এই পানীয় যেখানে তুমুল জনপ্রিয়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যথেষ্ট অসন্তোষ রয়েছে, সেই বাংলাদেশে এমন অরাজনৈতিক অথচ জনমুখী আন্দোলন গড়ে তোলা কি সম্ভব?


দ্য টি পার্টি

জামান সরদার

এ দেশে চায়ের প্রচলনে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যেসব বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করেছিল, তা এখন হাস্যরসের উপাদান। বাঙালির সান্ধ্য আড্ডা কীভাবে ‘পার্টি’তে রূপান্তরিত হলো এবং সেখানে চায়ের একক আধিপত্য খর্ব হয়ে পানীয় বৈচিত্র্য ঘটল, সেও এক ইন্টারেস্টিং ইতিহাস। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘টি পার্টি’ কিন্তু আরও মজার। অনেকেই জানেন, ব্রিটিশরা তাদের একটি উপনিবেশ ভারতের নাগরিক সমাজকে চায়ে মাতোয়ারা করতে সফল হলেও আরেক উপনিবেশ মার্কিন মুলুকে খুব একটা কায়দা করতে পারেনি। চা সেখানে বরং গণতোপের মুখে পড়েছিল। যে কারণে আমেরিকায় এখনও চা নয়, কফির আধিপত্য। মার্কিন নাগরিকদের বছরে মাথাপিছু কফি গ্রহণ ৪ কেজি ২০০ গ্রাম হলেও চায়ের পরিমাণ শুধু ২০০ গ্রাম।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা যেভাবে লবণ সত্যাগ্রহ পালন করেছি, সেই আঠারো শতকের শেষ ভাগেই আমেরিকানরা একই স্টাইলে ‘টি ডাম্পিং’ কর্মসূচি পালন করেছে। আমাদের মতো আমেরিকানরাও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কর বসানোর প্রতিবাদে চা বর্জন করেছিল। ১৭৭০ দশকে বিক্ষোভকারীরা জোর করে বোস্টন উপকূলে ভেড়ানো ব্রিটিশ জাহাজে উঠে চায়ের কার্টন কেড়ে নিয়ে সাগরে ফেলে দিত। পাড়ায় পাড়ায় এমন স্বেচ্ছাসেবক দল গঠিত হতে থাকে। চা-বিরোধী এই ছোট অথচ খুবই জনপ্রিয় দলগুলোর নাম হয় ‘বোস্টন টি পার্টি’।
পুরনো আদলের এ আন্দোলন ফের যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষ করে নিউইয়র্ক স্টেটে ফিরে আসে গত বছরের গোড়ার দিকে। ওই রাজ্যের গভর্নর বেশ কিছু বাড়তি কর আরোপের প্রস্তাব করলে স্থানীয় লোকজন খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ করে। বোস্টন শব্দটি ছেঁটে ফেলে তারা এর নাম দেয় ‘টি পার্টি’ বিক্ষোভ। বলাবাহুল্য, আমেরিকা হচ্ছে হাজার করের দেশ_ অন্যান্য রাজ্যেও এমন কিছু কর ছিল যেগুলো নাগরিকরা পছন্দ করছিল না। ফলে দ্রুতই ‘টি পার্টি’ গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে কেবল কর হ্রাস নয়; তাদের তৎপরতায় যুক্ত হয় সরকারের ব্যয় কমানো, জাতীয় ঋণ কমানো, ফেডারেল বাজেট ঘাটতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের আদি সংবিধান মেনে চলার দাবি।
বলাবাহুল্য, টি পার্টি রাজনৈতিক দল নয়; কিন্তু জনপ্রিয়তায় রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে কমও নয়। সদ্য সমাপ্ত সিনেট ও কংগ্রেস নির্বাচনে তারা যেসব প্রার্থীকে সমর্থন দেয় তারা বেশ ভালো ফলও করেছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে টি পার্টি এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, টাইম ম্যাগাজিন ২০১০ সালে তাদের পারসন অব দ্য ইয়ার তালিকায় এই সংগঠনকে অন্যতম রানারআপ নির্বাচিত করেছে।
মোদ্দা কথা, অরাজনৈতিক সংগঠন কীভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে, চায়ে অরুচির দেশে ‘টি পার্টি’ তা ভালোভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। এই পানীয় যেখানে তুমুল জনপ্রিয়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে যথেষ্ট অসন্তোষ রয়েছে, সেই বাংলাদেশে এমন অরাজনৈতিক অথচ জনমুখী আন্দোলন গড়ে তোলা কি সম্ভব?

%d bloggers like this: