বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।


রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২০১১ : শীর্ষ পাঁচে বাংলাদেশ

মীর মনিরুজ্জামান
বিশ্ব অর্থনীতির অনেক মানদণ্ডেই বাংলাদেশ উজ্জ্বলতম অবস্থানে নেই। কিন্তু এক দশক ধরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স দেশের জন্য নিয়ে এসেছে এক অসামান্য আশীর্বাদ। এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্সগ্রহীতা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে পঞ্চম।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের আউটলুক ফর রেমিট্যান্স ২০১২-১৪ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ বার্তা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব বসন্ত ও বিশ্বমন্দা রেমিট্যান্সপ্রবাহে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মিসর, সিরিয়া ও লিবিয়াসংকটের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক ফিরে এলেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। ২০১১ সালের ১০ মাসের ভিত্তিতে (জানুয়ারি-অক্টোবর) পুরো বছরের যে প্রক্ষেপণ তারা করেছে, তাতে বিশ্বব্যাংক মনে করছে, এ বছর বাংলাদেশ ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করবে।

প্রতিবেদনে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে ভারত, চীন, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, মিসর ও লেবানন। ২০১১ সালে শীর্ষ ১০টি দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহের পরিমাণ ২২০ বিলিয়ন ডলার, যা উন্নয়নশীল দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ। ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করে ভারত তালিকার শীর্ষস্থানটি দখল করেছে। ৫৭ বিলিয়ন নিয়ে চীন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে মেক্সিকো ২৪ বিলিয়ন ডলার, চতুর্থ অবস্থানে ফিলিপাইন ২৩ বিলিয়ন, পঞ্চম অবস্থানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ১২ বিলিয়ন, ষষ্ঠ অবস্থানে নাইজেরিয়া ১১ বিলিয়ন, সপ্তম অবস্থানে ভিয়েতনাম ৯ বিলিয়ন, অষ্টম অবস্থানে মিসর ও লেবানন ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবাসী শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রথম ৯ (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) মাসে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রবৃদ্ধি হয় ৩৭ শতাংশ। এ সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়ে। এ খাতে দেশটি প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ ধরে রেখেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে অক্টোবর পর্যন্ত বৈধ পথে রেমিট্যান্স এসেছে ১০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার পরও জনশক্তি রফতানিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রতিবেদনে লিবিয়া থেকে ৩৮ হাজার শ্রমিক ফেরত আসার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে কিছুটা রক্ষণশীল হিসাব বলে মনে করছেন প্রবাসীকল্যাণ সচিব ড. জাফর আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাবের চেয়ে বেশি জনশক্তি রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া রেমিট্যান্স খাতেও অর্জন বেশি। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও অন্যান্য চ্যানেলে পর্যাপ্ত রেমিট্যান্স আসে। তিনি বলেন, গত বছরের চেয়ে জনশক্তি রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত জনশক্তি রফতানি হয়েছিল ৩ লাখ ৯০ হাজার, এ বছর নভেম্বর পর্যন্ত রফতানি হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার। ডিসেম্বরে আরও ৪০ হাজার মানুষ যাবে। সব মিলে এ বছর ৬ লাখ জনশক্তি রফতানি হবে। ওমান ও সংযুক্ত আবর আমিরাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক রফতানি হওয়ায় এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট না থাকলে এ বছর আরও জনশক্তি রফতানি হতো বলে মনে করেন সচিব ড. জাফর আহমেদ।

তবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি মো. আবুল বাশার মনে করেন, কূটনৈতিক তত্পরতার দুর্বলতার কারণে জনবল রফতানি এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। তিনি বলেন, জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার এখনো বন্ধ আছে। সরকার যদি কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব দেশের শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানি আবার চালু করতে পারত, তবে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ত।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ছয়টি উন্নয়নশীল অঞ্চলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়েছে। আমেরিকা, জাপান ও ইউরোপের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরও উন্নয়নশীল দেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। ওই সব দেশের প্রবাসীরা ব্যক্তিগত খরচ কমিয়ে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, উন্নয়নশীল দেশে ২০১২ সালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৭ দশমিক ৯ এবং ২০১৪ সালে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে।
তবে প্রতিবেদনে বেশ কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরোর চলমান ঋণসংকট দীর্ঘায়িত হলে এবং আমেরিকাসহ উন্নত অর্থনীতির দেশে বেকারত্ব বাড়লে তা প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক দেশ প্রবাসী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ অথবা সংকোচন করতে পারে। কোনো কোনো দেশ নিজের ঘর সামলাতে শ্রমিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাকেন্দ্রের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, ইউরোপসংকট দীর্ঘায়িত হলেও তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে না। কারণ বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট ঘনীভূত হলে রেমিট্যান্সে বড় সমস্যা হবে। সে ক্ষেত্রে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন ড. জায়েদ বখত।

বায়রা সভাপতি মো. আবুল বাশার বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ লোক কাজের জন্য তৈরি হয়। এদের অধিকাংশের জন্য কাজের কোনো ব্যবস্থা দেশে নেই। এই শ্রমশক্তিকে যত বেশি বিদেশে পাঠানো যাবে, দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ তত বাড়বে। এ ব্যাপারে সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

%d bloggers like this: