মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!


ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও। গ্রাম থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীও ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে অনেকে।

সমাজবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করছেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার ওই ধারণা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকায়। এ রকম এক জুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই বিভাগে, একই ক্লাসে পড়তেন। গভীর বন্ধুত্ব তখন থেকেই। দু’জনই মেধাবী। রেজাল্টও ভাল। বন্ধুটি এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বান্ধবী পিএইচডি করছেন, এখনও শেষ হয়নি। থাকছেন বনানী এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটিও নিজেদের। লিভ টুগেদার করছেন। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করবেন না। দু’জনই চেষ্টা করছেন ইউরোপের একটি দেশে যেতে। বিত্তবান ঘরের সন্তান তারা।

বন্ধুটির বাড়ি ছিল ফেনীতে, বান্ধবীর ঢাকায়। শাহানা তার নতুন নাম। এ নামে কেবল জর্জই তাকে চেনে। জর্জকে ওই নামে অন্য কেউ চেনে না। এটা শাহানার দেয়া নাম। একে অপরকে দেয়া নতুন নামেই তাদের বাড়ি ভাড়া নেয়া উত্তরা এলাকায়। চাকরিজীবী দু’জনই। এক সময়ে চাকরি করতেন এই সংস্থায়। সেখান থেকে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। এখন তারা চাকরি করছেন পৃথক দু’টি বৈদেশিক সাহায্য সংস্থায়। উচ্চ বেতনে চাকরি। অফিসের গাড়ি। শাহানা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জর্জ পড়াশোনা করেছেন ভারতের নৈনিতালে, বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় ফিরে চাকরি নিয়েছেন। লিভ টুগেদার করছেন। বিয়ের প্রতি আগ্রহ নেই তাদের। শাহানা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চান। সেখানে তার পরিবারের বেশির ভাগ লোক বসবাস করছে। শাহানার চিন্তা বিয়ে মানেই একটি সংসার, ছেলেমেয়ে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। এখনই এগুলোর কথা ভাবতে গেলে তার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে, বিদেশে যাওয়া না-ও হতে পারে। এ কথাগুলো সে খুলে বলেছে জর্জকে। জর্জ রাজি হওয়ায় এক সঙ্গে থাকছেন তারা চার বছর ধরে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ দু’জনে মিলে বহন করেন। সব কিছুই হয় দু’জনে শেয়ার করে। মনোমালিন্য হয় না তা নয়, হয় আবার তা মিটেও যায়। এভাবেই চলছে চার বছর ধরে।

একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তারা। বসবাস করছেন ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটে। ছেলেমেয়ে দুজনই ধনাঢ্য পরিবারের। দু’বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন। পড়শিরা জানে, স্বামী-স্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে সেভাবেই নিজেদের পরিচয় দেন। যশোরের একটি গ্রাম থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন ওরা। পরিচয় তাদের স্কুল থেকে। ঢাকায় এসে প্রথম দু’বছর দু’জন থাকতেন আলাদা বাড়ি ভাড়া করে। এখন দু’জন মিলে থাকছেন একই বাসায়। ভাড়া দেন দু’জনে শেয়ার করে। গত এক বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত লিভ টুগেদার করছে। শোবিজে লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় ভাবে পরিচিত শোবিজের অনেক স্টার এখন লিভ টুগেদার করছেন। দেশব্যাপী পরিচিত দু’জন নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট শোবিজে। একজন পরিচিত কণ্ঠশিল্পী গত পাঁচ বছর ধরে লিভ টুগেদারের পর আপাত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এখন থাকছেন আলাদা। শোবিজের নাট্যাঙ্গনের চার জোড়া নতুন মুখ লিভ টুগেদার করছেন বছরখানেক ধরে। তাদের পরিচিত ও নিকটজনরা জানেন তাদের লিভ টুগেদার সম্পর্কে। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তারা কেউ আপাতত বিয়ের কথা ভাবছেন না। শোবিজে ছেলেমেয়ে উভয়ের উচ্চাসনে যাওয়ার পথে বিয়েকে একটি বড় বাধা মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত দুই তিন বছরের মধ্যে ঢাকায় লিভ টুগেদারেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে লিভ টুগেদারের বেশির ভাগ ছিল সমাজের উচ্চ স্তরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এখন লিভ টুগেদারের প্রবণতা বেড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সদ্য গ্রাম থেকে এসে ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। কেবলমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে কিন্তু তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এমন অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছে।

ঢাকার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, তার জানা মতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম করে হলেও এক শ’ জোড়া ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করছে। বিষয়টি তাদের কাছে ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ কাউকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। ওই শিক্ষার্থী লিভ টুগেদারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তার ভাষায় দু’জনের মতের মিলেই তারা লিভ টুগেদার করে। এখানে অপরাধ কিছু নেই। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা লিভ টুগেদার করছেন। তাদের লিভ টুগেদারের কথা জানে তাদের অনেক ছাত্রও। ওই শিক্ষকদের একজন তার এক নিকটজনের কাছে বলেছেন, লিভ টুগেদারকে তিনি বরং গর্বের বিষয় মনে করেন।
ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন, বর্তমানে বসবাস করছেন গুলশান এলাকায়। চাকরি করেন একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায়। এর আগে তার কর্মস্থল ছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। তিন বছর ধরে ঢাকায় আছেন। লিভ টুগেদার করছেন তারই এক সহকর্মী নারীর সঙ্গে। ওই ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দু’জনই বাংলাদেশী। তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং হয়। এখন বাংলাদেশে আছি, এক বছর পর অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। সে কারণে আমরা দু’জনই ঠিক করেছি লিভ টুগেদার করতে।

তাছাড়া, লিভ টুগেদারের ধারণা খারাপ নয়, আমরা কেউ কারও বোঝা নই, আইনি বন্ধনও নেই। কারও ভাল না লাগলে তিনি এক সঙ্গে না-ও থাকতে পারেন। এতে কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে এ প্রবণতার কিছু কারণ জানা গেছে। তাদের মতে, যে সব মেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করে, নিজেদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা বা দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা এখনই বিয়ে করে ছেলেমেয়ের ভার নিতে চায় না। সংসারের ঘানি টানতে চায় না। ওই সব মেয়ে নিজেদেরকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে। এমন অনেক ছেলেও আছে যারা ওই সব মেয়ের মতো ধারণা পোষণ করে না তারা কেবলমাত্র জৈবিক কারণে লিভ টুগেদার করছে। অর্থবিত্তে বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে লিভ টুগেদার করছে কেবলমাত্র সমাজে তার একজন সঙ্গীকে দেখানোর জন্য, নিজের একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায়। অনেকে বিয়ের প্রতি প্রচণ্ড রকম অনাগ্রহ থেকেও লিভ টুগেদার করছে। ঢাকা শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির কন্যা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন একজন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে। ওই শিল্পপতির কন্যার প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংসার জীবনের পাট চুকিয়ে এখন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের লিভ টুগদোর। ওয়েস্টার্ন সোসাইটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ ও অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন তাদের লিভ টুগেদারে বিচ্ছেদও ঘটছে। সহসা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঘটছে খুনের মতো অপরাধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে খুন করে পালিয়েছে ছেলেটি। চলতি বছর জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় খুন হয় সুরাইয়া নামের এক যুবতী। তিনি চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। তাকে খুন করে বাসায় লাশ রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যায় যুবক সুমন রহমান। পরে জানা যায়, প্রায় বছর খানেক ধরে লিভ টুগেদার করতেন সুমন ও সুরাইয়া।

এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। মে মাসে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে এক তরুণীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই তরুণী লিভ টুগেদার করতো তারই এক বন্ধুর সঙ্গে। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে মনোমালিন্য শুরু হয় তাদের মাঝে। শেষে মেয়েটিকে খুন করে পালিয়ে যায় বন্ধুটি। গত ১লা নভেম্বর রর‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় ম্যারেজ মিডিয়ার দুই পার্টনার। ফরিদপুর শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একই শহরের আরেকটি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে। পারভীন নামের মেয়ে ও আরিফ নামের ছেলেটি অকপটে স্বীকার করেছে তারা লিভ টুগেদার করছে এবং এক সঙ্গে ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসা করছে।

ঢাকাতে লিভ টুগেদার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমাডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অনেক যুবক-যুবতী এখন ফ্যামিলিকে একটা বার্ডেন মনে করে, বিয়েকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্তরায় মনে করে। দেখা যাচ্ছে, এরা বিয়ের চেয়ে লিভ টুগেদারকে বেশি পছন্দ করছে। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও পাচ্ছে। তারা সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের সঙ্গী হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন বাড়ি ভাড়া একটি বড় সমস্যা। বাইরে থেকে পড়তে আসা বা চাকরি করতে আসা যুবক বা যুবতীকে বাড়ির মালিক আলাদা আলাদা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তিনি বলেন, তবে এতে সমস্যা হচ্ছে সমাজে এক ধরনের ক্রাইম তৈরি হচ্ছে, কোন কারণে বনিবনা না হলে খুন হয়ে যাচ্ছে মেয়ে বা ছেলেটি।
http://allsharenews.com/

বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ


বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে মার্কিনী আধিপত্যের কারণ

ডঃ কাজী নাসির উদ্দীন

সম্প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে মার্কিন সমাজের আচার ব্যবহারের অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে লক্ষ্যগোচর হচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যে মা দিবস আর ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মার্কিনী প্রথায় ছেলেবন্ধু (বয়ফ্রেন্ড) ও মেয়েবন্ধু (গার্লফ্রেন্ড) গড়ে উঠছে এই রকম বন্ধুত্বের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না অচিরেই হয়তো শুনতে পাবো যে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই যুবক-যুবতীরা একই ছাদের নীচে বসবাস করছে ।

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হিড়িক পড়ে গেছে এবং তরুণ-তরুণীরা বন্ধুত্বের দাবীতে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে আর একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে অপরিসীম আনন্দ উপভোগ করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেও এই মার্কিনী অনুকরণের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এখন বাংলাদেশের গায়ক-গায়িকাদের গানের সঙ্গে নাচ যোগ করে দিতে হয় অর্থাৎ নেচে নেচে গান না গাইলে সে গান জনপ্রিয় হয় না বসে বসে গান গাওয়াটাতো এখন অতীতের ব্যাপারে পর্যবসিত হয়েছে আমাদের দেশের সংগীত শিল্পীরা চিরকাল গলা আর হৃদয়াবেগের মিশ্রণে মনের আকুলতা প্রকাশ করে এসেছে দেহকে সেখানে টেনে আনার কোন প্রয়োজন দেখা দেয় নি অবশ্য আমি এ ব্যাপারে সচেতন, যে কোন সংগীত চর্চায় গলা ও হৃদয়ের সঙ্গে দৈহিক অঙ্গভঙ্গী ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে, যেমন বাউল গান ও লালন গীতি কিনতু নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক গান যদি নেচে নেচে গাইতে হয়, তবে কেমন হয় ? পাঠকরাই বিবেচনা করুন এছাড়া দেশের তরুণীরা এখন শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ আর ওড়না ছেড়ে দিয়ে বেপরোয়াভাবে শার্ট আর জিন্স-এর প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।

বলা বাহুল্য যে সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো তা হুবহু মার্কিন সমাজ ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ মাত্র এক কথায় বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও সংস্কৃতি কেন এমন হলো ? পাশ্চাত্যে আরো অনেক দেশতো রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড ভ্রমণ করার সুযোগ আমার হয়েছে সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রয়াসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি আশ্চর্য্যরে ব্যাপার ঐ সমস্ত দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাংলাদেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি কেবলমাত্র মার্কিনী সংস্কৃতি গ্রাস করে নিয়েছে বাংলাদেশকে আরো আশ্চর্য্যরে বিষয় এই যে পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিতে পারেনি উপরন্তু পাশ্চাত্যের ঐ সমস্ত দেশে আমি মার্কিনী সংস্কৃতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা লক্ষ্য করেছি জিব্রালটার প্রণালী পার হয়ে স্পেনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম স্পেন, ইংল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা আমেরিকানদের রাখাল বালক (Cow Boy)হিসেবে অভিহিত করে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে বলা হয়ে থাকে আমেরিকানরা অসভ্য আর অসংস্কৃত সুতরাং হঠাৎ করে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে আমেরিকার সংস্কৃতি এতো প্রিয় হয়ে গেল কেন যে, এ বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

কোন একটি দুর্বল দেশকে যদি কোন একটি সবল দেশ চিরদিনের জন্যে অধীনস্থ করে রাখতে চায় তাহলে দুর্বল দেশটির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয় বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপনিবেশকে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য এই ধ্বংস যজ্ঞে আত্মনিয়োগ করেছিলো নিজেদেরকে কিšতু জাগ্রত প্রহরীর মতো সে সমস্ত উপনিবেশের বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির অপলাপ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলো আর তারই ফলশ্রুতিতে সেই সমস্ত দেশের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো তাদের নিজ নিজ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের অবসান আজও ঘটেনি নতুন মুখোশ পরে সাহায্য সহযোগিতার অজুহাতে আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা দুর্বল দেশগুলোর উপর নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে পেরেছে সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে একটি দেশকে দখল করা যায় সাময়িকভাবে কিনতু সে দেশটিকে জয় করা যায় না যতদিন পর্যন্ত না সে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, গর্ব আর অহংকারকে চূর্ণ করা যায় ততদিন পর্যন্ত সে দেশের মানুষকে বশীভূত করা যায় না একটি জাতির গৌরব, গর্ব আর অহংকারকে ধ্বংস করতে হলে সর্বপ্রথম ধ্বংস করতে হবে সে জাতির সংস্কৃতিকে মহা ধ্বংসযজ্ঞে বর্তমানে আত্মনিয়োগ করেছে সাম্রাজ্যবাদীরা আর এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ কেন ? যেহেতু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার আত্মমর্যাদা দুর্নীতিতে শীর্ষস্থান দখল করে বাংলাদেশ সকল গৌরবকে দিয়েছে জলাঞ্জলি সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশকে জয় করার এই হচ্ছে মোক্ষম সময় এই পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে বাংলদেশকে রুখে দাঁড়াতে হবে যেমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলো পৃথিবীর দিকে দিকে আত্মমর্যাদা সম্পন্ন বিভিন্ন জাতি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

সংস্কৃতি চেতনা যাদের খুব প্রখর তাদের আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই রকম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতিকে অধীনস্থ করা কঠিন আমার নিজের দেশবাসীরাই যদি অতি আগ্রহের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীর অপসংস্কৃতির অনুকরণে উৎসাহী হয়, তাহলে সাম্রাজ্যবাদীকে দোষ দিয়ে লাভ কি ? সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যটাতো দেশবাসীর সহায়তায় সহজেই হাসিল হয়ে যায় কিনতু কেন যে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই মার্কিনী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে রুখে না দাঁড়িয়ে বরং স্বাগত জানালো সে বিষয়টা এবার একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রে বিপরীত আকর্ষণ (Opposite attracts) করে বলে একটা তত্ত্ব আছে এর সারমর্ম এই যে তরুণ-তরুণীরা তার সম্পূর্ণ বিপরীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বাংলাদেশ আমেরিকার সম্পূর্ণ বিপরীত ক্রান্তিতে অবস্থান করছে অর্থাৎ আমেরিকায় যখন দিন বাংলাদেশে তখন রাত আমেরিকা পৃথিবীর একটি মহাপরাক্রমশালী দেশ বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্বল দেশ আমেরিকা পৃথিবীর শীর্ষ স্থানীয় ধনী দেশ সমূহের তালিকাভুক্ত আর বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ বিপরীত বটে, আর সে কারণেই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়া মনস্তত্ত্ব শাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী খুবই স্বাভাবিক কিনতু এই স্বাভাবিক মানসিক অবস্থাটাকে দুর্বল পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে তত্ত্ব প্রকাশ পায় তার নাম হলো হীনমন্যতা বোধ ইংরেজীতে যাকে বলে Inferiority complex এই হীনমন্যতা বোধের শিকারে পরিণত হয়ে যারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মহান সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা শুধু নিজেদেরকেই অপমানিত ও লাঞ্ছিত করে না, তারা সমগ্র জাতিকে দেউলিয়া করে দেশের স্বাধীনতাকে করে বিপন্ন। আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের জন্মলাভের জন্য ওরা নিজেরাও যথার্থভাবে দায়ী নয় আমাদের দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে দায়ী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং দেশপ্রেম গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবি, সমাজ নেতা ও রাজনীতিবিদরা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের দেশের দুর্নীতিপরায়ণ, স্বার্থান্বেষী কর্ণধাররা তাদের নিজেদের আখের গোছানোর কাজে এবং বিদেশী প্রভুদের পদলেহনে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে দেশাত্মবোধের কোন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হননি ।

বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অনেকে আবার মার্কিন সংস্কৃতির অনুকরণের স্বপক্ষে তাদের মনের মধ্যে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তারা বলেন, বিদেশী সংস্কৃতিতে যদি কোন ভালো জিনিস থাকে তবে তাকে গ্রহণ করতে দোষ কি ? এই প্রশ্নের জবাব হচ্ছে এই যে সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই একটি দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবন যাপন পদ্ধতিকে বুঝায় আমাদের সংস্কৃতির যে বিষয়টি আমরা সবচেয়ে ভালো মনে করি আমেরিকানরাতো সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছে না তাহলে ওদের ভালো জিনিসটা আমাদের গ্রহণ করতে হবে কেন ? তাছাড়া আপাততঃ যাকে ভালো মনে হয় সংস্কৃতির অঙ্গনে তার উৎপত্তি ও বিকাশের কারণটা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ মার্কিন মুল্লুকে মা দিবস ও বাবা দিবসের উদ্ভবের কারণ বিশ্লেষণ করা যাক আমেরিকায় সন্তান-সন্ততিরা তাদের ষোল (১৬) বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গৃহ ত্যাগ করে তারপর কালে ভদ্রে কখনো সখনো মা-বাবার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হয় সেই দেখা সাক্ষাতের জন্যে আবার আগে থেকেই দিনক্ষণ নির্ধারণ (appointment) করে নিতে হয় তাছাড়া আমেরিকার ছেলেমেয়েদের মা-বাবারা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাস করে না এই সমস্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদেরকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করার জন্যে বৎসরে একবার মা-বাবার খোঁজ খবর নেওয়া জরুরী হয়ে পড়ে সুতরাং আপাততঃ এটাকে একটা ভালো জিনিস মনে হলেও এর মূলে ভালো কিছুই নেই আমাদের সংস্কৃতিতে প্রতিটি দিনই মা-বাবার দিন প্রতিটি মূহুর্তে আমরা মা-বাবার সেবা করতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি এমন কি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় নিজেদের ঘর সংসার নিয়ে যখন আমরা আলাদাভাবে বসবাস করি তখনও মা-বাবা বেঁচে থাকলে আমরা যখন তখন মা-বাবার কাছে ছুটে যাই মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের কোন অনুমতি নিতে হয় না আমাদেরকে একবার মায়ের বাড়ি আর একবার বাপের বাড়ি দৌড়াতে হয় না আমরা মা-বাবাকে এক সঙ্গে পাই সব সময় সুতরাং ঘটা করে আমেরিকার মতো বৎসরে একবার মা আর একবার বাবার সেবা করাটা বাংলাদেশের সভ্যতা ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে যে কতো অবাস্তব তা সহজেই বোধগম্য ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে আমি দীর্ঘ ৩৪ বছর বাংলাদেশে বসবাস করি এখন আর ৩০ বছর যাবত আমি আমেরিকায় বসবাস করছি আমেরিকায় আসার পর এদেশের সংস্কৃতির তুলনায় আমাদের দেশের সংস্কৃতি যে কতো উন্নত, পরিশীলিত আর আমরা যে কি এক মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী তা আমার চোখে পড়ে দেশ থেকে বের না হলে দেশকে চেনা যায় না এটা শুধু আমার একার অভিমত নয় আমার মতো অনেকেই যারা কিছুদিন মার্কিন মুল্লুকে বসবাস করেছেন তারা সবাই মার্কিনী সংস্কৃতির অন্তঃসারশূন্যতা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন আর তাদের নিজের বাংলাদেশে এই অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন অতি সম্প্রতি হলিউড থেকে প্রকাশিত ”একুশ” পত্রিকায় চাঁদ সুলতানা মাহবুব কামরুন-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ”ঘুরে এলাম কিছু সময় বা ঝটিকা সফর”-এ সেই দুঃখ এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে, ”একটা ব্যাপার খুব চোখে লাগলো, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফ্রীডমে বিদেশকেও হার মানিয়েছে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মোহনা ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে” অন্যত্র ”নব্য সভ্যতার যুগে পুরাতন কালচার সব হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে ছেলেমেয়েরা সুরে বেসুরে ওদের ইচ্ছামতো গান গাচ্ছিলো আমি তখন একমনে খুঁজছিলাম আমার হারিয়ে যাওয়া পুরানো অতীতকে” বড়ই দুঃখের বিষয় সেই অতীত দ্রুত বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে কারণেই বোধ হয় প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অত প্রাণান্তকর প্রয়াস অথচ আমাদের প্রিয় দেশবাসী তরুণ-তরুণীরা নির্বিচারে বিদেশী অপসংস্কৃতিতে অবগাহন করে পরম পুলক অনুভব করছে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে ? কবে কিভাবে আমাদের বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই হীনমন্যতা বোধের অবসান ঘটবে ? কবে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কুঁড়ে ঘরে থেকেও শিল্পের বড়াই করতে শিখবে, কবে ওরা বুক ফুলিয়ে বলবে, ”নিক হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা” ? সে কথাই আজ ভাবছি।

একুশ পত্রিকা,

লস এঞ্জেলেস, জুলাই ৪ ২০০৭ ইস্যুঃ উপ-সম্পাদকীয়ঃ

টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই : বিটিভি সরকারের নেতা মন্ত্রীদের দেখায়। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো তাদের মালিক এবং বউ বাচ্চাদের দেখায়।


টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই
মহিউদ্দিন আহমদ

বাংলা টিভি

বাংলা টিভি

জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলৰে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী ও পরিচালনায় ‘নন্দিত নরকে’ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিটি দেখতে আজ শনিবার সকাল থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’ মোতাবেক ছবিটি শুরু হওয়ার কথা ছিল দুপুর ১টা ০৫ মিনিটের দিকে। তখন থেকেই শুরম্ন হয় বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্য। একটানা চলল এই নির্যাতন ৩০ মিনিটের মতো। ছবিটি ‘নন্দিত নরকে’ নয়, ‘আমার আছে জল’_ শুরু হলো ১টা ৩৫-এর দিকে। তাও ভাবলাম, ঠিক আছে, হুমায়ূন আহমেদেরই ছবি তো, কিন্তু চলল ১টা ৫০ পর্যন্ত। তারপর আবার পুরো ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন নির্যাতন। ২টায় শুরু হলো দুপুরের খবর। চলল ২টা ৩০ পর্যন্ত। তারপর শুরু হলো বিটিভির খবরের পুনর্প্রচার। কয়েক মাস ধরেই বিটিভির খবরের নামে এই অত্যাচার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর উপর। দেশে বিটিভিরই একমাত্র ‘টেরিস্ট্রিয়াল’, সম্প্রচার। শুরু থেকে একুশে টিভিরও এই সুবিধা ছিল। কিন্তু জামায়াত-জাতীয়তাবাদী জোট ২০০১-এর অক্টোবরে ক্ষমতায় এসে কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো একুশে টেলিভিশনটাকেই বন্ধ করে দিল। বিএনপি-জামায়াতের পতনের পর কয়েক বছর আগে ‘একুশে’ টিভি যখন আবার পুনপ্রচার শুরু করল, তখন তার ‘টেরিস্ট্রিয়াল’ সুবিধাটুকু ‘একুশে’কে আর দেয়া হলো না। সুতরাং বিটিভিরই ‘টেরিস্ট্রিয়াল’ সম্প্রচারের একচেটিয়া অধিকার, মানে মনোপলি। তারপর কয়েক বছর ধরে বিটিভির ‘বিটিভি ওয়ার্ল্ড’ নামের আর একটি চ্যানেলে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে আসছে। তারপরও বিটিভির খবর প্রাইভেট চ্যানেলগুলোতে প্রচার করতে হবে কেন, তার কোন ব্যাখ্যা নেই। গ্রামেগঞ্জে যেখানেই বিদু্যত সংযোগ আছে, সেখানেই বিটিভির অনুষ্ঠানমালা দেখা যায়। তাহলে আরও বারো চৌদ্দটি প্রাইভেট চ্যানেলে বিটিভির এই খবর আবার দেখাতে হবে কেন? মানুষজনকে এই ‘খাদ্যটি’ খেতে বাধ্য করা হচ্ছে কেন?

প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনগুলোর সঙ্গে যখন বিটিভির এই ‘নিউজ বুলেটিন’ও প্রচার করতে হয়, তখন দর্শকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাটা আরও বাড়ে। যেমন দেখলাম আজ শনিবার। বিটিভির আরোপিত দুপুরের খবর চলল এই প্রাইভেট চ্যানেলটিতে অপরাহ্ন ৩টা পর্যনত্ম। তারপর আবার এই প্রাইভেট চ্যানেলটির নিয়মিত প্রতিদিনের ‘শীর্ষ খবর’। পাঁচ মিনিটের শীর্ষ খবর শেষে হুমায়ূন আহমেদের ছবিটি আবার শুরম্ন হলো ৩টা ০৫ মিনিটে। মানে, পুরো একঘণ্টা পনেরো মিনিট পর। তারপর প্রায় প্রতি ১০ মিনিট পর পর ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা। ছবিটি শেষ হলো বিকাল ৫টায়। মানে পৌনে দু’ঘণ্টা, দু’ঘণ্টার ছবি দেখতে লাগল পুরো চারটি ঘণ্টা! নাগরিক জীবনের এতসব যন্ত্রণা, বিদু্যতের যন্ত্রণা, পানি গ্যাসে যন্ত্রণা, যানজটের যন্ত্রণা; এখন টিভি চ্যানেলগুলোর যন্ত্রণা। ঈদের দিন এবং তার আগে পরের কয়েকদিন এই যন্ত্রণার কোন সীমা পরিসীমা থাকবে না।

॥ দুই ॥
গত রোজার ঈদের অনুষ্ঠানমালায় টিভি চ্যানেলগুলো দর্শকদের ওপর কেমন বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা চালিয়েছিল তার একটি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান। গত ৮ নবেম্বর সোমবার দৈনিক ‘সমকাল’-এ “কৌন্ বনেগা ক্রোড়পতি” শিরোনামের লেখাটির কয়েকটি লাইন এমন : “গত ঈদে আমি একটি নাটক দেখতে বসেছিলাম। নাটক দেখছিলাম, সে সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট পর পর বিজ্ঞাপনও দেখছিলাম। এক পর্যায়ে দেখা গেল, নাটকের যে মূল চরিত্র বা নায়ক একটা ভয়ঙ্কর অবস্থায় পতিত হয়ে সেখান থেকে নিজেকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নাটকটির এই পর্যায়ে এমন টানটান উত্তেজনা যখন অনুভব করছিলাম তখনই পর্দায় একটি লেখা ভেসে উঠল, বিজ্ঞাপন ও রাতের সংবাদের পর নাটকের বাকি অংশ দেখতে পাবেন। এর মানে আরও ৫০ মিনিট পর নাটকের বাকি ১০ মিনিট। আর দেখার ধৈর্য হলো না।” মুসত্মাফিজুর রহমান সাহেব গত ঈদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন উপরে উদ্ধৃত কয়েকটি লাইনে। আর আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা কোরবানির ঈদের ৪ দিন আগের। টিভি চ্যানেলগুলোতে ঈদের দিনগুলোতে বিজ্ঞাপন যন্ত্রণার ওপর ঈদের কয়েকদিন পর তখন এই দৈনিক জনকণ্ঠেও একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

দেখা যাচ্ছে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ঈদ এবং বিশেষ দিনগুলোতে তাদের অত্যাচারের মাত্রাটা বাড়িয়ে দেয়। অত্যাচার নির্যাতন বাড়িয়ে দেয় জনপ্রিয় অন্যসব অনুষ্ঠানেও। যেমন আজ দেখলাম হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে বলে’ ‘ফিচার’ ছবিটির প্রচারের সময়।

বিজ্ঞাপন ছাড়া টিভি চ্যানেলগুলো চালানো যাবে না, এই কথাটি দেশের প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ, মানে পাগল ও শিশু ছাড়া আর সকলেই জানে। বিজ্ঞাপনের টাকা ছাড়া টিভি চ্যানেলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতা, প্রাইভেট প্রোডাকশন কোম্পানিগুলো থেকে নাটক সিরিয়াল, গান বাজনার অনুষ্ঠান ক্রয়, কিছুই সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি ঘণ্টায় কত মিনিট বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ থাকবে? বিজ্ঞাপনের এমন আধিক্যের কারণে একটি নীতিমালা এখন জরম্নরী হয়ে পড়েছে। নাটক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন? নাকি বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে, তা দর্শকদের জানা দরকার। এই তথ্যটি দর্শকদের জানার অধিকার রয়েছে।

আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো মানুষজনের বিভিন্ন অধিকারের প্রশ্নে যথার্থভাবেই সরব এবং সক্রিয়। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলোই যখন মানুষজনের অর্থাৎ দর্শকদের অধিকারে হামলা করছে, সেখানে এই ৰতিগ্রসত্ম মানুষগুলোর প্রতিকার কোথায় পাওয়া যাবে?
এই প্রতিকারটি আমাদের সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়টি দিতে পারে। প্রতি ঘণ্টার অনুষ্ঠানে কত মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে তথ্য মন্ত্রণালয় তা ঠিক করে দিতে পারে। অথবা প্রতিটি চ্যানেল এককভাবে তার নিজের অনুসরণের জন্য, অথবা সব প্রাইভেট টিভি চ্যানেল, সকল চ্যানেলের জন্য প্রযোজ্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। কোন চ্যানেল এই নীতিমালা লঙ্ঘন করলে, লঙ্ঘনকারী সেই চ্যানেলের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও থাকতে হবে এই নীতিমালায়। দুনিয়ার সকল উন্নত দেশেই অনুষ্ঠান প্রচারের সময় এবং তার ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় নির্ধারণ করা আছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশেও তার প্রচলন শুরম্ন হয়েছে।

তথ্য অধিকার আদায়ে এবং রৰায় আমাদের গণমাধ্যমগুলোর সাথে যে কোন গণতন্ত্রমনা মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করবে। কিন্তু কত ঘণ্টার টিভি প্রোগ্রামে কত সময় বিজ্ঞাপনের জন্য নির্ধারিত থাকবে, এই তথ্যটা জানাও শ্রোতা-দর্শকদের অধিকার।

॥ তিন ॥
দর্শকদের পছন্দ অপছন্দের তোয়াক্কা করছে না আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো। তাইতো চ্যানেল মালিকরা দর্শকদের অনুভূতিগুলোর প্রতি এমন অবজ্ঞা দেখাতে পারে। টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকরা তাদের এই চ্যানেলগুলোতে বিশাল পরিমাণের পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। সুতরাং তারা লাভ করবেন তা প্রত্যাশিত। কিন্তু বিজ্ঞাপনের এত আধিক্যের কারণে আবার কী, তারা লুণ্ঠনের মানসিকতাতেই বেশি তাড়িত হচ্ছেন। নিউজ বুলেটিনগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতার ব্র্যান্ড প্রচারিত হচ্ছে এখন। মাত্র আধঘণ্টার একটি বুলেটিনে এখন আরও আটটি বিজ্ঞাপনও দেখা যাচ্ছে। পুরনো চ্যানেল একটির এক মালিক নাকি খবর পাঠকদের সু্যট, পাঞ্জাবিতে এবং খবর পাঠিকাদের বাড়িতেও বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানির ‘লোগো’ লাগাতে চাইছেন। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের আমরা এখন যেমন দেখি।

একদিকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের বাজারটি বড় নয়। এই বাজারটিতে ভাগ আছে প্রিন্ট মিডিয়া, রেডিও এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার। পত্রপত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে। এখন এক ঢাকা শহর থেকেই ২০১টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এই তথ্যটি পাওয়া যাবে আমাদের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের ২০০৮-এর বার্ষিক সাময়িকী প্রতিবেদনে। পত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে এফএম রেডিও এবং টিভি চ্যানেলের সংখ্যাও। একজন সাধারণ দর্শকও তাহলে একটি অতি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারে, বিজ্ঞাপনের বাজার এত সীমিত জেনেও প্রাইভেট সেক্টরের কিছু লোক পত্রপত্রিকা প্রকাশে এবং টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স যোগাড়ে এত আগ্রহী, এত মরিয়া কেন?

এই দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে, গণমাধ্যমের মালিক হওয়ার পর অন্যান্য ৰেত্রেও ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটছে। কেউ কেউ অবশ্য পয়সাওয়ালা হওয়ার আগেই পত্রিকার মালিক ছিলেন। কিন্তু দুটো পুরনো প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিকদের একজন ওষুধ কোম্পানি খুলে রমরমা ব্যবসা করছে। আর অন্য চ্যানেলটির অন্য এক মালিক তার স্ত্রীর গানের অডিও ক্যাসেট, সিডি এবং ডিভিডির দোকানও খুলে বসেছেন। আত্মীয়-স্বজনকে তুলে ধরার নির্লজ্জ অপচেষ্টা, অপতৎপরতাও চলছে কতগুলো চ্যানেলে। তাহলে বিটিভির দোষ কি? বিটিভি সরকারের নেতা মন্ত্রীদের দেখায়। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো তাদের মালিক এবং বউ বাচ্চাদের দেখায়।

॥ চার ॥
মূলত বিজ্ঞাপনের নির্যাতনের কারণে, ঠিক কখন কত বছর আগে টিভিতে একটি নাটক দেখেছি, তা মনে করতে পারছি না। হুমায়ূন আহমেদের ছবি বলে অনেক বছর পর আজকের ছবিটি দেখতে আগ্রহী হয়েছিলাম। এই ছবিটিতে আবার পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘চ্যালেঞ্জারও’ ছিলেন। পীযূষের সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা আছে, ‘চ্যালেঞ্জারকে’ আমি কোনদিন সামনাসামনি দেখিনি। কিন্তু তার অভিনয় আমার ভাল লাগত। অল্প বয়সেই মানুষটি কিছুদিন আগে মারা গেলেন। ভাবলাম ছবিটি দেখলে তাঁর প্রতি একটু শ্রদ্ধাও জানানো হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা সুখের হলো না।

বিটিভিকে অনেক কারণেই তুলোধুনো করা যায়। কিন্তু এই বিটিভিতে সেই ৮০ এবং ৯০ এর দশকে যে সিরিয়ালগুলো প্রচারিত হয়েছে সেগুলো নিয়ে এখনও মানুষজন আলোচনা করে। মমতাজ হোসেনের লেখা এবং খ. ম. হারম্ননের প্রযোজনায় বিটিভিতে মধ্য ৮০’র দশকে প্রচারিত ‘শুকতারা’ নাটকের সিরিয়ালটির কথা একেবারেই ভুলতে পারি না। একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন প্রয়াত আলী আহসান সিডনী। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রম্নমীর কথাও ছিল এই নাকটটিতে। ছিল জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটির কথা। শুকতারা নাটকটির এই পর্বটি যখন প্রচারিত হয়, জাহানারা আপা তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তাঁর ছোট ছেলে জামীর কাছে। তাই তিনি তখন শুকতারার এই পর্বটি দেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু আমি সব পর্ব তখন ভিসিআরে ভিডিও করে বিদেশে আমাদের সব দূতাবাসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রশাসন অনুবিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল আমি তখন। পরে জাহানারা আপা দেশে ফিরে শেরে বাংলা নগরের মিনিস্টার্স হোস্টেলে আমার সরকারী বাসায় শহীদ রম্নমী এবং জাহানারা আপার উপর প্রচারিত ‘শুকতারা’র এই পর্বটি দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলাম এক সন্ধ্যায়। দেখতে দেখতে কেঁদেছিলেন তিনি তখন। শুকতারার মতো আর একটি সিরিয়ালও কি তারপর হয়েছে? এখন তো ‘টেকনোলজি’র ৰেত্রে আমরা অনেক বেশি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং টিভি চ্যানেলগুলো সংখ্যায় এখন প্রায় বিশ পঁচিশ।

সেইসব দিনে ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’ এবং ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো ধারাবাহিক নাটক হয়েছে, এই সিরিয়ালগুলোর জন্য তখন মানুষজন অপেৰা করত সেই বিশেষ দিনটির জন্য।
১৯৮৫’র অক্টোবর ১৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অডিটরিয়ামে কয়েক শ’ ছাত্র জড়ো হয়েছিল ‘শুকতারা’ দেখতে। বর্ষা বাদল ছিল তখন। রাতে যখন ‘শুকতারা’ নাটকটি দেখছে ছাত্ররা তখনই ধসে পড়ল অডিটরিয়ামটির ছাদ। আর এই দুর্ঘটনায় মারা গেল ৩৬ জন ছাত্র।
মমতাজ হোসেন এখনও লেখালেখি করে যাচ্ছেন। খ.ম. হারম্ননও এখন ‘বৈশাখী’ টেলিভিশনটির দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি। কিন্তু তারপরও ‘শুকতারা’ নেই, নেই ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এই সব দিনরাত্রি’ বা ‘কোথাও কেউ নেই’। তাহলে আমাদের অগ্রগতিটা কি হলো?

অগ্রগতি হয়ত আছে, কিন্তু আমি জানি না। জানি না_কারণ আমি দু’তিনটি চ্যানেলে খবর দেখার চেষ্টা করি। চ্যানেল আই-এর খবর দেখি কোন কোনদিন, যেদিন সাঈদুর রহমান খবর উপস্থাপন করে। সাঈদুর রহমান খবরের পাঠক হিসাবে আমার প্রিয়। তার উপর চৌদ্দ পনেরো বছর আগে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ আমার একটি কলামও প্রকাশিত হয়েছিল,_ “প্রজন্ম ৭১ এর সাঈদুর রহমান বনাম বেঙ্মিকোর সালমান রহমান।” একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাঈদুর রহমান তার বাবা-মা এবং তিন ভাইবোনকে শহীদ হতে দেখেছে। তারা তখন নীলফামারীর সৈয়দপুরে।

॥ পাঁচ ॥
আমাদের কোন কোন বিজ্ঞাপন নির্মাতা তাদের বিজ্ঞাপনে রম্নচিহীনতা দেখিয়ে যাবে। ‘ওয়াশিং লিকুইড’-এর কার্যকারিতা দেখাতে সেই বিজ্ঞাপনে ‘কমোড’ দেখাতে হবে? ‘কমোড’ কোন দেখানোর জিনিস হতে পারে? তারপর একটি প্রাইভেট ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে দেখি বৃষ্টিতে ভিজছে একটি শিশু ছাত্র। সে তারই একই স্কুলের হয়ত। তারই একই ক্লাসের ছাত্রীর গাড়িতে একটি ‘লিফ্ট্’ চাইছে। কিন্তু গাড়িতে উপবিষ্ট ছাত্রীটি বৃষ্টিতে ভেজা ছাত্রটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, শিশু ছাত্রটিকে গাড়িতে উঠতে দিচ্ছে না। একটি শিশু আর একটি শিশুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, এই দৃশ্যটি দেখে আর সব ছোট শিশু কি শিৰা পাচ্ছে? মনে হয় শিশুরা যে বেশি সংবেদনশীল, এই কথাটি এই বিজ্ঞাপন নির্মাতার জানা নেই।

অথচ এমন সব নিম্নমানের বিজ্ঞাপন চিত্রের বিপরীতে কিছু বিজ্ঞাপনে যে ক্রিয়েটিভিটি দেখি, তা আমাদের দেশের কিছু তরম্নণ সম্পর্কে আমাকে খুবই আশাবাদী করে তোলে। এর মধ্যে একটি, আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়। তবে এখন আর দেখি না। কয়েক বছর আগে ক্রিকেট সিজনে প্রায়ই দেখতাম বিভিন্ন চ্যানেলে। এই বিজ্ঞাপন চিত্রে দেখা যায় গ্রামের উদোম গায়ের কতগুলো ক্রিকেটপাগল শিশু ক্রিকেটের ব্যাট বানানোর তীব্র আগ্রহে তাল গাছে উঠেছে, তালগাছ থেকে তালপাতার ডাল কাটছে, মাটিতে সেই ডাল নামিয়ে সেই ডাল থেকে ব্যাট বানাচ্ছে বাঁ হাতে দা দিয়ে কুপিয়ে। তারপর তারা গ্রামের একটি খোলা মাঠে ক্রিকেট খেলছে। এই শিশুগুলো আমাকে দারম্নণভাবে অনুপ্রাণিত করত, যখন এই বিজ্ঞাপনটি আমি দেখতাম।

কয়েক বছর আগের আর একটি বিজ্ঞাপন চিত্র, ‘চ্যালেঞ্জার’ ছিলেন এটিতে। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, কতগুলো শিশু কিশোর ফুল চুরি করছে একটি বাড়ির বাগান থেকে। ‘চ্যালেঞ্জার’ তখন তাদের তাড়াচ্ছেন। কিন্তু সেই শিশু কিশোরগুলোই যখন একুশে ফেব্রম্নয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার জন্য ফুল চুরি করছে, ‘চ্যালেঞ্জার’ একটু দূর থেকে কিন্তু কিশোরদের এই চুরি কাজটি দেখে একটু একটু হাসছেন। তাঁর এই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি এই বাচ্চাগুলোকে দোয়া করছেন।

॥ ছয় ॥
আমি যখন বিদেশে যাই, আমি সেই দেশের টিভির খবর এবং বিজ্ঞাপন দেখার চেষ্টা করি। টিভির খবর যদি দেশের প্রেসিডেন্ট প্রাইম মিনিস্টারকে দিয়ে শুরম্ন হয়, তাহলে বুঝতে হবে, সেই দেশটি আমাদের জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদ জামানায় আছে। বিরোধী দলের খবর যত কম থাকবে, বুঝতে হবে সেই দেশের সরকারটি বিরোধী দলগুলোর প্রতি অসহনশীল। তারপর বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন। বিদেশী টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ‘মালয়েশিয়া ট্রুলি এশিয়া’বিজ্ঞাপনটিতে মালয়েশিয়ায় ‘টুরিস্ট’ আকর্ষণ করার চেষ্টা আছে। মানে সেই দেশে পর্যটকদের আকর্ষণ করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে।

বিজ্ঞাপনে টুথপেস্ট দেখানো হচ্ছে, নাকি মোটর গাড়ি?
কম্পিউটার, আইফোর্ড, এমপি থ্রি-ফোর এবং এ জাতীয় উন্নত বিশ্বের সর্বসাম্প্রতিক ‘প্রডাক্ট’গুলোর বিজ্ঞাপন লুঙ্গি, শাড়ি, পায়জামা, কোর্তা, গামছার? আমিরাত এয়ারলাইন্স এবং কাতার এয়ারলাইন্স-এর বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হবে এই আরব দেশগুলোর মানুষজন বিমানযাত্রী এবং কার্ব পরিবহনের জটিল ব্যবস্থায়ও অনেক সাফল্য, অনেক অগ্রগতি মাত্র কয়েক বছরেই অর্জন করে ফেলেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এবং থাই এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে বিশ্বাস জাগে তাদের ফ্লাইটগুলো ঠিক সময় আকাশে এবং ঠিক সময়ই গনত্মব্যেও পেঁৗছে। এই বিমান কোম্পানিগুলো ইউরোপ আমেরিকার বিমান সংস্থাগুলোর গায়ে তীব্র প্রতিযোগিতা করে বিশাল পরিমাণের মুনাফাও অর্জন করে চলেছে। এই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে সেই দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি ধারণাও পাওয়া যায়।

‘জি বাংলায়’ সৌরভ গাঙ্গুলীর উপস্থাপনায় ‘দাদাগিরি’ অনুষ্ঠানটি এ দেশের দর্শকদের কাছেও এত জনপ্রিয় কেন তা কি আমাদের চ্যানেলওয়ালারা একটু ভেবে দেখেছেন? এই অনুষ্ঠানটিতেও বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় ফাঁকে ফাঁকে। কিন্তু একটানা পাঁচ মিনিটেরও বিজ্ঞাপন কি প্রচারিত হয় এই অনুষ্ঠানটিতে এবং এই চ্যানেলটিতে? বিজ্ঞাপন যত ক্রিয়েটিভই হোক না কেন, টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা, নির্যাতন থেকে ‘ফ্রীডম’, মুক্তি চাই।

উত্তরা, ঢাকা; শনিবার ১৩ নবেম্বর ২০১০