আমি আর স্বপ্ন দেখি না বাংলাদেশ নিয়ে


নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না

শামারুহ মির্জা

আমার বাবা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ। আমি এই মানুষটি এবং অন্য আরও কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু কথা লিখছি। নিজের বাবাকে নিয়ে লেখা বোধহয় খুব শোভন নয়! আপাতদৃষ্টিতে এ কাজটি আমি আজ করতে চাই এবং করব।

মির্জা আলমগীরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বীরা তাকে শ্রদ্ধা করেছেন সবসময়। এলাকায় যে কোনো বিপদে-আপদে প্রথমে ছোটেন তাঁর কাছে, সমাধানের জন্য। তিনি যে দলেরই হোন না কেন, তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন। বলুকাকার একটি কথা মনে পড়ে গেল। নির্বাচনী প্রচারণায় আমি হাঁটছি এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায়। বলুকাকার বাসার সামনে এসেছি, সঙ্গে থাকা দু’জন বললেন—ভেতরে যাওয়ার দরকার নেই, তিনি আব্বুর বিরুদ্ধে প্রচারণা করছেন। আমি তবু এগিয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকতেই দেখি বলুকাকা আর ক’জন বসে। বললাম, বলুকাকা, আব্বুর জন্য দোয়া করবেন। বলুকাকা হেসে বললেন—মাগো, রাজনৈতিক কারণে আমি তোমার বাবার বিরোধিতা করছি; কিন্তু মানুষ আলমগীরের জন্য আমার মঙ্গল কামনা নির্ভেজাল, সবসময় ।

নাম বলছি না, তবে আওয়ামী লীগের এক বিখ্যাত বাগ্মী রাজনীতিবিদ এক টকশোতে আব্বুর সঙ্গে বসতে চাননি। তার স্রেফ কথা, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি ঝগড়া করতে পারব না। শতভাগ সততার সঙ্গে মানুষটি সারা জীবন রাজনীতি করেছেন; নিজের আদর্শ, নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে কখনো সমঝোতা করেননি। শুধু বোঝেননি, এই বাংলাদেশে তিনি বড়ই অনুপযুক্ত এক রাজনীতিবিদ। একটি ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার আজ এই মানুষটিকে যেভাবে অপদস্থ করল, তা আসলেই উদাহরণ হয়ে থাকবে চরম অবিচারের।

কী অপরাধ ছিল তাঁর? তিনি বিরোধী দলের মহাসচিব, সরকারের সমালোচনা করতেন, কর্মীদের সংগঠিত করতেন, তাঁদের উজ্জীবিত করতেন সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিয়ে, যা পুরো বাংলাদেশের মানুষ দেখত, শুনত, উপলব্ধি করার চেষ্টা করত। তিনি বোমাবাজি করেছেন কিংবা করিয়েছেন? গাড়িতে আগুন দিতে বলেছেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মির্জা আলমগীরের চরম শত্রুও তা বিশ্বাস করবে না!

পঁয়ষট্টি বছরের মানুষটাকে আমি প্রায়ই প্রশ্ন করতাম—আব্বু, এই নষ্ট, পচে যাওয়া সমাজে তুমি কেন এখনও রাজনীতি করছ? ‘৭১-পূর্ববর্তী রাজনীতির সেই পরিবেশ তো আর নেই। আগেও রাজনীতিবিদদের বন্দি করা হতো, তাদের সঙ্গে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হতো, আজ তো কোনো নিয়ম নেই, আজ তো গ্রেফতার করেই রিমান্ডে নিয়ে প্রাগৈতিহাসিকভাবে অত্যাচার করে। এসব বাদ দাও না! আব্বু স্মিত হেসে বলতেন, ‘শেষ চেষ্টাটা করেই দেখি, আমার তো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’ তাঁর খুব প্রিয় কবিতার একটি লাইন প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘এখনি অন্ধ বন্ধ করো না পাখা।’

আমার এই বাবার বিরুদ্ধে এই সরকার দুটি আজব মামলা দিয়েছে। একটিতে অভিযোগ, আব্বু এবং আরও ক’জন মিলে সচিবালয়ে ককটেল ফুটিয়েছে বা ফোটাতে সহযোগিতা করেছে; আরেকটিতে অভিযোগ, তাঁর এবং আরও ক’জনের প্ররোচনায় ২৯ এপ্রিল একটি বাস পোড়ানো হয়েছে। মামলার চার্জশিট পড়ছিলাম। নিজের অজান্তেই হেসে উঠলাম। আমাকে হাসতে দেখে আমার এক স্টুডেন্ট প্রশ্ন করল, কেন হাসছি। ওকে পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। তোমার বাবাকে আসামি বানিয়েছে? এই মামলায়? ওর বিস্ময় দেখে বললাম, বাংলাদেশের ৯৯ ভাগ মানুষ তোমার মতোই বিস্মিত! ওকে বললাম—জানো, এই সরকার দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে, এরা দিনবদলের কথা বলেছে! ওর বিস্ময় আরও বাড়ল। ‘বল কী, এটা নির্বাচিত সরকার! আমি তো ভেবেছি, এটা স্বৈরাচারী সামরিক সরকার।’ খারাপ লাগছিল। বললাম, ‘চিন্তা করো না, ঠিক হয়ে যাবে, সরকার একটু টালমাটাল এখন, ঠিক হয়ে যাবে।’ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ঘটনাটা আসার পরে অনেকেই আমার কাছে জানতে চাইল পুরো ব্যাপারটা। খুব চেষ্টা করলাম দেশের ‘ভাবমূর্তি’ রক্ষা করে বুঝিয়ে বলার। সবাইকে আশ্বাস দিলাম, আমাদের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে।

নিম্নআদালত আব্বুদের জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে। রায় ঘোষণার পরপরই আব্বুকে ফোন দিলাম। ভীষণ পজিটিভ, হাসছিলেন আমার দুশ্চিন্তা দেখে। হঠাত্ গলাটা বোধহয় আবেগে কিছুটা বুজে এলো। বললেন—’মাগো, তুমি সাহস হারিয়ো না, আমরা একসঙ্গে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব, করতেই হবে। যা-ই হোক, তুমি সাহস হারিয়ো না মা।’ আমি আর কথা বলতে পারলাম না। তাঁকে বললাম না, আমি আর স্বপ্ন দেখি না বাংলাদেশ নিয়ে, আমি আর আশা করি না। আমার কেন জানি আজকাল শুধু মনে হয়, ওরা ভিন্নমতাবলম্বী, সাহসী, সত্যবাদী, দেশপ্রেমিক কোনো বাংলাদেশী নাগরিককে মুক্ত থাকতে দেবে না। তুমি যদি স্বাধীনভাবে কথা বলতে চাও, চুপ করে থাকো। এর কিছুই তাঁকে বলা হোল না। শুধু বললাম, ‘তুমি ভালো থেকো আব্বু।’

আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর আনোয়ার হোসেনের লেখা আজকাল প্রায়ই পড়ি। সব লেখাতেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রামের কথা, তাঁর ভাইয়ের আত্মদানের কথা, সোনার বাংলা নিয়ে তাঁর পরিবারের স্বপ্নের কথা। আমারও মনে পড়ে ১/১১-এর পরে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা, আরেকটু আগেকার কথাও মনে পড়ে, শামসুন নাহার হলে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। স্যারকে দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর বাসায়, তাঁর আগেও স্যারের বাসায় গেছি রাতের খাবার খেতে, ক’জন বন্ধুসহ। কিছুদিন আগে মেইলে পেলাম তাঁর চিঠি, ১/১১-এর পরে কোর্টে দেয়া তাঁর জবানবন্দিসহ, তাঁকে ভোট দেয়ার আবেদন করে।

এই স্যার আজ আর প্রতিবাদ করছেন না, গর্জে উঠছেন না, মিছিলে যাচ্ছেন না। উনি দেখছেন, সেই একই পুলিশি রিমান্ডে রাজনৈতিক নেত্রীকে চার পেয়ে পশুর মতো অত্যাচার করা হচ্ছে, মেয়েটি দাঁড়াতে পারছে না, সেই একই রিমান্ডে মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হচ্ছে, সেই একই বাহিনী রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কারও বাবাকে, কারও স্বামীকে, কারও সস্তানকে, ক’দিন পরে বুড়িগঙ্গায় ভেসে উঠছে মানুষের হাত, পা। স্যার কিন্তু কিছুই বলছেন না। স্যার একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করেন জানি। খুব স্বাভাবিক। প্রতিটি মানুষ রাজনৈতিক। কিন্তু যে কোনো অন্যায় তো অন্যায়ই, যে কোনো অবিচার তো অবিচারই, যে কোনো অত্যাচার তো অত্যাচারই। এসবের তো অন্য কোনো নাম নেই, অন্য কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে? তাঁর এই নীরবতার কারণ কী? স্যারের একটি লেখা পড়লাম, কালের কণ্ঠে। তিনি লিখেছেন তাঁর প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে। সেই লেখাতেও তিনি কয়েকবার উল্লেখ করলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অতীত সংগ্রামের কথা। প্রশ্ন করি তাঁকে, আপনার ভাই যে আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছেন, তার কতটুকু এই ‘সোনার বাংলা’য় বাস্তবায়ন হয়েছে? প্রশ্ন করি তাঁকে, বর্তমানকে তিনি কীভাবে দেখছেন এবং বর্তমানে তিনি কী করছেন? সংগ্রাম কি চলমান প্রক্রিয়া নয়?

আমি স্যারের কথা উল্লেখ করলাম, কারণ আমি মনে করি বাংলাদেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। আমাদের আঁতেলরা এক একটি দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কেমন জানি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হয়ে যান। একটি মার্কা, একটি রঙ তাঁদের অন্ধ করে দেয়। চোখের সামনে সমাজটা নষ্ট হয়ে যায়, চোখের সামনে মানুষগুলো কুঁকড়ে যায়, চোখের সামনে দেশটা বধ্যভূমিতে পরিণত হয়, এদের কিচ্ছু যায় আসে না। একটু আগেই খবর পেলাম, আনোয়ার স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মনোনীত হয়েছেন, স্যারের সাম্প্রতিক নীরবতার কারণটা এখন বোধগম্য হলো!

সোহেল তাজের পদত্যাগের পর একটি ব্যাপার আমার কাছে পুরো পরিষ্কার। আমরা সবাই এক একটি সোহেল তাজ। আমরা খুব সাহস, উদ্যোগ নিয়ে নেমে পড়ি সমাজ বদলাবো বলে। ফেসবুকে এমন ঝড় তুলি, সে ঝড়েই যেন উড়ে যায় সব অনাচার, রাজনীতিবিদদের গালিগালাজ করে অর্গাজমের সমপরিমাণ আনন্দ বোধ করি, অন্যের পিণ্ডি চটকিয়ে দাবি করি—আমিই আলাদা, আমিই শুদ্ধ। তারপর যখন ত্বধষরঃু নরঃবং, দৈত্যগুলো কামড়ে দেয়, তখন গাল ফুলাই, অবুঝ শিশুর মতো বলি—’আমি তোমার সঙ্গে আর খেলব না।’ বিশাল একটা চিঠি লিখে পালিয়ে যাই আমেরিকা। ব্যস, নাটকের এখানেই সমাপ্তি।

আমার কিছু উচ্চশিক্ষিত বন্ধু আছে, এরা প্রায়ই বিভিন্ন আড্ডায়, ফেসবুকে রাজনীতিবিদের পিণ্ডি চটকায়। খুব ফ্যাশনের কাজ, নিজের নিরপেক্ষতা প্রমাণের কী সাংঘাতিক চেষ্টা, অনেক হাত তালি। ভাবখানা এমন, ‘হলো তো? দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা শেষ, এবার চলো, শীশা খেতে যাই।’ সুবিধাবাদের চূড়ান্ত! রাজনীতিবিদদের গালি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো যায় না, এ সহজ কথাটি আমার উচ্চশিক্ষিত বন্ধুদের মাথায় ঢোকে না, সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই!

আমার বাবা একটি কথা আজকাল প্রায়ই বলেন, ‘আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনে একটি অন্যতম মূল ভূমিকা রেখেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। পুঁজিবাদ আর ভোগবাদের প্রভাবে এই মধ্যবিত্ত আজ নির্লিপ্ত হয়ে গেছে, সুবিধাজনক বলে।’ আর আমার মাথা বলে, এটা খুব ভয়ঙ্কর একটা অবস্থা। কোনো নিয়মতান্ত্রিকভাবে, সভ্যভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আজ ব্যক্তি মির্জা আলমগীরের ওপর যে অন্যায় হলো, যে অবিচার হোল—এর ফল ভোগ করতে হবে পুরো জাতিকে। এটা পরিষ্কার। আজ অথবা কাল। নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না।
লেখক : কলামিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষারত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


রামজে বারোউদ • স্বেচ্ছাচারীদের চ্যালেঞ্জ করা, পুরনো কাঠামো ধ্বংস করা এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য কর্মপন্থা উদ্ভাবনের কাজে আরবদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যর্থ নীতি, ভুল ধারণা ও আত্মস্বার্থে অবিচল রয়েছে। আরবরা নিজেদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে, কিন্তু এ বিষয়ে খুব কম লোকই ভিন্ন মত পোষণ করে যে, এখন পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। মুবারক ও বেন আলীর মতো স্বেচ্ছাচারীদের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করে, তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জসহ নতুন সকাল। এ এলাকায় গণতন্ত্র, সুশীল সমাজ ও নাগরিকত্ব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আরবের যেসব বুদ্ধিজীবী এখনো সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বাগাড়ম্বর করে তাদের ওয়াশিংটন ভিত্তিক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী কাজে লাগিয়েছে অথবা তাদের মধ্যে এমন কিছু বেপরোয়া লোক আছে যারা মিথ্যার বেসাতি বিক্রেতা রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজে উপস্থিত হন।

একটা কথা সহজে অনুমেয় – আরব বিশ্বের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। হোসনি মুবারক যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখনকার অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার মিল নেই। একদল ‘আরব মধ্যস্থতাকারীর’ পরিচালনায় মুবারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন ঘটানো। ব্যাপারটা ছিল যেন তা মিসরের জাতীয় স্বার্থের জন্যও একটা জরুরি বিষয়। ইতোমধ্যে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ পরস্পরবিরোধী অবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে ভালো কাজে কৃতিত্ব লাভের জন্য তিনি বেপরোয়া ছিলেন – তিনি এখনো আরব প্রতিরোধের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে তখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কথাটা আরব সংস্কৃতিতে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত করা হয়। সাধারণ আরববাসীদের এমন বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা হয় যা তাদের কাছে গুরুত্বহীন ছিল, অথচ সেই বিষয়টিই এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

আরব নারী-পুরুষ সবাইকে অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়, এমনকি তাদের আশাশূন্য করা হয়। তাদের শুধু ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা ও অন্যান্য বিষয়ে জনমত জরিপের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ এসব বিষয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও অবমাননার জন্য দায়ী কোনো বিষয় ছিল না।

আরব স্বেচ্ছচারীরা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধ সংস্কারকে গ্রহণ করে। ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ‘আল কায়েদাকে পরাজিত’ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শত্রুভাবাপন্নভাবে দখল অথবা নিজেকেই ক্ষতিকর একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে যে কোনো একটা পথ বেছে নিতে হয়। তিনি শেষোক্ত বিকল্পটি বেছে নেন এবং এমন ভূমিকার ফলাফল হাতে হাতেই পেয়ে যান। ইয়েমেনী জনগণ রাস্তায় নেমে আসে – তারা দাবি করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের। সালেহ অনুগত বাহিনী ও রিপাবলিকান গার্ডদের পাঠান হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আল কায়েদা যোদ্ধাদের এবং নিরস্ত্র গণতন্ত্রকামী লোকদের একসঙ্গে হত্যা করার জন্য। সরাসরি ও কঠোর এ কাজকে তুলনা করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকথিত দরকষাকষির অাঁতাত, তোমাদের খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব যতক্ষণ আমি নিজেকে ধ্বংস করতে পারব এমন ভাবনার সঙ্গে।

লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো কাজে লাগান। তার শাসনামলে প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর সদস্যদের মধ্যে আল কায়েদা আছে। এসব কথা পশ্চিমা গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। পাশ্চাত্যকে শান্ত করার জন্য গাদ্দাফি এমন বেপরোয়া হয়ে যান যে, তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ফিলিস্তিনি ‘চরমপন্থীদের’ বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব স্বৈরশাসকরা যে ভাষায় কথা বলেন তা নির্যাতনের ভাষা কোষে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এটা একটা বিস্ময়কর বিষয়। অপরদিকে সাধারণ আরব জনগণ তাদের দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্বেলিত ছিল। আল কায়েদা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণনা অনুযায়ী আরব জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়, অন্য কিছু বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ যা পশ্চিমা ভাষ্যকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অংশীদারিত্বমূলক ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ঐক্য ছাড়াও তাদের মধ্যে আছে নির্যাতন, বিচ্ছিন্নতা, অন্যায় ও অসাম্যের এক সাধারণ অভিজ্ঞতা।

২০০৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের তৃতীয় আরব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয় যে, আধুনিক আরব রাষ্ট্রে ‘নির্বাহী প্রক্রিয়ার ধরন একটা কৃষ্ণ গহবরের মতো, যা এর আশপাশের সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে গঠন করে যে, তা থেকে কিছু এগিয়ে যায় না এবং যা থেকে কিছু পালিয়ে যেতে পারে না।’ আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ২০০৯ সালটা খুব ভালো ছিল না। ওই সময় এ ধরনের রিপোর্টের পঞ্চম খন্ডে বলা হয়, ‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে আশা করা হয়। অথচ বেশ কয়েকটা আরব দেশে দেখা গেছে, তা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সনদ ও জাতীয় শাসনতান্ত্রিক ধারাগুলোর প্রতি হুমকিস্বরূপ।’ মে’তে টাইম ম্যাগাজিন ‘হাউ দ্য এরাব স্প্রিং মেড বিন লাদেন অ্যান আফটারথট’ শিরোনামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। আরব বিপ্লবের সম্মিলিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে ওই রিপোর্টে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, মিসরের তাহরির স্কোয়ারে ওসামা বিন লাদেনের প্রশংসা করে কোনো ব্যানার দেখা যায়নি। তিউনিসিয়া, লিবিয়া বা এমনকি ইয়েমেনেও সরকারবিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে তার ডেপুটি আয়মান আল জাওয়াহিরির কোনো ছবি দেখা যায়নি।’

সত্যের এই প্রকাশ পশ্চিমা মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হলেও তাকে মোটামুটিভাবে বলা যায় একটা প্রতারণা। আসল কথা হলো, আল কায়েদা মডেল কখনো আরব সমাজের মূলধারায় প্রতিফলিত হয়নি। আরব বিপ্লব আল কায়েদা সম্পর্কে আরব সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। কারণ ওই ধারণা সমগ্র আরব সমাজের ধারণার খুবই সামান্য একটা অংশ মাত্র। যা হোক, এসব বিপ্লব আরবদের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ধারণাকে এখনো সত্যিকারভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি।

জগবি ইন্টারন্যাশনাল জুলাইয়ে এরাব অ্যাটিচিউড ২০১১ প্রকাশ করে। এতে ছয়টি আরব রাষ্ট্রের এমন ধারণা প্রকাশ পায় যা এতে আরবদের মধ্যে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা শতকরা ১০ ভাগ কমে যাওয়ার কথাও রয়েছে। ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবামা যখন তার বিখ্যাত ভাষণ দেন তখন অনেক আরব মনে করে যে, কোনো কোনো অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-আরব অগ্রাধিকার চূড়ান্তভাবে এসে মিলেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কোনো অনুকূল দিকে পরিচালিত না হওয়ায় আরবরা অনুধাবন করে, মার্কিন নীতিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েই আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ, ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন এবং তাদের পুরনো মিত্র অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ আরব শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আরবরা আবিষ্কার করেছে অথবা পুনরায় আবিষ্কার করেছে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কোনো মিল নেই, বরং ওই দুই ধারা আসলে সাংঘর্ষিক পর্যায়ে আছে।

এটা খুবই স্বাভাবিক, মধ্যপ্রাচ্যের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট স্বার্থ ও লক্ষ্যে তার নীতি পরিচালিত করবে। কিন্তু আসলে যা হচ্ছে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের জন্য অধিকাংশ আরব দেশের আশা আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরব স্বৈরাচারী শাসকদের সহায়তায় ওয়াশিংটনের অস্পষ্ট ও বিভ্রান্ত নীতি আরব জাতিগুলোর জন্য অকথিত ক্ষতি ডেকে এনেছে। লাখ লাখ সাধারণ আরব যাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অগ্রাধিকারকে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে এবং এখন আরব জনগণ দেখাচ্ছে যে, তারা ওই বাস্তবতা গ্রহণে আর রাজি নয়।

ইন্টারনেট থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

এমবেডেড ‘বুদ্ধিজীবী’ বা নব্য ঝলমলে সুখী দাসসমাজ : তবে নিছক জীবিকার জন্য নয়, বাণিজ্যের জন্য এবং নির্দিষ্টভাবে করপোরেট পুঁজির দাস হিসেবে নিজের শিক্ষা, মেধা ও সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা বর্তমান বিশ্বে ডিগ্রিপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। পুঁজির সঙ্গে বাঁধা ‘মাথাওয়ালা’ এই নব্য দাসসমাজ পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও আন্তর্জাতিকীকৃত হয়েছে।


বাংলাদেশের ‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘সুশীল সমাজ’-১

আনু মুহাম্মদ
‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দের বিভ্রান্তি : বুদ্ধিজীবী শব্দটির আক্ষরিক অর্থ দিয়ে এমন ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিদের বোঝানো হয় যিনি বা যারা বুদ্ধি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবিকা নির্বাহ করতে বুদ্ধি ব্যবহার করেন না এ রকম কোনো মানুষ নেই, ছিল না। অন্যদিকে শ্রমজীবী বলতে বোঝায় সেইসব মানুষকে, যারা কায়িক শ্রম বা শরীরের মেহনত দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এমন কী কাজ আছে যেটাতে শরীরের শ্রম লাগে না? বসে বসে যে কাজ সেখানেও কোনো না কোনো মাত্রায় শরীরের কাজ আছে। আবার পেশাজীবী একটা শব্দ দিয়ে বোঝানো হয় তাদের যারা কোনো নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করেন। যে কোনো জীবিকা অর্জনের কাজই তো কোনো না কোনো পেশার। তাহলে? তবে একজন লেখক বা অফিসের কর্মচারী পেশিশক্তি যতটা ব্যবহার করেন তার চেয়ে বহুগুণ ব্যবহার করতে হয় একজন মজুরকে যাকে সাধারণভাবে শ্রমজীবী বলা হয়।

তাহলে একভাবে বলা যায় যে কায়িক অথবা মানসিক শ্রমের আপেক্ষিক গুরুত্ব দিয়ে একেকটি নামকরণ করা হয়। কিন্তু সেভাবেও বুদ্ধিজীবী কথার অর্থ ঠিক হয় না। একজন উদ্যোক্তা, অফিস আমলা, ব্যবসায়ীও বুদ্ধি বা মানসিক শ্রম দিয়েই কাজ করেন কিন্তু তাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয় না। বুদ্ধিজীবী বলতে বোঝানো হয় সেইসব মানুষকে যারা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করেন। এই চর্চার চরিত্র আবার সবার ক্ষেত্রে এক নয়। এর মধ্যেও বড় দুটি ধারা আছে; একটি যারা প্রচলিত বা অধিপতি চিন্তা, মতাদর্শ ধারণ করেন এবং তা ব্যাখ্যার দায়িত্বে লিপ্ত থাকেন। ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকাই তাদের প্রধান ধরন। আরেকটি ধারা অধিপতি চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, নিজ নিজ বুঝ ও ক্ষমতা অনুযায়ী নতুন চিন্তা ও মতাদর্শ সৃজনে ব্রতী এবং জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে নানাভাবে যুক্ত হন।

লেখক, শিল্পী, গবেষক, শিক্ষক-সবাইকে সাধারণভাবে এই কথিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। কিন্তু এ রকম পেশায় থাকলেই কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত হবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার এসব পেশায় যুক্ত না থেকেও কেউ সৃজনশীল বা মননশীল কাজে যুক্ত থাকতে পারেন। তাই বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, মতগঠন, মতাদর্শ গঠন বা ভাঙন, শিল্পচর্চা এসব কাজ যে সব সময় জীবিকা তা নয়। বরঞ্চ অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মতাদর্শিক অবস্থানের কারণে অনেকের জীবিকাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই কারণে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি, অর্থ বিবেচনায়, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাই এককভাবে বিদ্বজ্জন এবং সামষ্টিকভাবে বিদ্বৎসমাজ শব্দ দুটি বরং যা বোঝানো হয় তার কাছাকাছি।

এমবেডেড ‘বুদ্ধিজীবী’ বা নব্য ঝলমলে সুখী দাসসমাজ : তবে নিছক জীবিকার জন্য নয়, বাণিজ্যের জন্য এবং নির্দিষ্টভাবে করপোরেট পুঁজির দাস হিসেবে নিজের শিক্ষা, মেধা ও সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা বর্তমান বিশ্বে ডিগ্রিপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। পুঁজির সঙ্গে বাঁধা ‘মাথাওয়ালা’ এই নব্য দাসসমাজ পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও আন্তর্জাতিকীকৃত হয়েছে।

ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় ‘এমবেডেড জার্নালিস্ট’ পরিচয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচার লাভ করে। এর দ্বারা দখলদার মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের প্রচারব্যবস্থার সঙ্গে বাঁধা সাংবাদিকতা বোঝানো হচ্ছিল। এ রকম সাংবাদিক তৈরি ও লালনপালনের কারণ কী-এ রকম এক প্রশ্নের উত্তরে এক মার্কিন জেনারেল বলেছিলেন, ‘সত্যি বলতে কি আমাদের দরকার যুদ্ধজয়। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তথ্যের যুদ্ধ। সুতরাং তথ্যের সব ক্ষেত্রের ওপর আমাদের আধিপত্য নিশ্চিত রাখবার জন্যই আমরা এই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ বলাই বাহুল্য, এ রকম এমবেডেড গোষ্ঠী শুধু সাংবাদিকতা ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই।

দখলদার মার্কিন বাহিনীর যেমন ছিল এমবেডেড জার্নালিস্ট তেমনি তার সহযোগী দখলদার বহুজাতিক পুঁজির আছে এমবেডেড কনসালট্যান্ট, এমবেডেড এক্সপার্ট, এমবেডেড রাইটার, এমবেডেড ফিল্ম মেকার, এমবেডেড মিডিয়া, এমবেডেড সিভিল সোসাইটি বা ‘সুশীল’ সমাজ। একইভাবে একচেটিয়া বা বহুজাতিক পুঁজিও তাদের আধিপত্য নিশ্চিত করবার জন্যই নানা ধরনের মত নির্মাণের গোষ্ঠী তৈরি ও লালনপালন করে। এই শেকলে বাঁধা ‘বুদ্ধিজীবীরা’ শিল্পচর্চা, বুদ্ধিচর্চা, গবেষণাচর্চা করেন পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী, তাদের ভাড়াটিয়া হিসেবে। বহুজাতিক পুঁজি, সংস্থা ও বাহিনীর জোরে এদের যে দাপট তাতে শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতিজগতে প্রকৃত শিক্ষাবিদ, গবেষক আর শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

এখন বাণিজ্য আর পুঁজির আধিপত্য বিস্তারে নিয়োজিত আছে বিশ্বের বহু নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্কট্যাঙ্ক, ফাউন্ডেশন। শিক্ষা আর গবেষণায় তহবিল জোগানের মাধ্যমে, স্পনসরড শিল্পচর্চার বিস্তারের মাধ্যমে সংযোগসূত্র তৈরি হয়, দাস-আকাঙ্ক্ষা জোরদার হয়, আপন জগৎ পরের দখলে যায়। বিশ্বব্যাপী পুঁজির ক্রিয়ার সহযোগী হিসেবে এই এমবেডেড গোষ্ঠীও নানা মাটির নানা ভাষা আর পোশাকে জন্মায়, কিন্তু ধারণ করে পুঁজির অভিন্ন বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি আর অবতীর্ণ হয় অভিন্ন ভূমিকায়।

মধ্যবিত্তের শেকড় ও শৃঙ্খল : বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির এই দুই ধারা প্রধানত মধ্যবিত্তের মধ্যেই বিকশিত হয়। সমাজের অন্যান্য অংশের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অনুপস্থিত তা নয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাগত আনুকূল্য, অবস্থানগত সংশয় আর দোলাচল মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেই সৃজনশীল বা মননশীল কাজের মানুষ আশ্রয় করে বেশি কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থায় তা নজরে পড়ে বেশি। বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজের দেহ ও মন বুঝতে গেলে অতএব এই মধ্যবিত্তের গঠন ও গতিশীলতা দেখা দরকার।

একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে ‘মিডল ক্লাস’ ধারণা এবং তার পরিচয় আমরা পাই ইউরোপে, ফরাসি বিপ্লবেরও আগে থেকে। এই জনগোষ্ঠী হলো ভূস্বামী, সামন্তপ্রভু এবং রায়ত কৃষকের মাঝামাঝি মানুষ। ইউরোপে সামন্তবাদী ব্যবস্থা যত ক্ষয় ও ভাঙনের দিকে যেতে থাকে ততই এই জনগোষ্ঠীর অবয়ব স্পষ্ট হয়, আয়তনও বাড়ে। ফরাসি ভাষায় এদের বলা হতো বুর্জোয়া। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন প্রধানত ব্যবসায়ী, কারিগর, পরে আরো যোগ হন ব্যাংকার এবং উদ্যোক্তা। এই জনস্তরেই আরো ছিলেন লেখক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা বিদ্বৎসমাজ। সামন্তবাদী অভিজাততন্ত্রী এবং ধর্মতন্ত্রী সমাজ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী যে রাজনৈতিক দার্শনিক লড়াই চলছিল সেখানে এই শ্রেণীটির ভূমিকা ছিল নেতৃস্থানীয়।

ইউরোপে সপ্তদশ শতক থেকেই ‘ঐশ্বরিক’ রাজশক্তি এবং অভিজাততন্ত্রের বংশানুক্রমিক আধিপত্যবিরোধী জনমত সংহত হতে থাকে। বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার, দার্শনিক নতুন জোয়ার এবং পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন এই জনমতকে ক্রমে একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন, অষ্টাদশ শতকে ফরাসি বিপ্লব, ঔপনিবেশিক অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সমাজ ইতিহাসে এবং চিন্তাজগতে এক নতুন পর্বের সূচনা করে। সেখানে ঐশ্বরিক বিধানের স্থানে মানুষের অস্তিত্ব আর মানুষের কর্তৃত্ব সাধারণভাবে স্বীকৃত হয়। অভিজাততন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, ঐশ্বরিক ক্ষমতার সঙ্গে রাজক্ষমতা যুক্ত করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি খর্ব হতে থাকে।

উনিশ শতকে পুঁজিবাদের বিকাশ ও উৎপাদন ক্ষেত্রে যান্ত্রিক ব্যবহার বৃদ্ধি পরস্পরকে শক্তি জুগিয়েছে। নগরের বিকাশ সে সময় দ্রুততর হয়। নগরকেন্দ্রিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, সমাজে অনেক স্তর ও পেশার জন্ম হয়, আয়েরও বিভিন্ন স্তর দেখা যায়। পুরনো সামন্ত শ্রেণীর ভাঙন ঘটে এবং বুর্জোয়া শ্রেণী ক্রমে হয়ে ওঠে ‘উচ্চ শ্রেণী’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ সম্পত্তি মালিক শ্রেণী। আদি ধারণার যে মধ্যবিত্ত সেই বুর্জোয়া শ্রেণীর বিত্তের দিক থেকে উচ্চ পর্যায়ে গমন এবং সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে শাসক শ্রেণীর ভূমিকায় আসীন হওয়ার ফলে গোটা সামাজিক বিন্যাস এক নতুন পর্বে প্রবেশ করে।

এরপর থেকে মধ্যবিত্ত হিসেবে তারাই অভিহিত হতে থাকে যাদের আরেক নাম পেটি (ক্ষুদে) বুর্জোয়া শ্রেণী। এই জনগোষ্ঠী শ্রমিক নয়, আবার মালিক হিসেবেও তেমন কিছু নয়। তবে এদের জীবন-জীবিকা বুর্জোয়াজগতেই, মানসিকভাবে তারা সেই শ্রেণীর ভাব ও ভাষাই ধারণ করে। সাধ থাকে সে রকমই কিন্তু সাধ্য থাকে না। সংকট, সংশয় আর দোলাচলের উৎস সেখানেই। আবার এদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে সবার নিচে পিষ্ট মানুষেরও, যারা সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এদের প্রতি মধ্যবিত্ত বরাবর বিরূপ তবে এই যোগাযোগ মধ্যবিত্তের কাউকে কাউকে নিজের বদ্ধঘর থেকে বেরিয়ে দুনিয়া দেখার চোখ দেয়। সেখানেই সৃষ্টি হয় নতুন মানুষ, মুক্ত মানুষ। এই টানাপোড়েন নিয়ে বিদ্বৎসমাজও গড়ে ওঠে।

ইউরোপের সেই পুঁজিবাদ বিশ্বের বাকি অঞ্চলে হাজির হয় ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে। তার দরকার হয় এই অঞ্চলগুলোতে নিজের প্রয়োজনমতো ভাঙচুর ও নির্মাণ। দরকার হয় প্রয়োজনমতো অতীত রক্ষণ ও নিজের আরদালি একটি ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী তৈরি যারা ভক্তি, দাসত্ব ও স্মার্টনেসের অভূতপূর্ব সমন্বয় নিয়ে গড়ে উঠবে। ভারত এবং বাংলায় তাই গড়ে উঠেছিল। তাদের উত্তরসূরিরাই পূর্বসূরির ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। বলা দরকার, এই ঘটনাটা একরৈখিক হয়নি। এখানেও গড়ে উঠেছিল কেউ কেউ ভিন্ন মানুষ।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের শেকড় অনুসন্ধানে তাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনই পাওয়া যায় প্রত্যক্ষভাবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আগে এই অঞ্চলের যে জনবিন্যাস তাতে মধ্যবিত্ত বলে স্থির কোনো জনগোষ্ঠী পাওয়া যায় না। সেই শাসনের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী গঠনের বড় কারণ হচ্ছে সেই শাসন পুঁজিবাদকেই প্রতিনিধিত্ব করছিল। আর মধ্যবিত্ত আসলে আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি জনস্তর। সে বিষয়ে এখানে শুধু এটুকু বলা যায় যে, ব্রিটিশ শাসনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, প্রশাসনিক প্রয়োজনে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন পেশা গঠন, প্রথমে শাসক কোম্পানি পরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে কেরানি, সওদাগর গোষ্ঠীর আবির্ভাব, শিক্ষক, সাংবাদিক, উকিল জনগোষ্ঠীর সম্প্রসারণ ইত্যাদি একটি শহুরে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী গঠন করেছিল।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে এর মধ্যে প্রধানত ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। সে কারণে উনিশ শতকে বাংলায়, বিশেষত তার কেন্দ্রে যে বিপুল লেখালেখি, প্রকাশনা, নতুন চিন্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও আন্দোলন দেখা যায় তাতে মুসলমানের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। ক্রমে মুসলমানের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার তাদের নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। পরকালের চেয়ে ইহকালে নিজেদের অবস্থান নিয়ে তাদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বোধ তৈরি হয়। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য থেকে বের হওয়ার জন্য নিজের পরিচয় নির্দিষ্ট করবার তাগিদ তৈরি হয়। বৈষম্য-নিপীড়ন ব্যাখ্যা ও তার অবসানের শ্রেণী রাজনীতিকে সরিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু নিপীড়কের মুখোমুখি দাঁড়ায় মুসলমানদের একটি প্রভাবশালী অংশ। মুসলমান বৃহৎ সম্পত্তিমালিক আর মধ্যবিত্ত এই অবস্থানেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  ক্রমে এ থেকে এই অঞ্চলের মুসলমানের রাষ্ট্রচিন্তা এবং পাকিস্তান আন্দোলন।

%d bloggers like this: