প্রকট হচ্ছে আয়বৈষম্য


প্রকট হচ্ছে আয়বৈষম্য

এম এম মুসা ● সরকারি পরিসংখ্যান বলছে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ৭০০ ডলার অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা। দৈনিক এক দশমিক ৯২ ডলার অর্থাৎ প্রায় ১৩৭ টাকা। তবে মাথাপিছু এই আয় বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দারিদ্র্য, অতিদরিদ্রের সংখ্যা, বাড়ছে কোটিপতি। একদিকে এই আয় বৃদ্ধি অন্যদিকে দরিদ্রবৃদ্ধির এই প্রবণতা কেন? বিশ্বব্যাংক বলছে বাংলাদেশ শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের সাড়ে ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে চলতে থাকলে ২০১০ সালে দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দশমিক তিন শতাংশ বাড়বে। ২০১১ সালে আরো প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামবে। জাতিসংঘ ঘোষিত দারিদ্র্যসীমা এক দশমিক ২৫ ডলার অনুযায়ী ২০১১ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে আট কোটি। এর কারণ চরম আয়বৈষম্য। আয়বৈষম্য ও খাদ্যমূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং অর্থনীতি থমকে গেছে। গুটিকয় মানুষের আয় ব্যাপক হারে বাড়ায় দেশের জাতীয় আয় বেড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বৈষম্য, দরিদ্র, ভাসমান মানুষের সংখ্যা ও বেকারত্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি অবশ্যই চিন্তার কারণ। এর অর্থ দাঁড়ায় দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর তালুবন্দি হচ্ছে। সম্পদের সমবণ্টন নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব ছিল চার দশকের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সরকারগুলোর, তা পালন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তারা।

আয়বৈষম্য : সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের আয়বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। সরকার ঘোষিত সাতটি জাতীয় বেতনকাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি বেতনকাঠামোতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয়ের পার্থক্য বেড়েছে। ২০০৯ সালে ঘোষিত সপ্তম জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৯০০ টাকা, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ। সাধারণ নিয়মে নিম্নতম ও উচ্চতম মজুরির পার্থক্য হওয়া উচিত এক অনুপাত ১০। যদিও এটি নিয়ে বির্তক রয়েছে তথাপিও সেটি ভঙ্গ করা হয়েছে সপ্তম মজুরিকাঠামোয়। ২০০৯ সালের জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ বেতন ৪০ হাজার টাকা আর সর্বনিম্ন মাত্র চার হাজার ১০০ টাকা। ২০০৫ সালে জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ বেতন ছিল ২৩ হাজার এবং সর্বনিম্ন দুই হাজার ৪০০ টাকা। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের পার্থক্য ছিল ২০ হাজার ৬০০ টাকা। দ্বিতীয় জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের পার্থক্য ছিল দুই হাজার ৭৭৫ টাকা। তৃতীয় জাতীয় বেতনকাঠামোয় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের পার্থক্য ছিল পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। চতুর্থ ও পঞ্চম বেতন কাঠামোয় এই ব্যবধান ছিল যথাক্রমে নয় হাজার ১০০ ও ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।

জাতীয় বেতনকাঠামো ২০০৯ অনুযায়ী নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন কম হারে বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ চারটি গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন অধিক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম থেকে চতুর্থ গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে ৭২-৭৪ শতাংশ। এখানে প্রথম গ্রেড থেকে নিচের গ্রেডের বেতনবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। পক্ষান্তরে ১০ হতে ১৮ নম্বর গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য বেতন ২০০৫ সাল থেকে বৃদ্ধি করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৫৬ থেকে সর্বোচ্চ ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত। এভাবেই প্রতি বেতনকাঠামোয় নিম্নতম ও উচ্চতম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয়বৈষম্য বাড়ছে।

আয়বৈষম্য বেড়েছে সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতে আরো অনেক বেশি। গার্মেন্টস খাতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এক হাজার ৬৬০ টাকা। অথচ একজন ব্যবস্থাপকের বেতন সর্বনিম্ন এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ সাত লাখ টাকা। এখানে আয়বৈষম্য হাজার নয়, লাখে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারিত থাকলেও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত নয়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভেদে বেতন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে বেতন বেশি, সেখানে আয়বৈষম্যও অপেক্ষাকৃত বেশি। প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী পাঁচ বছর পর পর ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা থাকলেও দুই-একটি শিল্প খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে তা মানা হয়নি। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো দারিদ্র্য নিরসনে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির হার দিনপ্রতি দুই ডলারে উন্নীত করা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চার বছর বাকি থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান এখনো অনেক পেছনে।

আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট : অঞ্চলভেদেও আয়বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে অঞ্চলভেদে আয়ের পার্থক্য বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শ্রম মজুরির ব্যাপক পার্থক্যের প্রভাব পড়ছে পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়। কৃষি ও অন্যান্য খাতে দেশের মধ্যাঞ্চলের আয় সবচেয়ে বেশি। আর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আয় এ দুটি খাতে সবচেয়ে কম। এসব অঞ্চলের মজুরিকাঠামো নির্ভর করে কৃষি মৌসুমের ওপর। মৌসুম শেষ হলে মজুরির পরিমাণও কমে যায়। গত বছর পরিচালিত মাঠপর্যায়ের সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের পূর্ব জনপদের জেলাগুলোয় মাথাপিছু দৈনিক আয় কৃষি খাতে ২২৩ এবং অন্যান্য খাতে ২১৩ টাকা। মধ্যাঞ্চলে এ আয় যথাক্রমে ২১৯ ও ৩১৩ টাকা; উত্তরাঞ্চলে ১৬৪ ও ১৯৭ এবং দক্ষিণাঞ্চলের ১৫৩ ও ১৬৪ টাকা। কয়েক বছরের মজুরি হার বিশ্লেষণ করে বিআইডিএস দেখিয়েছে, অঞ্চলভেদে মজুরিবৈষম্য প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের সীমান্তবর্তী ৩০ জেলার মধ্যে কেবল তিনটি ছাড়া সবকটির অর্থনৈতিক অবস্থাই করুণ। পিছিয়েপড়া এসব জেলার মাথাপিছু আয় বছরে ৩৫০ ডলারের নিচে। বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচন এখনো অনেক বড় ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমা শূন্য দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ধনী ও গরিব মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামের মানুষের আয়ের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ব্যবধান।

বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা : আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকিং খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৩১০ জন এবং এদের মোট আমানতের পরিমাণ হচ্ছে এক লাখ ৫৪৪ কোটি টাকা। ১৯৭৫ সালে দেশে বৈধ কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ জন এবং ২০০৮ সালে ১৯ হাজারের বেশি। ২০০৮ থেকে ২০০৯-এ এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে চার হাজার ৩১০ জন। ৩৮ বছরে বেড়েছে ২৩ হাজার ২৬৩ জন। প্রায় চার দশকে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৫০০ গুণ। শতকরা হিসাবে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতকারীর দশমিক ছয় শতাংশ এবং আমানতের পরিমাণ হচ্ছে মোট আমানতের এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ মাত্র দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ কোটিপতি আমানতকারী ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ৩১ শতাংশের মালিক। ১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালে ব্যাংকিং খাতে কোটিপতি আমানতকারীদের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০ ও প্রায় ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের জুনে এই আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ২০ শতাংশ, ২০০১ সালের শেষে প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ এবং ২০০৬ সালে তা প্রায় ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়। অন্যদিকে ২০০৭ ও ২০০৬ সালে মোট কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬ হাজার ৬৩৩ জন ও ১৪ হাজার ৪৯ জন। আলোচ্য দুই বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে বছরওয়ারি গড়ে প্রায় আড়াই হাজার। এ ছাড়া ১৯৯০, জুন ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের শেষে দেশে মোট কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৪৩, দুই হাজার ৫৯৪ ও পাঁচ হাজার ৭৯৯ জন।

বাড়ছে দারিদ্র্য : ২০০৫ সালে পরিচালিত খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বিশ্বব্যাংকও দারিদ্র্য পরিমাপের নতুন হিসাবে দৈনিক মাথাপিছু আয় এক ডলার ২৫ সেন্ট নির্ধারণ করেছে, তাতে বাংলাদেশে দারিদ্রে্যর সংখ্যা আরো বেড়েছে বলে সংস্থাটি মনে করে। বর্তমানে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৯ অনুযায়ী ১০ বছরে মোট জাতীয় আয়ে সর্বনিম্ন অবস্থানের পাঁচ শতাংশ দরিদ্র মানুষের অংশীদারিত্ব কমে মাত্র দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাঁচ শতাংশ ধনীর অধিকারে রয়েছে মোট আয়ের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। দেশের সর্বনিম্ন পাঁচ শতাংশ চরম দারিদ্র্যপীড়িত আয় ২০০০ সালে মোট জাতীয় আয়ের দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২০০৫ সালে দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ ধনী পরিবারের আয় বেড়ে মোট জাতীয় আয়ের ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ দেশের মোট আয়ের মাত্র নয় শতাংশ ভোগের সুযোগ পাচ্ছে। অথচ সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ ভোগ করছে ৪৬ শতাংশ আয়। পরিবারভিত্তিক আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক জাতীয় আয়ের মাত্র ২০ দশমিক ৩২ শতাংশের অংশীদার। ১৯৯৫ সালে দেশে শীর্ষ পাঁচ শতাংশ ধনী ও সর্বনিম্ন পাঁচ শতাংশ দরিদ্রের আয়ের ব্যবধান ছিল ২৭ অনুপাত এক। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ২০০০ সালে এই ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৪৭ অনুপাত এক। ১৯৯৯ সালের তুলনায় ২০০৪ সালে দেশে গরিব মানুষের মাসিক ব্যয় বেড়েছে গড়ে ৫৬ টাকা। আর এ সময়ের মধ্যে আয় বেড়েছে মাত্র ১৯ টাকা। দারিদ্র্য না কমলেও প্রতিবছরই দারিদ্র্যবিমোচন খাতে ব্যয় বাড়ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে দারিদ্র্যবিমোচন খাতে সরকারি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। সাড়ে ছয় কোটি দরিদ্র মানুষের মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়ায় ১১ হাজার ৬৯৩ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এই খাতে খরচ হয়েছে ৬১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৫৬ শতাংশ।

সঙ্গীন সাধারণ মানুষ : দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৫ শতাংশ এখনো কাঁচাঘর ও ঝুপড়িতে বাস করে। রাতের বেলা প্রায় অর্ধেক পরিবারের আলোর ব্যবস্থা হয় এখনো কেরোসিনের বাতির মাধ্যমে। বিনোদনের জন্য ৬০ শতাংশ পরিবারের কোনো রেডিও বা টেলিভিশন নেই। প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পার করতে পারে এক-তৃতীয়াংশেরও কম শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উদ্যোগে পরিচালিত ‘মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পরিবীক্ষণ জরিপ : ২০০৯’-এর প্রতিবেদনে এসব চিত্রই পাওয়া যায়। মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পরিবীক্ষণ জরিপের তথ্যানুসারে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি কমছে না। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মধ্যে ৪১ দশমিক দুই শতাংশ দরিদ্র। এর মধ্যে দুটি ভাগ ৩১ দশমিক নয় শতাংশ দরিদ্র ও নয় দশমিক তিন শতাংশ হতদরিদ্র। জরিপ অনুযায়ী ৩৭ শতাংশ পরিবার মনে করে দারিদ্রে্যর হার ক্রমশ বাড়ছে। ২৩ শতাংশ মনে করে কমছে। আর ৪০ শতাংশ মনে করে অবস্থা অপরিবর্তিত।

দারিদ্রে্যর উৎস হিসেবে জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারের দারিদ্রে্যর কারণ কোনো জমি না থাকা বা উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো কিছু না পাওয়া। পুঁজির অভাব বা ব্যবসায় লোকসানের ফলে এ রকম পরিবারের সংখ্যা ১৮ দশমিক চার শতাংশ। কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই, এ কারণে দরিদ্র পরিবারের সংখ্যা ১৭ দশমিক দুই শতাংশ। জরিপের তথ্যানুসারে দেশে মাত্র চার দশমিক সাত শতাংশ ধনী। মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশ। চলনসই বা নিম্নবিত্ত পরিবারের হার ৩৪ দশমিক এক শতাংশ।

দুই দশকে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ সাল-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকের উৎপাদনদক্ষতা বেড়েছে, কিন্তু সেই হারে মজুরি বাড়েনি। চার দশকে ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে শ্রমিকের উৎপাদনদক্ষতা। কিন্তুপ্রকৃত আয় বেড়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে মধ্যবিত্ত জনগণের ঋণ গ্রহণের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। বর্তমানে সেটি অধিকতর হয়েছে। বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৯ সালে মধ্যবিত্তদের আয়ে ঋণের অবদান প্রায় ৬০ শতাংশ।

১৯৭৩ সালে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১১০ ডলার। ২০০৯ সময়কালে তা বেড়ে হয়েছে ৭০০ ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, পাঁচ বছর ধরেই বাংলাদেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। পাঁচ বছরে গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এ বছর এ আয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও গড় মাথাপিছু আয় ৭৭০ ডলারের বেশি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে দেশের গড় মাথাপিছু মজুরি শূন্য দশমিক ৫৩ ডলার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত উচ্চবিত্ত মানুষের আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় গড় আয় বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এর মূল কারণ জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশই জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আয়ের মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে না। কর্মস্বল্পতা এবং সীমিত আবাদি জমির কারণেই বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে সাফল্য নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে বেকার মানুষের সংখ্যা। বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা দুই কোটি ৪৪ লাখ। মৌলিক চাহিদা পূরণের মতো আয়ের পথ না থাকায় বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একের পর এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও বেকারত্বের অভিশাপে দারিদ্রে্যর দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি পাচ্ছে না দেশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ অর্থনীতিতে যেসব অর্জন করেছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে মাথাপিছু আয়। তবে এর পাশাপাশি ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ায় মাথাপিছু আয়ের সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না। দেশের খুবই কমসংখ্যক মানুষের কাছে রয়েছে সিংহভাগ সম্পদ। শহর-গ্রাম বৈষম্য বাড়ছে। এখনো দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। তাদের প্রতিদিন আয় এক ডলারের কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে কারো দৈনিক আয় এক ডলারের কম হলে তাকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এ বছর মাথাপিছু আয় ৭৫০ ডলার হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেক কম। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখনো ৫৫ শতাংশ কম।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী ২৭ বছরে (১৯৮২-২০০৯) দ্রব্যমূল্য বেড়েছে প্রায় ২৭৫ শতাংশ। পাঁচ বছরে বেড়েছে ৬১ শতাংশ। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চালের দাম, ৯০ শতাংশ। চালের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দরিদ্র মানুষ। কারণ তাদের আয়ের ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্য কেনায়।

পাঁচ বছর আগে যে চাল বিক্রি হতো প্রতি কেজি ২৪ টাকায় আজ তার দাম হয়েছে ৪৫ টাকা। সয়াবিন তেলের লিটার ছিল ৪৮ টাকা যা এখন ১২০ টাকা। রসুন ছিল প্রতি কেজি ৪৪ টাকা, পেয়াজ ২০, শুকনা মরিচ ৫৫, মসুর ডাল ৪৫, গরুর মাংস ১০০ ও খাসির মাংস ১৫০ টাকা। এখন গরুর মাংস ২৬০, খাসির ৩৫০, রসুন ১১৫ ও শুকনা মরিচ ১৬০ টাকা কেজি। খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অন্যান্য সব ধরনের ব্যয়। ২০০৫ সালে যে বাড়ি ভাড়া ছিল দুই হাজার ৮৮০ টাকা। আজ তা হয়েছে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচ বছর আগে ডিজেলের দাম ছিল ৩২ টাকা আজ ৪৪ টাকা। আগে যে বিদ্যুতের মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট তিন টাকা আজ তার দাম সাড়ে চার টাকা। পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে যাতায়াত খরচ, বেড়েছে স্কুল-কলেজের বেতন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের দাম। শুধু কমেছে মানুষের প্রকৃত আয় অর্থাৎ আয় কিছুটা বাড়লেও তা জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির তুলনায় কমেছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, দেশের সিংহভাগ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ মুষ্টিমেয় শ্রেণীর হাতে রয়ে গেছে। সম্পদের বৈষম্য, স্বাধীনতা-পরবর্তী আমলাদের রহস্যজনক ভূমিকা, শর্তযুক্ত ঋণের অতিরিক্ত ভার বহন (প্রতিবছর জাতীয় রাজস্বের বড় একটি অংশ ঋণের সুদ হিসেবে ব্যয় করতে হয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্বের ১৩ দশমিক নয় শতাংশ এ খাতে ব্যয় করা হয়েছে) এবং চাপিয়ে দেওয়া প্রেসক্রিপশন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দূরদর্শিতার অভাব, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে না পারা, সরকারগুলোর লুটেরা মনোভাব এবং নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবও অতিদরিদ্র ও দারিদ্র্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী। [ এম এম মুসা ● সাপ্তাহিক বুধবার musamiah@gmail.com ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,