মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!


ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও। গ্রাম থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীও ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে অনেকে।

সমাজবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করছেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার ওই ধারণা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকায়। এ রকম এক জুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই বিভাগে, একই ক্লাসে পড়তেন। গভীর বন্ধুত্ব তখন থেকেই। দু’জনই মেধাবী। রেজাল্টও ভাল। বন্ধুটি এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বান্ধবী পিএইচডি করছেন, এখনও শেষ হয়নি। থাকছেন বনানী এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটিও নিজেদের। লিভ টুগেদার করছেন। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করবেন না। দু’জনই চেষ্টা করছেন ইউরোপের একটি দেশে যেতে। বিত্তবান ঘরের সন্তান তারা।

বন্ধুটির বাড়ি ছিল ফেনীতে, বান্ধবীর ঢাকায়। শাহানা তার নতুন নাম। এ নামে কেবল জর্জই তাকে চেনে। জর্জকে ওই নামে অন্য কেউ চেনে না। এটা শাহানার দেয়া নাম। একে অপরকে দেয়া নতুন নামেই তাদের বাড়ি ভাড়া নেয়া উত্তরা এলাকায়। চাকরিজীবী দু’জনই। এক সময়ে চাকরি করতেন এই সংস্থায়। সেখান থেকে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। এখন তারা চাকরি করছেন পৃথক দু’টি বৈদেশিক সাহায্য সংস্থায়। উচ্চ বেতনে চাকরি। অফিসের গাড়ি। শাহানা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জর্জ পড়াশোনা করেছেন ভারতের নৈনিতালে, বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় ফিরে চাকরি নিয়েছেন। লিভ টুগেদার করছেন। বিয়ের প্রতি আগ্রহ নেই তাদের। শাহানা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চান। সেখানে তার পরিবারের বেশির ভাগ লোক বসবাস করছে। শাহানার চিন্তা বিয়ে মানেই একটি সংসার, ছেলেমেয়ে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। এখনই এগুলোর কথা ভাবতে গেলে তার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে, বিদেশে যাওয়া না-ও হতে পারে। এ কথাগুলো সে খুলে বলেছে জর্জকে। জর্জ রাজি হওয়ায় এক সঙ্গে থাকছেন তারা চার বছর ধরে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ দু’জনে মিলে বহন করেন। সব কিছুই হয় দু’জনে শেয়ার করে। মনোমালিন্য হয় না তা নয়, হয় আবার তা মিটেও যায়। এভাবেই চলছে চার বছর ধরে।

একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তারা। বসবাস করছেন ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটে। ছেলেমেয়ে দুজনই ধনাঢ্য পরিবারের। দু’বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন। পড়শিরা জানে, স্বামী-স্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে সেভাবেই নিজেদের পরিচয় দেন। যশোরের একটি গ্রাম থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন ওরা। পরিচয় তাদের স্কুল থেকে। ঢাকায় এসে প্রথম দু’বছর দু’জন থাকতেন আলাদা বাড়ি ভাড়া করে। এখন দু’জন মিলে থাকছেন একই বাসায়। ভাড়া দেন দু’জনে শেয়ার করে। গত এক বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত লিভ টুগেদার করছে। শোবিজে লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় ভাবে পরিচিত শোবিজের অনেক স্টার এখন লিভ টুগেদার করছেন। দেশব্যাপী পরিচিত দু’জন নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট শোবিজে। একজন পরিচিত কণ্ঠশিল্পী গত পাঁচ বছর ধরে লিভ টুগেদারের পর আপাত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এখন থাকছেন আলাদা। শোবিজের নাট্যাঙ্গনের চার জোড়া নতুন মুখ লিভ টুগেদার করছেন বছরখানেক ধরে। তাদের পরিচিত ও নিকটজনরা জানেন তাদের লিভ টুগেদার সম্পর্কে। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তারা কেউ আপাতত বিয়ের কথা ভাবছেন না। শোবিজে ছেলেমেয়ে উভয়ের উচ্চাসনে যাওয়ার পথে বিয়েকে একটি বড় বাধা মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত দুই তিন বছরের মধ্যে ঢাকায় লিভ টুগেদারেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে লিভ টুগেদারের বেশির ভাগ ছিল সমাজের উচ্চ স্তরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এখন লিভ টুগেদারের প্রবণতা বেড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সদ্য গ্রাম থেকে এসে ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। কেবলমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে কিন্তু তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এমন অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছে।

ঢাকার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, তার জানা মতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম করে হলেও এক শ’ জোড়া ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করছে। বিষয়টি তাদের কাছে ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ কাউকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। ওই শিক্ষার্থী লিভ টুগেদারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তার ভাষায় দু’জনের মতের মিলেই তারা লিভ টুগেদার করে। এখানে অপরাধ কিছু নেই। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা লিভ টুগেদার করছেন। তাদের লিভ টুগেদারের কথা জানে তাদের অনেক ছাত্রও। ওই শিক্ষকদের একজন তার এক নিকটজনের কাছে বলেছেন, লিভ টুগেদারকে তিনি বরং গর্বের বিষয় মনে করেন।
ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন, বর্তমানে বসবাস করছেন গুলশান এলাকায়। চাকরি করেন একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায়। এর আগে তার কর্মস্থল ছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। তিন বছর ধরে ঢাকায় আছেন। লিভ টুগেদার করছেন তারই এক সহকর্মী নারীর সঙ্গে। ওই ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দু’জনই বাংলাদেশী। তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং হয়। এখন বাংলাদেশে আছি, এক বছর পর অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। সে কারণে আমরা দু’জনই ঠিক করেছি লিভ টুগেদার করতে।

তাছাড়া, লিভ টুগেদারের ধারণা খারাপ নয়, আমরা কেউ কারও বোঝা নই, আইনি বন্ধনও নেই। কারও ভাল না লাগলে তিনি এক সঙ্গে না-ও থাকতে পারেন। এতে কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে এ প্রবণতার কিছু কারণ জানা গেছে। তাদের মতে, যে সব মেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করে, নিজেদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা বা দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা এখনই বিয়ে করে ছেলেমেয়ের ভার নিতে চায় না। সংসারের ঘানি টানতে চায় না। ওই সব মেয়ে নিজেদেরকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে। এমন অনেক ছেলেও আছে যারা ওই সব মেয়ের মতো ধারণা পোষণ করে না তারা কেবলমাত্র জৈবিক কারণে লিভ টুগেদার করছে। অর্থবিত্তে বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে লিভ টুগেদার করছে কেবলমাত্র সমাজে তার একজন সঙ্গীকে দেখানোর জন্য, নিজের একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায়। অনেকে বিয়ের প্রতি প্রচণ্ড রকম অনাগ্রহ থেকেও লিভ টুগেদার করছে। ঢাকা শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির কন্যা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন একজন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে। ওই শিল্পপতির কন্যার প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংসার জীবনের পাট চুকিয়ে এখন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের লিভ টুগদোর। ওয়েস্টার্ন সোসাইটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ ও অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন তাদের লিভ টুগেদারে বিচ্ছেদও ঘটছে। সহসা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঘটছে খুনের মতো অপরাধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে খুন করে পালিয়েছে ছেলেটি। চলতি বছর জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় খুন হয় সুরাইয়া নামের এক যুবতী। তিনি চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। তাকে খুন করে বাসায় লাশ রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যায় যুবক সুমন রহমান। পরে জানা যায়, প্রায় বছর খানেক ধরে লিভ টুগেদার করতেন সুমন ও সুরাইয়া।

এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। মে মাসে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে এক তরুণীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই তরুণী লিভ টুগেদার করতো তারই এক বন্ধুর সঙ্গে। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে মনোমালিন্য শুরু হয় তাদের মাঝে। শেষে মেয়েটিকে খুন করে পালিয়ে যায় বন্ধুটি। গত ১লা নভেম্বর রর‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় ম্যারেজ মিডিয়ার দুই পার্টনার। ফরিদপুর শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একই শহরের আরেকটি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে। পারভীন নামের মেয়ে ও আরিফ নামের ছেলেটি অকপটে স্বীকার করেছে তারা লিভ টুগেদার করছে এবং এক সঙ্গে ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসা করছে।

ঢাকাতে লিভ টুগেদার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমাডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অনেক যুবক-যুবতী এখন ফ্যামিলিকে একটা বার্ডেন মনে করে, বিয়েকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্তরায় মনে করে। দেখা যাচ্ছে, এরা বিয়ের চেয়ে লিভ টুগেদারকে বেশি পছন্দ করছে। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও পাচ্ছে। তারা সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের সঙ্গী হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন বাড়ি ভাড়া একটি বড় সমস্যা। বাইরে থেকে পড়তে আসা বা চাকরি করতে আসা যুবক বা যুবতীকে বাড়ির মালিক আলাদা আলাদা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তিনি বলেন, তবে এতে সমস্যা হচ্ছে সমাজে এক ধরনের ক্রাইম তৈরি হচ্ছে, কোন কারণে বনিবনা না হলে খুন হয়ে যাচ্ছে মেয়ে বা ছেলেটি।
http://allsharenews.com/

Advertisements

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি। শুধু রাষ্ট্রদূত পদে নয়, ফার্স্ট সেক্রেটারি থেকে শুরু করে সহকারী সচিবের মতো মধ্যম ও নিম্নস্তরের কূটনীতিক পদে চলছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। এ পর্যন্ত ১২ জনকে রাষ্ট্রদূত এবং ১১ জন দলীয় ক্যাডার, ক্যাডারদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে মধ্যম এবং নিম্নস্তরের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন যারা অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত। অনেকে ছিলেন গৃহিণী। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো যোগ্যতাই নেই এসব দলীয় ক্যাডারের। এ নিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা এবং ক্ষোভ। দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ভারত এবং জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনসহ মোট ১২টি মিশনে দলীয় লোকদের চুক্তিভিত্তিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

এখন নিচের পদে চলছে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সহ-সভাপতি ওয়াহিদুর রহমান টিপুকে ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক এক আওয়ামী লীগ এমপির ছেলে শাহেদুর রহমানকে নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনসুলেটে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তার পেশা ছিল রাজনীতি। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েত-মৈত্রী হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অপর্ণা পালকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (কনসুলার) পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অপর্ণা পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন এবং তিনি অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত।
অপর্ণা পাল এখন কানাডায় পোস্টিং নেয়ার চেষ্টা করছেন।

ছাত্রজীবনে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম ওয়াইসুজ্জামানের স্ত্রী মৌসুমী ওয়াইসকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব (বাজেট) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাসুম আহমেদকে নেদারল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এপিএস ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম রুহুল আমীনের স্ত্রী আনিসা আমীনকে প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগের আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।

ছাত্রলীগের সাবেক নেত্রী এবং ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্নার স্ত্রী ইরিন পারভীন বাঁধনকে সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি একজন সরকারি চাকরিজীবী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক ফারুক আমীনের স্ত্রী রওনক আমীনকে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী। বিডিআর বিদ্রোহে নিহত এক সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর এপিএস (২) সাইফুজ্জামান শেখরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীমা পারভীনকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন গৃহিণী।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মরহুম শিকদার মোহাম্মদ জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চৌধুরী সুলতানা পারভীনকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনসুলেটে কনসল হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন গৃহিণী।

এছাড়া বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুরস্কার হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সাবেক কূটনীতিক তারিক এ করিমকে ভারতে, সাবেক কূটনীতিক আকরামুল কাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম সাইদুর রহমান খানকে ব্রিটেনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রীর ভাই ড. আবদুল মোমেনকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় অযোগ্য ও বিতর্কিত ড. নিমচন্দ্র ভৌমিককে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে চীনে সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ, ওমানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নূরুল আলম, রাশিয়ায় ড. এসএম সাইফুল হক, পাকিস্তানে মো. সোহরাব হোসেন, ইরাকে মুহাম্মদ কামালউদ্দিন, লিবিয়ায় মুহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং শেখ কামালের বন্ধু ও আবাহনী ক্লাবের সাবেক পরিচালক শাহেদ রেজাকে দলীয় লোক হিসেবে কুয়েতে রাষ্ট্রদূত পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ক্ষমতায় আসতে নানাভাবে সহায়তা করার পুরস্কার হিসেবে এদের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এছাড়া ১/১১’র অন্যতম প্রধান হোতা লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাইকমিশনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় বহাল তবিয়তে রেখেছে বর্তমান সরকার।

দলীয় ক্যাডারদের এই নিয়োগের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, অতীতে কখনও এভাবে অযোগ্য দলীয় ক্যাডার এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। পেশাদার কূটনীতিকদের বাদ দিয়ে এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে যে দলীয়করণ শুরু হয়েছে তাতে অকার্যকর হতে চলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে মেধাবীরা আর কূটনীতিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইবে না। এছাড়া দলীয়করণের ফলে কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এদিকে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান ।

দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখাটা অনেক বেশি জরুরি।


ডিপ্লোম্যাটিক নাকি ডিপসোম্যানিক?

আবু ইশমাম
যাদের স্থান পাওয়ার কথা
Deep-low-mat-এ বা গভীর নিচুতে পাতা মাদুরে, দেশের পররাষ্ট্রনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছে তারা বড়ই আদুরে! উল্টো তাদের স্থান দেয়া হয়েছে মর্যাদার উঁচু আসনে, Diplomat হিসেবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের হিসাবে বড়ই ভুল ছিল। জানি না এ ভুলের জন্য তারা এখন অনুশোচনায় চুল ছিঁড়তে চাইবে কি না! জাপান, ওমান ও নেপালে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূতেরা তাদের অশিষ্টতা বা মদ-নারীতে আসক্তিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমেDiplomat ভাবমর্যাদার বদলে বিদেশে তাদের পরিচিতি হয়েছে Diplomatic বা মাদকাসক্ত উন্মাদরূপে! নেপালে সম্প্রতি বাংলাদেশের দুইজন সাহসী তরুণ মুসা ও মুহিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টে আরোহণ করে সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উঁচু করেছিলেন। Dipsomanic Diplomat-রা তা আবার নামিয়ে আনলেনDeep-low-mat-এ। পেশাগত দক্ষতার বদলে দলীয় আনুগত্যই একমাত্র যোগ্যতা বিবেচিত হওয়ায় কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদার এই ভূমিধস পতন বলে অনেকে মনে করছেন। আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আসে বিদেশী রেমিট্যান্স থেকে (২০১০ সালে ১১ বিলিয়ন ডলার); যা অব্যাহত রাখতে ও দেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখাটা অনেক বেশি জরুরি।

 

গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রধানমন্ত্রীর এক সফরসঙ্গীর নারী কেলেঙ্কারিও দেশের সুনামের অবয়বে কালিমা লেপন করেছিল। কিন্তু সে ঘটনায়ও বোধ হয় সংশ্লিষ্টরা কূটনৈতিক নিয়োগে যথেষ্ট সতর্ক হননি। তাই চাণক্যের উত্তরসূরি ভেবেই হয়তো ড. নিমচন্দ্র ভৌমিককে নেপালে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই উত্তরসূরি যে আসলে উত্তর-শুঁড়ি, তা কে জানত? চন্দ্রেরও কলঙ্ক থাকে, তাই নিমচন্দ্রেরই বা থাকবে না কেন? নিম তো একটু তেতো বটেই! মার্সিডিস বেঞ্জের বদলে বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল খারাপ কিছু নয়! কাঠমান্ডুতে বাইকে চেপে রাষ্ট্রদূত যাচ্ছেন, এটা দেখে তার কৃচ্ছ্রসাধনের প্রতি অনেকেই শ্রদ্ধাবনত হতে পারেন! কিন্তু ক্লাবে-বারে তার মদ-নারী-ফুর্তি ফুটিয়ে তুলেছে তার আসল মূর্তি! এ বিষয়ে বিগত ৩ জুন ২০১১ তারিখের নয়া দিগন্তের এক বিস্তারিত রিপোর্টে জানা যায়, ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ব্যবহারের জন্য দামি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি রয়েছে। নিমচন্দ্র ভৌমিক নজিরবিহীনভাবে দূতাবাসের হিসাবরক্ষকের মোটরসাইকেলে চড়ে ড্যান্সবারে যান। মদ ও নারী নিয়ে আমোদ-ফুর্তি করেন। শুধু তা-ই নয়, কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতের একজন মহিলা কাউন্সিলরের বাসায় তিনি জোর করে ঢুকতে চাইলে কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরী বাধা দেন। এর পরও রাষ্ট্রদূত ওই কাউন্সিলরের বাসার সামনে আধা ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহিভূত আচরণের জন্য নেপালের পররাষ্ট্রসচিব নিমচন্দ্র ভৌমিককে সরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। ঢাকায় অবস্থিত নেপাল দূতাবাস এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে শিগগির একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কাঠমান্ডুতে পেশাদার কূটনীতিক নিয়োগ দেয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, নেপালে রাষ্ট্রদূত হওয়ার কী যোগ্যতা তার আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেই কি রাষ্ট্রদূত হওয়া যায়? একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের নেতৃত্বই কি তার বিশেষ যোগ্যতা? দেশে কি সচ্চরিত্র, দেশপ্রেমিক, মার্জিত-শিক্ষিত-সুসভ্য-যোগ্য পেশাদার কূটনীতিকের অভাব পড়েছে? নিমচন্দ্র কূটনৈতিক নর্ম ভঙ্গ করে যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাতে কেউ আর তাকে নমঃ জানাবে না, বরং মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে তার অবনমনই চাইবে। নেপালের সাথে ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার ও বাণিজ্য সম্পর্কের বিভিন্ন দিকগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতির আভাস পাওয়া গেছে। সার্ক সচিবালয় রয়েছে কাঠমান্ডুতেই। নেপালের সাথে ভৌগোলিক দূরত্বও মাত্র ষোলো মাইল। কিন্তু রাষ্ট্রদূতের অবিমৃশ্যকারিতায় সৃষ্টি হতে পারে বহু যোজন কূটনৈতিক দূরত্ব, যা আমাদের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনবে। আর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সম্প্রতি নেপাল কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী।http://www.newkerala.com-এর বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারির এক খবর অনুযায়ী মালয়েশিয়া বাংলাদেশী ৫৫ হাজার কর্মীর ভিসা বাতিল করে নেপালের জন্য আগের ২৫ হাজারের বদলে এক লাখ কর্মীর ভিসা ইসু করেছে। তা ছাড়া, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক বিপর্যয় আমাদের জন্য কতটা দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, সেটা আশা করছি ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। আমাদের বিপর্যস্ত পেলে, নেপালও বাগে ফেলে লুটে নিতে পারে কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক ফায়দা।

কূটনীতিক নিয়োগের পর বিদেশে পাঠানোর আগে পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া দরকার, আর এটাই স্বাভাবিক। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত অন্য কূটনীতিকেরাই তার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তারা কি নতুন রাষ্ট্রদূতকে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেননি? তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি কী কারণে? দেশের মর্যাদা এভাবে বিকিয়ে দিতে? কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকালে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সে দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা-ভব্যতার রীতিনীতিগুলো মেনে চলা অত্যাবশ্যকীয়।

 

ওমানে আমাদের রাষ্ট্রদূত Woman-প্রীতিতে জড়িয়ে না পড়লেও, তিনি যে কেন প্রথম সাক্ষাতে মন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্যের কাঁধে হাত রাখতে গেলেন, তা বোধগম্য নয়! রিপোর্টে জানা গেছে, ‘আওয়ামী লীগের তিনবারের নির্বাচিত এমপি নূরুল আলম চৌধুরীকে ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ২০১০ সালের ২২ মে। ওমানের সুলতানের কাছে পরিচয়পত্র পেশের আগে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাউই বিন আবদুল্লাহর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালের একপর্যায়ে নূরুল আলম চৌধুরী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাঁধে হাত তুলে দেন। এ আচরণকে কূটনৈতিক রেওয়াজের লঙ্ঘন বলে ওমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল ও আঞ্চলিক ডেস্কের প্রধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী নূরুল আলম চৌধুরী মাস্কাটে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এটিকে একটি আড্ডাস্থলে পরিণত করেছেন।’ কূটনীতিক নিয়োগের পর বিদেশে পাঠানোর আগে পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে তাকে কী প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়েছিল, জানা দরকার। সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত অন্য কূটনীতিকেরাই বা কী করেছিলেন? তারা কি নতুন রাষ্ট্রদূতকে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারেননি? তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি কী কারণে? দেশের মর্যাদা এভাবে বিকিয়ে দিতে? কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকালে আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ও সে দেশের সংস্কৃতি, সভ্যতা-ভব্যতার রীতিনীতিগুলো মেনে চলা অত্যাবশ্যকীয়। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে পর্যন্ত দেখা গেছে, ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী পোশাকে সৌদি বাদশাহর সাথে দেখা করতে। বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ-এর সাবেক প্রতিনিধি ও ভারতের পেশাদার কূটনীতিক সুনিতা মুখার্জিকে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় অনেক অনুষ্ঠানে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতকালে মাথায় কাপড় দিতে। ওমানে প্রেরিত কূটনীতিক সে দেশের সংস্কৃতির প্রতি আরো সংবেদনশীল হলেই তার প্রকৃত পোশাদারিত্বের পরিচয় পাওয়া যেত। বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম শ্রমবাজার ওমানে ২.৬১ লাখের ওপরে বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন (বাংলাদেশ টুডে ২৪-৩-২০১০)। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের চেয়ে ওখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকায় তা হতে পারে আমাদের শ্রম রফতানির এক ক্রমবর্ধনশীল বাজার। শ্রমিকদের কল্যাণে এবং প্রাথমিক গমন খরচ কমাতে বেশ ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগও রয়েছে বলে জানা যায়। ২০১০ সালে যত লোক বিদেশে গেছে তার ১১ শতাংশই গ্রহণ করেছে ওমান (ডেইলি স্টার, ০৫-০৩-২০১১)। ওমানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও মুসলিম বিশ্বে আমাদের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের যৌন কেলেঙ্কারি সবচেয়ে বড় আঘাত। জাপান একক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অংশীদার। সেখানে কূটনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে আমরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি। রিপোর্টে জানা গেছে, পেশাদার কূটনীতিক এ কে এম মাজিবুর রহমান গত বছর জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। রাষ্ট্রদূতের সোস্যাল সেক্রেটারি হিসেবে একজন জাপানি মহিলা কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সেই মহিলা রাষ্ট্রদূত মাজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেছেন। এসংক্রান্ত অভিযোগ তিনি টোকিওতে অবস্থিত সব বিদেশী দূতাবাসকে ই-মেইলের মাধ্যমে অবহিত করেছেন। পদত্যাগকারী মহিলা সম্প্রতি যৌন হয়রানির অভিযোগে রাষ্ট্রদূত মাজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। সংস্কৃতিবান, উন্নত ও পরিশীলিত রুচির জাপানিরা এ ঘটনাকে কিভাবে নিয়েছে, ভাবতেই লজ্জায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছি। জাপানে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশী কর্মজীবী রয়েছেন বলে জানা যায়। তারা অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি মজুরি পেয়ে থাকেন। ১৯৯১-২০০৪ সাল পর্যন্ত জাপান থেকে ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। সুনামি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জাপান কর্মক্ষেত্র হিসেবে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর, কূটনৈতিক বিপর্যয় সে স্পর্শকাতরতা আর বাড়িয়ে দিতে পারে। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক বাংলাদেশের কূষ্টিয়ার সন্তান জাস্টিস রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জাপানে যুদ্ধাপরাধবিষয়ক বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারক প্যানেলের সদস্য হিসেবে জাপানিদের পক্ষে দুঃসাহসী মত ব্যক্ত করে জাপানিদের শ্রদ্ধা অর্জন করে লাভ করেছিলেনOrder of the Sacred Treasure খেতাব। তা ছাড়া, তাকে সম্মান জানাতেYasukuni shrine ও Kyoto Ryozen Gokoku Shrine-এ তার ভাস্কর্যও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রদূতের কেলেঙ্কারি কী খেতাব বয়ে আনবে তা ভেবে শঙ্কিত হচ্ছি।

 

দলীয় বিবেচনায় কূটনীতিক নিয়োগের বিপদসঙ্কেত ব্যক্ত করে বিগত ১৮ মে ২০১১ তারিখে আমার দেশ পত্রিকা একটি প্রতিবেদন ছেপেছিল। সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অসতর্কতা যে এত দ্রুত বাস্তবে দৃশ্যমান হবে তা ভাবা যায়নি। বিপদ যে সত্যি সত্যিই রিপোর্টে ব্যক্ত অনুমানের আগেই অনেকখানি ঘটে গেছে, তা কে জানত? সত্যিই এসব কূটনীতিক অনেক করিৎকর্মা, তারা প্রতিবেদকদের দূরদর্শিতার চেয়ে অনেক অগ্রসর। রিপোর্টটিতে জানা গিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন দলীয় ক্যাডারদের ছড়াছড়ি। শুধু রাষ্ট্রদূত পদে নয়, ফার্স্ট সেক্রেটারি থেকে শুরু করে সহকারী সচিবের মতো মধ্যম ও নিুস্তরের কূটনীতিক পদে চলছে চুক্তিভিত্তিতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ। এ পর্যন্ত ১২ জনকে রাষ্ট্রদূত এবং ১১ জন দলীয় ক্যাডার, ক্যাডারদের স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনকে মধ্যম এবং নিুস্তরের কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যারা অনার্স ও মাস্টার্সে তৃতীয় শ্রেণিপ্রাপ্ত। অনেকে ছিলেন গৃহিণী। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কোনো যোগ্যতাই নেই এসব দলীয় ক্যাডারের। এ নিয়ে পেশাদার কূটনীতিকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ। এ বিষয়ে রিপোর্টটিতে সতর্ক করা হয়েছিল, দলীয়করণের ফলে কূটনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

যা হোক, বাংলাদেশ প্রতিদিনের ০৬-০৬-২০১১ তারিখের এক বিস্তারিত রিপোর্টে জানা যায়, টোকিওর বাংলাদেশ মিশনের সোস্যাল সেক্রেটারি মিজ কিয়োকো তাকাহাসিকে কয়েক দফা ইন্টারভিউকালে এবং নিয়োগের পর কর্মক্ষেত্রে ও বাইরে রাষ্ট্রদূত এ কে এম মাজিবুর রহমান তাকে উত্ত্যক্ত করেন, চুমু খেতে চান, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ দেন। সব সময়ই মেয়েটির জবাব ছিল ‘না’। এই যৌন নির্যাতনে তাকাহাসির মুখের হাসি দূর হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রদূতের লোলুপ দৃষ্টির বাঁকা হাসি ও অপচেষ্টা বন্ধ না হওয়ায় তিনি অভিযোগ জানাতে বাধ্য হন।

ডিপ্লোম্যাটিক জগতে কূটনীতিক ও নারীর মধ্যে পার্থক্য বিষয়ে একটি মজার গল্প চালু রয়েছে, তা হচ্ছেঃ যখন একজন কূটনীতিক বলেন, হঁ্যা, তাহলে মনে করতে হবে, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, সম্ভাবনা আছে। যদি তিনি বলেন, আসলে কোনো কূটনীতিকই নন। অন্য দিকে একজন নারী যদি বলেন, ‘না’, তাহলে মনে করতে হবে, তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন সম্ভাবনা আছে। আর যদি তিনি বলেন, হঁ্যা, তাহলে মনে করতে হবে তিনি সত্যিকার অর্থে কোনো নারীই নন। জাপানে আর নেপালে নিয়োজিত আমাদের রাষ্ট্রদূতেরা হয়তো এই গল্পটি জানতেন, সে কারণে তারা আকাঙ্ক্ষিত নারীদের ‘না’কে সম্ভাবনা আছে মনে করেই হয়তো সীমা লঙ্ঘন করে থাকবেন। ওমানি কূটনীতিকের অনমনীয়তা এবং ভারতীয় ও জাপানি নারীদের ‘না’ ফুটিয়ে তুলেছে তাদের আপসহীন চারিত্রিক দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্ব। আমাদের নির্লজ্জ কূটনীতিকেরা তাদের থেকে কিছু শিখতে পেরেছেন কি?

—————————————————————————————————————————————————–