তথ্য আছে, আ.লীগ আবার আসবে: জয়


তথ্য আছে, আ.লীগ আবার আসবে: জয়.

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের ব্যাপারে ‘আত্মবিশ্বাসী’ প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়।

মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগ আয়োজিত ইফতার পূর্ব আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আগামীবার আবার ক্ষমতায় আসবে। বিএনপির মিথ্যা প্রচার মোকাবেলা করতেই হবে।”

আগামী ছয় মাস তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরারও আহ্বান জানান জয়।

গত ১৬ জুলাই স্ত্রী ক্রিস্টিন ওভারমায়ার ও মেয়ে সোফিকে নিয়ে সজীব ওয়াজেদ দেশে আসেন। দেশের ফেরার পর সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির দেয়া ইফতার আয়োজনে অংশ নেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে দাবি করে তিনি বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেশ পেছন দিকে হাঁটবে। বাংলার মানুষ কখনোই বিএনপি-জামায়াতের সেসব দিনের কথা ভুলবে না।

২১ অগাস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে জয় বলেন, “একুশে আগস্টের কথা আমরা ভুলিনি। আমার মা কে লক্ষ্য করে বোমা হামলা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ২৩ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল, আহত হয়েছিলেন ৪০০ জন। আর এই হামলার মূল পরিকল্পনা করা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে নিজে আমার মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।”

“আমার মা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও আইভী রহমান বাঁচতে পারেননি। তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। আমরা কিছুই ভুলিনি, ভুলব না। ২১ শে আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই।”

বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “কোথায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে? বিগত বিএনপির সাথে বর্তমান সরকারের তুলনা করে দেখুন। টিআইবি এতো অভিযোগ করে কিন্তু বিএনপির সময়ে টিআইবির জরিপে দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ, এখন বাংলাদেশের অবস্থা ৪০ এর উপরে।”

বর্তমান সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হয় না দাবি করে জয় বলেন, “হলমার্ক-ডেসটিনি নিয়ে এত কথা হয়, কিন্তু হাওয়া ভবনের কথা কি জাতি ভুলে গেছে? খাম্বার কথা ভুলে গেছে? বিএনপি সরকার ৫ বছর শুধু খাম্বা কিনেছে, বিদ্যুৎ দিতে পারেনি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও বিএনপি-জামায়াত সরকার ছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ।”

দেড় কোটি মানুষ গত সাড়ে ৪ বছরে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মীজানুর রহমান, যুবলীগ নেতা হারুনুর রশীদ, ফজলুল হক প্রমুখ।

Advertisements

বিএনপি – ক্যালিফোর্ণিয়া শাখা, যুক্তরাষ্ট্রের ইফতার মাহফিল


বিএনপি – ক্যালিফোর্ণিয়া শাখা, যুক্তরাষ্ট্রের ইফতার মাহফিল
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বি,এন,পি, ক্যালিফোর্নিয়া শাখা, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বি,এন,পি, ক্যালিফোর্নিয়া শাখা, যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – ক্যালিফোর্ণিয়া শাখা, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ২১ জুলাই এক আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

লিটল বাংলাদেশ-এর লস এঞ্জেলেসের শ্যাটো রিক্রিয়েশনাল সেন্টারে ক্যালিফোর্ণিয়া বিএনপির সভাপতি আব্দুল বাসিতের ও সাধারন সম্পাদক নিয়াজ মোহাইমেনের পরিচালনায় ইফতার মাহফিলে কোরআন তেলওয়াত করেন মোঃ কালাম। স্থানীয় কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের সাথে বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীরা তাদের পরিবার-পরিজনসহ এই ইফতার মাহফিল যোগ দেন।

বিএনপির সভাপতি আব্দুল বাসিত একুশ নিউজ মিডিয়াকে বলেন, গাজীপুরসহ পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির প্রার্থীর বিজয়ের মাধ্যমে জনগণ বার্তা দিয়েছে যে তারা পরিবর্তন চায়। শুধু পাঁচ সিটিতে নয় সারা দেশেই এখন একই অবস্থা। নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নিজ নিজ স্থানে উন্নয়নের পাশাপাশি সৎ ও নিষ্ঠার সাথে জনগণের দেয়া অর্পিত দ্বায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে শহীদ জিয়ার নীতি ও আদর্শকে সমাজে স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের সময় এই বিশাল গণরায়কে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে কাজে লাগানোর জন্য নতুন মেয়র ও কাউন্সিলদের উপর যে গুরুদ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা সর্তকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করার আহ্বান জানান আব্দুল বাসিত।
ছবি লিংক ঃ http://goo.gl/lmlYDQ

লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত


লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত

লস এঞ্জেলেসঃ ১০ জানুয়ারী, ২০১৩
লস এঞ্জেলেসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্যালিফোর্ণিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দ্যোগে বাংলাদেশের স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করা হয়েছে।
লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত

লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত


লস এঞ্জেলেসের সান ফেরন্যান্ডো ভ্যালীতে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্যালিফোর্ণিয়ার সভাপতি শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা স্মরণ করে শফিকুর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে পড়েছে সেই শূন্যতাকে তার সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা সুদৃড়ভাবে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন ও তার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য প্রবাসীদের এগিয়ে আসতে হবে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন- ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে জাতি বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে। বক্তারা সেই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা সমগ্র বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের সংগ্রামের নিদর্শন স্বরূপ। বঙ্গবন্ধু হত্যা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি বলেও বক্তারা উল্লেখ করেন।

লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত

লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্যালিফোর্ণিয়ার সাধারন সম্পাদক ডাঃ রবি আলমের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ দেলোয়ার হোসেন, কোষাধ্যক্ষ মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ক্যালিফোর্ণিয়া ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শওকত আহমেদ চৌধুরী। স্থানীয় কমিউনিটির পক্ষে থেকে স্মৃতিচারণ করেন মোবারক হোসেন বাবলু, এম কে জামান, খন্দকার ইমতিয়াজ আহমেদ ইমু, কাজী নাজির আহমেদ হাসিব প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ যাঁরা ১৫ ই আগস্ট শাহাদাৎ বরণ করেছেন তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে ও বাংলাদেশের অব্যাহত শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এই উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর বর্ন্যাঢ্য জীবন নিয়ে চিত্র প্রর্দশনীর আয়োজন করা হয়।

লস এঞ্জেলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত:ভিডিও:

The Liberator Bangabandhu Sheikh Mujib returns home: Video
http://www.facebook.com/v/10151325194521897
Pic: http://www.facebook.com/media/set/?set=a.10151325115691897.499885.826936896&type=1&l=a9c80f4b51

স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে


[প্রবাস প্রতিবেদন] তারেক রহমানের বিলেতের দিনকাল

  

ইসহাক কাজল লন্ডন থেকে

তারেক রহমান তথা তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনে বসবাস করছেন। তাকে নিয়ে বিলেতে বাঙালি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাধারণ জনসমাজে কৌতূহলের শেষ নেই। বিশেষ করে লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি তো বটেই, বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় তাকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্য আরও বেড়েছে। প্রায় ৫ বছর আগে বিলেতে এসে এখন পর্যন্ত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার যে খরচ তার যোগান কোথা থেকে আসছে তাও এক রহস্য কমিউনিটির কাছে। বিশেষ করে তার রাজকীয় চলাফেরার খবর অনেকের কাছেই রয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন যেখানে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি করে দিন যাপন করেছেন, উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবী প্রচণ্ড অর্থকষ্টে জীবন কাটিয়েছেন বিদেশের মাটিতে, সেখানে তারেক রহমান বিনা আয়ে এমন রাজকীয়ভাবে লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে চলেন কীভাবে?
বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথমে লন্ডনে আসেন ২০০৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে বাসা থেকে বের না হলেও মাঝে মাঝে তাকে বিভিন্ন শপিং মলসহ বিনোদন কেন্দ্রে দেখেছেন অনেকে। এছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনে ওয়েলিংটন হসপিটালে কিংবা তার প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও অনেকের নজরে এসেছেন এই রহস্যময় রাজনীতিক নেতা। ক্ষমতা হারানোর পর নির্যাতনে তারেকের মেরুদণ্ডের ৬ ও ৯ নম্বর হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে এ অবস্থা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া কঠিন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ের বিয়েতে তারেক রহমান জনপ্রকাশ্যে এলে তাকে ছড়ি হাতে দেখে ডাক্তারদের সেই কথাই মনে হয়েছে অনেকের।

লন্ডনে শুরুর সময়
২০০৮ সালে লন্ডনে আসার পর পর তারেক রহমান ছিলেন তৎকালীন যুক্তরাজ্য বিএনপির একচ্ছত্র নেতা কমর উদ্দিনের ছত্রছায়ায়। সেই সময় তারেক রহমান কমর উদ্দিনের এনফিল্ড টাউন ও সাউথ গেইট এই দুই এলাকার মাঝামাঝি এলাকায় এক বাসায় থাকতেন। কমর উদ্দিন লন্ডনে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন। কমর উদ্দিনের প্রায় বারোটির মতো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে লন্ডন ও বিভিন্ন শহরে। তারেক রহমান যে বাসায় ওঠেন কমর উদ্দিন সেই বাড়ি ক্রয় করেন ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিলাসবহুল এই বাড়ির মাসিক মর্টগেজ দিতে হতো ৩৩৫ পাউন্ড যা ক্রেডিট ক্রাঞ্চে কমে গিয়ে ২২০ পাউন্ডে নেমে আসে। তারেক রহমানকে এই মর্টগেজের টাকাও দিতে হয় না। উপরন্ত লন্ডনে তারেকের বাড়ির খরচও চালাতেন কমর উদ্দিন। লন্ডনে আসার পর কমর উদ্দিনের নিজের ব্যবহারকৃত জাগুয়ার গাড়িটি তারেককে দিয়ে দেন। মাসিক ৮০০ পাউন্ড বেতনে ড্রাইভার শরীফুল ইসলাম চাকরি পান। পরে তারেক নিজেও দুইটি গাড়ি কিনেন, ক্যাব্রিজ হিথ রোডের রূড থেকে। একটি হলো বিএম ডাব্লিউ সেভেন সিরিজ আরেকটি হচ্ছে অডি। এসময় তারেক রহমান প্রধানত বাসাতেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মেয়ে জাইমাকে স্কুল থেকে আনতে ড্রাইভারের সঙ্গে বের হতেন।
পাশাপাশি মাঝে মাঝে তার পরিবার নিয়ে বাসার গ্রোসারি কেনাকাটা করতেন পন্ডার্স এন্ডের টেসকো থেকে। কমর উদ্দিনের রেস্টুরেন্টের কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারীও তার কেনাকাটায় সাহায্য করতেন। প্রায় দিনই রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার প্রেরণ করা হতো। এছাড়াও প্রতিমাসে লেক সাইডের ব্লু ওয়াটার এবং সেন্ট্রাল লন্ডনের সেলফ্রিজেসে শপিং করতেন বলে জানা গেছে। যেতেন সেলফ্রিজেস এর হোম এক্সেসরিজেও। সেলফ্রিজ ও ব্লু ওয়াটার হচ্ছে ইউকের সবচাইতে বিলাসবহুল এবং ব্যয়বহুল শপিং মল। মিলিয়নিয়াররাই মূলত সেখানে কেনাকাটা করে থাকেন। তারেক প্রায়ই পুরো পরিবার নিয়ে উডগ্রীন সিনে ওয়ার্ল্ডে সিনেমা দেখতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আপ্টন পার্কের বলিনেও সিনেমা দেখতে আসতেন বলে জানা গেছে।

বর্তমান জীবন
কমর উদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমানে তারেক রহমান থাকেন সারের কিংসটনে। এ এলাকার লোকাল অথরিটির তথ্য অনুযায়ী ৩-৪ বেডরুমের এক বাসার মাসিক ভাড়া ১২শ’ থেকে শুরু করে ৫ হাজার পাউন্ড। সি ব্যান্ডের বাসার জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স ১৪৭৪ পাউন্ড ৬৭ পেন্স। বিদ্যুৎ গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল ন্যূনতম ১৫০ পাউন্ড। তার পরিবারের ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ন্যূনতম ১শ’ পাউন্ড। এছাড়া লন্ড্রি, পোশাক-আশাক, পত্রপত্রিকা এবং মোবাইল ও টেলিফোনসহ আরও প্রায় ৭-৮শ’ পাউন্ড খরচ হয়ই। সব মিলিয়ে ৪ হাজার পাউন্ডের নিচে তার মতো লাইফ স্টাইল চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। বিশেষত এই এলাকায় আরও রাঘব বোয়ালরা থাকেন। এই এলাকাতেই থেকে গেছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। এখনো পাকিস্তানের সাবেক সেনা শাসক পারভেজ মোশাররফ বসবাস করছেন কিংসটনে।
এরই মধ্যে একবার তিনি ২০০৮-এ লন্ডনে এসে বার এট ল ডিগ্রি (ব্যারিস্টার) সম্পাদন করবেন বলে মনস্থির করেন। তবে তিনি সুবিধা করতে পারেনি। তারেক যেহেতু বাংলাদেশের গ্রাজুয়েট তাই লন্ডনে তাকে প্রথমে একটি ব্যাচেলর ডিগ্রি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি এক্সেশন পাননি। সাউথ ব্যাঙ্ক ইউনিভারসিটি ও কুইন মেরী তারেককে সরাসরি রিজেক্ট করে দেয়। পরে তিনি জিডিএল করে শর্ট-কাটে বার এট ল করতে চেয়েও পারেননি।

নেই কোনো আয়ের উৎস
গত প্রায় ৫ বছর ধরে লন্ডন থাকলেও তারেক রহমান কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যেমন কোনো কাজে নিয়োজিত হতেও পারেন না। তাকে বাইরে দেখাও যায় না খুব একটা। স্ত্রী জুবাইদা গুলশান আরাও তেমন কোনো কাজ করেন না। উপরন্তু এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচও রয়েছে। অতি সম্প্রতি ব্রিটেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন তারেক রহমান। এর সুবাদে ব্রিটেনে অবাধে চলাচলের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে কোনো সরকারি অর্থায়ন বা বেনিফিট পাবেন না তারেক। দেশেও তার এবং তার মা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা আছে। তারেকের ইনকামের একমাত্র স্বীকৃত উৎস হিসেবে ধরা যায় তার মা বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সংসদের বেতন। তবে তা দিয়ে লন্ডনে এই বিলাসী জীবনের একাংশও বহন করা সম্ভব কি না সন্দেহ।

মাথার উপর মামলার বোঝা 
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ তারেক রহমানের ওপর ঝুলছে ১৪টি মামলার খড়গ। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করা হলেও ২০০৯ সালে একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। অন্য মামলাগুলোর মধ্যে ৪টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। জীবনে আর রাজনীতি করবেন না এমন মুচলেকা দিয়ে তারেক রহমান চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লন্ডন চলে আসার পর তা বাতিল করে বর্তমান সরকার। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পলাতক বিবেচনায় একাধিক মামলায় তারেক রহমানের জামিন বাতিল করে আদালত। এছাড়াও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে যে ২৫টি মামলা ঝুলছে সেগুলোর মধ্যে ২৩টি মামলাই তত্ত্বাবধায়ক আমলে দায়ের করা।

যুক্তরাজ্য নেতৃবৃন্দ যা বলেন
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির নেতৃবৃন্দের মতামত জানতে চাইলে তারা অনেক কথা বলেছেন।
 
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ বলেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসক ইস্কন্দর মির্জা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এই লন্ডনে এসে আশ্রয় পেয়ে ছিলেন। লন্ডনে জীবনযাপনের ব্যয়ভার বহনের জন্য তাকে একটি হোটেলে ম্যানেজারের চাকরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। দারুণ অর্থকষ্টে একেবারে নিঃস্ব কপর্দকহীন অবস্থায় তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। উগান্ডার ইদি আমিন, ইরানের রেজা শাহ পাহলেবীর কথা তো কারো অজানা নয়। ইদি আমিনকে সৌদি আরবে ঝাড়–দারের চাকরি করে জীবন নির্বাহ করতে হয়েছিল আর রেজা শাহ পাহলেবীর অবস্থাও খুবই করুণ ছিল। তারেক রহমান হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় অর্থসম্পদ
  নিজের করে নেয়া অনৈতিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পেয়ে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিকল্প ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি করে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়। সেই অর্থ দিয়েই তারেক রহমান লন্ডনে বিলাসী জীবনযাপন করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। অর্থ পাচারের ঘটনাটি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে। রাজনৈতিক পাওয়ার বা শক্তি বিক্রি করেই তারেক রহমান এই অঢেল অবৈধ অর্থ ও বিত্তের মালিক হয়েছেন। এই অপরাধের জন্য তারেক রহমানকে যেমন একদিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণের আদালতেও একদিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই দিন বেশি দূরে নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং যুক্তরাজ্য যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে তারেক রহমানের বিলাসী জীবনযাপন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ বলে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেনাবেচার রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। স্বগর্বে তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি চর্চা কঠিন করে ছাড়বেন। সে ধারা অক্ষুণ
œ রেখে তারেক রহমান একই পথ অনুসরণ করেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ সম্পদ লুটপাট করে সাহসী তারুণ্যের অহঙ্কারকে কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার সূচনা করেন। হাওয়া ভবনকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র করে তারেক-কোকো-মামুন এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। লুটের সেই অর্থেই তাদের বিলাসী জীবনযাপন চলছে।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি। তাই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। লন্ডনে দীর্ঘদিন কী অবস্থায়, কোন ক্যাটাগরির ভিসায় তিনি আছেন তা জনগণের জানার অধিকার পর্যায়ে পড়ে। এখানে অবস্থানের ব্যয়ভার কীভাবে তিনি নির্বাহ করেন সে সত্যও প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যেসব দুর্নীতি মামলা তার ওপর হয়েছে, সৎ সাহস থাকলে বাংলাদেশে গিয়ে সেগুলোর মোকাবেলা করা উচিত। সন্ত্রাসী চক্র আর দুর্নীতিবাজরা মিডিয়া থেকে বরাবরই নিরাপদ দূরত্বে থাকে। তারেক রহমান
  মিডিয়াকে ভয় করেন কেন? লন্ডনের ব্যয়বহুল জীবনযাপনের ব্যয়ভার কোথা থেকে আসছে একজন রাজনীতিক হিসেবে সে সত্য তার প্রকাশ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সাবেক আহ্বায়ক এমএ মালিক বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির একজন সংগঠক ও কর্মী হিসেবে এ সত্য আমার অজানা নয় যে তারেক রহমান নিজের সকল ব্যয়ভার নিজেই বহন করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখতে হবে তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। তার পিতা জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন সামরিক বাহিনীতে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। তাই তাকে কারও দয়া দাক্ষিণ্যের উপর ভরসা করে লন্ডনে বসবাস করতে হবে সে প্রশ্ন অবান্তর।
যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিয়া মনিরুল আলম এ ব্যাপারে কোনো প্রকার রাখঢাক না করে বলেন, তারেক রহমানের অবস্থা এত খারাপ নয় যে তার খাওয়াপরার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না। সিলেটি ভাষায় তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পোয়া। তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন নিজের শক্তি ও সামর্থ্য।ে আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে অনেকেই আছেন যারা আমাদের রেস্টুরেন্টে ভাত খেয়ে, থেকে লালিতপালিত হয়েছেন। অনেকের হাত খরচের অর্থ আমরা যুগিয়েছি। তারা এখন ক্ষমতার উচ্চশিখরে আছেন বলে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগসূত্রও নেই। দেখেও না দেখার ভান করেন। আর তারেক জিয়া আমাদের নেতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগামী দিনের বীর সেনানী তিনি যদি অর্থকষ্টে থাকেন তাহলে সে লজ্জা আমাদেরই। আমরা প্রাণ উজাড় করে শর্তহীনভাবে তাকে সহায়তা করতে সদা প্রস্তুত। তিনি সুস্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে জাতির কাণ্ডারি হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করুন সে প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
বিলুপ্ত ঘোষিত যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য সচিব ব্যারিস্টার এমএ সালাম বলেছেন, কিছু কিছু বিষয়ে রাজনীতি না এনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্যাতনে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় উচ্চতর চিকিৎসাসেবা গ্রহণের জন্য তারেক রহমান লন্ডন এসেছিলেন। এখনো তিনি চিকিৎসাধীন আছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শেই লন্ডনে তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল তারেক রহমানের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে সে ব্যাপারে উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করা হবে। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা গুঁড়ে বালি। বিষয়টি তদন্ত করা তো দূরের কথা বর্তমান সরকার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর একটি মামলা দায়ের করে তার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে।

সূত্রঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7532

কে জানে গণতন্ত্রই এক দিন গুম হয়ে যায় নাকি এ দেশে!


গুম হয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্র?
 

  

আসিফ নজরুল:

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
 

রোববারের পত্রিকা পড়ার পর আরও চিন্তিত হয়ে আছি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, গুম ও নিখোঁজের কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। তাঁর এই সাহসী বক্তব্যের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ; কিন্তু তিনি যা বলেছেন, তা উদ্বেগজনকও। এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় যখন আমরা মিজানুর রহমান খানের লেখায় পাই গুমের একটি ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবে থাকা একজন সেনাসদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ।

বাংলাদেশে বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‌্যাব জড়িত ছিল। এ ধরনের ঘটনা বানানো হলেও র‌্যাবের একটি কৈফিয়ত থাকে। লাশ উদ্ধার হয় বলে তার ময়নাতদন্ত, সৎকার এবং ভবিষ্যতে বিচারের একটি সম্ভাবনা থাকে। গুমের ক্ষেত্রে এসব কিছুই থাকে না; থাকে না এমনকি ‘মৃত’ মানুষের জন্য প্রার্থনা করার সুযোগটুকু। এই পৈশাচিক অপরাধকে তাই নিকৃষ্টতম অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আইন ও নৈতিকতা—উভয় বিচারে। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, যে দেশের সরকার যত বেশি ফ্যাসিস্ট, সেখানে তত বেশি গুমের ঘটনা ঘটে। কম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া, জিম্বাবুয়ের মতো দেশে এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটত একসময়। ইলিয়াসের নিখোঁজের ঘটনা আবারও এই প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে যে আমরা কি সেদিকে যাচ্ছি? নাকি এরই মধ্যে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি, যেখানে জনগণের নিরাপত্তার বড় শত্রু স্বয়ং রাষ্ট্র!

অতীতের বিশাল বর্ণনা বাকি রাখি। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনাই চরম অস্বস্তির জন্ম দেয় আমাদের মনে। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের পর এর তদন্ত তদারকির দায়িত্ব স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও নিয়েছেন—এ কথা বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। পুলিশের আইজি হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তদারকির দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই পুলিশি তদন্তের ফলাফল উচ্চ আদালতের ভাষায় কেমন করে তাহলে ‘জিরো’ হয়ে যায়! কেন এই তদন্তের দায়িত্ব অবশেষে দিতে হয় র‌্যাবকে, যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই রয়েছে তদন্ত ‘গুম’ করার বা সাজানোর অভিযোগ! এ দেশের ইতিহাসে বিদেশি কূটনীতিকের খুন হওয়ার কোনো নজির ছিল না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর রাজধানীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় খুন হন একজন পদস্থ সৌদি কূটনীতিক। কেন প্রায় দুই মাস পরও এমন একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর খুনের তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই? কেন দেশকাঁপানো এমন দুটো ঘটনায় একজনকে আজও গ্রেপ্তার করতে পারল না পুলিশ? মিডিয়ার এত জিজ্ঞাসা সত্ত্বেও কোথায় গায়েব হয়ে গেল সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা, যার কারণে উদ্ঘাটিত হয়নি সেই গাড়িচালক আলী আজম?

সবশেষে কেমন করে রাজধানীর সবচেয়ে প্রটেকটেড একটি রাস্তা থেকে উধাও হলেন বিরোধী দলের একজন প্রথম সারির নেতা? এ ঘটনার পর বিএনপি, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাদের সাবধানে চলাফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে। বড় রাজনীতিবিদদের গানম্যান আছে, সঙ্গী-সাথি আছে, খবর নেওয়ার নেটওয়ার্ক আছে। তাঁরা সাবধানে থাকতে হয়তো সমর্থ। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী হবে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বেডরুমে নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। আবার আমরা দেখছি, রাজপথ থেকেও উধাও হয়ে যেতে পারে কোনো মানুষ। আইন-আদালত কোথাও নিষ্পত্তি হচ্ছে না কারও দায়দায়িত্ব!

এ পরিস্থিতি, বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণকারীদের জন্য অশনিসংকেত। এ পরিস্থিতি মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকারের জন্য ভয়ংকর। এ পরিস্থিতি কখনোই গণতন্ত্র নয়, বরং গণতন্ত্রের মোড়কে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের ইঙ্গিতবাহী।

২.
প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যে বর্ণনা আমরা পেয়েছি, তাতে এটি সন্দেহ করার কারণ রয়েছে, সরকারের কোনো সংস্থার লোকেরা ইলিয়াসকে তুলে নিয়ে গেছে। যে নিখুঁত পরিকল্পনায় তাঁর গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে নেমে আসতে বাধ্য করা হয়, যেভাবে সেখানে মাইক্রোবাসে তাঁকে তোলা হয় এবং ঘটনাস্থলে সাইরেন বাজানো যানের যে বর্ণনা আমরা পাই, তাতে এ ধারণা যে কারও জন্মাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ইলিয়াস লুকিয়ে থাকতে পারেন আন্দোলনের ইস্যু তৈরি করার জন্য। সোহরাব হাসান তাঁর লেখায় ব্যাখ্যা করেছেন কতটা অবাস্তব এটি। আমি মনে করি, যে সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দলীয়করণ আর ভারত-তোষণের অভিযোগের পাহাড় জমছে, তার বিরুদ্ধে আন্দালনের আর কোনো নতুন ইস্যুর প্রয়োজন নেই; বরং খতিয়ে দেখলে মনে হবে ইলিয়াসকে উধাও করার ঘটনার পেছনে সরকারেরই মোটিভ থাকতে পারে। প্রথমত, বিএনপি অভিযোগ করেছে, রেল মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ-বাণিজ্যের দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ার পর তা আড়াল করার জন্য ইলিয়াসকে গুম করা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, তোলপাড় করা সুরঞ্জিতকেন্দ্রিক এ দুর্নীতির ঘটনা আসলেই অনেকটা আড়াল পড়ে গেছে ইলিয়াস গুম হওয়ার ঘটনায়। দ্বিতীয়ত, বিএনপির একজন নেতা টিপাইমুখবিরোধী আন্দোলনে সম্প্রতি ইলিয়াসের সোচ্চার ভূমিকাকেও আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তৃতীয়ত, আন্দোলনের মাঠ সচল রাখার ক্ষেত্রে ইলিয়াসের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ইলিয়াসের মতো একজন সুপরিচিত নেতা গুম হয়ে গেলে মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে সিলেট বিভাগে সরকারবিরোধী আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি এটি বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীকে আতঙ্কিত এবং আন্দোলনবিমুখও করে তুলতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এর আগে বিএনপির প্রায় দুই ডজন নেতাসহ শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। কারও ক্ষেত্রেই তদন্তের কোনো সুরাহা হয়নি। দুই বছরে সরকার আমাদের কিছুই জানাতে পারেনি যে চৌধুরী আলম কোথায়, তাঁকে কে উধাও করেছে, তিনি মারা গেলে তাঁর লাশ কোথায়?

সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব যেকোনো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। কোনো মানুষ উধাও বা খুন হলে দোষীদের গ্রেপ্তার করা এবং বিচারের জন্য সোপর্দ করা। সরকার যদি এটি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দুটো অনুসিদ্ধান্তই কেবল নেওয়া সম্ভব। এক. সরকার নিজে তা করেছে বলে বিচার করতে অনিচ্ছুক। দুই. সরকার অপরাধী শনাক্ত করতে বা অপরাধটির বিচার করতে অক্ষম বা অসমর্থ। যদি এর একটিও সত্যি হয়, তাহলে সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার কোথায় থাকে? মানুষের নিরাপত্তা ও জীবন যদি রাষ্ট্রযন্ত্র কেড়ে নেয় বা তা কেড়ে নেওয়া মেনে নেয়, তাহলে সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর আইনের শাসন কোথায় থাকে?

৩.
আমাদের কিছু উদ্বেগ এখনো দূর হয়ে যেতে পারে ইলিয়াস জীবিত অবস্থায় ফেরত এলে। কিন্তু তিনি কি বেঁচে আছেন এখনো? আমি জানি, যাঁরা প্রকৃত রাজনীতিক, যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাঁরা মনেপ্রাণে চাইবেন তিনি বেঁচে থাকুন। আওয়ামী লীগের মতো সুদীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক দলে এমন বহু নেতা-কর্মী আছেন, যাঁরা ইলিয়াসের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। তাঁর অন্তর্ধানের প্রথম দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কথাবার্তায় তাঁদের উদ্বিগ্ন ও বিব্রত মনে হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কিছু দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগের দু-একজন নেতাকে তাঁর মতো করে কথা বলতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, ইলিয়াসকে খালেদা জিয়াই লুকিয়ে থাকতে বলে নাটক সাজিয়েছেন, তাঁকে ভুল প্রমাণ করার জন্য নিশ্চয়ই পুলিশ-গোয়েন্দা কাজ করবে না। অন্য বহু তদন্তের মতো সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে এটিও ঝুলিয়ে দেওয়া হতে পারে তাই। সরকারের কাজের যা প্যাটার্ন, এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আরও ভয়াবহ কোনো ঘটনাও হয়তো ঘটানো হতে পারে বাংলাদেশে।

আমি জানি, দেশজুড়ে গুজব আছে ইলিয়াসকে ফেরত দেওয়া হতে পারে জীবিতাবস্থায়। কিন্তু এটি বিশ্বাস করা কষ্টকর। যেখানে কোনো তদন্তের আগে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে এটি বিরোধী দলের নেত্রীর সাজানো নাটক, সেখানে ইলিয়াস এমন একটি বিবরণ নিজে থেকে দিতে রাজি হলেই কেবল তাঁকে জীবিত ফেরত দেওয়া সম্ভব। নিজের জীবন রক্ষার্থে এবং সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে ইলিয়াস হয়তো সাময়িকভাবে রাজি হতে পারেন এতে। কিন্তু তাতে এই হীন অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা রক্ষা পাবে, প্রকৃত ঘটনা নিয়ে কুৎসিত কাদা ছোড়াছুড়ি অব্যাহত থাকবে, দেশবাসী আরও বিভ্রান্তিতে পড়বে।

আমরা তবু চাই, ইলিয়াস ফেরত আসুন। কারণ, শাহ্দীন মালিকের গতকালের অসাধারণ লেখা থেকেই বলছি, ‘এভাবে চলতে থাকলে দেশে রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের আকাল পড়বে। বহাল তবিয়তে থাকবে শুধু র‌্যাব।’

যত দূর মনে করতে পারি, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে র‌্যাবের দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধী দলকে বলছেন, আপনাদের সৃষ্টি করা বাহিনীই আপনাদের খাবে! বিএনপির কি এখন বোধোদয় হচ্ছে, কী ভয়ংকর আগুন নিয়ে খেলেছিল তারা র‌্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করে? আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনার আমলে গুম-সংস্কৃতি বিস্তার হওয়ায় কোন দাবানল তৈরি হচ্ছে দেশে? গুম হওয়া যদি স্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তাহলে কে জানে গণতন্ত্রই এক দিন গুম হয়ে যায় নাকি এ দেশে!

আমরা সত্যিই আশঙ্কিত!

পাদটীকা: এই লেখা যখন লিখছি, দেশে তখন হরতাল চলছে বিরোধী দলের আহ্বানে। হরতালের দিন এবং আগের দিন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুজন, আহত হয়েছেন অনেকে, বেশ কিছু যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আমরা হরতালের অধিকারে বিশ্বাসী, কিন্তু হরতালে নিহত-আহত হওয়ার ঘটনা আর ধ্বংসযজ্ঞ এই অধিকারের আওতায় পড়ে না। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।

 
 

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৩/০৪/১২]

দুই নেত্রীর জিদে উত্তপ্ত রাজপথ- দেশবাসী উৎকণ্ঠায়


দুই নেত্রীর জিদে উত্তপ্ত রাজপথ দেশবাসী উৎকণ্ঠায়

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই


একুশে রিপোর্ট : শান্ত ছিলো রাজপথ। হঠাৎ বজ্রপাতের মতোই রাজপথ উষ্ণ হয়ে ওঠলো। কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলেই আসল বিষয় নয়। নেপথ্য কারণ অনেক। এর প্রথম হচ্ছে বিএনপি নেত্রীর দুই পুত্রের সাজা ও নতুন মামলায় অন্তভূর্ক্তি এবং জামাতের নেতাদের মুক্তির জন্য পরোক্ষভাবে বার্তা পৌঁছানো। সংবিধান সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হতে পারতো। হলো না শুধু দুই নেত্রীর জিদাজিদের জন্য। কেউ কারো মুখ দর্শনে নারাজ। এই ধারা চলতে থাকলে যতই সরকারের মেয়াদ কমবে, ততই সংঘর্ষ-সংঘাতের দিকে দেশ ধাবিত হবে। জনগণ এসব ভেবে শঙ্কায় আছে।

এরই মধ্যে ৪ দল ছোট ছোট দলগুলোকে নিজেদের দিকে টানার জন্য টিম পাঠাচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগও বসে নেই। তারাও প্রগতিশীল এবং সমমনা দলগুলোর সাথে কথা বলছে। নতুন মিত্র দুই পক্ষই খুঁজছে। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মুছে ফেলায় এখন হয়ত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। এরই মধ্যে ৪ দল আগাম ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় শেষ হয়ে যায়নি। নির্বাচনের অনেক সময় বাকি। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে। সংবিধানে সবের্াচ্চ আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী আরও দুই মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখে আরেকটি সংশোধনী পাশ করলেই রাজপথ শীতল হয়ে যাবে। সমাধানের পথ এটাই। আর যদি সরকারি দল সে পথে না যায়, তাহলে ঘুনিয়ে আসছে অনিবার্য মহাসংঘাত। হয়ত এই সংঘাতে গৃহযুদ্ধ না হলেও ভয়াবহ পরিস্হিতির সৃষ্টি হতে পারে। জিম্মি হয়ে পড়তে পারে দেশবাসী। আর তখন জনগণকে এমনি পরিস্হিতি থেকে উদ্ধারে কে এগিয়ে আসবেন? ত্রাতা বা রেফারী হিসেবে তখন কি আবারো সেনাবাহিনীকে এক-এগারোর মতো মিডিয়েটরের ভূমিকা পালন করতে হবে? এমনি আশঙ্কাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

 

জনগণ মনে করে আমাদের রাজনৈতিক গণনে মুল সমস্যা হচ্ছেন দুই নেত্রী। তারা এক টেবিলে বসে যদি সব সিদ্ধান্ত নেন তাহলে এদেশে আর কোনোদিন আন্দোলন, হরতাল দরকার হতো না। দুই নেত্রীর মধ্যে আছে ইগো বা জিদ। দু’জনই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আবারও হয়েছেন। জনগণ তাদের দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দিয়েছে। দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য যদি সংঘাতের বদলে সমঝোতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতো, তাহলে এদেশ সব সমস্যা ও সংকট থেকে মুক্ত হতে পারতো। যদি সংবিধানে আর কোনো সংশোধনী যুক্ত না হয়, আদালতও চুড়ান্ত রায়ে আরও দু’টি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা ম্যান্ডেটরী না করে, সরকারের মেয়াদের পরে রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো অপশনে না গিয়ে শেখ হাসিনাকেই ৯০ দিনের জন্য কাজ চালিয়ে যেতে বলেন, তাহলে ৪ দল সেই নির্বাচনে যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছ। তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না। এই জেদ ও সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে নির্বাচনের আগে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে যাওয়াও বিচিত্র নয়। আমাদের সামনে ২০০৬ সালে জোট সরকারের পদত্যাগের সময়টার কথা মনে আছে। তখন কিভাবে পল্টনে, বায়তুল মোকাররমে রাস্তায় লড়াই হয়, গোলাগুলী হয়, অতঃপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ। আমরা কি মাত্র ৫ বছরে সেই কালচার থেকে বেরিয় আসতে পেরেছি? আমরা কি ঘোষণা দিতে পারি যে, আর এদেশে এমন ঘটনা ঘটবে না? সুতরাং সরকারি ও বিরোধী দলকে এক টেবিলে বসিয়ে দুরুত্ব কমিয়ে আনতে না পারলে দেশ এক সাংঘর্ষিক পরিস্হিতির দিকে এগিয়ে যাবে-এমনটাই ্আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিমক বিশ্লেষকরা। খালেদা জিয়া বলেছন, আর নয় হরতাল, আর নয় ভাঙচুর, আর নয় জ্বালাও-পোড়াও। তাহলে কি শুভবুদ্ধির উদয় হলো? নাকি যে কারণে এসব চলছিল, তার সামাধান তিনি পেয়ে গেছেন? বিশ্লেষকদের একাংশ বলেছেন, এটা ঘোষণা হলেও তা চিরস্হায়ী কোনো ঘোষণা নয়। তাদের মতে হরতালের নেপথ্য কারণ ছিল তারেক-আরাফাত-এর মামলা, সাজা, ওয়ারেন্ট ইত্যাদি। হয়ত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে গ্রীন সিগনাল দেয়া হয়েছ শর্তভিত্তিক। আর এ কারণেই শরীকদের জিজ্ঞাসা বা মতামত না নিয়েই গণ-অনশনে তিনি এমন ঘোষণা দিয়েছন। তারপরও সাধারণ জনগণ আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তারা ঈদের পর আবার হরতাল, ভাঙচুর, গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার আশঙ্কাও করছেন।

 

এরই মধ্যে সামাজিক অস্হিরতা বাড়ছে। গণপিটুনী দিয়ে ছাত্র হত্যা করা হচ্ছে, নানারকম হত্যা, ধর্ষণ ও অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের সাহসও বাড়ছে। দাগী আসামীরা জামীন ও পাচ্ছে। এদিকে রাষ্ট্রপতি লক্ষ্মীপুরের ফাঁসির আসামী বিপ্লবকে ক্ষমা করে দিলেন। এর আগে বিএনপি-জামাতের সময় ২০০৫ সালে ফাঁসি হওয়া পলাতক আসামী জিন্টুকে ব্যারিস্টার মওদুদ সাহেব এনে ুআদালতে আত্মসমপর্ণ করিয়ে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে সাজা মওকুফ করিয়ে আবার সুইডেন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। একই নজীর হলো এ সরকারের সময়ও। তাহলে দিন বদল হলো কোথায়? এসব কর্মকাণ্ড হলে অপরাধ প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু দালাল আইন ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চিকন আলী রাজার ও মহসীন হল মার্ডার কেসে অভিযুক্ত শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তেমনটি হতে পারতো। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রিক সরকারে যাত্রা শুরু হয় অনেক আন্দোলন, রক্তক্ষয় ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে। তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী তখনকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের কাছে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী ঘোষিত হয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে মেয়াদ শেষ হবার আগে নির্বাচন কিমিশন নতুনভাবে গঠিত হবার পরই দেখা যায় বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসার কেওশল নিয়ে তাদের দলে সমর্থক কমিশন সদস্যের নিয়োগ করে। ভোটার তালিকায় অনেক ভোটারকে বাদ দেয়া হয়। এ সময় দলীয় সেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যেতে দেশের সব দল, এমনকি জামাতও রাজী হয়নী। তারা আন্দোলনে নামে, দাবি করে কেয়ারটেকার সরকার গঠনের। এমনি এক পরিস্হিতিতেও খালেদা জিয়ার সরকার নিজেদের লোকজনকে টিক চিহ্ন দিয়ে নির্বাচনহীন এক ভোট দেখিয়ে সংসদ ও সরকার গঠন করে। অবশেষে রাজপথে জনতার মঞ্চ তৈরি করে ৮ দল, ৫ দল, জামাত, জাসদসহ সব দল। সেই পাতানো সংসদেই পাস হয় ত্রয়োদশ সংশোধনী-তত্ত্বাবধায়ক সরকার। গঠিত হয় বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সরকার। তবে এই তত্ত্বাবধায়ক আমলেও সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম ট্যাংক নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয় বিচারপতি লতিফুরের অধীনে। তার মেয়াদকালে আইন-শৃঙখলার বারোটা বাজে। সারাদেশে হাজার হাজার মানুষ খুন ও ধর্ষণের শিকার হয়। অগণিত মানুষের সম্পদ দখল হয়। সংখ্যালঘুরা বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্য জেলায় আশ্রয় নেয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এজেন্টদের প্রকাশ্য মেরর বের করে দেয়া হয়। সারাদেশে অরাজকতা ও নৈরাজ্যে স্বাধীনতা বিরোধীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। এমনি অবস্হায় নির্বাচন হয়। নির্বাচনের পর ৬ মাস যাবত চলতে থাকে অরাজকতা, খুন, ধর্ষণ ও দখল।

 

তৃতীয় তত্ত্বাবধায়ক, সরকার হলো তিন উদ্দিনের ভেলকিবাজী। ২০০৬ সালে জামাত-বিএনপি সরকার পদত্যাগের পরই রাজপথে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। হরতাল অবরোধ এমন পর্যায়ে যায় যে, সেনা হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্হিতি নিয়ন্ত্রণে আসতো না। এখন ২০১৩-১৪ সালে আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করলে তখন কি হবে, এ ভেবে জনগণ শঙ্কিত। তখন জনগণ যদি জিম্মি হয়ে পড়ে, তাদের উদ্ধারে রেফারী বা মিডিয়েটর কে হবে? আবার কি সেনাবাহিনীকেই আসতে হবে? সংবিধানতো ডাস্টবিনে ফেলার ঘোষণাই এসে গেছে। তাহলে জোর যার রাজ্য তার ছাড়া আরতো নীতিমালা থাকবে না। তখন কি হবে? আরেকটি মহাসংঘাত ও নতুন কোনো মিডিয়েটর?