টনি ব্লেয়ারঃ একজন সম্ভাবনাময় ব্রিটিশ নেতার করুণ পরিণতি অন্তর্দর্শন


টনি ব্লেয়ারঃ একজন সম্ভাবনাময় ব্রিটিশ নেতার করুণ পরিণতি অন্তর্দর্শন
এম. আবদুল হাফিজ
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সংবাদ শিরোনামে থাকতে ভালোবাসেন। সংবাদ শিরোনামের জন্য ব্লেয়ারের এই অবসেসন (obsession) তার স্মৃতিকথার (Memoir) প্রকাশনার সাথেও যুক্ত হয়ে আছে। তার প্রকাশিত বইয়ের নাম A Journey, যাতে তিনি নিজেকে কোনো মাইথোলজির নায়ক রূপে উপস্থাপিত করেছেন। কেউ ইচ্ছে করলেই এই বহুরূপীর এক বা একাধিক ডাইমেনশন ‘দ্য জার্নি’ থেকে আবিষ্কার করতে পারেন। তার প্রকাশিত মেমোয়েরের সত্যিই কোনো গতানুগতিক রিভিউ হয় না। যেটা হওয়া সম্ভব তা হলো­ লেবার রাজনীতিক হিসেবে তার একটি একান্ত ব্যক্তিগত মূল্যায়ন এবং লেবার পার্টির ওপর তার স্থায়ী প্রভাব, যদি তা সত্যিই পড়ে থাকে।

১৯৯৭ সালের নির্বাচনে ব্লেয়ারকে খ্যাতির পাদপ্রদীপের নিচে নিয়ে আসে ব্রিটিশরা। একটি দীর্ঘ টোরি শাসনের অবসানে তারা টনি ব্লেয়ারকে একটি ভূমিধস বিজয়ের নায়ক হিসেবে তার সমগ্র কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছিল। তার উত্তেজক বিভা ও প্রতিভা ব্রিটিশদের মুগ্ধ করেছিল। ব্রিটিশ জনগণের পুরনো সুদিনের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ভেবে লেবার সমর্থকরা উল্লসিত হয়েছিল। ব্রিটিশদের জন্য বিশ্বকে সম্ভাবনায় ভরপুর মনে হয়েছিল। দীর্ঘ টোরিশাসনের গতানুগতিকতার পর তাদের মনে হয়েছিল যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি ইতিবাচক রূপান্তর নাগালের মধ্যে।

পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বর্জিত বিপর্যস্ত লেবার ক্ষমতার অঙ্গন থেকে দীর্ঘ নির্বাসনের পর সেখানে পুনঃপ্রবেশের আনন্দে আপ্লুত। তবু তারা একটি অনাগত আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত না হয়ে পারেনি। বিশেষ করে ঐতিহ্যপ্রিয় লেবার সমর্থকরা ব্লেয়ারের মতাদর্শগত দৃঢ়তার অভাবে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতে পারেনি। সমর্থকের আরো ভয় ছিল যে, সেই ব্লেয়ারের নেতৃত্বে লেবার পার্টির মৌলিক আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে কি না। লেবারের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকদের এই আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো, যখন ব্লেয়ার দলের বিশুদ্ধ ও পবিত্র বিবেচিত নীতিগুলোকে এক এক করে বর্জন করতে থাকলেন।

ক্ষমতা গ্রহণের অব্যবহিত পর ব্লেয়ার অবশ্য লেবারদের ট্রেডমার্ক হিসেবে বিবেচিত কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, করপোরেট প্রতিষ্ঠানে মোটা করারোপ, যা লেবার অনুসৃত নীতিমালার অন্যতম­ এমন কিছু পদক্ষেপ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় নেয়ার পরই ব্লেয়ার অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে লেবার পার্টিকে তার নিজস্ব বিশ্বাস এবং সুবিধা অর্জনে সম্পূর্ণ নতুন ছাঁচে ঢেলে নতুন করে সাজালেন। তার পুনর্গঠিত লেবার পার্টিতে থাকল শুধু ক্ষমতা লাভের চুম্বক।

ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্লেয়ার সর্বপ্রথম যে কাজটি করলেন তা ছিল তার অর্থনীতিতে বহু বিতর্কিত থ্যাচারিজমের অভিষেক। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী টোরি দলের মার্গারেট থ্যাচারকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন, যা ছিল তার অর্থনীতিতে থ্যাচারিজমের প্রতীকী অনুমোদন। অবশ্য মার্গারেট থ্যাচারের অর্থনীতিতে ব্রিটেনে অনেক উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ নি্নবিত্ত মানুষদেরকেই তার মাশুল দিতে হয়েছিল। ব্লেয়ারের এহেন পদক্ষেপ দলের প্রগতিশীল বামপন্থী অংশকে স্বাভাবিকভাবে শঙ্কিত করেছিল।

ব্লেয়ারের সৌভাগ্য যে, তার ক্ষমতায়নের সময়ে ব্রিটেনে টোরিবিরোধী একটি প্রবণতা ছিল। এর ফায়দা দু’হাতে লুটলেও ব্লেয়ার তার নিজস্ব বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে লেবার পার্টিকে আমূল পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আধুনিকায়নের অজুহাতে তিনি লেবার পার্টিকে দু’টি স্বতন্ত্র শ্রেণীতে বিভক্ত করেন­ ওল্ড লেবার ও নিউ লেবার। বলা বাহুল্য, তিনি নিউ লেবারের নেতৃত্বে আসীন হন। ব্লেয়ার পার্টিকে দু’ভাগে বিভাজনের খেলা যেভাবে খেলেছেন, তা পার্টির জন্য সামগ্রিকভাবে ছিল অত্যন্ত ক্ষতিকর। এরই অংশ হিসেবে ব্লেয়ার পার্টিকে তার ‘অতীত’ ও ‘আত্মা’কে বর্জন করতে বাধ্য করেন। উদ্দেশ্য ছিল দলকে একটি নতুন আবরণী দেয়া, যাতে শ্রমিক শ্রেণী নয়, ব্রিটেনের মধ্যবিত্তরা দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু ব্লেয়ারের ঐতিহ্যবাহী শ্রমিক শ্রেণী যারা লেবার পার্টির মেরুদণ্ড বলে বিবেচিত তাদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হয়, যখন তার প্ররোচনায় দলীয় সংবিধানের চার নম্বর অনুচ্ছেদের কর্তন অনিবার্য হয়। এই অনুচ্ছেদটিই লেবার পার্টির দীর্ঘ দিনের কমিটমেন্ট­ শ্রমিকদের উৎপাদনের সব উপায়ের অভিন্ন মালিকানা সংরক্ষণ। ব্লেয়ার এখানেই থামলেন না, তিনি পার্টিকে এমন এক ছাঁচে ঢাললেন, যেন এখন থেকে নিউ লেবার শুধু একটি জনসংযোগের প্লাটফর্ম।

তা ছাড়া পার্টিকে দু’ভাগে বিভাজনের যৌক্তিক কারণই ছিল ভোটারদেরকে এই ধোঁকা দেয়া যে, নিউ লেবার একটি ভেজালমুক্ত সমর্থকদের পার্টি, যেখানে ওল্ড লেবার এখনো অনাধুনিক বামপন্থীতে ঠাসা। এমনই একটি ধুয়া তোলার ফলে মিডিয়া ম্যানেজাররা ব্লেয়ারকে লুফে নিল। লুফে নিল ইমেজ বানানেওয়ালারা। তারা ব্লেয়ারকে এ জন্য একজন আদর্শ শিকার হিসেবে পেল, যাকে জনসংযোগের (Pablic Relation Machine) মেশিনে ফেলে বিপণনযোগ্য ব্র্যান্ডে পরিণত করা যাবে, যদিও এককালের লেবার পার্টি সম্প্রসারিত অর্থে সামাজিক আন্দোলনই ছিল। সেখানে পার্টির বার্ষিক সম্মেলন হতো­ নীতি ও আদর্শ নিয়ে খোলামেলা বিতর্কের জন্য। এখন থেকে সেসব আর হওয়ার সুযোগ থাকল না। সম্ভবত এখন আর থাকবে না কোনো ভিন্ন মতাবলম্বী। অবশ্য এমন পরিবর্তনে ব্লেয়ারের হারানোরও কিছু ছিল না। তার কখনো কোনো ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বা ঐতিহ্য বহনের বালাই ছিল না।

টনি ব্লেয়ার আসলে নতুন প্রজন্মের এমপিদের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, যাতে তার রাজনীতিতে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। এই প্রজন্ম কখনো শ্রমিক আন্দোলন করেনি এবং তার স্বরূপ সম্বন্ধেও তাদের ধারণা ছিল না। এই সহজে প্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিত্বের ফলে যারা এমপি হয়েছিলেন, তারা কোনোভাবেই লেবার পার্টির ইতিহাস বা ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত ছিলেন না। ব্লেয়ারের আবির্ভাবের সময় নাগাদ লেবার পার্টির প্রবাদ পুরুষরা আর কেউ অবশিষ্ট ছিলেন না। তাদের স্থানে ক্রমে ক্রমে অধিষ্ঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক আনাড়িরা, যারা পার্টিতেও ছিল নিয়মশৃঙ্খলাহীন। লেবার পার্টিতে এদের অধিষ্ঠানের ফলে একসময়ের ভয়ঙ্কর জনসম্পৃক্ত পার্টি হয়ে ওঠে ভুঁইফোড়দের আখড়া। এমনই একটি পরিবর্তনের ধারায় টনি ব্লেয়ারের ভাগ্য খুলেছিল, যিনি শুধু নির্বাচন জিততে চান, পার্লামেন্টে আসন চান। নীতি বা আদর্শকে সমুন্নত রাখা তার কাজ নয়।

এদিকে ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে চমক এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কোনো পর্যায়েই তার ওয়ার্ল্ড ভিউ বদলায়নি। ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারাভিযান থেকে কিছু কিছু সবক নিয়ে ব্রিটেনেও ব্লেয়ার লেবার পার্টিকে আনকোরা নতুন অবয়ব দেন। তার রাজনীতিকে ঐশ্বর্যময় করতে ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও সে দেশের নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত অনুকরণে প্রবৃত্ত হন। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্লেয়ারের প্রতীক্ষিত রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক একটি মান অর্জনের সুযোগটি আসে যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন ঘটনার পর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে প্রতিহিংসামূলক আক্রমণ অভিযানে টনি ব্লেয়ার বাহবাদানের দায়িত্বটি নিজ ঘাড়ে তুলে নেন। মার্কিন নব্যরক্ষণশীলদের কদর্য অনুকরণে ব্লেয়ার এই কুখ্যাত যুদ্ধের যথার্থতা প্রমাণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার মতো সম্ভাবনাময় একজন ব্রিটিশ নেতা বুশ নেতৃত্বাধীন ক্রুসেড বাহিনীতে যোগ দেন।

পার্লামেন্টে যদিও তার সুদক্ষ বাগ্মীতায় তার অনৈতিক চাতুর্য ঢাকা পড়ে যায়, তাকে হাউস অব কমনসের বাইরে যুদ্ধবিরোধী প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এবং তিনি জনমত যাচাইয়ে দ্রুত তার গ্রহণযোগ্যতা হারাতে থাকেন। ১৯৬০-এর দশকে লেবার প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন ভিয়েতনামে ব্রিটিশ সৈন্য পাঠানোর জন্য মার্কিন সরকারের অনুরোধে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তারও আগে ক্লিমেন্ট এটলি, ব্রিটেনের যুদ্ধ-উত্তর প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি লেবার পার্টিরই ছিলেন, অবলীলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন­ সেই একই পার্টির অন্য এক সংস্করণের নেতা টনি ব্লেয়ার আজ বিবেকদংশিত হলেও কারোর কোনো সহানুভূতি তার জন্য নেই। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে প্রাক-ইরাকযুদ্ধ এবং যুদ্ধকালীন ইরাককে ঘিরে তার অনৈতিক ওকালতি তাকে আমৃতুø তাড়া করতে থাকবে এবং লিগ্যাসিকে কলঙ্ক লেপন করবে। তবু ইরাক আক্রমণের জন্য তিনি যেভাবে বুশ ও তার লিওকনদের উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, সম্ভবত তারই পুরস্কারস্বরূপ এক যুদ্ধবাজ ব্লেয়ারকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিদূতের পদ প্রদান করা হয়েছিল।

ব্লেয়ারের স্মৃতিকথা A Journey, পাঠক আসলে এক রক্ষণশীলের জার্নির (ভ্রমণ) কথাই পড়বে যিনি লেবারের নাম ভাঙিয়ে উচ্চাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং তারপর শুধু সেই লেবার পার্টিই নয়, ব্রিটেনের ঐতিহ্যমণ্ডিত লেবার আন্দোলনকেই ধ্বংস করেছেন। পাঠকরা আরো জানবেন যে, কী করে একজন প্রতিভাবান রাজনীতিক এক মহান সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে ধ্বংস করে নিওকন এলিটদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং একজন কুখ্যাত যুদ্ধবাজে রূপান্তরিত হয়েছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তিনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যকে উসকে দিয়েছেন।

আমি নিশ্চিত যে, ব্লেয়ারের ‘জার্নির’ সাথে যে কারো সহগমন হবে আসলেই একটি ‘মোহভঙ্গের’ যাত্রা, যার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের একজন প্রতিভাবান রাজনীতিকের পরিণতি হয়েছে বড়জোর একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পুডলে (Poodle) অথবা তার এক নিকৃষ্ট ভাঁড়ে (cheer Leader). ব্লেয়ারের A Journey,-তে একটা রূপরেখা হয়তো আছে, কিন্তু কোনো সারবস্তু নেই।

এম. আবদুল হাফিজ
লেখকঃ অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এবং নিরাপত্তা, রাজনীতি, বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক