তৈরি পোশাক খাত:শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা:বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনছে চীনা উদ্যোক্তারা:রেমিট্যান্সপ্রবাহে বিশাল ধস নেমেছে


তৈরি পোশাক খাত
শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা
বদরুল আলম

দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প সচল রেখেছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তবে শিল্পমালিকরা বলছেন, এ খাতে শ্রমিক প্রয়োজন ৫০ লাখ। এ হিসাবে এখনই ১০ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যেই ঘটছে তাজরীন ফ্যাশনসের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, যা কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলছে শ্রমিকদের। এর ওপর আছে মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের শ্রমিকসংকটে পড়তে যাচ্ছে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার এনে দেয়া খাতটি।
শ্রমিকসংকটের কথা স্বীকার করছেন খাতসংশ্লিষ্টরাও। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি ফারুক হাসান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামনের দিনগুলোয় ভয়াবহ শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা করছি আমরা। এর মূল কারণ, শ্রমিকরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ আস্থার সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হবেই।’

জানা যায়, তৈরি পোশাকের মূল সরবরাহকারী চীন তাদের অবস্থান থেকে ক্রমেই ছিটকে যাচ্ছে। দেশটিতে শ্রমের মজুরি বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। কয়েক বছর আগে চীন বিশ্বের মোট চাহিদার ৪২ শতাংশ তৈরি পোশাক সরবরাহ করলেও এখন তা ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতেও শ্রমের মজুরি প্রতি বছরই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে এ খাতে নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করার। তবে মজুরি ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশের অভাবে এ সুযোগ কাজে লাগানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
Bangladesh fire victims want old jobs back

Bangladesh fire victims want old jobs back

খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি মাসে ১৫-২০ শতাংশ শ্রমিক পোশাক কারখানা ছেড়ে যাচ্ছেন। তিন বছর আগেও এ হার ছিল ৫-১০ শতাংশ। কৃষিকাজে উপার্জনের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামে ফিরে যেতে চাইছেন অনেকেই। দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা হিসাবে একজন কৃষি শ্রমিক মাসে ৯-১০ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত এ হারে আয় করতে পারবেন তারা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে অনেক কারখানা আছে, যেগুলোর শ্রমিকরা এখন মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে বাধ্য হয়েই কারখানাগুলোকে সারা বছরই শ্রমিক নিয়োগে চেষ্টা চালাতে হচ্ছে। ঢাকাসহ আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কারখানায়ই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে।

শ্রমিকদের মধ্যে পোশাক কারখানা ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা। এর সর্বশেষ উদাহরণ আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। এ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার পর আতঙ্কিত শ্রমিকদের অনেকেই এখন এ পেশা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছেন। সংগঠনগুলো তাজরীনের পাশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেও তাতে সাড়া মিলছে না।

তাজরীন ফ্যাশনসের অপারেটর শামসুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ কারখানায় আর কাজ করব না। অন্য কারখানায়ও যেতে চাই না। বেশির ভাগ কারখানার পরিবেশই প্রায় একই রকম। তাই কাজ পেলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে না।’

শ্রম পরিবেশ নিয়ে শ্রমিকদের অভিযোগগুলোর সত্যতা মেলে পোশাক খাত নিয়ে করা সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, পোশাক খাতের শ্রমিকপর্যায়ের ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ চাকরিই অস্থায়ী। ৮০ শতাংশ কারখানার প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই। ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ কারখানায় চিকিত্সা সুবিধা নেই। পরিবহন সুবিধা দেয় না, এমন কারখানার হার ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ।

অবশ্য শ্রমিক প্রতিনিধিরা এ সংকট সাময়িক বলে ধারণা করছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি শিরিন আখতার বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। সাময়িকভাবে এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকসংকট সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদি যা-ই হোক, এ খাতের সার্বিক কর্মপরিবেশ উন্নয়নে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ এ খাতের মূল আকর্ষণই হচ্ছে শ্রমের সস্তা মজুরি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা খাত পরিবর্তনে বাধ্য হবেন কি না, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ ও সময়সাপেক্ষ। তবে এটাও ঠিক, তাদের হাতে খুব বেশি বিকল্পও নেই।

পোশাকশিল্প খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী, যারা শহরে এসে একসময় বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। এ পেশা ছেড়ে তারা আর আগের পেশায় ফিরে যেতে চাইবেন না। আবার গ্রামে কৃষিকাজের সুযোগ থাকলেও কায়িক শ্রম বেশি হওয়ায় পুরুষরা তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে— দেশের বাইরে চলে যাওয়া। কিন্তু সেখানেও রয়েছে নিরাপত্তার অভাব। কাজেই এ মুহূর্তে পোশাক কারখানাগুলোর উচিত কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশাল এ কর্মী বাহিনীকে ধরে রাখা।

বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনছে চীনা উদ্যোক্তারা
পোশাক শিল্পে সস্তা শ্রমের সুযোগ
সাইদুল ইসলাম

সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে পোশাক শিল্প কারখানা সরিয়ে আনছে বিশ্ব অর্থনীতির বৃহত্ শক্তি চীন। চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে গার্মেন্টস তৈরি করে তা নিজেদের দেশের ভোক্তাদের জন্য রপ্তানিও করছে। বর্তমানে দেশে চীনা পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও চীনের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য কম দামে পোশাক রপ্তানি করছে। জানা গেছে, চীনের স্থানীয় খোলাবাজারে সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রি প্রতিষ্ঠান ভ্যানসেল ইতিমধ্যে কিছু প্যান্ট এবং শার্টের অর্ডার বাংলাদেশকে দিয়েছে। এছাড়া পশ্চিমা ক্রেতা ওশান এবং এইচ এন্ড এম চীনা বাজারে পোশাক সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কাজ করাচ্ছে।

বর্তমানে একজন চীনা শ্রমিকের সর্বোচ্চ বেতন প্রতিমাসে চারশ থেকে পাঁচশ মার্কিন ডলার। আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ বেতন ৭০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার। চীনা বিনিয়োগকারীদের মতে, এ পরিমাণ বেতন দিয়ে অনেক সময় কারখানা চালাতে গিয়ে উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যায়। রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক সময় পুষিয়ে উঠা সম্ভব হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে কম মূল্যে পোশাক রপ্তানি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনের সবচেয়ে বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত।

চীনের বন্দর শহর নিনগোতে একটি গার্মেন্টস কারখানা চালান সেখানকার নাগরিক রোজা দাদা। দৈনিক ইত্তেফাককে তিনি বলেছেন, চীনে কারখানা চালানো এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে। গত দু’ বছরে শ্রমিকদের বেতন যে হারে বেড়েছে তাতে বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনা ছাড়া কোন উপায় ছিলো না। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান ফোর সিজন ফ্যাশনের জন্য কাজ করেন। রোজা দাদা আরো বলেন, তিনি শুধু পণ্য ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির জন্য ঢাকায় অফিস খোলেননি। তিনি চীনে পোশাক রপ্তানির বিষয়টিও তদারকি করছেন। চীনা উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস আমদানি করলে তাদের খরচ চীন থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম পড়ে।

বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, তারা ৯০ শতাংশ গার্মেন্টস পণ্য যেমন টি-শার্ট, জিন্স এবং স্যুয়েটারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পায়। তাদের মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকলে চীনে রপ্তানি আরো বাড়বে। কয়েক বছর আগে চীনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দুই কোটি মার্কিন ডলারের মতো থাকলেও বর্তমানে তা ১৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এ রপ্তানি ৫০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করছেন।

তবে চীনা উদ্যোক্তাদের কারখানা সরিয়ে আনার খবরে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা কিছুটা শংকিত। একজন রপ্তানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেছেন, চীনা উদ্যোক্তারা এখানে ছোট একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এর আদলে তারা বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্ডার নিয়ে আসে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করিয়ে নিয়ে তারা পুরো মুনাফা নিজেদের পকেটে পুরছে। এছাড়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দরকারি কাঁচামাল তাদের নিজ দেশ থেকে আমদানি করার কারণে বাংলাদেশের পশ্চাত্সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মত দেন তিনি।

নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৯৮ মিলিয়ন ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক
রেমিট্যান্সপ্রবাহে যে ইতিবাচক ধারা শুরু হয়েছিল তাতে বিশাল ধস নেমেছে। গত অক্টোবরের চেয়ে ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার কম রেমিট্যান্স এসেছে নভেম্বরে। এমনকি চলতি অর্থবছরের যেকোনো মাসের চেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে নভেম্বরে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ডলার। অক্টোবরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৫৩ মিলিয়ন, সেপ্টেম্বর ও আগস্টে ছিল ১ হাজার ১৭৮ মিলিয়ন এবং জুলাইয়ে ছিল ১ হাজার ২০১ মিলিয়ন ডলার।

নভেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার। অক্টোবরে আসে ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে নভেম্বরে এসেছে ৩০৬ মিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে আসে ৩৯৮ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ৭১৭ মিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে যার পরিমাণ ছিল ৯৬৯ মিলিয়ন ডলার।

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ব্যাংকাররা জানান, দুই ঈদের কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছিল। এখন জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সপ্রবাহে।
Sources: http://www.bonikbarta.com/?view=details&pub_no=162&menu_id=1&news_id=20414&news_type_id=1
http://www.bonikbarta.com/?view=details&pub_no=162&menu_id=11&news_id=20411&news_type_id=1

দোয়েল’ ল্যাপটপ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে কল্পকাহিনীকে হার মানানো লুটপাট


ক্রাইমবাতৃা রিপোট:

সরকারি কোম্পানির দোয়েল ল্যাপটপ উৎপাদনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে কল্পকাহিনীকে হার মানানো লুটপাট হয়েছে। হাজার ডলারের যন্ত্রপাতির মূল্য লাখ ডলার দেখিয়ে আমদানি করা হয়েছে। সে কারণে দেড় লাখ ডলারের পণ্যের মূল্য দেখানো হয় ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৪০ ডলার। ৩০০ শতাংশ বেশি মূল্য দেখিয়ে আমদানি করা অর্থের ভাগবাটোয়ারা হয়েছে মালয়েশিয়ার পেনাং এবং নিউইয়র্কে। পেনাংয়ে এইচএসবিসি ব্যাংক এবং নিউইয়র্কের টিডি ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্টে পৌনে চার লাখ ডলার লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে, যার পুরোটাই ঘুষ হিসেবে দিয়েছে দোয়েল ল্যাপটপের তখনকার মালয়েশিয়ান অংশীদার টিএফটি টেকনোলজি গ্রুপ। উপরি আয়ের একটি বড় অংশ তখনকার টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুও পেয়েছেন বলে সমকালকে নিশ্চিত করেছেন টিএফটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ওয়াং।সূত্র সমকাল।

তবে রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু অস্বীকার করেছেন এমন অভিযোগ; বরং টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তার নামে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে উল্টো অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা বললেও পরে আবার অনুরোধ করেছেন এ বিষয়ে কিছু না লেখার জন্য। তবে টেশিসের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ল্যাপটপ উৎপাদনে লুটপাট হয়েছে। বিষয়টি অনেক পরে ধরতে পেরেছেন তারা। সমকাল নিশ্চিত হয়েছে, মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এইচএসবিসি ব্যাংকে (হিসাব নম্বর ৩৭১২৭১৭৪৩৭১০) মোহাম্মদ ইকবালের নামে দুই লাখ ৯৯ হাজার ডলার জমা করে টিএফটি। গত বছরের ১১ জুলাই এই ডলার জমা করা হয়। এ-সংক্রান্ত টিটির (টেলিফোন ট্রানজেকশন) একটি কপি সমকালের হাতে রয়েছে। একইভাবে নিউইয়র্কের টিডি ব্যাংকে সুইফট কোড পদ্ধতিতে (হিসাব নম্বর ০৩১১০১২৬৬) জমা করা হয় আরও ৭৫ হাজার ডলার। এই টাকা জমা হয় চৌধুরী অ্যাসোসিয়েটসের নামে। পৌনে চার লাখ ডলার দেওয়ার পর সেটি অবহিত করে একটি চিঠিও মোহাম্মদ ইকবালের ঢাকার অফিসে পাঠান মাইকেল ওয়াং। চিঠিতে মোহাম্মদ ইকবালকে ঢাকার মিলেনিয়াম হোল্ডিং লিমিটেডের এমডি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে গত এক সপ্তাহে কয়েকবার রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেল (শেরাটন) কমপ্লেক্সে মিলেনিয়াম হোল্ডিং লিমিটেডের অফিসে গিয়েও মোহাম্মদ ইকবালের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। তার অফিস থেকে প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বর রেখে দিয়ে যোগাযোগ করা হবে বললেও কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ইকবালের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাইকেল ওয়াং পরিষ্কার করে বলেছেন, টাকার ভাগ মন্ত্রী (রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু), অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন পেয়েছেন। তার কয়েকটি ই-মেইলে তিনি বলেন, ল্যাপটপ উৎপাদনের জন্য নতুন করে গঠিত হওয়া কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নাজিব হাসানকে পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন কীভাবে আমদানি করা যন্ত্রাংশের দাম বাড়াতে হবে। রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই হিসেবে ওই কোম্পানির দায়িত্ব পান নাজিব। বেশ কিছুদিন আগে এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলেও বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন।

বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে মাইকেল ওয়াং এসব তথ্য সরকারকে অবহিত করেন। পরে একপর্যায়ে লুটপাটের বিষয় তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফাইল পাঠানোরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল টেশিস কর্তৃপক্ষ। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর টেশিসের বোর্ড মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয় এমডি মোহাম্মদ ইসমাইলকে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বোর্ডে এমন সিদ্ধান্তের কারণেই মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে তদবির করে ল্যাপটপ প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেন ইসমাইলকে। আবার পরের বৈঠকেই সিদ্ধান্ত বদলের সঙ্গে সঙ্গে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয় দুদকবিষয়ক অংশ।

এর আগে গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বর থেকে দুর্নীতির খবর যখন বেরোতে থাকে, তখন থেকেই মোহাম্মদ ইসমাইলকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন মন্ত্রী। একই সময়ে ল্যাপটপ প্রকল্পের এসব দুর্নীতির অবৈধ অর্থ লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সমকাল। এর মধ্যে ঢাকায় বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ডও সমকালে রয়েছে। তা ছাড়া মাইকেল ওয়াংয়ের সঙ্গে এক বছর ধরে ই-মেইল লেনদেনের মাধ্যমে পাওয়া গেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এসব ই-মেইলে ওয়াং জানান, তিনি নিজে একাধিক বাংলাদেশির অ্যাকাউন্টে মন্ত্রীর জন্য ডলার জমা করেছেন। তা ছাড়া সারওয়ান্ত সিং (ভারতীয় নাগরিক) নামে অন্য এক ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও তাকে ডলার দিতে হয়েছে। তার বক্তব্যে তিনি আজিজ রহমান নামেও এক ব্যক্তির কথা বলেন। অনুসন্ধানে আরও অনেকেই লেনদেনের সঙ্গে আজিজ রহমানের নাম বলেন; কিন্তু তার পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ল্যাপটপে দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন রফিকুল ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি টেশিস বোর্ডের সদস্য। তিনি বলেন, ওয়াংয়ের অভিযোগ সত্য হতেও পারে। তবে এর সঙ্গে নিজের ও মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, প্রকল্প পরিকল্পনার সময়ই সমস্যা ছিল। ১০ লাখ ডলারের প্রকল্প ব্যয় ১৮ লাখ ডলার ধরা হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ওয়াং নিজে দুর্নীতিবাজ। তাকেই তো আগে ধরা উচিত। লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইকবালকে যে টাকা দেওয়া হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সে তো তাদেরই লোক।

এর আগে দেশে প্রথমবারের মতো ল্যাপটপ সংযোজনের জন্য মালয়েশিয়ার টিএফটি ও বাংলাদেশের ২এম করপোরেশন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টিএসএস) সঙ্গে ২০১০ সালের মে মাসে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এ বিষয়ে চুক্তি করে তিন পক্ষ। চুক্তিতে অবকাঠামোর জন্য টেশিস পায় ৩০ শতাংশের মালিকানা। বাকি বিনিয়োগের জন্য ৭০ শতাংশ পায় অপর দুই কোম্পানি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরোলেও কোনো বিনিয়োগ করছিল না টিএফটি ও ২এম করপোরেশন। ওয়াং জানান, এটিই ছিল তাদের কৌশল। একপর্যায়ে অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়ায় সরকারের অপর কোম্পানি বিটিসিএল থেকে ২৫ কোটি টাকা ধার নেয়। এই টাকা নিয়েই ভাগবাটোয়ারা শুরু হয়ে যায় ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে।

এর আগে স্বল্প মূল্যের যন্ত্রপাতি বেশি দামে এবং সংশ্লিষ্ট নয়, এমন যন্ত্রপাতি গছানো হচ্ছে ধরতে পেরে টিএফটির দাবি করা বেশ কিছু টাকা আটকে দেয় টেশিস। তাদের ১০ লাখ ছয় হাজার ডলারের বিপরীতে ততক্ষণে দেওয়া হয়েছে ছয় লাখ ২০ হাজার ডলার। টিএফটির তখন আরও তিন লাখ ৮৫ হাজার ডলার পাওনা। টিএফটি জানায়, তারা যে ছয় লাখ ২০ হাজার ডলার পেয়েছে, তার মধ্যে পৌনে চার লাখ ডলার ঘুষ দিতে গিয়ে তাদের লোকসানে পড়তে হয়েছে। বাকি টাকা পেতে তারা দফায় দফায় টেশিসে ধরনা দেয়। একপর্যায়ে বাকি থাকা তিন লাখ ৮৫ হাজার ডলার থেকে মাত্র ৪০ হাজার ডলার পেলেই দাবি ছেড়ে দেওয়া এবং পরে এই টাকা পেতেই মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। বিষয়টির রফা করতে ঢাকা থেকে কয়েক দফা মালয়েশিয়ায় টেশিসের কর্মকর্তারাও যাতায়াত করেন।

গত জুলাই মাসে এই প্রতিবেদক মালয়েশিয়ায় গেলে মাইকেল ওয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানেও কয়েক দফা তার সঙ্গে আলাপ হয়। এ সময় তিনি বলেন, যে পৌনে চার লাখ ডলার তিনি দিয়েছেন, তার বড় অংশ মন্ত্রীর (রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু) পকেটেই গেছে। এ সময় তিনি অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মন্ত্রীর সখ্যের বিষয়টি তুলে ধরেন। লোপাটের পুরো আয়োজন তিনিই সম্পন্ন করেছেন বলে জানান ওয়াং। একই কারণে টেশিস এবং টিএফটি মিলে আলাদা যে কোম্পানি গঠিত হয়, সেখানে মন্ত্রীর কোনো অবস্থান না থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকে মন্ত্রীর থাকার বিষয়গুলো নিশ্চিত করেন রফিকুল ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম বলেন, বললেই তো হবে না যে মন্ত্রী ভাগ পেয়েছেন। মন্ত্রীর সঙ্গে তো ওয়াংয়ের কখনও দেখাও হয়নি; বরং তখনকার এমডি (মোহাম্মদ ইসমাইল) ভাগ পেতে পারেন। তাদের মধ্যে লেনদেন নিয়ে ঝগড়া শুরু হলেই বিষয়টি অন্যদের নজরে আসে।

টেশিসের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিএফটি-২এম মিলে ১০ লাখ ছয় হাজারের কিছু বেশি ডলারের যন্ত্রপাতি মালয়েশিয়া থেকে আনে বলে হিসাবে দেখানো হয়। পরে একপর্যায়ে টিএফটির সিইও ই-মেইলে টেশিসের কয়েকজনকে জানান, কাগজে-কলমে অন্তত ৩০০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি করে যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি করা হয়। টেশিসের এক কর্মকর্তা জানান, কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেন, যেসব যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে, ল্যাপটপ উৎপাদনে তা কোনো কাজেই লাগছে না। তখন এসব যন্ত্রপাতির ওপর গুণগত মান যাচাই করার জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে জরিপ করানো হয়। সেখানে দেখা যায়, ল্যাপটপ প্রকল্পের নামে মূলত এলসিডি টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া যন্ত্রপাতির মধ্যে টেবিল-চেয়ারও ধরা হয়েছে। সেসব যন্ত্রপাতির অধিকাংশই এখন টেশিসে স্ক্রাপ হিসেবে পড়ে আছে।

চতুরতার এই তথ্য বেরিয়ে আসার পরেই বাকি পাওনা আটকে দেয় টেশিসের তখনকার এমডি। সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিষয়গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে গত বছরের ২৯ আগস্ট মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে ল্যাপটপ প্রকল্প থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় তাদের বের করা হবে, সেটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ১৪ মাসেও কেন সব ঠিক হয়নি_ এ প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি।

লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, মোহাম্মদ ইকবালকে তিনি চেনেন না। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেনও না; বরং তিনি মোহাম্মদ ইসমাইলকে পুরো বিষয়ের জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, ইসমাইল কিছু করে গিয়ে থাকতে পারে। এসব অপপ্রচার সে-ই ছড়াচ্ছে।

মালয়েশিয়ান কোম্পানিকে ল্যাপটপ উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে বের করে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২এম এবং টিএফটি টাকা দেয় না। সে কারণে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে। টাকা দেবে না আর তাদের কেন অহেতুক কোম্পানি বয়ে বেড়াবে?

মন্ত্রীর এ বক্তব্যের উত্তরে ওয়াং বলেন, শুরুতে থাকলেও পরে হিসাব বুঝে নেওয়ার পর ইকবাল মোহাম্মদ ২এম কোম্পানি থেকে সরে পড়েছেন। এখন তার ছেলেমেয়েরা কোম্পানি চালায়।

দুদকে তদন্তের সিদ্ধান্ত বাতিল :পুরো ঘটনা কয়েক দফা ই-মেইলে মাইকেল ওয়াং টেশিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ ডিসেম্বর বৈঠকে বিষয়গুলো তদন্তের জন্য দুদকেও পাঠানোর প্রস্তাব গ্রহণ করে টেশিস বোর্ড। পরের বৈঠকে কার্যবিবরণী অনুমোদন করার সময় দুদকের তদন্তের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়; বরং নতুন এমডি সেখানে কয়েকটি লাইন লাল কালি দিয়ে কেটে দিয়ে দুদকে তদন্তের আগে নিজেরা তদন্ত করার কথা লেখেন। অবশ্য সেই তদন্ত কমিটি এখনও গঠিত হয়নি এবং কোনো তদন্তও হয়নি।

টিএফটিকে উকিল নোটিশ :কার্যত বাদ দেওয়া হলেও যেহেতু সরকারের নিবন্ধিত কোম্পানি ছিল টিএসএস-টিএফটি ২এম করপোরেশন, সে কারণেই চাইলেই টিএফটিকে বাদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সমঝোতাপূর্ণ (অ্যামিক্যাবল) সেটেলমেন্টে যেতে চাইছে টেশিস। রফিকুল ইসলামও বলছেন, এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।