করে (অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করে) পুনর্গঠনের বিল পরিশোধ করতে হবে। ঠিক যেমনটি হয়েছে ইরাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিতে লিবিয়ার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেন্টাগন যে দীর্ঘ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তাতে লিবিয়া একটি ফ্যাক্টর। লিবিয়ার প্রশাসনকে যদি হাতে রাখা যায়, তা হলে উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলে পার্শ্ববর্তী শাদ ও নাইজারও নিয়ন্ত্রণে আসবে। শাদ ও নাইজারে রয়েছে তেল ও ইউরেনিয়াম, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। একুশ শতকে যে নতুন আফ্রিকার জন্ম হতে যাচ্ছে, সেখানে ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের। কঙ্গো, রুয়ান্ডা, আইভরি কোস্ট ছিল একসময় ফ্রান্সের কলোনি। ফরাসি ভাষা এখানে সরকারি ভাষা। এ অঞ্চলে তখন বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। ইতোমধ্যেই আফ্রিকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন একটি মিলিটারি কমান্ড অঋজওঈঙগ। এ জন্য লিবিয়ায় ‘বন্ধুপ্রতিম’ সরকারের খুব প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফির মত্যু এই হিসাবটা সহজ করে দিল। লিবিয়ার ঘটনাবলি দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের সরকারকে উত্খাত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র রাখে। তবে অবশ্যই সেই সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের হতে হবে। অতীতে গাদ্দাফিকে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ইরাকে সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযানের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র গাদ্দাফিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় গাদ্দাফিকে চলে যেতে হল। এভাবে একটি স্বাধীন দেশে ন্যাটোর বিমানবহর দিয়ে হামলা কোনো আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদন করে না। এটা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ। নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় তথাকথিত ‘গণহত্যা’(?) ঠেকাতে ন্যাটোর বিমান হামলার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের কোনো অনুমতি দেয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদে এ কথাগুলো আর কেউ বলবে না। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আফ্রিকায় সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তন হল।

প্রশ্ন হচ্ছে, সমগ্র আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তন কি সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে? তিউনিসিয়ায় এন্নাহদা পার্টির উত্থান সেখানে একটি ‘তুরস্ক মডেলের’ জন্ম দিতে যাচ্ছে। তুরস্কে ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। তুরস্কে ইসলামপন্থীরা কট্টরপন্থী নন। এরা আল কায়দাকে সমর্থনও করে না। বরং আল কায়দার রাজনীতিকে সমালোচনা করে। আধুনিকমনস্ক তুরস্কের নেতৃত্ব ইসলামিক বিশ্বে নতুন এক ইমেজ নিয়ে এসেছে। এন্নাহদার নেতা ঘান্নুচি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের রাজনীতির অনুসারী। এ কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। একসময় মিসরের ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ঘান্নুচি। এখন সেখান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। ‘তুরস্ক মডেল’ এখন তার কাছে আদর্শ। আগামী ২৮ নভেম্বর মিসরে সংসদ নির্বাচন। সেখানে ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোন পর্যায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার বিষয়। সামরিক জান্তা প্রধান ফিল্ড মার্শাল তানতাবি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। দেশটিতে অশান্ত পরিস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। এখানে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা পরিচালনা করা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। ইয়েমেনের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখেননি। তুলনামূলক বিচারে আল কায়দা অনেক শক্তিশালী ইয়েমেনে। এখানে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিজয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তরুণ সমাজ সেখানে সালেহবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তাদের কোনো সংগঠন নেই। তবে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে একটা ভয় থেকেই গেল। সিরিয়াতেও এদের তত্পরতা রয়েছে।
স্পষ্টতই আরব বিশ্বে ইসলামিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। ১৯৫২ সালে মিসরে জামাল আবদুন নাসেরের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম হয়েছিল, যা ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিটি আরব রাষ্ট্রে। এখন তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রমনা একটি ইসলামিক শক্তির উত্থান সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে যায় কি না সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tareque.rahman(a)aol.com

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি। শুধু রাষ্ট্রদূত পদে নয়, ফার্স্ট সেক্রেটারি থেকে শুরু করে সহকারী সচিবের মতো মধ্যম ও নিম্নস্তরের কূটনীতিক পদে চলছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। এ পর্যন্ত ১২ জনকে রাষ্ট্রদূত এবং ১১ জন দলীয় ক্যাডার, ক্যাডারদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে মধ্যম এবং নিম্নস্তরের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন যারা অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত। অনেকে ছিলেন গৃহিণী। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো যোগ্যতাই নেই এসব দলীয় ক্যাডারের। এ নিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা এবং ক্ষোভ। দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ভারত এবং জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনসহ মোট ১২টি মিশনে দলীয় লোকদের চুক্তিভিত্তিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এখন নিচের পদে চলছে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ওয়াহিদুর রহমান টিপুকে ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক এক আওয়ামী লীগ এমপির ছেলে শাহেদুর রহমানকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনসুলেটে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েত-মৈত্রী হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অপর্ণা পালকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (কনসুলার) পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অপর্ণা পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন এবং তিনি অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত।
অপর্ণা পাল এখন কানাডায় পোস্টিং নেয়ার চেষ্টা করছেন।

ছাত্রজীবনে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম ওয়াইসুজ্জামানের স্ত্রী মৌসুমী ওয়াইসকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (বাজেট) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাসুম আহমেদকে নেদারল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এপিএস ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম রুহুল আমীনের স্ত্রী আনিসা আমীনকে প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।

ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী এবং ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নার স্ত্রী ইরিন পারভীন বাঁধনকে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক ফারুক আমীনের স্ত্রী রওনক আমীনকে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী। বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর এপিএস (২) সাইফুজ্জামান শেখরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীমা পারভীনকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম শিকদার মোহাম্মদ জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চৌধুরী সুলতানা পারভীনকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনসুলেটে কনসল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী।

এছাড়া বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুরস্কার হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সাবেক কূটনীতিক তারিক এ করিমকে ভারতে, সাবেক কূটনীতিক আকরামুল কাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম সাইদুর রহমান খানকে ব্রিটেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রীর ভাই ড. আবদুল মোমেনকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় অযোগ্য ও বিতর্কিত ড. নিমচন্দ্র ভৌমিককে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে চীনে সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ, ওমানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নূরুল আলম, রাশিয়ায় ড. এসএম সাইফুল হক, পাকিস্তানে মো. সোহরাব হোসেন, ইরাকে মুহাম্মদ কামালউদ্দিন, লিবিয়ায় মুহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং শেখ কামালের বন্ধু ও আবাহনী ক্লাবের সাবেক পরিচালক শাহেদ রেজাকে দলীয় লোক হিসেবে কুয়েতে রাষ্ট্রদূত পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ক্ষমতায় আসতে নানাভাবে সহায়তা করার পুরস্কার হিসেবে এদের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া ১/১১’র অন্যতম প্রধান হোতা লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাইকমিশনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় বহাল তবিয়তে রেখেছে বর্তমান সরকার।

দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, অতীতে কখনও এভাবে অযোগ্য দলীয় ক্যাডার এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে যে দলীয়করণ শুরু হয়েছে তাতে অকার্যকর হতে চলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে মেধাবীরা আর কূটনীতিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইবে না। এছাড়া দলীয়করণের ফলে কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এদিকে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান ।

দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখাটা অনেক বেশি জরুরি।


ডিপ্লোম্যাটিক নাকি ডিপসোম্যানিক?

আবু ইশমাম
যাদের স্থান পাওয়ার কথা
Deep-low-mat-এ বা গভীর নিচুতে পাতা মাদুরে, দেশের পররাষ্ট্রনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছে তারা বড়ই আদুরে! উল্টো তাদের স্থান দেয়া হয়েছে মর্যাদার উঁচু আসনে, Diplomat হিসেবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের হিসাবে বড়ই ভুল ছিল। জানি না এ ভুলের জন্য তারা এখন অনুশোচনায় চুল ছিঁড়তে চাইবে কি না! জাপান, ওমান ও নেপালে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূতেরা তাদের অশিষ্টতা বা মদ-নারীতে আসক্তিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমেDiplomat ভাবমর্যাদার বদলে বিদেশে তাদের পরিচিতি হয়েছে Diplomatic বা মাদকাসক্ত উন্মাদরূপে! নেপালে সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন সাহসী তরুণ মুসা ও মুহিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টে আরোহণ করে সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উঁচু করেছিলেন। Dipsomanic Diplomat-রা তা আবার নামিয়ে আনলেনDeep-low-mat-এ। পেশাগত দক্ষতার বদলে দলীয় আনুগত্যই একমাত্র যোগ্যতা বিবেচিত হওয়ায় কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদার এই ভূমিধস পতন বলে অনেকে মনে করছেন। আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে বিদেশী রেমিট্যান্স থেকে (২০১০ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার); যা অব্যাহত রাখতে ও দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখাটা অনেক বেশি জরুরি।

 

গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রধানমন্ত্রীর এক সফরসঙ্গীর নারী কেলেঙ্কারিও দেশের সুনামের অবয়বে কালিমা লেপন করেছিল। কিন্তু সে ঘটনায়ও বোধ হয় সংশ্লিষ্টরা কূটনৈতিক নিয়োগে যথেষ্ট সতর্ক হননি। তাই চাণক্যের উত্তরসূরি ভেবেই হয়তো ড. নিমচন্দ্র ভৌমিককে নেপালে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই উত্তরসূরি যে আসলে উত্তর-শুঁড়ি, তা কে জানত? চন্দ্রেরও কলঙ্ক থাকে, তাই নিমচন্দ্রেরই বা থাকবে না কেন? নিম তো একটু তেতো বটেই! মার্সিডিস বেঞ্জের বদলে বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল খারাপ কিছু নয়! কাঠমান্ডুতে বাইকে চেপে রাষ্ট্রদূত যাচ্ছেন, এটা দেখে তার কৃচ্ছ্রসাধনের প্রতি অনেকেই শ্রদ্ধাবনত হতে পারেন! কিন্তু ক্লাবে-বারে তার মদ-নারী-ফুর্তি ফুটিয়ে তুলেছে তার আসল মূর্তি! এ বিষয়ে বিগত ৩ জুন ২০১১ তারিখের নয়া দিগন্তের এক বিস্তারিত রিপোর্টে জানা যায়, ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ব্যবহারের জন্য দামি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি রয়েছে। নিমচন্দ্র ভৌমিক নজিরবিহীনভাবে দূতাবাসের হিসাবরক্ষকের মোটরসাইকেলে চড়ে ড্যান্সবারে যান। মদ ও নারী নিয়ে আমোদ-ফুর্তি করেন। শুধু তা-ই নয়, কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতের একজন মহিলা কাউন্সিলরের বাসায় তিনি জোর করে ঢুকতে চাইলে কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরী বাধা দেন। এর পরও রাষ্ট্রদূত ওই কাউন্সিলরের বাসার সামনে আধা ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহিভূত আচরণের জন্য নেপালের পররাষ্ট্রসচিব নিমচন্দ্র ভৌমিককে সরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। ঢাকায় অবস্থিত নেপাল দূতাবাস এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে শিগগির একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কাঠমান্ডুতে পেশাদার কূটনীতিক নিয়োগ দেয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, নেপালে রাষ্ট্রদূত হওয়ার কী যোগ্যতা তার আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেই কি রাষ্ট্রদূত হওয়া যায়? একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের নেতৃত্বই কি তার বিশেষ যোগ্যতা? দেশে কি সচ্চরিত্র, দেশপ্রেমিক, মার্জিত-শিক্ষিত-সুসভ্য-যোগ্য পেশাদার কূটনীতিকের অভাব পড়েছে? নিমচন্দ্র কূটনৈতিক নর্ম ভঙ্গ করে যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাতে কেউ আর তাকে নমঃ জানাবে না, বরং মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে তার অবনমনই চাইবে। নেপালের সাথে ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার ও বাণিজ্য সম্পর্কের বিভিন্ন দিকগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতির আভাস পাওয়া গেছে। সার্ক সচিবালয় রয়েছে কাঠমান্ডুতেই। নেপালের সাথে ভৌগোলিক দূরত্বও মাত্র ষোলো মাইল। কিন্তু রাষ্ট্রদূতের অবিমৃশ্যকারিতায় সৃষ্টি হতে পারে বহু যোজন কূটনৈতিক দূরত্ব, যা আমাদের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনবে। আর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সম্প্রতি নেপাল কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী।http://www.newkerala.com-এর বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারির এক খবর অনুযায়ী মালয়েশিয়া বাংলাদেশী ৫৫ হাজার কর্মীর ভিসা বাতিল করে নেপালের জন্য আগের ২৫ হাজারের বদলে এক লাখ কর্মীর ভিসা ইসু করেছে। তা ছাড়া, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক বিপর্যয় আমাদের জন্য কতটা দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, সেটা আশা করছি ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। আমাদের বিপর্যস্ত পেলে, নেপালও বাগে ফেলে লুটে নিতে পারে কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক ফায়দা।

কূটনীতিক নিয়োগের পর বিদেশে পাঠানোর আগে পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া দরকার, আর এটাই স্বাভাবিক। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত অন্য কূটনীতিকেরাই তার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তারা কি নতুন রাষ্ট্রদূতকে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেননি? তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি কী কারণে? দেশের মর্যাদা এভাবে বিকিয়ে দিতে? কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকালে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সে দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা-ভব্যতার রীতিনীতিগুলো মেনে চলা অত্যাবশ্যকীয়।

 

ওমানে আমাদের রাষ্ট্রদূত Woman-প্রীতিতে জড়িয়ে না পড়লেও, তিনি যে কেন প্রথম সাক্ষাতে মন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্যের কাঁধে হাত রাখতে গেলেন, তা বোধগম্য নয়! রিপোর্টে জানা গেছে, ‘আওয়ামী লীগের তিনবারের নির্বাচিত এমপি নূরুল আলম চৌধুরীকে ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ২০১০ সালের ২২ মে। ওমানের সুলতানের কাছে পরিচয়পত্র পেশের আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাউই বিন আবদুল্লাহর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালের একপর্যায়ে নূরুল আলম চৌধুরী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাঁধে হাত তুলে দেন। এ আচরণকে কূটনৈতিক রেওয়াজের লঙ্ঘন বলে ওমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল ও আঞ্চলিক ডেস্কের প্রধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী নূরুল আলম চৌধুরী মাস্কাটে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এটিকে একটি আড্ডাস্থলে পরিণত করেছেন।’ কূটনীতিক নিয়োগের পর বিদেশে পাঠানোর আগে পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাকে কী প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়েছিল, জানা দরকার। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত অন্য কূটনীতিকেরাই বা কী করেছিলেন? তারা কি নতুন রাষ্ট্রদূতকে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেননি? তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি কী কারণে? দেশের মর্যাদা এভাবে বিকিয়ে দিতে? কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকালে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সে দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা-ভব্যতার রীতিনীতিগুলো মেনে চলা অত্যাবশ্যকীয়। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে পর্যন্ত দেখা গেছে, ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী পোশাকে সৌদি বাদশাহর সাথে দেখা করতে। বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ-এর সাবেক প্রতিনিধি ও ভারতের পেশাদার কূটনীতিক সুনিতা মুখার্জিকে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় অনেক অনুষ্ঠানে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতকালে মাথায় কাপড় দিতে। ওমানে প্রেরিত কূটনীতিক সে দেশের সংস্কৃতির প্রতি আরো সংবেদনশীল হলেই তার প্রকৃত পোশাদারিত্বের পরিচয় পাওয়া যেত। বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম শ্রমবাজার ওমানে ২.৬১ লাখের ওপরে বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন (বাংলাদেশ টুডে ২৪-৩-২০১০)। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের চেয়ে ওখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকায় তা হতে পারে আমাদের শ্রম রফতানির এক ক্রমবর্ধনশীল বাজার। শ্রমিকদের কল্যাণে এবং প্রাথমিক গমন খরচ কমাতে বেশ ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগও রয়েছে বলে জানা যায়। ২০১০ সালে যত লোক বিদেশে গেছে তার ১১ শতাংশই গ্রহণ করেছে ওমান (ডেইলি স্টার, ০৫-০৩-২০১১)। ওমানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও মুসলিম বিশ্বে আমাদের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের যৌন কেলেঙ্কারি সবচেয়ে বড় আঘাত। জাপান একক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অংশীদার। সেখানে কূটনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে আমরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি। রিপোর্টে জানা গেছে, পেশাদার কূটনীতিক এ কে এম মাজিবুর রহমান গত বছর জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। রাষ্ট্রদূতের সোস্যাল সেক্রেটারি হিসেবে একজন জাপানি মহিলা কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সেই মহিলা রাষ্ট্রদূত মাজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেছেন। এসংক্রান্ত অভিযোগ তিনি টোকিওতে অবস্থিত সব বিদেশী দূতাবাসকে ই-মেইলের মাধ্যমে অবহিত করেছেন। পদত্যাগকারী মহিলা সম্প্রতি যৌন হয়রানির অভিযোগে রাষ্ট্রদূত মাজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। সংস্কৃতিবান, উন্নত ও পরিশীলিত রুচির জাপানিরা এ ঘটনাকে কিভাবে নিয়েছে, ভাবতেই লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছি। জাপানে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশী কর্মজীবী রয়েছেন বলে জানা যায়। তারা অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি মজুরি পেয়ে থাকেন। ১৯৯১-২০০৪ সাল পর্যন্ত জাপান থেকে ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। সুনামি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জাপান কর্মক্ষেত্র হিসেবে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর, কূটনৈতিক বিপর্যয় সে স্পর্শকাতরতা আর বাড়িয়ে দিতে পারে। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক বাংলাদেশের কূষ্টিয়ার সন্তান জাস্টিস রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জাপানে যুদ্ধাপরাধবিষয়ক বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারক প্যানেলের সদস্য হিসেবে জাপানিদের পক্ষে দুঃসাহসী মত ব্যক্ত করে জাপানিদের শ্রদ্ধা অর্জন করে লাভ করেছিলেনOrder of the Sacred Treasure খেতাব। তা ছাড়া, তাকে সম্মান জানাতেYasukuni shrine ও Kyoto Ryozen Gokoku Shrine-এ তার ভাস্কর্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রদূতের কেলেঙ্কারি কী খেতাব বয়ে আনবে তা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি।

 

দলীয় বিবেচনায় কূটনীতিক নিয়োগের বিপদসঙ্কেত ব্যক্ত করে বিগত ১৮ মে ২০১১ তারিখে আমার দেশ পত্রিকা একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অসতর্কতা যে এত দ্রুত বাস্তবে দৃশ্যমান হবে তা ভাবা যায়নি। বিপদ যে সত্যি সত্যিই রিপোর্টে ব্যক্ত অনুমানের আগেই অনেকখানি ঘটে গেছে, তা কে জানত? সত্যিই এসব কূটনীতিক অনেক করিৎকর্মা, তারা প্রতিবেদকদের দূরদর্শিতার চেয়ে অনেক অগ্রসর। রিপোর্টটিতে জানা গিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি। শুধু রাষ্ট্রদূত পদে নয়, ফার্স্ট সেক্রেটারি থেকে শুরু করে সহকারী সচিবের মতো মধ্যম ও নিুস্তরের কূটনীতিক পদে চলছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। এ পর্যন্ত ১২ জনকে রাষ্ট্রদূত এবং ১১ জন দলীয় ক্যাডার, ক্যাডারদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে মধ্যম এবং নিুস্তরের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যারা অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত। অনেকে ছিলেন গৃহিণী। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো যোগ্যতাই নেই এসব দলীয় ক্যাডারের। এ নিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ। এ বিষয়ে রিপোর্টটিতে সতর্ক করা হয়েছিল, দলীয়করণের ফলে কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

যা হোক, বাংলাদেশ প্রতিদিনের ০৬-০৬-২০১১ তারিখের এক বিস্তারিত রিপোর্টে জানা যায়, টোকিওর বাংলাদেশ মিশনের সোস্যাল সেক্রেটারি মিজ কিয়োকো তাকাহাসিকে কয়েক দফা ইন্টারভিউকালে এবং নিয়োগের পর কর্মক্ষেত্রে ও বাইরে রাষ্ট্রদূত এ কে এম মাজিবুর রহমান তাকে উত্ত্যক্ত করেন, চুমু খেতে চান, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দেন। সব সময়ই মেয়েটির জবাব ছিল ‘না’। এই যৌন নির্যাতনে তাকাহাসির মুখের হাসি দূর হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রদূতের লোলুপ দৃষ্টির বাঁকা হাসি ও অপচেষ্টা বন্ধ না হওয়ায় তিনি অভিযোগ জানাতে বাধ্য হন।

ডিপ্লোম্যাটিক জগতে কূটনীতিক ও নারীর মধ্যে পার্থক্য বিষয়ে একটি মজার গল্প চালু রয়েছে, তা হচ্ছেঃ যখন একজন কূটনীতিক বলেন, হঁ্যা, তাহলে মনে করতে হবে, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, সম্ভাবনা আছে। যদি তিনি বলেন, আসলে কোনো কূটনীতিকই নন। অন্য দিকে একজন নারী যদি বলেন, ‘না’, তাহলে মনে করতে হবে, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন সম্ভাবনা আছে। আর যদি তিনি বলেন, হঁ্যা, তাহলে মনে করতে হবে তিনি সত্যিকার অর্থে কোনো নারীই নন। জাপানে আর নেপালে নিয়োজিত আমাদের রাষ্ট্রদূতেরা হয়তো এই গল্পটি জানতেন, সে কারণে তারা আকাঙ্ক্ষিত নারীদের ‘না’কে সম্ভাবনা আছে মনে করেই হয়তো সীমা লঙ্ঘন করে থাকবেন। ওমানি কূটনীতিকের অনমনীয়তা এবং ভারতীয় ও জাপানি নারীদের ‘না’ ফুটিয়ে তুলেছে তাদের আপসহীন চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্ব। আমাদের নির্লজ্জ কূটনীতিকেরা তাদের থেকে কিছু শিখতে পেরেছেন কি?

—————————————————————————————————————————————————–

রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’ একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।


রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’
বেলাল বেগ

রাজনীতি

রাজনীতি

লাগুক বা না লাগুক, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আওয়ামী লীগের উদ্দেশে একটি শব্দ গুলতি ছুড়েছেন। আওয়ামী লীগ নাকি সারা দেশটাকেই ‘ইভ টিজিং’ করছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, বেড়ে বলেছেন তো! রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোকদীপ্তিকে আরণ্যক অন্ধকার বানিয়ে নিশাচর হিংস্র পশুর মতো আচরণ করে যে রিপুতাড়িত বখাটের দল, সেটাই তো ইভ টিজিং। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুষ্কৃতকারীদের আচরণ এক ধরনের রাজনৈতিক ইভ টিজিং বটে। চকিতে মনে এল তারেক-কোকো, খাম্বা-মামুন, হাওয়া ভবনের প্যান্ডোরার বাঙ্রে কথা। জামায়াত-বিএনপির ওই যুগের তুলনায় আওয়ামী লীগ ভাঙিয়ে খাওয়া এসব কুলাঙ্গার তো নস্যি। আমার চিন্তাস্রোত হাসিনা-খালেদা, আওয়ামী-বিএনপির শৈবালধামে আটকা পড়ে যাচ্ছিল। আমার মনেই হয়নি, আবদুল্লাহ আল নোমান এই জাতির সাংস্কৃতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজানো ইভ টিজিং সমস্যাটাকে খেলো বানিয়ে দিয়েছেন।

ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল মদাসক্ত আছেন বলে জাতির কোনো মর্মান্তিক সমস্যার যাতনা বিএনপি নেতাদের অন্তরে দাগ কাটে না। বখাটেদের কামলোলুপ হিংস্রতার মুখে সুন্দর এই পৃথিবীর দিকে চোখের পাপড়ি মেলে ধরার আগে ‘প্রতিকারহীন শক্তি’র অপরাধে যে কিশোরী আত্মহননের পথ বাছাই করল, তার অভিশাপে পুরো সমাজটাই দগ্ধ হতে পারে_এই বোধটা থাকলে ইভ টিজিংকে এমন ফালতু রাজনৈতিক মশকারা বানাতেন না সমাজসচেতন কোনো নেতা। এটা বলার আগে তাঁর একবারও মনে হলো না, অন্তত ইভ টিজিং সমূলে ধ্বংসের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির হাত মেলানো উচিত ছিল। কেতাবি গণতন্ত্রীরা অভ্যাসবশত এটা আশা করলেও আমরা জানি, জাতির সুখ-দুঃখের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া বা থাকা এই দুটি দলের জন্য সম্ভব নয়।

প্রথমে বিএনপির কথা ধরা যাক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুরা, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, ১৯৭৫ সালে তারা একজোট হয়ে বঙ্গবন্ধু এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে বাংলাদেশ দখল করে এবং কালবিলম্ব না করে গোপনে রাষ্ট্রটির চরিত্র বদলে এটাকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন চিরস্থায়ী করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লে বিএনপির জন্ম হয়। বলা বাহুল্য, সেই সময় জনগণের মাঝে জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা থাকলে বিএনপির হয়তো জন্মই হতো না। যাহোক, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ধ্বংসই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করাও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জানত, সুযোগ পেলে বিএনপি তাদের ধ্বংস করবে। এ কাজটি তারা করে উঠতে পারছিল না গণতন্ত্রের মুখোশ পরে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-ভীতির কারণে। তার পরও শেষ পর্যন্ত গেরিলা কায়দায় বোমা হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে স্বাধীনতাবিরোধীরা। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির অবিরাম ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা এবং তা প্রতিরোধে পরিচালিত আওয়ামী লীগের মরিয়া সংগ্রাম স্বাধীনতার পরদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার পরিবেশকে সংঘাতময়, হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও অসহনীয় করে রেখেছে। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ঐতিহাসিক বাঙালি সমাজ ভেঙে খান খান হয়ে গেল। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি থেকে বস্তির নিঃস্ব ব্যক্তি পর্যন্ত যে কেউ যখন খুশি আইন হাতে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাজুল ইসলাম ছয়টি সন্তানসহ বিরজাবালাকে কেটে টুকরা টুকরা করে তাতে লবণ মিশিয়ে ড্রামে ভরে বিলের নিচে পুঁতে রেখেছিল। সংস্কৃতি চলে গেল বলিউড, মধ্যপ্রাচ্য ও ইয়াংকি মুলুকে, শিক্ষা চলে গেল হুজুরদের জুব্বার নিচে মক্তব-মাদ্রাসায়, ব্যবসা চলে গেল কালোবাজারে এবং মুক্তবাজার বিদেশিদের হাতে। ক্ষমতা রূপ নিল দখলদারিত্বে। পত্রিকার হেডলাইন পেতে লাগল সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে খুনিরা। দুর্নীতির আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতা চলল রাজনীতিতে, প্রশাসনে, পুলিশে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, কাস্টমসে, ইনকাম ট্যাঙ্_েকোথায় নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রইল বেশ কয়েক বছর। যেখানে সভ্যতাবিরোধী পরিবেশে রাজাকার-আলবদররা দেশের মন্ত্রী হতে পারে, খুনের বিচার হয় না, খুনিকে পুরস্কৃত করা হয়, সেখানে অল্প বয়সী অর্থ-অস্ত্র-উন্মাদ, ড্যাম কেয়ার বন্য তরুণটির ইভ টিজার হওয়াটাই তো একটা বাহাদুরি ছিল।

ইভ টিজিং_এসিড নিক্ষেপ, গুম, জোড়া খুন, সিরিয়াল কিলিং, নাবালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, অগি্নসংযোগ, ভাড়ায় খুন প্রভৃতির মতো একটি অপরাধ। একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।

বাংলাদেশ নষ্ট করার মিশন নিয়ে যেহেতু বিএনপির জন্ম, সেহেতু বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির সবকিছু নষ্ট করাই তার লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রধান দোষ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা বিএনপি-জামায়াতকে প্রথম দিন থেকেই প্রতিহত না করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেওয়া। যে জনগণ একাত্তরের নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংসের শিকার হয়েও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছে, দেশের ঘোর বিপদের দিনে জনগণের নিজ সংগঠন আওয়ামী লীগ তাদেরই ডাকল না। তারা দেশের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গিয়ে ক্ষমতা ভোগের রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ল। বিএনপি আমাদের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নষ্ট করল, আওয়ামী লীগ এর প্রতি নীরব সমর্থন জানাল। অনেকে বলাবলি শুরু করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অসহযোগিতামূলক বন্ধুত্ব তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আঁস্তাকুড় বানালে আমাদের বহু যুগের লালিত সব স্বপ্ন ও আদর্শ তিরোহিত হয়। সংক্ষেপে এই হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের পচা অতীতের আরণ্যক সমাজের গন্ধ ব্যবচ্ছেদ। এই সময়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ‘প্রতিকারহীন’ অসভ্য শক্তি ডাকাতির মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ঘোর বর্ষায় একটানা মেঘ-বৃষ্টির পর একটা ঝলমলে দিনের মতো আশা, উদ্দীপনা এবং প্রেরণা নিয়ে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে। এই প্রথম জনগণ ২০২১ সালে পেঁৗছানোর জন্য একটি গন্তব্যের ঠিকানা পেল, পেল পথের দিশা ডিজিটাল বাংলাদেশ। পরিচ্ছন্ন মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, কৃষি ও কৃষকদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারণ, বন্ধ্যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে (ইভ টিজিংয়ের অন্যতম কারণ) ঝাঁকি দিয়ে জাগানো, পার্লামেন্ট চালু রাখা, সংকট ও জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা_এ রকম অসংখ্য উদ্যোগ জনগণের চোখে পড়েছে। সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা দৃঢ়। কিন্তু তার পরও একটি জাগ্রত জনতার দেশের মতো গতিশীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ নেই বাংলাদেশে। একটি কারণ হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্যহারা বিএনপির ভাড়াটে নেতাদের দিন-রাত ‘বাঘ পড়েছে’, ‘বাঘ পড়েছে’ বলে চিৎকার করে জনগণকে সন্ত্রস্ত রাখা। এটি অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না কারণ কোকো-তারেক-মামুন-বাবর আর হাওয়া ভবন বিএনপিকে যে কফিনে শুইয়েছিল, তাতে পেরেক ঠুকে দিয়েছে খালেদা জিয়ার বাড়ি রক্ষা আন্দোলন। বিএনপি কখনো জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল ছিল না, তবে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী হওয়ার মতো এমন ন্যক্কারজনক অবস্থায় আগে কখনো পড়েনি। সরকারকে সমর্থন করা সত্ত্বেও জনগণ কেন সক্রিয়ভাবে সমাজ গঠনে এগিয়ে আসছে না, এটিই হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল ভাবনা। কারণ এতকালের নষ্ট সমাজ ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণ করার অনুপযোগী।

সমাজ এখনো জেগে না ওঠার কারণ, চেতনার ক্ষেত্রে সরকার ও দলের মধ্যে যোজন যোজন মাইল দূরত্ব রয়েছে। সরকার যেখানে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, দল সেখানে পচা অতীতের ক্ষমতা দখল রাজনীতির ফেনসিডিল নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সরকার যেখানে নদী উদ্ধার, ভূমি উদ্ধার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি চাচ্ছে, দল সেখানে নদী দখল, চর দখল, ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চাকরি দখল, টেন্ডার দখল ইত্যাদি খাই খাই রোগে আক্রান্ত। জনগণ দলকে চেনে, সরকার চেনে না। তাই তো তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দলকে ছাড়িয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার যে শর্ত গতিশীলতা, যোগ্যতা ও ধনুকভাঙ্গা পণ, তার প্রতিবন্ধতা হচ্ছে, প্রশাসনের মস্তিষ্কে বড় হওয়া আমলাতন্ত্রের টিউমার।

সমাজ ন্যায়-নীতির মাঝে গতিশীল ও কর্মময় না হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ জনগণ কর্তৃক পার্লামেন্টে পাঠানো তাদের ৩০০ নেতা নিজেরাই এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট কী এবং কেন তা একেবারেই অপরিহার্য। অথচ নতুন সমাজ গঠনের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হলে প্রথম সারিতে দাঁড়াতে হবে তাঁদেরকেই।

নতুন সমাজ গঠনে জনজোয়ার এলে ‘ইভ টিজিং’ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, ভেসে যাবে ফালতু রাজনীতির পচা অতীত।
লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?


রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক