তথ্য আছে, আ.লীগ আবার আসবে: জয়


তথ্য আছে, আ.লীগ আবার আসবে: জয়.

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের ব্যাপারে ‘আত্মবিশ্বাসী’ প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়।

মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগ আয়োজিত ইফতার পূর্ব আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আগামীবার আবার ক্ষমতায় আসবে। বিএনপির মিথ্যা প্রচার মোকাবেলা করতেই হবে।”

আগামী ছয় মাস তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরারও আহ্বান জানান জয়।

গত ১৬ জুলাই স্ত্রী ক্রিস্টিন ওভারমায়ার ও মেয়ে সোফিকে নিয়ে সজীব ওয়াজেদ দেশে আসেন। দেশের ফেরার পর সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির দেয়া ইফতার আয়োজনে অংশ নেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে দাবি করে তিনি বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেশ পেছন দিকে হাঁটবে। বাংলার মানুষ কখনোই বিএনপি-জামায়াতের সেসব দিনের কথা ভুলবে না।

২১ অগাস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে জয় বলেন, “একুশে আগস্টের কথা আমরা ভুলিনি। আমার মা কে লক্ষ্য করে বোমা হামলা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ২৩ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল, আহত হয়েছিলেন ৪০০ জন। আর এই হামলার মূল পরিকল্পনা করা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে নিজে আমার মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।”

“আমার মা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও আইভী রহমান বাঁচতে পারেননি। তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। আমরা কিছুই ভুলিনি, ভুলব না। ২১ শে আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই।”

বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “কোথায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে? বিগত বিএনপির সাথে বর্তমান সরকারের তুলনা করে দেখুন। টিআইবি এতো অভিযোগ করে কিন্তু বিএনপির সময়ে টিআইবির জরিপে দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ, এখন বাংলাদেশের অবস্থা ৪০ এর উপরে।”

বর্তমান সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হয় না দাবি করে জয় বলেন, “হলমার্ক-ডেসটিনি নিয়ে এত কথা হয়, কিন্তু হাওয়া ভবনের কথা কি জাতি ভুলে গেছে? খাম্বার কথা ভুলে গেছে? বিএনপি সরকার ৫ বছর শুধু খাম্বা কিনেছে, বিদ্যুৎ দিতে পারেনি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও বিএনপি-জামায়াত সরকার ছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”

দেড় কোটি মানুষ গত সাড়ে ৪ বছরে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মীজানুর রহমান, যুবলীগ নেতা হারুনুর রশীদ, ফজলুল হক প্রমুখ।

রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’ একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।


রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’
বেলাল বেগ

রাজনীতি

রাজনীতি

লাগুক বা না লাগুক, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আওয়ামী লীগের উদ্দেশে একটি শব্দ গুলতি ছুড়েছেন। আওয়ামী লীগ নাকি সারা দেশটাকেই ‘ইভ টিজিং’ করছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, বেড়ে বলেছেন তো! রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোকদীপ্তিকে আরণ্যক অন্ধকার বানিয়ে নিশাচর হিংস্র পশুর মতো আচরণ করে যে রিপুতাড়িত বখাটের দল, সেটাই তো ইভ টিজিং। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুষ্কৃতকারীদের আচরণ এক ধরনের রাজনৈতিক ইভ টিজিং বটে। চকিতে মনে এল তারেক-কোকো, খাম্বা-মামুন, হাওয়া ভবনের প্যান্ডোরার বাঙ্রে কথা। জামায়াত-বিএনপির ওই যুগের তুলনায় আওয়ামী লীগ ভাঙিয়ে খাওয়া এসব কুলাঙ্গার তো নস্যি। আমার চিন্তাস্রোত হাসিনা-খালেদা, আওয়ামী-বিএনপির শৈবালধামে আটকা পড়ে যাচ্ছিল। আমার মনেই হয়নি, আবদুল্লাহ আল নোমান এই জাতির সাংস্কৃতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজানো ইভ টিজিং সমস্যাটাকে খেলো বানিয়ে দিয়েছেন।

ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল মদাসক্ত আছেন বলে জাতির কোনো মর্মান্তিক সমস্যার যাতনা বিএনপি নেতাদের অন্তরে দাগ কাটে না। বখাটেদের কামলোলুপ হিংস্রতার মুখে সুন্দর এই পৃথিবীর দিকে চোখের পাপড়ি মেলে ধরার আগে ‘প্রতিকারহীন শক্তি’র অপরাধে যে কিশোরী আত্মহননের পথ বাছাই করল, তার অভিশাপে পুরো সমাজটাই দগ্ধ হতে পারে_এই বোধটা থাকলে ইভ টিজিংকে এমন ফালতু রাজনৈতিক মশকারা বানাতেন না সমাজসচেতন কোনো নেতা। এটা বলার আগে তাঁর একবারও মনে হলো না, অন্তত ইভ টিজিং সমূলে ধ্বংসের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির হাত মেলানো উচিত ছিল। কেতাবি গণতন্ত্রীরা অভ্যাসবশত এটা আশা করলেও আমরা জানি, জাতির সুখ-দুঃখের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া বা থাকা এই দুটি দলের জন্য সম্ভব নয়।

প্রথমে বিএনপির কথা ধরা যাক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুরা, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, ১৯৭৫ সালে তারা একজোট হয়ে বঙ্গবন্ধু এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে বাংলাদেশ দখল করে এবং কালবিলম্ব না করে গোপনে রাষ্ট্রটির চরিত্র বদলে এটাকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন চিরস্থায়ী করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লে বিএনপির জন্ম হয়। বলা বাহুল্য, সেই সময় জনগণের মাঝে জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা থাকলে বিএনপির হয়তো জন্মই হতো না। যাহোক, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ধ্বংসই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করাও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জানত, সুযোগ পেলে বিএনপি তাদের ধ্বংস করবে। এ কাজটি তারা করে উঠতে পারছিল না গণতন্ত্রের মুখোশ পরে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-ভীতির কারণে। তার পরও শেষ পর্যন্ত গেরিলা কায়দায় বোমা হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে স্বাধীনতাবিরোধীরা। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির অবিরাম ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা এবং তা প্রতিরোধে পরিচালিত আওয়ামী লীগের মরিয়া সংগ্রাম স্বাধীনতার পরদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার পরিবেশকে সংঘাতময়, হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও অসহনীয় করে রেখেছে। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ঐতিহাসিক বাঙালি সমাজ ভেঙে খান খান হয়ে গেল। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি থেকে বস্তির নিঃস্ব ব্যক্তি পর্যন্ত যে কেউ যখন খুশি আইন হাতে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাজুল ইসলাম ছয়টি সন্তানসহ বিরজাবালাকে কেটে টুকরা টুকরা করে তাতে লবণ মিশিয়ে ড্রামে ভরে বিলের নিচে পুঁতে রেখেছিল। সংস্কৃতি চলে গেল বলিউড, মধ্যপ্রাচ্য ও ইয়াংকি মুলুকে, শিক্ষা চলে গেল হুজুরদের জুব্বার নিচে মক্তব-মাদ্রাসায়, ব্যবসা চলে গেল কালোবাজারে এবং মুক্তবাজার বিদেশিদের হাতে। ক্ষমতা রূপ নিল দখলদারিত্বে। পত্রিকার হেডলাইন পেতে লাগল সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে খুনিরা। দুর্নীতির আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতা চলল রাজনীতিতে, প্রশাসনে, পুলিশে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, কাস্টমসে, ইনকাম ট্যাঙ্_েকোথায় নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রইল বেশ কয়েক বছর। যেখানে সভ্যতাবিরোধী পরিবেশে রাজাকার-আলবদররা দেশের মন্ত্রী হতে পারে, খুনের বিচার হয় না, খুনিকে পুরস্কৃত করা হয়, সেখানে অল্প বয়সী অর্থ-অস্ত্র-উন্মাদ, ড্যাম কেয়ার বন্য তরুণটির ইভ টিজার হওয়াটাই তো একটা বাহাদুরি ছিল।

ইভ টিজিং_এসিড নিক্ষেপ, গুম, জোড়া খুন, সিরিয়াল কিলিং, নাবালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, অগি্নসংযোগ, ভাড়ায় খুন প্রভৃতির মতো একটি অপরাধ। একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।

বাংলাদেশ নষ্ট করার মিশন নিয়ে যেহেতু বিএনপির জন্ম, সেহেতু বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির সবকিছু নষ্ট করাই তার লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রধান দোষ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা বিএনপি-জামায়াতকে প্রথম দিন থেকেই প্রতিহত না করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেওয়া। যে জনগণ একাত্তরের নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংসের শিকার হয়েও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছে, দেশের ঘোর বিপদের দিনে জনগণের নিজ সংগঠন আওয়ামী লীগ তাদেরই ডাকল না। তারা দেশের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গিয়ে ক্ষমতা ভোগের রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ল। বিএনপি আমাদের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নষ্ট করল, আওয়ামী লীগ এর প্রতি নীরব সমর্থন জানাল। অনেকে বলাবলি শুরু করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অসহযোগিতামূলক বন্ধুত্ব তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আঁস্তাকুড় বানালে আমাদের বহু যুগের লালিত সব স্বপ্ন ও আদর্শ তিরোহিত হয়। সংক্ষেপে এই হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের পচা অতীতের আরণ্যক সমাজের গন্ধ ব্যবচ্ছেদ। এই সময়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ‘প্রতিকারহীন’ অসভ্য শক্তি ডাকাতির মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ঘোর বর্ষায় একটানা মেঘ-বৃষ্টির পর একটা ঝলমলে দিনের মতো আশা, উদ্দীপনা এবং প্রেরণা নিয়ে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে। এই প্রথম জনগণ ২০২১ সালে পেঁৗছানোর জন্য একটি গন্তব্যের ঠিকানা পেল, পেল পথের দিশা ডিজিটাল বাংলাদেশ। পরিচ্ছন্ন মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, কৃষি ও কৃষকদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারণ, বন্ধ্যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে (ইভ টিজিংয়ের অন্যতম কারণ) ঝাঁকি দিয়ে জাগানো, পার্লামেন্ট চালু রাখা, সংকট ও জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা_এ রকম অসংখ্য উদ্যোগ জনগণের চোখে পড়েছে। সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা দৃঢ়। কিন্তু তার পরও একটি জাগ্রত জনতার দেশের মতো গতিশীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ নেই বাংলাদেশে। একটি কারণ হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্যহারা বিএনপির ভাড়াটে নেতাদের দিন-রাত ‘বাঘ পড়েছে’, ‘বাঘ পড়েছে’ বলে চিৎকার করে জনগণকে সন্ত্রস্ত রাখা। এটি অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না কারণ কোকো-তারেক-মামুন-বাবর আর হাওয়া ভবন বিএনপিকে যে কফিনে শুইয়েছিল, তাতে পেরেক ঠুকে দিয়েছে খালেদা জিয়ার বাড়ি রক্ষা আন্দোলন। বিএনপি কখনো জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল ছিল না, তবে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী হওয়ার মতো এমন ন্যক্কারজনক অবস্থায় আগে কখনো পড়েনি। সরকারকে সমর্থন করা সত্ত্বেও জনগণ কেন সক্রিয়ভাবে সমাজ গঠনে এগিয়ে আসছে না, এটিই হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল ভাবনা। কারণ এতকালের নষ্ট সমাজ ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণ করার অনুপযোগী।

সমাজ এখনো জেগে না ওঠার কারণ, চেতনার ক্ষেত্রে সরকার ও দলের মধ্যে যোজন যোজন মাইল দূরত্ব রয়েছে। সরকার যেখানে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, দল সেখানে পচা অতীতের ক্ষমতা দখল রাজনীতির ফেনসিডিল নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সরকার যেখানে নদী উদ্ধার, ভূমি উদ্ধার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি চাচ্ছে, দল সেখানে নদী দখল, চর দখল, ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চাকরি দখল, টেন্ডার দখল ইত্যাদি খাই খাই রোগে আক্রান্ত। জনগণ দলকে চেনে, সরকার চেনে না। তাই তো তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দলকে ছাড়িয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার যে শর্ত গতিশীলতা, যোগ্যতা ও ধনুকভাঙ্গা পণ, তার প্রতিবন্ধতা হচ্ছে, প্রশাসনের মস্তিষ্কে বড় হওয়া আমলাতন্ত্রের টিউমার।

সমাজ ন্যায়-নীতির মাঝে গতিশীল ও কর্মময় না হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ জনগণ কর্তৃক পার্লামেন্টে পাঠানো তাদের ৩০০ নেতা নিজেরাই এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট কী এবং কেন তা একেবারেই অপরিহার্য। অথচ নতুন সমাজ গঠনের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হলে প্রথম সারিতে দাঁড়াতে হবে তাঁদেরকেই।

নতুন সমাজ গঠনে জনজোয়ার এলে ‘ইভ টিজিং’ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, ভেসে যাবে ফালতু রাজনীতির পচা অতীত।
লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?


রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক