বাংলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার ৪৩.১০ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় ৩১.০%, ভারতে ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ১০%, ভিয়েতনামে ৬.৫%, নেপালে ৪.৪% এবং সবচেয়ে কম চীনে, ৩.২%। অর্থাৎ বাংলাদেশের মালিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। এই মালিকরা নিজেরা কোটি কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি ব্যবহার করছে। আর শ্রমিকরা না খেয়ে জীবন যাপন করছে।


পোশাক শিল্পে দুর্দিন : ভাল নেই শ্রমিকরা

এফএনএস (আহমেদ ফয়সাল) : পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিন থেকে চলছে শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ¡। এ দ্বন্দে¡র ফলে দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প আজ বিপর্যয়ের মুখে। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন শ্রমিক ও মালিকদের সুসম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে পোষাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ আবারও দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার আশুলিয়ার ৩টি পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামে এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই অসন্তোষ আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। জানা যায়, বিনা কারণে শ্রমিক ছাটাই এবং শ্রমিকদের বেতন আটকিয়ে রাখা, শ্রমিকদের শ্রমের অধিকার এবং পাওনা বেতন প্রদানের দাবিতে বিক্ষোভ করছে পোশাক শ্রমিকরা।

মালিক পক্ষের অবহেলা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে দিনে দিনে অস্থির হয়ে উঠছে এ শিল্পটি। অথচ রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭৫ ভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রম বিনিয়োগ হয় এই খাতে। সবচেয়ে বেশি পরিবার নির্ভরশীল এর ওপর। বাংলাদেশে সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত খাতও এটাই। তবে এই সুবিধার সম্পর্ণটাই যায় মালিকদের পকেটে। শ্রমিকদের দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অবহেলিত খাত এই তৈরি পোশাক শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা! যারা ঢাকায় থাকেন এবং যারা ঢাকার বাইরে থাকেন, তারা প্রত্যেকেই জানেন যে এই টাকায় একমাস চলা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব না। পরিবার নিয়ে তো অসম্ভব কথা। বলা চলে, ঢাকার একজন ভিক্ষুকের মাসিক আয়ও একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে বেশি!

শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণ ১. চাল, ডাল, তেলসহ জিনিষপত্রের দাম বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না; ২. সময় মতো বেতন এবং ওভারটাইম ভাতা না দেয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুইটি না থাকা; ৩. কর্মকর্তা কর্তৃক শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, অমানবিক ব্যবহার করা; ৪. যে কোনো অজুহাতে শ্রমিকদের ছাঁটাই, শোকজ ইত্যাদির মাধ্যমে হয়রানী করা; ৫. গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকা, অর্থাৎ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কথা বলার কোনো পক্ষ নেই; ৬. ব্যবসায়ীরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগ গ্রহণ করে আবার মালিকের পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদের উপর নির্যাতন চালায়। এমনকি মালিকদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ নানা বিরোধে শ্রমিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব নানা বিষয়ের প্রতিক্রিয়ায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ সারা মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবনযাপেনর উপযোগী ন্যূনতম মজুরি না পাওয়া।

বিজিএমইএ’র পরিচালকের হিসাবে একজন মালিক বছরে ৫০০ শ্রমিকের একটি কারখানা থেকে ১ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিট মুনাফা করছে। বিজিএমই-এর এক পরিচালক জানান, বিশ্বমন্দা, জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও তারা লোকসান গুনছেন না। লাভের হার হয়ত কিছু কমেছে। আগে যেখানে হয়ত প্রতি পিসে ২০ টাকা লাভ হত, এখন সেখানে হয়ত ১৫ টাকা লাভ হচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন দেশের মালিকদের মুনাফার হার পর্যালোচনা করলেও মালিকদের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচিত হয়। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার ৪৩.১০ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় ৩১.০%, ভারতে ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ১০%, ভিয়েতনামে ৬.৫%, নেপালে ৪.৪% এবং সবচেয়ে কম চীনে, ৩.২%। অর্থাৎ বাংলাদেশের মালিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। এই মালিকরা নিজেরা কোটি কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি ব্যবহার করছে। আর শ্রমিকরা না খেয়ে জীবন যাপন করছে।

মালিকরা বলে, তারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, এটাই যথেষ্ট। শ্রমিকদের এতেই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মজুরি যা দিচ্ছি তা দিয়েই শ্রমিকদের চলা উচিত। বাজারে যে হারে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে সে হারে তারা মোটাচাল, মশুর ডাল, কমদামি তরিতরকারি কিনে কোনমতে জীবন যাপন করে। গার্মেন্টস-এ ওভারটাইম ডিউটি করেও দুই-আড়াই হাজার টাকা বেতন পাওয়া শ্রমিক তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং প্রোটিন পাবে কীভাবে? অথচ এরাই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ১৯৭৮ সালে ২টি গার্মেন্টস কারখানা দিয়ে যে শিল্পের যাত্রা শুরু সেখানে আজ প্রায় ৪৫০০টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শ্রমিক এ শিল্পের সাথে যুক্ত। বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক (চীন ও তুরস্কের পর) বাংলাদেশকে তৃতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, তুরস্কে পোশাক শিল্পের একজন শ্রমিক প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম মজুরি পান ২ দশমিক ৪৪ ডলার, মেক্সিকোতে ২ দশমিক ১৭ ডলার, চীনে ১ দশমিক ৪৪ থেকে ১ দশমিক ৮৮ ডলার, পাকিস্তানে শূণ্য দশমিক ৫৬ ডলার, ভারতে শূণ্য দশমিক ৫১ ডলার, শ্রীলঙ্কায় শূণ্য দশমিক ৪৪ ডলার এবং ভিয়েতনামে শূণ্য দশমিক ৪৪ ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পে ন্যুনতম মজুরি এক হাজার ৬৬২ দশমিক ৫০ টাকা। দিনে আট ঘণ্টা কর্মদিবস ধরে এবং মাসে চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে প্রতি ঘণ্টায় ন্যুনতম মজুরি দাঁড়ায় শূণ্য দশমিক ১২ ডলারেরও কম। বিশ্বের যেকোনো দেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকের তুলনায় এ মজুরি কম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে কম মজুরি।

সরকারকে মনে রাখতে হবে এই তৈরী শিল্প খাতটি একবার দেশছাড়া হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেমে যাবে, তেমনি লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। পাটকলগুলো যেভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোও যেন সেভাবে বন্ধ হয়ে না যায়। পাশাপাশি এ ব্যাপারে পোশাক শিল্প কারখানার মালিকদেরও খেয়াল রাখতে হবে।

%d bloggers like this: