ব্রিটেনে অস্থায়ী ইমিগ্র্যান্টদের স্থায়ী হওয়ার বিধান বাতিল হচ্ছে


ব্রিটেনে অস্থায়ী ইমিগ্র্যান্টদের স্থায়ী হওয়ার বিধান বাতিল হচ্ছে

মহিউদ্দিন আফজাল লন্ডন

ইমিগ্র্যান্টদের জন্য স্বপ্নপুরী খ্যাত ব্রিটেনে যতই দিন যাচ্ছে ততই ইমিগ্র্যান্ট নীতিমালা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান টোরি-লিবডেম সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন পূর্ণপদ্ধতি, আইন ও নিয়ম-নীতি সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো বিষয় তারা কার্যকর করেছে। যার ফলে ইমিগ্রেশন কমিউনিটি বিশেষ করে বাংলাদেশী, পাকিস্তানি, টারকিশ ও সোমালীয়দের মধ্যে তীব্র আশঙ্কা বিরাজ করছে।

নব্য ইমিগ্রেশন নীতিমালার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে অনেকে দুর্বিষহ প্রবাসজীবন অতিবাহিত করছেন। তার ওপর ব্রিটেনে শুরু হতে যাচ্ছে নব্য সোস্যাল সিকিউরিটি পদ্ধতি। যা সমগ্র মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে প্রভাব ফেলবে। কেননা ব্রিটেনে মুসলিম কমিউনিটি অন্যদের তুলনায় এখনো ততটা সচ্ছল অথবা প্রতিষ্ঠিত নয়। এ ছাড়া ১/১১, ৭/৭ ও বিশ্বমন্দার প্রভাবে মুসলিম কমিউনিটি ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিতে যথেষ্ট বৈষম্য ও ক্ষতির শিকার হয়েছে। এসবের প্রভাব ব্রিটেনে এখনো চলমান। এরই মধ্যে আরেকটি দুঃসংবাদ মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো দেখা দিয়েছে। সেটা হচ্ছে­ বর্তমান টোরি-লিবডেম সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যে আইনে এখন থেকে ব্রিটেনে অস্থায়ী ইমিগ্র্যান্টদের স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়ার বিধান বাতিল করা হবে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ হোম সেক্রেটারি টেরেসা মে বলেছেন, ব্রিটেনে যারা অস্থায়ী ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে আসবেন তারা অস্থায়ীভাবে ব্রিটেনে থাকবেন। ব্রিটেনে আসার পর মেয়াদ শেষ হলে তাকে ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে থাকতে দেয়া হবে না। তাদের কার্য সমাধা করে স্বদেশে চলে যেতে হবে। গত সপ্তাহে ইমিগ্রেশন স্থায়ী হওয়া আইন সংস্কারের ঘোষণায় তিনি এ নীতিমালা পেশ করেন। অর্থাৎ ব্রিটেনে পড়তে এলে লেখাপড়া শেষে নিজ নিজ দেশে চলে যেতে হবে। এখানে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না।

টোরি-লিবডেম সরকারের মুখপাত্র বলেন, আমরা ছাত্র বলতে বুঝি ব্রিটেনে পড়তে এসে পড়া শেষ করে স্বদেশে চলে যাওয়া। এ ছাড়া সরকার ছাত্রদের ও তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের চাকরির অধিকার পর্যালোচনা করতে যাচ্ছে।

এ দিকে ব্রিটিশ সরকার নন-ইউরোপিয়ান ছাত্রদের পোস্টস্টাডি ওয়ার্ক বন্ধ করতে যাচ্ছে বলে একটি মিডিয়া সূত্রে জানা যায়। শিগগিরই ওই সব নীতিমালা চূড়ান্তভাবে পেশ করতে যাচ্ছে টোরি-লিবডেম সরকার। এ ছাড়া সরকার বর্তমানে ব্রিটেনে অবস্থানরত নন-ইউরোপিয়ান এক লাখ ৬০ হাজার ছাত্র টার্গেট করে নয়া নীতিমালা কার্যকর করতে চাচ্ছে।

লেবার সরকারের ব্রিটিশ নাগরিক নীতিমালা বাতিল হলে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত এক লাখ ২০ হাজার ইমিগ্র্যান্ট ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ার অধিকার হারাবেন। যাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী, পাকিস্তানি ও সোমলিয়ান। এ দিকে ব্রিটিশ সরকার গত চার বছরে এক লাখ ৩৯ হাজার লোককে ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। যাদের সাথে স্ত্রী-শিশু পরিবারের সদস্যরাও রয়েছে।

লাম্পট্যতা রোধে জেল-জরিমানা! কতটা ফলপ্রসু? ‘ইভ টিজার’ বলে বখাটেদের সম্মান না দিয়ে যথার্থ বাংলা শব্দের প্রয়োগ করতে হবে।


লাম্পট্যতা রোধে জেল-জরিমানা! কতটা ফলপ্রসু?
নজরুল ইসলাম টিপু



সুন্দরী চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে? রাগ করোনা সুন্দরী গো, রাগলে তোমায় লাগে আরো ভাল….। এটি ৩০ বছর আগের বাংলা ছবির একটি হিট গান, গানের সূর সুন্দর হলেও ছবিতে দেখা যায়, একজন নারী একাকী রাস্তায় চলে যাচ্ছে, আরেকজন পুরুষ গাড়ীতে বসে নারীকে উত্যক্ত করে গানটি গাইছে। এখনও কদাচিৎ টিভিতে ছবিগুলো প্রদর্শিত হয়। তখনকার দিনে সমাজ জীবনে এগুলোর কোন প্রভাব ছিলনা, মানুষ ভাবত নিতান্ত আনন্দ বিনোদনের জন্য ছবি দেখা, যার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নাই। বর্তমান কালের ছবিতে যে গানগুলো নাচিয়ে দেখানো হয়, সেগুলো না গাওয়া যায়, না দেখা যায়, না শোনা যায়, না লিখা যায়! টিভি খবরের মাঝখানে যদি ফ্লিমের এ্যাড আসে হয় টিভি বন্ধ করতে হয়; নতুবা যে যার মত সে স্থান থেকে ত্যাগ করতে হয়। বর্তমানের প্রচলিত গানের কলি না লিখে ৩০ বছর আগের একটি গানের কলি এখানে তুলে আনলাম; কেননা আমিও ৩০ বছর আগের ইজা টানব। ছবিতেই নারীকে উত্যক্ত করে গানটি গাওয়া হয়েছিল; তখনকার দিনে বাস্তবে কেউ প্রকাশ্যে এটা করলে তাকে লম্পট, লুইচ্ছা, বদমাইশ, বেয়াদব বলার সাথে সাথে, মার-গুথোর পর জুতা কামড়িয়ে মাটি থেকে তুলতে হত। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আধুনিক সমাজের কাছে এই ব্যক্তিদের নাম হল ‘ইভ টিজার’! কিছুটা সম্মানজনক শব্দ বটে!

বাংলাদেশে নারী-পুরুষের যৌনতার চাদরে আবৃত প্রেম ব্যতীত সিনেমা নাই। কেউ বানাতে পারেনা, তাদের দাবী বানালে নাকি বাজারে চলবেনা! বাংলা সিনেমায় দেখুন, আঁট-শাট পোষাক পরিহীতা কিছুটা দেমাগী, সুন্দরী মেয়েটি কাউকে পাত্তা না দিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিন করে চলল। ক্লাসে কিংবা কেন্টিনে মেয়েটির দেমাগী ভাব ক্লাসের স্যারদের সামনে নিলর্জ্জ যথারীতি চলে। ক্লাসের আরেক ছাত্র হতে পারে ধনী কিংবা মেধাবী মেয়েটিকে উত্যক্ত করল দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। ছেলেটি ব্যর্থ হয়ে মেয়েটির কামিজে টান মারে, অমনি মেয়েটি বাম হাতের পাঁচ সিকার একখানি থাপ্পড় ছেলের গালে বসিয়ে দেয়! ব্যস, শুরু হল আসল খেলা, টানটান উত্তেজনা, রক্ত টগবগ করা কাহিনী জমে উঠে। হঠাৎ ছন্দপতন, সে কাহিনী মোড় নেয় প্রেমে, অমর প্রেম। উভয় পক্ষের বাবা-মা মানতে নারাজ, শেষ পর্যন্ত বাবা-মা বুঝতে পারে, তারাই আসলে ভূল করেছিল। ছেলেমেয়েরা কোন ভূল করেনি, তারা ঠিক পথেই চলছিল। পিতা-মাতার কম আকলের কারনে তা বুঝে উঠতে পারেনি, ফলে সানাই বাজল বিয়ে হল। এভাবেই প্রতিটি বাংলা সিনেমার ছবি তৈরী হয়, বুঝানো হয়, মেয়েদের উত্যক্ত করেই প্রেম করতে হয়, মন পেতে হয়। সঙ্গত কারনে দর্শকদের মাঝে উঠতি বয়সের কিছু ছেলেদের উপর এর খারাপ প্রভাব পড়ে। কেউ প্রশ্ন করেনি, মামলা করেনি, আসলেই কি কলেজের অভ্যন্তর ভাগের হালছাল এত বিশ্রি! উত্যক্ত করলে মেয়েরা থাপ্পড় মারেনা, বাস্তবতা হল মেয়েরা পারলে জুতো পিটুনি দেয়। কখনও সিনেমাতে দেখেছেন? উত্যক্তকারী নায়ককে জুতো পিটুনি দিতে? অথছ সেটাই ছিল তার কর্মের প্রাপ্য।

বিগত ১০ বছর আগেও সমালোচনা হত টিভি বিজ্ঞাপনে অযথা মেয়েদের দেখানো হয়, অপ্রয়োজনে তাদের দিয়ে নানা অঙ্গ-ভঙ্গি করিয়ে নেয়া হয়। ভদ্র অভিরুচি সম্পন্ন শিক্ষিত সমাজ থেকে বলা হত গাড়ীর টায়ারের বিজ্ঞাপনে, ব্লেডের বিজ্ঞাপনে, সিমেন্ট, লোহা কিংবা জমির সারের বিজ্ঞাপনের সাথে নারীদের কি সম্পর্ক? কেন তাদের এভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? রাষ্ট্রিয়ভাবে এগুলো নিয়ে কোন সরকারই ভাবেনি, ভাবার গরজও মনে করেনি। সেটার উত্তরণতো হয়নি বরং এখন সেটা মহামারী আকারে, মিডিয়া জগতে প্রবেশ করেছে। আগে ছিল অপ্রয়োজনে নারীদের উপস্থিতি নিয়ে যত কথা, এখন যোগ হয়েছে নাচ-গান সহ বিভিন্ন উদ্ভট অঙ্গ-ভঙ্গি। এখন সাবানের বিজ্ঞাপনে নারীদের নাচ আছে, বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে নারী-পুরুষের লাফালাফি আছে। সিমেন্ট, ময়দা, লাচ্ছা সেমাই, ইট, টিভি, ফ্রিজ, নুডুলস্, বিস্কুট, চুইংগাম, ন্যাপকিন, পাওয়ার টিলার, জৈব সার থেকে শুরু করে কোন বিজ্ঞাপনে ছেলে-মেয়েদের দৃষ্টি কটু লাফালাফি নাই? পানির পিভিসি পাইপের বিজ্ঞাপনে নারী চরিত্র ঢুকাতে হবে, কিছুতেই মাথায় আসছেনা কিভাবে সম্ভব করা যায়। আমার এক মিডিয়া শুভাকাঙ্খির কাছে সাহায্য চাইল এ্যাড ফার্মের বন্ধু, একটু বুদ্ধি পরামর্শ দিতে! খাদ্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের একটি সংলাপ এমন, বান্ধবীকে বলা হল, মুখে থাকবে গান, হাতে থাকবে বিস্কুট। ১৫ সেকেন্টের এই বিজ্ঞাপনের ১১ সেকেন্ট চলল বক্ষ প্রদর্শনী নৃত্য, ৪ সেকেন্ট পণ্যের নাম। ক্রিমের ১৫ সেকেন্টের বিজ্ঞাপনে ১৩ সেকেন্ট ধরে মেয়েটি ছেলেদের উত্যক্ত করার দৃশ্য, মাত্র২ সেকেন্টে নিল পণ্যের নাম বলতে! পণ্য সামগ্রীর গুনগত মান, সূলভ, সহজলভ্যতা, উপকারী, দরকারী কিনা কোন কথা বার্তা নাই। প্রায় প্রতিটি বিজ্ঞাপনের আজ এই দশা।

ইদানীং মোবাইল কোম্পানীগুলো যথেষ্ট বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। মোবাইল ডিজিটাল যুগের অমর কীর্তি, চরম বিষ্ময়, যথেষ্ট প্রয়োজন ও উপকারী। এমন একটি প্রয়োজনীয় সৃষ্টির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেও কি, একই উচ্চতার, একই গড়নের, একই আকৃতির একদল তরুনীর মাঝখানে একজন পুরুষকে নাচাতে হবে? বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর সৃষ্টি, অতীব প্রয়োজনীয় একটি বস্তুকে পরিচিত করাতে, নারী-পুরুষের বেলাল্লাপনার আয়োজন কি অতি জরুরী? পৃথিবীতে মোবাইল কোম্পানী কি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মাটি ফেঁড়ে উদ্ভিদের মত গজিয়েছে? পৃথিবীতে মোবাইলের এ্যাড কি আর কেউ দেয়না? নাকি মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে কোম্পানীদের গলদঘর্ম হয়? মোবাইলের ব্যবহার আর যাই হোক, এসব দেখে উঠতি বয়সী বাচ্চাদের যে নৈতিক স্খলন ঘটবে, তা কোন বাবা-মা অস্বীকার করতে পারবে না।

আব্বাস উদ্দীন, বশির আহমেদ, আবদুল আলীম, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, নীনা হামিদ সহ প্রচুর বিখ্যাত গায়ক গায়িকা বাংলাদেশে রয়েছে। তাদের কত জনকে তদানীন্তন বাংলাদেশের মানুষ চোখে দেখেছে? ভাটি অঞ্চলের প্রান্তে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের নিভৃত পল্লীতে তাদের গান গুলো, পথ চলা পথিকের কন্ঠে টান পড়ত। মানুষ জানত এটা আব্বাস উদ্দীনের ভাটিয়ালী কিংবা আবদুল আলীমের পল্লীগীতি। রূপবানের গানের সূরে নীনা হামিদ প্রতিটি গ্রামের বধুদের কাছে পরিচিত। অথছ তখন ছিলনা টিভি, রেডিও, কেসেট প্লেয়ার, এমপি থ্রির মত সহজলভ্য যন্ত্রাংশ কিংবা ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এসব শিল্পীদের মানুষ নামে চিনত, কন্ঠে চিনত, ফলে হৃদয় নিংড়ানো ইজ্জত দিত। এখন ইলেকট্রনিক্স বাদ্যের কারনে বেসুরো গায়ক-গায়িকাদের মেলা কদর বেড়েছে। আগে গানের তালে বাদ্য বাজত, এখন বাদ্যের তালে বেসুরো গলায় শিল্পীকে গাইতে হয়। মিক্সিং করে গলা ও সুরের দুর্বলতাগুলো রিপেয়ার করা হয়। এত কিছু করেও শিল্পীরা আগের মত পরিচিতি পাচ্ছেনা। ফলে গান দেখানোর জন্য আশ্চর্য্য এক ব্যবস্থা চালু হল। শিল্পী নিজে গাইবে, আর মডেল কণ্যা, গায়িকা নামধারী একজনকে কলা গাছের তলায়, সীম বাগানের ঝোপ-ঝাড়ে নৃত্যে করাবে। সেটার জন্য অরুচিকর বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা হবে। ব্যবসা এখন তাতেও ভাল যাচ্ছেনা, ফলে গানের মডেলদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে খোদ গায়িকারাই নিজেই গানের মডেল হয়ে গাইছেন। এখন গায়িকাদের ভাল কণ্ঠ থাকলেই চলেনা, মঞ্চ কাঁপানোর মত লম্প-ঝম্প, নর্তন কুর্দন না করলে চলেনা। সমস্যাটা এখানেই, বাজার দখলের ধান্ধায় এসব গায়িকা কাম মডেল কণ্যারা, নিজেরাই নিজেদের ড্রেস তৈরী করছেন। ড্রেসগুলো আভিজাত্য ও পরিমার্জিত করার চেয়ে বেশী নজর দেয়া হয়, সেগুলো যথেষ্ট উত্তেজক হয়েছে কিনা সেদিকে। সে ড্রেসগুলো পরে গায়িকা কাম মডেল কণ্যারা, নেচে গেয়ে চলছেন অবিরত। কেউ ভাবছেনা, কেউ বলছে না এগুলো আমাদের দেশের সাংস্কৃতির সাথে মানান সই কিনা? দেশের ছেলেমেয়েরা আমাদের সাংস্কৃতির অংশবিশেষ। বড় আফসোস লাগে বাংলার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া, সম্মান পাওয়া গায়িকা ছাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লার মত দেশ কাঁপানো গায়িকারাও হাল আমলের শিল্পীদের মাঝে বিলীন হয়ে যেতে। অথছ তাদের না দেখেই বাংলার মানুষ শ্রদ্ধা করতে শিখেছিল।

আজ ঘরে ঘরে হিন্দী ছবির সয়লাব। অনেক পরিবার ভাল বাংলা বলতে পারেনা, ইংরেজী বলতে পারেনা, তবে ঠিকই হিন্দী বলতে পারে ও বুঝে। হিন্দী নাটক ও ছবিগুলো সর্বদা সমাজের মধ্যে অসামাজিক নোংমারী ঢুকাতে সিদ্ধহস্থ। প্রায় সব নাটকেই পরকীয়া প্রেমকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়। এক পুরুষের সাথে মা-মেয়ের প্রেম, এক মহিলার সাথে বাবা-ছেলের প্রেম! এসব হচ্ছে ভারতীয় ছবি ও নাটকের উপজীব্য বিষয়। এসব কুৎসিত চিন্তা, নোংরা কাহিনী হলো নাটকের মূল বিষয় বস্তু, সেগুলোকে বাস্তবতার রূপ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। যারা দেখে তারা এক পর্যায়ে দেখতে অভ্যস্থ হয়ে যায়। সেসব গর্হিত কাজকে বর্তমান তরুণ শ্রেনী বাস্তব পক্রিয়া বলে ভাবতে শুরু করে। বর্তমানে নাটকের শিখানো কায়দায় ছেলেরা রাস্তাঘাটে অসহায় নারীদের উত্যক্ত করে চলছে, এগুলো যাদের দেখার দায়িত্ব তারা কিভাবে এই পরিণতির দায় এড়াবেন? বর্তমানে বিয়ের সম্পর্ক করতে গেলে ঘরে কি কি চ্যানেল তারা দেখে থাকেন, খোঁজ খবর নেওয়া অনেকেই জরুরী মনে করেন, অনেকে এদের সাথে আত্মীয়তা করতে দশবার ভাবছেন।

বর্তমানে আমাদের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলেও নাটক তৈরীতে ভারতীয় ভূতের আছর পড়েছে। তারা ব্যবসা সফলতার জন্য ভারতীয় পন্থাকে অনুকরন করছে এবং আমাদের চ্যানেলগুলো সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। চ্যানেল গুলোতে অভিনেত্রী, গায়িকা খুঁজার নামে কোটি কোটি টাকা খরছ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে সেরা গায়িকা-নায়িকা বাছাই হলেই জাতি স্বনির্ভর হবে অচিরেই। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজী-অংকের পিছনে সময় দেবার চেয়ে, গানের পিছনে বেশী সময় ব্যয়কে উপরে উঠার মাধ্যম মনে করছেন। কেননা চ্যানেল গুলোতে তাদের মূল্যই বেশী। একটি চ্যানেলও শিক্ষার ক্ষেত্রে নূন্যতম সময় ব্যয় করেনা। আবার নায়িকা বাছাই পক্রিয়ার রীতি নীতিগুলো আপত্তিকর, তাদের ক্লোজআপ দৃশ্যগুলো আরেকটি অনুষ্ঠান বানিয়ে রগরগে বর্ণনায়, রঙ্গচটা ভঙ্গিতে প্রচার করা হয়। সামাজিক সমস্যার কথা বাদ দিলেও উঠতি যৌবনপ্রাপ্ত বালদের জন্য এসব দৃশ্য দেখে ধর্য্য ধারন করা অবশ্যই কষ্টকর হবে। যারা এসব বানাচ্ছে তাদের কাছে সমাজের চাহিদার কোন দায়বদ্ধতা নেই। তাদের মূল উদ্দ্যেশ্যই হল টাকা বানানো, সমাজ বানানো নয়।

নারীদের উপর এসব প্রতিরোধে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে, মার্শাল আট শেখানো হচ্ছে। একটি ওড়না দিয়ে কিভাবে ছেলেকে কাবু করা যায় শেখানো হচ্ছে। আরো নতুন প্রতিরোধক ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। ছেলেরা যেখানে ছুরি মারছে, এসিড মারছে, শরীরে গাড়ি তুলে দিচ্ছে; সেখানে মার্শাল আর্ট প্রযুক্তি কতটুকু কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে? সরকার ইতিমধ্যে ১ বছরের জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। ইতিমধ্যে ছোট খাট শাস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। এ দ্বারা একটি বখাটে ছেলের বিরুদ্ধে সাময়িক ভীতি তৈরী করা সম্ভব হলেও, একদল বখাটের বিরুদ্ধে কি কাজে আসবে? যে সমাজে দৈনিক হাজার হাজার বখাটে তৈরীর উপকরণ খোলা রেখেছে, সেখানে উপরোক্ত পদ্ধতি কৌতুক ছাড়া বড় কিছু নয়। মার্শাল আর্ট শিখার টাকা যার ঘরে আছে তার কণ্যা যে বখাটের খপ্পড়ে পড়বেনা, বলাই বাহুল্য। গ্রীসের মানুষেরা খুবই ভদ্র, মার্জিত। সেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশী। স্কুল-কলেজের সামনে, কিংবা মহিলা আধিক্য বাসে যেভাবে পুরুষকে নারীরা উত্যক্ত করে ভাবলে শরীর শিউরে উঠে। আমাদের দেশে পুরুষ বেশী বলে নারীরা উত্যক্ত হচ্ছে, যে দেশে নারী বেশী সেখানে পুরুষ উত্যক্ত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। তাই নারীকে মার্শাল আর্ট শিখিয়ে পুরুষদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা যেমনি চিন্তাশীল গোষ্টির উত্তম কর্মকান্ড হতে পারেনা। বখাটে ছেলেদের জেলে ঢুকিয়ে সাময়িক ফায়দা হলেও, জেল ফেরৎ বখাটেরা মেয়েদের বিরুদ্ধে আরো প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠবে সন্দেহ নাই, তাই দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এই পদ্ধতিও কোন সূফল বয়ে আনবেনা।

উপরের কয়েকটি দৃশ্য থেকে উপলব্ধি করা যায়, কিভাবে আমাদের দেশের সাংস্কৃতি কান্ডারী বিহীন নৌকার মত মতো, নদীর স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। কোন নিয়ন্ত্রন নাই, কারো অনুশোচনা নাই, কারো দায়বদ্ধতা নাই। যার কারনে এগুলো দেখে, আকৃষ্ট হয়ে, তরুণ সমাজে দুষ্ট ক্ষতের সৃষ্ট হচ্ছে। তরুণেরা সর্বদাই তরুণ, তাদের কাছে ভাল-মন্দের মানদন্ড রক্ষা করা কষ্টকর। যেখানে, যে যায়গায় তারা হাত দিবে, সেখানেই তারুণ্যের ছাপ রাখবে। এটা তাদের দোষ নয়, ফলে তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারিবারিক শাসন, স্কুল শিক্ষকের ভয়, সামাজিক বদনামের ভীতি দিয়ে তাদের সর্বদা তাড়িত করাতে হয়। তবেই তারা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রশ্ন হল সুশীল ব্যক্তিরা যে সমাজ ব্যবস্থা আমাদের তৈরী করে দিয়েছেন বিগত ৩০ বছর আগ থেকে তার দায় কে নেবে? সমাজ পঁচনের শেষ সীমায় এসে এন্টিবায়োটিক দিলে, কি উপকার হবে সে অংশের; যেটা ইতিমধ্যে পঁচে গেছে? সিনেমা-নাটকে তরুনীদের উত্যক্ত করার দীর্ঘ অপসাংস্কৃতি চালু করে; তরুন-যুবকদের সুপ্ত তারুণ্যকে উসকিয়ে দিয়েছেন, তাদের তারুণ্যের অপরাধ কে কাঁধে নেবে? আজ সাংস্কৃতিক জগতের অপসাংস্কৃতির নোংরামী, পঁচা মগজের সৃষ্ট কদাকার কাহিনীর পরিনাম ও দায়ভার কি তারা নেবে? তারা কি বুঝতে পেরেছে এই পট পরিবর্তনে তাদের অবদানই মূখ্য ভূমিকা রেখেছে?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, এগুলো মূলত অপসংস্কৃতির প্রভাব, যেগুলো এসেছে আধিপত্যবাদিদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে। পরাশক্তিগুলো সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে অনেক বেশি সুবিধাজনক ও ফলপ্রসু মনে করে। কেননা সামরিক হামলা চোখে দেখা যায়, শত্রুকে চেনা যায়; এমনকি প্রস্তুতি নেবার সময় পাওয়া যায়। ফ্লিম, ছবি, নাটক, ফ্যাশন শো’র মতো উপকরণ নিয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল আসে ধীরগতিতে। উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে যায়, ফলে জনগোষ্টি দেখতে দেখতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিরোধের সুযোগ হাত ছাড়া হয়। শত্রুর জন্য অপেক্ষার সুযোগ মেলে না। ফলে পুরো জাতি তাদের মনোগত গোলামে পরিনত হয়। অবশেষে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আড়ালে প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে বাণিজ্যিক ও সামরিক আগ্রাসন। একই উদ্দেশ্যে তালেবানের পতনের পর কারজাই সরকারের সাহাযার্থে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সাহায্য-সামগ্রী পাঠালেও; ভারত সরকার টিভি, ভি,সি,আর এবং হিন্দী ছবি নিয়ে যায় আফগান জনগনের সাহাযার্থে। আজ বাংলাদেশের আপামর জনতা পতনের কিনারায় দাঁড়িয়ে গেছে; দেশের একটি গোষ্টি অপসাংস্কৃতির মনোগত গোলামে পরিণত হয়েছে।

তাই এগুলো প্রতিকারের জন্য প্রথমেই সাংস্কৃতির পরিমন্ডলের প্রতিটি জোড়ায় হাত দিতে হবে। বিকৃত, কু-রুচিবোধ, অপসাংস্কৃতির পঁচা মগজে নৈতিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি চ্যানেল ও নাট্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সরকারকে আগে বসতে হবে। মনোবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় পন্ডিতদের পরামর্শে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। এটা পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কাজ নয়, ছেলেদের পিটিয়ে, কানধরে উঠ-বস করিয়ে ভীতি তৈরী করা যাবে, সমস্যার উত্তরণ হবেনা। কারন রোগটি হয়েছে মগজে, নৈতিকতার অভাবে। আর নৈতিকতা শিক্ষা দেয় ধর্ম, সকল ধর্মই নৈতিকতার কথা বলে, খারাপ মানুষকে ভাল বানায়। আল্লাহ নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তোমরা হিজাব তথা শালীন পোশাক পড়, তাহলে তোমরা সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিত হবে এবং রাস্তায় তোমাদের উত্যক্ত করা হবেনা। পুরুষদের বলেছেন, তোমরা পর নারীর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করোনা। তিনবারের অধিক তাকালে মহাপাপের ভয় দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের দেখা মাফ হলেও, তার সন্তোষজনক জবাব থাকতে হবে। কেননা সবই তিনি মনিটরিং করছেন? ইসলাম নারী-পুরুষ দুজনকেই পর্দা করতে আদেশ করেছেন, তাদের চরিত্রের মানদন্ড ও সীমানা নির্ধারণ করেছেন।

সকল ক্লাসে সকল ধর্মের বই পড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। টিভির বিজ্ঞাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। যৌন উত্তেজক ছবি পরিহার করে, হাসি-কৌতুকের ছবিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়কে শালীন পোশাক পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। মসজিদে-মন্দিরে চরিত্র গঠন মূলক বক্তব্য ও স্কুলে এ বিষয়ে বিতর্ক প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করতে হবে। নাটক, কার্টুন ছবির মাধ্যমে চরিত্রবান মানুষের কি মর্যাদা ও সম্মান ইত্যাদি বিষয়ে নাটক তৈরী করে প্রচার করতে হবে। আমাদের দেশে ইংরেজী শব্দের প্রতি আকর্ষন ও সম্মান বেশী। অর্থ যত বেমানান হোক, বোধগম্য নাই হোক; ইংরেজীর মত হলেই নিজেকে সম্মানী ভাবে। মানুষ ইংরেজী লিলি নাম রাখে বাংলায় শাপলা রাখেনা, বিউট রাখে সুন্দরী রাখেনা, লোটাস রাখে পদ্ম রাখেনা। তাই বিদেশী শব্দ ‘ইভ টিজার’ বলে বখাটেদের সম্মান না দিয়ে যথার্থ বাংলা শব্দের প্রয়োগ করতে হবে। যে শব্দ শুনলে একজন মূর্খ মানুষের চামড়ায় যাতে আগুন জ্বলে, ঘৃণা তৈরী হয়। লম্পট, লূইচ্ছা, বখাটে শব্দ না হলেও প্রচলিত নতুন বাংলা শব্দ খোঁজে বের করতে হবে। তখনই আমরা একটি সুস্থ যুবক শ্রেনী তৈরী করতে পারব এবং আমাদের কোমলমতি তরুণীরা পথে-ঘাটে, ঘরে-বাহিরে উত্যক্ত হবেনা।

লেখক আমীরাত প্রবাসী।

মিডিয়ার উৎকট বিভাজন ও একটি মন্তব্য প্রতিবেদন


মিডিয়ার উৎকট বিভাজন ও একটি মন্তব্য প্রতিবেদন
সাকিব ফারহান

Bangladesh Media

বাংলাদেশ মিডিয়া



৩ নভেম্বর বুধবার নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার সংবাদ শিরোণামগুলো যথাক্রমে, ট্রানজিটে শুল্ক নেয়া সম্ভব নয়, জেলহত্যা দিবস আজ, ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে ফেরত আনা নিয়ে হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশ, খালেদা জিয়ার অফিসের সামনে হঠাৎ পুলিশ র‌্যাবের অবস্থান, সরকারের উচিৎ মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করা: খালেদা জিয়া, বিএনপি মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইতেই পারে: জাপা, মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইলে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনুন: আশরাফ, বাংলাদেশে আল্লাহর প্রতি আস্থার মূলনীতি বাতিল ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের বিচারের অপচেষ্টার উদ্বেগ।

ট্রানজিট নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে কোড করে পত্রিকাটি প্রধান শিরোণাম করেছে। ভিন্ন শিরোণামে খবরটি প্রধান শিরোণাম করেছে প্রথম আলো ও আমার দেশ। অন্যদিকে ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, সমকালে খবরটি দেয়া হয়েছে একেবারেই লো প্রোফাইল করে। নয়া দিগন্তের প্রথম পাতায় প্রকাশিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী এবং ইসলামি ব্যক্তিত্বদের বিচারের অপচেষ্টা শিরোণামে খবর দুটি অন্য কোনো পত্রিকার প্রথম পাতায় দেখা যায়নি।

প্রথম খবরটিতে নয়া দিগন্ত লিখেছে, ১৯৭৪ সালে ড. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খানের রিট আবেদনের ওপর দ্বিধাবিভক্ত আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। অন্য বিচারপতি সৈয়দ আবু কাওসার ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা সদস্যকে ছেড়ে দেয়া এবং তাদের ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করার কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুলনিশি জারি করেছেন। দুই বিচারপতি পৃথক রায় দেয়ায় প্রধান বিচারপতি এটিকে তৃতীয় বিচারপতির বেঞ্চে পাঠাবেন।

অন্য খবরটিতে নয়া দিগন্ত বলেছে, বিশ্বের ২১ টিরও বেশি দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ইসলামি ব্যক্তিত্বের প্রতিনিধিত্বকারি সংগঠন ইত্তেহাদুল ওলামার বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশে আল্লাহর প্রতি আস্থার মূলনীতি সংবলিত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল এবং শীর্ষ আলেম ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী নাম দিয়ে বিচারের অপচেষ্টায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্মেলনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য ইত্তেহাদুল ওলামার একটি টিম ঢাকা সফর করা এবং পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় ইত্তেহাদুল ওলামার এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দোহা সংবাদদাতার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি এ খবরটি প্রকাশ করেছে।

যুগান্তর এদিন প্রধান শিরোণাম করেছে ‘খালেদার গুলশান কার্যালয় র‌্যাব-পুলিশের ঘেরাও’। এটি অন্যান্য পত্রিকার এক কলাম সংবাদ। পত্রিকাটি আওয়ামীলীগের ধামাধরা বলেই পরিচিত কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী অবস্থানকে বেশি করে তুলে ধরছে। তার প্রমান অন্যান্য পত্রিকার এক কলাম সংবাদটিকে টেনে হিচড়ে ৫ কলাম করে প্রধান শিরোণাম করা। পত্রিকাটির আগের পলিসি ভারত তোষণে সেক্ষেত্রে কোন হেরফের হয়নি। ভারতকে বেপরোয়া সমর্থনদানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারকে ঘায়েল করা হচ্ছে পত্রিকাটির বর্তমান নীতি। চট্টগ্রামের মেয়রকে যুবলীগ অবরুদ্ধ করে রাখে। এখবরটিও তারা বেশ হাইলাইট করেছে।

খবরে প্রকাশ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মনজুর আলমকে তুচ্ছ কারণে লাঞ্ছিত করেছে স্থানীয় যুবলীগ। ঘটনার সূত্রপাত হয় সিটি করপোরেশন অবৈধ বিল বোর্ড উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। মঙ্গলবার দুপুরে সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় স্থাপিত ছয়টি বিল বোর্ড উচ্ছেদ করে। যারা আইনবিরোধী কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা। এর পরিবর্তে কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে উল্টো দেখা গেল অবৈধ কর্মকান্ডের হোতাদের তান্ডব। বিকেলে নগর যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন বাচ্চুর নেতৃত্বে চিটাগাং আউটডোর অ্যাডভার্টাইজিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নামক সংগঠনের নেতাকর্মী পরিচয়ে অর্ধশত যুবক সিটি করপোরেশন ভবনে গিয়ে তৃতীয় তলায় ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষে জোরপুর্বক ঢুকে পড়ে। তারা ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে তারা ম্যাজিস্ট্রেটের চেয়ার ছুড়ে ফেলে। তাৎক্ষনিক অপরাধ দমনে পুলিশি একশন দেখা গেল না। বরং যুবলীগ নামধারি সন্ত্রাসিরা স্বয়ং মেয়রকে লাঞ্ছিত করার জন্য নির্বিগ্নে এগিয়ে গেল। সরকারি দলের নেতাকর্মী হলে যত অপরাধই করা হোক না পার পাওয়া যায়। বিষয়টি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অপরাধ প্রবনতায় বরং উৎসাহিত করছে। এর পরিণাম অবশ্যই ভয়াবহ হবে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খুন খারাবি ও ইভটিজিং লাগামহীনভাবে বেড়ে চলার সাথে এর সংযোগ নেই এটা কেউ বলতে পারবে না। নিরাপরাধ নয়; অপরাধিদের বিরুদ্ধে পুলিশ সক্রিয় হোক এটা সবার প্রত্যাশা ।

এদিন প্রথম আলোর ২৫ নম্বর পাতায় ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা’ শিরোণামে একটি গোল টেবিল আয়োজনের ছবি ও বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখা যায়। অংশগ্রহণকারিদের বক্তব্য ব্যাপক বিস্তৃত করে দেয়া হয়। ২৫ নম্বর পৃষ্টার পর এটি ২৬ ও ২৭ নম্বর পৃষ্টাব্যাপী বিস্তৃত হয়। অংশগ্রহণকারিদের তালিকায় যুগান্তর এবং এবং কালের কণ্ঠ সংশ্লিষ্টদের কাউকে দেখা যায়নি। অংশগ্রহণকারিদের মধ্যে নয়া দিগন্তের সম্পাদকও ছিলেন। উল্লেখ্য প্রথম আলোর আলপিন ম্যাগাজিনে ইসলাম ধর্মের নবীকে কটাক্ষ করা হলে এর সমালোচনা করে নয়া দিগন্তে সরস একটি কলাম লিখেছিলেন আমার দেশের সম্পাদক বর্তমানে কারান্তরীন মাহমুদুর রহমান। বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি প্রথম আলো। যতটুকুর খবর পাওয়া যায় প্রথম আলো কোনো ব্যাপারে নয়া দিগন্তের সংস্পর্শে আসতে চায় না। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান ও যুগান্তরের কাউকে ওই অনুষ্ঠানে (সম্ভবত) দাওয়াত না করে নয়া দিগন্তের সম্পাদককে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যে তাৎপর্য রয়েছে। প্রথম আলো আহমদ আকবর সোবহানের যে আগ্রাসনের মুখে পড়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য গনমাধ্যমের সকল পক্ষকে নিজেদের পক্ষ নিতে চাইছে। যুগান্তরের মালিক নুরুল ইসলাম বাবুলকে দেখা যাচ্ছে আহমদ আকবর সোবহানের সঙ্গে গাটছাড়া বাধতে। এরমধ্যে বসুন্ধরা যুমনা যৌথভাবে জমি ব্যবসা শুরু করছে। পত্রিকা দুটি একটি যায়গায় দারুন মিল। উভয় পত্রিকাই ভারতীয় স্বার্থে একই ধরনের আচরন করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রশ্নে একটি অন্ধ সরকার সমর্থক অন্যটি বর্তমানে ঘোরতর সরকার সমালোচক। এর মধ্যে গুরুত্বপর্ণ মেসেজ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ওবামা ও তার দল ডেমক্রেটদের ভরাডুবি হয়েছে। খবরটি বাংলাদেশী পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। ইত্তেফাক, নয়া দিগন্ত, সমকাল, কালের কণ্ঠ এ খবরকে প্রধান শিরোণাম করেছে। প্রথম আলোর এক যুগপুর্তির কারণে নিজেদের খবরটি শীষ সংবাদ করেছে তবে দ্বিতীয় প্রধান শিরোণাম করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন।

ইত্তেফাক লিখেছে, মনে আশার আলো জাগিয়ে সাধারণ মানুষকে আশাহত করলে তার ফল কি হয় সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা। আমরা পরিবর্তনে বিশ্বাস করি, নতুন আমেরিকা গড়তে হলে পুরাতন জঞ্জাল সাফ করার বিকল্প নেই। এজন্য চাই ‘চেঞ্জ’। মার্কিনীরা ওবামার পেতে রাখা এই টোপ গিলেছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশটির জনগন তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছিল। কিন্তু যে পরিবর্তনের লোভ তাদের দেখানো হয়েছিল, তা আসেনি। পত্রিকাটি এর পরেই আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল তুলে ধরে। খবরের শুরুটা যেভাবে করেছে সেটাকে মন্তব্যই বলা যায়। একই সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচনেও একই ধরনের প্রচারনা চালিয়ে বর্তমান মহাজোট সরকার বিপুলভাবে জয়ী হয়। পত্রিকাটি আমেরিকায় ডেমক্রেটদের পরাজয়ে কারণকে হাইলাইট করলেও বাংলাদেশের মহাজোট সরকারের ব্যাপারে কিছু বলেনি। তবে এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে তারা যেনো পরোক্ষভাবে সরকারকে এ থেকে শিক্ষা নিতে বলছে। মনে হচ্ছে একই কারনে তারা খবরটি প্রধান শিরোণাম করেছে। এ নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত জনৈক হাসেম ক্লার্ক প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। এ খবরটি সব পত্রিকায় এসেছে।

প্রথম আলোর যুগপুর্তির দিন অবাক করে দিয়ে কালের কণ্ঠের সম্পাদক আবেদ খান নিজ পত্রিকায় একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন। সেখানে তিনি প্রথম আলোর পক্ষে কয়েকটি কথা বলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রথম আলো সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে এ ধরনের দায়বদ্ধতা প্রথম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি ইত্তেফাকসহ ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেকগুলো পত্রিকার নাম নেন যারা সংবাদমাধ্যম জগতে প্রভাবশালী হয়ে এ ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। মতিউর রহমানের সঙ্গে তার দীর্ঘ আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে বলে বার বার উল্লেখ করেন আবেদ খান। আহমদ আকবর সোবহানের পত্রিকায় এ ধরনের মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে তা অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে পত্রিকাটি যেখানে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে বার বার মতিউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা প্রমানের চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনের শেষে আবেদ খান একটি ইংরেজি উদ্বৃতি দেন। তার অর্থ করলে দাড়ায়, কেউ সেতুর বদলে প্রাচীর রচনা করে নিঃসঙ্গ হলে অভিযোগ করার অধিকারটিও সে হারায়।

বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?


বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?
মোহাম্মদ শাহজাহান

Published: 2010-10-23

ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক জ্যাম

Traffic JAM in Dhaka


বেশ ক’বছর আগের ঘটনা। ঢাকার রাস্তাঘাটের চালচিত্রের উপর একটি টিভি প্রতিবেদনের রিপোর্ট দেখছিলাম। রিপোর্টার জনৈক রিকশাওয়ালাকে তিনি কেন ট্রাফিক নিয়ম ভেঙ্গে বেপরোয়া গতিতে তার রিক্সা চালিয়ে নিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন করলে, রিক্সাওয়ালা মহোদয় বুক চিতিয়ে দুর্বিনীত ভংগীতে তাকে যে জবাবটি দিয়েছিলো, তার সে জবাবেরই অংশ উপরে উদ্বৃত এ লেখাটির শিরোনাম।

বাংলাদেশে কে নিয়ম মেনে চলে? একটি অতি স্বাভাবিক কিন্তু পীড়াদায়ক প্রশ্ন বটে। এক কথায় এর জবাব হতে পারে, না, কেউই এখানে নিয়ম মেনে চলেনা। কারণ নিয়ম ভাংগাটাই যেন এখন এখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো বিশদভাবে বললে বলতে হয়, নিয়ম কানুন যা আছে বাংলাদেশে সব কিতাব আছে, বাস্তবে ঐসব নিয়ম পালনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়ও পরিলক্ষিত হয়না।

রিক্সাচালকের উপরোক্ত বাক্যের মাধ্যমে আমাদের দেশের বর্তমান সমাজের একটি অতি সত্য কিন্তু তিক্ততম অবস্থার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। সোজা কথায় বলতে হয় সমাজের একেবারে উপরতলা হতে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নিয়মনীতি ভাংগার এ প্রতিযোগিতা চলছে, অবিরাম গতিতে। আর সেকারণেই একজন রিক্সাচালক হয়েও লোকটি অত্যন্ত নির্বিকার ও দৃঢ় ভংগীতে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছে। রিক্সাচালক হয়েও দেশের ভেঙ্গে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তার এ প্রতীতি জম্মেছে যে তার এমন অপ্রিয় সত্য ভাষন শুনে কেউ একথা বলবেনা, ‘বলে কি লোকটা, চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’। প্রকৃতপক্ষে তার এই অপ্রিয় সত্য ও বেপরোয়া মন্তব্যের মাঝেই প্রোথিত আছে, আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এবং ধ্বসে পড়া রাজনৈতিক অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় নিয়ম কেন ভাঙ্গা হয়, নিয়ম ভাঙ্গার সাহস কোথা থেকে আসে, তখন এর জবাবে বলা যায়, ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা, স্বার্থপরতা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ এবং লালসা চরিতার্থ করার বাসনা হতে, সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পরকাল ও সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়ডরের অভাবেই সাধারণতঃ মানুষ নিয়ম ভাংগে, নিয়ম ভেংগে অবৈধ উপায়ে অপরের স্বার্থের হানি ঘটিয়ে বিভিন্ন সুবিধাদি হাতিয়ে নেয়। ছোট ছোট নিয়ম বা আইন ভাংতে ভাংতে একদিন সে অতি বড় ক্রিমিনাল (গডফাদার) হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার ভয়ে কম্পমান থাকে এলাকার জনগন। সরকারের আইন কানুনের ভয়ের চাইতেও বেশী প্রভাবশালী ও ক্ষমতাময় প্রভাব বিস্তার করে এসব গডফাদারগন নিজ নিজ এলাকায়। এ মহাযজ্ঞে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে চলে আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক পটভূমি, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী-উপদেষ্টা কর্তৃক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্বন্ধে অসত্য ও বিরূপ মন্তব্য করে অন্যায়কারীদেরকে আস্কারা দেয়া, ভগ্নপ্রায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ইত্যাদি। আজ যারা সমাজের উচ্চাসনে বসে আছেন, অলংকৃত করে আছেন দেশের বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদ, অথবা বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি, তাঁরা কেউই (হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া) দেশের পবিত্র সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি ভাংগার ক্ষেত্রে অপর কারো থেকে পিছেয়ে নেই।

নিয়ম ভাংগার এ ম্যারাথন দৌড়ে সবাই চায় তার সামনের ব্যক্তিটিকে কিভাবে ল্যাং মেরে পিছিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে তার প্রতিবেশীকে টাকা পয়সায়, অর্থ-সম্পদে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে, দৈনন্দিন আদান প্রদানে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে এমন ক্ষমতাধর হওয়া যায় যে, সমাজের অন্য সবাইকে তার পেছনে জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর বোল বলিয়ে নিজেকে একজন কেউকেটা জাতীয় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। নিয়ম ভাংগার এই দৌড়ে তার দ্বারা সমাজে কি কি সব অনাচার ও অপরাধ ছড়াচ্ছে,বা দেশ ও জাতির জন্য তা কি ভয়াবহ পরিনাম ডেকে আনছে, তা সে ভাবতেও চায়না, বরং সত্যি কথা বলতে কি, দেশের চাইতেও সে এখানে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে। তার এই স্বার্থপর নীতি চরিতার্থ করার পথে সে যাকেই পাবে তাকেই কুচলে দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাঁধবেনা, হোক না সে আপন রক্ত সম্পর্কেরই কেউ, নিজের মায়ের পেটের ভাই, স্বামী (মহিলার ক্ষেত্রে), কিংবা স্বয়ং তার জম্মদাতা অথবা জম্মদাত্রী মা।

যারা শুধুমাত্র নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য, নিজের ভবিষ্যৎ আরাম আয়েশের পথ সুগম করার লক্ষ্যে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে, এবং অন্যদিকে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বে অবহেলা করে সরকার তথা দেশের জনগনের অর্থ এবং সম্পত্তির সীমাহীন অপচয় করে চলে, তারা কোনভাবেই রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের বড় বড় পদ দখল করে রাখার যোগ্য হতে পারেনা। বরং তাদের স্থান হওয়া উচিৎ পুরান ঢাকার লোহার গেট দেয়া লাল ইটের তৈরী বড় দালান। তাদের প্রথম অপরাধ, তারা জনগনের খেদমতের প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় বসে জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয়। তাদের দ্বিতীয় অপরাধ, তারা অসৎ উপায়ে দেশের খেটে খাওয়া জনগনের ট্যাক্সে গঠিত সরকারের তহবিল তসরূপ করে দেশকে আরো গরীব হবার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, এবং তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তারা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও অসৎ পন্থা অবলম্বন করেন বলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য সব কর্মচারীগনও অনিয়মের গলিঘুপচিতে চলতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তাদের বসদের পদাংক অনুসরণ করে গোটা সিস্টেম এর মধ্যেই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, এবং অসততার সয়লাব ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে দিয়ে, দেশের সার্বিক প্রশাসন ব্যবস্থাকে একেবারে পংগু করে ছাড়ে।

এটাতো একটি সহজ সরল বিষয় যে, কোন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা যদি নিজে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত হন, তবে ক্রমে ক্রমে তার অধীনস্থ সব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাই ঘুষ খাওয়াটাকে জায়েজ মনে করে নির্বিবাদে সে অপকর্মটিকে নিজেদের দৈনন্দিন অফিসিয়াল কর্মসূচীর একটি অংগ বানিয়ে নিবে। ঠিক যেমন একজন পিতা যদি নিজে নামাজী না হন তাহলে তার সন্তান সন্ততি কেউই নামাজী হতে পারেনা। দু’টি ক্ষেত্রেই পরবর্তীদের চাইতে পূর্ববর্তীদের পাপ দ্বিগুন হবে, কারণ প্রথমতঃ বড় হিসাবে তাদের দায়িত্ব ছিল অন্যায় অনিয়মকে প্রশ্রয় না দেয়া, কোথাও কোন অন্যায় ঘটতে দেখলে তা রোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া। তাতো তিনি করেনই নি, বরং উল্টো নিজেই অনিয়মের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছেন, এবং এভাবে তার অধীনস্থদেরও এর প্রতি আহবান করেছেন। ফলে তারাও তাকে অনুসরণ করেছে। ফলশ্রুতিতে নিজের পাপের বোঝা যেমন তাঁরা কাঁধে নিচ্ছেন তেমনি অপরের করা পাপেরও সমান অংশীদার হচ্ছেন। পবিত্র হাদিস শরীফেও আছে, মানুষের একাধারে করতে থাকা ছোট ছোট অন্যায় বা ভূলগুলোই ক্রমান্বয়ে তাকে বড় অন্যায়ের প্রতি টেনে নিয়ে যায়। আর তার দ্বারা সংঘটিত অন্যায় কাজ তার উত্তরসূরীদের মাঝে সংক্রমনে যেহেতু তারই অবদান বেশী, তাই পরবর্তিদের অন্যায় কর্মের পাপের বোঝা অন্যায়কারীর সাথে সাথে তাদের উপরও সমান ভাবে বর্তাবে।

রিক্সাওয়ালার উচ্চারিত সে কথাটুকুতে ফিরে যাই। একমাত্র ট্রাফিক নিয়মকানুন ভাংগার ক্ষেত্রেই যদি একটু তীক্ষ্ণ নজর দেয়া যায় তো দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নিয়ম ভাংগার ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতে নিয়েছে। দূর্নীতিতে বিশ্বসেরা হওয়ার রেকর্ড তো কাগজে কলমে বেশ কয়েকবারই হতভাগা এ দেশের কপালে জুটেছে। ৫/৬ বছর পুরনো এক সমীক্ষা মতে ঢাকা শহরে প্রায় চার লক্ষ রিকশার কোন বৈধ লাইসেন্সই নেই। এভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্যান্য যানবাহনেরও বহু সংখ্যকের বৈধ লাইসেন্স ও জরুরী কাগজপত্রে ভীষন ঘাটতি রয়েছে। কাগজপত্র থাকলেও সেসব কতটুকু খাঁটিঁ সে ব্যাপারটিও আবার বিবেচনার দাবী রাখে। অসহ্য ট্রাফিক জ্যামের কারণে বাসে করে মিরপুর হতে গুলিস্তানের দূরত্ব পাড়ি দিতে আপনার কম পক্ষে দেড় থেকে দু’ ঘন্টা সময় লাগবেই। অথচ জ্যামবিহীন রাস্তায় এ দূরত্ব অতিক্রম করতে আধা ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা নয়। আবার নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে এ দেড় দু’ ঘন্টা সময়ে একজন বাসযাত্রীকে কি কি ভোগান্তির সম্মূখীন হতে হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নীচে দেয়া গেলঃ

বাস, কার বা সি.এন.জি-গুলোর যথাস্থানে না দাঁড়িয়ে প্রায় সিকি কি.মি. জুড়ে এলোমেলোভাবে দাঁড়ানো, সি.এন.জি/ট্যাক্সি ক্যাবগুলো মিটার ব্যবহার না করা ও মিটারের চাইতে দ্বিগুন-তিনগুন ভাড়া হাঁকা, ট্রাফিক রুলের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গাড়ী চালানো, সামনের গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে মারাত্মক সব দুর্ঘটনার জম্ম দেয়া (কদিন আগের সাভারের আমিনবাজারের দুর্ঘটনাটি ছিল এ ওভারটেকেরই করুণ পরিণতি), নির্দিষ্ট স্টপেজে না দাঁড়িয়ে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, বিরতিহীন লেবেল এঁটে দিয়ে যাত্রীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে প্রায় সবক্ষেত্রেই সবিরাম গাড়ি চালানো, অফ-পিক আওয়ারে স্টপেজগুলোতে দু’মিনিটের বিরতিস্থলে দশ-পনের মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ানো, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বাস চালানো, পুরুষ যাত্রী কিংবা বাস চালক নির্বিশেষে মহিলা সীটের প্রতি কোন সম্মান না দেখিয়ে, নারী-পুরুষের ঠেলাঠেলিতে আর গাদাগাদিতে গাড়ীতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, কোন স্টপে যাত্রীদের অবতরন শেষ না হতেই গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দেয়া যাতে করে নারী ও শিশু যাত্রীরা অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়, মা-বোনদের হাত ধরে হেলপারদের অযথা টানাহেঁচড়া করার অশোভনীয় দৃশ্য।

আরো আছ। মটরযানের সাথে পাল্লা দিয়ে রিক্সাগুলোর মাঝরাস্তা বরাবর অথবা রাস্তার প্রায় সবটুকুই দখল করে চলাচল করা, যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরকেই দু’কথা শুনিয়ে দেয়া, কে কার আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সিগন্যালের মোড়ে চতুমূর্খী রিক্সা, বাস ও কারের জট পাকিয়ে দিয়ে ত্রাহি মধূসুদন অবস্থার সৃষ্টি, আর কতো বলবো? একবিংশ শতাব্দিতে এসেও ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে এখনো মান্ধাতা আমলেরই প্রতিনিধিত্ব করে চলছে, সে ব্যাপারটি দেখার ও যেন কেউ নেই। রাস্তাঘাটের হতদরিদ্র অবস্থার কথা এখানে আর বলছিনা, মনে হয় সময় এসেছে, নাগরিকদের নাগরিক সুবিধার অবর্তমানে সরকারকে ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করার জোর প্রচারণা চালানোর। সেদিন বেশী দূর নয়।

মহানগরীর রাজপথে চলাকালীন যাত্রীসাধারণের দূর্ভোগের একটি খন্ডচিত্র আমি আমার স্বল্পজ্ঞানের পরিধিতে সবার জন্য তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ফিরিস্তিখানা আর বেশী দীর্ঘ করে ট্রাফিকের যন্ত্রনায় এমনিতেই কাতর নগরবাসীর মনের জ্বালা আর বাড়াতে চাইনা। ‘কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে’, জনৈক রিক্সাচালকের এ উক্তির সূত্র ধরে আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের আরো কিছু অনিয়ম তথা নিয়ম ভাংগার ইতিকথা সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের সাথে সমভাবে ভাগাভাগি করে নেয়ার ইচ্ছা রেখে শেষ করছি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা


অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা

আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক
০০ জাকিরুল ইসলাম

মহামন্দার ধাক্কায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে ধরাশায়ী সেখানে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগাণ্ডায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার ২ শতাংশ যা তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়েও বেশি। চলতি এবং আগামী ২০১১ সালে এ হার আরো বেশি হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতি বিশেস্নষকরা। আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক। এমনকি ব্রাজিল, রাশিয়া, মেক্সিকো ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর চেয়েও বর্ধিত অংকের।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফ যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে তা হলো মাথাপিছু আয়। দেখা গেছে, আফ্রিকানদের মাথাপিছু গড় আয় ভারতীয়দের চেয়ে বেশি। আফ্রিকা ডজনখানেক দেশে জাতীয় মাথাপিছু গড় আয় চীনের চেয়েও বেশি। আরো আশ্চর্যের বিষয় আফ্রিকার দেশগুলোতে লোভনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেই তেল ও হীরার মতো কাঁচামালের বিকিকিনি। গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে জিডিপি অর্জিত হয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মূলে ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের পণ্য উৎপাদন এবং সেবাখাত।

গত বছর বিশ্বজুড়ে মহামন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছে এশিয়ার দুই দেশ চীন ও ভারত কিন্তু আফ্রিকার কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে অর্জিত হলেও তা থেকে গেছে সবার অগোচরে। দুনর্ীতির রাহুগ্রাস সত্ত্বেও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব আর তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। তাই কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সংশোধিত রিপোর্ট যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করার মতো। রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রেট লেকের পাশর্্ববতর্ী বিশেষ করে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় এমনকি হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার সৃঙ্গ) নামে পরিচিত খরাপীড়িত অঞ্চলে তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এদেশের অর্জিত প্রবৃদ্ধি এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ চীন ও ভারতকেও চমকে দিয়েছে।

আইএমএফ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী তাতে আফ্রিকার একশ কোটির মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতিমধ্যে পেঁৗছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। অবাক করার মতো বিষয়, মধ্য আয়ের শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এমন লোকের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক, ট্যাক্সিচালক, গৃহপরিচারিকা এমনকি রাস্তার ধারে অস্থায়ী অবকাঠামোতে বসে ব্যবসা করে এমন ক্ষুদে দোকানীর সংখ্যাও অনেক।

আফ্রিকা রাইজিং গ্রন্থের লেখক বিজয় মাজাবান তার ব্যাখ্যায় উলেস্নখ করেছেন, দুনর্ীতি ও অপশাসনের জন্য বদনাম থাকলেও তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আফ্রিকায় ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব। আর তার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। ফলে কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘আফ্রিকা ইনফ্রাস্টাকচার কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে আফ্রিকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশ। তাছাড়া এয়ারলাইন্স ও স্থলপথে পণ্য পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ার বাজারে ছাড়ায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে সংশিস্নষ্ট খাতগুলোতে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে চীনে এবং ভারতে। আরো একটি বিষয় উলেস্নখ্য ঐ সমীক্ষায় বলা হয়েছে বুরুন্ডি ও মালাউয়ে দক্ষ জনশক্তির বড়ই অভাব। তবে ঘানা, বোতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা ভিন্ন। উলিস্নখিত দেশ তিনটিতেই শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েকটি রিপোর্টে এ ব্যাপারে মিলেছে অভূতপূর্ব তথ্য। জানা গেছে, শুধু গত বছরই বিদেশে শিক্ষা সমাপনী শেষে নাইজেরিয়ায় ফিরেছে ১০ হাজার দক্ষ ভোক্তাজীবী। এঙ্গোলায় প্রতি বছর ফিরছে উলেস্নখযোগ্য দক্ষ পেশাজীবী, যারা দেশে ফিরে স্থানীয় শ্রমবাজারে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। এসব পারিপাশ্বর্িক অবস্থায় বিশ্বের কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভারতের পরই দক্ষ জনশক্তির অঞ্চল হবে আফ্রিকার দেশগুলো। যার পথ বেয়ে দ্রুতই আরো বিকশিত হবে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্টে বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে।

কেননা তার রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৯৫৪টি আফ্রিকান কোম্পানী অর্জিত মুনাফা গড়ে ১১ শতাংশ। একই সময়ে সমান সংখ্যক চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশীয় কোম্পানীর চেয়ে যা বেশি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এশিয়ার তুলনায় সহজলভ্য ও কম খরচে শ্রমিক নিয়োগ। এর মধ্যে আফ্রিকান মোবাইল অপারেটরদের মুনাফার হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে ইউনিলিভার, নেসলে ও সুইসপোর্ট ইন্টারন্যাশনালের মতো বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর মুনাফার পরিমাণও ঈর্ষণীয়। তাই ২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ কমে গেলেও আফ্রিকায় এ চিত্র উল্টো। ঐ বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে বরং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। অর্থের অংকে যা ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ১৯০ কোটি) ডলার। সর্বশেষ শিল্প ও বাণিজ্য বান্ধব আফ্রিকা দুনর্ীতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

মানসিক রোগীর সংখ্যা দেশে ১৬ শতাংশ : পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী


দেশে ১৬ শতাংশ লোক মানসিক রোগী ঢাবিতে গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে মানসিক রোগী

mental health in bangladesh

০০ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের ৬০ ভাগ লোক বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে ১৬ দশমিক ১ ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোক এবং ১৮ দশমিক ৩৫ ভাগ শিশু-কিশোর মানসিক রোগ ও সমস্যায় ভুগছে। এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য দেশে মাত্র ১২৩জন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন। এছাড়া, ৩২জন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও ১০১জন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রয়েছেন।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি (বিসিপিএস) এবং ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনব্যাপী গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব তথ্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরো বলেন, দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং এবং সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কের জন্য কোন প্রশিক্ষণ কোর্স নেই। বাংলাদেশে মানসিক রোগ বিষয়ে অজ্ঞতা ও কু-সংস্কার এবং মানসিক রোগীর প্রতি অবহেলা সর্বত্র বিদ্যমান। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে সর্বত্র সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো: গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো: জহির উদ্দিন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠন সম্ভব নয়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করে পরিবারের শান্তি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রত্যেক স্কুলে একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগের চিন্তা করছে।

ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাই সামাজিক সহিংসতা, দুর্নীতি, ইভটিজিং, প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এসব লোককে সুস্থ করে সুন্দর জাতি গঠন করা সম্ভব।

উলেস্নখ্য, দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় গোলটেবিল আলোচনা, কর্মশালা ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন মানসিক অবস্থা পরিমাপের সুযোগ রয়েছে।

দেশে মানসিক রোগী দেড় কোটি!

Sunday, 29 August 2010 সোলায়মান তুষার:

দেশে পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী। বিপুল সংখ্যক মানুষ সমস্যায় থাকলেও তাদের চিকিৎসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত একমাত্র হাসপাতালটি মানসিক রোগীর ভারে নতজানু। তাতেও নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কয়েকটি সংস্থার জরিপে দেশে পরিণত বয়সের এক কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন মানুষ মানসিক রোগে ভোগছেন।

এরমধ্যে গুরুতর অর্থাৎ একেবারে পাগল ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৮ জন। এছাড়া উদ্বেগজনক জটিলতায় ভোগছেন ৮৩ লাখ ৫ হাজার ৩৭০ জন। বিষণ্নতায় ভোগছেন ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৯ জন। মাদকাসক্ত পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাগুলো যৌথভাবে দেশের ১৮ বয়সের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষের ওপর জরিপ করে। জরিপ অনুযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ১৬.১ ভাগ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে উদ্বেগজনিত ৮.৪ ভাগ, বিষণ্নতায় ৪.৬ ভাগ, গুরুতর মানসিক সমস্যায় ১.১ ভাগ ও মাদকাসক্ত রোগে ভোগছেন ০.৬ ভাগ মানুষ।

জাতিসংঘের ২০০৯ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৯০ লাখ। উইকিপিডিয়ায় ‘ডেমোগ্রাফিক অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখা থেকে জানা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের লোকের সংখ্যা মোট নয় কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ চার কোটি ৭৮ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৪ জন। মহিলা চার কোটি ৫৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৪ জন। যা মোট জনসংখ্যার ৬১ ভাগ। আর ৬৫ বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ১৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। আর মহিলা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৫ জন। যা মোট জনসংখ্যার চার ভাগ। জন্মের পর থেকে ১৪ বছর বয়সের লোকজন মোট জনসংখ্যার ৩৪.৬ ভাগ। জরিপে এ সংখ্যা ধরা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ লোকের চিকিৎসার জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ রোগীর জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক কর্মরত। এরমধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত ১১৫ জন। যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০৭ ভাগ। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট রয়েছে একটি। তাতে ১৫০টি শয্যা রয়েছে। মানসিক হাসপাতাল রয়েছে একটি। তাতে পাঁচশ’ শয্যা রয়েছে। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মাত্র ০.৪ ভাগ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্তবিভাগ রয়েছে ৩১টি। তাতে ৮১৩টি শয্যা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভাগ রয়েছে একটি। তাতে ২০টি শয্যা রয়েছে। সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক রয়েছে দুটি। মাদকাসক্তি বিষয়ে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে চারটি ও বেসরকারি ১৬৪টি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারি ব্যয় স্বাস্থ্য বাজেটের ০.৪৪ ভাগ।

মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষ বিচিত্র ধরনের সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে ৪৪টি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। ১০ থেকে ১২টি সমস্যা গুরুতর। যেসব সমস্যা মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, এডজাস্টমেন্ট সমস্যা, সম্পর্কগত সমস্যা, অহেতুক ভয়, বিশ্বাসের অভাব, মনোযোগের সমস্যা, মনোগত সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মেহজাবিন হক বলেন, মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার পর যত্ন নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার দিক দিয়ে আমরা খুবই পিছিয়ে আছি। তিনি বলেন, সমপ্রতি যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তা একপ্রকার মানসিক রোগ থেকেই হয়েছে।

মানুষের বিকৃত রুচির দিকে প্রবণতা বাড়ছে। এটা একটা সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি তাতে কারও সুস্থ থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, আমাদের হাজারও রকম সমস্যা রয়েছে। এসবের সঙ্গে মানসিক সমস্যা যোগ দিয়ে আরও প্রবল আকার ধারণ করেছে। সমপ্রতি যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তাতে এটাই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র পরামর্শক সালেহ সিদ্দিকী বলেন, অনেক ধরনের রোগী রয়েছে। তিনি বলেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সমস্যা আরও বাড়ছে। মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হচ্ছে। এরফলে প্রায় প্রত্যেকের মধ্যে একপ্রকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি দেশে সমপ্রতি যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে তা মানসিক সমস্যার জন্যই।

বিশেষ প্রতিবেদন
দীর্ঘস্থায়ী রোগ মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে

দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, হূদরোগ বা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হলে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ একপর্যায়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুরারোগ্য বা প্রাণঘাতী জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের হতাশা দূর করার দায়িত্ব একাধারে চিকিৎসক, পরিবার ও সমাজের। কিন্তু দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতা ও ব্যবস্থা কোনোটিই নেই বললেই চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর বিশ্বের ৬০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ। সময়ের পরিবর্তনে জীবনাচরণসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশেও এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। রোগের গতিপ্রকৃতি, বিছানায় পড়ে থাকা, চিকিৎসার ব্যয়ভার, দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা—এসবের কথা ভেবে মানুষ শঙ্কিত বোধ করে। অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। গভীর হতাশা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিক রোগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, দেহ-মন এক সুতোয় বাঁধা বলেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগের সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। পরিবার ও সমাজের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অমনোযোগের কারণে শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য-জটিলতা চোখের আড়ালে থেকে যায়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটির উদ্ধৃতি দিয়ে মোহিত কামাল বলেন, এই অসচেতনতা ও অমনোযোগের কারণে আগামী ১০ বছরে বিশ্বে ৩৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে অসহায়ভাবে। এর বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোয়।

হূদরোগের আতঙ্ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হূদরোগ বিশেষজ্ঞ সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের (হূদযন্ত্রে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়া) পর অনেক মানুষ ভয় পায়। অনেকে মনে করেন, “আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছি। যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব না।” আসে হতাশা। এগুলো সাধারণ প্রবণতা।’

তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পর ৭০ শতাংশ রোগীই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পরামর্শ দিয়ে সজল ব্যানার্জি বলেন, এসব রোগীকে জীবনের আলো দেখানোই চিকিৎসকের দায়িত্ব। হূদরোগ চিকিৎসার পাশাপাশি হতাশা কমানো চিকিৎসারই অংশ। তিনি বলেন, ‘আমি আমার রোগীদের বলি, “এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার যে আপনি বেঁচে আছেন। তবে আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমার পরামর্শ মেনে চললে নতুন জীবন ফিরে পাবেন।”

সজল ব্যানার্জি জানান, রোগী ও তাঁর পরিবারের লোকদের সঙ্গে পরামর্শ (কাউন্সেলিং) করা দরকার। সময় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, সমস্যা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। এই কথা বলা চিকিৎসারই অংশ।

এ বিশেষজ্ঞ জানান, একটি ক্ষুদ্র অংশের হতাশা এতটাই গভীর হয় যে তাদের মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীর দেখেন হূদরোগ চিকিৎসক আর মনের চিকিৎসা করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

যন্ত্রণা থেকে হতাশা: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আলী হোসেন বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগেন। ওষুধে অনেক সময় সেই যন্ত্রণার উপশম হয় না। ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা সবকিছুর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন রোগী। আসে হতাশা।

আলী হোসেন বলেন, রোগীর সমস্যা যেন পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, সেই উদ্যোগ চিকিৎসককেই নিতে হয়। তিনি দুটি উদাহরণ দেন। অনেকের পরীক্ষার আগে হাঁপানি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভয় দূর করার দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে। অনেক বয়স্ক মানুষের ক্রনিক ব্রংকাইটিস আছে। শীতের সময় তা বাড়ে। অনেক সময় মানসিক কারণেও রোগটি বেড়ে যায়। সুতরাং পরিবারের এখানেও দায়িত্ব নেওয়ার আছে।

দীর্ঘদিন থেকে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা করছেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, এমডিআর যক্ষ্মায় (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট—বহু ওষুধ প্রতিরোধী) আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। নিয়মিত ১৮ থেকে ২৪ মাস ওষুধ খেতে হয়। ওষুধের খরচ, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাতায়াত রোগী এবং পরিবারকে হতাশ করে তোলে। আলী হোসেন বলেন, এসব রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসক ও সমাজের দায়িত্ব। শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে মানুষ সুস্থ হয় না। মানসিক সহায়তা বড় দরকার। প্রয়োজনে রোগীকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে।

সমাজের মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলী হোসেন আরও বলেন, সমাজেরও প্রস্তুত হওয়ার দরকার আছে। কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে গেলে অনেকেই তাঁকে মানসিক রোগী বা ‘পাগল’ ভাবতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থূলতা থেকেও বিষণ্নতা: বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত মোটা মানুষ কোনো কাজ ঠিকমতো, সময়মতো করতে পারে না। কাজের মান ঠিক থাকে না। মোটা মানুষ এ জন্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন। এসব কারণে অনেকে সমাজ ও পরিবারের কাছে নিজেকে অপাঙেক্তয় মনে করে। একসময় তারা হতাশ হয়ে পড়ে।

খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ঘামের কারণে অতিরিক্ত স্থূল মানুষের শরীরের অনেক স্থানে ঘা বা চর্মরোগ হয়। সহজে তা ভালো হয় না। ডায়াবেটিস রোগীদের বারবার প্রস্রাব করতে হয়। অনেকের রাতে ভালো ঘুম হয় না। এ থেকেও হতাশা জন্মে।

এ দেশে স্থূলতা বিষয়ে পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তবে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থূলতায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, স্থূলতার জন্য কাজ করতে না পারা মানুষ শুধু খায় আর ঘুমায়। এতে তাদের খাওয়া বেড়ে যায়। একসময় তারা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

মোটা মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দিন জানান, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে।

মোহিত কামাল বলেন, প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে একজন বিষণ্নতায় ভোগে। বিষণ্নতার কারণে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে ৩০ শতাংশ। আবার ডায়াবেটিসের সঙ্গে বিষণ্নতা যুক্ত হলে চিকিৎসা-খরচ বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ।

এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্লিনিক ও হাসপাতালে কাউন্সেলিংয়ের আয়োজন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য শেয়ার বাজার Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market