মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!


ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও। গ্রাম থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীও ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে অনেকে।

সমাজবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করছেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার ওই ধারণা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকায়। এ রকম এক জুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই বিভাগে, একই ক্লাসে পড়তেন। গভীর বন্ধুত্ব তখন থেকেই। দু’জনই মেধাবী। রেজাল্টও ভাল। বন্ধুটি এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বান্ধবী পিএইচডি করছেন, এখনও শেষ হয়নি। থাকছেন বনানী এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটিও নিজেদের। লিভ টুগেদার করছেন। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করবেন না। দু’জনই চেষ্টা করছেন ইউরোপের একটি দেশে যেতে। বিত্তবান ঘরের সন্তান তারা।

বন্ধুটির বাড়ি ছিল ফেনীতে, বান্ধবীর ঢাকায়। শাহানা তার নতুন নাম। এ নামে কেবল জর্জই তাকে চেনে। জর্জকে ওই নামে অন্য কেউ চেনে না। এটা শাহানার দেয়া নাম। একে অপরকে দেয়া নতুন নামেই তাদের বাড়ি ভাড়া নেয়া উত্তরা এলাকায়। চাকরিজীবী দু’জনই। এক সময়ে চাকরি করতেন এই সংস্থায়। সেখান থেকে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। এখন তারা চাকরি করছেন পৃথক দু’টি বৈদেশিক সাহায্য সংস্থায়। উচ্চ বেতনে চাকরি। অফিসের গাড়ি। শাহানা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জর্জ পড়াশোনা করেছেন ভারতের নৈনিতালে, বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় ফিরে চাকরি নিয়েছেন। লিভ টুগেদার করছেন। বিয়ের প্রতি আগ্রহ নেই তাদের। শাহানা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চান। সেখানে তার পরিবারের বেশির ভাগ লোক বসবাস করছে। শাহানার চিন্তা বিয়ে মানেই একটি সংসার, ছেলেমেয়ে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। এখনই এগুলোর কথা ভাবতে গেলে তার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে, বিদেশে যাওয়া না-ও হতে পারে। এ কথাগুলো সে খুলে বলেছে জর্জকে। জর্জ রাজি হওয়ায় এক সঙ্গে থাকছেন তারা চার বছর ধরে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ দু’জনে মিলে বহন করেন। সব কিছুই হয় দু’জনে শেয়ার করে। মনোমালিন্য হয় না তা নয়, হয় আবার তা মিটেও যায়। এভাবেই চলছে চার বছর ধরে।

একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তারা। বসবাস করছেন ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটে। ছেলেমেয়ে দুজনই ধনাঢ্য পরিবারের। দু’বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন। পড়শিরা জানে, স্বামী-স্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে সেভাবেই নিজেদের পরিচয় দেন। যশোরের একটি গ্রাম থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন ওরা। পরিচয় তাদের স্কুল থেকে। ঢাকায় এসে প্রথম দু’বছর দু’জন থাকতেন আলাদা বাড়ি ভাড়া করে। এখন দু’জন মিলে থাকছেন একই বাসায়। ভাড়া দেন দু’জনে শেয়ার করে। গত এক বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত লিভ টুগেদার করছে। শোবিজে লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় ভাবে পরিচিত শোবিজের অনেক স্টার এখন লিভ টুগেদার করছেন। দেশব্যাপী পরিচিত দু’জন নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট শোবিজে। একজন পরিচিত কণ্ঠশিল্পী গত পাঁচ বছর ধরে লিভ টুগেদারের পর আপাত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এখন থাকছেন আলাদা। শোবিজের নাট্যাঙ্গনের চার জোড়া নতুন মুখ লিভ টুগেদার করছেন বছরখানেক ধরে। তাদের পরিচিত ও নিকটজনরা জানেন তাদের লিভ টুগেদার সম্পর্কে। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তারা কেউ আপাতত বিয়ের কথা ভাবছেন না। শোবিজে ছেলেমেয়ে উভয়ের উচ্চাসনে যাওয়ার পথে বিয়েকে একটি বড় বাধা মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত দুই তিন বছরের মধ্যে ঢাকায় লিভ টুগেদারেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে লিভ টুগেদারের বেশির ভাগ ছিল সমাজের উচ্চ স্তরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এখন লিভ টুগেদারের প্রবণতা বেড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সদ্য গ্রাম থেকে এসে ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। কেবলমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে কিন্তু তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এমন অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছে।

ঢাকার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, তার জানা মতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম করে হলেও এক শ’ জোড়া ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করছে। বিষয়টি তাদের কাছে ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ কাউকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। ওই শিক্ষার্থী লিভ টুগেদারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তার ভাষায় দু’জনের মতের মিলেই তারা লিভ টুগেদার করে। এখানে অপরাধ কিছু নেই। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা লিভ টুগেদার করছেন। তাদের লিভ টুগেদারের কথা জানে তাদের অনেক ছাত্রও। ওই শিক্ষকদের একজন তার এক নিকটজনের কাছে বলেছেন, লিভ টুগেদারকে তিনি বরং গর্বের বিষয় মনে করেন।
ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন, বর্তমানে বসবাস করছেন গুলশান এলাকায়। চাকরি করেন একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায়। এর আগে তার কর্মস্থল ছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। তিন বছর ধরে ঢাকায় আছেন। লিভ টুগেদার করছেন তারই এক সহকর্মী নারীর সঙ্গে। ওই ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দু’জনই বাংলাদেশী। তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং হয়। এখন বাংলাদেশে আছি, এক বছর পর অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। সে কারণে আমরা দু’জনই ঠিক করেছি লিভ টুগেদার করতে।

তাছাড়া, লিভ টুগেদারের ধারণা খারাপ নয়, আমরা কেউ কারও বোঝা নই, আইনি বন্ধনও নেই। কারও ভাল না লাগলে তিনি এক সঙ্গে না-ও থাকতে পারেন। এতে কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে এ প্রবণতার কিছু কারণ জানা গেছে। তাদের মতে, যে সব মেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করে, নিজেদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা বা দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা এখনই বিয়ে করে ছেলেমেয়ের ভার নিতে চায় না। সংসারের ঘানি টানতে চায় না। ওই সব মেয়ে নিজেদেরকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে। এমন অনেক ছেলেও আছে যারা ওই সব মেয়ের মতো ধারণা পোষণ করে না তারা কেবলমাত্র জৈবিক কারণে লিভ টুগেদার করছে। অর্থবিত্তে বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে লিভ টুগেদার করছে কেবলমাত্র সমাজে তার একজন সঙ্গীকে দেখানোর জন্য, নিজের একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায়। অনেকে বিয়ের প্রতি প্রচণ্ড রকম অনাগ্রহ থেকেও লিভ টুগেদার করছে। ঢাকা শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির কন্যা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন একজন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে। ওই শিল্পপতির কন্যার প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংসার জীবনের পাট চুকিয়ে এখন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের লিভ টুগদোর। ওয়েস্টার্ন সোসাইটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ ও অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন তাদের লিভ টুগেদারে বিচ্ছেদও ঘটছে। সহসা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঘটছে খুনের মতো অপরাধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে খুন করে পালিয়েছে ছেলেটি। চলতি বছর জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় খুন হয় সুরাইয়া নামের এক যুবতী। তিনি চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। তাকে খুন করে বাসায় লাশ রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যায় যুবক সুমন রহমান। পরে জানা যায়, প্রায় বছর খানেক ধরে লিভ টুগেদার করতেন সুমন ও সুরাইয়া।

এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। মে মাসে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে এক তরুণীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই তরুণী লিভ টুগেদার করতো তারই এক বন্ধুর সঙ্গে। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে মনোমালিন্য শুরু হয় তাদের মাঝে। শেষে মেয়েটিকে খুন করে পালিয়ে যায় বন্ধুটি। গত ১লা নভেম্বর রর‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় ম্যারেজ মিডিয়ার দুই পার্টনার। ফরিদপুর শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একই শহরের আরেকটি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে। পারভীন নামের মেয়ে ও আরিফ নামের ছেলেটি অকপটে স্বীকার করেছে তারা লিভ টুগেদার করছে এবং এক সঙ্গে ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসা করছে।

ঢাকাতে লিভ টুগেদার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমাডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অনেক যুবক-যুবতী এখন ফ্যামিলিকে একটা বার্ডেন মনে করে, বিয়েকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্তরায় মনে করে। দেখা যাচ্ছে, এরা বিয়ের চেয়ে লিভ টুগেদারকে বেশি পছন্দ করছে। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও পাচ্ছে। তারা সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের সঙ্গী হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন বাড়ি ভাড়া একটি বড় সমস্যা। বাইরে থেকে পড়তে আসা বা চাকরি করতে আসা যুবক বা যুবতীকে বাড়ির মালিক আলাদা আলাদা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তিনি বলেন, তবে এতে সমস্যা হচ্ছে সমাজে এক ধরনের ক্রাইম তৈরি হচ্ছে, কোন কারণে বনিবনা না হলে খুন হয়ে যাচ্ছে মেয়ে বা ছেলেটি।
http://allsharenews.com/

Advertisements

দুই শ্রেণীর মানুষ মিথ্যা বলবেই। তারা হলো রাজনীতিবিদ এবং পুরনো গাড়ি বিক্রেতা। জীবনের জন্য প্রয়োজন সম্পদ, জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সামাজিক বন্ধন। রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার :


রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার

আলমগীর মহিউদ্দিন

রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার

তিন দশক আগে এক তরুণ বাংলাদেশী কূটনীতিকের মেহমান হয়েছিলাম। তিনি সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তার আইরিশ মানবীকে নিয়ে ইউরোপের এক শহরে ঘর বেঁধেছিলেন। এমন সংসার কেমন চলে জানতে ইচ্ছে হলো। আইরিশ মানবীকে জিজ্ঞেস করলাম সে কথা। তিনি বললেন, চমৎকার, তবে কথা প্রসঙ্গে একবার বললেন, ‘তবে একটু অসুবিধা হলো আমরা ঠাট্টা-কৌতুকে সমান ভাগ নিতে পারি না।’ এটাই আমার জানার ইচ্ছে ছিল। বলা হয়, ঠাট্টা ও কৌতুক (জোকস অ্যান্ড হিউমার) যেকোনো জাতির সংস্কৃতির একটি নিংড়ানো প্রতিচ্ছবি। তাই বিভিন্ন জাতির মাঝে সাংস্কৃতিক আচার-ব্যবহারের যে ব্যবধান তা ব্যক্তিগত বা সামাজিক পরিমণ্ডলে প্রতিফলিত হবেই এবং অনেক ক্ষেত্রে তা অলঙ্ঘনীয় হয়ে ওঠে। সে কারণেই কি না, এই দম্পতির সংসার ভেঙে গিয়েছিল।

তবে বিভিন্ন দেশের সামাজিক ও ব্যক্তিপর্যায়ে সাংস্কৃতিক এমন অমিল হলেও, একটি সংস্কৃতিতে বিশ্বের সব দেশের রাজনীতিবিদদের অপূর্ব মিল রয়েছে। এমন সংস্কৃতিতে এখন তারা প্রায়ই অংশগ্রহণ করে বিশ্বে অশান্তি, অনাচার, ধ্বংস এবং দখলের রাজত্ব কায়েম করেছে। অবশ্য এমন অবস্থা অতীতে থাকলেও, আজকের মতো এত তীব্রতা ছিল না। এ সংস্কৃতি হলো রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার ও দুর্নীতি। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে রাজনীতিবিদদের সরাসরি মিথ্যাবাদী বলা বা তাদের মিথ্যাচার নিয়ে আলোচনা করা খানিকটা বিপজ্জনক। কারণ তারা মৌখিক প্রতিবাদ বা বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত হন না, তারা অভিযোগকারীদের ‘ফিজিক্যাল’ নির্মূলে ব্রতী হন। প্রথম বিশ্বে এমন আলোচনা ব্যাপক এবং তা কেমন তার কিছু উদ্ধৃতি এখানে দেয়ার চেষ্টা করা হবে। এ আলোচনাই নির্দেশ করবে, কেন প্রথম বিশ্বে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ী এবং শক্তিশালী। এখানে অনেক কারণের মাঝে একটির উল্লেখ যথেষ্ট। তা হলো জনগণ তাদের মতামত নির্ভয়ে প্রদান করতে পারে তাদের রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে এজন্য যে, সেসব রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় থাকলে কখনো নিজেদের শাসক ভাবে না, তারা সর্বদা নিজেদের জনগণের প্রতিনিধি ভাবে।

বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং জনমত সংগ্রহকারীদের ধারণা, রাজনীতিবিদরা মিথ্যা বলেন, অনেক কারণের মধ্যে, আর্থিক লাভ, বাধাহীন ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং অহঙ্কারের জন্য। এ ছাড়া তারা মিথ্যা বলেন, তারা মিথ্যা বলতে পারেন বলে বলেন। হেলিয়াম বলে একটি ইন্টারনেট ব্লগে শত শত সাড়াদানকারী একতানে বলেছেন, তারা মিথ্যা বলেন, এমনকি সত্য ও মিথ্যার ভেদাভেদও করতে ব্যর্থ হন একপর্যায়ে। যারা যত বেশি ক্ষমতাপ্রিয় ও আর্থিক লাভে মগ্ন, তারা তত মিথ্যা বলেন। তবে একজন সাড়াদানকারী (বি শীলা) বলেছেন, ‘পাখি যেমন ওড়ে, রাজনীতিবিদরা তেমনি মিথ্যাচার করে।’

তবে ডেইলি মেইল তাদের এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করে, ‘আধুনিক রাজনীতিবিদরা মিথ্যা বলবে না, এমনটি আশা করাই অতি সরলতা।’ তবে সম্পাদকীয়তে সাংবাদিকদেরও এক হাত নেয়া হয়। বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের অনেকেই হয় যোগসাজশে লিপ্ত নতুবা বিভ্রান্ত বা অলস, যারা এই মিথ্যাচারের মুখোশ খুলে না দিয়ে একে হয় বাড়তে দেয়, অথবা এর ভিত শক্ত হতে সাহায্য করে। ডেইলি মেইল বলেছে, এতে সংবাদমাধ্যম তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব থেকে বিরত থাকে।

মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদদের সাঙ্গপাঙ্গরা কিভাবে মিথ্যাচারকে সত্যি বলে চালানো যায়, তার এক মজার উদাহরণ দিয়েছেন বি শীলা। তিনি লিখেছেন, বিল ক্লিনটন যখন ঘোষণা করলেন মনিকার সাথে তার কোনো যৌন মিলন হয়নি, তখন সবাই বিশ্বাস করেছিল। কারণ ক্যামেরার সামনে এত জোরালোভাবে এমন মিথ্যা বলা যায় সে কথা তারা ভাবতে পারত না। যখন সংবাদমাধ্যমের একাংশ আসল ঘটনা ফাঁস করে দেয়, তখন ক্লিনটনের সাঙ্গপাঙ্গ এবং সংবাদমাধ্যমের অপরাংশ আলোচনা শুরু করল, ‘যৌনতা, যৌনসম্ভোগ’ ইত্যাদি কী এবং ক্লিনটনের মিথ্যাচারকে গুলিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়।

সম্প্রতি রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের ওপর একটি চমৎকার বই বেরিয়েছে। ‘দি মার্কেটিং অব ইভিল’ বইতে লেখক ডেভিড কুপেলিয়ান (David Kupelian) দেখিয়েছেন, কেমনভাবে রাজনৈতিক আমূল সংস্কারবাদী, উচ্চ শ্রেণী এবং ভুয়া বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে স্বাধীনতা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করছে (How radicals, elitists and pseudo-experts sell us corruption disguised as freedom). অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা একাই মিথ্যাচার করছেন না। তারা সমাজের সজাগ অংশকেও সম্পৃক্ত করছেন এই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে। তবে তাদের নতুন করে দোষ দেয়ার কিছু নেই এ জন্য যে, এটা রাজনীতির একটা অঙ্গ হিসেবে বহু দিন থেকে চালু আছে। যেমন বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো এবং লিও স্ট্রস মন্তব্য করেছেন, মিথ্যাচার রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ডের একাংশ, কারণ তারা মিথ্যাচার করে অজান্তে জনগণের প্রয়োজনের কথাটিও তুলে ধরেন Philosophers Plato and Leo Strauss say lying is essential to the politician’s art. Only by lying can leaders make the public see what benefits them. Not to lie, given he quality of public understanding, invites chaos)। তাহলে রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের জন্য জনগণও খানিকটা দায়ী। কারণ তারা সব সময় সচেতন নয়। শুধু মিথ্যা আশ্বাস এবং বক্তব্য শোনার পরই তারা সচেতন হতে শুরু করে।

এটা সত্য, আজকের যুগে কেউ কখনো মিথ্যা বলেনি এমন দাবি বাতুলতা। তবে রাজনীতিবদরা মিথ্যা বলার উৎসাহ পেয়েছেন নানা বুদ্ধিমান ও জনবিরোধী মানুষের কাছ থেকে। তাদের মাঝে ভারতের চানক্য, ইউরোপের নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ও এডলফ হিটলার উল্লেখযোগ্য।

চানক্য বলেছেন, মানুষের খুব সৎ হওয়া উচিত নয়, কারণ সোজা-সরল গাছই আগে কাটা হয় আর সৎ মানুষকেই সর্বপ্রথম হেনস্তা করা হয়। (A person should not be too honest. Straight trees are cut first and honest persons are screwed first) তবে চানক্য এ কথাও বলেছেন, সত্যই বিশ্বকে পরিচালিত করে (The earth is supported by the power of truth. It is the power of truth that makes the sun shine and winds blow; indeed all things rest upon truth).
ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, ‘যদি রাজনীতিবিদরা মিথ্যা না বলেন তাহলে তার পতন হবে। কারণ রাজনীতির মূলই হচ্ছে মিথ্যাচার। মিথ্যা না বলা অর্থ হচ্ছে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা (If politicians did not lie they would severely fail because lying was fundamental to politics. Not to lie was to ignore reality).

ডেভিড কুপেলিয়েনের একটি মন্তব্য বাংলাদেশের অবস্থার চমৎকার বর্ণনা করে। তিনি বলেন, যখন রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারেন, জনগণ সত্য এবং মিথ্যা নিয়ে ভাবে, তখন তারা মিথ্যাটাকে সাহস এবং শক্তির সাথে বলেন। অনেকেই বুঝতে পারে না, মিথ্যার শক্তি কতখানি। তবে রাজনীতিবিদরা যখন মিথ্যা বলবেন, তা বড় হতে হবে। কারণ ছোট মিথ্যা সাধারণ মানুষ বলে। তারা ভাবতেই পারে না, বড় মিথ্যা বলা সম্ভব। তাই মিথ্যা যত বিশাল হবে এবং ক্ষমতা ও অধিকার বলে বলা যাবে, তা ততই জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে। জনগণকে যদি বলা হয়, এটা বিশাল মিথ্যা, তারা তা গ্রহণ করতে চাইবে না এই বলে যে, একজন নেতা এবং শিক্ষিত মানুষ কেমন করে এত বড় মিথ্যা বলতে পারেন। যেমন কোনো বড় নেতা যদি বাংলাদেশের মানুষকে বলেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে ২০ টাকা কেজির চাল ১০ টাকায় পাওয়ার ব্যবস্থা করবেন, জনগণ তা বিশ্বাস করবে। কারণ এত বড় নেতা এত বিশাল মিথ্যা বলবেন, তা তারা বিশ্বাস করবে না। আবার তিনি ক্ষমতায় গিয়ে যদি তা বাস্তবায়ন করতে না পারেন, বরং চালের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে পৌঁছলে যদি তিনি তার পূর্ববর্তী বক্তব্যকে অস্বীকার করেন এবং বিরোধী দলকে দায়ী করেন, জনগণের এক বিরাট অংশ তাও বিশ্বাস করবে। তারা মনে করবে, তার বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে অথবা তাকে তার অমাত্যরা সঠিক তথ্য দেয়নি।

আসলে এই বিশাল মিথ্যা বলার মতবাদ সর্বপ্রথম প্রচার করে জার্মানির এডলফ হিটলার। তিনি তার আত্মজীবনীতে (Mein Kamf) লিখেছেন, ‘বড় মিথ্যায় সব সময় বিশ্বাসযোগ্যতার এক বিশাল শক্তি রয়েছে। এটা জনগণের মনের গভীরে গিয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে। তারা সহজেই বড় মিথ্যার কবলে পড়ে, কারণ তারা মিথ্যা বললেও তা ছোট এবং বড় মিথ্যা বলতে তারা লজ্জা পায়। এটা তাদের মাথায়ই আসবে না (In the big lie there is always a certain force of credibility; because the broad masses of a nation are always more easily corrupted in the deeper strata of their emotional nature than consciously or voluntarily; and thus in the primitive simplicity of their minds they more readily fall victims to the bit lie than small lie, since they themselves often tell small lies in little matters but would be ashmed to resort to large-scale falsehoods. It would never come into their heads to fabricate colossal untruths, and they would not believe that others could have the impudence to distort the truth so infamously. Even though the facts which prove this to be so, may be brought to their minds, they will still doubt and waiver and will continue to think that there may be some other explanation.)

হিটলারকে সবাই নিন্দা করলেও বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদরা এই নীতির পরম ভক্ত। বেশি দূর না গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাবে। এখানে বিশাল মিথ্যাগুলো জাতীয় আইকন হিসেবে স্থান পেয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কেউই সত্য তথ্যও উপস্থাপন করতে সাহস পায় না, এমনকি সরকারও। মজার ব্যাপার হলো, অনেক রাজনৈতিক দল এই মিথ্যা আইকন নিয়ে তাদের রাজনীতি করছে।

তবে এটা সত্য, যেমন চানক্য বলেছেন সত্যই অবশেষে সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর একটি মজার তথ্য ডেভিড কুপেলিয়ান তার বইয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মার্কিন সরকারের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (সিআইএ’র পূর্বসূরি) হিটলারের পদ্ধতি ও প্রচারণার একটি সমীক্ষা করে। তা হলো ‘কখনো জনগণকে স্থিত হতে দেবে না; কোনো বিচুøতি বা ভুল স্বীকার করবে না; কখনো স্বীকার করবে না প্রতিপক্ষের কোনো কিছু ভালো; কখনো বিকল্প পথের ব্যবস্থা রাখবে না; শত্রুর একজন একজনকে ধরবে এবং তাকে সব কিছু বিচুøতির জন্য দুষবে; মানুষ বড় মিথ্যাকেই বিশ্বাস করবে, ছোট মিথ্যাকে নয়; এবং এই মিথ্যা বারবার বললে জনগণ অবশেষে বিশ্বাস করবেই (Never allow the public to cool off; never admit a fault or wrong; never concede that there may be some good in your opponent; never leave room for alternatives; never accept blame; concentrate on one enemy at a time and blame him for everything that goes wrong; people will believe a big lie sooner than a little one; and if you repeat it frequently enough people will, sooner or later believe it.) বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো লক্ষ করলে মনে হতে বাধ্য, সিআইএ রচিত এই সমীক্ষাকে অনুসরণ করা হচ্ছে বহু যত্ন সহকারে। তারা এ বক্তব্যের একনিষ্ঠ বাস্তবায়নকারী বলাই বাহুল্য।
সম্প্রতি মার্কিনি এক টেলিভিশন শোতে উপস্থাপক রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের ওপর দর্শকদের মতামত চাইলে একটি বক্তব্য প্রায় সবাই দেয়। তারা বলে, রাজনীতিবিদদের মিথ্যা বলার স্বাধীনতা খর্ব করতে হবে এবং এ ব্যাপারে তাদের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। তবে মজার ব্যাপার হলো, ওয়াশিংটন সুপ্রিম কোর্ট ৫ অক্টোবর ২০০৭ সালের ৫-৪ রায়ে বলে, ‘রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মিথ্যাচার করলে তারা সাংবিধানিক রক্ষা পান।’ (The Supreme Court of Washington ruled today in a 5-4 decision that candidates for political office have a constitutionally protected right to be free from prosecution for lying in their pursuit of office) বব লিবোউইটস (Bob Leibowitz) বলে এক ব্লগার ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছেন, “It should not surprise, given the state of the law, our courts and our politicians, and in fact, it actually makes sense. এটা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট যখন সরকারকে কিছু জিনিসের মূল্য নির্ধারণের জন্য রায় দিল, তখন যেমন বিভিন্ন মতামতের মানুষ কনটেমপ্ট অব কোর্টের ব্যবস্থা নিন্দা করে বিচার বিভাগের সমালোচনা করেছিল, ঠিক তারই মতো লিবোউইটজও লিখেছেন, পাইলটের লাইসেন্স বা পোস্টবক্সের জন্য বা অস্ত্র কেনার জন্য দরখাস্তে মিথ্যা বললে জেলে যেতে হয়, তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য মিথ্যা বললে তা মাপ
(So, let’s see. You can be prosecuted for lying on an application for a pilots license. You can go to jail for lying when buying a gun, or filling out the form needed to arrange a post office box. You can be fired for lying on your resume, but if politics is your career choice, it’s ‘got out of jail’ free) তবে লিবোউইটজ বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি লিখতে পারেননি। এখানে যখন রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকেন তখন মিথ্যা বললে সব মাপ। কিন্তু বিরোধী দলে থাকলে মিথ্যা না বললেও হয়ত জেলে থাকতে হতো পারে।

ফিলিপ ডোরেল বলে এক লেখক লিখেছেন, দুই শ্রেণীর মানুষ মিথ্যা বলবেই। তারা হলো রাজনীতিবিদ এবং পুরনো গাড়ি বিক্রেতা। ডোরেল বলেছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতিবিদরা শুধু মিথ্যাই বলেন না, তারা প্রয়োজনে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ অথবা সংখ্যালঘিষ্টকে লক্ষ্য করে হত্যা, হয়রানি, নির্যাতনের রাজত্বও কায়েম করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। তিনি দেখিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুরা সাধারণত ক্ষুদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার (৫১%) জন্য মিথ্যাচার করে এ জন্য যে, এই স্বল্পসংখ্যক মানুষকে খুশি রাখা সহজ। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া বিপজ্জনক হয়, কারণ সবাইকে খুশি করতে গিয়ে আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটাতে হয়। ফলে শিগগিরই ক্ষমতা বিপদগ্রস্ত হয়। এমন সরকারকে তখন বাধ্য হয়ে ছোট্ট বিরোধী গ্রুপকে হয়রানি এবং নির্যাতনের মাঝে রেখে ক্রমান্বয়ে বড় বড় মিথ্যা বলতে হয়। সে জন্য ডোরেল পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর সাংঘর্ষিক পক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন সমাজের সবচেয়ে ধনী ক্ষমতাবানরা এক দিকে, গরিব ও দুর্বলরা অন্য দিকে। ফলে বর্ণবাদিতা নানা আকারে প্রকাশ পায়।

শুধু কি রাজনীতিবিদরা মিথ্যা বলে? না, ডিক্টেটররাও মিথ্যা বলে। কারণ তারাও ক্ষমতায় থাকে ও রাজনীতি করে। তবে নির্বাচিত গণতন্ত্রীরা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জন্য ডিক্টেটরদের (স্বৈরাচার) চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ড. পল উইলিয়ামস (গ্রিফিথস বিশ্ববিদ্যালয়) অস্ট্রেলিয়ার কুরিয়ার মেইল পত্রিকায় লিখেছেন, রাজনীতিবিদরা এখন জর্জ ওয়াশিংটনের সেই সত্যবাদিতা (সত্য বলবে, ন্যায়পরায়ণ হবে, ভয় করবে না­ (Tell no lies, be just and fear not) অনুসরণ করতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে তারা আর সত্যের ভার বইতে পারে না (They can’t handle the truth) তিনি ২০০১ সালের বিখ্যাত মার্কিন ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষা উদ্ধৃতি দেন। এ সমীক্ষায় একদল প্রতিনিধিত্বমূলক মানুষের ওপর চালানো হয়। দেখা যায়, ৬০ শতাংশ প্রতি ১০ মিনিটে একটি মিথ্যা বলছে তাদের নিজেদের মাঝে কথাবার্তায়। তাই বিখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক মার্টিন জে (Best way) যুক্তি দিয়েছেন, রাজনীতিতে সত্য ভাষণ সব সময় সবচেয়ে ভালো (ইপঢ়য় াথী) পথ নয়। সেই বিখ্যাত ‘ইয়েস মিনিস্টার’ টিভি শোয়ের চরিত্রদের বিখ্যাত জনপ্রিয় উক্তির কথাই ধরা যাক। ‘তুমি সত্যবাদী হবে, না সরকারে থাকবে? দু’টির মাঝে একটিকে গ্রহণ করতে হবে। এক সাথে দু’টি সম্ভব নয়।’

মজার কথা বলেছেন উইলিয়ামস। ভোটাররা মিথ্যা কথাও মেনে নেয় যেমন ক্লিনটন ও নিক্সনের মিথ্যাচার। তবে এগুলো লুকানোর চেষ্টা তারা মেনে নিতে রাজি হয় না।

সম্ভবত এ কথা অনুসরণ করেই তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিবিদরা যখন মিথ্যা বলেন, তখন আর সে মিথ্যা থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন না। যেমন তৃতীয় বিশ্বের একজন রাজনীতিবিদ বললেন ত্রিশ লাখ লোক মারা গেছে। তিনি থ্রি মিলিয়ন এবং তিন লাখের পার্থক্য জানতেন না। সেই অসত্য থেকে আর সরে আসতে পারেননি। এসব কারণেই নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেমস অসট্রোস্কি (James Ostrowski, NewYork, Buffello) বলেছেন, ‘কোনো আশ্চর্য হওয়ার কারণ নেই। সব মূলস্রোতের রাজনীতিবিদরা মিথ্যাচার করে। রাজনীতি হলো সংগঠিত শক্তিকে সমাজে কেমন করে ব্যবহার করতে হবে। শক্তি ও বলপ্রয়োগ মূলত ঋণাত্মক। এরা ধ্বংস করে এবং কোনো ঘটনাকে ঘটতে দেয় না। কিন্তু জীবনের জন্য প্রয়োজন সম্পদ, জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সামাজিক বন্ধন।’ (No surprise there. All mainstream politicians are liars. Politics is the art of determining how organized force is to be used in society. Force is essentially a negative thing. It destroys things and prevents things from happening. Life, however, requires the production of positive_ weath, knowledge, ethical values, social bonds) । জেমস বলেছেন, সরকার একটি কাজই ভালো পারে তা হলো যুদ্ধ বাধাতে এবং সঙ্ঘাত সৃষ্টিতে। কারণ এটা সহজ কাজ। তার একটি মজার মন্তব্য হলো, রাজনীতিবিদরা মিথ্যা বলে ক্ষমতার লোভে আর ভোটাররা আকর্ষিত হয় অন্যের অর্থের লোভে (Politicians lie because they are greedy for power; voters are seduced by those lies because they are greedy for other people’s money)।

ইউনিভার্সিটি অব রোড আইল্যান্ডের অধ্যাপিকা রোজা মারিয়া পিগুরস বলেছেন, এ জন্যই ক্ষমতাসীনরা প্রায় মিথ্যা বলাটাকে সরকারি নীতি হিসেবে গ্রহণ করে যাতে নৈতিকতায় বিশ্বাসীরাও মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়। তবে একটি মজার উক্তি করেছেন চার্লস জনসন বলে একজন পত্রলেখক। তিনি বলেছেন, এখন রাজনীতিবিদরা গবেষণা করেন কোন মিথ্যা দিয়ে বিরোধী দলকে ঘায়েল করা যায়। এটা ক্ষমতায় যারা থাকেন তারাই বেশি করে থাকেন। কারণ তখন মিথ্যাকে সত্যি বলে চালানোর শক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে মিথ্যাচার থেকে রাজনীতিবিদদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই বেরিয়ে আসতে হয়। এ রচনার প্রারম্ভে দুর্নীতির কথা থাকলেও তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। মিথ্যাচারের ওপর ভর করেই দুর্নীতির জন্ম। আর মিথ্যাচারের ব্যবহার এত ব্যাপক যে তার সফল নির্ধারণ কঠিন। যেমন চার্লস জনসন লিখেছেন, অনেক সময় মিথ্যা কথাটি অনেক দিন ধরে বলতে হয়, তবেই তা সবার কাছে পৌঁছে। একজন কৌতুক করে লিখেছেন, রাজনীতিবিদরা জন্মগত মিথ্যাবাদী নয়। তারা জনগণের জন্য মিথ্যা বলেন তাদের সুখী এবং খুশি করার জন্য। তাই দুইবার ভাবুন তাদের মিথ্যাবাদী বলার আগে।

একটা কৌতুক বলি। একদা একটি বাসে মার্কিন রাজনীতিবিদরা এক আনন্দ ভ্রমণে যাচ্ছিল। বাসটি দুর্ঘটনায় পড়ে। একজন গ্রামবাসী সে বাসের মৃত ব্যক্তিদের কবর দিয়ে সিআইএকে খবর দেয়। সিআইএ এসে গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
সিআইএঃ বাসে কারা ছিল?
গ্রামবাসীঃ তাদের চিনি, তারা রাজনীতিবিদ ছিল।
সিআইএঃ তারা কি সবাই মারা গিয়েছিল তাদের কবর দেয়ার আগে?
গ্রামবাসীঃ না। কেউ কেউ বলছিল, তারা বেঁচে আছে। কিন্তু আপনারা; জানেন, রাজনীতিবিদরা মিথ্যা বলে।