ফেসবুক বলে দেবে প্রেমের গভীরতা!


ফেসবুক বলে দেবে প্রেমের গভীরতা!

ঢাকা টাইমস ডেস্ক ঢাকা: নিত্যদিনের আর পাঁচটা দরকারি কাজকম্মের মতোই ফেসবুকটিও জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এই ব্যাপারটি আর যেই হোক, তর্কবাগীশ বাঙালি কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেন না। সে আপনি ফেসবুক ব্যবহার করতে চান বা না-ই চান! কী পারে না এই ফেসবুক? প্রাত্যহিকভাবে নতুন কোনও কিছুর হদিশ দিতে পারা এই ফেসবুকে একদিকে যেমন অন্যের দেওয়ালে নাকগলানো বা ‘পোক’ করা যায়, তেমনই জোড়া লাগানো বা ফাটল ধরানোও যায় সম্পর্কে। তবে এতসব জটিলতার মাঝে হারিয়ে না গিয়ে এবার ফেসবুক থেকে জেনে নিতে পারেন আপনার প্রেমিকের সততা বা সম্পর্কের দায়বদ্ধতার কথাটিও! ভাবছেন, কী করে বুঝবেন মনের মানুষটি আপনাকে ঠকাচ্ছেন কিনা?
Facebook Love
১. ফেসবুকে তাঁর নিত্যনতুন ছবি আপলোড হয়ে থাকলেও আপনাদের জুটির ছবির কোনওটাই কি ফেসবুকের চৌকাঠ মাড়ায় না? তাহলে বরং একটু নড়েচড়ে বসুন দেখি! আর ভাবুন, কেন আপনাকে অন্যান্য বন্ধুদের কাছে দেখাতে চাইছেন না পুরুষটি। সেটা কিছুটা অতিরিক্ত অধিকারবোধের জায়গা থেকেও হতে পারে বইকি। সেক্ষেত্রে তাঁর কাছে একদিন আলতো করে পেড়েই দেখুন না কথাটা। তার পরেও তিনি অভ্যেস না বদলালে আপনার নেতিবাচক দিকটার কথা ভাবাই বোধহয় উচিত হবে। তাছাড়া নিজেতে মত্ত থাকার প্রমাণস্বরূপ আপনার প্রেমের মানুষটি যদি একটু বেশিই নিজের ছবি পোস্ট করে থাকেন, তবে শুনুন, তিনি কিন্তু নার্সিসিস্ট! মানে শুধু নিজেকেই ভালবাসেন, এমন একজন মানুষ।

২. এরই উল্টোদিকে আপনার কিম্বা আপনাদের প্রচুর ছবি যদি আপনার প্রেমিক পোস্ট করেন ফেসবুকে, তাও আবার সম্পর্কের মাস কয়েকের মধ্যেই অথবা প্রেমপ্রস্তাব স্বীকার করার মুহূর্তের মধ্যেই তিনি যদি ‘ইন আ রিলেশনশিপ’ রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেন আপনাকে- তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, সেটিও আর যাই হোক- প্রেম নয়। তাহলে? কিছুই না, আপনার বয়ফ্রেন্ড বড় ধরনের রিলেশনশিপ অ্যাডিক্ট! এবার তিনি মনেপ্রাণে কতটা চাইছেন আপনাকে, আর কতটাই বা শুধুই রিলেশনশিপের চাহিদা- ভাল করে ভেবে দেখুন।

৩. মাস কয়েকের বেশি সময় ধরেই আপনাদের প্রেমলীলা চলছে, তবুও প্রিয় পুরুষের ফেসবুকের ‘সিঙ্গল’ স্টেটাসটিকে কি আপনি পারেননি বদলাতে? তবে জানবেন মানুষটি একেবারেও সিরিয়াস নন আপনাকে নিয়ে, তিনি সেটি ইচ্ছাকৃতভাবেই রেখেছেন ‘সিঙ্গল’ করে।

৪. কারও প্রেমে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই ফেসবুকে ডুবে থাকার সময়টি কমে যায় মানুষের জীবনে। চারপাশে একটু তাকিয়ে দেখুন, কথাটার সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন। ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুককে উৎসর্গ করা সময়টি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে থাকে না ততটাই খালি। কিন্তু সম্পর্কে ঘোরতরভাবে ঢুকে যাওয়ার পরেও, আগের মতো কমিটেড লংটাইম ফেসবুক সারফিং করলে বুঝবেন, মানুষটি একেবারেই সিরিয়াস নন সম্পর্টিকে নিয়ে।

৫. অতি তুচ্ছ কারণে মনের মানুষের সব কিছুই ফেসবুকে পোস্ট করাকেও দেখতে পারেন সন্দেহের চোখে। যেমন ধরুন, তাঁর মায়ের শরীর খারাপে তিনি মর্মাহত, কিম্বা চাকরি নিয়ে বীতশ্রদ্ধ… এমন ব্যক্তিগত কথা যদি আপনাকে না জানিয়ে পুরুষটি পোস্ট করেন আগেভাগেই ফেসবুকে, তার মানে আপনার নয়, অন্য মহিলাদেরও অ্যাটেনশন চাইছেন তিনি। ভাবছেন, এবারে আপনার কী কর্তব্য? আর কিছু না, ফেসবুকে তাঁর গতিবিধি দেখে এবারে ঠাহর করে নিন বয়ফ্রেন্ডের মনের গোপন কথা। স্পষ্ট মালুম হবে, কতটাই বা আছে তাঁর কমিটমেন্ট আপনাদের সম্পর্কের জন্য!

ইন্টারনেটের আওতায় দেশের মাত্র ৫% মানুষ


ইন্টারনেটের আওতায় দেশের মাত্র ৫% মানুষ

ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৬তম।
মে ১৮, ২০১৩

জেসমিন মলি :
তথ্যপ্রবাহের অবাধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। অথচ দেশে এর বিপরীত চিত্রই দৃশ্যমান। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী দেশের ২৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। কিন্তু ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাসের চলতি বছরের প্রতিবেদন বলছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট পেনিট্রেশন বা ঘনত্বের হার ৫ শতাংশ, যা এশিয়ার মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সংখ্যার মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ। আর ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ ৫২ হাজার।
প্রসঙ্গত, সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর তথ্য নিয়ে তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাস।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্টারনেট ঘনত্বে সবচেয়ে বেশি ভুটানে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে আর তাদের ফেসবুক গ্রাহকের সংখ্যা ৪২ হাজার। ভারতে ইন্টারনেট ঘনত্বের হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ফেসবুক ব্যবহারকারী ৬২ কোটি ৭ লাখ। পাকিস্তানে ইন্টারনেট ঘনত্বের হার ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফেসবুক গ্রাহক ৭ কোটি ৯৮ লাখ। শ্রীলংকায় ১৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাপ্রাপ্ত আর ফেসবুক গ্রাহক ১ কোটি ৫১ লাখ। নেপালে ৯ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে আর ফেসবুক গ্রাহক ১৯ লাখ ৪০ হাজার।
ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে এশিয়ায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এ হার ইউরোপে ২১ দশমিক ৫, দক্ষিণ আমেরিকায় ১১ দশমিক ৪, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ১০ দশমিক ৪, আফ্রিকায় ৭, মধ্যপ্রাচ্যে ৩ দশমিক ৭ এবং ওশেনিয়ায় ১ শতাংশ। গত বছর পুরো এশিয়ায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যবহারের আওতায় ছিল, যা মোট জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বিশ্বের বাকি অংশে ছিল ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা মোট জনসংখ্যার ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। এশিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ঘনত্ব উত্সাহব্যঞ্জক হলেও বাংলাদেশে এ চিত্র হতাশাজনকই।
ফেসবুক-সংশ্লিষ্ট নানা পরিসংখ্যান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোস্যাল বেকারস বলছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪৬তম।
ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটাসের প্রতিবেদনের তথ্য ভুল বলে দাবি করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শেফায়েত হোসেন জানান, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী ইন্টারনেট ঘনত্ব ৩ থেকে ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। সে হিসাবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের চিত্র উত্সাহব্যঞ্জক। সারা দেশে অপটিক্যাল ক্যাবল ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় ও টেলিটকের থ্রিজি পুরোপুরি চালু হলে এ হার আরো বাড়বে।
ঢাকা কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এমএ হাকিম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে জানান, কোনো দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ঘনত্ব বাড়াতে হলে সে পরিমাণ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা থাকতে হয়। কিন্তু দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর সুযোগ না থাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে না। এ কারণে সরকারের নিজস্ব অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওয়াইম্যাক্স, থ্রিজির মতো প্রযুক্তিতে প্রবেশ করেছে গ্রাহক। ইন্টারনেটে কাজের সুযোগ করে নিয়েছেন অনেক ফ্রিল্যান্সার। কিন্তু অতিরিক্ত দাম ও অপর্যাপ্ত গতির কারণে তাদের কাজ ঠিকভাবে করতে পারছেন না। সরকার কয়েক দফা ব্যান্ডউইডথের দাম কমিয়েছে। কিন্তু গ্রাহকপর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন (আইএসপিএবি) অবশ্য বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের মতে, শুরুর সময় বেশি মূল্যে গ্রাহক কম গতির সংযোগ ব্যবহার করত। এখন একই মূল্যে বেশি গতির সংযোগ ব্যবহার করছে। এ কারণে এ অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন আইএসপিএবির সাবেক পরিচালক মাক্তুবুর রহমান।

– বণিক বার্তা

স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে


সামাজিক যোগাযোগ :ফেসবুকের এপিঠ-ওপিঠ

মো. আবদুল হামিদ

যুবসমাজের মাথা বিগড়ে দেয়া ‘ফেসবুক’-এর অকল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্নদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে এবং বেশ ইতিবাচক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক জরিপে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলে মনটা হালকা হয় বলে ফুরফুরে মেজাজে চলমান কাজে অধিকতর মনোযোগী হওয়া যায়। সে গবেষণায় ফেসবুকবিমুখদের মনোযোগের লেভেল ব্যবহারকারীদের তুলনায় কম বলেও প্রতীয়মান হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতে, ফেসবুক তাদের আত্মবিশ্বাসের লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে। কানেক্টিভিটির এ যুগে দীর্ঘ সময় নিকটজনের খোঁজখবর না পেলে বা নিজে কোথায়, কী করছে তা ঘনিষ্ঠজনদের জানাতে না পারলে কেমন যেন অস্বস্তি কিংবা উদ্বিগ্নতা কাজ করে। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য হলেও একবার ঢুঁ মারতে পারলে অনেকটা সময় নিশ্চিন্ত মনে কাজে ডুব দেয়া যায়। ফেসবুক বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সোস্যাল নেটওয়ার্ক। কে জানত পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের জন্য জাকারবার্গ যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন (২০০৪ সালে নিজেরা শুরু করলেও উন্মুক্ত হয় ২০০৬ সালে) তা মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সম্প্রসারণশীল সাইটে পরিণত হবে! কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করে ২৫ কোটির বেশি ইউজার, যাদের গড়ে ১৩০ জনের বেশি বন্ধু রয়েছে এবং মাসে ৭০ হাজার কোটি মিনিটের বেশি ফেসবুক ব্যবহার হয়। মোট ব্যবহারের ৭০ শতাংশ নন-আমেরিকান এবং পর্নো পেজ ও গ্রুপগুলো ভিজিট হয় সবচেয়ে বেশি। আইফোন ও অন্যান্য সেল ফোনে ইন্টারনেট চালু হওয়ায় ফেসবুক ব্যবহারের প্রবণতা গোটা বিশ্বেই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুরু থেকেই ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ, উন্নত দেশগুলোয় যা কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাজ্যে অন্য এক স্টাডিতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের (২১ থেকে ২৯ বছর বয়সী) পাশাপাশি মানসিক চিকিত্সায় নিয়োজিত কিছু বিশেষজ্ঞের মতামতও নেয়া হয়েছে। অধিকাংশের মতে, পরিমিত মাত্রায় ফেসবুকের ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। কোনো স্ট্যাটাস দেখে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠা, ভালো লাগা এমনকি সাময়িক কষ্ট পাওয়া মস্তিষ্ককে সচল করে এবং আগের তুলনায় বেশি কনসেনট্রেট করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় এক জরিপে দেখা যায়, যারা বাস্তব জীবনে সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখতে কম দক্ষ, তারাও ফেসবুকে সফলভাবে যোগাযোগ করতে পারেন। অর্থাত্ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা যারা ঘরকুনো বলে অবহেলিত তারাও অন্যদের মতো এ মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষায় সক্ষম। তবে সবচেয়ে ভালো দিক হলো বন্ধুরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাক (এমনকি স্থান বদলের পরও), যোগাযোগের ঠিকানা জানতে বা পরিবর্তন করতে হয় না। এক ক্লিকেই তথ্য, ছবি, ভিডিও সব পাওয়া যায় এবং প্রায় বিনা খরচে। তবে সুফলের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রযুক্তির অপব্যবহারের শঙ্কাও বাড়ছে; যেমন— আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সেদিন শিক্ষকের লেকচার ভালো লাগছিল না বলে ক্লাসরুমে বসেই ফেসবুকে এ সম্পর্কে স্ট্যাটাস দেয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা তার জবাবে নানা ধরনের প্রতিমন্তব্য করে, যার শেষটা মোটেই সুখকর ছিল না। কয়েক মাস আগে জাবি ও বুয়েটের দুই শিক্ষককে আদালত তলব করেন স্ট্যাটাস ও কমেন্ট লেখার কারণে। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে।
হতাশ হওয়ার মতো অনেক তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ২০০৯ সালে যত বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে তার ২০ শতাংশই ছিল সরাসরি ফেসবুকজনিত কারণে। অর্থাত্ স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ফলো করত, তারপর পাসওয়ার্ড নিয়ে নজরদারি; একপর্যায়ে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে এবং কোর্টের মাধ্যমে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তারা। অনেক দেশে এটাকে অ্যালকোহল বা কোকেনের মতোই ভয়াবহ মনে করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য যেমন শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে একটানা বেশি সময় ফেসবুক ব্যবহার তেমনি ক্ষতিকর। শরীরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, ঘাড় বা পিঠে ব্যথা, হাতের ও হাঁটুর গিটগুলোয় ব্যথা অনুভব করা, মাথা ধরে থাকা প্রভৃতি উপসর্গ প্রায়ই লক্ষ করা যায়। তা ছাড়া খাবার খেতে অনিয়ম করা ফেসবুক অ্যাডিক্টদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তারা ফাস্টফুড ও শুকনাজাতীয় খাবারে বেশি আগ্রহী হয়, যা সুষম খাদ্য সরবরাহ করে না এবং শরীরচর্চা না করায় মোটা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ক্রিকেট খেলার বিরোধিতা করেছিল এ যুক্তিতে যে খেলোয়াড়, আয়োজক, দর্শক সবারই দিনের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয় খেলার পেছনে; ফলে তারা কাজ করবে কখন? সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক ব্যবহারে কত শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয় তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সে কারণেই হয়তো চীন ও ইরানের মতো দেশগুলো এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এক গবেষণা সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। তারা যদি দিনে গড়ে ১০ মিনিট করে ফেসবুক ব্যবহার করে, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার কর্মচারীর এক মাসের শ্রমঘণ্টার চেয়েও বেশি পণ্ডশ্রম হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের মতো গরিব দেশে!
ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকার অধিকাংশই বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে অথবা গত কয়েক বছরে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। ফলে তরুণদের ফেসবুক ব্যবহার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার বেশ সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের উল্লেখ মনে হয় প্রাসঙ্গিক হবে, মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ঐশ্বরিয়া রাইকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ধরা যাক তার সামনে দুটি অপশন আছে: কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ হওয়া অথবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা— আধুনিক তরুণী হিসেবে সে কোনটাকে বেছে নেবে এবং কেন? ঐশ্বরিয়া বেছে নিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষা; কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এটি জানা থাকলে কম্পিউটার শেখাটা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষা ভাষার মান বাড়াতে পারবে না। তা ছাড়া অনেক পেশা আছে, যেখানে কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ না হয়েও ভালো ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব। হলভর্তি দর্শক জোরে হাততালি দিয়ে তার জবাবকে সমর্থন করেছিলেন, আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম তাত্ক্ষণিক ওই কথায়। কয়েক বছর আগে যখন তরুণদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন খুব আশাবাদী হয়েছিলাম যে, এ অসিলায় অন্তত আমাদের তরুণরা ইংরেজি ভাষাটা ভালোভাবে রপ্ত করবে। কিন্তু ভয়ঙ্কর কিছু ব্যাপার তারা ফেসবুক ভাষায় ব্যবহার করছে, যা তাদের অধঃপতনই ত্বরান্বিত করছে; কল্যাণ নয়। একটি হলো ইংরেজি অক্ষরের মাধ্যমে বাংলা লেখা। এতে আগে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে সে যা বলতে চাইছে তার ইংরেজি শব্দটা বা বাক্যটা জানার চেষ্টা করত এখন তার প্রয়োজন শেষ হয়েছে। ফলে নতুন কোনো ইংরেজি শব্দ না শিখেও তারা অনায়াসে মেসেজ পাঠাচ্ছে, মন্তব্য করছে। আরেকটি বিষয় হলো, তারা বড় ও জটিল শব্দগুলোকে সংক্ষিপ্ত করছে। বড় শব্দকে ছোট লিখতে গিয়ে তারা প্রকৃত বানানটা ভুলে যাচ্ছে। অনেকেই যখন বানান নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়, তখন মাঝের দু-তিনটা অক্ষর বাদ দিয়ে শব্দটা লেখে। তাতে সঠিক বানান না জানার দুর্বলতাও গোপন করা যায়; আবার স্মার্টনেসও দেখানো হয়। এর কুপ্রভাব সাম্প্রতিক কালে পরীক্ষার উত্তরপত্রেও লক্ষ করা যাচ্ছে, বানান ভুলের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। সংক্ষেপ হলেই স্মার্ট হয়— এ ভয়াবহ ধারণাটি আমাদের তরুণদের এখানেও আক্রান্ত করেছে। উন্নত দেশের যে মেয়েটি মিনি স্কার্ট পরে সে কিন্তু ক্লাসরুমেও অল্প কথায় মূল মেসেজটি সবার সামনে তুলে ধরতে পারে। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাদের পোশাকের ঢঙটাই নকল করতে চেষ্টা করে, জ্ঞানের উত্কর্ষতা নয়।
ক্যারিয়ার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ থাকায় চেষ্টা করি এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে। আমাদের তরুণরা হয়তো এখনো ভাবতে শুরু করেনি, তার ফেসবুক প্রোফাইল ও স্ট্যাটাস চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধক হতে পারে। ইউরোপের বিখ্যাত একটি ফাইভ স্টার হোটেল চেইনের হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের প্রধান সেদিন জানালেন, সিভিতে প্রদত্ত ই-মেইল আইডি ব্যবহার করে ফেসবুক ও অন্যান্য সোস্যাল নেটওয়ার্কে চাকরিপ্রার্থীর অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করেন। সিভিতে যেসব দিক উল্লেখ থাকে, প্রার্থী বাস্তব জীবনে তার কতটা চর্চা করেন— তা বুঝতে চেষ্টা করেন! প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনেকের অ্যাকাউন্ট তাদের বন্ধু ছাড়া কেউ দেখতে পারে না, সে ক্ষেত্রে কীভাবে দেখেন? তিনি বলেন, বড় বিজ্ঞাপনদাতা হওয়ায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্টগুলোয় ঢুকতে পারেন। সেখানে বিশেষভাবে খেয়াল করেন প্রার্থী ফেসবুকে আসক্ত কি না। তা ছাড়া সে কী ধরনের স্ট্যাটাস দেয়, তার বন্ধুদের তালিকায় থাকা অধিকাংশ লোক কোন প্রকৃতির, দিনের কোন অংশে পোস্ট দেয়ার প্রবণতা কেমন, কমেন্টগুলো কতটা বুদ্ধিদীপ্ত প্রভৃতি। ফলে স্ট্যাটাস লেখার সময় সতর্ক হতে হবে। কারও কমেন্টের একটি বাক্যে তিনটি ভুল (বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যের গঠন) যখন চোখে পড়ে, তখন তার বিদ্যার দৌড় সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাস্তব একটি ঘটনা বলে শেষ করতে চাই। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত এক ভদ্রলোক অসুস্থতার অজুহাতে অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি ম্যানেজ করেন। বাসায় ফিরেই ফেসবুকে লিখলেন, ‘ওহ কী শান্তি…!’ পরবর্তী সময়ে দিনে কয়েকবার করে স্ট্যাটাস আপডেট দেন, যার প্রতিটিই ছিল হাসি-আনন্দসম্পর্কিত এবং ছুটিকালীন শরীর খারাপ, হাসপাতাল, চিকিত্সা, চিকিত্সক নিয়ে একটি স্ট্যাটাসও ছিল না। এমনকি ফ্যামিলি নিয়ে যেসব স্থানে ঘুরতে গেছেন তার ছবিও আপলোড করেছেন। তিনি খেয়ালই করেননি যে, তার কলিগ ও বস ফেসবুকের বন্ধু হিসেবে সব দেখছেন। ছুটিশেষে যেদিন কর্মক্ষেত্রে ফিরলেন সেদিন তাকে বলা হলো, যারা ব্যক্তিজীবনে অসত্ এবং অফিসের কাজ উপভোগ করেন না. তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ফলে অফুরন্ত শান্তির জন্য আপনাকে চাকরি থেকে বিদায় দেয়া হলো! তাই সাবধান। বস, সহকর্মী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী সবাই কিন্তু আপনাকে দেখছে ফেসবুকের জানালা দিয়ে। আর সোস্যাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে গিয়ে নিজে যেন ছোট্ট স্ক্রিনে বন্দি হয়ে না যান। তাহলে সবার সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বাড়লেও পরিবার ও চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়বে, যা আদৌ কল্যাণকর নয়।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক
mahamud.biz@gmail.com

http://www.bonikbarta.com/2012-05-04/news/details/30351.html
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls