মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!


ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও। গ্রাম থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীও ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে অনেকে।

সমাজবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করছেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার ওই ধারণা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকায়। এ রকম এক জুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই বিভাগে, একই ক্লাসে পড়তেন। গভীর বন্ধুত্ব তখন থেকেই। দু’জনই মেধাবী। রেজাল্টও ভাল। বন্ধুটি এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বান্ধবী পিএইচডি করছেন, এখনও শেষ হয়নি। থাকছেন বনানী এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটিও নিজেদের। লিভ টুগেদার করছেন। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করবেন না। দু’জনই চেষ্টা করছেন ইউরোপের একটি দেশে যেতে। বিত্তবান ঘরের সন্তান তারা।

বন্ধুটির বাড়ি ছিল ফেনীতে, বান্ধবীর ঢাকায়। শাহানা তার নতুন নাম। এ নামে কেবল জর্জই তাকে চেনে। জর্জকে ওই নামে অন্য কেউ চেনে না। এটা শাহানার দেয়া নাম। একে অপরকে দেয়া নতুন নামেই তাদের বাড়ি ভাড়া নেয়া উত্তরা এলাকায়। চাকরিজীবী দু’জনই। এক সময়ে চাকরি করতেন এই সংস্থায়। সেখান থেকে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। এখন তারা চাকরি করছেন পৃথক দু’টি বৈদেশিক সাহায্য সংস্থায়। উচ্চ বেতনে চাকরি। অফিসের গাড়ি। শাহানা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জর্জ পড়াশোনা করেছেন ভারতের নৈনিতালে, বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় ফিরে চাকরি নিয়েছেন। লিভ টুগেদার করছেন। বিয়ের প্রতি আগ্রহ নেই তাদের। শাহানা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চান। সেখানে তার পরিবারের বেশির ভাগ লোক বসবাস করছে। শাহানার চিন্তা বিয়ে মানেই একটি সংসার, ছেলেমেয়ে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। এখনই এগুলোর কথা ভাবতে গেলে তার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে, বিদেশে যাওয়া না-ও হতে পারে। এ কথাগুলো সে খুলে বলেছে জর্জকে। জর্জ রাজি হওয়ায় এক সঙ্গে থাকছেন তারা চার বছর ধরে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ দু’জনে মিলে বহন করেন। সব কিছুই হয় দু’জনে শেয়ার করে। মনোমালিন্য হয় না তা নয়, হয় আবার তা মিটেও যায়। এভাবেই চলছে চার বছর ধরে।

একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তারা। বসবাস করছেন ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটে। ছেলেমেয়ে দুজনই ধনাঢ্য পরিবারের। দু’বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন। পড়শিরা জানে, স্বামী-স্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে সেভাবেই নিজেদের পরিচয় দেন। যশোরের একটি গ্রাম থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন ওরা। পরিচয় তাদের স্কুল থেকে। ঢাকায় এসে প্রথম দু’বছর দু’জন থাকতেন আলাদা বাড়ি ভাড়া করে। এখন দু’জন মিলে থাকছেন একই বাসায়। ভাড়া দেন দু’জনে শেয়ার করে। গত এক বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত লিভ টুগেদার করছে। শোবিজে লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় ভাবে পরিচিত শোবিজের অনেক স্টার এখন লিভ টুগেদার করছেন। দেশব্যাপী পরিচিত দু’জন নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট শোবিজে। একজন পরিচিত কণ্ঠশিল্পী গত পাঁচ বছর ধরে লিভ টুগেদারের পর আপাত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এখন থাকছেন আলাদা। শোবিজের নাট্যাঙ্গনের চার জোড়া নতুন মুখ লিভ টুগেদার করছেন বছরখানেক ধরে। তাদের পরিচিত ও নিকটজনরা জানেন তাদের লিভ টুগেদার সম্পর্কে। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তারা কেউ আপাতত বিয়ের কথা ভাবছেন না। শোবিজে ছেলেমেয়ে উভয়ের উচ্চাসনে যাওয়ার পথে বিয়েকে একটি বড় বাধা মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত দুই তিন বছরের মধ্যে ঢাকায় লিভ টুগেদারেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে লিভ টুগেদারের বেশির ভাগ ছিল সমাজের উচ্চ স্তরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এখন লিভ টুগেদারের প্রবণতা বেড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সদ্য গ্রাম থেকে এসে ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। কেবলমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে কিন্তু তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এমন অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছে।

ঢাকার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, তার জানা মতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম করে হলেও এক শ’ জোড়া ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করছে। বিষয়টি তাদের কাছে ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ কাউকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। ওই শিক্ষার্থী লিভ টুগেদারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তার ভাষায় দু’জনের মতের মিলেই তারা লিভ টুগেদার করে। এখানে অপরাধ কিছু নেই। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা লিভ টুগেদার করছেন। তাদের লিভ টুগেদারের কথা জানে তাদের অনেক ছাত্রও। ওই শিক্ষকদের একজন তার এক নিকটজনের কাছে বলেছেন, লিভ টুগেদারকে তিনি বরং গর্বের বিষয় মনে করেন।
ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন, বর্তমানে বসবাস করছেন গুলশান এলাকায়। চাকরি করেন একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায়। এর আগে তার কর্মস্থল ছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। তিন বছর ধরে ঢাকায় আছেন। লিভ টুগেদার করছেন তারই এক সহকর্মী নারীর সঙ্গে। ওই ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দু’জনই বাংলাদেশী। তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং হয়। এখন বাংলাদেশে আছি, এক বছর পর অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। সে কারণে আমরা দু’জনই ঠিক করেছি লিভ টুগেদার করতে।

তাছাড়া, লিভ টুগেদারের ধারণা খারাপ নয়, আমরা কেউ কারও বোঝা নই, আইনি বন্ধনও নেই। কারও ভাল না লাগলে তিনি এক সঙ্গে না-ও থাকতে পারেন। এতে কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে এ প্রবণতার কিছু কারণ জানা গেছে। তাদের মতে, যে সব মেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করে, নিজেদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা বা দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা এখনই বিয়ে করে ছেলেমেয়ের ভার নিতে চায় না। সংসারের ঘানি টানতে চায় না। ওই সব মেয়ে নিজেদেরকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে। এমন অনেক ছেলেও আছে যারা ওই সব মেয়ের মতো ধারণা পোষণ করে না তারা কেবলমাত্র জৈবিক কারণে লিভ টুগেদার করছে। অর্থবিত্তে বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে লিভ টুগেদার করছে কেবলমাত্র সমাজে তার একজন সঙ্গীকে দেখানোর জন্য, নিজের একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায়। অনেকে বিয়ের প্রতি প্রচণ্ড রকম অনাগ্রহ থেকেও লিভ টুগেদার করছে। ঢাকা শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির কন্যা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন একজন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে। ওই শিল্পপতির কন্যার প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংসার জীবনের পাট চুকিয়ে এখন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের লিভ টুগদোর। ওয়েস্টার্ন সোসাইটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ ও অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন তাদের লিভ টুগেদারে বিচ্ছেদও ঘটছে। সহসা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঘটছে খুনের মতো অপরাধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে খুন করে পালিয়েছে ছেলেটি। চলতি বছর জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় খুন হয় সুরাইয়া নামের এক যুবতী। তিনি চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। তাকে খুন করে বাসায় লাশ রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যায় যুবক সুমন রহমান। পরে জানা যায়, প্রায় বছর খানেক ধরে লিভ টুগেদার করতেন সুমন ও সুরাইয়া।

এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। মে মাসে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে এক তরুণীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই তরুণী লিভ টুগেদার করতো তারই এক বন্ধুর সঙ্গে। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে মনোমালিন্য শুরু হয় তাদের মাঝে। শেষে মেয়েটিকে খুন করে পালিয়ে যায় বন্ধুটি। গত ১লা নভেম্বর রর‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় ম্যারেজ মিডিয়ার দুই পার্টনার। ফরিদপুর শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একই শহরের আরেকটি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে। পারভীন নামের মেয়ে ও আরিফ নামের ছেলেটি অকপটে স্বীকার করেছে তারা লিভ টুগেদার করছে এবং এক সঙ্গে ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসা করছে।

ঢাকাতে লিভ টুগেদার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমাডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অনেক যুবক-যুবতী এখন ফ্যামিলিকে একটা বার্ডেন মনে করে, বিয়েকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্তরায় মনে করে। দেখা যাচ্ছে, এরা বিয়ের চেয়ে লিভ টুগেদারকে বেশি পছন্দ করছে। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও পাচ্ছে। তারা সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের সঙ্গী হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন বাড়ি ভাড়া একটি বড় সমস্যা। বাইরে থেকে পড়তে আসা বা চাকরি করতে আসা যুবক বা যুবতীকে বাড়ির মালিক আলাদা আলাদা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তিনি বলেন, তবে এতে সমস্যা হচ্ছে সমাজে এক ধরনের ক্রাইম তৈরি হচ্ছে, কোন কারণে বনিবনা না হলে খুন হয়ে যাচ্ছে মেয়ে বা ছেলেটি।
http://allsharenews.com/

মেধা নাকি যৌন আবেদনে আসে খ্যাতি!


যৌন আবেদন নাকি মেধা?

ফোর্বস ম্যাগাজিনের সাম্প্রতিক এক তালিকা দেখে এমন প্রশ্নের আবির্ভাব৷ তালিকাটা ৩০ বছরের কম বয়সি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনকারী সেলিব্রেটিদের৷ তাতে শীর্ষ দশের সাতজনই হচ্ছেন নারী৷

একেবারে শীর্ষ অবশ্যই লেডি গাগা৷ গত বছরে তাঁর আয় ছিল ৮০ মিলিয়ন ডলার৷ হিট গান বিক্রি, ওয়ার্ল্ড ট্যুর আর বিভিন্ন পণ্যের মডেল হয়ে এই অর্থ আয় করেছেন লেডি গাগা৷ পরিমাণটা হয়ত আরও বাড়তে পারতো যদি না ইনজুরির কারণে কয়েকটি ট্যুর বাতিল না করতেন৷ ঐ সময়টা তাঁকে তাঁর ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়েছে!

এরপরেই আছেন তালিকায় থাকা তিন তরুণের প্রথমজন ক্যানাডিয়ান সেনসেশন জাস্টিন বিবার৷ তবে তাঁর আয় লেডি গাগার চেয়ে ২২ মিলিয়ন ডলার কম, অর্থাৎ ৫৮ মিলিয়ন৷ তালিকার অন্য দুই ছেলে তারকা হলেন ডিজে ক্যালভিন হ্যারিস ও অভিনেতা টেলর লাউটনার৷ তাঁদের আয় যথাক্রমে ৪৬ ও ২২ মিলিয়ন ডলার৷ আর মেয়েদের মধ্য আছেন টেলর সুইফট (৫৫ মিলিয়ন ডলার), রিহানা (৪৩ মিলিয়ন), কেটি পেরি (৩৯ মিলিয়ন), আডেলে (২৫ মিলিয়ন), জেনিফার লরেন্স (২৬ মিলিয়ন ডলার) ও ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট (২২ মিলিয়ন)৷

তবে শুধু কম বয়সি তারকাদের তালিকায় নয়, গত জুনে ফোর্বস যে ‘পাওয়ারফুল সেলিব্রেটি'-দের লিস্ট তৈরি করেছিল তাতেও শীর্ষ দশে ছিলেন ছয়জন নারী৷

ফেমিনিস্ট ওয়েবসাইট জেজেবেল ডটকমের ব্লগার কেট ড্রাইস বলছেন, ‘‘শুধু যৌন আবেদন দিয়ে মেয়েরা অর্থ আয়ের ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা ঠিক নয়, বরং গানের শিল্পীরা শুধু মিউজিশিয়ান হওয়ার চেয়ে আরো অন্যান্য বিষয়েও দক্ষতা অর্জন করছেন৷ তাই তাঁরা বেশি আয় করছেন৷

তিনি বলেন, লেডি গাগা, রিহানা, টেলর সুইফট, কেটি পেরির মতো তারকারা পণ্যের মডেল হয়েই বেশি আয় করছেন৷ বিশেষ করে তাঁরা চান বিভিন্ন কসমেটিক পণ্যের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে৷ এমনকি জাস্টিন বিবারও তরুণীদের কাছে তাঁর নাম বেঁচে অনেক অর্থ আয় করছেন বলে মনে করেন ড্রাইস৷
প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন?

সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তা


স্নেহময় অভিভাবকত্ব যৌন-রসাত্মক টাইম
তরুণীর বুকের দুধ শিশুকে খাওয়ানো নিয়ে তোলপাড় চলছে। ঘটনাটি ঘটেছে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়া ওই ছবিটি নিয়ে। বিষয়টি স্নেহময় অভিভাবকত্ব হিসেবে ধরে নিলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যত দোষ নন্দ ঘোষ হলে সমস্যা। আর সমস্যাটা হয়েছে প্রকাশ্যে পত্রিকার পাতায় দুধ খাওয়ানের দৃশ্য নিয়ে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে সাহসী স্নেহময় অভিভাবকত্বধারী সেই নারীর নাম লিন গ্রুমেট। বিতর্ক উঠেছে এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের বলে। কথা উঠেছে বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না।

তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এক তরুণী। এটাই ছিল এ সপ্তাহের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। ‘স্নেহময় অভিভাবকত্ব’ শিরোনামের প্রতিবেদনটির জন্য তোলা হয়েছিল ছবিটি। আর এটা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিতর্কে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা এ ম্যাগাজিনটি। অনেকেই উৎসাহিত করেছেন সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তাকে। আবার অনেকেই প্রকাশ করেছেন ভীত ও সন্দেহমূলক অভিব্যক্তি।

তবে লস অ্যাঞ্জেলেস নিবাসী গ্রুমেট তার তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে খুবই স্বাভাবিক ও জৈবিক ব্যাপার বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি তার মা তাকে ছয় বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাইয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষকে বুঝতে হবে যে এটা জৈবিকভাবে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। মানুষ এটা যত বেশি দেখবে, ততই আমাদের সংস্কৃতিতে এটা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে। আমি এখন তেমনটাই আশা করছি। আমি চাই মানুষ এটা দেখুক।

তবে টাইম ম্যাগাজিনের এ প্রচ্ছদ নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে। এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের উদ্রেক করবে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শিশুটি যখন বড় হবে, তখন তাকে অনেক বিদ্রƒপের মুখে পড়তে হবে। বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না, এসব বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। আরকানসাস নিবাসী ছয় সন্তানের জননী ববি মিলার বলেছেন, এমনকি একটা গরুও জানে কখন তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস ত্যাগ করা দরকার। আর প্রচ্ছদটি সম্পর্কে তার অভিমত, ‘এটাকে কেন এখানে আনতে হবে? এটা হাস্যকর।বিপরীতে টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষেও দাঁড়িয়েছেন শিশুযতœবিষয়ক কিছু সংগঠন। বেস্ট ফর বেবিস নামের একটি সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেটিনা ফোর্বস বলেছেন, এ প্রচ্ছদটা মূলধারার আমেরিকানদের কিছুটা কম রোগে ভুগতে সাহায্য করবে। নারীরা তাদের যে কোনো বয়সী সন্তানকেই বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। আর এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় এটাই।

জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে


সামাজিক যোগাযোগ :ফেসবুকের এপিঠ-ওপিঠ

মো. আবদুল হামিদ

যুবসমাজের মাথা বিগড়ে দেয়া ‘ফেসবুক’-এর অকল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্নদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে এবং বেশ ইতিবাচক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক জরিপে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলে মনটা হালকা হয় বলে ফুরফুরে মেজাজে চলমান কাজে অধিকতর মনোযোগী হওয়া যায়। সে গবেষণায় ফেসবুকবিমুখদের মনোযোগের লেভেল ব্যবহারকারীদের তুলনায় কম বলেও প্রতীয়মান হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতে, ফেসবুক তাদের আত্মবিশ্বাসের লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে। কানেক্টিভিটির এ যুগে দীর্ঘ সময় নিকটজনের খোঁজখবর না পেলে বা নিজে কোথায়, কী করছে তা ঘনিষ্ঠজনদের জানাতে না পারলে কেমন যেন অস্বস্তি কিংবা উদ্বিগ্নতা কাজ করে। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য হলেও একবার ঢুঁ মারতে পারলে অনেকটা সময় নিশ্চিন্ত মনে কাজে ডুব দেয়া যায়। ফেসবুক বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সোস্যাল নেটওয়ার্ক। কে জানত পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের জন্য জাকারবার্গ যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন (২০০৪ সালে নিজেরা শুরু করলেও উন্মুক্ত হয় ২০০৬ সালে) তা মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সম্প্রসারণশীল সাইটে পরিণত হবে! কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করে ২৫ কোটির বেশি ইউজার, যাদের গড়ে ১৩০ জনের বেশি বন্ধু রয়েছে এবং মাসে ৭০ হাজার কোটি মিনিটের বেশি ফেসবুক ব্যবহার হয়। মোট ব্যবহারের ৭০ শতাংশ নন-আমেরিকান এবং পর্নো পেজ ও গ্রুপগুলো ভিজিট হয় সবচেয়ে বেশি। আইফোন ও অন্যান্য সেল ফোনে ইন্টারনেট চালু হওয়ায় ফেসবুক ব্যবহারের প্রবণতা গোটা বিশ্বেই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুরু থেকেই ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ, উন্নত দেশগুলোয় যা কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাজ্যে অন্য এক স্টাডিতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের (২১ থেকে ২৯ বছর বয়সী) পাশাপাশি মানসিক চিকিত্সায় নিয়োজিত কিছু বিশেষজ্ঞের মতামতও নেয়া হয়েছে। অধিকাংশের মতে, পরিমিত মাত্রায় ফেসবুকের ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। কোনো স্ট্যাটাস দেখে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠা, ভালো লাগা এমনকি সাময়িক কষ্ট পাওয়া মস্তিষ্ককে সচল করে এবং আগের তুলনায় বেশি কনসেনট্রেট করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় এক জরিপে দেখা যায়, যারা বাস্তব জীবনে সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখতে কম দক্ষ, তারাও ফেসবুকে সফলভাবে যোগাযোগ করতে পারেন। অর্থাত্ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা যারা ঘরকুনো বলে অবহেলিত তারাও অন্যদের মতো এ মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষায় সক্ষম। তবে সবচেয়ে ভালো দিক হলো বন্ধুরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাক (এমনকি স্থান বদলের পরও), যোগাযোগের ঠিকানা জানতে বা পরিবর্তন করতে হয় না। এক ক্লিকেই তথ্য, ছবি, ভিডিও সব পাওয়া যায় এবং প্রায় বিনা খরচে। তবে সুফলের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রযুক্তির অপব্যবহারের শঙ্কাও বাড়ছে; যেমন— আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সেদিন শিক্ষকের লেকচার ভালো লাগছিল না বলে ক্লাসরুমে বসেই ফেসবুকে এ সম্পর্কে স্ট্যাটাস দেয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা তার জবাবে নানা ধরনের প্রতিমন্তব্য করে, যার শেষটা মোটেই সুখকর ছিল না। কয়েক মাস আগে জাবি ও বুয়েটের দুই শিক্ষককে আদালত তলব করেন স্ট্যাটাস ও কমেন্ট লেখার কারণে। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে।
হতাশ হওয়ার মতো অনেক তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ২০০৯ সালে যত বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে তার ২০ শতাংশই ছিল সরাসরি ফেসবুকজনিত কারণে। অর্থাত্ স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ফলো করত, তারপর পাসওয়ার্ড নিয়ে নজরদারি; একপর্যায়ে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে এবং কোর্টের মাধ্যমে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তারা। অনেক দেশে এটাকে অ্যালকোহল বা কোকেনের মতোই ভয়াবহ মনে করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য যেমন শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে একটানা বেশি সময় ফেসবুক ব্যবহার তেমনি ক্ষতিকর। শরীরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, ঘাড় বা পিঠে ব্যথা, হাতের ও হাঁটুর গিটগুলোয় ব্যথা অনুভব করা, মাথা ধরে থাকা প্রভৃতি উপসর্গ প্রায়ই লক্ষ করা যায়। তা ছাড়া খাবার খেতে অনিয়ম করা ফেসবুক অ্যাডিক্টদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তারা ফাস্টফুড ও শুকনাজাতীয় খাবারে বেশি আগ্রহী হয়, যা সুষম খাদ্য সরবরাহ করে না এবং শরীরচর্চা না করায় মোটা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ক্রিকেট খেলার বিরোধিতা করেছিল এ যুক্তিতে যে খেলোয়াড়, আয়োজক, দর্শক সবারই দিনের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয় খেলার পেছনে; ফলে তারা কাজ করবে কখন? সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক ব্যবহারে কত শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয় তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সে কারণেই হয়তো চীন ও ইরানের মতো দেশগুলো এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এক গবেষণা সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। তারা যদি দিনে গড়ে ১০ মিনিট করে ফেসবুক ব্যবহার করে, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার কর্মচারীর এক মাসের শ্রমঘণ্টার চেয়েও বেশি পণ্ডশ্রম হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের মতো গরিব দেশে!
ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকার অধিকাংশই বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে অথবা গত কয়েক বছরে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। ফলে তরুণদের ফেসবুক ব্যবহার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার বেশ সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের উল্লেখ মনে হয় প্রাসঙ্গিক হবে, মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ঐশ্বরিয়া রাইকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ধরা যাক তার সামনে দুটি অপশন আছে: কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ হওয়া অথবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা— আধুনিক তরুণী হিসেবে সে কোনটাকে বেছে নেবে এবং কেন? ঐশ্বরিয়া বেছে নিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষা; কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এটি জানা থাকলে কম্পিউটার শেখাটা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষা ভাষার মান বাড়াতে পারবে না। তা ছাড়া অনেক পেশা আছে, যেখানে কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ না হয়েও ভালো ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব। হলভর্তি দর্শক জোরে হাততালি দিয়ে তার জবাবকে সমর্থন করেছিলেন, আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম তাত্ক্ষণিক ওই কথায়। কয়েক বছর আগে যখন তরুণদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন খুব আশাবাদী হয়েছিলাম যে, এ অসিলায় অন্তত আমাদের তরুণরা ইংরেজি ভাষাটা ভালোভাবে রপ্ত করবে। কিন্তু ভয়ঙ্কর কিছু ব্যাপার তারা ফেসবুক ভাষায় ব্যবহার করছে, যা তাদের অধঃপতনই ত্বরান্বিত করছে; কল্যাণ নয়। একটি হলো ইংরেজি অক্ষরের মাধ্যমে বাংলা লেখা। এতে আগে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে সে যা বলতে চাইছে তার ইংরেজি শব্দটা বা বাক্যটা জানার চেষ্টা করত এখন তার প্রয়োজন শেষ হয়েছে। ফলে নতুন কোনো ইংরেজি শব্দ না শিখেও তারা অনায়াসে মেসেজ পাঠাচ্ছে, মন্তব্য করছে। আরেকটি বিষয় হলো, তারা বড় ও জটিল শব্দগুলোকে সংক্ষিপ্ত করছে। বড় শব্দকে ছোট লিখতে গিয়ে তারা প্রকৃত বানানটা ভুলে যাচ্ছে। অনেকেই যখন বানান নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়, তখন মাঝের দু-তিনটা অক্ষর বাদ দিয়ে শব্দটা লেখে। তাতে সঠিক বানান না জানার দুর্বলতাও গোপন করা যায়; আবার স্মার্টনেসও দেখানো হয়। এর কুপ্রভাব সাম্প্রতিক কালে পরীক্ষার উত্তরপত্রেও লক্ষ করা যাচ্ছে, বানান ভুলের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। সংক্ষেপ হলেই স্মার্ট হয়— এ ভয়াবহ ধারণাটি আমাদের তরুণদের এখানেও আক্রান্ত করেছে। উন্নত দেশের যে মেয়েটি মিনি স্কার্ট পরে সে কিন্তু ক্লাসরুমেও অল্প কথায় মূল মেসেজটি সবার সামনে তুলে ধরতে পারে। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাদের পোশাকের ঢঙটাই নকল করতে চেষ্টা করে, জ্ঞানের উত্কর্ষতা নয়।
ক্যারিয়ার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ থাকায় চেষ্টা করি এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে। আমাদের তরুণরা হয়তো এখনো ভাবতে শুরু করেনি, তার ফেসবুক প্রোফাইল ও স্ট্যাটাস চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধক হতে পারে। ইউরোপের বিখ্যাত একটি ফাইভ স্টার হোটেল চেইনের হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের প্রধান সেদিন জানালেন, সিভিতে প্রদত্ত ই-মেইল আইডি ব্যবহার করে ফেসবুক ও অন্যান্য সোস্যাল নেটওয়ার্কে চাকরিপ্রার্থীর অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করেন। সিভিতে যেসব দিক উল্লেখ থাকে, প্রার্থী বাস্তব জীবনে তার কতটা চর্চা করেন— তা বুঝতে চেষ্টা করেন! প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনেকের অ্যাকাউন্ট তাদের বন্ধু ছাড়া কেউ দেখতে পারে না, সে ক্ষেত্রে কীভাবে দেখেন? তিনি বলেন, বড় বিজ্ঞাপনদাতা হওয়ায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্টগুলোয় ঢুকতে পারেন। সেখানে বিশেষভাবে খেয়াল করেন প্রার্থী ফেসবুকে আসক্ত কি না। তা ছাড়া সে কী ধরনের স্ট্যাটাস দেয়, তার বন্ধুদের তালিকায় থাকা অধিকাংশ লোক কোন প্রকৃতির, দিনের কোন অংশে পোস্ট দেয়ার প্রবণতা কেমন, কমেন্টগুলো কতটা বুদ্ধিদীপ্ত প্রভৃতি। ফলে স্ট্যাটাস লেখার সময় সতর্ক হতে হবে। কারও কমেন্টের একটি বাক্যে তিনটি ভুল (বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যের গঠন) যখন চোখে পড়ে, তখন তার বিদ্যার দৌড় সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাস্তব একটি ঘটনা বলে শেষ করতে চাই। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত এক ভদ্রলোক অসুস্থতার অজুহাতে অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি ম্যানেজ করেন। বাসায় ফিরেই ফেসবুকে লিখলেন, ‘ওহ কী শান্তি…!’ পরবর্তী সময়ে দিনে কয়েকবার করে স্ট্যাটাস আপডেট দেন, যার প্রতিটিই ছিল হাসি-আনন্দসম্পর্কিত এবং ছুটিকালীন শরীর খারাপ, হাসপাতাল, চিকিত্সা, চিকিত্সক নিয়ে একটি স্ট্যাটাসও ছিল না। এমনকি ফ্যামিলি নিয়ে যেসব স্থানে ঘুরতে গেছেন তার ছবিও আপলোড করেছেন। তিনি খেয়ালই করেননি যে, তার কলিগ ও বস ফেসবুকের বন্ধু হিসেবে সব দেখছেন। ছুটিশেষে যেদিন কর্মক্ষেত্রে ফিরলেন সেদিন তাকে বলা হলো, যারা ব্যক্তিজীবনে অসত্ এবং অফিসের কাজ উপভোগ করেন না. তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ফলে অফুরন্ত শান্তির জন্য আপনাকে চাকরি থেকে বিদায় দেয়া হলো! তাই সাবধান। বস, সহকর্মী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী সবাই কিন্তু আপনাকে দেখছে ফেসবুকের জানালা দিয়ে। আর সোস্যাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে গিয়ে নিজে যেন ছোট্ট স্ক্রিনে বন্দি হয়ে না যান। তাহলে সবার সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বাড়লেও পরিবার ও চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়বে, যা আদৌ কল্যাণকর নয়।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক
mahamud.biz@gmail.com

http://www.bonikbarta.com/2012-05-04/news/details/30351.html
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls