স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

পোশাক শিল্পে আগুন: লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা


পোশাক শিল্পে আগুন, প্রবাসীদের শোকঃ নিহতদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমবেদনা
লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা
লস এঞ্জেলেস, ২৭ নভেম্বর, একুশ নিউজ মিডিয়াঃ শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য অবিলম্বে সরকারকে নিরাপদ কার্যক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত শেষে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিরাপদ ভবনে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে বিল্ডিংকোড শক্তিশালী করে নিরাপত্তা পরিদর্শকদের আরও দায়িত্ববান হওয়া ও দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার বিরুদ্ধে সরকারের পূর্নদৃষ্টি দেবার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন লস এঞ্জেলেসের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশে ঘোষিত জাতীয় শোক দিবসে লস এঞ্জেলেসের প্রাণকেন্দ্র লিটল বাংলাদেশে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও প্রবাসীদের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা ও শোকসভায় এসব কথা বলা হয়। সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস অ্যান্ড মিডিয়া (বাদাম)।

আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের প্রাণহানির ঘটনা ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস এন্ড মিডিয়া (বাদাম) এক শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। বাদাম-এর আহবানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ প্রবাসীরা এই সভায় যোগ দেন।

শোকসভায় কারখানার নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে ক্রেতা কোম্পানিগুলোর দায়বদ্বতা নিয়ে প্রবাসীরা তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। গত শনিবার সংঘটিত দেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে বৃহত্তম এবং ভয়াবহতম অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যাতে পোশাক শিল্পকে হুমকির মুখে না নিয়ে যায়, প্রবাসীরা এই ব্যাপারে সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার নিমিত্তে দল-মত নির্বিশেষে একমত পোষণ করে।

সভায় মোবারক হোসেন বাবলু স্মারকলিপি পড়ে শোনান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অ্যাঞ্জেলিনোদের মাঝে সুচিন্তিত রূপরেখাসহ বক্তব্য দেন সিরাজুল ইসলাম খোকন, ফরিদ উ আহমেদ, সোহেল রহমান বাদল, মুশফিকুর চৌধুরী খসরু, এম হোসেন বাবু, ইসমাইল হোসেন, ড্যানী তৈয়ব, এম এ বাসিত, ডঃ জয়নাল আবেদিন, তৌফিক সোলেমান খান তুহিন, মোরশেদুল ইসলাম, আবু হানিফা, ডঃ মাহবুব হাসান, ফারহানা সাঈদ, মোঃ মুরাদ হোসেন, মুজিব সিদ্দিকী ও এম কে জামান।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যেন কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না পড়ে তার প্রতি সতর্ক ও সচেতন দৃষ্টি দেবার জন্য সকলকে কাজ করে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান লস এঞ্জেলেসের রাজনৈতিক কর্মীরা। সভায় নিরাপত্তা পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে প্রবাসীরা বলেন, ব্যাক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে দেশের এই বৃহত্তর শিল্পকে বিশ্বের বুকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

This slideshow requires JavaScript.

বক্তারা জানান, কর্তৃপক্ষের অবহেলা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, তেমনি শ্রমিকদের ঘামের বিনিময়ে মুনাফার অংশ যেন শ্রমিকদের কল্যাণে সচেতনভাবে ব্যয় হয় তার প্রতি মালিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্বতা অস্বীকার করার সুযোগও নেই। দুর্ঘটনা যেন হত্যাকাণ্ডে পরিণত না হয় তার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান সচেতন প্রবাসীরা।

গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় নিহতদের সত্যিকারের পরিচয় সংগ্রহ করে সেই সকল দুস্থ পরিবারদের সরাসরি সাহায্য করার জন্য প্রবাসীরা একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পোশাক শিল্প কারখানায় সংগঠিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবার ও পরিজনকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়। এ ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য লাভ কামনা করা হয়।

আলোচনা ও শোকসভায় আরো যোগ দেন সাইফুল আনসারী চপল, জহির ইউ আহমেদ, আবদুল খালেক মিয়া, রেজাউল চৌধুরী, আব্দুল কে মিয়া, জামাল হোসেন, মতিউর রহমান মার্টিন, আলী তৈয়ব, কাজী নাজির হাসিব, রেজাউল চৌধুরী, জামাল হোসেন, মশিউর চৌধুরী, আখতার ভুঁইয়া প্রমুখ।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাদাম-এর আহবায়ক জাহান হাসান। সহযোগিতায় ছিলেন পঙ্কজ দাস ও শফিউল ইসলাম বাবু।

বাংলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার ৪৩.১০ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় ৩১.০%, ভারতে ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ১০%, ভিয়েতনামে ৬.৫%, নেপালে ৪.৪% এবং সবচেয়ে কম চীনে, ৩.২%। অর্থাৎ বাংলাদেশের মালিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। এই মালিকরা নিজেরা কোটি কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি ব্যবহার করছে। আর শ্রমিকরা না খেয়ে জীবন যাপন করছে।


পোশাক শিল্পে দুর্দিন : ভাল নেই শ্রমিকরা

এফএনএস (আহমেদ ফয়সাল) : পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিন থেকে চলছে শ্রমিক ও মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ¡। এ দ্বন্দে¡র ফলে দেশের প্রধান এ রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প আজ বিপর্যয়ের মুখে। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন শ্রমিক ও মালিকদের সুসম্পর্ক। সাম্প্রতিক সময়ে পোষাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ আবারও দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার আশুলিয়ার ৩টি পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামে এবং বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই অসন্তোষ আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। জানা যায়, বিনা কারণে শ্রমিক ছাটাই এবং শ্রমিকদের বেতন আটকিয়ে রাখা, শ্রমিকদের শ্রমের অধিকার এবং পাওনা বেতন প্রদানের দাবিতে বিক্ষোভ করছে পোশাক শ্রমিকরা।

মালিক পক্ষের অবহেলা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে দিনে দিনে অস্থির হয়ে উঠছে এ শিল্পটি। অথচ রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭৫ ভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রম বিনিয়োগ হয় এই খাতে। সবচেয়ে বেশি পরিবার নির্ভরশীল এর ওপর। বাংলাদেশে সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত খাতও এটাই। তবে এই সুবিধার সম্পর্ণটাই যায় মালিকদের পকেটে। শ্রমিকদের দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অবহেলিত খাত এই তৈরি পোশাক শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশের একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা! যারা ঢাকায় থাকেন এবং যারা ঢাকার বাইরে থাকেন, তারা প্রত্যেকেই জানেন যে এই টাকায় একমাস চলা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব না। পরিবার নিয়ে তো অসম্ভব কথা। বলা চলে, ঢাকার একজন ভিক্ষুকের মাসিক আয়ও একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের চেয়ে বেশি!

শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণ ১. চাল, ডাল, তেলসহ জিনিষপত্রের দাম বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না; ২. সময় মতো বেতন এবং ওভারটাইম ভাতা না দেয়া, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাচুইটি না থাকা; ৩. কর্মকর্তা কর্তৃক শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, অমানবিক ব্যবহার করা; ৪. যে কোনো অজুহাতে শ্রমিকদের ছাঁটাই, শোকজ ইত্যাদির মাধ্যমে হয়রানী করা; ৫. গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার না থাকা, অর্থাৎ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কথা বলার কোনো পক্ষ নেই; ৬. ব্যবসায়ীরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগ গ্রহণ করে আবার মালিকের পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদের উপর নির্যাতন চালায়। এমনকি মালিকদের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ নানা বিরোধে শ্রমিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব নানা বিষয়ের প্রতিক্রিয়ায় শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ সারা মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবনযাপেনর উপযোগী ন্যূনতম মজুরি না পাওয়া।

বিজিএমইএ’র পরিচালকের হিসাবে একজন মালিক বছরে ৫০০ শ্রমিকের একটি কারখানা থেকে ১ কোটি ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিট মুনাফা করছে। বিজিএমই-এর এক পরিচালক জানান, বিশ্বমন্দা, জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও তারা লোকসান গুনছেন না। লাভের হার হয়ত কিছু কমেছে। আগে যেখানে হয়ত প্রতি পিসে ২০ টাকা লাভ হত, এখন সেখানে হয়ত ১৫ টাকা লাভ হচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন দেশের মালিকদের মুনাফার হার পর্যালোচনা করলেও মালিকদের মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচিত হয়। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে মালিকদের মুনাফার হার ৪৩.১০ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় ৩১.০%, ভারতে ১১.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ১০%, ভিয়েতনামে ৬.৫%, নেপালে ৪.৪% এবং সবচেয়ে কম চীনে, ৩.২%। অর্থাৎ বাংলাদেশের মালিকরা বিশ্বের সবচেয়ে কম মজুরি দিয়ে, সরকারের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। এই মালিকরা নিজেরা কোটি কোটি টাকার গাড়ি-বাড়ি ব্যবহার করছে। আর শ্রমিকরা না খেয়ে জীবন যাপন করছে।

মালিকরা বলে, তারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে, এটাই যথেষ্ট। শ্রমিকদের এতেই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মজুরি যা দিচ্ছি তা দিয়েই শ্রমিকদের চলা উচিত। বাজারে যে হারে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে সে হারে তারা মোটাচাল, মশুর ডাল, কমদামি তরিতরকারি কিনে কোনমতে জীবন যাপন করে। গার্মেন্টস-এ ওভারটাইম ডিউটি করেও দুই-আড়াই হাজার টাকা বেতন পাওয়া শ্রমিক তার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং প্রোটিন পাবে কীভাবে? অথচ এরাই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। ১৯৭৮ সালে ২টি গার্মেন্টস কারখানা দিয়ে যে শিল্পের যাত্রা শুরু সেখানে আজ প্রায় ৪৫০০টি কারখানা স্থাপিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শ্রমিক এ শিল্পের সাথে যুক্ত। বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক (চীন ও তুরস্কের পর) বাংলাদেশকে তৃতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, তুরস্কে পোশাক শিল্পের একজন শ্রমিক প্রতি ঘণ্টায় ন্যূনতম মজুরি পান ২ দশমিক ৪৪ ডলার, মেক্সিকোতে ২ দশমিক ১৭ ডলার, চীনে ১ দশমিক ৪৪ থেকে ১ দশমিক ৮৮ ডলার, পাকিস্তানে শূণ্য দশমিক ৫৬ ডলার, ভারতে শূণ্য দশমিক ৫১ ডলার, শ্রীলঙ্কায় শূণ্য দশমিক ৪৪ ডলার এবং ভিয়েতনামে শূণ্য দশমিক ৪৪ ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পে ন্যুনতম মজুরি এক হাজার ৬৬২ দশমিক ৫০ টাকা। দিনে আট ঘণ্টা কর্মদিবস ধরে এবং মাসে চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে প্রতি ঘণ্টায় ন্যুনতম মজুরি দাঁড়ায় শূণ্য দশমিক ১২ ডলারেরও কম। বিশ্বের যেকোনো দেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকের তুলনায় এ মজুরি কম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে কম মজুরি।

সরকারকে মনে রাখতে হবে এই তৈরী শিল্প খাতটি একবার দেশছাড়া হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেমে যাবে, তেমনি লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। পাটকলগুলো যেভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোও যেন সেভাবে বন্ধ হয়ে না যায়। পাশাপাশি এ ব্যাপারে পোশাক শিল্প কারখানার মালিকদেরও খেয়াল রাখতে হবে।

বিয়ে শুধু দুইজন মানব-মানবীর মধ্যেই ঘটে না, বরং বিয়ে হয় দুটো পরিবারের। কথাটি মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশী প্রযোজ্য। যে মেয়েটিকে আপনি বউ করে ঘরে নিয়ে আসবেন, সে শুধু আপনার বউ না, সে আপনার বাবা-মায়ের বৌমা, ভাই-বোনের ভাবী। সমতা না থাকলে পুরো পরিবারকে আপন করে নিতে সমস্যা হতে পারে।


কাকে বিয়ে করবেন,
কখন করবেন?

Bangladeshi Wedding

Bangladeshi Wedding

আমিনূল মোহায়মেন
 

মিসরে বিয়ে শাদী নিয়ে একটা লেখা সোনার বাংলাদেশ ব্লগে প্রকাশ করার পর অনেকে তাদের জন্য কনে দেখতে বলেছেন। তাদের মন্তব্য পড়তে গিয়ে মনে হলো, কনে খোজা নিয়ে জরুরী কিছু পরামর্শ দিয়ে একটা কিছু লিখলে এখনো যারা বিয়ে করেননি, তাদের উপকারে আসতে পারে।

বিয়েটা হচ্ছে জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমাদের দেশে যেহেতু একটার বেশী বিয়ে করার রেওয়াজ নেই, তাই অত্যন্ত ভেবেচিন্তে, হিসাব নিকাশ করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। একটা ভুল বা খারাপ বিয়ে মানে পুরো জীবনটা নষ্ট।

ধরুন, আপনি মোটামুটি একটা চাকুরী করেন, কোন রকমে সংসার চলে যায়। কিন্তু, বিয়ে করে ফেললেন ধনীর দুলালীকে। তার খরচ মেটাতে তখন আপনার জীবন শেষ, সাথে বোনাস হিসাবে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা। আবার স্ত্রী যদি চিররুগ্ন হন, তাহলে জীবনের অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক সরকারী চাকুরী করতেন। ভালো ভালো পজিশনে কাজ করেছেন। কিন্তু, কিছুই জমাতে পারেন নি, কেননা, তার স্ত্রী সারাজীবন অসুস্থ থেকেছেন।

কাকে বিয়ে করবেন?

জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মে যে বিষয়টিকে সবথেকে বেশী জোর দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে দুই পক্ষের সমতা। এই সমতা বলতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানই মূলত: বোঝানো হয়েছে।

বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমেই যাকে বিয়ে করতে চান, তার একটা স্পেসিফিকেশন তৈরী করুন। সবথেকে ভালো হয়, এই স্পেসিফিকেশন যদি আরো আগেই তৈরী করে রাখেন। তাহলে কাউকে ভালো লাগলেও, আগে থেকেই হিসাব নিকাশ করে অগ্রসর হতে পারবেন। বেহিসেবী প্রেমের কারণে প্রেমের বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সফল হয় না।

জীবন সঙ্গীর স্পেসিফিকেশনে যে বিষয়গুলো থাকতে পারে তা হচ্ছে:

১. সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান:

জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের সমতাকে সবথেকে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। বিয়ে শুধু দুইজন মানব-মানবীর মধ্যেই ঘটে না, বরং বিয়ে হয় দুটো পরিবারের। কথাটি মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশী প্রযোজ্য। যে মেয়েটিকে আপনি বউ করে ঘরে নিয়ে আসবেন, সে শুধু আপনার বউ না, সে আপনার বাবা-মায়ের বৌমা, ভাই-বোনের ভাবী। সমতা না থাকলে পুরো পরিবারকে আপন করে নিতে সমস্যা হতে পারে।

অসম আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কারণে অনেক বিয়ে ভেঙ্গে যেতে পারে। বর্তমানে আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার কারণে এই বিষয়টির গুরুত্ব মারাত্মক হতে পারে। আপনি মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, পাশ করে মোটামুটি ভালো চাকুরী শুরু করেছেন। এখন যদি এমন কোন মেয়েকে বিয়ে করেন, যে ছোটবেলা থেকে গাড়ীতে চলাচল করে অভ্যস্ত, তাহলে আপনার গাড়ী না থাকলে তার জন্য খুব কষ্টকর হবে।

মনে হতে পারে, তাহলে নিজের থেকে কম আর্থ-সামাজিক অবস্থানের কাউকে বিয়ে করলেই তো হলো। আপনার জীবনসঙ্গীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান যদি আপনার থেকে বেশী কম হয়ে থাকে, তাহলেও সমস্যা। মানসিকতায় নাও মিলতে পারে, বিশেষ করে আপনার পরিবারের সাথে।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান:

বৈবাহিক জীবনের পূর্ণ আনন্দ তখনই পাওয়া যায়, যখন দুই জনের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ম্যাচ করে। এ ধরণের ক্ষেত্রে সঙ্গীর সাথে কিছুক্ষণ থাকলেই মনের সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর হয়ে যেতে পারে, কেননা, তার কাছে আপনি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেন। তা না হলে, আপনি বউ এর থেকে বন্ধুদের সাথে থাকতে বেশী পছন্দ করবেন।

আপনি খুব রাজনীতি সচেতন, অথচ, আপনার জীবন সঙ্গীর এ বিষয়ে কোন আগ্রহ নেই। তাহলে তার সাথে কথা বলতে আপনার ভালো লাগবে না। আপনি সাহিত্য খুব পছন্দ করেন, সে এসবের কিছুই বোঝে না – তাহলে এক সময় আপনি তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।

জীবন সঙ্গীর মেধাবী হওয়াটাও দরকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেধাবী পিতা-মাতার সন্তান মেধাবী হয়।

৩. দৈহিক সৌন্দর্য্য:

আমাদের দেশে বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে দৈহিক সৌন্দর্য্যকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়। দৈহিক সৌন্দর্য্যের অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এটিই মুখ্য হওয়া উচিৎ নয়।

৪. ব্যক্তিত্বের মিল:

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিত্বের মিল (ম্যাচ) হওয়া দরকার। এই মিল মানে যে দুইজনকে একই রকম হতে হবে, তা নয়। দুইজন কিছুটা বিপরীত চরিত্রের হলে ভালো হয়। যদি দুইজনই খুব শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের হয়ে থাকে, তাহলে সংসার ভেঙ্গেও যেতে পারে। আবার দুইজনই যদি খুব নরম প্রকৃতির হয়, তাহলে সন্তান লালন-পালন, অন্যান্য সাংসারিক বিষয়, যেখানে কিছুটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাতে সমস্যা হতে পারে।

৫. ধার্মিকতার মিল:

ধার্মিকদের জন্য এই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি খুব ধার্মিক, অথচ, জীবন সঙ্গী ধর্মের ধারই ধারেনা – এ রকম হলে সমস্যা হতে পারে।

৬. শারীরিক সুস্থতা:

এটির গুরুত্ব খুব বেশী। আপনার জীবন সঙ্গী অবশ্যই যেন চির রোগা টাইপের না হয়।

৭. বয়সের মিল:

মোটামুটি সমবয়সী বিয়ে করা ভালো। বরের থেকে কনের বয়স ২-৩ বছর কম হলেই ভালো হয়ে। কণের বয়স বেশী হলে পরে সমস্যা হতে পারে। আবার কনের বয়স অনেক কম হওয়াও ঠিক নয়।

৮. আর্থিক সক্ষমতা:

ছেলেকে বিয়ের আগে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া দরকার। এই স্বচ্ছল মানে এই না যে, তার অনেক টাকা জমানো থাকতে হবে, বা নিজের বাড়ী-গাড়ী থাকতে হবে, বরং সে যেন নিজের সংসার নিজে চালাতে পারে – সেই পরিমাণ উপার্জন থাকা দরকার। পিতা-মাতার উপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল অবস্থায় বিয়ে করা উচিৎ নয়।

ছেলের একার পক্ষে সংসার চালানোর মত উপার্জন না থাকলে চাকুরীজীবি মেয়ে বিয়ে করা যেতে পারে।

৯. নিকটাত্মীয় বিয়ে না করা:

নিকটাত্মীয় বিয়ে করলে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের নানা রকম শারীরিক সমস্যা হতে পারে।

বিয়ে করার বয়স:

আমার মতে ছেলেদের বিয়ে করার সবথেকে ভালো বয়স হচ্ছে ২৫ বছর, মেয়েদের ২২-২৩। মেয়েদের এর আগে বিয়ে হলে তারা শারীরিকভাবে পূর্ণ নাও হতে পারে এবং যেহেতু, বিয়ের পর তাদেরকে একটি নতুন পরিবেশে চলে যেতে হয়, সেই পরিবেশ মোকাবেলা করার মত পরিপক্কতা তাদের নাও আসতে পারে। আবার বেশী বয়সে বিয়ে করলে যেমন সন্তান শারীরিক ও মেধার দিক থেকে যথেষ্ঠ শক্তিশালী না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি সন্তান লালন-পালন করার জন্য পিতা-মাতার হাতে পর্যাপ্ত সময়ও থাকে না।

বিয়ে করার জন্য কিভাবে অগ্রসর হবেন?

আপনার জীবন সঙ্গীর স্পেসিফিকেশন তৈরী করার পর মনে মনে খুঁজতে থাকুন। এভাবে একটা শর্টলিস্ট করে ফেলুন। তারপর তাদের সম্পর্কে খোজ-খবর নিতে থাকুন। খোজ-খবর নেয়ার সময় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়গুলো নিয়েও খোজ খবর নিতে হবে। দেখা গেলো, মেয়ে মেধাবী, ধার্মিক, সুন্দরী, কিন্তু, তাদের পরিবারের লোকেরা খুব অসামাজিক। তাহলে আপনার পরিবারের সাথে তাদের মিল নাও হতে পারে।

দুই পক্ষের কথা-বার্তা হয়ে গেলে দিন ঠিক করে আমাদেরকে দাওয়াত দিবেন। কার্ডে লিখে দিবেন, ‘উপহার নয়, শুধুমাত্র দোয়া চাই।’