বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?


বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?
মোহাম্মদ শাহজাহান

Published: 2010-10-23

ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক জ্যাম

Traffic JAM in Dhaka


বেশ ক’বছর আগের ঘটনা। ঢাকার রাস্তাঘাটের চালচিত্রের উপর একটি টিভি প্রতিবেদনের রিপোর্ট দেখছিলাম। রিপোর্টার জনৈক রিকশাওয়ালাকে তিনি কেন ট্রাফিক নিয়ম ভেঙ্গে বেপরোয়া গতিতে তার রিক্সা চালিয়ে নিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন করলে, রিক্সাওয়ালা মহোদয় বুক চিতিয়ে দুর্বিনীত ভংগীতে তাকে যে জবাবটি দিয়েছিলো, তার সে জবাবেরই অংশ উপরে উদ্বৃত এ লেখাটির শিরোনাম।

বাংলাদেশে কে নিয়ম মেনে চলে? একটি অতি স্বাভাবিক কিন্তু পীড়াদায়ক প্রশ্ন বটে। এক কথায় এর জবাব হতে পারে, না, কেউই এখানে নিয়ম মেনে চলেনা। কারণ নিয়ম ভাংগাটাই যেন এখন এখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো বিশদভাবে বললে বলতে হয়, নিয়ম কানুন যা আছে বাংলাদেশে সব কিতাব আছে, বাস্তবে ঐসব নিয়ম পালনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়ও পরিলক্ষিত হয়না।

রিক্সাচালকের উপরোক্ত বাক্যের মাধ্যমে আমাদের দেশের বর্তমান সমাজের একটি অতি সত্য কিন্তু তিক্ততম অবস্থার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। সোজা কথায় বলতে হয় সমাজের একেবারে উপরতলা হতে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নিয়মনীতি ভাংগার এ প্রতিযোগিতা চলছে, অবিরাম গতিতে। আর সেকারণেই একজন রিক্সাচালক হয়েও লোকটি অত্যন্ত নির্বিকার ও দৃঢ় ভংগীতে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছে। রিক্সাচালক হয়েও দেশের ভেঙ্গে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তার এ প্রতীতি জম্মেছে যে তার এমন অপ্রিয় সত্য ভাষন শুনে কেউ একথা বলবেনা, ‘বলে কি লোকটা, চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’। প্রকৃতপক্ষে তার এই অপ্রিয় সত্য ও বেপরোয়া মন্তব্যের মাঝেই প্রোথিত আছে, আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এবং ধ্বসে পড়া রাজনৈতিক অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় নিয়ম কেন ভাঙ্গা হয়, নিয়ম ভাঙ্গার সাহস কোথা থেকে আসে, তখন এর জবাবে বলা যায়, ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা, স্বার্থপরতা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ এবং লালসা চরিতার্থ করার বাসনা হতে, সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পরকাল ও সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়ডরের অভাবেই সাধারণতঃ মানুষ নিয়ম ভাংগে, নিয়ম ভেংগে অবৈধ উপায়ে অপরের স্বার্থের হানি ঘটিয়ে বিভিন্ন সুবিধাদি হাতিয়ে নেয়। ছোট ছোট নিয়ম বা আইন ভাংতে ভাংতে একদিন সে অতি বড় ক্রিমিনাল (গডফাদার) হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার ভয়ে কম্পমান থাকে এলাকার জনগন। সরকারের আইন কানুনের ভয়ের চাইতেও বেশী প্রভাবশালী ও ক্ষমতাময় প্রভাব বিস্তার করে এসব গডফাদারগন নিজ নিজ এলাকায়। এ মহাযজ্ঞে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে চলে আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক পটভূমি, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী-উপদেষ্টা কর্তৃক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্বন্ধে অসত্য ও বিরূপ মন্তব্য করে অন্যায়কারীদেরকে আস্কারা দেয়া, ভগ্নপ্রায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ইত্যাদি। আজ যারা সমাজের উচ্চাসনে বসে আছেন, অলংকৃত করে আছেন দেশের বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদ, অথবা বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি, তাঁরা কেউই (হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া) দেশের পবিত্র সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি ভাংগার ক্ষেত্রে অপর কারো থেকে পিছেয়ে নেই।

নিয়ম ভাংগার এ ম্যারাথন দৌড়ে সবাই চায় তার সামনের ব্যক্তিটিকে কিভাবে ল্যাং মেরে পিছিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে তার প্রতিবেশীকে টাকা পয়সায়, অর্থ-সম্পদে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে, দৈনন্দিন আদান প্রদানে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে এমন ক্ষমতাধর হওয়া যায় যে, সমাজের অন্য সবাইকে তার পেছনে জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর বোল বলিয়ে নিজেকে একজন কেউকেটা জাতীয় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। নিয়ম ভাংগার এই দৌড়ে তার দ্বারা সমাজে কি কি সব অনাচার ও অপরাধ ছড়াচ্ছে,বা দেশ ও জাতির জন্য তা কি ভয়াবহ পরিনাম ডেকে আনছে, তা সে ভাবতেও চায়না, বরং সত্যি কথা বলতে কি, দেশের চাইতেও সে এখানে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে। তার এই স্বার্থপর নীতি চরিতার্থ করার পথে সে যাকেই পাবে তাকেই কুচলে দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাঁধবেনা, হোক না সে আপন রক্ত সম্পর্কেরই কেউ, নিজের মায়ের পেটের ভাই, স্বামী (মহিলার ক্ষেত্রে), কিংবা স্বয়ং তার জম্মদাতা অথবা জম্মদাত্রী মা।

যারা শুধুমাত্র নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য, নিজের ভবিষ্যৎ আরাম আয়েশের পথ সুগম করার লক্ষ্যে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে, এবং অন্যদিকে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বে অবহেলা করে সরকার তথা দেশের জনগনের অর্থ এবং সম্পত্তির সীমাহীন অপচয় করে চলে, তারা কোনভাবেই রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের বড় বড় পদ দখল করে রাখার যোগ্য হতে পারেনা। বরং তাদের স্থান হওয়া উচিৎ পুরান ঢাকার লোহার গেট দেয়া লাল ইটের তৈরী বড় দালান। তাদের প্রথম অপরাধ, তারা জনগনের খেদমতের প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় বসে জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয়। তাদের দ্বিতীয় অপরাধ, তারা অসৎ উপায়ে দেশের খেটে খাওয়া জনগনের ট্যাক্সে গঠিত সরকারের তহবিল তসরূপ করে দেশকে আরো গরীব হবার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, এবং তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তারা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও অসৎ পন্থা অবলম্বন করেন বলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য সব কর্মচারীগনও অনিয়মের গলিঘুপচিতে চলতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তাদের বসদের পদাংক অনুসরণ করে গোটা সিস্টেম এর মধ্যেই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, এবং অসততার সয়লাব ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে দিয়ে, দেশের সার্বিক প্রশাসন ব্যবস্থাকে একেবারে পংগু করে ছাড়ে।

এটাতো একটি সহজ সরল বিষয় যে, কোন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা যদি নিজে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত হন, তবে ক্রমে ক্রমে তার অধীনস্থ সব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাই ঘুষ খাওয়াটাকে জায়েজ মনে করে নির্বিবাদে সে অপকর্মটিকে নিজেদের দৈনন্দিন অফিসিয়াল কর্মসূচীর একটি অংগ বানিয়ে নিবে। ঠিক যেমন একজন পিতা যদি নিজে নামাজী না হন তাহলে তার সন্তান সন্ততি কেউই নামাজী হতে পারেনা। দু’টি ক্ষেত্রেই পরবর্তীদের চাইতে পূর্ববর্তীদের পাপ দ্বিগুন হবে, কারণ প্রথমতঃ বড় হিসাবে তাদের দায়িত্ব ছিল অন্যায় অনিয়মকে প্রশ্রয় না দেয়া, কোথাও কোন অন্যায় ঘটতে দেখলে তা রোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া। তাতো তিনি করেনই নি, বরং উল্টো নিজেই অনিয়মের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছেন, এবং এভাবে তার অধীনস্থদেরও এর প্রতি আহবান করেছেন। ফলে তারাও তাকে অনুসরণ করেছে। ফলশ্রুতিতে নিজের পাপের বোঝা যেমন তাঁরা কাঁধে নিচ্ছেন তেমনি অপরের করা পাপেরও সমান অংশীদার হচ্ছেন। পবিত্র হাদিস শরীফেও আছে, মানুষের একাধারে করতে থাকা ছোট ছোট অন্যায় বা ভূলগুলোই ক্রমান্বয়ে তাকে বড় অন্যায়ের প্রতি টেনে নিয়ে যায়। আর তার দ্বারা সংঘটিত অন্যায় কাজ তার উত্তরসূরীদের মাঝে সংক্রমনে যেহেতু তারই অবদান বেশী, তাই পরবর্তিদের অন্যায় কর্মের পাপের বোঝা অন্যায়কারীর সাথে সাথে তাদের উপরও সমান ভাবে বর্তাবে।

রিক্সাওয়ালার উচ্চারিত সে কথাটুকুতে ফিরে যাই। একমাত্র ট্রাফিক নিয়মকানুন ভাংগার ক্ষেত্রেই যদি একটু তীক্ষ্ণ নজর দেয়া যায় তো দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নিয়ম ভাংগার ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতে নিয়েছে। দূর্নীতিতে বিশ্বসেরা হওয়ার রেকর্ড তো কাগজে কলমে বেশ কয়েকবারই হতভাগা এ দেশের কপালে জুটেছে। ৫/৬ বছর পুরনো এক সমীক্ষা মতে ঢাকা শহরে প্রায় চার লক্ষ রিকশার কোন বৈধ লাইসেন্সই নেই। এভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্যান্য যানবাহনেরও বহু সংখ্যকের বৈধ লাইসেন্স ও জরুরী কাগজপত্রে ভীষন ঘাটতি রয়েছে। কাগজপত্র থাকলেও সেসব কতটুকু খাঁটিঁ সে ব্যাপারটিও আবার বিবেচনার দাবী রাখে। অসহ্য ট্রাফিক জ্যামের কারণে বাসে করে মিরপুর হতে গুলিস্তানের দূরত্ব পাড়ি দিতে আপনার কম পক্ষে দেড় থেকে দু’ ঘন্টা সময় লাগবেই। অথচ জ্যামবিহীন রাস্তায় এ দূরত্ব অতিক্রম করতে আধা ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা নয়। আবার নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে এ দেড় দু’ ঘন্টা সময়ে একজন বাসযাত্রীকে কি কি ভোগান্তির সম্মূখীন হতে হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নীচে দেয়া গেলঃ

বাস, কার বা সি.এন.জি-গুলোর যথাস্থানে না দাঁড়িয়ে প্রায় সিকি কি.মি. জুড়ে এলোমেলোভাবে দাঁড়ানো, সি.এন.জি/ট্যাক্সি ক্যাবগুলো মিটার ব্যবহার না করা ও মিটারের চাইতে দ্বিগুন-তিনগুন ভাড়া হাঁকা, ট্রাফিক রুলের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গাড়ী চালানো, সামনের গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে মারাত্মক সব দুর্ঘটনার জম্ম দেয়া (কদিন আগের সাভারের আমিনবাজারের দুর্ঘটনাটি ছিল এ ওভারটেকেরই করুণ পরিণতি), নির্দিষ্ট স্টপেজে না দাঁড়িয়ে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, বিরতিহীন লেবেল এঁটে দিয়ে যাত্রীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে প্রায় সবক্ষেত্রেই সবিরাম গাড়ি চালানো, অফ-পিক আওয়ারে স্টপেজগুলোতে দু’মিনিটের বিরতিস্থলে দশ-পনের মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ানো, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বাস চালানো, পুরুষ যাত্রী কিংবা বাস চালক নির্বিশেষে মহিলা সীটের প্রতি কোন সম্মান না দেখিয়ে, নারী-পুরুষের ঠেলাঠেলিতে আর গাদাগাদিতে গাড়ীতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, কোন স্টপে যাত্রীদের অবতরন শেষ না হতেই গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দেয়া যাতে করে নারী ও শিশু যাত্রীরা অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়, মা-বোনদের হাত ধরে হেলপারদের অযথা টানাহেঁচড়া করার অশোভনীয় দৃশ্য।

আরো আছ। মটরযানের সাথে পাল্লা দিয়ে রিক্সাগুলোর মাঝরাস্তা বরাবর অথবা রাস্তার প্রায় সবটুকুই দখল করে চলাচল করা, যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরকেই দু’কথা শুনিয়ে দেয়া, কে কার আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সিগন্যালের মোড়ে চতুমূর্খী রিক্সা, বাস ও কারের জট পাকিয়ে দিয়ে ত্রাহি মধূসুদন অবস্থার সৃষ্টি, আর কতো বলবো? একবিংশ শতাব্দিতে এসেও ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে এখনো মান্ধাতা আমলেরই প্রতিনিধিত্ব করে চলছে, সে ব্যাপারটি দেখার ও যেন কেউ নেই। রাস্তাঘাটের হতদরিদ্র অবস্থার কথা এখানে আর বলছিনা, মনে হয় সময় এসেছে, নাগরিকদের নাগরিক সুবিধার অবর্তমানে সরকারকে ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করার জোর প্রচারণা চালানোর। সেদিন বেশী দূর নয়।

মহানগরীর রাজপথে চলাকালীন যাত্রীসাধারণের দূর্ভোগের একটি খন্ডচিত্র আমি আমার স্বল্পজ্ঞানের পরিধিতে সবার জন্য তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ফিরিস্তিখানা আর বেশী দীর্ঘ করে ট্রাফিকের যন্ত্রনায় এমনিতেই কাতর নগরবাসীর মনের জ্বালা আর বাড়াতে চাইনা। ‘কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে’, জনৈক রিক্সাচালকের এ উক্তির সূত্র ধরে আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের আরো কিছু অনিয়ম তথা নিয়ম ভাংগার ইতিকথা সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের সাথে সমভাবে ভাগাভাগি করে নেয়ার ইচ্ছা রেখে শেষ করছি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা


অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা

আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক
০০ জাকিরুল ইসলাম

মহামন্দার ধাক্কায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে ধরাশায়ী সেখানে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগাণ্ডায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার ২ শতাংশ যা তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়েও বেশি। চলতি এবং আগামী ২০১১ সালে এ হার আরো বেশি হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতি বিশেস্নষকরা। আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক। এমনকি ব্রাজিল, রাশিয়া, মেক্সিকো ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর চেয়েও বর্ধিত অংকের।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফ যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে তা হলো মাথাপিছু আয়। দেখা গেছে, আফ্রিকানদের মাথাপিছু গড় আয় ভারতীয়দের চেয়ে বেশি। আফ্রিকা ডজনখানেক দেশে জাতীয় মাথাপিছু গড় আয় চীনের চেয়েও বেশি। আরো আশ্চর্যের বিষয় আফ্রিকার দেশগুলোতে লোভনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেই তেল ও হীরার মতো কাঁচামালের বিকিকিনি। গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে জিডিপি অর্জিত হয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মূলে ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের পণ্য উৎপাদন এবং সেবাখাত।

গত বছর বিশ্বজুড়ে মহামন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছে এশিয়ার দুই দেশ চীন ও ভারত কিন্তু আফ্রিকার কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে অর্জিত হলেও তা থেকে গেছে সবার অগোচরে। দুনর্ীতির রাহুগ্রাস সত্ত্বেও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব আর তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। তাই কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সংশোধিত রিপোর্ট যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করার মতো। রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রেট লেকের পাশর্্ববতর্ী বিশেষ করে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় এমনকি হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার সৃঙ্গ) নামে পরিচিত খরাপীড়িত অঞ্চলে তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এদেশের অর্জিত প্রবৃদ্ধি এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ চীন ও ভারতকেও চমকে দিয়েছে।

আইএমএফ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী তাতে আফ্রিকার একশ কোটির মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতিমধ্যে পেঁৗছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। অবাক করার মতো বিষয়, মধ্য আয়ের শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এমন লোকের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক, ট্যাক্সিচালক, গৃহপরিচারিকা এমনকি রাস্তার ধারে অস্থায়ী অবকাঠামোতে বসে ব্যবসা করে এমন ক্ষুদে দোকানীর সংখ্যাও অনেক।

আফ্রিকা রাইজিং গ্রন্থের লেখক বিজয় মাজাবান তার ব্যাখ্যায় উলেস্নখ করেছেন, দুনর্ীতি ও অপশাসনের জন্য বদনাম থাকলেও তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আফ্রিকায় ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব। আর তার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। ফলে কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘আফ্রিকা ইনফ্রাস্টাকচার কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে আফ্রিকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশ। তাছাড়া এয়ারলাইন্স ও স্থলপথে পণ্য পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ার বাজারে ছাড়ায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে সংশিস্নষ্ট খাতগুলোতে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে চীনে এবং ভারতে। আরো একটি বিষয় উলেস্নখ্য ঐ সমীক্ষায় বলা হয়েছে বুরুন্ডি ও মালাউয়ে দক্ষ জনশক্তির বড়ই অভাব। তবে ঘানা, বোতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা ভিন্ন। উলিস্নখিত দেশ তিনটিতেই শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েকটি রিপোর্টে এ ব্যাপারে মিলেছে অভূতপূর্ব তথ্য। জানা গেছে, শুধু গত বছরই বিদেশে শিক্ষা সমাপনী শেষে নাইজেরিয়ায় ফিরেছে ১০ হাজার দক্ষ ভোক্তাজীবী। এঙ্গোলায় প্রতি বছর ফিরছে উলেস্নখযোগ্য দক্ষ পেশাজীবী, যারা দেশে ফিরে স্থানীয় শ্রমবাজারে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। এসব পারিপাশ্বর্িক অবস্থায় বিশ্বের কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভারতের পরই দক্ষ জনশক্তির অঞ্চল হবে আফ্রিকার দেশগুলো। যার পথ বেয়ে দ্রুতই আরো বিকশিত হবে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্টে বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে।

কেননা তার রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৯৫৪টি আফ্রিকান কোম্পানী অর্জিত মুনাফা গড়ে ১১ শতাংশ। একই সময়ে সমান সংখ্যক চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশীয় কোম্পানীর চেয়ে যা বেশি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এশিয়ার তুলনায় সহজলভ্য ও কম খরচে শ্রমিক নিয়োগ। এর মধ্যে আফ্রিকান মোবাইল অপারেটরদের মুনাফার হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে ইউনিলিভার, নেসলে ও সুইসপোর্ট ইন্টারন্যাশনালের মতো বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর মুনাফার পরিমাণও ঈর্ষণীয়। তাই ২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ কমে গেলেও আফ্রিকায় এ চিত্র উল্টো। ঐ বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে বরং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। অর্থের অংকে যা ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ১৯০ কোটি) ডলার। সর্বশেষ শিল্প ও বাণিজ্য বান্ধব আফ্রিকা দুনর্ীতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

মানসিক রোগীর সংখ্যা দেশে ১৬ শতাংশ : পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী


দেশে ১৬ শতাংশ লোক মানসিক রোগী ঢাবিতে গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে মানসিক রোগী

mental health in bangladesh

০০ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের ৬০ ভাগ লোক বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে ১৬ দশমিক ১ ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোক এবং ১৮ দশমিক ৩৫ ভাগ শিশু-কিশোর মানসিক রোগ ও সমস্যায় ভুগছে। এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য দেশে মাত্র ১২৩জন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন। এছাড়া, ৩২জন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও ১০১জন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রয়েছেন।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি (বিসিপিএস) এবং ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনব্যাপী গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব তথ্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরো বলেন, দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং এবং সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কের জন্য কোন প্রশিক্ষণ কোর্স নেই। বাংলাদেশে মানসিক রোগ বিষয়ে অজ্ঞতা ও কু-সংস্কার এবং মানসিক রোগীর প্রতি অবহেলা সর্বত্র বিদ্যমান। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে সর্বত্র সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো: গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো: জহির উদ্দিন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠন সম্ভব নয়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করে পরিবারের শান্তি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রত্যেক স্কুলে একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগের চিন্তা করছে।

ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাই সামাজিক সহিংসতা, দুর্নীতি, ইভটিজিং, প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এসব লোককে সুস্থ করে সুন্দর জাতি গঠন করা সম্ভব।

উলেস্নখ্য, দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় গোলটেবিল আলোচনা, কর্মশালা ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন মানসিক অবস্থা পরিমাপের সুযোগ রয়েছে।

দেশে মানসিক রোগী দেড় কোটি!

Sunday, 29 August 2010 সোলায়মান তুষার:

দেশে পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী। বিপুল সংখ্যক মানুষ সমস্যায় থাকলেও তাদের চিকিৎসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত একমাত্র হাসপাতালটি মানসিক রোগীর ভারে নতজানু। তাতেও নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কয়েকটি সংস্থার জরিপে দেশে পরিণত বয়সের এক কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন মানুষ মানসিক রোগে ভোগছেন।

এরমধ্যে গুরুতর অর্থাৎ একেবারে পাগল ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৮ জন। এছাড়া উদ্বেগজনক জটিলতায় ভোগছেন ৮৩ লাখ ৫ হাজার ৩৭০ জন। বিষণ্নতায় ভোগছেন ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৯ জন। মাদকাসক্ত পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাগুলো যৌথভাবে দেশের ১৮ বয়সের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষের ওপর জরিপ করে। জরিপ অনুযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ১৬.১ ভাগ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে উদ্বেগজনিত ৮.৪ ভাগ, বিষণ্নতায় ৪.৬ ভাগ, গুরুতর মানসিক সমস্যায় ১.১ ভাগ ও মাদকাসক্ত রোগে ভোগছেন ০.৬ ভাগ মানুষ।

জাতিসংঘের ২০০৯ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৯০ লাখ। উইকিপিডিয়ায় ‘ডেমোগ্রাফিক অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখা থেকে জানা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের লোকের সংখ্যা মোট নয় কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ চার কোটি ৭৮ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৪ জন। মহিলা চার কোটি ৫৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৪ জন। যা মোট জনসংখ্যার ৬১ ভাগ। আর ৬৫ বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ১৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। আর মহিলা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৫ জন। যা মোট জনসংখ্যার চার ভাগ। জন্মের পর থেকে ১৪ বছর বয়সের লোকজন মোট জনসংখ্যার ৩৪.৬ ভাগ। জরিপে এ সংখ্যা ধরা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ লোকের চিকিৎসার জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ রোগীর জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক কর্মরত। এরমধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত ১১৫ জন। যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০৭ ভাগ। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট রয়েছে একটি। তাতে ১৫০টি শয্যা রয়েছে। মানসিক হাসপাতাল রয়েছে একটি। তাতে পাঁচশ’ শয্যা রয়েছে। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মাত্র ০.৪ ভাগ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্তবিভাগ রয়েছে ৩১টি। তাতে ৮১৩টি শয্যা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভাগ রয়েছে একটি। তাতে ২০টি শয্যা রয়েছে। সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক রয়েছে দুটি। মাদকাসক্তি বিষয়ে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে চারটি ও বেসরকারি ১৬৪টি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারি ব্যয় স্বাস্থ্য বাজেটের ০.৪৪ ভাগ।

মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষ বিচিত্র ধরনের সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে ৪৪টি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। ১০ থেকে ১২টি সমস্যা গুরুতর। যেসব সমস্যা মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, এডজাস্টমেন্ট সমস্যা, সম্পর্কগত সমস্যা, অহেতুক ভয়, বিশ্বাসের অভাব, মনোযোগের সমস্যা, মনোগত সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মেহজাবিন হক বলেন, মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার পর যত্ন নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার দিক দিয়ে আমরা খুবই পিছিয়ে আছি। তিনি বলেন, সমপ্রতি যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তা একপ্রকার মানসিক রোগ থেকেই হয়েছে।

মানুষের বিকৃত রুচির দিকে প্রবণতা বাড়ছে। এটা একটা সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি তাতে কারও সুস্থ থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, আমাদের হাজারও রকম সমস্যা রয়েছে। এসবের সঙ্গে মানসিক সমস্যা যোগ দিয়ে আরও প্রবল আকার ধারণ করেছে। সমপ্রতি যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তাতে এটাই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র পরামর্শক সালেহ সিদ্দিকী বলেন, অনেক ধরনের রোগী রয়েছে। তিনি বলেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সমস্যা আরও বাড়ছে। মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হচ্ছে। এরফলে প্রায় প্রত্যেকের মধ্যে একপ্রকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি দেশে সমপ্রতি যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে তা মানসিক সমস্যার জন্যই।

বিশেষ প্রতিবেদন
দীর্ঘস্থায়ী রোগ মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে

দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, হূদরোগ বা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হলে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ একপর্যায়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুরারোগ্য বা প্রাণঘাতী জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের হতাশা দূর করার দায়িত্ব একাধারে চিকিৎসক, পরিবার ও সমাজের। কিন্তু দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতা ও ব্যবস্থা কোনোটিই নেই বললেই চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর বিশ্বের ৬০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ। সময়ের পরিবর্তনে জীবনাচরণসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশেও এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। রোগের গতিপ্রকৃতি, বিছানায় পড়ে থাকা, চিকিৎসার ব্যয়ভার, দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা—এসবের কথা ভেবে মানুষ শঙ্কিত বোধ করে। অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। গভীর হতাশা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিক রোগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, দেহ-মন এক সুতোয় বাঁধা বলেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগের সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। পরিবার ও সমাজের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অমনোযোগের কারণে শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য-জটিলতা চোখের আড়ালে থেকে যায়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটির উদ্ধৃতি দিয়ে মোহিত কামাল বলেন, এই অসচেতনতা ও অমনোযোগের কারণে আগামী ১০ বছরে বিশ্বে ৩৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে অসহায়ভাবে। এর বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোয়।

হূদরোগের আতঙ্ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হূদরোগ বিশেষজ্ঞ সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের (হূদযন্ত্রে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়া) পর অনেক মানুষ ভয় পায়। অনেকে মনে করেন, “আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছি। যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব না।” আসে হতাশা। এগুলো সাধারণ প্রবণতা।’

তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পর ৭০ শতাংশ রোগীই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পরামর্শ দিয়ে সজল ব্যানার্জি বলেন, এসব রোগীকে জীবনের আলো দেখানোই চিকিৎসকের দায়িত্ব। হূদরোগ চিকিৎসার পাশাপাশি হতাশা কমানো চিকিৎসারই অংশ। তিনি বলেন, ‘আমি আমার রোগীদের বলি, “এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার যে আপনি বেঁচে আছেন। তবে আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমার পরামর্শ মেনে চললে নতুন জীবন ফিরে পাবেন।”

সজল ব্যানার্জি জানান, রোগী ও তাঁর পরিবারের লোকদের সঙ্গে পরামর্শ (কাউন্সেলিং) করা দরকার। সময় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, সমস্যা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। এই কথা বলা চিকিৎসারই অংশ।

এ বিশেষজ্ঞ জানান, একটি ক্ষুদ্র অংশের হতাশা এতটাই গভীর হয় যে তাদের মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীর দেখেন হূদরোগ চিকিৎসক আর মনের চিকিৎসা করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

যন্ত্রণা থেকে হতাশা: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আলী হোসেন বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগেন। ওষুধে অনেক সময় সেই যন্ত্রণার উপশম হয় না। ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা সবকিছুর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন রোগী। আসে হতাশা।

আলী হোসেন বলেন, রোগীর সমস্যা যেন পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, সেই উদ্যোগ চিকিৎসককেই নিতে হয়। তিনি দুটি উদাহরণ দেন। অনেকের পরীক্ষার আগে হাঁপানি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভয় দূর করার দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে। অনেক বয়স্ক মানুষের ক্রনিক ব্রংকাইটিস আছে। শীতের সময় তা বাড়ে। অনেক সময় মানসিক কারণেও রোগটি বেড়ে যায়। সুতরাং পরিবারের এখানেও দায়িত্ব নেওয়ার আছে।

দীর্ঘদিন থেকে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা করছেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, এমডিআর যক্ষ্মায় (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট—বহু ওষুধ প্রতিরোধী) আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। নিয়মিত ১৮ থেকে ২৪ মাস ওষুধ খেতে হয়। ওষুধের খরচ, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাতায়াত রোগী এবং পরিবারকে হতাশ করে তোলে। আলী হোসেন বলেন, এসব রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসক ও সমাজের দায়িত্ব। শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে মানুষ সুস্থ হয় না। মানসিক সহায়তা বড় দরকার। প্রয়োজনে রোগীকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে।

সমাজের মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলী হোসেন আরও বলেন, সমাজেরও প্রস্তুত হওয়ার দরকার আছে। কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে গেলে অনেকেই তাঁকে মানসিক রোগী বা ‘পাগল’ ভাবতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থূলতা থেকেও বিষণ্নতা: বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত মোটা মানুষ কোনো কাজ ঠিকমতো, সময়মতো করতে পারে না। কাজের মান ঠিক থাকে না। মোটা মানুষ এ জন্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন। এসব কারণে অনেকে সমাজ ও পরিবারের কাছে নিজেকে অপাঙেক্তয় মনে করে। একসময় তারা হতাশ হয়ে পড়ে।

খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ঘামের কারণে অতিরিক্ত স্থূল মানুষের শরীরের অনেক স্থানে ঘা বা চর্মরোগ হয়। সহজে তা ভালো হয় না। ডায়াবেটিস রোগীদের বারবার প্রস্রাব করতে হয়। অনেকের রাতে ভালো ঘুম হয় না। এ থেকেও হতাশা জন্মে।

এ দেশে স্থূলতা বিষয়ে পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তবে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থূলতায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, স্থূলতার জন্য কাজ করতে না পারা মানুষ শুধু খায় আর ঘুমায়। এতে তাদের খাওয়া বেড়ে যায়। একসময় তারা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

মোটা মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দিন জানান, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে।

মোহিত কামাল বলেন, প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে একজন বিষণ্নতায় ভোগে। বিষণ্নতার কারণে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে ৩০ শতাংশ। আবার ডায়াবেটিসের সঙ্গে বিষণ্নতা যুক্ত হলে চিকিৎসা-খরচ বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ।

এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্লিনিক ও হাসপাতালে কাউন্সেলিংয়ের আয়োজন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য শেয়ার বাজার Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market