যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন


যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন
২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র আধিপত্য
চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেল গুগল

—————————————————-

যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিয়েলসেনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ছিলেন ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে অ্যান্ড্রয়েডচালিত স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। খবর টেকক্রাঞ্চের।

নিয়েলসেনের জরিপে আরও জানা যায়, দেশটির ভোক্তাদের মধ্যে অ্যাপল আইফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন ৩২ শতাংশ। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যক্তি স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন। সে বিচারে ২০১২ সালের মার্চে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন শতাংশ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কতজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন তা-ও বের করেছে নিয়েলসেন।

সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এশিয়ান আমেরিকানরা সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে দশমিক ৩ শতাংশ স্মার্টফোনকে তাদের মূল সেলফোন হিসেবে ব্যবহার করেন। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হিস্পানিকদের সংখ্যা ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। নারীদের মধ্যে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ আর পুরুষদের মধ্যে ৫০ দশমিক ১ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ সবচেয়ে এগিয়ে আছে। ২৫-৩৪ বছর বয়সী তিনজন ব্যক্তির দুজনই স্মার্টফোন ব্যবহার করেন।

২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম
২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম ২০২০ সালে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটারের মাধ্যমে লেনদেন করবে বেশির ভাগ মানুষ। নগদ অর্থ ও ক্রেডিট কার্ড দুটোই তখন দুর্লভ বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। গত মঙ্গলবার পিউ রিসার্চের একটি জরিপ থেকে জানা গেছে এ তথ্য। খবর এএফপির।

ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটার যে ভবিষ্যতে জনপ্রিয় হবে, তা তথ্যপ্রযুক্তির স্টেকহোল্ডার ও সমালোচকদের ৬৫ শতাংশই স্বীকার করেছেন। পিউ রিসার্চ ও ইলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমাজিনিং দি ইন্টারনেট সেন্টার ডিজিটাল ওয়ালেটসংক্রান্ত জরিপটি চালিয়েছিল। ১ হাজার ২১ জন এ জরিপে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের বেশির ভাগের মতে, নিরাপত্তা এবং সুবিধা দুটোই পাওয়া যায় বলে মানুষ এখন অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।


যারা স্মার্টফোনকে আগামীর ওয়ালেট হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তাদের অনেকেই ভেবেছিলেন, বিষয়টি এত জনপ্রিয় হবে না। নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হবার আশঙ্কা, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং বর্তমান ব্যবস্থায় লাভজনক ব্যবসা বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবাদের আশঙ্কা এর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হলেও নগদ অর্থ এবং ক্রেডিট কার্ড যে একেবারেই হারিয়ে যাবে না সেটাও পিউয়ের জরিপের অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন। সামাজিক পরিবর্তনে ধীরগতি এবং আর্থিক সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিরোধের কারণে ডিজিটাল ওয়ালেট অর্থ পরিশোধের উপায়গুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত হবে। পিউ রিসার্চের অ্যারন স্মিথ এমনটাই মনে করেন।

ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পর্কে গুগলের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাল ভারিয়েন বলেন, ২০২০ সাল যদিও খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি লক্ষ্য, তবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটারকে যে ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তা বলাই বাহুল্য। ওয়ালেটে পরিচয়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং অর্থ হবে। খুব জলদি সেগুলো মোবাইল ডিভাইসেও সুন্দর মতো এঁটে যাবে। গুগল গত বছরই ওয়ালেট নামে একটি সার্ভিস চালু করে। অ্যান্ড্রয়েডচালিত মোবাইল ফোনগুলো দিয়ে এ সার্ভিসটির মাধ্যমে কেনাকাটা করা যায়। পুরো ব্যবস্থাকেই সংক্ষেপে বলা হয় ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র আধিপত্য

বার্লিন, ৭ মে: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সবসময়ই আলোচনার বিষয়৷ নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এখনো বাধা রয়েছে৷ এই সীমাবদ্ধতার কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠছে বিকল্প ‘সোশ্যাল মিডিয়া’৷

গত বছরের আরব বসন্তের কথাই ধরা যাক৷ মিশর, লিবিয়া, টিউনিশিয়ার মতো দেশগুলোর গণমাধ্যম ঠিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতো না৷ স্বৈরশাসকদের অস্ত্রের নলের মুখে মূলধারার গণমাধ্যম ছিল অসহায়৷ কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা সত্ত্বেও ফুঁসে উঠল এসব দেশের সাধারণ মানুষ৷ তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিল স্যোশাল মিডিয়াকে৷ আরো সহজ করে বললে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব’কে৷ এসব সোশ্যাল মিডিয়া আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিল৷ ইন্টারনেটে যে স্বাধীনতা তারা পেয়েছে, সেটির প্রতিফলন ঘটেছে রাজপথে৷ হোসনি মুবারক, বেন আলী কিংবা গাদ্দাফিরা আজ আর ক্ষমতায় নেই৷ পতন ঘটেছে স্বৈরতন্ত্রের, এখন গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে মিশর, টিউনিশিয়া এবং লিবিয়ায়৷

ইন্টারনেটভিত্তিক স্বাধীন বিকল্প মিডিয়ার সন্ধান মানুষ পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে কি প্রচলিত গণমাধ্যম পরাধীনতার শিকলে বাঁধা থাকবে? এমনটা আসলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নয়৷ যে কারণে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ধারাকে উৎসাহিত করতে, প্রতি বছরের তেসরা মে উদযাপন করা হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস৷ ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷

এখনো বিশ্বের কয়েক ডজন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই৷ মুক্তভাবে মত প্রকাশের অধিকার নেই৷ এখনো সাংবাদিক, সম্পাদকরা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন, নিহত হচ্ছেন৷

বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক৷ মাত্র কয়েকদিন আগে দৈনিক সমকাল পত্রিকার সম্পাদক গোলাম সারোয়ারকে একটি প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে হুমকি প্রদান করা হয়েছে৷ গোলাম সারোয়ার এই ঘটনার পর থানায় জিডি করেছেন৷ এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার এবং মেহেরুন রুনি৷

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী ও ব্লগার ড. শহীদুল আলম বলেন, ”আগে যতটা স্বাধীনতা ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি আছে৷ আগে আমরা অনেক কিছু বলতে পারতাম না৷ এখন বলার সুযোগ আছে৷ কিন্তু সেটার সঙ্গে আবার যে হুমকিগুলো এখন দাঁড়িয়ে গেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার কারণ নেই৷ বাংলাদেশে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে৷ এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখানো হয়েছে৷”

প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইন্টারনেটভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, মনে করেন চীনের ব্লগার আইস্যাক মাও৷ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ”চীনের প্রচলিত গণমাধ্যম পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত৷ ফলে নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য তরুণ প্রজন্ম নতুন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে৷ যদিও চীনে ইন্টারনেটের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তারপরও তরুণ প্রজন্ম তথ্য আদানপ্রদানের বিভিন্ন উপায় বের করছে৷ এভাবেই তারা সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে খুব দ্রুত সংঘবদ্ধ হতে পারছে, যা চীনের শাসক গোষ্ঠীর জন্য সুখবর নয়৷”

প্রতি বছর অসংখ্য সাংবাদিক প্রাণ হারাচ্ছে পেশাগত কারণে৷ রিপোর্টার্স উইদাআউট বডার্স’র হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ১৯৷ এছাড়া কারাবন্দি রয়েছেন ১৬১ সাংবাদিক এবং ১২১ নেটিজেন৷ সূত্র: ডয়চে ভেলে।

চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেল গুগল

ইন্টারনেট সার্চ জায়ান্ট গুগল পেল চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স। এই গাড়ি চালানোর জন্য আলাদা করে কোন চালকের প্রয়োজন হবে না। বরং গাড়ি চলবে নিজেই৷ রাস্তায় অন্য গাড়িকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে৷ এমনকি কোন রাস্তায় কোন জটিলতা দেখা দিলে আপনা থেকেই গাড়িটি বেছে নেবে নিজের সুবিধাজনক জায়গা৷ গুগল এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে এই প্রযুক্তি৷ সেটা গাড়িতে জুড়ে চলছে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ আর এবার, আবার আরো একধাপ এগিয়ে গেল সংস্থাটি৷ কারণ সোমবার আমেরিকার নেভাদা রাজ্য কর্তৃপক্ষ গুগলকে এই গাড়ির লাইসেন্স দিয়েছে৷ লাইসেন্স পাওয়ার পর গুগল প্রথম যে চালকবিহীন গাড়িটি রাস্তায় নামাচ্ছে, সেটি টয়োটা কোম্পানির৷ প্রিয়াস মডেলের গাড়িতে চালকবিহীন প্রযুক্তি যোগ করছে গুগল৷ আরো অনেক গাড়ি কোম্পানি অবশ্য নেভাদায় চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেতে আবেদন জানিয়েছে৷ চালকবিহীন গাড়িতে থাকছে ভিডিও ক্যামেরা, রাডার সেন্সর এবং লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার৷ এসব ব্যবহার করে রাস্তায় থাকা অন্যান্য গাড়ি এবং বস্তুর অবস্থান সনাক্ত করবে চালকবিহীন গাড়িটি৷ গুগলের ইঞ্জিনিয়াররা এরই মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় এই গাড়ি পরীক্ষা করেছে৷ তখন অবশ্য গাড়ির মধ্যে একজন অভিজ্ঞ চালক ছিলেন৷ বাড়তি সতর্কতা হিসেবে তাকে রাখা হয়েছিল৷ গুগল সফটওয়্যার যদি কোন কারণে কাজ না করে তাহলে যাতে চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন সেজন্যই রাখা হয়েছিল একজন দক্ষ চালক৷ বলাবাহুল্য, পরীক্ষামূলক এই চালনায় কোন ধরনের বড় জটিলতা ধরা পড়েনি৷ গুগলের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সেবাস্টিয়ান থ্রুন এই বিষয়ে বিবিসিকে বলেন, কোন ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই চালকবিহীন গাড়িটি এক লাখ চল্লিশ হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছে৷ এই চলার পথে শুধুমাত্র একবার ট্রাফিক সিগন্যালে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিল চালকবিহীন গাড়িটিকে৷ নেভাদার মোটর ভেহিক্যালস বিভাগের পরিচালক ব্রুস ব্রেসলো মনে করেন, চালকবিহীন গাড়ি হচ্ছে ভবিষ্যতের গাড়ি৷ রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ি চলাচলের অনুমতি দিতে গত মার্চ মাসে আইন পরিবর্তন করে নেভাদা৷ ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষকে এই গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার কথাও ভাবছে রাজ্যটি৷


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


রামজে বারোউদ • স্বেচ্ছাচারীদের চ্যালেঞ্জ করা, পুরনো কাঠামো ধ্বংস করা এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য কর্মপন্থা উদ্ভাবনের কাজে আরবদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যর্থ নীতি, ভুল ধারণা ও আত্মস্বার্থে অবিচল রয়েছে। আরবরা নিজেদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে, কিন্তু এ বিষয়ে খুব কম লোকই ভিন্ন মত পোষণ করে যে, এখন পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। মুবারক ও বেন আলীর মতো স্বেচ্ছাচারীদের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করে, তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জসহ নতুন সকাল। এ এলাকায় গণতন্ত্র, সুশীল সমাজ ও নাগরিকত্ব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আরবের যেসব বুদ্ধিজীবী এখনো সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বাগাড়ম্বর করে তাদের ওয়াশিংটন ভিত্তিক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী কাজে লাগিয়েছে অথবা তাদের মধ্যে এমন কিছু বেপরোয়া লোক আছে যারা মিথ্যার বেসাতি বিক্রেতা রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজে উপস্থিত হন।

একটা কথা সহজে অনুমেয় – আরব বিশ্বের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। হোসনি মুবারক যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখনকার অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার মিল নেই। একদল ‘আরব মধ্যস্থতাকারীর’ পরিচালনায় মুবারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন ঘটানো। ব্যাপারটা ছিল যেন তা মিসরের জাতীয় স্বার্থের জন্যও একটা জরুরি বিষয়। ইতোমধ্যে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ পরস্পরবিরোধী অবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে ভালো কাজে কৃতিত্ব লাভের জন্য তিনি বেপরোয়া ছিলেন – তিনি এখনো আরব প্রতিরোধের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে তখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কথাটা আরব সংস্কৃতিতে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত করা হয়। সাধারণ আরববাসীদের এমন বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা হয় যা তাদের কাছে গুরুত্বহীন ছিল, অথচ সেই বিষয়টিই এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

আরব নারী-পুরুষ সবাইকে অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়, এমনকি তাদের আশাশূন্য করা হয়। তাদের শুধু ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা ও অন্যান্য বিষয়ে জনমত জরিপের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ এসব বিষয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও অবমাননার জন্য দায়ী কোনো বিষয় ছিল না।

আরব স্বেচ্ছচারীরা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধ সংস্কারকে গ্রহণ করে। ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ‘আল কায়েদাকে পরাজিত’ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শত্রুভাবাপন্নভাবে দখল অথবা নিজেকেই ক্ষতিকর একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে যে কোনো একটা পথ বেছে নিতে হয়। তিনি শেষোক্ত বিকল্পটি বেছে নেন এবং এমন ভূমিকার ফলাফল হাতে হাতেই পেয়ে যান। ইয়েমেনী জনগণ রাস্তায় নেমে আসে – তারা দাবি করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের। সালেহ অনুগত বাহিনী ও রিপাবলিকান গার্ডদের পাঠান হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আল কায়েদা যোদ্ধাদের এবং নিরস্ত্র গণতন্ত্রকামী লোকদের একসঙ্গে হত্যা করার জন্য। সরাসরি ও কঠোর এ কাজকে তুলনা করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকথিত দরকষাকষির অাঁতাত, তোমাদের খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব যতক্ষণ আমি নিজেকে ধ্বংস করতে পারব এমন ভাবনার সঙ্গে।

লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো কাজে লাগান। তার শাসনামলে প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর সদস্যদের মধ্যে আল কায়েদা আছে। এসব কথা পশ্চিমা গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। পাশ্চাত্যকে শান্ত করার জন্য গাদ্দাফি এমন বেপরোয়া হয়ে যান যে, তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ফিলিস্তিনি ‘চরমপন্থীদের’ বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব স্বৈরশাসকরা যে ভাষায় কথা বলেন তা নির্যাতনের ভাষা কোষে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এটা একটা বিস্ময়কর বিষয়। অপরদিকে সাধারণ আরব জনগণ তাদের দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্বেলিত ছিল। আল কায়েদা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণনা অনুযায়ী আরব জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়, অন্য কিছু বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ যা পশ্চিমা ভাষ্যকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অংশীদারিত্বমূলক ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ঐক্য ছাড়াও তাদের মধ্যে আছে নির্যাতন, বিচ্ছিন্নতা, অন্যায় ও অসাম্যের এক সাধারণ অভিজ্ঞতা।

২০০৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের তৃতীয় আরব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয় যে, আধুনিক আরব রাষ্ট্রে ‘নির্বাহী প্রক্রিয়ার ধরন একটা কৃষ্ণ গহবরের মতো, যা এর আশপাশের সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে গঠন করে যে, তা থেকে কিছু এগিয়ে যায় না এবং যা থেকে কিছু পালিয়ে যেতে পারে না।’ আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ২০০৯ সালটা খুব ভালো ছিল না। ওই সময় এ ধরনের রিপোর্টের পঞ্চম খন্ডে বলা হয়, ‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে আশা করা হয়। অথচ বেশ কয়েকটা আরব দেশে দেখা গেছে, তা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সনদ ও জাতীয় শাসনতান্ত্রিক ধারাগুলোর প্রতি হুমকিস্বরূপ।’ মে’তে টাইম ম্যাগাজিন ‘হাউ দ্য এরাব স্প্রিং মেড বিন লাদেন অ্যান আফটারথট’ শিরোনামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। আরব বিপ্লবের সম্মিলিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে ওই রিপোর্টে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, মিসরের তাহরির স্কোয়ারে ওসামা বিন লাদেনের প্রশংসা করে কোনো ব্যানার দেখা যায়নি। তিউনিসিয়া, লিবিয়া বা এমনকি ইয়েমেনেও সরকারবিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে তার ডেপুটি আয়মান আল জাওয়াহিরির কোনো ছবি দেখা যায়নি।’

সত্যের এই প্রকাশ পশ্চিমা মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হলেও তাকে মোটামুটিভাবে বলা যায় একটা প্রতারণা। আসল কথা হলো, আল কায়েদা মডেল কখনো আরব সমাজের মূলধারায় প্রতিফলিত হয়নি। আরব বিপ্লব আল কায়েদা সম্পর্কে আরব সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। কারণ ওই ধারণা সমগ্র আরব সমাজের ধারণার খুবই সামান্য একটা অংশ মাত্র। যা হোক, এসব বিপ্লব আরবদের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ধারণাকে এখনো সত্যিকারভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি।

জগবি ইন্টারন্যাশনাল জুলাইয়ে এরাব অ্যাটিচিউড ২০১১ প্রকাশ করে। এতে ছয়টি আরব রাষ্ট্রের এমন ধারণা প্রকাশ পায় যা এতে আরবদের মধ্যে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা শতকরা ১০ ভাগ কমে যাওয়ার কথাও রয়েছে। ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবামা যখন তার বিখ্যাত ভাষণ দেন তখন অনেক আরব মনে করে যে, কোনো কোনো অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-আরব অগ্রাধিকার চূড়ান্তভাবে এসে মিলেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কোনো অনুকূল দিকে পরিচালিত না হওয়ায় আরবরা অনুধাবন করে, মার্কিন নীতিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েই আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ, ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন এবং তাদের পুরনো মিত্র অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ আরব শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আরবরা আবিষ্কার করেছে অথবা পুনরায় আবিষ্কার করেছে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কোনো মিল নেই, বরং ওই দুই ধারা আসলে সাংঘর্ষিক পর্যায়ে আছে।

এটা খুবই স্বাভাবিক, মধ্যপ্রাচ্যের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট স্বার্থ ও লক্ষ্যে তার নীতি পরিচালিত করবে। কিন্তু আসলে যা হচ্ছে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের জন্য অধিকাংশ আরব দেশের আশা আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরব স্বৈরাচারী শাসকদের সহায়তায় ওয়াশিংটনের অস্পষ্ট ও বিভ্রান্ত নীতি আরব জাতিগুলোর জন্য অকথিত ক্ষতি ডেকে এনেছে। লাখ লাখ সাধারণ আরব যাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অগ্রাধিকারকে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে এবং এখন আরব জনগণ দেখাচ্ছে যে, তারা ওই বাস্তবতা গ্রহণে আর রাজি নয়।

ইন্টারনেট থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

বিদ্রোহের নতুন নাম ‘আমরা শতকরা ৯৯’


বিদ্রোহের নতুন নাম ‘আমরা শতকরা ৯৯’ ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট দখল আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকায় সমাবেশ হয়েছে।

Occupy Wall St.


মেহেদী হাসান • ওয়াল স্ট্রিট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার মূল কেন্দ্র। অন্য কথায়, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বাণিজ্যিক কেন্দ্র। যে কেন্দ্রে বসে আছে সমগ্র জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একচেটিয়া পুঁজির প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ বহুজাতিক করপোরেশন (তেল, অস্ত্র, খাদ্য), ব্যাংক, বীমা এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আর যাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এ স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যাকে সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ, গণহত্যা, জাতিগত সহিংসতা, সামরিক শাসন বিস্তৃত করতে হয়েছে। অস্ত্র আর তেল কোম্পানির স্বার্থে সারা পৃথিবীতেই যুদ্ধোন্মাদনা ছড়াতে হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান সর্বশেষ লিবিয়ায় লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধের বলি হয়েছে। কেবল দখলকৃত দেশগুলোর মানুষই রাষ্ট্রটির তাড়নার শিকার হয়নি, হয়েছে তার নিজ দেশের সাধারণ মানুষও। যুদ্ধ এবং দমন অর্থনীতির পেছনে জনগণের করের অর্থে এ রাষ্ট্রটি ব্যয় করে বছরে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ বাহ্যিক চাকচিক্যময়, জৌলুসপূর্ণ এ মুল্লুকে প্রতিদিন ক্ষুধার্ত থাকে চার কোটি মানুষ। তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজন মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। মন্দা অর্থনীতিতে জর্জরিত এ রাষ্ট্রে গোয়েন্দাগিরির পেছনে খরচ বেড়েছে তিনগুণ, কমেছে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়। দৈত্যাকার ব্যাংক, করপোরেশনের অন্তর্গত মন্দার কারণে ধ্বংস থেকে বাঁচাতে গিয়ে বেইল আউট কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। বেড়েছে দ্রব্যমূল্য, কমেছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ঋণ বেড়েছে জনগণের ওপরে করের বোঝা বেড়েছে জনগণের।

‘ওয়াল স্ট্রিট দখল কর’ আওয়াজ দিয়ে এহেন পররাজ্যগ্রাসী, সন্ত্রাসী, ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী অংশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ‘আমরা শতকরা ৯৯’ আর এটি এখন সারা দুনিয়ার এক প্রতীকী স্লোগান। আর এরই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে আন্দোলন। নারী-শ্রমিক-শিক্ষার্থী-শিক্ষক-বেকার-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত; যারা বর্তমান বিদ্যমান ব্যবস্থায় জর্জরিত, দিশেহারা; তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ হলো শোষণকেন্দ্রে প্রজবলিত বিদ্রোহের নতুন নাম, নতুন পরিচয়। যে পরিচয় হীনমন্যতা, ভোগবাদিতা, আত্মপরিচয়ের সংকটকে ঝেড়ে ফেলে নতুন শক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। এই শক্তি এখন ইথারে ভেসে ছড়িয়ে গেছে সারাবিশেবর তরুণ-যুব সম্প্রদায়ের কাছে। সারাবিশ্বের ভুক্তভোগী সংবেদনশীল মানুষের কাছে। নিজের দেশের অসহনীয় অস্বস্তিকর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’-এর ‘আমরা শতকরা ৯৯’-এর প্রতিরোধের শক্তি নিয়ে বিশ্বের প্রায় এক হাজার শহরে এই আন্দোলন দানা বেঁধেছে। নোয়াম চমস্কি এ আন্দোলনকে সমর্থন করে বার্তা পাঠিয়েছেন ‘জনগণের পক্ষে সম্মানজনক এবং দুঃসাহসিক অভিযাত্রার ভূমিকা’ বলে।

সম্মানজনক কেন? কারণ, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং তাদের প্রতিনিধিত্বমূলক শ্রেণীরাষ্ট্র-মুখপাত্ররা যেখানে পুরো সমাজকে ভোগবাদিতার চকচকে রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়াকে দেখানোর প্রচেষ্টায় দিনরাত আহাজারি করছে; পণ্যভোগকে ধর্মের স্থানে ঠাঁই দেওয়ার প্রচেষ্টায় মত্ত যেখানে `TINA’ (There is no Alternative)-র অনুসারীরা সেখানে সে বেড়াজালকে ছিন্ন করে ‘মানুষ’ পরিচয়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা দুঃসাহসিকই বটে। এই মানুষ প্রমাণ করেছেন, রাষ্ট্র যতই ক্ষমতাধর কিংবা শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণের অসাধ্য কোনো কিছু নেই। নাহলে, বিশ্বের সবচাইতে ‘দুর্ধর্ষ’ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় বসে এহেন কাজ কীভাবে সম্ভব? সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়; এটা প্রমাণ করেছেন ‘শতকরা ৯৯’-এর প্রতিনিধিরা।

Occupy Wall St.


কেন পুঁজিতান্ত্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রস্থলে বিদ্রোহের নতুন ঠিকানা তৈরি হলো? এই কি প্রথম? তা তো নয়। নভেম্বর ১৯৯৯তে সিয়াটলে, এপ্রিল ২০০১-এ কিউবেক সিটিতে ‘পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বায়নবিরোধী’ বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু এই পর্বে পূর্বের আন্দোলনের দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতাকে অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রম করে সচেতনতা-ধরণ-ধারণ-বিস্তৃতি-ব্যাপকতার নতুনমাত্রা নিয়ে এই আন্দোলন আরো শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলন এখন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের চেতনার ঐক্যের ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। এটা ঠিক এই আন্দোলনে একক কোনো নেতৃত্ব নেই। এখানে যেমন শ্রমিক আছেন, তেমনি বেকাররাও আছেন। আছেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, পরিবেশবাদী, স্টাডি গ্রুপ, সংস্কৃতিকর্মী। বিপক্ষে; ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ, ধর্মযাজক, স্টক এক্সচেঞ্জ, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।

যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনের গতি বিস্তৃত হয়েছে যে জগত তৈরি করেছিল করপোরেট তার আপন মুনাফাবৃদ্ধির স্বার্থে। সে প্রযুক্তিই তার জন্য কবর রচনা করতে যাচ্ছে। করপোরেট রাষ্ট্রের ভয়ও সে কারণে মারাত্মক। এই ভীতি থেকেই ন্যায্য এবং যুক্তির শক্তি নিয়ে দাঁড়ানো আন্দোলনকে দমন করতে উদ্যত। হামলা-মামলা-ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্দোলনকে স্তিমিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু দমনমূলক নীতি নিয়ে তারা যে ‘পুলসেরাতের পুল’ পার হতে পারছে না তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত। ১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের জুকোটি পার্কে অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, ব্যাংক বন্ধকি সংকট ও করপোরেট লোভের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে বিক্ষোভকারীরা। এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে পর্তুগালের লিসবনে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামে। তারা স্লোগান দেয়- ‘ঋণের দায় আমাদের নয়, আইএমএফ বেরিয়ে যাও’। এ আন্দোলন এখন নিউইয়র্ক ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া পর্যন্ত। সারা বিশ্বের হাজার শহরে; পাঁচজন থেকে পাঁচ হাজার, পঞ্চাশ হাজার, লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হচ্ছেন আপন আপন স্থানে।

স্লোগানের নতুন নতুন ভাষা তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন বক্তব্য। ‘আমরা ৯৯ শতাংশ’, ‘আমরা আমাদের দেশকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছি’। ‘আমরা হারিয়েছি, ব্যাংক বেইল আউট পেয়েছে’, ‘সারাদিন, সারা সপ্তাহ ওয়াল স্ট্রিট দখল করুন’, ‘করপোরেট সাম্রাজ্য জাগ্রত এবং সচেতন মানুষকে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’ ‘৯৯ শতাংশ মানে বৃহৎ সংখ্যা, যারা হারতে পারে না।’ ‘ব্যাংকারদের গ্রেফতার কর, আমাদের নয়।’ ‘প্রাইভেট ব্যাংক সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে, জনগণ নয়।’ ‘আমাদের চাকরি কোথায়?’ ‘এটি আমাদের দেশ-একে আমরা দখল করবো, এগুলো আমাদের রাস্তা-এগুলো আমরা দখল করবো, আমরা এখানে আছি এবং আমরা ক্রমশ বাড়ছি-চল সবাই একসঙ্গে দখল করি।’ ‘আমাদের যা পাওনা আমরা তা বুঝে নেই।’

এই বিদ্রোহের প্রয়োজনীয়তা কেন তা স্লোগানের ভাষার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়।

ক্রিস হেজেস যিনি একজন লেখক-সাংবাদিক, পূর্ব ইউরোপের অনেক ধরনের গণআন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী এবং ‘অকোপাই ওয়াল স্ট্রিট’-এ অংশগ্রহণকারী; তিনি বলছেন, ‘আমি এই আন্দোলনে এসেছি ভেতরের তাগিদ থেকে। কারণ, করপোরেশনগুলো আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মাথা-মগজ দখল করে নিয়েছে। দখল করে নিয়েছে তাদের স্বতবা। এ আন্দোলন তার বিরুদ্ধে।…যখন এই ধরনের আন্দোলন মাথা তুলে দাঁড়ায় সেখানে করপোরেট দখলের বিরুদ্ধে মানুষের পক্ষে প্রকৃত সত্যটাই সামনে নিয়ে আসে। এ ধরনের আন্দোলন যখন তৈরি হয় তখন যে মানুষ যে সমাজে বসবাস করছে সে সমাজের প্রকৃত চিত্রটাকে পরিষ্কার করে তুলে ধরে। তুলে ধরে সমাজের বৈষম্য, ক্ষমতাবানদের দেŠরাত্ম্য-অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা এবং আন্দোলন অনেকটা ‘সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স’ ধরনের কাজ করে- কারণ এ আন্দোলনের যে শক্তি তা ছড়িয়ে পড়ে এবং কোথায় গিয়ে এর শেষটা দাঁড়াবে তা পূর্বে থেকে অনুমান করা যায় না।..সমাজের এলিট গোষ্ঠী, নীল পোশাকধারী পুলিশ প্রশাসন, মাথা-মগজ নিয়ন্ত্রণের ম্যাকানিজম; কেউ এ আন্দোলন আশা করে না। কিন্তু বিধি বাম, ইতিহাস তাদের নির্ধারিত পথে চলে না এবং শেষ পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের কারণে ক্ষমতাবানরা হয়ে পড়ে প্রতিরোধহীন।’

‘করপোরেট ডাকাত হানা দিয়েছে দ্বারে, তাকে প্রতিরোধ কর’ প্ল্যাকার্ড হাতে ২০/২২ বছরের একজন তরুণ বলছেন, ‘আমরা এখন আর করপোরেটের হাতে বন্দি হতে চাই না। রাজনীতিতে করপোরেট অর্থ আমরা চাই না। এই অর্থ সারা বিশ্বের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে; নিয়ন্ত্রণ করছে প্রাকৃতিক সম্পদ, সমস্ত জীবন-মান।’ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই তরুণ-যুব সমাজের অংশ। কয়েকজনের সাক্ষাৎকার সংবলিত একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, তারা বলছেন, ‘ব্যাংক এবং এক্সনের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ঘাড়ে চেপে আমাদের নিংড়ে নিচ্ছে। আমরা যারা সমবেত হয়েছি তারা এ প্রক্রিয়ার বিপক্ষে।’….‘মধ্য প্রাচ্যে যখন কোনো আন্দোলন হয় তখন মিডিয়া সেটাকে খামচে ধরে প্রচার করে। কারণ, সেখানে তাদের স্বার্থ আছে। সরকারি স্বার্থের সঙ্গে তাদের স্বার্থ জড়িত। কিন্তু যখন নিজের দেশের উঠানে করপোরেট স্বার্থ-শোষণবিরোধী একটি ন্যায্য আন্দোলন হচ্ছে তখন সেটি প্রচার করতে তাদের অনীহা। কারণ, এতে তাদের মুনাফা স্বার্থ বাধাগ্রস্ত হয়।’…‘শাসকরা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলছেন এবং এই বিষয়টি আমাদের দৃষ্টির আড়ালে হচ্ছে। এটা তো কোনোভাবেই আমি মেনে নিতে পারি না।’…‘সরকার আমাদের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তারা আমাদের জীবনকে কোনো পরোয়াই করে না। এটা আমরা মেনে নিতে পারি না।’ চাকরিজীবী একজন পৌঢ় বয়সের, তিনি সেদিনই উপস্থিত হয়েছেন আন্দোলনে। তার উপলব্ধি হলো, ‘এখানে যারা উপস্থিত হয়েছেন তারা বলছেন ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের কথা। এটা ঠিক। এদের কারণে আমরা আমাদের কোনো স্বপ্নই বাস্তবায়ন করতে পারছি না।’ ৩০/৩২ বছরের একজন বেকার যুবক অসহনীয় অবস্থায় থেকেও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘আমি আমার চাকরি হারিয়েছি। হারিয়েছি হেলথ ইন্স্যুরেন্স। সামাজিক নিরাপত্তা জাল যেটি সরকারের দেওয়ার কথা ছিল বেকার অবস্থায় তার সবকিছু এখন আমার আয়ত্তের বাইরে। কিন্তু এর জন্য আমরা কর প্রদান করি। বিপরীতে এখন অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ভর করেছে। আমি আমার এই কথাগুলোই বলতে এসেছি এখানে।’…‘যখন আমাদের জীবন-মান সব চলে যাচ্ছে অল্প কিছু সম্পদলোভী হায়েনার হাতে তখন আমরা আর কী করতে পারি। যখন আমাদের করের অর্থে ভোগ-বিলাসে মত্ত গুটিকয়েক লোক যারা সমাজের ১%, তখন ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে না দাঁড়ানোর কি কোনো কারণ আছে? আমাদের করের অর্থে চালানো হচ্ছে যুদ্ধ, মানুষ মরছে, আমরা হচ্ছি বেকার’।

এ কথাগুলো শুধু আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নয় বরং মার্কিন মুল্লুক এবং পুঁুজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার অধীনস্ত সব দেশের মানুষের। যার কারণে এর ঢেউ সারাবিশ্বে আছড়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। যার চেহারা আমরা দেখছি বিশ্বব্যাপী। শারীরিক-মানসিক-প্রাযুক্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজস্ব স্বর এবং সুর নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের দখল-আধিপত্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে বিক্ষোভকারীরা, সমাজের সিংহভাগ মানুষের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে, ‘আমরা শতকরা ৯৯’। রক্তাক্ত হচ্ছে কিন্তু আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতে পারছে না ক্ষমতাধর প্রশাসন। গায়ে ‘কাঁদা’ লাগানোতে অনীহা মূল ধারার করপোরেট মিডিয়ার। এজন্য একদিকে আমরা দেখি লিবিয়ায় ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ নামক তেল দখলের যুদ্ধের মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাহিনী যত না ফলাও করে প্রচার করা হয়; লিবিয়ার তথাকথিত বিদ্রোহী এনটিসির যুদ্ধ জয়ের খবর যত না আগ্রহ সহকারে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে; তার সিকিভাগের একভাগ গুরুত্ব পায় না জনগণের ন্যায় এবং ন্যায্য আন্দোলন। তার বিপরীতে ‘শতকরা ৯৯’কে আড়ালে রাখায় মরিয়া হয়ে উঠতে দেখি! উপরন্তু করপোরেট মিডিয়ার ঘাড়ে এখন ‘সমাজতন্ত্রের ভূত’ চেপে বসেছে। এ ভূত ঘাড় থেকে নামানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে কিন্তু কোনোভাবেই নামাতে পারছে না। কী মার্কিন, কী বাংলাদেশে। আদল আলাদা, রক্তের ধারা এক। কিন্তু এ বিদ্রোহের বিশেষত্ব এই যে, করর্পোরেট মিডিয়ার মুখ পানে চেয়ে বসে নেই বিদ্রোহীরা। ফেসবুক, টুইটার, ব্লগের মতো সামাজিক মিডিয়াকে অবলম্বন করে আন্দোলনকে বিস্তৃত করতে তৎপর। যদিও এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু, এই শক্তিকে রুখবে কে?

বাংলাদেশেও একচেটিয়া পুঁজির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হওয়ার আন্দোলন চলছে। সম্পদ এবং সম্মান যা বিভিন্ন মেয়াদের সরকারের সময় জনগণের হাতছাড়া হয়েছে তাকে জনগণের হাতে ফেরৎ আনার আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। ‘আমরা শতকরা ৯৯’-এর সঙ্গে সংহতি এবং সম্পর্ক সেখানেই। ভিন্ন দেশ কিন্তু দখল-আধিপত্যবিরোধী গণআন্দোলনের সুরটি অভিন্ন। শোষণের মূল ধর্মটি যেখানে এক সেখানে প্রতিরোধ-বিদ্রোহের ভাষার মূলে ঐক্য থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। mehedihassan1@gmail.com [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]

ঢাকা, অক্টোবর ৩১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট দখল আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকায় সমাবেশ হয়েছে।

সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘গরিবী হটাও আন্দোলন’ এ সমাবেশ আয়োজন করে।

সমাবেশে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক নূরুল হক মেহেদী বলেন, “এ আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিশ্বের শ্রমজীবী-মেহনতী মানুষের আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে। এ আন্দোলনের ঢেউ আমাদের অধিকার বঞ্চিত মানুষদের মধ্যে জাগরণের সৃষ্টি করেছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘অতিমুনাফা’র প্রতিবাদে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের এ আন্দোলন শুরু হয়। এক পর্যায়ে গত ১৫ অক্টোবর বিশ্বের ৮০টি দেশের ৯৫১টি শহরে একযোগে প্রতিবাদে নামে এ আন্দোলনের সমর্থকরা।

ঢাকার সমাবেশে কমরেড মেহেদি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুনেত্র ও রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দাবি জানান।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন গরিবী হটাও আন্দোলনের ঢাকা মহানগরের সভাপতি খায়রুল ইসলাম সুজন ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল্লাহ মাহবুব।
সমাবেশ শেষে মিছিল করেন তারা।

Visit us on FaceBook

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

Video News: www.EkushTube.com

Change your Life: ASea – Advancing Life

এই পানীয় যেখানে তুমুল জনপ্রিয়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যথেষ্ট অসন্তোষ রয়েছে, সেই বাংলাদেশে এমন অরাজনৈতিক অথচ জনমুখী আন্দোলন গড়ে তোলা কি সম্ভব?


দ্য টি পার্টি

জামান সরদার

এ দেশে চায়ের প্রচলনে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যেসব বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা এখন হাস্যরসের উপাদান। বাঙালির সান্ধ্য আড্ডা কীভাবে ‘পার্টি’তে রূপান্তরিত হলো এবং সেখানে চায়ের একক আধিপত্য খর্ব হয়ে পানীয় বৈচিত্র্য ঘটল, সেও এক ইন্টারেস্টিং ইতিহাস। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টি পার্টি’ কিন্তু আরও মজার। অনেকেই জানেন, ব্রিটিশরা তাদের একটি উপনিবেশ ভারতের নাগরিক সমাজকে চায়ে মাতোয়ারা করতে সফল হলেও আরেক উপনিবেশ মার্কিন মুলুকে খুব একটা কায়দা করতে পারেনি। চা সেখানে বরং গণতোপের মুখে পড়েছিল। যে কারণে আমেরিকায় এখনও চা নয়, কফির আধিপত্য। মার্কিন নাগরিকদের বছরে মাথাপিছু কফি গ্রহণ ৪ কেজি ২০০ গ্রাম হলেও চায়ের পরিমাণ শুধু ২০০ গ্রাম।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা যেভাবে লবণ সত্যাগ্রহ পালন করেছি, সেই আঠারো শতকের শেষ ভাগেই আমেরিকানরা একই স্টাইলে ‘টি ডাম্পিং’ কর্মসূচি পালন করেছে। আমাদের মতো আমেরিকানরাও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কর বসানোর প্রতিবাদে চা বর্জন করেছিল। ১৭৭০ দশকে বিক্ষোভকারীরা জোর করে বোস্টন উপকূলে ভেড়ানো ব্রিটিশ জাহাজে উঠে চায়ের কার্টন কেড়ে নিয়ে সাগরে ফেলে দিত। পাড়ায় পাড়ায় এমন স্বেচ্ছাসেবক দল গঠিত হতে থাকে। চা-বিরোধী এই ছোট অথচ খুবই জনপ্রিয় দলগুলোর নাম হয় ‘বোস্টন টি পার্টি’।
পুরনো আদলের এ আন্দোলন ফের যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষ করে নিউইয়র্ক স্টেটে ফিরে আসে গত বছরের গোড়ার দিকে। ওই রাজ্যের গভর্নর বেশ কিছু বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব করলে স্থানীয় লোকজন খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ করে। বোস্টন শব্দটি ছেঁটে ফেলে তারা এর নাম দেয় ‘টি পার্টি’ বিক্ষোভ। বলাবাহুল্য, আমেরিকা হচ্ছে হাজার করের দেশ_ অন্যান্য রাজ্যেও এমন কিছু কর ছিল যেগুলো নাগরিকরা পছন্দ করছিল না। ফলে দ্রুতই ‘টি পার্টি’ গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে কেবল কর হ্রাস নয়; তাদের তৎপরতায় যুক্ত হয় সরকারের ব্যয় কমানো, জাতীয় ঋণ কমানো, ফেডারেল বাজেট ঘাটতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের আদি সংবিধান মেনে চলার দাবি।
বলাবাহুল্য, টি পার্টি রাজনৈতিক দল নয়; কিন্তু জনপ্রিয়তায় রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে কমও নয়। সদ্য সমাপ্ত সিনেট ও কংগ্রেস নির্বাচনে তারা যেসব প্রার্থীকে সমর্থন দেয় তারা বেশ ভালো ফলও করেছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে টি পার্টি এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, টাইম ম্যাগাজিন ২০১০ সালে তাদের পারসন অব দ্য ইয়ার তালিকায় এই সংগঠনকে অন্যতম রানারআপ নির্বাচিত করেছে।
মোদ্দা কথা, অরাজনৈতিক সংগঠন কীভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে, চায়ে অরুচির দেশে ‘টি পার্টি’ তা ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। এই পানীয় যেখানে তুমুল জনপ্রিয়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যথেষ্ট অসন্তোষ রয়েছে, সেই বাংলাদেশে এমন অরাজনৈতিক অথচ জনমুখী আন্দোলন গড়ে তোলা কি সম্ভব?

ওবামার কিছু সহজাত সুকুমার প্রবৃত্তি থাকলেও থাকতে পারে, যা তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোভাবে প্রকাশ পায়- সেড়্গেত্রে অবশ্য তিনি একই রকম ভয়াবহভাবে দুর্বল, কাপুরম্নষোচিত


ওবামার স্ববিরোধিতা ও প্রত্যয়ের অভাব

এম আবদুল হাফিজ

Barack Obama

Barack Obama


 

তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজের খ্রিস্টান পরিচিতিকে সতর্কভাবে ধরে রেখেছেন। তিনি জানতেন যে, বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিচয়ই তার অভিলাষকে পূর্ণ করবে- হোক না তার জন্ম কোনো অখ্যাত আফ্রিকীয় জনকের ঔরসে। তাই তিনি মাতৃকুলের খ্রিস্টান সম্পৃক্ততাকে নিজে শুধু ধারণই করেননি, সেটাকে ঘষে-মেজে উজ্জ্বল করেছেন। ক্যাম্পেইনের সময় প্রায়ই ওবামাকে গির্জায় যেয়ে উপাসনায় লিপ্ত দেখা যেত। মসজিদ বা কোনো ধরনের মুসলিম উপাসনালয়কে তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। তিনি তার অতীতের মুসলিম সম্পৃক্ততাকে প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন মুছে ফেলার, যদিও তার জন্মদাতা বাবা এবং সৎ বাবা দুজনে মুসলমান ছিলেন। জাকার্তায় তার সৎ বাবার সঙ্গে বসবাসকালে তার জীবনারম্্‌ভ হয়েছিল একজন মুসলমান হিসেবে। কী পরিমাণ স্বার্থ-বুদ্ধি কারো মধ্যে কাজ করলে সে অবলীলায় তার শেকড়কে অস্বীকার করতে পারে। ওবামা সেটিই করেছিলেন এবং এখন তার মধ্যে যে দ্বিবিধ চেহারা পরিদৃষ্ট হয়, তার কারণও এটি।

নির্বাচনে ওবামাকে বেকায়দায় ফেলতে তার প্রতিপড়্গরা প্রায়ই তার চোখের মধ্যাংশের প্রতি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। শুধু তাই নয়, তারা ওবামার জন্ম-বৃত্তান্তের রেকর্ডকেও বিতর্কিত করেছিল এবং এও প্রচার করেছিল যে, ওবামা ফিলিস্তিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সম্্‌ভাব্য প্রেসিডেন্টকে ঘায়েল করতে প্রতিপড়্গরা তাদের অনুকূল কন্সটিটিউয়েন্সি বিশেষ করে ইহুদি-খ্রিস্টানদের মুখাপেড়্গী হয়েছিল।

যা হোক, ড়্গমতায় আসীন হওয়া মাত্রই কিছু কিছু বিষয়ে ওবামা আরব ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসে বুশ প্রশাসনের নীতিকে বর্জন করেন। ইরাক থেকেও তিনি মার্কিন সৈন্যদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন, যদিও তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে তার ইরাককে নিয়ে সত্যিকারের অভিপ্রায় নিয়ে। কেননা তিনি বিপুল সংখ্যার সৈন্য ইরাকেই পুনঃমোতায়েন করছেন ইরাকি নেটিভ আর্মির প্রশিড়্গণের ছুতোয়। তাছাড়াও ইরাকের এ পর্যায়ে একটি লেজেগোবরে অবস্থা, যার অছিলায় যুক্তরাষ্ট্র যখন তখন সৈন্য পুনঃমোতায়েন করতে পারে এবং ইরাকের জাতি ও ধর্ম গোষ্ঠীগত বিভেদ-বিদ্বেষকে কাজ লাগিয়ে মার্কিন-দোসর ইসরায়েলের গ্রেটার ইসরায়েলে স্বপ্নের অনুকূলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি বিরোধ নিষ্পত্তিতেও ওবামা আপাতদৃষ্টিতে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন সম্প্রসারিত না করার জন্য চাপে রেখেছেন এবং সরল বিশ্বাসে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে বলছেন। মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের ওপর ওয়াশিংটনের বিরাট প্রভাব রয়েছে। ওবামা সম্্‌ভবত সেটিই কাছে লাগাতে চান। প্রয়োজনে এবং সদিচ্ছা থাকলে ওবামা ইসরায়েলকে আগের মতো মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ বন্ধও করে দিতে পারেন।

কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের এতসব হুমকি-ধমকি বা প্রভাব এ পর্যন্ত ইসরায়েলি আচরণে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। ওবামা কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনুকূল মনোভাব দেখিয়েই যাচ্ছেন। যদিও তার ইতিবাচক কোনো ফলাফলই নেই। ২০০৯ সালের জুনে ওবামার বহুল প্রচারিত কায়রো ভাষণটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে গতানুগতিকভাবে পৌঁছেছিল এবং তিনি সে সময় ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামটি পরিবর্তনের কথাও চিন্তা করছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে টার্গেট করতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি শব্দমালা থেকে এই নামটির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

শুধু তাই নয়, ওবামার এতসব মুসলিম বিশ্বের জন্য উদার এবং মহৎ উচ্চারণের পর ওবামা আফগানিস্তানে সৈন্যস্ফীতির আদেশ দিয়েছেন। সিআইএর ড্রন হামলাও তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পাকিস্তানের সীমান্ত সংলগ্ন উপজাতীয় অঞ্চলে।

ড্রন হামলার এই তীব্রতা ওবামার মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশেষ সমীকরণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর। মার্কিন বিশেষ বাহিনীগুলো এখন ৭৫টি দেশে সক্রিয়। বুশ আমলে তা ছিল ৬০টি দেশে। ইত্যবসরে গুয়ানতানামো বে এখনো চালু আছে। মার্কিনিরা এখনো সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি নেয় এবং প্রয়োজনে ‘হত্যা’ এখনো ওয়াশিংটনের টুলবক্সে একটি যন্ত্র বা হাতিয়ার।

মার্কিনিদের কনটিজেন্সি অপারেশন্স-এ বিদেশ-বিভূইয়ে যেসব বেসামরিক ব্যক্তি মারা পড়ে তাদের অধিকাংশই মুসলমান। যেসব বিদেশি ধরা পড়ে এবং জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয় তাদেরও প্রায় সবাই মুসলিম। ফলে আল-কায়েদার ব্যবহৃত উক্তি ‘ক্রুসেডর’ এবং ‘ইমপেরিয়ালিস্ট’ কাদের বোঝায় তা কিছুটা চোখ-কান খোলা রাখলে আর অস্পষ্ট থাকে না।

আশ্চর্যের বিষয় যে, ওবামার কায়রো ভাষণের লালিত্য সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বে ওবামার দেশের গ্রহণযোগ্যতা যা আগেও খুব ভালো ছিল না- আরও অনেক নিচে নেমে এসেছে। গ্রহণযোগ্যতার এই নিম্নগামিতা মার্কিনিদের মিত্র আরব দেশ মিসরে ২০০৯ সালের শতকরা ৪১ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ৩১ ভাগে নেমে এসেছে। তুরস্ড়্গে তা গত বছরের শতকরা ৩৩ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ২৩ ভাগে নেমেছে। তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস ঘটেছে পাকিস্তানে, যা গত বছরের শতকরা ১৩ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ৮ ভাগ। বোঝা যায়, ওবামা প্রেসিডেন্সি এই ধ্বংস সর্বাধিক।

মার্কিনি যুদ্ধ, দখলদারিত্ব এবং অতর্কিত ড্রন হামলা মার্কিনিদের বিরম্নদ্ধে মুসলিম বিশ্বে বিরূপ অবস্থান গ্রহণ প্রধান কারণ। এমনটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবাট প্যাপের অভিমত। তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ আত্মঘাতী হামলা- যা দখলদারদের এবং বিদেশি হামলাকারীদের বিরম্নদ্ধে পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে। তা সব প্রতিশোধমূলক, যা মার্কিনিরা কোনো যৌক্তিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকেই নয়- এগারোর অব্যবহিত পর ঘটিয়েছিল। অনেকে ধর্মের দোহাই দিলেও এগুলো নিছক প্রতিশোধের বীভৎস প্রকাশ।

নয়-এগারোয় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি আইকন ধ্বংস হওয়ার পরই প্রতিশোধের দাবানল জ্বলে উঠেছিল। মার্কিনিরা এর ধর্মীয় অনুশাসন বা অনুমোদন খঁুজতে তখন বাইবেলের প্রাসঙ্গিক ছত্র হাতড়াতে যায়নি। জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ স্টিফেন কাল বলেন যে, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী জাতিসংঘ ও সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রতি গভীর আস্থা এবং সমর্থন আছে। তা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্ব ওবামা যুগের বৈদেশিক নীতিকে মুসলমানরা বুশ নীতিরই প্রলম্বন ভাবছে না। তাদের কাছে ওবামার যুদ্ধ এবং দখলদারিত্বের নীতি আরো কদর্য, আরো ভয়াবহ। ওবামার কিছু সহজাত সুকুমার প্রবৃত্তি থাকলেও থাকতে পারে, যা তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোভাবে প্রকাশ পায়- সেড়্গেত্রে অবশ্য তিনি একই রকম ভয়াবহভাবে দুর্বল, কাপুরম্নষোচিত।

লেখকঃ ব্রিগেডিয়ার (অব·), সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

যে মানুষটিকে আপনি কখনও লেখাপড়া নিয়ে কোন কথা বলতে শোনেননি তিনি হঠাৎ করে নামের পাশে বিরাট করে ‘ডক্টর’ লিখছেন


উচ্চশিক্ষার্থে বিলেত যাত্রায় সাবধানতা প্রয়োজন

আ ব দু ল মা ন্না ন

প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে। ফ্লাইটটি যথারীতি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে প্রায় আট ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়েছিল। মাঝখানে দুবাইয়ে ঘণ্টা দুয়েকের যাত্রাবিরতি। তারপর আবার ঢাকার উদ্দেশে উড়ল। সে সময় বিমানের অভ্যন্তরীণ সেবার মান মোটামুটি ভালো ছিল। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে বিমানের স্মার্ট বিমানবালা জানতে চাইলেন, ডিউটি ফ্রি কিছু কিনতে চাই কিনা! তখন আমি একজন নিয়মিত ধূমপায়ী। দশ ডলার দিয়ে কিনলাম এক কার্টন বিদেশী ব্র্যান্ডের সিগারেট। ঢাকা বিমানবন্দরে শুল্ক কর্তৃপক্ষ তা বাজেয়াপ্ত করল এই বলে যে, বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীর বিদেশী সিগারেট দেশে আনা নিষিদ্ধ। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি, সিগারেট আমার কাছে বাংলাদেশ বিমানের অভ্যন্তরীণ শুল্কমুক্ত দোকানই বিক্রি করেছে। তারা আমাকে কখনও বলেনি, বাংলাদেশী পাসপোর্ট হলে এ সিগারেট নেয়া যাবে না। বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে অনেক সময় শুল্ক কর্তৃপক্ষকে সহজ কথাও বোঝানো সম্্‌ভব নয়। তাদের সোজাসাপ্টা উত্তর, কোথা থেকে কিনলেন, কারা বিক্রি করল, তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। সিগারেট আপনি নিয়ে যেতে পারবেন না। এসব বিষয়ে আমি সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নই। তর্ক হয় বেশ কিছুক্ষণ। লাভ হয় না কিছুই। শেষতক শখের ওই সিগারেটের কার্টনটা শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হই। এতদূর পড়ার পর পাঠক মনে করতে পারেন, আমি বুঝি বাংলাদেশ বিমান বা বিমানবন্দর শুল্ক কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে কিছু একটা লিখতে বসেছি। না, তেমনটি নয়। বিষয়টি হচ্ছে বহুল আলোচিত, সমালোচিত, নিন্দিত ‘শিক্ষাবাণিজ্য’ বিষয়ক।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত ভোরের ডাক পত্রিকা ২ ডিসেম্বরে প্রথম পৃষ্ঠায় চার কলামের শীর্ষ খবর হিসেবে ‘ব্রিটেনে ৬৩ হাজার বাংলাদেশী ছাত্রের শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত’ একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। সংবাদে বলা হয়েছে, সে দেশ থেকে হাজার হাজার বিদেশী ছাত্রকে বিদায় করার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকার। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নন-ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়নরত বাংলাদেশসহ অন্তত ৯০ হাজার বিদেশী শিক্ষার্থীর ভিসা আর ব্রিটিশ সরকার নবায়ন করবে না। ব্রিটিশ হাইকমিশনের বরাত দিয়ে সংবাদটিতে এও উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিটেনে অবস্থানরত বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীর আনুমানিক ৭০ শতাংশই নন-ডিগ্রি কোর্সে অধ্যয়ন করছে। সেদেশের সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটেনে অধ্যয়নরত প্রায় ৬৩ হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হলে হাজার হাজার বিদেশী ছাত্র, যারা ‘উচ্চশিক্ষা লাভের’ উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে বৈধভাবে শখের বিলেত যাত্রা করেছিল, তাদের নিজ দেশে ফিরতে হবে সবকিছু অসমাপ্ত রেখে। এটি কুড়ি বছর আগে বৈধভাবে বিমানের শুল্কমুক্ত বিপণি থেকে আমার সিগারেট ক্রয় করে ফ্যাসাদে পড়ার অবস্থা আর কী।

যেসব ছাত্রকে ব্রিটিশ সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে সে দেশ ছাড়তে হবে, তারা কেউই জাল ভিসা নিয়ে সে দেশে যায়নি। সেটি সম্্‌ভবও নয়। সব ছাত্র বৈধ ভিসা নিয়েই সে দেশে প্রবেশ করেছে এবং সে ভিসা পাওয়ার জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। বিরাট অংকের ভিসা ফিসহ নানা কিসিমের কাগজপত্র জমা দিতে হয়েছে। তাদের সহায়তা করেছে এ দেশে কার্যরত সেদেশেরই একটি সরকারি সংস্থা এবং ব্রিটেনের অনেক নন-ডিগ্রি গ্রান্টিং কলেজ, তার অনেকগুলোর প্রচলিত নাম ‘ভিসা কলেজ’। এদের কারও কারও আবার ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামে সহায়ক অফিসও আছে। এসব কলেজ কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিরতি দিয়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে যায়, পত্রপত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দেয়, বলে কাগজপত্র নিয়ে আস, স্পট এডমিশন নাও এবং আমার সঙ্গে চল। এরকম একটি ব্যবস্থাকে আমি আগে আমার একটি লেখায় আমাদের বাপ-দাদাদের আমলের সৌদি আরব থেকে হজের মৌসুমে আসা মোয়াল্লেম ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছিলাম। সে সময় হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে হাজী সাহেবানদের সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম থেকে রওনা হতে হতো। তারও আগে যেতে হতো মুম্বাই হয়ে। সেখান থেকে জেদ্দা। সময় লাগত প্রায় এক মাস। সে সময় সৌদি আরব থেকে মোয়াল্লেমরা এসে চট্টগ্রাম বা মুম্বাইয়ে অফিস খুলে হাজী সাহেবদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার করে একটা ফি নিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেত। তখন সৌদি আরব কোন তেলসম্পদ সমৃদ্ধ দেশ নয়। হজ মৌসুমের আয়টাই তাদের প্রধান আয়। ব্রিটেনে বর্তমানে উচ্চশিক্ষার নামে (যারা বাংলাদেশ বা অন্য কোন দেশে ছাত্র আনতে যায়) তাদের অবস্থাও এখন অনেকটা সেরকম। যে ছাত্রদের তারা সেদেশ থেকে বের করে দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে, তারা কিন্তু একটা বড় অংকের অর্থ সেদেশে নিয়ে গেছে, খরচও করেছে। সহজ কথায়, তারা সে দেশের অর্থনীতিতে সামান্য হলেও অবদান রেখেছে।

১৯৯৮-২০০০ সালে আমি লন্ডনের অ্যাসোসিয়েশন অব কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য ছিলাম। সে সময় অ্যাসোসিয়েশন যেসব কলেজ নন-ডিগ্রি কলেজের নামে শিক্ষাবাণিজ্যে লিপ্ত ছিল, সে বিষয়ে বেশ চিন্তিত ছিল। এদের তখনও বলা হতো ভিসা কলেজ, এখনও তা বলা হয়। ২০০০ সালে এর সংখ্যা ছিল ১৬০, পরে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দেড় হাজারে উন্নীত হয়। এটি বেশি বৃদ্ধি পায় যুক্তরাষ্ট্রের এক/এগারোর পরে। যখন সে দেশে স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রিটেনের কিছু ব্যক্তি, যাদের অধিকাংশের সঙ্গে শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই, তারা এসব কলেজ খুলে বসে। এসব কলেজের বেশিরভাগই অভিবাসী (যেমন- পূর্ব লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম) অধুøষিত এলাকায় অবস্থিত। কলেজ মানে কোন একটা ভবন বা দোকান বা রেস্টুরেন্টের ওপর দু’খানা ছোট আকারের কামরা। এগুলোর প্রায় কোনটাতেই কোন ফুলটাইম শিক্ষক নেই। নাম হয় বেশ বাহারি। কেউ কিন্তু ডিগ্রি দিতে পারে না। দিতে পারে ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট। কোন কোনটির সঙ্গে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা আছে। একটি পর্যায়ের পর, (সাধারণত দুই বছর) সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির যোগ্যতা অর্জন সাপেক্ষে একজন কলেজ ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। তবে বাস্তবে তা কদাচিৎ ঘটে। আর এসব বিশ্ববিদ্যালয়ও তেমন কোন উঁচুমানের বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ব্রিটেনে এখনও পর্যন্ত শুধু একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বাকিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়। তাতে ভর্তি হতে গেলে অনেক টাকা লাগে। কলেজগুলোতে ভর্তি হতে সাধারণত এক সেমিস্টারে (চার-সাড়ে চার মাস) তিন হাজার পাউন্ড দিতে হয়। অন্যান্য খরচও আছে। সঙ্গে আছে থাকা-খাওয়ার খরচ। একজন ছাত্র সপ্তাহে কুড়ি ঘণ্টা কাজ করতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সে সুযোগও বেশ সীমিত। ছাত্রভিসা নবায়ন করতে হলে কলেজের একটা প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। সেটা নিতে গেলেও আবার মোটা অংকের অর্থ দিতে হয়। যেহেতেু এসব কলেজের ছাত্ররা বেশিরভাগ সময়ই কাজ খঁুজতে ব্যস্ত থাকে অথবা কোন একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে স্বল্প আয়ে কাজ করতেই সময় ব্যয় করে, সেহেতু তারা নিয়মিত ক্লাসও করতে পারে না। সুতরাং তাদের বেলায় প্রত্যয়নপত্রের জন্য ফিও দিতে হয় বেশি। সবকিছু মিলিয়ে পুরো বিষয়টা নিয়ে একটা প্রতারণার জালে আটকে যায় বিদেশী ছাত্ররা। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। তবে সেরকম কলেজের সংখ্যা হাতে গোনা যায়।

দেরিতে হলেও ব্রিটিশ সরকার বিষয়টার গুরুত্ব কিছুটা উপলব্ধি করেছে এবং বিগত চার-পাঁচ বছরে এরকম প্রায় সাতশ’ কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, তারা শিক্ষার নামে মূলত আদম ব্যবসা করে আসছিল। তবে তা যদি তারা স্বীকারই করে তাহলে তারা এসব কলেজে সরল বিশ্বাসে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের শুরুতে স্টুডেন্ট ভিসা দিয়েছিল কেন? অতএব পুরো প্রতারণা ব্যবস্থায় ব্রিটেন সরকারের সম্পৃক্ততা তারা অস্বীকার করে কিভাবে? বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নিয়মিত বিরতি দিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনেকটা ঢালওভাবে কঠোর সমালোচনা করে। এর মধ্যে ঠিক হয়েছে অনেকগুলোকে নাকি চরমপত্র দেয়া হবে। এটি অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মনীতি মানছে না, শিক্ষার মান ভালো নয়, সার্টিফিকেট বিক্রি করে ইত্যাদি। এগুলোর ক্রেতার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের সংখ্যাও কম নয়। কারণ একটা ডিগ্রির সনদ জোগাড় করতে পারলে কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির সুযোগ সহজ হয় বলে ধারণা। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, বাংলাদেশের সবচেয়ে নিম্নমানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও সম্্‌ভবত বিলেতের এসব তথাকথিত কলেজের চেয়ে ভালো। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এসব কলেজের ক্ষেত্রে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করে না। তবে সরকার ইতিমধ্যে দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষামেলার নামে ব্যবসায়িক ফাঁদ পাতা নিষিদ্ধ করার একটা উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যারাই জড়িত, নিশ্চিতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে প্রশংসা করবেন তারা। তবে খেয়াল রাখতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপটা শুধু নির্দেশেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে।

এ সত্যটি নিশ্চয় কেউ অস্বীকার করবেন না। যেসব ছাত্র বাংলাদেশ থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষার নামে উল্লিখিতভাবে বিলাত যাত্রা করে, বর্তমান অবস্থায় তাদের প্রতারিত হওয়ার সম্্‌ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি। ক’দিন আগে ঢাকার একটি ভুয়া ফরেন এডুকেশন কনসালটেন্ট বাংলাদেশী ছাত্রদের কাছ থেকে পনেরো কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছে, ঠিক যেমনটা ঘটে আদম বেপারিদের ক্ষেত্রে। এসব জালজোচ্চুরি বন্ধ করতে হলে উভয় দেশের সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ব্রিটেনকে মনে রাখতে হবে, এটি এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যুগ নয়। আপনারা হাজার হাজার বিদেশী ছাত্রকে স্টুডেন্ট ভিসা দিয়ে (বিরাট অংকের অর্থের বিনিময়ে) নিজ দেশে নিয়ে যাবেন এবং তারা সেখানে নিম্নমানের কালেজে ভর্তি হবে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে, যার অনুমোদন ব্রিটিশ সরকার দিয়েছে এবং কিছ- সময় পর সেসব ছাত্রকে ব্রিটেন ত্যাগে বাধ্য করবেন, এটা তো কোন সৎ উদ্দেশ্যের কাজ হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যে বা মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতারিত হয়ে যেমন অনেক শ্রমিক সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসে, বিলেত যাত্রীদের ক্ষেত্রেও অনেকটা সেরকম অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এটি বন্ধ করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে, বাংলাদেশের সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। দেশে এখন প্রায় একান্ন ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে সুযোগটা না থাকলে হয়তো এদের অনেকেই বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হতো। সুতরাং এখন সরকারকে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা নিয়ে প্রতারণার কথা না বললে লেখাটা অসমাপ্ত থেকে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র বাজার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র বলে সে দেশে টাকা দিলে সবকিছু পাওয়া যায়। ডিগ্রিও সহজলভ্য। অবশ্য তা কোন প্রতিষ্ঠিত এবং স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নয়। এগুলোকে বলা হয় ব্রিফকেস বা অ্যাপার্টমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকটা ব্রিটেনের কলেজগুলোর মতো, তবে তাদের কাজ করার ধরন আলাদা। ডিজিটাল যুগে তারা অনলাইনে ডিগ্রি দেয়। একেবারে সরাসরি পিএইচডি পেতে পারে যে কেউ। পাঁচ থেকে দশ হাজার ডলার খরচ করে নাম নিবন্ধন করতে হয়। বিএ, এমএ ডিগ্রির জন্য রেট একটু কম। বছরখানেক পর দেখা যাবে, যে মানুষটিকে আপনি কখনও লেখাপড়া নিয়ে কোন কথা বলতে শোনেননি তিনি হঠাৎ করে নামের পাশে বিরাট করে ‘ডক্টর’ লিখছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে সবাইকে জানান দিচ্ছেন। আসলে শিক্ষা নিয়ে জালিয়াতি বা বাণিজ্য এখন সারা দুনিয়াতেই হচ্ছে। সব শেষে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সাফল্য কামনা করি এবং আশা করব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও এ ব্যাপারে একটা জোরালো ভূমিকা রাখবে। তাতে অন্তত এদেশের কিছু মানুষ প্রতারণার হাত থেকে বাঁচবে এবং কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে পাচার বন্ধ হবে। যারা নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে উচ্চশিক্ষার্থে নিজ সন্তানকে বিদেশ পাঠাবেন বলে ঠিক করেছেন, তা করার আগে ভালো করে খোঁজখবর নিন, যথাযথ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আপনার সন্তানটিকে পাঠাচ্ছেন কিনা! না হয় প্রতারিত হওয়ার যথেষ্ট সম্্‌ভাবনা রয়েছে।

আবদুল মান্নানঃ শিক্ষক, ইউল্যাব, ঢাকা, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সত্ত্বেও আরো গোপন তথ্য ফাঁস: উইকিলিকসে বাংলাদেশ বিষয়ে ২১৮২ নথি


অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সত্ত্বেও আরো গোপন তথ্য ফাঁস

সবকিছুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী :অস্ট্রেলিয়া

যৌন অপরাধের মামলায় প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার হওয়া সত্বেও থামানো যাচ্ছে না তার সাড়া জাগানো সৃষ্টি ওয়েবসাইট-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁস করে দুনিয়াজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলা উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসাঞ্জ মঙ্গলবার ব্রিটেনে গ্রেফতার হন। সুইডেনের একটি গ্রেফতারি পরোয়ানায় তাকে আটক করা হয়। দু’জন মহিলার উপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ আগেই পরোয়ানা জারি করেছিল।

তবে অস্ট্রেলিয়া বলেছে, উইকিলিকসে আড়াই লাখ কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী, সংবাদমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নন। অ্যাসাঞ্জকে সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তার দেশ অস্ট্রেলিয়া। খবর বিবিসি, এপি ও এএফপির।

যৌন অপরাধের অভিযোগ জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ব্রিটেনে গ্রেফতার হলেও গতকাল বুধবার তার প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস আরো গোপন তথ্য ফাঁস করেছে। ওয়েবসাইটের এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, সামনে আরো গোপন তথ্য প্রকাশ্যে আনবে উইকিলিকস। উইকিলিকস মুখপাত্র ক্রিস্টিন রাফসোন টুইটারে এক ক্ষুদ্রবার্তার সহায়তায় গতকাল বলেন, নতুন আরো গোপন তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। আমাদের মিডিয়া পার্টনাররা সময়মতো এগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারবে। করপোরেট সেনসরশিপ আরোপ করে কিংবা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। উইকিলিকস অনলাইনে আছে। সম্পূর্ণ ওয়েবসাইটটি ৫০০ এর বেশি স্থান থেকে অনুলিপি করা আছে। তাই সাইটটি বন্ধ হবার আশংকা মিথ্যা।’ উইকিলিকস সর্বশেষ যে গোপন তথ্য ফাঁস করেছে তাতে আছে ব্রিটেন-লিবিয়া কুটনৈতিক সম্পর্ক, লকারবি বোমারু মেগরাহি ইসু্য, সৌদি যুবরাজ সম্পর্কিত তথ্য, ইত্যাদি।

মঙ্গলবার লন্ডন পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, অনৈতিক বলপ্রয়োগের একটি ধারা, যৌন নিপীড়নের দুইটি ধারা ও ধর্ষণের একটি ধারায় সুইডিশ কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। এ অপরাধগুলোর সব কয়টি ২০১০ সালের আগস্টে ঘটেছে। একারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র দায়ী ঃ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেভিন রাড বলেছেন, উইকিলিকসে আড়াই লাখ কূটনৈতিক নথি ফাঁস হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী, সংবাদমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নন। কেভিন রাড বলেন, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রবাহে তার সম্পর্কে যে সমালোচনা হয়েছে করা হয়েছে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। কেভিনের এ অবস্থানকে সমর্থন করেছেন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড। কেভিনের মন্তব্যেরও প্রশংসা করে গিলার্ড বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত চমৎকার কাজ করছেন।’

উইকিলিকসের স্রষ্টা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ লন্ডনে গ্রেফতার

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ


অবশেষে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় দোসররা। দুই সুইডিশ নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার করা হল বর্তমানে বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করা ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকসের’ স্রষ্টা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে। বিবিসি, পিপিআই।
বেশ কিছুদিন ধরেই ব্রিটেনে বসবাসকারী অ্যাসাঞ্জ মঙ্গলবার তার আইনজীবীদের নিয়ে লন্ডনে মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এর পরই তাকে সুইডেনে জারি হওয়া ওয়ারেন্টের আওতায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। তাকে এরপর ওয়েস্ট মিনিস্টার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তোলা হয়। সেখানে অ্যাসাঞ্জের আইনজীবীরা তার জামিন আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যান করেন আদালত। আদালতে অ্যাসাঞ্জ জানান, তাকে জোর করে সুইডেনে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবেন তিনি। এদিকে আদালতে পাঁচ বিশিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিক অ্যাসাঞ্জের জামিনদার হতে চান। এদের মধ্যে রয়েছে প্রখ্যাত সাংবাদিক জন পিলগার, সমাজকর্মী ও কিংবদন্তী ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা। ৩৯ বছর বয়স্ড়্গ অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক অ্যাসাঞ্জ একজন পেশাদার কম্পিউটার হ্যাকার। পেন্টাগনসহ মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হ্যাক করে বিশ্ব রাজনীতির লাখ লাখ গোপন তথ্য বের করে আনেন তিনি। এরপর উইকিলিকস নামক ওয়েবসাইটটি তৈরি করে ওইসব তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন অ্যাসাঞ্জ। ফাঁস হয়ে যায় মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথিত ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নানা গোপন কাহিনী। জনগণ আঁতকে উঠেন ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র অত্যাচার-নির্যাতনের কথা শুনে। কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানের কুকীর্তির তথ্য ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের নিজেদের ইশারায় নাচায় এ তথাকথিত বন্ধুপ্রতিম দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক নোংরা কাহিনী ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আঁতে ঘা লাগে এই বিশ্ব পরাশক্তির। হুমকি-ধমকি দিয়ে উইকিলিকসকে ডোমেইন বরাদ্দ দেয়া প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করে তাদের ডোমেইন প্রত্যাহার করে নিতে। এতে সফলও হয় তারা। বন্ধ হয়ে যায় উইকিলিকস। কিন্তু তা মাত্র কয়েকঘণ্টার জন্য। এরপর ওয়েব ঠিকানা সামান্য পরিবর্তন করে আবারও সচল হয় উইকিলিকস। এরই মধ্যে ২০০৯-এ সুইডেনে দায়ের হওয়া ওই যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। অ্যাসাঞ্জ অবশ্য বরাবরই নিজেকে নির্দোষ ও একে যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো নাটক হিসেবেই দাবি করে আসছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ের পরম বন্ধু সাদ্দামকে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য নিজেদের সৃষ্টি করা তালেবান ও আল কায়দাকে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর নির্মূল করতে উঠেপড়ে লাগা যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস ঘাটলে অ্যাসাঞ্জের দাবিকে চিরায়ত সত্যের মতোই মনে হবে। তবে ঘটনা যাই হোক, সত্যের জয় হবে এমনই প্রত্যাশা সবার।

————————————————————————————————————————
বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার
তথ্য ফাঁস নয়, অভিযোগ যৌন নিপীড়নের

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটেনে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে লাখ লাখ মার্কিন গোপন তথ্য ফাঁসের জন্য নয়, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তথাকথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগে। গতকালই তাকে আদালতে হাজির করার পর জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়ায় উইকিলিকসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এতে আমাদের গোপন ফাইল প্রকাশ বন্ধ হবে না। খবর বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স ও অন্যান্য সূত্রের।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড জানিয়েছে, অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকায় লন্ডনের পুলিশ গতকাল সকালে তাকে গ্রেফতার করেছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড আরো বলেছে, অ্যাসাঞ্জ নিজেই তার আটকের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। লন্ডন পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অনৈতিক বলপ্রয়োগের একটি ধারা, যৌন নিপীড়নের দু’টি ধারা ও ধর্ষণের একটি ধারায় সুইডিশ কর্তৃপক্ষ অনলাইন পত্রিকাটির সম্পাদক অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। সব অপরাধ ২০১০ সালের আগস্টে ঘটেছে।’ এর আগে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সুইডেন সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
আলজাজিরা জানায়, মিডিয়ার খবরে বলা হয়, আগস্টে সুইডেন সফরকালে অ্যাসাঞ্জ দুই নারীর সাথে শুয়েছিলেন। তাদের একজনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সুইডিশ পত্রিকা একটি অদ্ভুত তথ্য জানায়। বলা হয়, সম্মতিক্রমেই সেক্স শুরু হলেও শেষটা নাকি হয় ‘বলপূর্বক’। তবে পেন্টাগনের মদদে এই অভিযোগ আনা হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ওই নারী প্রত্যাখ্যান করেন। এএফপি জানায়, ওই দুই নারী ছিলেন উইকিলিকসের স্বেচ্ছাসেবী। অ্যাসাঞ্জ চলতি বছরের প্রথম দিকে বেশ কিছু দিন সুইডেনে ছিলেন।
অ্যাসাঞ্জ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে এটিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে তার আইনজীবী বর্ণনা করেছেন রাজনৈতিক চমক হিসেবে।
গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা পর গতকালই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কালো গাড়িতে করে তাকে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করার সময় রাস্তাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। গ্রেফতারের পর তাকে আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্র জানায়।
সুইডিশ কৌঁসুলিরা অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বেশ জটিলতায় পড়েছেন। প্রথমে তারা যে মামলাটি করেছিলেন, সেটা তারা প্রত্যাহার করেন। তারপর আবার তারা অভিযোগের তদন্ত শুরু করেন।
উইকিলিকসের মুখপাত্র হরাফনসন গতকাল রয়টার্সকে বলেন, অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি হামলা। উইকিলিকস কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আগের মতোই একইভাবে কাজ করে যাবো। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসবে না।
এর আগে অ্যাসাঞ্জ নিজেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, তাকে গ্রেফতার করা হলে তার সহকর্মীরা আরো ভয়াবহ তথ্য ফাঁস করে দেবে। তার কাছে গুয়ানতানামো বেসহ মারাত্মক সব তথ্য এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বিমান হামলায় বেসামরিক লোকের প্রাণহানির ভিডিওচিত্রও আছে বলে তিনি দাবি করেন। উইকিলিকসের মুখপাত্র বলেন, উইকিলিকস লন্ডন ও অন্যান্য গোপন স্থান থেকে একটি গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বিবিসি জানায়, গ্রেফতারের আগে অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী মার্ক স্টিফেনস জানিয়েছিলেন, ‘পুলিশের কাছে তার স্বেচ্ছায় যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’ তিনি জানান, তার মক্কেল অভিযোগগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। সোমবার রাতে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে জানিয়েছিল, তারা সুইডিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পেয়েছে।
মার্ক স্টিফেনসের উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরা জানায়, উইকিলিকসের তথ্য ফাঁসে ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রই এসব অভিযোগ উত্থাপনের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।
অ্যাসাঞ্জের লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী জেনিফার রবিনসন বলেন, তার মক্কেল তাকে সুইডেনে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ প্রতিরোধ করবেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করছেন, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হতে পারে। তবে আইনি জটিলতা থাকায় তাকে শিগগিরই সুইডেনে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে না বলে আইনজীবীরা দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, ইরাক, আফগান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ গোপন নথি উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হলে বিপাকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। গত ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পাইপলাইন, যোগাযোগ ও পরিবহন, ক্যাবল লোকেশন, স্যাটেলাইট ও বিএই সিস্টেম প্লান্টসহ বেশ কিছু গোপন স্থাপনার তালিকা প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে ওই সব স্থাপনা এখন সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার মুখে রয়েছে। এসব তথ্য ফাঁসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে অন্য দেশগুলোর কাছে দুঃখও প্রকাশ করতে হয়। আরো অনেক বিশ্বনেতার তোপের মুখেও পড়েন জুলিয়ান।
৩৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় নাগরিক অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় না দিতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটন আহ্বান জানায় বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। সোমবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ যুক্তরাজ্যসহ স্পর্শকাতর অবস্থানের তথ্য ফাঁস করায় উইকিলিকসের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তারা সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারাহ পলিন অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে রক্তমাখা হাতে মার্কিনবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ আনেন। অ্যাসাঞ্জের নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছ থেকেও তার সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ইতোমধ্যে অ্যাসাঞ্জের সমালোচনা করেছেন। তিনি নথি প্রকাশকে বেআইনি কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ইন্টারনেট সার্ভিস যোগানদাতা প্রতিষ্ঠান উইকিলিকসকে সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তারা সুইস সার্ভার নিতে বাধ্য হয়। সোমবার সুইস কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অ্যাসাঞ্জ তার আবাসস্থল সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে এক সপ্তাহে অ্যাসাঞ্জ এক লাখ ইউরো হারিয়েছেন। পোস্ট ফিনান্সের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাথে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ তার স্থায়ী নিবাস হিসেবে জেনেভা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তার সুইজারল্যান্ডে বসবাসের কোনো প্রমাণ না থাকায় তিনি পোস্ট ফিন্যান্সের সাথে ভোক্তার সম্পর্ক রাখার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। এ কারণে ব্যাংক তার অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার রাখে।
উইকিলিকস এক বিবৃতিতে জানায়, গত সপ্তাহে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিশোধের বড় প্রতিষ্ঠান পেপ্যাল জার্মান দাতব্য সংস্থা ওয়াও হল্যান্ড ফাউন্ডেশনের ৬০ হাজার ইউরো জব্দ করেছে। এ প্রতিষ্ঠান পরোক্ষভাবে উইকিলিকসকে সহায়তা করে থাকে।
সম্প্রতি ওবামার পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করে অ্যাসাঞ্জ বলেন, যদি দেখা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের গোয়েন্দা লাগানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেন তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, যিনি এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি যদি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে দেখতে চান তাহলে তাকে পদত্যাগ করা উচিত।
প্রকাশিত ওই নথিগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো, জাতিসঙ্ঘের কর্মকাণ্ড গোপনে মনিটরিং করা, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে বলা হয়েছিল তিনি যেন জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তার টেলিফোন, ই-মেইল ও ক্রেডিট কার্ডসহ যাবতীয় বিষয়ে গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখেন।
চমস্কির স্বাক্ষরঃ এএফপি জানায়, বিখ্যাত মার্কিন বুদ্ধিজীবী, ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের পক্ষাবলম্বন করে তাকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়ান গিলার্ডের কাছে পাঠানো একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজির (এমআইটি) অধ্যাপক ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচক নোয়াম চমস্কি ওই চিঠিতে গিলার্ডকে তিনি এ বিষয়ে দৃঢ়তাপূর্ণ বিবৃতি দেয়ার জন্যও বলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আইনজীবী, লেখক ও সাংবাদিক এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে লেখা রয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার বংশোদ্ভূত অ্যাসাঞ্জকে লক্ষ্য করে ক্রমবর্ধমান সহিংস বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা বলেন, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে স্প্যারো ও মানবাধিকার আইনজীবী লিজি ও’শেরার লিখিত চিঠিটিতে গিলার্ডকে অবাধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার অস্ট্রেলিয়ার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।

————————————————————————————————————————
উইকিলিকসে বাংলাদেশ বিষয়ে ২১৮২ নথি

কালের কণ্ঠ, Sun 5 Dec 2010
ওয়েবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিসহ গোটা বিশ্বের যে আড়াই লাখ নথি ফাঁস করার মিশনে নেমেছে, তার মধ্যে দুই হাজার ১৮২টি বাংলাদেশবিষয়ক। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত উইকিলিকস তার ওয়েবসাইটে ৬৮৩টি নথি প্রকাশ করেছে। বাকিগুলো গুরুত্ব বুঝে পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক মাসে প্রকাশ করা হবে বলে উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, ১৯৬৬ সাল থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দেশটির ২৭৪টি দূতাবাসের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া নথি ওয়েবসাইটটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে। তবে উল্লেখযোগ্য নথিগুলোর উৎস দেখানোর জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখচিত্রে (গ্রাফ) ৪৫টি দূতাবাস স্থান পেয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৩৭ নম্বর অবস্থানে আছে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস।

উইকিলিকস সূত্রে জানা গেছে, প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য নথির মধ্যে আট হাজার ৩২০টি চীনবিষয়ক, সাত হাজার ৯৫টি আফগানিস্তানবিষয়ক, পাঁচ হাজার ৮৭টি ভারতবিষয়ক এবং চার হাজার ৭৭৫টি পাকিস্তানবিষয়ক। গতকাল বিকেল পর্যন্ত প্রকাশিত নথির চারটিতে বাংলাদেশের নাম এসেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি প্যারিসের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে এবং বাকি দুটি ইসলামাবাদের দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো। ইসলামাবাদের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাঠানো নথিতে বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার আস্তানা থাকতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের দূতাবাস থেকে পাঠানো নথিতে ২০০৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবেদনের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরক্কো থেকে আসা কমপক্ষে ২০ জন ইমামকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা এতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে ২০০৬ সালে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নথিতে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে ডিএনএ পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো নথিতে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের ব্যাপারে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত ফাঁস হওয়া এমন সাতটি নথি রয়েছে যেগুলোর অনুলিপি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে এসেছে। এগুলো হলো শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ বিষয়ে ‘শ্রীলঙ্কা ওয়ার ক্রাইম অ্যাকাউন্টিবিলিটি : দ্য তামিল’, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ইস্যুতে পাকিস্তান সরকারকে চাপে রাখার বিষয়ে ‘টেরর ফিন্যান্স : এমবাসি প্রেসেস গভর্নমেন্ট অব পাকিস্তান অন ইউএন ১২৬৭’, ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার না করতে আমেরিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের কাছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অনুরোধ বিষয়ে ‘মোশাররফ টেলস ম্যাককেইন : ডোন্ট পুল আউট ফ্রম ইরাক’, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল স্কুমেকার এবং দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক বিষয়ে ‘প্রেসিডেন্ট মোশাররফ ব্রিফস জেনারেল স্কুমেকার অ্যান্ড’, আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি রিচার্ড বাউচারের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক প্রসঙ্গে ‘মোশাররফ টেলস বাউচার অ্যাবাউট পাকিস্তানস প্ল্যান ফর’, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি সভার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক বিষয়ে ‘প্রেসিডেন্ট মোশাররফ মিটস স্পিকার পেলোসি’ এবং ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার আস্তানা থাকতে পারে বলে ধারণা পোষণ বিষয়ে ‘প্রিজার্ভিং ইনফরমেশন শেয়ারিং’

—————————————————————————————————-
নিজেদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে উইকিলিকস কর্তৃপক্ষ

প্রথম আলো, Sun 5 Dec 2010
উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গোপন বার্তা প্রকাশের পর থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অ্যাসাঞ্জ বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা যেকোনো হুমকি থেকে নিজেদের বাঁচাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত শুক্রবার অজ্ঞাত স্থান থেকে অনলাইনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এসব কথা বলেন। তাঁর এ সাক্ষাৎকার ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ান-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে অ্যাসাঞ্জ নতুন করে আরও তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, ভিনগ্রহের প্রাণী (এলিয়েন) ও অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু (ইউএফও) সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্যও তিনি প্রকাশ করবেন। তিনি তরুণ মার্কিন সেনা ব্রাডলি ম্যানিংকে �অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক� বলে আখ্যায়িত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখার এই সেনাই সে দেশের গোপন দলিলপত্র উইকিলিকসের কাছে পাচার করেছেন। পুলিশ চলতি বছরের মে মাসে ম্যানিংকে গ্রেপ্তার করে।

অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, তাঁকে কেউ হুমকি দিলে তা হত্যার প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, �আমাদের জীবনের হুমকির বিষয়টি সবারই জানা। পরাশক্তির সঙ্গে পেরে উঠতে এ বিষয়ে আমরা যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি।� নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী বলেছেন, যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তাঁর মক্কেলকে সুইডেনের কাছে হস্তান্তরের সব প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর বিশ্বাস, বিদেশি শক্তিগুলো সুইডেনকে এ ব্যাপারে প্রভাবিত করছে।
এদিকে সুইডেন কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এরই মধ্যে ব্রিটেনের কাছে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজপত্র হস্তান্তর করেছে। ১০ দিনের মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মাইক হুকাবি বলেছেন, যে ব্যক্তিই গোপন মার্কিন দলিল প্রকাশ করুক না কেন, তার বিচার করতে হবে।
আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর গোপন দলিল প্রকাশ করে উইকিলিকস বিশ্বব্যাপী আলোচনার ঝড় তোলে। সর্বশেষ তারা বিপুল পরিমাণ গোপন মার্কিন কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশ করে। এ নিয়ে উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের তোপের মুখে পড়ে।

এর পর থেকেই তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অ্যাসাঞ্জ দাবি করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিল ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার দি ইনডিপেন্ডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ সম্ভবত দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কোনো এক জায়গায় অবস্থান করছেন। ব্রিটেনের পুলিশ তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছে।

—————————————————————————————————-

আত্মপক্ষঃ রহস্যজনক প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস

এবনে গোলাম সামাদ

সম্প্রতি উইকিলিকস (WikiLeaks) ওয়েবসাইট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। এসব গোপন তথ্য উইকিলিকস কিভাবে সংগ্রহ করতে পেরেছে সেটা বিস্ময়কর। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়, আরো অনেক রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করছে উইকিলিকস। তাই উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য যে বানোয়াট, তা কোনো রাষ্ট্রই বলছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পাকিস্তানের পরমাণু চুল্লি থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এটা হতে দেয়নি। উইকিলিকস এই তথ্য ফাঁস করেছে পাকিস্তানের একজন সরকারি মুখপত্র বলেছেন, উইকিলিকসের দেয়া তথ্য যথার্থ। উইকিলিকসের ফাঁস করা সব তথ্যই মনে হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ আর এর আছে দালিলিক ভিত্তি। কী করে একটি প্রতিষ্ঠান এত দলিল সংগ্রহ করতে পারল, সেটা অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে বিস্ময়কর।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জি (Julian Assange) একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। তার জন্ম সে দেশে। অ্যাসাঞ্জি বলেছেন, তার সাথে সর্বক্ষণ কাজ করে মাত্র পাঁচজন। আর এ ছাড়া যারা কাজ করে তারা কেউই সার্বক্ষণিক নয়। প্রায় ৮০০ লোক পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সহযোগিতা করছে অ্যাসাঞ্জিকে। উইকিলিকস নাম দুটো শব্দকে একত্রে মিলিয়ে তৈরি। উইকি (Wiki)শব্দটা হাওয়াই দ্বীপের ভাষা থেকে পাওয়া। শব্দগত অর্থ হলো দ্রুত। আর খপথর শব্দটা ইংরেজি। এর একটা মানে হলো ফাঁস করা। শব্দগত অর্থে তাই উইকিলিকস বলতে বোঝাচ্ছে ‘দ্রুত ফাঁস করা’। অ্যাসাঞ্জি ঘোষণা করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে প্রধানত বিভিন্ন দেশের সরকারের গোপন তথ্য ফাঁস করা। যাতে বিভিন্ন দেশের সরকারকে সেসব দেশের মানুষের কাছে হতে হয় জবাবদিহিতার মুখোমুখি। উইকিলিকস বস্তুনিষ্ঠভাবে বিভিন্ন দেশের সরকারের স্বরূপ করে চলবে উন্মোচন।

উইকিলিস প্রতিষ্ঠানের মালিক অ্যাসাঞ্জি নন। এর মালিক হলো সানশাইন প্রেস (The Sunshine Press)। উইকিলিকস শুরু হয়েছে ২০০৬ সালে। কিন্তু মাত্র এই কয় বছরে তা হয়ে উঠেছে বিশেষ আলোচ্য ও তথ্যের উৎস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের New York Times, বিলাতের The Guardian, জার্মানির Der Spiege , এবং ফ্রান্সের Le monde Gog এসব পত্রিকা খুবই নামকরা। আর হালকা ধরনের নয়। এসব পত্রিকায় ছাপানো হচ্ছে উইকিলিসের ফাঁস করা তথ্য। আর বিভিন্ন দেশের পাঠক সমাজের কাছে তা গৃহীত হচ্ছে নির্ভরযোগ্য হিসেবে। উইকিলিকস সম্প্রতি ফাঁস করেছে, সৌদি আরবের বাদশা আবদুল্লাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন, সে যেন ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আঘাত করে। বাদশা আবদুল্লাহ চেয়েছেন ইরানের পরমাণু স্থাপনার ধ্বংস। উইকিলিকসের দেয়া এই তথ্য ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে নিশ্চয় সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটাবে। খবরটি এমনই এক সময় উইকিলিকসের পক্ষ থেকে ফাঁস করা হলো, যখন বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ইরান ও সৌদি আরব তাদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে ইচ্ছুক।

উইকিলিকস দাবি করেছে, তার হাতে আছে আফগানিস্তানের ওপর ৭৬ হাজার ৯০০ দলিল, যা সে প্রকাশ করবে আফগানিস্তান সম্পর্কে মার্কিন নীতিকে উন্মোচিত করার জন্য। উইকিলিকস বলেছে, চীনের লক্ষ্য হচ্ছে দুই কোরিয়াকে এক করে একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সেখান থেকে মার্কিন সৈন্যের অপসারণ। উইকিলিকস সেটা বলেছে, চীনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গোপন বক্তব্য উদ্ধৃৃত করে। প্রশ্ন উঠেছে উইকিলিকস এত সব গোপন তথ্য কী করে সংগ্রহ করতে পারছে? এসব তথ্য সংগ্রহ করতে নিশ্চয় তার ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তার এই অর্থের উৎস জানা যাচ্ছে না। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, তথ্য প্রচারের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক ব্রাডলি ম্যানিংকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি গোপন তথ্য দিয়েছেন অ্যাসাঞ্জিকে। অ্যাসাঞ্জি বলেছেন, ব্রাডলি ম্যানিংয়ের মামলার সব খরচ তিনি বহন করবেন উইকিলিকসের পক্ষ থেকে। এই মামলায় প্রচুর অর্থ লাগবে। অ্যাসাঞ্জি এই অর্থ কোথা থেকে পাবেন তা নিয়ে দেখা দিচ্ছে প্রশ্ন। অর্থাৎ উইকিলিসককে যে ধরনের প্রতিষ্ঠান বলা হচ্ছে সে তা নয়। এর পেছনে আছে একটা শক্তিমান চক্র। যারা সাহায্য করে চলেছে অ্যাসাঞ্জিকে।

উইকিলিকসের কোনো সদর দফতর নেই। উইকিলিকসের কাজ চলেছিল সুইডেনকে নির্ভর করে। কিন্তু সুইডেনে অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে যৌন হয়রানির। অ্যাসাঞ্জির বয়স ৩৯। তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। অনেকে বলছেন, অ্যাসাঞ্জিকে বিপাকে ফেলার জন্যই করা হয়েছে এই মামলা। প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, তিনি একজন যৌন বিকারগ্রস্ত মানুষ। শোনা যাচ্ছে অ্যাসাঞ্জি এখন আছেন বিলাতে, কিন্তু বিলাতের পুলিশ নাকি তাকে ধরতে আগ্রহী নয়। তাই তিনি এখনো ধরা পড়েননি। বিলাতের পুলিশ কেন তাকে ধরতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, সেটা স্পষ্ট নয়। অ্যাসাঞ্জিকে মনে হয় রক্ষা করার চেষ্টা হচ্ছে কোনো বিশেষ মহল থেকে। উইকিলিকসের জন্ম বেশি দিন হয়নি। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে এর কর্মকা । কিন্তু ইতোমধ্যেই তা প্রতিষ্ঠা পেতে পেরেছে একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সে দেশে অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা করা হবে গোপন তথ্য চুরি করার অভিযোগে। কিন্তু অ্যাসাঞ্জি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থেকে এই কাজ করনেনি। তাই মার্কিন আদালতে এই মামলার বৈধতা নিয়ে থাকবে প্রশ্ন। অন্য দিকে ব্রিটেনে তার বিপক্ষে কোনো মামলা করা যাবে না, কারণ তিনি ব্রিটেন থেকে কোনো তথ্য চুরি করেননি। এ ছাড়া ব্রিটেনের আইন বলে (বিল অব রাইটস-১৬৮৯ খ্রিঃ) মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সংবাদপত্রে বিলাতে কোনো খবর ছাপাতে বাধা নেই। বিলাতের আইনে তাই অ্যাসাঞ্জিকে বলা যাচ্ছে না কোনোভাবেই অপরাধী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও আইন আছে খবর জানার অধিকারের। অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা উঠলে নিশ্চয় এই অধিকার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে গোপন তথ্য সংরক্ষণের কড়াকড়ি। কিন্তু তথাপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হতে পারছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সচিব) বলেছেন, অ্যাসাঞ্জি যা করছেন তা হলো তথ্য সন্ত্রাস। আর এই তথ্য সন্ত্রাসের ফলে কেবল যে মার্কিন স্বার্থই বিপন্নই হচ্ছে তা নয়, তার মিত্রদেরও পড়তে হচ্ছে বিপাকে। ফলে বিশ্বশান্তি বিপন্ন হতে পারে। বিপন্ন হতে পারে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা। অ্যাসাঞ্জি ঘোষণা করেছেন, উইকিলিকসের হাতে আছে এমন দলিলপত্র যা প্রকাশিত হলে মানুষ জানতে পারবে মার্কিন ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা। তিনি এসব দলিল প্রকাশের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। অ্যাসাঞ্জি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কী করে এত দূর ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারলেন, সেটা থাকছে অজ্ঞাত। সে যা হোক, উইকিলিকস হয়ে উঠেছে সারা বিশ্বের পত্রপত্রিকার বিশেষ খবর। উইকিলিকস যদি বিভিন্ন দেশের খবর ফাঁস করে চলতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবেই তা প্রভাবিত করতে সক্ষম হবে বিশ্ব রাজনীতির ধারাকে।

লেখকঃ প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info

%d bloggers like this: