…unity within diversity adds a richness and beauty to marriage and to life…


দুই ধর্মের মানুষের বিয়ে

লেখক: রফিকুল বাসার

০০ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অটুট রেখে সংসার করছেন অনেক দম্পতি
০০ বেড়ে উঠছে নতুন একটি প্রজন্ম, যাদের উত্তরাধিকার সূত্রে ধর্মীয় কোন পরিচয় নেই
০০ এটাকে সমাজের অনেক বড় পরিবর্তন বলছেন সমাজবিজ্ঞানীরা

ধর্ম পরিবর্তন না করেই দু’টি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে বিয়ের ঘটনা বাড়ছে। একই ধর্মের দু’জন বিয়ে করে ঘর সংসার করতে হবে এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসছেন অনেকেই। দুই ধর্মের দু’জন তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ঠিক রেখে বিয়ে করছেন। আচার-আচরণ পালন করছেন যে যার বিশ্বাস মত। এভাবে দেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে করে সংসার করছেন অসংখ্য দম্পতি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের জুটি এখন অনেক। আর এই বিয়ের ফলে বেড়ে উঠছে নতুন একটি প্রজন্ম। যারা উত্তরাধিকার সূত্রে কোন ধর্মীয় পরিচয় বহন করছেন না। আধুনিক সমাজে সেটা প্রয়োজনও মনে করছেন না অনেকে। এই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আবার কেউ কেউ নিজেই একটি ধর্ম বেছে নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ধর্ম বিশ্বাস থেকে সরে আসছেন। তবে রাষ্ট্র আইন করে এমন বিয়ের ব্যবস্থা করলেও এইসব পরিবারের সম্পত্তি বন্টনের জন্য কোন আইন নেই।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা সমাজের অনেক বড় পরিবর্তন। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সকলেই তার মত প্রকাশে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। নানা মতের, ধর্মের মানুষ এক সাথে বসবাস করবে এটাইতো গণতন্ত্র। আদর্শ সমাজ। বাংলাদেশের বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ (সংশোধিত ২০০৭) অনুযায়ী এই বিয়ে হচ্ছে। এই আইন অনুযায়ী, একজন মুসলমান, হিন্দু, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদি বা অন্য যে কোন ধর্মের যে কেউ যে কারো সাথে বিয়ে করতে পারবে। ধর্মের পরিবর্তন করা প্রয়োজন হবে না। অথবা দু’জনই ধর্মীয় বিশ্বাস বাদ দিয়ে বিয়ে করতে পারবে। অথবা একজন অন্যজনের ধর্ম মেনে নিতে পারবে। তবে নাবালকের সাথে কেউ বিয়ে করতে পারবে না। আইন অনুযায়ী এই বিয়ে রেজিষ্ট্রি করার জন্য সরকার একজনকে নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশে একজনই এই বিয়ে পড়িয়ে থাকেন।

” … পৃথিবীর উন্নত প্রায় প্রত্যেক দেশে ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই বিয়ের ব্যবস্থা আছে। এমন কি জীবন যাপনে আমাদের যেমন ধর্মীয় পরিচয় দিতে হয়। নানা ফরম পূরণ করতে গিয়ে লিখতে হয় ধর্ম। তা অনেক দেশেই নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দুই ধর্মের দুইজন বিয়ে করতে পারে। আইনগত কোন সমস্যা নেই। এছাড়া ইউরোপ আমেরিকাতেও একই অবস্থা। সেখানে শুধু বিয়ে নয়, কোন কাজেই ধর্মীয় পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন হয় না। …”


প্রায় প্রতিমাসেই এই বিয়ে হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এই বিয়ের হার বেড়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে এপর্যন্ত এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রায় ৫০০ দম্পত্তি কোন ধর্ম পরিবর্তন না করেই এমন বিয়ে করেছেন। এদের মধ্যে ছেলে হিন্দু, মেয়ে মুসলমান। কিম্বা ছেলে মুসলমান, মেয়ে হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। অনেকে আছেন আবেগে বিয়ে করছেন। অনেকে জেনে বুঝে গন্ডি ভাঙ্গার তাগিদে। অনেক পরিবার আছে এই বিয়ে মেনে নিচ্ছেন, আবার অনেক পরিবার আছে যারা মানছেন না।

ঈশান, নৈর্ঋত, নৈতিক। তিন ভাই। ওদের বাবা হিন্দু, মা মুসলমান। বাবা ব্যবসায় করেন, মা চাকরি। তিন ভাইই বয়সে এখনো ছোট। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে ওদেরকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় ওদের বাবা-মা। ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই ওরা এই সমাজে বেড়ে উঠছে। ওদের বাবা উজ্জল বালো মনে করেন, ধর্মীয় পরিচয় প্রয়োজন নেই। ‘মানুষ’ হবে এটাই বড় পরিচয়।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ স্বাধীন। যে যার ইচ্ছে তার সাথেই বসবাস করতে পারে। এখানে কোন বাধা নেই। দুই ধর্মের দু’জনের মধ্যে ভাল লাগার এক পর্যায়ে বিয়ের প্রসঙ্গ আসলে সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা দু’টো, একটা সমাজ-পরিবার আর একটা নিয়ম না জানা। সে জন্য একজন ধর্মান্তরিত হয়ে অন্যজনের সাথে জীবন যাপন করে। এক্ষেত্রে একজনকে তার ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন করতে হয়। একজনকে ছাড় দিতে হয় অনেক বেশি। কিন্তু কেউ কারো বিশ্বাস থেকে সরে না এসেও বিয়ে করছেন। এটা সমাজের অনেক বড় পরিবর্তন। সমাজ যে কুসংস্কার, কূপমন্ডুকতা থেকে বের হয়ে আসছে তার উদাহরণ। উদার মনের পরিচয়। অন্যের বিশ্বাসের প্রতি আস্থা রাখা। সকলকে মত প্রকাশ করার সুযোগ বা স্বাধীনতা দেয়া। তবে এ স্বাধীনতা দেশের শহরাঞ্চলের মানুষ যতটা ভোগ করছেন গ্রামে ততটা নয়। তবে এক্ষেত্রে সমস্যা উত্তরাধিকারদের সম্পত্তি ভাগ নিয়ে। বাংলাদেশে ইসলাম, হিন্দু ও খৃষ্টান ধর্মীয় আইনে সম্পত্তি ভাগ হয়। কিন্তু এই পরিবারের সম্পত্তি যদি বাবা-মা ভাগ করে দিয়ে না যান বা উইল না করেন, তবে ভাগ করার কোন নিয়ম নেই।

আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমদ দুই ধর্মের দু’জনের বিয়ে বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, স্বাধীন দেশে মানুষের স্বাধীনতা আছে। সেই স্বাধীনতা তারা ভোগ করছে। এখানে সবাই স্বাধীন। যে যার মত পারে। রাষ্ট্র তাকে স্বাধীনভাবে চলার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা দিয়েছে এবং দিয়ে যাবে। দেশে সামাজিক পরিবর্তন হবে। মানুষের চিন্তার বিকাশ হবে। এক একজন এক একটা ভাববে কিন্তু অন্যের ক্ষতি করবে না এটাইতো স্বাভাবিক। দুই ধর্মের দম্পতির সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে কিভাবে বন্টন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্পত্তি যার নামে তিনি যে ধর্মের হবেন সম্পত্তিও সেই ধর্মের নিয়মে ভাগ হবে। বাবা যদি মুসলমান হন এবং সম্পত্তি যদি তার নামে থাকে তবে মুসলিম আইনে ভাগ হবে। আর মা যদি হিন্দু হন আর তার নামে সম্পত্তি থাকে তবে হিন্দু আইনে। কোন রকম সামাজিক সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত, কোন আইনগত বাধা না আসা পর্যন্ত এই বিয়ে বিষয়ে নতুন আইনের প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

” … আবেগটা কমিয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে চলা ভাল। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। কোন একটা শক্তির কাছে নিজেকে সপে দিতে চাই। বিশ্বাস না করার জন্য একটা আলাদা শক্তি লাগে। আমার সেটা নেই। দুটো মানুষের সম্পর্ক এখানে বিষয়। ধর্মতো কোন বিষয় না। ধর্ম বাদ দিয়েও কেউ একসাথে থাকতে পারে। সেটা তাদের নিজেদের বিষয়। ধর্মটা আমার কাছে নিজের। বিশ্বাসটা আমার মতো। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের কাছে সবাই সমান। এখানে ধর্ম কোন বিষয় না। আমার ব্যক্তি জীবনে নিজের এত বড় শক্তি নেই যে, আমি বিশ্বাসটাকে ফেলে দেব। আমার একটা আশ্রয় প্রয়োজন। …”


প্রসঙ্গত, সরকারিভাবে এমন বিয়ে পড়ানোর একমাত্র স্থান পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলি। প্রাণেশ সমাদ্দার এই বিয়ের রেজিস্ট্রার। একই সাথে তিনি রাজধানীর পাটুয়াটুলির শরত্চন্দ্র ব্রাহ্ম প্রচারক নিবাসের আচার্য ও ট্রাস্টি। সেখানেই থাকেন তিনি। প্রাণেশ সমাদ্দার বলেন, শুধু ঢাকা নয় দেশের অন্যান্য জেলা থেকেও ছেলে মেয়েরা আসে বিয়ে করতে। বিশেষ করে যারা দেশের বাইরে যেতে চায় তাদের আসতেই হয়। কারণ কোর্টে বিয়ে করলে বিয়ে রেজিস্ট্রির কোন প্রমাণপত্র পাওয়া যায় না। অবশ্য কোর্টে দুই ধর্মের দু’জন বিয়ে করতে পারে না। অনেক সময় যারা জানে না তারা প্রথমে কোর্টে যায়। আর তখন আইনজীবীরা এখানে নিয়ে আসে। এখানে বিয়ে হলেও ডিভোর্স করানো যায় না। ওটা করতে হয় কোর্টে।

সূত্র জানায়, বিয়ের ১৪ দিন আগে রেজিস্ট্রারের কাছে নোটিস দিতে হয়। এরমধ্যে কারো কোন আপত্তি থাকলে সে তা জানাবে। তারপর তিনজন সাক্ষী আর পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে হাজির হতে হবে। নির্দিষ্ট ছকে ছেলে-মেয়ে দু’জন স্বাক্ষর করবে আর স্বাক্ষর করবে তিনজন সাক্ষী। এতেই হয়ে যাবে দু’জনের বিয়ে। সামাজিক আর কোন আনুষ্ঠানিকতা এখানে নেই। তবে বিয়ের পরে কেউ কেউ মিস্টি নিয়ে আসেন। উপস্থিত সবাই মিষ্টি খেয়ে নব দম্পতির মঙ্গল কামনা করেন।

বিশিষ্ট অভিনেতা এবং হিন্দু ও মুসলিম মিলিত পরিবারে বেড়ে ওঠা ত্রপা মজুমদার এমন পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিজেকে গর্বিত মনে করেন। তিনি বলেন, আমি এমন পরিবারে জন্মে গর্ব বোধ করি। যত সহজে ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে দেখতে পারি তা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ যদি এভাবে জীবন গড়তে চায় তবে তাকে আমি সাধুবাদ জানাবো। তবে আমার মা-বাবা বলে, দরকার নেই। কারণ এভাবে জীবন কাটানোর সংগ্রামটা অনেক বেশি কঠোর। আবেগ দিয়ে অনেকে এটা করে ফেলে। আবেগটা কমিয়ে বাস্তবতার ভিত্তিতে চলা ভাল। আমি মনে করি কোন সমস্যা নেই। ধর্মটা একটা ব্যক্তিগত বিষয়। যে যার মতো ধর্ম পালন করবে। এখানে এক সাথে বসবাস করাতে কোন সমস্যা নেই। ছোট বেলা থেকে কিছু কিছু সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষক বা অন্য অনেকে বলেছে, তুমি কোন ধর্ম পালন কর? তোমার মা-বাবা কে কোন ধর্ম পালন করে? তখন খারাপ লাগতো। বিব্রত হতাম। বড় হওয়ার পরে আর খারাপ লাগে না। বিব্রত হই না। দাদু বাড়িতে যাই। সেখানে তাদের মত সব ধরনের হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে। আবার নানু বাড়িতে যাই সেখানেও সব ধরনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবে আমি নিজে ইসলাম ধর্ম চর্চা করি। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। কোন একটা শক্তির কাছে নিজেকে সপে দিতে চাই। বিশ্বাস না করার জন্য একটা আলাদা শক্তি লাগে। আমার সেটা নেই। দুটো মানুষের সম্পর্ক এখানে বিষয়। ধর্মতো কোন বিষয় না। ধর্ম বাদ দিয়েও কেউ একসাথে থাকতে পারে। সেটা তাদের নিজেদের বিষয়। ধর্মটা আমার কাছে নিজের। বিশ্বাসটা আমার মতো। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের কাছে সবাই সমান। এখানে ধর্ম কোন বিষয় না। আমার ব্যক্তি জীবনে নিজের এত বড় শক্তি নেই যে, আমি বিশ্বাসটাকে ফেলে দেব। আমার একটা আশ্রয় প্রয়োজন।

একটি মোবাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী শুভ। গত মার্চে বিয়ে করেছেন একটি মুসলমান মেয়েকে। একজনের বাড়ি পাবনা, অন্যজনের ময়মনসিংহ। ওরা কেউ তাদের ধর্ম পরিবর্তন করেনি। নিজ নিজ ধর্মে থেকেই বিয়ে করেছেন। এখন সংসার করছেন। মেয়েটি নামাজ পড়ে। ছেলেটি পূজা করে। ধর্মীয় কোন কিছুতে কারো কোন সমস্যা নেই। বাধাও নেই। সামাজিকভাবেও কোন সমস্যা নেই। দু’জনই চাকরি করছেন। বন্ধু, সহকর্মীরা স্বাগত জানিয়েছেন। সংসার গোছাতে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু বাধ সেধেছে পরিবারের অভিভাবকরা। সমস্যা শুধু পরিবার থেকে। শুভ বলেন, ধর্ম, রাষ্ট্র একটা গণ্ডি। আমরা সেই গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছি। গণ্ডিটা ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছি। শুধু যে আবেগে বিয়ে করেছি তা নয়। এখানে দুইটা মানুষ এক হয়ে থাকবে সেটাই বড় কথা। মানুষতো ধর্ম এনেছে। ধর্মতো আর মানুষকে আনেনি। জীবনে মানবিকতাই বড়। অন্য কিছু নয়।

মৌসুমী (ছদ্ম নাম) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক হিন্দু ছেলের সাথে প্রেম করেছেন। পড়া শেষে চাকরি করতে দু’জনই ঢাকায়। এগার বছর পর তাদের বিয়ে হয়। মেয়ের বাড়ি থেকে এখনো মেনে নেয়নি। ছেলের বাড়ি থেকেও মেনে নেয়নি। মৌসুমী বললেন, ধর্ম বা সমাজ যদি বড় একটা বিষয় হত আমি বিয়ে করতাম না। আমরা কেউ ধর্ম পরিবর্তন করিনি। আমাদের সন্তানকে আমরা ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে গড়ে তুলব। পরে তার যদি কোন ইচ্ছা হয় তবে সে সেটা পালন করবে। তিনি বলেন, অফিস থেকে ভাল সাহায্য পেয়েছি। বন্ধুদের অনেকে সাহায্য করেছে। এই বিয়ে করতে গেলে মানসিক শক্তিটা অনেক বড় থাকতে হবে। ধর্মটা এখানে বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে সমাজ। আমার বাবা মনে করছে তার সমাজ কি বলবে। আমি যে তার মেয়ে সেটা সে দেখছে না। আমার চেয়ে তার সমাজের কে কি বলল সেটা বড় হলো। বাবা আমার কথা ভাবছে না। সমাজ কাছের মানুষকে এক করে না, দূরে পাঠায়। সমাজ তাকে কিছু দিচ্ছে না। তিরস্কার করছে। অথচ তারা ঐ সমাজ নিয়েই থাকছে। বিয়ে করার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পুরানো ঢাকার পাটুয়াটুলিতে গিয়ে প্রথমে নাম লিখিয়ে এসেছি। পরে নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে বিয়ে করেছি। তিনজন সাক্ষী লেগেছে। আর দু’কপি ছবি। সাথে পরিচয়পত্রর ফটোকপি। তারপর থেকেই আমরা একসাথে আছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা এম. রশিদ চৌধুরী বলেন, এটি আধুনিকতার একটি রূপ। যেখানে ধর্মটাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন প্রভাবে এটা হচ্ছে। সমাজ মেনে নিচ্ছে। আবার রক্ষণশীল সমাজ হলে তা মানছে না। এখানে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্বাধীন জীবন যাপন করছে তারা। এটা বেশি দেখা যায় শিক্ষিত সমাজে। সেখানে মনের মিলটাই গুরুত্বপূর্ণ। গোঁড়ামি কুসংস্কার ছিল, তা এখন কমে আসছে। সামাজিক বিধি-নিষেধ, বাধা কমে যাচ্ছে। সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম আসছে না। যারা সাংস্কৃতিক অঞ্চলে জীবন যাপন করে তারা এটা মানে না। তিনি বলেন, এই ধরেনর বিয়েতে প্রথমে পরিবার থেকে বাধা আসে। তবে তা পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যায়। তবে আধুনিকতা পরবর্তীতে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। সামাজিক কিছু সমস্যা হয়। ছেলে-মেয়ে কি হবে। তারা কিভাবে পরিচিত হবে। এগুলো সামনে চলে আসে। তবে ইসলাম ধর্মে কিছু বাধা নিষেধ আছে। ইসলাম ধর্মে এ ধরনের বিয়ের কোন নিয়ম নেই। যদি ধর্ম না মেনে রাষ্ট্রীয় আইনে বিয়ে করে তবে ঠিক আছে।

প্রসঙ্গত, পৃথিবীর উন্নত প্রায় প্রত্যেক দেশে ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াই বিয়ের ব্যবস্থা আছে। এমন কি জীবন যাপনে আমাদের যেমন ধর্মীয় পরিচয় দিতে হয়। নানা ফরম পূরণ করতে গিয়ে লিখতে হয় ধর্ম। তা অনেক দেশেই নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দুই ধর্মের দুইজন বিয়ে করতে পারে। আইনগত কোন সমস্যা নেই। এছাড়া ইউরোপ আমেরিকাতেও একই অবস্থা। সেখানে শুধু বিয়ে নয়, কোন কাজেই ধর্মীয় পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন হয় না।

” … Free International Calls: Free mobile calls between 50 countries..Make a cheap call to Bangladesh Landline / Mobile 3.9¢ / No Pin / 1 Min rounding/ The honest LD company in the Planet …”

Say YES/ NO to inter-religious marriage..?? Click…

নারী নির্যাতনের হঠাৎ মহামারীর কারণ কি?


নারী নির্যাতনের হঠাৎ মহামারীর কারণ কি?
আহসান মোহাম্মদ

নারী নির্যাতন

নারী নির্যাতন



১.গত মাসখানেকের পত্রিকার দিকে তাকালে মনে হবে হঠাৎ করেই কোন একটা বর্বর বাহিনী তাদের সকল শক্তি ও লাম্পট্য নিয়ে আমাদের মেয়েদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়েছে ইভ-টিজিং এর মহোৎসব। শত শত মানুষের সামনে জোর করে স্কুলগামী একটা মেয়েকে চুমু দেয়া, রাস্তায় গাছের সাথে প্রকাশ্য দিবালোকে বেধে রেখে বিবস্ত্র করা, বখাটেপনায় বাধা দিলে শিক্ষক কিংবা মেয়েটির মাকে হত্যা করা – এই ধরণের কোন না কোন খবর প্রতিদিনই পত্রিকাতে আসছে।

সকলের মনেই প্রশ্ন উঠছে, মেয়েদেরকে উত্যক্ত ও নির্যাতন করা হঠাৎ করে মহামারী আকার ধারণ করলো কেন?

এই ধরণের দুই-একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যাবে।

ত্রিশে অক্টোবরে প্রথম আলোর একটি রিপোর্টে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য ও প্রথম আলোর রিপোর্টারের মহানুভবতার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে,

“বখাটেদের উৎপাতে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাভার ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুর রশীদ। কিন্তু বিয়ের এক দিন আগে গত বৃহস্পতিবার অন্তত ৩০ জন সন্ত্রাসী ওই বাসায় হানা দিয়ে আবদুর রশীদের মেয়ে সাহিরা শাওলিন শৈলীকে অপহরণের চেষ্টা চালায়।

কথা ছিল শুক্রবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন হবে। সকাল থেকেই বখাটে সোহাগ কনের বাবা ও বরকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। হুমকির মুখে বরের বাড়ির লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। দুপুর ১২টায় বিয়েতে অপারগতা প্রকাশ করে খবর পাঠানো হয় কনের বাসায়। তখন ওই বাসায় বিয়ের আয়োজন চলছিল।”

খবরের এই অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে পড়লে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে পড়ে:

ক. একজন সরকারী কর্মকর্তা, অফিসার্স কোয়ার্টারে থেকেও তার মেয়েকে বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার সাহায্যে এগিয়ে আসছে না।

খ. বখাটেরা অফিসার্স কোয়ার্টারে এসেও হামলা করার সাহস পাচ্ছে।

রিপোর্টের পরের অংশ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

“প্রতিবেদক বিষয়টি জানান সাভারের সাংসদ তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদকে। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পাওয়া যায় তাঁর কাছ থেকে। সাংসদের নির্দেশে একে একে কনের বাসায় উপস্থিত হন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) সাভার থানার একাধিক কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার করা হয় বখাটে যুবক সোহাগের বাবা মজিবর রহমানকে।”

এই অংশ পড়ে বোঝা গেলো জাদুর কাঠি কোথায়। সংসদ সদস্য নির্দেশ দেয়া মাত্র ওসি এসে মেয়েটির বাসায় হাজির, সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার বখাটে যুবক সোহাগের বাবা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ওসি সাহেব এতোদিন কেন বখাটে বা তার বাবাকে গ্রেফতার করেননি? উত্যক্ত করার ঘটনা ঘটছিল বেশ কিছুদিন ধরে, কোনভাবেই কিছু না হওয়ায় একজন প্রকৌশলী তার মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বহুবার পুলিশের দরজায় ধর্ণা দিয়েছেলেন। পুলিশ তখন কিছু করেনি কেন? বখাটেরা মেয়েটাকে অপহরণ করতে তার বাসায় হামলা চালায়। পুলিশ তখন বখাটে বা তার বাবাকে গ্রেফতার করেনি কেন?

উত্তরটা সহজ। পুলিশ তখন কিছুই করতে পারেনি, কেননা, এমপি সাহেব তাদেরকে কোন কিছু করার নির্দেশ দেননি।

ওসি সাহেবেরা সব সময়েই এমপি মহোদয়দের তোয়াজ করে চলেন। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এটি হয়তো একেবারে দূর করা কষ্টকর। এমপি বললে গ্রেফতার করা হয়, এমপি বললে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু, এমপির নির্দেশ না পেলে কোন কিছুই করা হয় না – এটি বাংলাদেশে হয়তো এই প্রথম।

২.এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারদলীয় কর্মীদের দ্বারা সরকারী কর্মকর্তাদের অপদস্ত হওয়ার নানা খবর প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে। বলা দরকার যে, সরকার যাদেরকে কোন না কোনভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি অতি বিশ্বস্ত মনে করছে না, তাদেরকে ওএসডি করে রাখা হচ্ছে। দলীয় বিশ্বস্ততার সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই কেবলমাত্র ডিসি, এসপি, ওসি – এই সব পদে থাকতে পারছেন। ফলে, তারাও সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন, সরকারী দলকে সন্তষ্ট রাখতে।

কিন্তু, পাবনার ডিসি কোনভাবেই কুল রক্ষা করতে পারলেন না। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের হামলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা ভণ্ডুল হয়ে যায়। চরমভাবে লাঞ্ছিত হন জেলা প্রশাসক মনজুর কাদিরসহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তারা। দৈহিক নির্যাতনের শিকার হন নারী কর্মকর্তারাও।

সরকার সমর্থক পত্রিকা সমকালের রিপোর্টে বলা হয়েছে,

“প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ইশরাত ফারজানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি আমার ছোট সন্তানকে নিয়ে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ৩ বছরের শিশুকে নিচে রেখে তৃতীয় তলায় হলে ছিলাম। এ সময় দেড়-দুইশ’ যুবক লাঠিসোটা নিয়ে স্কুলের গেট ভেঙে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায়। তারা আমার সামনে সদরের ইউএনও আবদুল হালিমকে মারতে মারতে নিচে নামায়। আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে গায়ে হাত তোলে।”

বিষয়টি মিডিয়াতে আসলে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই ঘটনায় তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তখন বিদেশে ছিলেন। সকলেই আশা করছিলেন, তিনি এবার লাগামহীন দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিবেন।

কিন্তু, তিনি প্রশাসনকে একটা উল্টো বার্তা পাঠালেন। প্রকাশ্যে বললেন, একহাতে তালি বাজে না। যারা সরকারী কর্মকর্তাদের মারধোর করলো, প্রথম শ্রেনীর নারী ম্যাজিস্ট্রেটের গায়ে হাত তুললো, তাদেরকে সাজা দেয়ার বদলে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত সরকারী কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হলো। সরকারী কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। তিনি বলে দিলেন, সরকারী দলের যে কেউ যা কিছু ইচ্ছা করতে পারবে, কোন ধরণের বাধা দিলে চাকরী থাকবে না।

এই সময়েই ঘটে আরো কয়েকটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ঘটনা।

ক. রাষ্ট্রপতি ফাসির দন্ডপ্রাপ্ত ২০ জন খুনের আসামীকে ক্ষমা করে দেন। তাদেরকে আবার ফুলের মালা দিয়ে সম্বর্ধনা জানান একজন মন্ত্রী।

খ. প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক ও টিভি ক্যামেরার সামনে আওয়ামী লীগের নেতারা পিটিয়ে হত্যা করে নাটোরের উপজেলা চেয়ারম্যানকে। সকল দৈনিক পত্রিকায় এই হত্যাকান্ডের ছবি ছাপা হয় এবং সকল টিভি চ্যানেলে পিটিয়ে মারার ভিডিও প্রচারিত হয়। ছবি এবং ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা জাকির হোসেনের নেতৃত্বে পিটিয়ে ও কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী এইবার সবথেকে মারাত্মক বার্তাটি পাঠান। তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, এটি যে বিএনপির অন্ত:কলহের ফল নয়, তা কে বলবে! ফলে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা বুঝে গেলো, যত বড় অপরাধই তারা করুক, এমনকি টিভি ক্যামেরার সামনে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও তাদের কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

৩. মানবদেহের যেমন নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে, তেমনি প্রতিটি সমাজেরও অপরাধ প্রতিরোধে অন্তনির্হিত শক্তি থাকে। বাংলাদেশের জন্য সেটি ছিল ধর্মীয় শক্তি। পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে কাজ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তরুনদের মধ্যে ধর্মপ্রবনতা বেড়েছে এবং তারা একটি সামাজিক প্রতিরোধ শক্তি হিসাবে কাজ করেছে।

কিন্তু, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত সব কিছুর বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ধার্মিক তরুনদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে কারাগারে। কোরআন শরীফের তাফসীর, ইসলাম ধর্মের উপর বিভিন্ন বই-পত্র রাখার অপরাধে প্রায়ই গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং এই সকল বইগুলোকে জেহাদী বই হিসাবে দাবী করছেন আমাদের পুলিশ কর্মকর্তারা। আসলেই এখন মানুষ কোরআন শরীফ লুকিয়ে রাখছে। যেহেতু সমাজের এই ধর্মপ্রবণ অংশটি এখন দিন কাটাচ্ছে চরম ভীতির মধ্যে, তাই তাদের পক্ষ থেকে সামাজিক অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ আসতো, তা আসতে পারছে না।