এটি খুবই দুঃখজনক যে, নিয়মিত করদাতারা ২৫ শতাংশ হারে কর দেবেন, আর ফাঁকিবাজরা মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে পারবেন


শেয়ারবাজারে কালো টাকা রাখতে হবে দুই বছর
শেয়ারবাজারে কালো টাকা রাখতে হবে দুই বছর মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলো। একই সঙ্গে প্রাইমারি শেয়ারে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে প্রদেয় করে ১০ শতাংশ হারে ছাড় (রিবেট) পাওয়া যাবে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। কালো টাকা বিনিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ায় দুই সপ্তাহ ধরেই শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে তা দু’বছরের জন্য রাখতে হবে। আগামী এক বছর ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। আর কেউ যদি প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগ করেন তাহলে প্রদেয় করের ওপর ১০ শতাংশ হারে রিবেট পাওয়া যাবে। তবে নির্ধারিত দু’বছরের আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা কালো টাকা তুলে নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী ২৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নিতে পারবেন। পুরো বিষয়টি মনিটরিং করবে রাজস্ব বোর্ড। চলতি মাস থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ সুযোগ থাকবে। এনবিআর জানিয়েছে, কালো টাকা বিনিয়োগ করতে হলে এনবিআরকে একটি নির্ধারিত ফরমে ঘোষণা দিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি ওই টাকা বিনিয়োগের আগেই ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এ সুযোগ নিতে হলে এনবিআরকে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব দাখিল করতে হবে। শেয়ারবাজারে আগে বিনিয়োগ করা টাকা পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ নেয়া যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ওসমান ইমাম বলেন, শেয়ারবাজারে রাজনৈতিক কারণে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই দু’বার শেয়ারবাজারে ধস নেমেছিল। এ কারণে বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণেই সরকারকে শেয়ারবাজারে কালো টাকার সুযোগ দিতে হয়েছে। এদিকে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা নেয়ার কথা বলেছে। অথচ বাজেট ঘাটতি পূরণে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও সরকার সেটি গ্রহণ করেনি। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি সরকারের অনাগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। তবে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে এটি শেয়ারবাজারে স্বল্প মেয়াদে হয়তো প্রভাব পড়বে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। স্বল্প মেয়াদে প্রভাব পড়ার বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করেছি।
প্রসঙ্গত, গত বছর চারটি সেক্টরে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে— বিএমআরই, শেয়ারবাজার, নতুন শিল্প স্থাপন ও রিয়েল এস্টেট সেক্টর। রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রায় ৯২২ কোটি কালো টাকা সাদা করা হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু শেয়ারবাজার থেকে ৪২৭ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার পর ৩৬ ব্যক্তি তাদের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। এ থেকে সরকার প্রায় ৪৩ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল।
শেয়ারবাজারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে মাত্র এক বছর। ১ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে মূলধন কমপক্ষে দুই বছর বাজারে ধরে রাখতে হবে। অর্থাত্ ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত মূলধন বাজার থেকে উঠাতে পারবে না। বিনিয়োগকারী ওই সময়ের মধ্যে শেয়ার লেনদেন করে শুধু মুনাফা তুলে নিতে পারবেন। কিন্তু মূলধন উঠিয়ে নিতে পারবেন না। চূড়ান্ত নীতিমালায় এ ধরনের নির্দেশনা রয়েছে। এ সুযোগ গ্রহণ করার পর যাতে কোনো ব্যক্তি বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে না পারেন সেজন্যই এ ধরনের শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকার ঘোষিত সুযোগটি গ্রহণ করতে হলে বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই ঘোষণা দিতে হবে তিনি কি পরিমাণ অর্থ বৈধ করবেন। যে পরিমাণ অর্থ ঘোষণা করা হবে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। এনবিআরের তৈরি করা আলাদা ঘোষণাপত্রে নাম, ঠিকানা, ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বরসহ (টিআইএন) সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্য উল্লেখ করার পাশাপাশি বিও অ্যাকাউন্টের বিবরণী ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, নিয়মিত করদাতারা ২৫ শতাংশ হারে কর দেবেন, আর ফাঁকিবাজরা মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে পারবেন। তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ শেয়ারবাজারে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। কারণ এর আগে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। তারল্য সরবরাহ না বাড়ালে বাজারের স্থিতিশীলতা টিকবে না। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগে ১০ শতাংশ রিবেটের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে, সেটি তিনি সমর্থন করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় নীতিমালা সাপেক্ষে প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। এটি কোম্পানির জন্য ভালো। কারণ আইপিওর চাইতে প্লেসমেন্টে খরচ অনেক কম।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহসানুল ইসলাম টিটো বলেন, এটি সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে বেশি মনিটরিং করা হলে প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়তো বিনিয়োগ আসবে না। প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগে রিবেটের সুযোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি নট ফেয়ার। সুযোগ দেয়া হলে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটে একসঙ্গেই দেয়া উচিত্। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেখানে শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছেন সেখানে আমলারা নানা রকম শর্ত জুড়ে দেয়ায় অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হয়তো সফল হবে না।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

‘‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চেয়ে কে বেশি দেশপ্রেমিক এবং দেশের স্বার্থের বিষয়টা আমার চেয়ে কে বেশি ভাবে?’’ -প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


‘দেশপ্রেমিক’ এবং টোকাইদের আখ্যান

পিয়াস করিম ● প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তার আরো অনেক বক্তব্যের মতোই এই প্রশ্নটিই কোনো আলগা, অসতর্ক উচ্চারণ কিনা আমরা জানি না। কিন্তু নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নকে খুব হালকাভাবেই নেই কি করে?

১৮ জুন ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ বোর্ডের প্রধান কার্যালয় ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘আমার প্রশ্ন হলো আমার চেয়ে কে বেশি দেশপ্রেমিক এবং দেশের স্বার্থের বিষয়টা আমার চেয়ে কে বেশি ভাবে?’’ যেই মনোভঙ্গি থেকে একজন নির্বাচিত সরকারপ্রধান জানান দেন যে তার চেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক আর কেউ হতে পারে না, সেই ভঙ্গিটিকে ঠিক গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। এই ঘোষণাটির মধ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে এক ধরনের ঔদ্ধত্য ‘আমার চেয়ে বড় আর কেউ নয়’ এই দৃষ্টিভঙ্গিটি। একজন ফার্দিনান্দ মার্কোস, একজন পিনোসে কিংবা একজন হোসনি মোবারকের কাছে এই বক্তব্যটি প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু একজন নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির কাছ থেকেও এই কথা আমাদের শুনতে হবে?

জানতে ইচ্ছে করে এই আমার চেয়ে বড় কেউ নয়, এই অহংবোধের, এই দম্ভোক্তির রাজনৈতিক ভিত্তিটি কোথায়? একজন সাধারণ নাগরিক কি দেশপ্রেমের মাত্রায় তার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন না? বাংলাদেশের যে কৃষক উদয়াস্ত শ্রম করেও তার ফসলের ন্যায্য দাম পান না, সেই শ্রমিককে মানবেতর কাজের পরিবেশে প্রতিদিনের দিনযাপনের গ্লানি সয়ে সয়ে নিজেকে ক্রমান্বয়ে ক্ষয় করে ফেলতে হয়, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বড় দেশপ্রেম দাবি করার অধিকার তার নেই? দেশপ্রেমের কোন মাপকাঠিতে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের মেপে থাকেন? ক্ষমতাহীনরা তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের চেয়ে চিরকাল পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হন। হায় ঈশ্বর, এখন দেশপ্রেমিকত্বের প্রতিযোগিতাতেও তাদের পিছিয়ে থাকতে হবে! ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তিতে ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া অধিকার থাকে। এখন দেশপ্রেমের ওপরও তাদের মৌরসী পাট্টা! এখন দেশপ্রেমে বড় হওয়ার অধিকারটুকুও বুঝি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল! সত্যি কি বিচিত্র এই দেশ আমাদের, আর বিচিত্রতর আমাদের দেশপ্রেমের অধিপতি বয়ান।

দুই.

‘দেশপ্রেম’ তো অবিতর্কিত প্রত্যয় নয় কোনো। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশপ্রেমিক নয় তা নিয়ে একটা বিতর্ক তো ছিলই সবসময়। সেই ১৭৭৫ সালে আত্মম্ভরী ভুয়া দেশপ্রেমিকদের সমালোচনা করতে গিয়ে স্যামুয়েল জনসন বলেছিলেন- ‘Patriotism is the last resort of the scoundrel.’ ইতিহাসের প্রেক্ষিত পাল্টে গেছে, কিন্তু দেশপ্রেমের অহংকারী বয়ানের পুনরাবৃত্তি তো ঘটেই চলেছে।

পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকেরা আমাদের বাঙালিদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বারবার। আমরা ভারতের দালাল, আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র ও আদর্শের প্রতি যথেষ্ট বিশ্বস্ত নই, পাকিস্তানের অধিপতি আখ্যানে এই অভিযোগগুলো বারবার উত্থাপিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমের পাকিস্তানি অধিপতি আখ্যানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ একটি প্রতিবাদী দেশপ্রেমের আখ্যান নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তান নামক দেশের ধারণার মধ্যে ঘুন ধরে গিয়েছিল অনেকদিন ধরেই। ভাষার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, স্বাধিকারের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, জনগণের সার্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন এক দেশের কল্পনা নির্মিত হচ্ছিল আমাদের চৈতন্যে, আমাদের বাস্তবতায়। একাত্তরে সেই চেতনার প্রবল শক্তিধর বিস্ফোরণ ঘটেছিল। আমরা নতুন দেশের, নতুন দেশপ্রেমের স্বপ্নলোককে একটা বাস্তব অবয়ব দিতে পেরেছিলাম।

কিন্তু সেই বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত একটি অসম্পূর্ণ বাস্তবতা থেকে গেছে, একাত্তরের অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মতোই। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বতন্ত্র নিজ দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা নির্মিত হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বস্ত্তগত রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে যেই স্বপ্নের দেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল তা আমাদের হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। জনগণের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক অধিকার এখনো সুদূরপরাহত। আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের কোন স্পষ্ট ভিত্তি এখনো দাঁড়া হয়নি।

কিন্তু এই ব্যর্থতার দায়ভাগ তো বাংলাদেশের জনগণের নয়। আমাদের বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বিশুদ্ধ পানির সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, দ্রব্যমূল্য সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাবনার পৃথিবী ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না আর কোথাও, আমাদের জাতীয় সম্পদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকছে না, সামাজিক বৈষম্য বেড়েই চলেছে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের চোখের আড়ালে অসম চুক্তি হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সীমান্তে পাখি শিকারের মতো হত্যা করা হচ্ছে আমাদের নাগরিকদের – এর সব দায়ভার কি আমাদের জনগণের?

কোন যোগ্যতায়, কোন রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে আমাদের শাসকশ্রেণীর প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, তাদের চেয়ে বেশি দেশপ্রেমিক আর কেউ হতে পারে না?

তিন.

দেশপ্রেম নিয়ে এই উদ্ধত ঘোষণার সঙ্গে ইদানীং হয়েছে আরেকটি প্রসঙ্গ। শাসক শ্রেণীর সাম্প্রতিক বয়ানের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ‘টোকাই’ চরিত্রটি। শিল্পী রফিকুন্নবীর এই অসামান্য সৃষ্টিটি বাংলাদেশের ছিন্নমূল পথশিশুদের প্রতিনিধি। আমাদের শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সবচেয়ে নিচে এদের অবস্থান। রাষ্ট্র এবং সমাজ এদের গৃহ দিতে পারেনি, শিক্ষার সুযোগ দিতে পারেনি, জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর কোন সংস্থান করতে পারেনি। এই বঞ্চিত, নিপীড়িত শিশুরা আমাদের সমাজের অসঙ্গতির, ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে এসেছে রফিকুন্নবীর দক্ষ তুলির অাঁচড়ে।

কিন্তু বঞ্চনা ছাড়াও টোকাইয়ের চরিত্রে রয়েছে অন্য একটি মাত্রা। টোকাইয়ের রয়েছে প্রবল বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুক, সমাজের অসঙ্গতিকে বোঝার জন্য প্রখর অন্তর্দৃষ্টি (ইংরেজিতে একেই বুঝি wit বলে)।

শাসকশ্রেণীর তো এক অর্থে মতাদর্শগত আধিপত্য থাকেই, মার্কস থেকে গ্রামসী পর্যন্ত ইতিহাসের নক্ষত্র পুরুষরা তা বলেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও আমাদের জানবার বিষয় যে কোনো অধিপতি মতাদর্শই সমাজের প্রতিটি অংশের ওপর তার চূড়ান্ত আধিপত্য বজায় রাখতে পারে না। মতাদর্শগত আধিপত্য সবসময়ই তাই একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প। সমাজের কোথাও না কোথাও আধিপত্যের বাইরে ভিন্ন মতাদর্শের, প্রতিরোধের সম্ভাবনা আর বাস্তবতা থেকেই যায়। এই আধিপত্যবিরোধী মতাদর্শ, এই প্রতিরোধ আসে সমাজের প্রান্তে যাদের অবস্থান সেই মানুষ থেকেই। টোকাইয়ের wit সেই প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। টোকাই তাই একই সঙ্গে বঞ্চনা আর প্রতিরোধের যুগল প্রতিনিধি।

রফিকুন্নবী টোকাইয়ের চিত্রিত আখ্যানটি তৈরি করেছিলেন সমাজের একটি ক্রিটিক হিসেবে। কিন্তু আমাদের বুর্জোয়া, মধ্যবিত্ত আখ্যান টোকাইয়ের এই ক্রিটিক্যাল দিকটি ধারণ করেনি। টোকাই এখানে হয়ে উঠেছে উপেক্ষার, টিটকারির, অপমানের প্রতীক। সেই পথশিশুরা শ্রেণী সমাজের অন্তর্নিহিত বৈষম্যের ফল, তাদেরকে বুর্জোয়া আখ্যান দেখে উপহাসের লক্ষ্যবস্ত্ত হিসেবে।

বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ২০ জুন সংসদে টোকাইয়ের এই বুর্জোয়া অর্থটিকেই ব্যবহার করেছেন। জাতীয় তেল-গ্যাস কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন – কোথাকার মনু মোহাম্মদ, আনু মুহাম্মদ মিলে টোকাইদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করেছে।

‘মনু মোহাম্মদ-আনু মুহাম্মদ’ প্রকাশটির মধ্যে নাম বিকৃতির কুৎসিত রুচি তো রয়েছেই কিন্তু এর চেয়েও বেশি এতে রয়েছে শাসকশ্রেণীর ঔদ্ধত্য আর অসংবেদনশীলতা। হাছান মাহমুদের পক্ষে যেটা বোঝা সম্ভব নয়, তার সংকীর্ণ রাজনৈতিক বোধের কারণেই হয়তো, টোকাইদের সংগঠন আখ্যা দিয়ে তিনি জাতীয় কমিটিকে অপমান করতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী তার এই বক্তব্যে কোন কায়েমী স্বার্থের প্রতিধ্বনি তুললেন সেটা তো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই। কিন্তু একই গুরুত্বের সঙ্গে যা আমাদের মনোযোগ দাবি করে তা হচ্ছে এই অসংযত বক্তব্যের মধ্য দিয়েই নিজের অনিচ্ছায় তিনি জাতীয় কমিটির জনভিত্তির সত্যটিকেই প্রকাশ করে দিলেন। জাতীয় কমিটি যদি সত্যিই টোকাইদের সংগঠিত করতে পারে তাহলে তো তা একটি বড় মাপের অর্জন। কারণ এই দেশটি তো হাছান মাহমুদ কিংবা তার নেত্রী শেখ হাসিনার নয়। আমাদের কারোই পৈতৃক সম্পত্তি নয় দেশটি। অনেকাংশেই পিতৃমাতৃহীন টোকাইদের চেয়ে আমাদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দেশপ্রেম বেশি এটাও তো দাবি করা যাবে না।

২৪ জুন রাতে একুশে টেলিভিশনের ‘একুশের রাতে’ অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে বললেন, তিনি তো ঠিকই বলেছেন। আনু মুহাম্মদ তো টোকাই-ই। টোকাই অর্থ তো গরিব মানুষ। আনু মুহাম্মদ তো গরিব মানুষই।

সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পেছনে কোনো সচেতন Irony ছিল কিনা জানি না। কিন্তু তা থাকুক না থাকুক, বুঝে হোক না হোক, তিনি কিন্তু আনু মুহাম্মদকে সম্মানিত করলেন। প্রতিমন্ত্রী ‘টোকাই’ শব্দটিকে ব্যবহার করেছিলেন নেতিবাচক উপহাস আর উপেক্ষা অর্থে। সংসদ সদস্য রনি, সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে ‘টোকাই’ প্রত্যয়টির সমাজতাত্ত্বিক বৃত্তটিকে বিস্তৃত করে দিলেন। ‘টোকাই’ আজকে শুধু ছিন্নমূল পথশিশু নয়। আমরা যারা নিপীড়িত, বঞ্চিত, যাদের জীবন রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণীর হাতে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, যাদের সম্পদ তাদের সম্মতি না নিয়েই বিদেশী করপোরেশনের কাছে বিকিয়ে যায়, আমরা সবাই আজকে ‘টোকাই’। আনু মুহাম্মদ, তার বন্ধু ও সমর্থকরা, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করছেন, সবচেয়ে বড় কথা, শাসকশ্রেণীর বাইরে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকই আজকে টোকাই।

আন্তনিও নেগ্রি বিশ্লেষন করে দেখিয়েছেন পুঁজিবাদের বর্তমান পর্যায়ে শোষণের কেন্দ্র শুধু আর কারখানাতে সীমাবদ্ধ নেই। গোটা সমাজজুড়ে গড়ে উঠেছে এক সামাজিক কারখানা। শ্রমিকের সংজ্ঞাও শুধু কারখানার বৃত্তে আটকে নেই। সারা সমাজজুড়ে তৈরি হয়েছে সামাজিক শ্রমের নতুন ধারণা। একইভাবে কিন্তু বাংলাদেশে ‘টোকাই’দের ধারণাও আজ বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।

চার.

যদি আজকে আমাদের সমাজের দ্বন্দ্ব শাসকশ্রেণীর ‘দেশপ্রেমিক’ আর টোকাইদের মধ্যে এসে ঠেকে, আমাদের পক্ষপাতিত্বকেও আজ স্পষ্ট করে আমাদের বুঝে নিতে হবে। যেই ‘দেশপ্রেমিক’রা আমাদের হতাশা, নিপীড়ন আর ব্যর্থতার দিকে বারবার ঠেলে দিচ্ছে তাদের পক্ষে নয়, ইতিহাসকে আজকে নির্মাণ করতে হবে টোকাইদের পক্ষেই।

শাসকশ্রেণীর ‘দেশপ্রেমিক’ প্রতিনিধিরা, আপনাদের জন্য আমাদের টোকাইদের একটি বার্তা আছে। আপনারা বাংলাদেশের জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন তো? মার্কস যেমন বলেছিলেন বুর্জোয়ারা তাদের নিজেদের কবর খনন করেছে প্রলেতারিয়েত তৈরি করে আপনারাও তেমনি কোটি কোটি টোকাই তৈরি করে ফেলেছেন আপনাদের শোষণ-নিপীড়নের সীমাহীন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমাদের সমুদ্রের সম্পদ আপনারা বিক্রি করে দিয়েছেন, বিদেশী বাঁধ আর অসম পানি বণ্টনের চুক্তি আমাদের নদী শুকিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের তেরশ’ নদীর বহতা স্রোতের মতো, সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের মতো টোকাইরা এই দেশের মালিকানা দাবি করতে যদি আজকে ধেয়ে আসে, আপনাদের ভুল ‘দেশপ্রেমের’ বালির বাঁধ দিয়ে কি তা রুখতে পারবেন?
[উপ-সম্পাদকীয়, সাপ্তাহিক বুধবার]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, ঢাকা ষ্টক একচেঞ্জ ডিএসই

এক বছরের পুঁজিবাজার ।। অনেক অঘটন ইতিহাস হয়ে থাকবে


এক বছরের পুঁজিবাজার ।। অনেক অঘটন ইতিহাস হয়ে থাকবে

শেয়ার বিজ্‌ রিপোর্টঃ পুঁজিবাজারের ইতিহাসে গত বছরটি ছিল বাজার সম্প্রসারণ, লেনদেন ও সূচকের অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের বছর। এ সময়ে সিকিউরিটিজ হাউজগুলো রাজধানীর গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জেলা শহরে। ফলে তৃণমূল পর্যায় থেকে টাকা আসতে শুরম্ন করে শেয়ারবাজারে। আর হঠাৎ বেড়ে যাওয়া চাহিদা সামাল দিতে শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে ব্যর্থ হয় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এ সময় ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে উদাসীন ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক অবস্থান করে ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্টে। এদিন লেনদেনের পরিমাণ (টাকায়) দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা এবং বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭১ কোটি টাকায়। অনেকের চোখে ওই দিনটি ছিল ২০১০ সালে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে স্বর্ণালি দিন।

এরপর ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে শুরম্ন হয় দরপতনের পালা। এদিন লেনদেন শুরম্নর মাত্র ৭৫ মিনিটের মধ্যে সূচক ৫৪৭ পয়েন্ট বা সাড়ে ৬ শতাংশ কমে যায়। এদিন বেলা ২টার দিকে সূচক আবার ৫৯৩ পয়েন্ট বেড়ে ৮৬২৬·৫৫ পয়েন্টে পৌঁছায়। দিনের শেষভাগে তা আবার নেমে আসে ৮৪৫১·৫৯ পয়েন্টে। যা আগের দিনের চেয়ে ১৩৪ পয়েন্ট কম। দেশের পঁুজিবাজারে সূচক ওঠানামার এ রকম ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এর আগে ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর শেয়ার কেলেঙ্কারির সময় সর্বোচ্চ ২৩৩ পয়েন্ট বা ৬ শতাংশের মতো সূচক কমেছিল।

গত এক বছরে পুঁজিবাজারের উত্থান প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ডিএসইর সাবেক সিইও সালাহ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, গত এক বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতায় বাজারে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা পঁুজিবাজারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে তারল্য সংকট দেখা যাচ্ছে তা কাটিয়ে ওঠা না গেলে আবারো এমন দুংসময় আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে। তিনি আরো বলেন, গত অর্থবছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা এবং চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হয়েছে। এতে অনেকে ড়্গতিগ্রস্তô হয়েছেন আবার অনেকে লাভবানও হয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাই বেশি।

ডিএসইর প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী এ ব্যাপারে বলেন, গত অর্থবছরে ডিমান্ড ও সাপস্নাইয়ের ভারসাম্যহীনতায় বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হয়েছে। তবে আগামী বছর এ ২টির সমন্বয় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন বাজার আবার দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতায় ফিরে আসবে।

বাজার বিশেস্নষণে দেখা যায়, গত বছরের সর্বোচ্চ বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৭১ কোটি ৪১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, সূচক ৮ হাজার ৯১৮ পয়েন্ট এবং আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ৩ হাজার ২৪৯ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বছর শেষে মূলধন ৮২ হাজার ৬৮২ কোটি ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৯ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকায়, সূচক ২ হাজার ৮০০ পয়েন্ট কমে ৬ হাজার ১১৭ পয়েন্ট এবং আর্থিক লেনদেন ২ হাজার ২৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ২১ হাজার টাকা কমে দাঁড়ায় ৯৫৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়।

জানা যায়, ২০০৯ সালে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল তার রেশ ২০১০ সালেও ছিল। চলতি বছরও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাজারকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ প্রত্যাশা সবার। সরকার পঁুজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে আইনি সংস্ড়্গার, কারসাজি চক্রকে শাস্তিôর আওতায় আনতে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ, এসইসির পুনর্গঠনসহ নানামুখী সিদ্ধান্ত নেয়। ড· এম খায়রম্নল হোসেনকে চেয়ারম্যান করে পুনর্গঠিত এসইসি, ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজারবান্ধব বাজেট নিয়ে শুরম্ন হলো আরেকটি বছরের যাত্রা। চলতি বছর নতুন নেতৃত্বে পুঁজিবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরবে- এমনটাই প্রত্যাশা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, dhaka stock exchange

ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা


ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা
ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা

এ এইচ রানাঃ তারল্য সংকট, মুদ্রাবাজারে অস্থিরতাসহ পুঁজিবাজারের বিপর্যয়ে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। এতে করে অনেকেরই ধারণা ছিল ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা কমে আসতে পারে। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অধিকাংশ ব্যাংক বছরের প্রথমার্ধে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে। যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি বলে জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটসহ নানা সমস্যার বিষয় উপস্থাপন করা হলেও বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) অধিকাংশ ব্যাংকই রেকর্ড পরিমাণ পরিচালন মুনাফা করেছে। চলতি বছরের জুন ক্লোজিং শেষে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার প্রাথমিক তথ্য এ চিত্রে উঠে এসেছে। জুন ক্লোজিং শেষে ব্যাংকগুলো প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের পরিচালন মুনাফার হিসাব-নিকাশ করেছে। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ড়্গেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন পুরোদমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আসবে। যে কারণে বছর শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে মনে করছেন বিশেস্নষকরা। এদিকে বরাবরের মতো অর্ধবার্ষিক হিসাবে পরিচালন মুনাফার পরিমাণের দিক থেকে সর্বাধিক আয় হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। ৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৪৯৫ কোটি টাকা। পরিচালন মুনাফার দিক থেকে ইসলামী ব্যাংকের পরই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৫৭ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৫৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ১৫০ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময় করেছিল ১১০ কোটি টাকা। একইভাবে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ১৫৮ কোটি, গত বছর ছিল ১৩০ কোটি, শাহজালাল ব্যাংক করেছে ১৬৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৬০ কোটি, যমুনা ব্যাংক করেছে ১৫০ কোটি, এসআইবিএল করেছে ১৩৫ কোটি, গত বছর ছিল ১০৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ১৩৩ কোটি,গত বছর ছিল ১৩৯ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংক করেছে ১০৬ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ৮০ কোটি, তবে এক্সিম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ব্যাংকটি এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ১০২ কোটি, অথচ গত বছর একই সময় ছিল ২১০ কোটি, একইভাবে মিউচুøয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক করেছে ৬৫ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ১০৪ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ৭৮ কোটি, গত বছর একই সময়ে ছিল ৩০ কোটি, বেসিক ব্যাংক করেছে ১৩৬ কোটি, গত বছর ছিল ৬২ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক করেছে ৪৯০ কোটি, গত বছর ছিল ৩৬৫ কোটি, প্রাইম ব্যাংক করেছে ৪০৫ কোটি, গত বছর ছিল ৩৩৫ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক করেছে ৩২৫ কোটি, গত বছর ছিল ২৯৫ কোটি, পূবালী ব্যাংক করেছে ২৮০ কোটি, গত বছর ছিল ২৮৪ কোটি, ইউসিবিএল করেছে ২৮০ কোটি, গত বছর ছিল ২২৬ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক করেছে ২৫০ কোটি, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক এবার পরিচালন মুনাফা করেছে ২৪৫ কোটি, গত বছর ছিল ২২০ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংক করেছে ২৩০ কোটি, গত বছর ছিল ২৫০ কোটি, ব্যাংক এশিয়া করেছে ২১৫ কোটি, গত বছর ছিল ২১৪ কোটি, এনসিসিবিএল করেছে ২০১ কোটি, গত বছর ছিল ১৮৫ কোটি, এবি ব্যাংক করেছে ২০০কোটি, গত বছর ছিল ২০০ কোটি, ঢাকা ব্যাংক করেছে ১৯৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৮১ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক করেছে ১৮৫ কোটি, গত বছর ছিল ১৪০ কোটি, ওয়ান ব্যাংক করেছে ১৮০ কোটি, গত বছর ছিল ১৬৪ কোটি, সিটি ব্যাংক করেছে ১৮০ কোটি, আল-আরাফাহ্‌ ব্যাংক করেছে ১৭৭ কোটি, গত বছর ছিল ১৪০ কোটি ও উত্তরা ব্যাংক বছরের প্রথমার্ধে পরিচালন মুনাফা করেছে ১৭০ কোটি, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৪০ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পরিচালন মুনাফা প্রকাশের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফা প্রকাশ করতে পারে না। এ বিধিনিষেধ এসেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) থেকে। এসইসি মূল্য সংবেদনশীল বিবেচনায় এ তথ্য প্রকাশ করতে দিতে চায় না। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাতে সম্মতি দিয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে যারা প্রতিনিয়ত কেনাবেচা করেন এবং যাদের হাতে কোনো ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে, তারা ব্যক্তি যোগাযোগের মাধ্যমেই এ তথ্য আগেভাগে পেয়ে থাকেন। সে ড়্গেত্রে সংবাদপত্রে তথ্য প্রকাশিত হলে সব বিনিয়োগকারী একই তথ্য পেতে পারেন।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী পরিচালন মুনাফা প্রকাশ একটি সাধারণ নিয়মের বিষয়। তবে নিট মুনাফাই ব্যাংকের প্রকৃত আয়। বছর শেষে পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরড়্গণ এবং কর (৪২·৫ শতাংশ) বাদ দিয়ে নিট মুনাফার হিসাব হয়। উপরন্তু প্রাথমিকভাবে পাওয়া এ তথ্য-উপাত্ত কিছুটা কমবেশি হতে পারে। কেননা কোনো কোনো ব্যাংকের জুন হিসাব শেষ হলেও এর অনেক ধরনের হিসাব চূড়ান্তô করতে আরো কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।

ফলে এতে মুনাফার টাকা কমে বা বেড়ে যেতে পারে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীকে অপেড়্গা করতে হয় নিট বা প্রকৃত মুনাফার হিসাব পাওয়া পর্যন্তô।

সব মিলিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও অধিকাংশ ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করতে সড়্গম হয়েছে। পুঁজিবাজারে বিপর্যয় নেমে না এলে পরিচালন মুনাফার পরিমাণ আরো বাড়তো। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ড়্গেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় মনোভাবের কারণে পুঁজিবাজার যেমন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সড়্গম হবে, ঠিক তেমনি বছর শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশিস্নষ্টরা।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info, dse, cse, dhaka stock exchange

দীর্ঘ প্রবাসবাসে আনমনে যে নস্টালজিয়ার জন্ম হয়, শিকড়ের টানে তা যে কত দৃঢ় এবং কতটা গভীরে প্রোথিত, প্রবাস জীবনে স্বদেশের সাথে গ্রন্থিত রজ্জু যার হৃদয়বৃন্তে নেই, তার পক্ষে এই যন্ত্রণার আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।


ভেতরে কেবলই হিংসার চাষবাস

নাসীর মাহমূদ

ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো একটা অবাস্তব অর্থ প্রদানকারী প্রবচনের সাথে অনেকেরই পরিচয় রয়েছে। এই প্রবচনটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়েই লাখ টাকার স্বপ্নকে কিছুটা হলেও বাস্তব করে তুলেছিলেন যেই ব্যক্তিটি তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ প্রবাসবাসে আনমনে যে নস্টালজিয়ার জন্ম হয়, শিকড়ের টানে তা যে কত দৃঢ় এবং কতটা গভীরে প্রোথিত, প্রবাস জীবনে স্বদেশের সাথে গ্রন্থিত রজ্জু যার হৃদয়বৃন্তে নেই, তার পক্ষে এই যন্ত্রণার আনন্দ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কবি নজরুল জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতেন। তার ওই হাসি ফাঁসির মঞ্চেও যে হাসা যায়, তা সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে বুঝতে পারছি প্রবাসে এসে। প্রবাস মানেই যন্ত্রণা, প্রবাস মানেই কষ্ট। এই অবস্থান থেকে যখন বাংলাদেশী হিসেবে গর্ব করার মতো কোনো খবর পৃথিবীময় ছড়িয়ে যায়, তখন নজরুলের ওই হাসিটা একান্ত বাস্তব হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে, ভারত কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশ অথবা অহঙ্কারী অস্ট্রেলিয়াকে যখন খেলায় হারায় তখনো তা বাস্তব হয়ে ওঠে। ড. ইউনূসের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি তেমনই এক নজরুলি হাসির বাস্তবতা। প্রবাসে বাংলাদেশীরা যত ভালো পদেই কাজ করুন না কেন, তাদের মর্যাদা তৃতীয় বিশ্ব অর্থাৎ বিশ্বের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের ঊর্ধ্বে নয়। তবু এ ধরনের গর্ব করার মতো আশ্চর্য সন্দেশ থার্ড ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার মতো একটা আত্ম-পরিতৃপ্তি এনে দেয়। নোবেল বলে কথা, বাংলাদেশী বলে কথা। যারা আমাদের ঝড়ের দেশ, বন্যার দেশ, অভাবের দেশ বলে তাচ্ছিল্যের ভাব দেখায়, তাদের বুক ফুলিয়ে বলতে পারা যায় নতুন সংযোজনীর কথা­ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত দেশ। ড. ইউনূস তখন আর ব্যক্তি থাকেন না, হয়ে যান সমগ্র দেশের কিংবা বলা ভালো সমগ্র বিশ্বের। নোবেল পুরস্কারের বিশ্ব শিরোপা তিন বাঙালি পরলেও ড. ইউনূসকে নিয়ে আমাদের গর্ব আগের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। এই অভিব্যক্তির ফলে যে প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়াবে তার উত্তরটাও বেশ দীর্ঘ। আজ তা আমাদের আলোচ্য নয়। আলোচ্য প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেশোত্তীর্ণ এই বিশ্বব্যক্তিত্বকে আমি সুদূর প্রবাস থেকে জানাই সালাম এবং আন্তরিক অভিনন্দন।

দুইঃ হিংসুক শুকায় প্রতিবেশীর সুখে। নিজের নাক কেটে হলেও তাই প্রতিবেশীর সুখ নষ্ট করা চাই। এ রকম অদ্ভুত সব চিন্তা আর প্রবাদ নদীর স্রোতময় ধ্রুপদী সঙ্গীতে ভরা, নিবিড় সবুজে ঘেরা, ফুল-পাখি আর বিচিত্র নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বাংলাদেশে কী করে জন্মাল তা বুঝে আসে না। অজানা সেই লতাতন্তুজাল টেনে বের করা আমার কাজ নয়, আমার বরং দেখতে ইচ্ছে করে ঈর্ষা আর হিংসামুক্ত বাংলাদেশ। যে বৃক্ষটি সাতচল্লিশের কৃত্রিম ঝড়ে দ্বিখণ্ডিত হলো, সেই ঝড় পশ্চিমাংশের জলের দু’পাড়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল দু’টি বীজ। একাত্তরের পর আজ দুই হাজার দশে এসে দেখছি ওপারের বীজটি ফলে-ফুলে সজ্জিত। যদিও অতিথি পাখিরা এসে খেয়ে যাচ্ছে সব। তবু বৃক্ষটির শিকড়জুড়ে আছে পরমাণুর আপাত শক্তি। আর এপারের বীজটি থেকে যে বৃক্ষটি বেড়ে উঠেছিল তার শিকড়জুড়ে ইঁদুরের বসতি। প্রতি কয়েক বছর পরপর তার শেকড় ও ডালপালা কেটে যে যার মতো নিয়ে যাচ্ছে। এখন তাই বনসাই হয়ে আছে সে। আমাদের দেশের মালিরা এই বাগানের সেবার বিচিত্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজে যোগ দিয়ে অবশেষে বাগান উজাড় করে ফেলে। পিতৃত্ব কিংবা যে দোহাই যা দিয়েই কাজে লাগুক না কেন, ভেতরে কেবলই হিংসার চাষবাস। কারো বেশি কারো কম। তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কিংবা বলা ভালো, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেভাবে এখন হিংসার চাষ হচ্ছে, সে রকম বাম্পার ফলন বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে আর হয়নি। সাবাস বাংলাদেশ। হিংসা তাই এখন ডিজিটাল মাত্রা পেয়েছে, অনন্য শিরোপা লাভ করেছে। অনেকেই বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতির হিংসার চাষবাস প্রথমে হয়েছে নির্বাচনে, তারপর পিলখানা হয়ে মইনুল রোডে। আর উৎপাদিত এই হিংসাপণ্য ডিজিটালি পৌঁছে গেছে বাংলার ঘরে ঘরে। চারদিকে তাই এখন হিংসার জয়োল্লাস। হিংসাটা ভয়ঙ্কর। প্রতিবেশীর বাগানে ফুল সুগন্ধি ছড়ায়, আমার কেন তা নেই, তাই ফুলের ওই বাগানটি ধ্বংস করে দিতে হবে­ এরই নাম হিংসা। ঈর্ষাটা কিন্তু মন্দ নয়। প্রতিবেশীর বাগানের মতো আমারও একটি বাগান চাই এবং সেখানেও ফুটুক ফুল, ছড়াক সুগন্ধি­ এই হলো ঈর্ষা। তাই হিংসার বদলে ঈর্ষার চাষ হলে বাগানটা ফুলে-ফলে আরো রঙিন আরো শ্যামল হয়ে উঠত। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ বাড়ির প্রতিইঞ্চি মাটিতে, প্রতিটি ধূলিকণায় এখন হিংসার চাষ। তাই এ মাটিতে গড়ে না কিছুই, কেবলই ভাঙে। ভাঙে বৃক্ষ, ভাঙে বাগান, ভাঙে আবহমান ঐতিহ্য আর স্মৃতিময় ডালপালা। আমরা ভাঙনের এই সংস্কৃতির অবসান চাই। আবহমান এই ভাঙনের পরিবর্তে গড়ার প্রবণতায় ঋদ্ধ সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক আমাদের মন আর মনন­ সে রকম সুস্থতার চর্চা দেখতে চাই। একজনের নোবেল শিরোপা কেড়ে নিয়ে কিংবা তার ওপর নোংরামির নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে অর্জনকে ্লান না করে আমরা আরো বেশি নোবেল অর্জনের চেষ্টা দেখতে চাই। দেখতে চাই আরো অনেক অনেক প্রাপ্তি যোগ। মনে রাখা উচিত, সম্মান পেতে হলে সম্মান দিতে হয়, দিতে জানতে হয়। সম্মান দেয়ার মাঝে, আচার-আচরণের মাঝে, কথাবার্তার মাঝে মন-মানসিকতা এবং আভিজাত্যের পরিচয় ফুটে ওঠে। যাদের নিজেদের সম্মান-সম্ভ্রমের অভাব আছে, কেবল তারাই আরেকজনের সম্মানের ব্যাপারে তোয়াক্কা করে না। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসবের চর্চা হলে নিু পর্যায়ে যে বেয়াদবির ধারার সূচনা ঘটবে তা বোধ হয় এখন আর কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়। কেননা দেশবাসী এখন নিজেদের সব অস্তিত্ব দিয়ে তা অনুভব করছে। ড. ইউনূস সোনার মেকুরের মতো কারো দুধের বাটি খেয়ে যাননি। বরং একটা ধারণা এনে দিয়েছেন, দিতে চাচ্ছেন। অনেকেই তার সোশ্যাল বিজনেস নিয়ে কিংবা বিদেশীদের ঋণ প্রদান নীতিতে পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নেতিবাচক কথা বলছেন। সমসাময়িক অনেক অর্থনীতিবিদকেও দেখছি ড. ইউনূসের নতুন এই বিজনেস না বোঝার ভান করছেন অনেকটা সচেতনভাবে অচেতন থাকার মতো। ড. ইউনূসের সহজ কথাটি হলো­ বিদেশীরা যেসব ঋণ দেয় সেসব টাকা গঠনমূলক কিংবা লাভজনক কোনো কাজে ব্যবহার করার সুযোগ তারা দেয় না। সে জন্য ঋণের ফলে সাহায্যগ্রহীতা দেশের কোনো লাভ হয় না, বরং তার মাথায় ঋণের বোঝা বেড়েই যেতে থাকে। কিন্তু ‘সামাজিক ব্যবসা তহবিল’ সৃষ্টি করা গেলে গ্রহীতা দেশের মধ্যে ওই তহবিলের টাকা ক্রমান্বয়ে বাড়বে, দেশের সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন উদ্ভাবনীমূলক সামাজিক ব্যবসার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ড. ইউনূস বলতে চাচ্ছেন বিদেশী দাতাদের উদ্দেশ করেঃ ‘কর্মচঞ্চল এই হাতে দান নয়, কাজের সুযোগ করে দাও’। এই দৃষ্টিভঙ্গি বা ধারণা দোষণীয় তো নয়ই বরং প্রশংসনীয় এবং ধন্যবাদার্হ বলেই মনে করি।

এবার আসা যাক ড. ইউনূস সম্পর্কে উত্থিত কিছু আপত্তি প্রসঙ্গে। ড. ইউনূস একজন মানুষ, মেধাবী মানুষ। তিনি অতিমানব বা ফেরেশতা নন। তিনি তাই দোষের ঊর্ধ্বে নন। আমরা যারা অপরের দোষ ধরে অভ্যস্ত তারা নিজেদের কথা ভাবি না। একটিবার আত্মসমালোচনা করি না। ড. ইউনূস যা কিছুই করেছেন তা দেশের জন্য অমঙ্গল নয় মঙ্গলই বয়ে এনেছে, সম্মান বয়ে এনেছে। এই সম্মান আর মর্যাদায় দেশের ভেতরে এবং বাইরে অনেকেই হিংসার চর্চা করে থাকতে পারেন। এই চিন্তাটি মাথায় রেখে আমরা কি পারি না কারা এসব করছে, কেন করছে, কাদের ইঙ্গিতে করছে­ সেসব নিয়ে তদন্ত করতে? একটা শ্রেণীকে দেখা যায় ড. ইউনূসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন রকম হাইপোথিসিস দাঁড় করাচ্ছে। কোনো একটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছে কিংবা নিশ্চিত না হয়ে হুট করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে অরুচিকর, হীনম্মন্য, হিংসুক কোনো মন্তব্য করা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা উচিত। বাইরের কেউ এসে আমাদের ঘরের বিষয়ে মাতব্বরি করলে আমাদের সম্মান বাড়ে কী কমে সেটাও কি একবার ভেবে দেখা যায় না? ঘরের উত্থাপিত সমস্যাকে পরের হাতে তুলে না দিয়ে নিজেদের ভেতরে মীমাংসার পরিবর্তে কারা একে বিতর্কিত ইসুø বানিয়ে বিশ্বব্যাপী আমাদের অর্জনকে ্লান করে দিতে চাচ্ছে তাদের বরং শনাক্ত করা উচিত। নিজেদের ঘরের ব্যাপারে বাইরের কাউকে নাক গলাতে দেয়াই ঠিক নয়। আমাদের ভাবতে হবে, চাঁদের গায়ে দূর থেকে যেসব কলঙ্ক দেখা যায়, সেসব সত্ত্বেও তার জ্যোৎস্নায় কোনোরকম কলঙ্ক থাকে না। আনন্দিত যে ড. ইউনূস তার গায়ের কলঙ্ককে অস্বীকার করার লক্ষ্যে সুষ্ঠু তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। দেশপ্রেমী যেকোনো নাগরিকও তার এই দৃঢ়তায় আনন্দিত হবে সেটাই স্বাভাবিক।
nasir.radio@gmail.com

‘দলীয় নেত্রী’ ও দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মধ্যে যে একটা গুণগত পার্থক্য থাকে তা অনেক সময়ই তিনি বিস্মৃত হয়ে যান


ক্ষুদ্রঋণ : প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে

আ বু ল আ ব্বা স

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা তাদের এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : ‘শেখ হাসিনা যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তা অনিভিপ্রেত। তদন্তের আগেই কাউকে দোষারোপ করা যায় না।’ (৭ ডিসেম্বর) ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকাও এ বিষয়ে এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : প্রধানমন্ত্রী ও মিডিয়ার একটি অংশ নরওয়ের টিভি চ্যানেলে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের সূত্র ধরে নোবেল বিজয়ী, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ কল্যাণ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছে তা সব তথ্যকে বিবেচনায় এনে করা হয়নি। (৬ ডিসেম্বর) দৈনিক ‘সমকাল’ এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : ‘ইতিমধ্যে ড. ইউনূস সম্পর্কে কোনো কোনো মহল থেকে এমন সব মন্তব্য করা হয়েছে, যা সমর্থনযোগ্য নয়। ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যকে এক ফুত্কারে অস্বীকার করব, সেটিও সমর্থনযোগ্য নয়। (৮ ডিসেম্বর)

প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য বক্তব্য নিয়ে অনেক স্থানে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। আমি অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এরকম বক্তব্যে অবাক হইনি। কারণ, তিনি এরকমই বলে থাকেন। ‘দলীয় নেত্রী’ ও দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মধ্যে যে একটা গুণগত পার্থক্য থাকে তা অনেক সময়ই তিনি বিস্মৃত হয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা উপলক্ষে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কেও ব্যঙ্গোক্তি ও চটুল ভাষায় সমালোচনা করে থাকেন। পাঠকের নিশ্চয় তা মনে আছে। রাজনীতিতে অনেক সময় ভাষা বা ভাবের ত্রুটি খোঁজা হয় না। তবু সেখানেও একটা পরিমিতি থাকা প্রয়োজন।

দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা নোবেল বিজয়ী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তা শেখ হাসিনার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী পদের একজন নেতা দেশের কোনো সম্মানিত নাগরিক সম্পর্কে (রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক ছাড়া) ব্যক্তিগত পর্যায়ে অশোভন, অরুচিকর ভাষায় যে মন্তব্য করতে পারেন তা অনেকেরই কল্পনার অতীত ছিল। প্রধানমন্ত্রী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্মসূচির সমালোচনা করতেই পারেন। প্রত্যেক নাগরিকেরই সেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার যে ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন, তা প্রধানমন্ত্রী পদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

শুধু ভাষা নয়, তিনি গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যেসব অভিযোগ করেছেন, তাও তথ্যভিত্তিক নয়। তা কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মতলববাজ গবেষক বা সাংবাদিকের পক্ষে এ ধরনের অভিযোগ মানালেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য তা খুবই বেমানান ও অশোভন। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সম্পর্কে তির্যক সমালোচনা করেছেন, ঘটনাক্রমে সেই প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারে’ সম্মানিত, যা প্রকারন্তরে বাংলাদেশেরই গৌরব। সমালোচনা করার সময় প্রধানমন্ত্রী সেই তথ্যটিও বিস্মৃত হয়েছেন। আশা করি, নোবেল পুরস্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভুল ধারণা নেই। শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, ড. ইউনূস সারা বিশ্বের জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য পুরস্কার এবং পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত ৪৮টি সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি লাভ করেছেন। এসব ডিগ্রি তিনি কোনো সরকারি পদে থাকার সময় পাননি। ড. ইউনূসের মতো এত বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার খুব কম মানুষের ভাগ্যে জুটেছে। বিশ্বের বহু দেশের সাধারণ মানুষ এখন ‘বাংলাদেশকে’ চেনেন শুধু ড. ইউনূসের জন্য।

আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. ইউনূসসংক্রান্ত এসব তথ্য জানেন না। বোধ হয় প্রধানমন্ত্রীর ধারণা, ড. ইউনূস সোনালী বা জনতা ব্যাংকের মতো আরেকটি সরকারি ব্যাংকের এমডি। তা না হলে তিনি ড. ইউনূস সম্পর্কে প্রকাশ্যে এই ভাষায় সমালোচনা করতে পারতেন না।
ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তিনি ভোট, হরতাল, মিছিল, সরকারি ব্যবসা, কমিশন বাণিজ্যের অংশীদার, কোনো সরকারি পদ ইত্যাদি থেকে অনেক অনেক দূরে। যেগুলো দেখভাল করা প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনে ড. ইউনূস তো কোনো বাধা নয়। তবু ড. ইউনূসের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রোশ কেন? খালেদা জিয়ার ওপর প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশের কারণ বোঝা যায়। এটা বোঝা যায় না।

‘গ্রামীণ ব্যাংক’ সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রী সমালোচনামুখর। গ্রামীণ ব্যাংকও একটি নোবেল জয়ী প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর খুব কম ‘প্রতিষ্ঠানই’ নোবেল পুরস্কার পেয়েছে। এই পুরস্কারে বাংলাদেশ সম্মানিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সম্মানিত। অথচ সেই বিরল প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে তিনি যুক্তিহীনভাবে সমালোচনা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান আক্রমণের টার্গেট ‘ক্ষুদ্রঋণ’। এটা খুব রহস্যময়। কারণ, সারা পৃথিবী বাংলাদেশের উদ্ভাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ’ নিয়ে প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত, অথচ এর জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এর সমালোচনায় মুখর। তিনি বলেন, ‘আমি এটা কখনোই সমর্থন করিনি। প্রতিবাদ করেছি।’ তিনি কেন একে সমর্থন করেননি, তার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক নেতার সমালোচনার মতো শুধু ঢালাও মন্তব্য পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা রাজনৈতিক ইস্যুতে ঢালাও মন্তব্য করে থাকেন। এটা মোটামুটি সহনীয় হয়ে গেছে। কোনো সমালোচনার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত দেয়া রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রে নেই। (ব্যতিক্রম খুব কম) ঢালাও মন্তব্য করার মধ্যেই তাদের আনন্দ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ক্ষেত্রে অভ্যাসমত তাই করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা হয়তো ভুলে গেছেন ‘ক্ষুদ্রঋণ’ কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, ট্রানজিট বা টিপাইমুখ বাঁধের মতো। এটা বহুল পরীক্ষিত ও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি অর্থনৈতিক মডেল। বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশের ১১০টি দেশে এই ‘গ্রামীণ’ মডেল অনুসরণ করা হয়। বিশ্বের বহু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও ফিন্যান্স শাস্ত্রে ‘মাইক্রো ফিন্যান্স’ পড়ানো হয়ে থাকে। এই মডেল নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। এটা ‘একটি বাড়ি ও একটি খামার’ এর মতো কোনো সরকারি কর্মসূচি নয়, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

ড. ইউনূস ‘গ্রামীণ’ আইডিয়ার মাধ্যমে একটি নতুন ব্যাংকিং মডেল উদ্ভাবন করেছেন, যার বৈশিষ্ট্য হলো : বিনা বন্ধকিতে গরিব মানুষকে ছোট অংকের ঋণ দেয়া ও প্রতি সপ্তাহে সুদসহ তা পরিশোধ করা। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী যেসব গরিব নারী ও পুরুষ সম্পদের অভাবে (কোলেটারেল) কোনোদিন ব্যাংকের কাছে ঋণ চাইতে পারেনি, তারা আজ ‘গ্রামীণ’ মডেলের বদৌলতে ঋণ নিয়ে আয়-উপার্জন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে পারছেন। নিজের একটি ছোট বাড়ি করতে পেরেছেন। সবই ক্ষুদ্রঋণের জন্যই সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি কখনও বাংলাদেশের গরিব মানুষের, বিশেষ করে গরিব, বিত্তহীন নারীদের জীবনে এই পরিবর্তনের কথা শোনেননি? বাংলাদেশের গ্রামে কি আওয়ামী লীগের কোনো শাখা নেই? কোনো নেতা নেই? কর্মী নেই? তারা কি ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের (অন্যান্য এনজিওসহ) ভাগ্য পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেননি? যদি দেখে থাকেন, তাহলে সেই গল্প দয়া করে আপনাদের নেত্রীকে বলবেন।

পৃথিবীর নানা দেশের সরকারপ্রধান ও নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গরিব নারীদের ভাগ্য পরিবর্তন দেখে গেছেন। শুধু দেখার সময় হয়নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনে হয় বেগম খালেদা জিয়ারও দেখার সময় হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ কয়েকটি সমালোচনার পয়েন্ট তুলেছেন। আমি এখানে একে একে তা নিয়ে আলোচনা করব।

১.প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গরিব মানুষের রক্ত চুষে খেলে ধরা খেতে হয়।’ অন্যান্য ব্যাংক বা এনজিওর কর্মসূচি ছাড়াও শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৮৪ লাখ। দেশের সব এনজিও মিলিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নেয়। এরা সবাই গরিব মানুষ। গ্রামীণ ব্যাংক এ পর্যন্ত (নভেম্বর ২০১০) ৫৭ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। এই ঋণ নিয়ে গ্রামের গরিব মহিলারা উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি ও বন, গৃহপালিত পশু ও মত্স্য, ব্যবসা, ফেরি ব্যবসা ও দোকানদারি ইত্যাদি কাজে খাটান। এর চেয়ে বড় কাজেও তারা ঋণের টাকা খাটান। যেমন : ট্রাক্টর ভাড়া দেয়া, মুরগির খামার, মাছ চাষ, স’মিল, ফার্নিচারের ব্যবসা, মুদি দোকান, মাছের আড়ত, কাপড়ের ব্যবসা, তেলের ব্যবসা ও ওষুধের দোকান ইত্যাদি। এই কাজগুলো করছেন গ্রামের বিত্তহীন নারী ও পুরুষ। যারা ঋণ নেয়ার আগে দু’বেলা ভাত খেতে পারতেন না। যাদের ছেলেমেয়েরা কখনও স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। এখন গ্রামীণ ব্যাংকের ‘শিক্ষা ঋণ’ নিয়ে তাদের অনেকের ছেলেমেয়ে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি এসব তথ্যে কোনো উন্নয়ন দেখতে পান না? নাকি পুরোটাই তার ভাষায় ‘ভোজবাজি’? গ্রামের গরিব মহিলাদের এই অবস্থার পরিবর্তনকে প্রধানমন্ত্রী এত ছোট করে দেখতে চান কেন? এই উন্নয়নকেই কি শেখ হাসিনা ‘গরিবের রক্ত চুষে খাওয়া’ বলতে চেয়েছেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে গরিব নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা কি ‘রক্ত চুষে খাওয়া?’

দেশের তিন কোটি ঋণ গ্রহীতার মধ্যে হয়তো কেউ কেউ ঋণের টাকা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সবাই মূলধন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয় না। কিন্তু তিন কোটি ঋণ গ্রহীতার মধ্যে ৩০০ জনের ব্যর্থতাকে কি ক্ষুদ্রঋণের ব্যর্থতা বলা হবে?

২. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মানুষকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হয়েছে।’ কোন মানুষকে? গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। গ্রামীণ ব্যাংক তো সেই স্তর পেরিয়ে এসেছে ৩০ বছর আগে। এখন গিনিপিগের প্রশ্ন আসছে কেন? তাছাড়া যে ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ৮৪ লাখ, সেখানে গিনিপিগ হবে কে?

৩. প্রধানমন্ত্রী নাম উল্লেখ না করে ড. ইউনূসকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘নিজের আখের গোছাতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন।’ ড. ইউনূস নরওয়ের টিভির কথিত অভিযোগে নিজের আখের গুছিয়েছেন কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসবে আশা করি। তবে আমার জানা মতে, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সরকারি স্কেলে বেতন পেয়ে থাকেন। ব্যাংকের গাড়িতে চড়েন, ব্যাংকের কোয়ার্টারে থাকেন। নোবেল পুরস্কারসহ যাবতীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কারের টাকা ‘ইউনূস ট্রাস্টে’ দিয়েছেন। যে ট্রাস্ট গরিব মানুষের কল্যাণে নানা প্রকল্প নিয়ে থাকে। সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে নানা ‘সামাজিক ব্যবসা’ শুরু করেছেন। ড. ইউনূস উদ্ভাবিত ‘সামাজিক ব্যবসার’ অন্যতম শর্ত হলো : এই ব্যবসার মালিক কখনও ব্যবসা থেকে লাভ (ডিভিডেন্ট) নিতে পারবেন না। বিনিয়োগের টাকা ফেরত নিতে পারবেন। ব্যবসার লাভ থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হবে। নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করা হবে।

ড. ইউনূসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নানা ‘গ্রামীণ কোম্পানির’ (গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত নয়) পরিচালনা বোর্ডের তিনি অবৈতনিক চেয়ারম্যান। এর একটিও ব্যক্তিমালিকানার প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো হয় সামাজিক ব্যবসা বা ট্রাস্ট কিংবা ফাউন্ডেশন। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে অবসর নিলে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ও অবসর সুবিধা ছাড়া আর কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না। অবশ্য বিশ্বজোড়া খ্যাতিও সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
এবার শেখ হাসিনা বলুন, ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ও গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে কীভাবে নিজের আখের গোছাচ্ছেন?

৪. প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংক জনগণের সম্পত্তি। অথচ এখন তাকে এমনভাবে কব্জা করা হয়েছে, এটা যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি।’
গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা বোর্ড, অর্থের উত্স ইত্যাদি কোনো কিছু সম্পর্কেই শেখ হাসিনার পরিষ্কার ধারণা আছে বলে মনে হয় না। সংবাদ সম্মেলনে আসার আগে প্রধানমন্ত্রী যদি অর্থমন্ত্রী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে একটু আলাপ করে নিতেন, ভালো হতো। তারা অনেক দিন যাবত্ গ্রামীণ ব্যাংককে জানেন। জনসমক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভুল তথ্য বা ধারণা দেয়া ঠিক নয়।

প্রকৃত তথ্য হলো : গ্রামীণ ব্যাংক সত্যিকার অর্থেই জনগণের প্রতিষ্ঠান। কারণ এর ৭৫ ভাগ মালিকানা এর শেয়ারহোল্ডারদের। বাকি ২৫ ভাগ সরকারের। একটি নির্দিষ্ট স্তরের গরিব না হলে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য হওয়া যায় না। বাংলাদেশে ৭৫ ভাগ মালিকানায় গরিব মানুষের আর কোনো প্রতিষ্ঠান আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী কি জানেন, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও গরিবের মালিকানার এই ব্যতিক্রমী শর্তটি তিনি নিজেই যুক্ত করেছিলেন?

একজন সম্পাদক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তুলেছেন : ‘আগে গ্রামীণ ব্যাংকে ৬০ শতাংশ সরকারের মালিকানা ছিল। এখন তা ২৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে।’ মনে হয় সম্পাদক সাহেব এটা পছন্দ করতে পারেননি। সরকার যে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানাও ছেড়ে দিচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে, সরকারি ব্যাংকে পৃথক বেতন স্কেল দিয়েছে, এ ব্যাপারে সম্পাদক সাহেব প্রশ্ন করেন না কেন? নাকি তার এজেন্ডা শুধু গ্রামীণ ব্যাংক? আমরা তো জানি, নাগরিক সমাজের জনপ্রিয় দাবি হলো : সরকার কোনো রকম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকবে না। সরকার করবে নীতি ও মনিটরিং। প্রশ্নকর্তা সম্পাদক মনে হয় এখনও সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের যুগেই রয়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী উত্তরে বলেছেন : ‘গ্রামীণ ব্যাংক যেন আজ ব্যক্তি সম্পত্তি।’ এ কথা প্রধানমন্ত্রী অবশ্য পরোক্ষভাবে ঠিকই বলেছেন। কারণ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতা গরিব নারী পুরুষরাই এর মালিক। এরা গরিব হলেও ব্যক্তি তো। এই গরিব নারী ও পুরুষরা গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক হলে শেখ হাসিনার আপত্তি কেন? কে বা কারা মালিক হলে শেখ হাসিনা খুশি হতেন? প্রধানমন্ত্রী কি এ কথা স্পষ্ট করে সাংবাদিকদের জানাবেন?

৫. প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে গরিব মানুষের (ভাগ্য বদলানোর) কথা বলে টাকা আনা হলেও তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান এক সময় ইআরডির সচিব ছিলেন। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা তার সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হয়। কোনো দাতা সংস্থা তাদের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে আর কখনও টাকা দেয় না। দাতাদের থাকে নিজস্ব অডিট ও মনিটরিং ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে ইআরডিরও রয়েছে পৃথক মনিটরিং। বিদেশের টাকা আনা ও খরচ করা খুব সহজ কাজ নয়। এটা রাজনৈতিক দলের চাঁদা সংগ্রহ নয়। যার কোনো রশিদ বা হিসাব থাকে না। এমনকি অডিটও হয় না।
আমার সন্দেহ, আমাদের কর্মব্যস্ত প্রধানমন্ত্রীকে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানানো হয়নি। তিনি হয়তো জানেন না গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৯৮ সালের পর থেকে আর কোনো বিদেশি অনুদান গ্রহণ করেনি। কাজেই বিদেশ থেকে গরিব মানুষের অজুহাতে টাকা আনার অভিযোগ থেকে গ্রামীণ ব্যাংক এখন পুরোপুরি মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী কি জানেন, বিশ্বব্যাংক বহু চেষ্টা করেও গ্রামীণ ব্যাংককে এক সময় টাকা দিতে পারেনি। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতি সপ্তাহে ২২৫ কোটি টাকা ঋণ দেয় কীভাবে? গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দেয় তার সদস্য ও বহিরাগতদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের মাধ্যমে।

৬. প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমি কখনও এর সমর্থন করিনি। বিরোধিতা করেছি।’
খুব ভালো কথা। ক্ষুদ্রঋণ একটি আইডিয়া, একটি মডেল। সবাই তা সমর্থন করবেন, এটা আশা করা উচিত নয়। সবাই কি সমাজতন্ত্র সমর্থন করেন? করেন না। সমর্থন বা বিরোধিতা নিয়ে বাদানুবাদের কিছু নেই। এটা ব্যক্তি অভিমত। বাংলাদেশের কয়েকজন অর্থনীতিবিদও ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন করেন না। তাতে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন না করা বা বিরোধিতার একটি ভিন্ন তাত্পর্য রয়েছে। তা হলো : তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রধান নীতিনির্ধারক। নীতির প্রশ্নে তার স্ববিরোধিতা মানায় না। তিনি একদিকে বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন করেন না। অন্যদিকে তার সরকার নানা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, পিকেএসএফ, যুব মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছে। তদুপরি গ্রামীণ ব্যাংকে রয়েছে সরকারের আংশিক মালিকানা। তার এক মন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের আর প্রয়োজন নেই।’ তাহলে এত সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে কেন? বন্ধ করে দিলেই তো ভালো হয়। অন্তত আওয়ামী লীগ যত দিন ক্ষমতায় আছে, তত দিন ক্ষুদ্রঋণ দেয়া বন্ধ করা যেতে পারে। সেটাই হবে শেখ হাসিনার কথার সঙ্গে কাজের মিল। তা না হলে একে স্ববিরোধিতাই বলতে হবে।

সারা দেশে সম্ভব না হলেও আপাতত যেসব উপজেলা ও গ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাদের উচিত, তাদের নেত্রীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেই সব গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া। সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকায় ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ‘গরিব মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার’ এই ব্যবস্থা মেনে নেয়া ঠিক হবে না। সবখানে প্রচার করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গরিব নারীদের এই ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও ড. ইউনূস সম্পর্কে যেসব অভিযোগ করেছেন, তা কতটা সত্য বা অসত্য, তা একমাত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে। আমার এই সামান্য রচনা প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ সম্পর্কে একজন সাধারণ নাগরিকের পর্যবেক্ষণ মাত্র।

লেখক : একজন উন্নয়নকর্মী
তথ্যসূত্র : বিভিন্ন সংবাদপত্র, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকাশনা ও গ্রামীণ ব্যাংক কার্যালয়

প্রবাসী কি করতে পারে? হ্যাঁ, টাকা পাঠায়। তাতে আত্মীয়-স্বজনের উপকার হয়। আত্মীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলে, দালানকোঠা বানায়। প্রবাসীরা কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য দান-অনুদান পাঠিয়ে থাকে। এসব ভালো কাজ। উপকারী কর্তব্য। কিন্তু মূল ব্যাপারটা তো হলো এই যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা না বদলালে দেশের উন্নতি হবে না।


প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশপ্রেম এবং চারপাশের বাস্তবতা

Probashi

প্রবাসী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রবাসী পক্ষে দেশকে না দেখে কোনো উপায় নেই। প্রথম কথা এই যে, প্রবাসী মাত্রেই স্বদেশবাসী, দেশ তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে, স্মৃতিতে জ্বলে, অনুভবে লুকিয়ে রয়, দৃষ্টিভঙ্গিতেও ধরা পড়ে। দেশে বাস করে দেশকে উপেক্ষা করা বরং সহজ, প্রবাসে থেকে দেশকে না দেখার তুলনায়। দ্বিতীয় সত্য এই যে, বিদেশে এসে খোঁজ পাওয়া গেছে নতুন আলোর। খোঁজ পাওয়া নয় তো, অনেক ক্ষেত্রেই আলোটা সঙ্গী হয়ে থাকে সর্বক্ষণ। সে আলো দেশকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

তৃতীয় ঘটনা এমনতর যে, ভালো দৃশ্য যেমন তেমন, খারাপ দৃশ্য চোখ কাড়ে না হয়তো কিন্তু চোখে টেনে নেয় ঠিকই। ফুলের টব ও আবর্জনার বালতি পাশাপাশি থাকলে আবর্জনাই দেখি প্রথমে। দৃশ্য তো আছেই; গন্ধটাও কম নয়। দেশে ফিরলে প্রবাসী প্রথমে যা দেখে তা হলো ভিড়। আগেও ছিল, কিন্তু সে ভিড় আরো বেড়েছে। উপচে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে দেখা হয় অরাজকতাও। নানা ধরনের দুর্বৃত্ত ওঁৎপেতে রয়েছে। ধরবে, জব্দ করবে, ঠকাবে।

কোনো মতে পথে বের হয়ে আসতে পারলে দেখবে সে বৈষম্য। বৈষম্য পুরাতন ব্যাপার, কিন্তু তার মনে হবে যে, সেটা বেড়েছে। সত্যি সত্যি তো বেড়েছে, না দেখে উপায় কী। এই বৈষম্য রাস্তায় চোখে পড়বে, নিজের ঠিকানায় পৌঁছলেই টের পাওয়া যাবে। পরিবার ভেঙে গেছে, ক্ষুদ্র এক অংশ ওপরে গেছে উঠে, অপরাংশ, সেটাই বড়, নেমে গেছে নিচে। দেখবে সে তথ্যপ্রযুক্তির প্রাচুর্য ঘটেছে। মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, বিদেশে যা দেখেছে, এখানেও পাবে দেখতে।

কিন্তু এদের প্রাচুর্য অভাব দূর করেনি মানুষের, যা করেছে তা হলো বৈষম্য বৃদ্ধি। অন্তর্গত বৈষম্যকে আরো প্রকটিত করে তুলেছে। না দেখে উপায় থাকবে না। সর্বত্র ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় চলে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, এ খবর জানা আছে প্রবাসীর। দেখবে সে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা পেতে হলে যেতে হবে প্রাইভেট ক্লিনিকে। দেখবে সে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সঙ্কুচিত, প্রাইভেট কারের দাপটে। আর সেই সব গাড়ি যে পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস ছাড়ছে তা শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত করে দেয় মানুষ ও গাছপালাকে।

বিদেশে প্রবাসীদের জন্য সমস্যা মাতৃভাষা চর্চা করা। এখানে এসে দেখবে ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষা ভুলতে চলেছে। এ কেমন ঘটনা, ভাববে সে। বিদেশে আমরা আতঙ্কে থাকি মাতৃভাষা ভুলে যাব বলে, আর এখানে দেখেছি মাতৃভাষা ভোলা যায় কী করে তার জন্য জীবনপণ চেষ্টা। শিক্ষার প্রধান যে ধারা সেই বাংলা মাধ্যমিক ব্যবস্থায় দেখবে সে যে নকল বেড়েছে পরীক্ষায়। শুনবে শ্রেণীকক্ষ থেকে পড়াশোনা উঠে গেছে; যা হওয়ার হয় কোচিং সেন্টারে। প্রবাসীরা দেখেছে পুঁজিবাদী বিশ্বে নৈতিকতার প্রশ্নটি বড় জরুরি হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদীরা নানা অপকর্ম করে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কোনো প্রকার সামাজিক দায়িত্ব নিতে চায় না। প্রবাসী বাঙালি কেউ কেউ ভাবে প্রতিকার রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষায়। কিন্তু প্রবাসী জানে সে শিক্ষা স্কুল শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না, বড়জোর পরিপূরক হওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রবাসী দেখবে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার বেড়েছে; দেখে সে চিন্তিত হবে।

Probashi

লস এঞ্জেলেস এ প্রবাসীদের মেলা


শিক্ষা তো শিক্ষার্থীকে আধুনিক করবে। তাকে দক্ষতা দেবে, বাড়াবে তার মানমর্যাদা। এ কথা তো সত্য, মাদ্রাসাতে প্রধানত যায় গরীব ঘরের ছেলেমেয়েরাই। কেননা, সেখানে খরচা কম। আর যায় কিছুটা অবস্থাপন্ন ঘরের বুদ্ধিবৃত্তিতে কম অগ্রসর সন্তানরা। তারা সেখানে গিয়ে যে শিক্ষা পায় তাতে তাদের জাগতিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না, বরং আরো খারাপ হয়, তাদের শিক্ষা অর্থনৈতিকভাবে তাদের এগিয়ে দেয় না। প্রবাসীর চোখে এটা ধরা পড়ে বেশ সহজেই যে, গরিব ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসা শিক্ষা দেয়া আসলে গরিব মানুষকে গরিব করে রাখার ষড়যন্ত্র। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় এটা যে, গরিব টেরই পায় না যে এটা তার সঙ্গে শত্রুতা মাত্র, সে ভাবে তার উপকার করা হচ্ছে, তাকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী দেখবে এই বিপরীত ঘটনাও যে, মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য যারা উচ্চ হারে সরকারি ব্যয়ের বরাদ্দ দেয়, তাদের কোনো সন্তান-সন্ততি মাদ্রাসায় পড়ে না।

প্রবাসীর মনে এই দুশ্চিন্তা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পীড়াদায়ক হয়ে দেখা দেবে যে, এভাবে একটি সমাজ চলতে পারে কিনা। এর ঐক্যটা কোথায়? না, ঐক্য সে খুঁজে পাবে না। দেশপ্রেম সে প্রবাসীদের মধ্যে যতোটা দেখেছে, দেখে উৎফুল্ল হয়েছে, দেশে ফিরে অনেক বাঙালির মধ্যেই তা দেখতে পাবে না, না পেয়ে দমে যাবে। টের পাবে সে যে, স্বদেশীদের অনেকেই তাকে ঈর্ষা করছে। বলছে খুব ভালো আছো ভাই। কিভাবে যাওয়া যায় তার ফন্দি-ফিকির তারা জানতে চাইছে। ধাক্কা খাবে প্রবাসী এটা দেখে যে, সে যাদের ঈর্ষা করে তাদের কাছেই সে পাত্র হচ্ছে ঈর্ষার। তাতে তার ব্যক্তিগত অহমিকা বাড়ছে ঠিকই কিন্তু সমষ্টিগত ভবিষ্যৎটা তার কাছে উজ্জ্বল মনে হবে না।

সবাই বলবে দেশে নিরাপত্তা নেই। সরকার যে নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। অস্ত্র ও বোমার ব্যবহার বাড়ছে। এমন জিনিস আগে এ দেশে ছিল না। অপরাধী ধরা পড়ছে না। আর ধরা পড়ছে না বলেই অপরাধ বাড়ছে। আসল অপরাধ সুযোগ প্রাপ্তরাই করে থাকে। করে ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। আর সে ক্ষমতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি দলের। সন্ত্রাস মূলত রাজনৈতিক এবং তা ঘটে রাজনীতির স্বার্থে এবং পৃষ্ঠপোষকতায়। ভাড়াটে খুনিও পাওয়া যাচ্ছে অল্প দামেই। পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে এ দেশের মানুষের কখনই কোনো আস্থা ছিল না। ভয় ছিল। কিন্তু সেই আস্থাহীনতা ও ভীতিও এখন যে পর্যায়ে গেছে সেটা আগে কখনো দেখা যায়নি।

প্রবাসী শুনবে কৃষকের দুর্দশার কথা। ফসল খারাপ হলে কৃষকের মাথায় বাজ পড়ে। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু শুনবে সে যে বাম্পার ফসল হলেও কৃষকের সমূহ সর্বনাশ। টমেটো পচনশীল। তা ধরে রাখা যায় না। সেজন্য উত্তরবঙ্গে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে এক মণ টমেটো বিক্রি করে কৃষক ১ সের চাল কিনে ঘরে ফিরেছে। বোরো ধান খুব ফলেছে। তাতে কৃষক বসে গেছে মাথায় হাত দিয়ে। যে ধান তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩০০ টাকা তা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। এই খরচের মধ্যে কৃষকের শ্রমের হিসাবটা নেই। ব্যাপার দাঁড়াচ্ছে এই যে, কৃষক যদি নিজের ক্ষেত্রে ধান না চাষ করে অন্যের ক্ষেত্রে দিনমজুরি খাটতো তাহলে তার উপকার হতো বেশি। খাদ্যে গর্বিত স্বয়ংসম্পূর্ণতা শীর্ণ কৃষকের দীর্ঘশ্বাসে পুষ্ট বটে।

লিটল বাংলাদেশ

লস এঞ্জেলেস এ লিটল বাংলাদেশ


প্রবাসী শুনতে পাবে এবং দেখবেও যে, দেশের নদী-খাল, বিল, পার্ক, খোলা মাঠ সব ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। তার জানা আছে এটা যে, একাত্তর সালে এ দেশে হানাদাররা এসেছিল বাইরে থেকে। তারা ছিল শত্রু, তাদের আচরণ ছিল দৈত্যের মতো। তারা মানুষ মেরে, বাড়িঘর পুড়িয়ে, ধর্ষণ করে, সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল। কিন্তু এবার এসে দেখবে সে যে, বিদেশি হানাদাররা গেছে চলে ঠিকই, কিন্তু দেশী হানাদাররা তৎপর হয়ে উঠেছে মহোৎসাহে, তারা দৈত্য নয় হয়তো তবে রাক্ষস ও শৃগাল বটে যা পায় খেয়ে ফেলে এবং খাওয়াতে কোনো বিরতি নেই, ক্লান্তি নেই। দেখতে পাবে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। বৃদ্ধি করা উচিত ছিল রেল লাইন, সেটা এক ইঞ্চি বাড়েনি বরং কমেছে। বাড়ানো উচিত ছিল নৌপথের সুবিধা। সেটা এক তিল বাড়েনি। বেড়েছে বাস, সড়ক ও সড়কের দুর্ঘটনা। সড়ক নির্মাণ করলে সুবিধা ঠিকাদারদের, সুবিধা বাস-ট্রাক মালিকের। সুবিধা ওসবের বিদেশি বিক্রেতার স্থানীয় এজেন্টের। সেই সুবিধারই পাকা বন্দোবস্ত মানুষের মৃত্যু বিনিময়ে।

বিদেশ থেকে প্রবাসী শুনে এসেছে যে, বাংলাদেশ গ্যাস ও তেলের ওপর ভাসছে, কিন্তু তাতে বাংলাদেশের বিপদের আশু সম্ভাবনা। কেননা, তা বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির কাছে। তারা আমাদের গ্যাস ও তেল তাদের নিজেদের স্থির করা দামে কিনবে এবং পরে তা আন্তর্জাতিক দরে তাদের কাছ থেকেই আবার আমরা কিনে নেব। অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্য। সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়কার অবস্থা।

সমুদ্র বন্দর হচ্ছে অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। বাংলাদেশে বন্দর বলতে আসলে একটাই। চট্টগ্রামে। প্রবাসী শুনবে সেটা ধ্বংসের ব্যবস্থা হচ্ছে বিদেশীদের পাল্টা বন্দর তৈরি করার সুযোগদানের মাধ্যমে। কারা দিচ্ছে? আবার কারা, ওই দেশী লুণ্ঠনকারীরা। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদদৌলা লড়েছিলেন উপনিবেশবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। তারপর ব্রিটিশ শাসনকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। ব্রিটিশ গেছে, কিন্তু উপনিবেশ যায়নি। যে জন্য পাকিস্তানি শাসন আমলে আমাদেরকে লড়াই করতে হয়েছে। আজকে দেশ স্বাধীন। কিন্তু প্রবাসী দেখবে মনুষের মুক্তি তো দূরের কথা দেশের স্বাধীনতাও আসেনি। লগ্নিপুঁজি ও মুক্তবাজার দেশ দখল করে ফেলেছে। ফলে বড় রাষ্ট্র ছোট হয়েছে ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রের কোনো পরিবর্তন আসেনি। তার মতাদর্শ ও সংগঠন দুটোই পুঁজিবাদী ও আমলাতান্ত্রিক। ব্রিটিশ আমলেও এ রকম ছিল, পাকিস্তান আমলেও তাই, এখনো অধিকাংশ সেই রকমই। পরিবর্তন যা তা নামে।

ব্রিটিশ গেছে, পাঞ্জাবি গেছে, এখন এসেছে বাঙালি। বাঙালি শাসক আগের শাসকদের মতোই লুটপাট করে। তবে একটা তফাৎ আছে, আগেকার শাসকরা জানতো তারা বিদেশি, তাই অল্প হলেও ভয়ে ভয়ে থাকতো, এখনকার শাসকদের সেই ভয়টা নেই, কেননা তারা স্বদেশী। এরা লুণ্ঠন করছে আরো নির্মমভাবে। তাদের জন্য দায় নেই কোনো জবাবদিহিতার এবং অবাধে এই লুণ্ঠনই হচ্ছে তাদের রাজনীতি। যে জন্য সর্বত্র এমন নৈরাজ্য, নিরাপত্তার এমন অভাব।

নির্বাচন আসলে হচ্ছে দুইদল ডাকাতের মধ্যে লড়াই। তাই তো নির্বাচন আসছে দেখলে মানুষ কিছুটা ভীত হয়। দুই পক্ষের মধ্যে লড়াইয়ের যে প্রস্ত্ততি তাতে উলুখাগড়াদেরই বিপদ। কে জিতবে, কে হারবে তাতে জনগণের কিছু আসবে যাবে না। তাদের অবস্থা আরো খারাপ হতেই থাকবে। লুণ্ঠনকারীরা তাদের রেহাই দেবে না। প্রবাসী যেটা দেখতে না পেয়ে পীড়িত হবে তা হলো প্রতিরোধ। লুণ্ঠন ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলেও ছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধও ছিল। এখন সেটা নেই। হতাশার কারণ রয়েছে সেখানেই। অনুৎপাদক লুণ্ঠনকারীরা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকে। এ দলে তারা, ও দলেও তারাই। জনগণ কোনো বিকল্প পাচ্ছে না। লুন্ঠনের বাইরে কোনো আদর্শবাদিতা নেই। প্রবাসী দেখবে এটা। দেখে দুশ্চিন্তায় পড়বে। প্রতিরোধ যে একেবারেই নেই তা অবশ্য নয়। আর শুনবে সে এবং আশা করবে যে প্রতিরোধটা শক্তিশালী হোক, মানুষের মুক্তির যে রাজনীতিটা সামনে আসুক। এই রাষ্ট্রের চরিত্র বদল ঘটুক এবং রাষ্ট্রের আদর্শগত সাংগঠনিক বিন্যাসের পরিবর্তন মানুষকে মাুনষের মতো বাঁচতে দিক।

মূল প্রয়োজন ওই আদর্শবাদী রাজনীতির। দেশের মানুষ সেটা গড়ে তুলতে পারছে না। নেতৃত্ব আসবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকেই কিন্তু সে মধ্যবিত্তকে শ্রেণীচ্যুত হয়ে জনগণের সঙ্গে এক হতে হবে। জনগণের স্বার্থকে প্রধান করে তুলতে হবে। তার জন্য সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক। প্রবাসী বুঝবে সেটা। চাইবে ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে। যতোটা চাইবে ততোটাই ভালো। তার বাইরে তো কেবলই হতাশা।

দেশে এখন দেশপ্রেমের খুবই অভাব। প্রবাসী বাংলাদেশী পীড়িত হয়, দেশে ফিরে যখন সে অভাব দেখে এই দেশপ্রেমের। প্রবাসী মাত্রেই যে দেশপ্রেমিক তা নিশ্চয়ই নয়। কেউ কেউ আছে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু অধিকাংশই দেশের কথা ভাবে, দেশের জন্য তাদের মন কাঁদে, দেশের দুর্দশা দেখে তারা পীড়িত বোধ করে। দেশের রাজনীতিতে মীর জাফরদের উৎপাতে প্রবাসী টের পায়, টের পেয়ে তার দুঃখ বাড়ে। কিন্তু প্রবাসী কি করতে পারে? হ্যাঁ, টাকা পাঠায়। তাতে আত্মীয়-স্বজনের উপকার হয়। আত্মীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলে, দালানকোঠা বানায়। প্রবাসীরা কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য দান-অনুদান পাঠিয়ে থাকে। এসব ভালো কাজ। উপকারী কর্তব্য। কিন্তু মূল ব্যাপারটা তো হলো এই যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা না বদলালে দেশের উন্নতি হবে না।প্রবাসীদের পক্ষে ভাবার বিষয় হচ্ছে এ লড়াইয়ে তারা কোনো ভূমিকা নিতে পারে কিনা। কেবল টাকা পাঠালেই যে দেশ বদলাবে না তা তো বোঝাই যাচ্ছে।
আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush

লিটল বাংলাদেশ লস এঞ্জেলেস এর প্রথম অফিশিয়াল কার্য্যক্রমে অভূতপূর্ব সাড়া।

%d bloggers like this: