মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবীয় জনগণের মতাদর্শিক সংঘর্ষ


রামজে বারোউদ • স্বেচ্ছাচারীদের চ্যালেঞ্জ করা, পুরনো কাঠামো ধ্বংস করা এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য কর্মপন্থা উদ্ভাবনের কাজে আরবদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ব্যর্থ নীতি, ভুল ধারণা ও আত্মস্বার্থে অবিচল রয়েছে। আরবরা নিজেদের মধ্যে অনেক বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে, কিন্তু এ বিষয়ে খুব কম লোকই ভিন্ন মত পোষণ করে যে, এখন পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। মুবারক ও বেন আলীর মতো স্বেচ্ছাচারীদের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করে, তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জসহ নতুন সকাল। এ এলাকায় গণতন্ত্র, সুশীল সমাজ ও নাগরিকত্ব বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আরবের যেসব বুদ্ধিজীবী এখনো সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বাগাড়ম্বর করে তাদের ওয়াশিংটন ভিত্তিক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী কাজে লাগিয়েছে অথবা তাদের মধ্যে এমন কিছু বেপরোয়া লোক আছে যারা মিথ্যার বেসাতি বিক্রেতা রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজে উপস্থিত হন।

একটা কথা সহজে অনুমেয় – আরব বিশ্বের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। হোসনি মুবারক যখন মিসরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখনকার অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার মিল নেই। একদল ‘আরব মধ্যস্থতাকারীর’ পরিচালনায় মুবারকের প্রধান দায়িত্ব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির প্রতিফলন ঘটানো। ব্যাপারটা ছিল যেন তা মিসরের জাতীয় স্বার্থের জন্যও একটা জরুরি বিষয়। ইতোমধ্যে সিরিয়ার বাশার আল আসাদ পরস্পরবিরোধী অবস্থার মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন। তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে ভালো কাজে কৃতিত্ব লাভের জন্য তিনি বেপরোয়া ছিলেন – তিনি এখনো আরব প্রতিরোধের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ২০০১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান দখল করে তখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কথাটা আরব সংস্কৃতিতে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত করা হয়। সাধারণ আরববাসীদের এমন বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা হয় যা তাদের কাছে গুরুত্বহীন ছিল, অথচ সেই বিষয়টিই এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়।

আরব নারী-পুরুষ সবাইকে অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়, এমনকি তাদের আশাশূন্য করা হয়। তাদের শুধু ওসামা বিন লাদেন, আল কায়েদা ও অন্যান্য বিষয়ে জনমত জরিপের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ এসব বিষয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও অবমাননার জন্য দায়ী কোনো বিষয় ছিল না।

আরব স্বেচ্ছচারীরা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদ্ধ সংস্কারকে গ্রহণ করে। ইয়েমেনের আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ‘আল কায়েদাকে পরাজিত’ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক শত্রুভাবাপন্নভাবে দখল অথবা নিজেকেই ক্ষতিকর একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে যে কোনো একটা পথ বেছে নিতে হয়। তিনি শেষোক্ত বিকল্পটি বেছে নেন এবং এমন ভূমিকার ফলাফল হাতে হাতেই পেয়ে যান। ইয়েমেনী জনগণ রাস্তায় নেমে আসে – তারা দাবি করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের। সালেহ অনুগত বাহিনী ও রিপাবলিকান গার্ডদের পাঠান হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আল কায়েদা যোদ্ধাদের এবং নিরস্ত্র গণতন্ত্রকামী লোকদের একসঙ্গে হত্যা করার জন্য। সরাসরি ও কঠোর এ কাজকে তুলনা করা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অকথিত দরকষাকষির অাঁতাত, তোমাদের খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব যতক্ষণ আমি নিজেকে ধ্বংস করতে পারব এমন ভাবনার সঙ্গে।

লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো কাজে লাগান। তার শাসনামলে প্রতিনিয়ত জোর দেওয়া হয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর সদস্যদের মধ্যে আল কায়েদা আছে। এসব কথা পশ্চিমা গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। পাশ্চাত্যকে শান্ত করার জন্য গাদ্দাফি এমন বেপরোয়া হয়ে যান যে, তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ফিলিস্তিনি ‘চরমপন্থীদের’ বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব স্বৈরশাসকরা যে ভাষায় কথা বলেন তা নির্যাতনের ভাষা কোষে খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এটা একটা বিস্ময়কর বিষয়। অপরদিকে সাধারণ আরব জনগণ তাদের দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাওয়ার আশায় উদ্বেলিত ছিল। আল কায়েদা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণনা অনুযায়ী আরব জনগণ ঐক্যবদ্ধ নয়, অন্য কিছু বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ যা পশ্চিমা ভাষ্যকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। অংশীদারিত্বমূলক ইতিহাস, ধর্ম, ভাষা ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ঐক্য ছাড়াও তাদের মধ্যে আছে নির্যাতন, বিচ্ছিন্নতা, অন্যায় ও অসাম্যের এক সাধারণ অভিজ্ঞতা।

২০০৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের তৃতীয় আরব উন্নয়ন রিপোর্টে বলা হয় যে, আধুনিক আরব রাষ্ট্রে ‘নির্বাহী প্রক্রিয়ার ধরন একটা কৃষ্ণ গহবরের মতো, যা এর আশপাশের সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে গঠন করে যে, তা থেকে কিছু এগিয়ে যায় না এবং যা থেকে কিছু পালিয়ে যেতে পারে না।’ আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য ২০০৯ সালটা খুব ভালো ছিল না। ওই সময় এ ধরনের রিপোর্টের পঞ্চম খন্ডে বলা হয়, ‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে আশা করা হয়। অথচ বেশ কয়েকটা আরব দেশে দেখা গেছে, তা হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক সনদ ও জাতীয় শাসনতান্ত্রিক ধারাগুলোর প্রতি হুমকিস্বরূপ।’ মে’তে টাইম ম্যাগাজিন ‘হাউ দ্য এরাব স্প্রিং মেড বিন লাদেন অ্যান আফটারথট’ শিরোনামে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। আরব বিপ্লবের সম্মিলিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে ওই রিপোর্টে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, মিসরের তাহরির স্কোয়ারে ওসামা বিন লাদেনের প্রশংসা করে কোনো ব্যানার দেখা যায়নি। তিউনিসিয়া, লিবিয়া বা এমনকি ইয়েমেনেও সরকারবিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে তার ডেপুটি আয়মান আল জাওয়াহিরির কোনো ছবি দেখা যায়নি।’

সত্যের এই প্রকাশ পশ্চিমা মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা হলেও তাকে মোটামুটিভাবে বলা যায় একটা প্রতারণা। আসল কথা হলো, আল কায়েদা মডেল কখনো আরব সমাজের মূলধারায় প্রতিফলিত হয়নি। আরব বিপ্লব আল কায়েদা সম্পর্কে আরব সমাজের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেনি। কারণ ওই ধারণা সমগ্র আরব সমাজের ধারণার খুবই সামান্য একটা অংশ মাত্র। যা হোক, এসব বিপ্লব আরবদের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ধারণাকে এখনো সত্যিকারভাবে চ্যালেঞ্জ করেনি।

জগবি ইন্টারন্যাশনাল জুলাইয়ে এরাব অ্যাটিচিউড ২০১১ প্রকাশ করে। এতে ছয়টি আরব রাষ্ট্রের এমন ধারণা প্রকাশ পায় যা এতে আরবদের মধ্যে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তা শতকরা ১০ ভাগ কমে যাওয়ার কথাও রয়েছে। ২০০৯ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবামা যখন তার বিখ্যাত ভাষণ দেন তখন অনেক আরব মনে করে যে, কোনো কোনো অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-আরব অগ্রাধিকার চূড়ান্তভাবে এসে মিলেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কোনো অনুকূল দিকে পরিচালিত না হওয়ায় আরবরা অনুধাবন করে, মার্কিন নীতিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েই আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধ, ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন এবং তাদের পুরনো মিত্র অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ আরব শাসক ও অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আরবরা আবিষ্কার করেছে অথবা পুনরায় আবিষ্কার করেছে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কোনো মিল নেই, বরং ওই দুই ধারা আসলে সাংঘর্ষিক পর্যায়ে আছে।

এটা খুবই স্বাভাবিক, মধ্যপ্রাচ্যের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট স্বার্থ ও লক্ষ্যে তার নীতি পরিচালিত করবে। কিন্তু আসলে যা হচ্ছে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের জন্য অধিকাংশ আরব দেশের আশা আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থ পুরোপুরি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরব স্বৈরাচারী শাসকদের সহায়তায় ওয়াশিংটনের অস্পষ্ট ও বিভ্রান্ত নীতি আরব জাতিগুলোর জন্য অকথিত ক্ষতি ডেকে এনেছে। লাখ লাখ সাধারণ আরব যাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অগ্রাধিকারকে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে এবং এখন আরব জনগণ দেখাচ্ছে যে, তারা ওই বাস্তবতা গ্রহণে আর রাজি নয়।

ইন্টারনেট থেকে ভাষান্তর [সাপ্তাহিক বুধবার থেকে]
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

কোন পথে আরব বিশ্ব


কোন পথে আরব বিশ্ব
তা রে ক শা ম সু র রে হ মা ন
আরব বিশ্বের রাজনীতি এখন কোন পথে? গেল বছরের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলির দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে তাতে গাদ্দাফির পতন ও মৃত্যুই শেষ কথা নয়। বরং পরিবর্তন আসছে সিরিয়ায়, সেখানে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দিন যত যাচ্ছে, দেশটিতে গণঅসন্তোষ তত বাড়ছে। গত প্রায় আট মাস ধরে সেখানে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট আসাদকে কিছুটা নমনীয় মনে হয়। গত ২ নভেম্বর কায়রোতে আরব লিগের প্রস্তাবনায় সিরিয়ায় সহিংসতা বন্ধে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী সিরিয়ার বিভিন্ন শহর থেকে সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তির ভবিষ্যত্ ইতোমধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেননা চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সিরিয়ার সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ব্যবহার করেছে এবং একটি ঘটনায় ২৪ জন মানুষ হোমসে শহরে মারা গেছে। চলতি সপ্তাহে কায়রোতে সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে আলাপ শুরু হওয়ার কথা। এই আলোচনার ফলাফলের ওপর অনেক কিছুই এখন নির্ভর করছে। বলা ভালো, আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদ ১৯৭১ সাল থেকেই সিরিয়ার ক্ষমতায় ছিলেন। বাথ পার্টির মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা পরিচালনা করতেন। ২০০০ সালে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান বাশার আল আসাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তনের ঢেউ গিয়ে লেগেছে বাহরাইনেও। সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও শাসক হামাদ বিন ঈসা আল খলিফার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। গত ৪ নভেম্বর রাজধানী মানামায় বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন। পুলিশের গুলিতে একজন বিক্ষোভকারী মারাও গেছেন। তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে বাহরাইন পর্যন্ত সর্বত্রই সরকার পতনের আন্দোলন হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরকারের পরিবর্তন হয়েছে এবং একটি গণতান্ত্রিক ধারাও সেখানে শুরু হয়েছে। তিউনিসিয়ায় সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং একটি ইসলামিক শক্তি সেখানে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এন্নাহদার বিজয় আরব বিশ্বে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে। লিবিয়ায় গণ-আন্দোলনের মুখে গাদ্দাফির পতন হয়নি। একটি গৃহযুদ্ধে এবং বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপে গাদ্দাফির সরকারের পতনই শুধু হয়নি, গাদ্দাফি নিজে নিহতও হয়েছেন। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়াতে কোন ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী আট মাসের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন আছে অনেক। যদি লিবিয়াতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তা হলে আরেকজন স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। মুস্তাফা আবদেল জলিলের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সেখানে যুদ্ধ পরিচালক করেছে এবং গাদ্দাফি-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে থাকবে। অতীতে আবদেল জলিল গাদ্দাফির বিচারমন্ত্রী ছিলেন। পক্ষ ত্যাগ করে তিনি বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেন। কিন্তু জিবরিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে সেখানেই বসবাস করেন। সম্ভবত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। জলিলের চেয়ে জিবরিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের খুব কাছের ব্যক্তি হবেন। যুদ্ধের কারণে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র সাধারণ মানুষের কাছে চলে গেছে। গাদ্দাফি নিজেও অস্ত্রভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন। ন্যাটোর বিমান থেকেও বিদ্রোহীদের জন্য অস্ত্র ফেলা হয়েছিল। এসব অস্ত্রের হদিস পাওয়া খুব কঠিন হবে। বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে ওইসব অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে। এই অস্ত্র আল কায়দার কাছে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ফলে গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় অস্ত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করবে, যা গণতন্ত্রের উত্তরণে কোনো সাহায্য করবে না। গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় ইসলামী জঙ্গিরা অন্যতম একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বেশ কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপের খবর পাওয়া যায়, যারা গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে; যেমন, বলা যেতে পারে Islamic Fighting Group (IFG), Abu Ubaidah-bin Januah Brigade, Abdel Hakim Belhadj Group, Tripoli Military Council কিংবা Salafi Group-এর কথা। এদের কারও কারও সঙ্গে আল কায়দার যোগাযোগ রয়েছে বলেও ধরে নেওয়া হয়। এক সময় IFG-কে পশ্চিমা শক্তি সমর্থন করেছিল। ১৯৯৬ সালে গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলনে IFG-কে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী দাঁড়ায় সেটা দেখার বিষয়। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যা দরকার, তা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাপনা, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা-যা লিবিয়াতে নেই। এখানে কোনো রাজনৈতিক দল নেই। এখন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সদস্যরা একাধিক দলের জন্ম দিতে পারেন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে পারেন। লিবিয়ায় বেকার সমস্যা প্রকট। জনগোষ্ঠীর ৩০ ভাগ বেকার। লিবিয়ায় বিশাল তেলের রিজার্ভ থাকলেও তেলনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। লিবিয়ার জনগোষ্ঠীর ৪০ ভাগ হচ্ছে তরুণ। এদেরকে মূল ধারায় নিয়ে আসা, চাকরির ব্যবস্থা করা হবে কঠিন কাজ। না হলে এখানে চিরস্থায়ী একটি অস্থিতিশীলতা থাকবেই। লিবিয়া গোত্রকেন্দ্রিকভাবে বিভক্ত। গোত্রের লোকজন একত্রিত হয়ে মরুভূমি তথা পাহাড়ের নিচে বসবাস করেন। এরা আধুনিকমনস্ক নন। গাদ্দাফি যে গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা গাদ্দাফির মৃত্যুকে সহজভাবে নেবেন না। ফলে একধরনের বিরোধিতা থেকেই যাবে। উপরন্তু দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিরোধের জন্ম হয়েছে। তেল কূপগুলো পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল দক্ষিণাঞ্চল থেকে। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়বে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর আগ্রহ মূলত লিবিয়ার তেল ও গ্যাসের কারণে। বিশ্বের রিজার্ভের ৩৫ ভাগ তেল রয়েছে লিবিয়ায়, যার পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ব্যারেল। গ্যাস রিজার্ভ রয়েছে ১ হাজার ৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন তেল উত্তোলিত হতো এক দশমিক তিন মিলিয়ন ব্যারেল থেকে এক দশমিক ছয় মিলিয়ন ব্যারেল। ভূমধ্যসাগরের নিচ দিয়ে পাইপের সাহায্যে এই গ্যাস যায় ইতালিতে (ত্বেবহংঃত্বধস চরঢ়বষরহব)। লিবিয়ার অভ্যন্তরে মাত্র এক ডলারে তেল পাওয়া যেত। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের মূল্য ৮০ ডলার। সুতরাং আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থটা কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। লিবিয়ার পুনর্গঠনের নামে তখন লিবিয়াতে ব্যবসা খুঁজবে মার্কিনি কোম্পানিগুলো। আর লিবীয় সরকারকে তেল বিক্রি করে (অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করে) পুনর্গঠনের বিল পরিশোধ করতে হবে। ঠিক যেমনটি হয়েছে ইরাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিতে লিবিয়ার অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পেন্টাগন যে দীর্ঘ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তাতে লিবিয়া একটি ফ্যাক্টর। লিবিয়ার প্রশাসনকে যদি হাতে রাখা যায়, তা হলে উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। লিবিয়া নিয়ন্ত্রণে এলে পার্শ্ববর্তী শাদ ও নাইজারও নিয়ন্ত্রণে আসবে। শাদ ও নাইজারে রয়েছে তেল ও ইউরেনিয়াম, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। একুশ শতকে যে নতুন আফ্রিকার জন্ম হতে যাচ্ছে, সেখানে ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের। কঙ্গো, রুয়ান্ডা, আইভরি কোস্ট ছিল একসময় ফ্রান্সের কলোনি। ফরাসি ভাষা এখানে সরকারি ভাষা। এ অঞ্চলে তখন বাড়বে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব। ইতোমধ্যেই আফ্রিকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন একটি মিলিটারি কমান্ড অঋজওঈঙগ। এ জন্য লিবিয়ায় ‘বন্ধুপ্রতিম’ সরকারের খুব প্রয়োজন ছিল। গাদ্দাফির মত্যু এই হিসাবটা সহজ করে দিল। লিবিয়ার ঘটনাবলি দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের সরকারকে উত্খাত করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র রাখে। তবে অবশ্যই সেই সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের হতে হবে। অতীতে গাদ্দাফিকে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ইরাকে সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযানের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র গাদ্দাফিকে তার স্বার্থে ব্যবহার করেছিল। প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় গাদ্দাফিকে চলে যেতে হল। এভাবে একটি স্বাধীন দেশে ন্যাটোর বিমানবহর দিয়ে হামলা কোনো আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদন করে না। এটা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ। নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় তথাকথিত ‘গণহত্যা’(?) ঠেকাতে ন্যাটোর বিমান হামলার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের কোনো অনুমতি দেয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদে এ কথাগুলো আর কেউ বলবে না। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আফ্রিকায় সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তন হল।

প্রশ্ন হচ্ছে, সমগ্র আরব বিশ্বের এই যে পরিবর্তন, এই পরিবর্তন কি সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে? তিউনিসিয়ায় এন্নাহদা পার্টির উত্থান সেখানে একটি ‘তুরস্ক মডেলের’ জন্ম দিতে যাচ্ছে। তুরস্কে ইসলাম আর গণতন্ত্রের সমন্বয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। তুরস্কে ইসলামপন্থীরা কট্টরপন্থী নন। এরা আল কায়দাকে সমর্থনও করে না। বরং আল কায়দার রাজনীতিকে সমালোচনা করে। আধুনিকমনস্ক তুরস্কের নেতৃত্ব ইসলামিক বিশ্বে নতুন এক ইমেজ নিয়ে এসেছে। এন্নাহদার নেতা ঘান্নুচি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের রাজনীতির অনুসারী। এ কথা তিনি স্বীকারও করেছেন। একসময় মিসরের ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ঘান্নুচি। এখন সেখান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। ‘তুরস্ক মডেল’ এখন তার কাছে আদর্শ। আগামী ২৮ নভেম্বর মিসরে সংসদ নির্বাচন। সেখানে ইসলামিক ব্রাদারহুড পার্টির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কোন পর্যায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই দেখার বিষয়। সামরিক জান্তা প্রধান ফিল্ড মার্শাল তানতাবি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। দেশটিতে অশান্ত পরিস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। এখানে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা পরিচালনা করা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল। ইয়েমেনের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখেননি। তুলনামূলক বিচারে আল কায়দা অনেক শক্তিশালী ইয়েমেনে। এখানে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিজয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তরুণ সমাজ সেখানে সালেহবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু তাদের কোনো সংগঠন নেই। তবে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে একটা ভয় থেকেই গেল। সিরিয়াতেও এদের তত্পরতা রয়েছে।
স্পষ্টতই আরব বিশ্বে ইসলামিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। ১৯৫২ সালে মিসরে জামাল আবদুন নাসেরের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্ম হয়েছিল, যা ছড়িয়ে গিয়েছিল প্রতিটি আরব রাষ্ট্রে। এখন তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রমনা একটি ইসলামিক শক্তির উত্থান সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে যায় কি না সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
tareque.rahman(a)aol.com

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

%d bloggers like this: