ভাইব্রেশন অফ লাইফ, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান


একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন
 

মুর্তজা বশীর

চিত্রশিল্পী

পেইন্টিং, মুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার নানা ফর্মে কাজ করেছেন মুর্তজা বশীর। বাংলাদেশের চিত্রকলায় অগ্রগণ্য অবস্থান তার। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। উর্দু মুভি ‘কারোয়া’র চিত্রনাট্য লিখেছেন। হুমায়ুন কবীরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আলমগীর কবিরের মুভি ‘নদী ও নারী’তে কাজ করেছেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। গবেষক হিসেবে মদ্রা ও শিলালিপির আলোকে রচনা করেছেন বাংলার হাবশি সুলতানদের ইতিহাস। শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে। এতো কিছুর পরও ফটোগ্রাফি, ডাকটিকেট সংগ্রহের মতো শখের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অবিরাম পাঠ করে চলেছেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বইপত্র। তারুণ্যের দীপ্তি তাকে রাখে সদাচঞ্চল। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী শিল্পী চান ৯৩ বছরের জীবন। নির্মাণ করতে চান চারটি ডকুমেন্টারি মুভি। দ্রুত ঘুরে আসতে চান বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্নস্থল। তার জন্ম ঢাকায়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট, আশুতোষ মিউজিয়াম, ফ্লোরেন্সের দ্যেল বেলেস্ন আরটি, প্যারিসের ইকোলে ন্যাশনাল সুপিরিয়র দ্য বোজার্ট ও আকাদেমি গোয়েৎস-এ। ভ্রমণ করেছেন নানা দেশ, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলার লোকশিল্প। ১৯৯৮ সালে চিটাগং ইউনিভার্সিটি থেকে অবসর নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকছেন। কর্ম উদ্যোগী এ শিল্পী কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। দু’দফায় আয়োজিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন নিজের শিল্প, জীবন ও নন্দনতত্ত্ব ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা ও আমি মাহবুব মোর্শেদ। ২০০৭ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এখানে পুনর্মুদ্রিত হলো।

সাধারণভাবে আমরা জানি মুখ্যত বেঙ্গল স্কুলের মাধ্যমেই বাংলায় আধুনিক চিত্রকলা চর্চার সূচনা ঘটেছে। বেঙ্গল স্কুলের পর পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে বঙ্গীয় শিল্পধারা বলে কি কিছু তৈরি হয়েছে?

এ প্রসঙ্গে একটি কথা সর্বপ্রথম বলা উচিত যে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্পী মনে করেন, শিল্পকলার ভাষা হলো আন্তর্জাতিক। অতএব, আন্তর্জাতিকতা তার শিল্পে থাকতে হবে। এখানে একটি জিনিস আমার কাছে বেখাপ্পা লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা আমি স্বীকার করি, কিন্তু সে ভাষায় তো মাটির গন্ধ থাকতে হবে। আমরা আমেরিকার অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের কাজ দেখি, তারা রঙ ছিটিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে, রাগের সঙ্গে চওড়া ব্রাশ দিয়ে ইচ্ছামতো আঁকাজোকা করেছে। কেন? আমেরিকার সোসাইটি ছিল ভাঙনমুখী। বাবা ছেড়ে চলে গেছে, মা ছেড়ে চলে গেছে। এই যে টোটাল একটা এলিয়েনেটেড সমাজ। মানুষ সেখানে অনেকটা যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছে। ভেতরের এ রাগের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি শিল্পীদের রঙ ব্যবহারে, সেটার মধ্যে এক ধরনের অ্যাঙ্গার প্রকাশিত হচ্ছে। সাইড বাই সাইড আমরা দেখছি ওই সময় সাহিত্য ক্ষেত্রে বিট জেনারেশন। বিলেতে অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। জন অসবর্ন বিলেতে লুক ব্যাক ইন অ্যাংগার লিখলেন। সঙ্গে আরো অনেকে জন ওয়াইন, ফিলিপ লারকিন, কিংসলি অ্যামিস। পাশ্চাত্যের ওই সেন্সে এখনো কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ এলিয়েনেটেড হয়নি, এখনো যৌথ পরিবার। বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে থাকে। টোটালি এলিয়েনেটেড মানুষের পার্সেন্টেজ খুব কম। এখানে শিল্পকলার আন্তর্জাতিক ভাষার চিন্তাধারার ফলে দেখা গেল, এসব চিত্রকলায় মাটির গন্ধ আর দেশজ রঙ থাকলো না।

এর আরেকটি কারণ হলো, শিল্প সংগ্রাহক বলতে যা বোঝায়, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। শিল্প সংগ্রাহকরা যতোক্ষণ না আর্টকে একটি পণ্য হিসেবে লগি্ন করবে, ততোক্ষণ এখানে আর্ট ওইভাবে বিকশিত হবে না। এখানে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আমাদের দেশে আর্ট সংগ্রাহক গড়ে ওঠেনি। এখানে ছবির বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে অনেকটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন হিসেবে। ঘরের দেয়ালের রঙ, পর্দার রঙ, কার্পেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ফলে শিল্পীদের কাজেও উজ্জ্বল রঙের প্রয়োগ আমরা দেখি না।

বাংলার নিজস্ব ঘরানা গড়ে ওঠেনি, কারণ আমরা কথায় বলি আমরা বাঙালি, কিন্তু বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা কতোটুকু জানি? এটার জন্য অনেক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে ছোটবেলাতেই যোগসূত্র স্থাপন করে দিতে হবে।

তারপরও আমাদের এখানে যে একেবারেই কাজ হচ্ছে না, তা নয়। আমাদের কামরুল হাসান লোকশিল্প, কালীঘাটের চিত্রকলা ইত্যাদির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। রশীদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রির ফর্ম আমাদের নিজস্ব লোকশিল্প লক্ষ্মীর সরা থেকে নিচ্ছেন। আবার কাইয়ুম চৌধুরীকে আমরা দেখলাম, একদিকে কালীঘাট থেকে নিচ্ছেন, অন্যদিকে তার মধ্যে জ্যামিতিক যে বিন্যাস আমার মতে, সেটা অনেকটা জামদানি শাড়ির মতো। এরকম হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন বলে তো আমি দেখছি না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপিয়ান ঘরানার শিল্পী ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, আমার শিল্পকলায় মাটির গন্ধ নেই, দেশের গন্ধ নেই তখন আমার মনে হলো, একজন কৃষকের প্রধান কাজ হলো জমিটাকে চেনা। জমিটাকে চিনলেই সে সঠিক বীজটা রোপণ করতে পারবে। একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন।

ঐতিহ্যে হাত দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার আগে দুজন অলরেডি সেখানে হাত দিয়ে কাজ করেছেন। একজন যামিনী রায়, আরেকজন কামরুল হাসান। আমার কাছে মনে হলো, এরা বিরাট দুটি পাহাড় এবং এ পাহাড়কে অতিক্রম করার মতো শক্তিশালী শিল্পীসত্তা আমার নেই। দেখলাম, আমার কাজে যদি কামরুল হাসান বা যামিনী রায়ের গন্ধ থাকে, তবে সেটা একজন আত্মম্ভরী শিল্পীর জন্য প্রশংসার কথা নয়। ঠিক করলাম, আমার পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা ও আমার ঐতিহ্যকে যদি মেলবন্ধনে আনতে পারি, তাহলে আমি ওদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো এবং আমি সেভাবে বেশকিছু ফিগারেটিভ কাজ ২৫ বছর পর ১৯৯৩-তে শুরু করি। তবে এখনো মনে হয়, বাংলাদেশে আমরা ছবি আঁকছি ঠিকই, কিন্তু নামটা যদি মুছে ফেলা যায় তবে শিল্পীর আইডেন্টিটি দেখা খুব মুশকিল। এখানে মূল ব্যাপার হলো, আমার ঐতিহ্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমার ঐতিহ্যকে জানতে হবে, তার মধ্যে অবগাহন করে যদি শিল্প সৃষ্টি করা হয়, তাহলেই একটি নিজস্ব শিল্পধারা গড়ে উঠবে।

আমাদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়গুলো গভীর অভিনিবেশে পাঠ করেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণামূলক কাজও করেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে ইতিহাসের মতো বিষয়ের প্রতি আপনার আগ্রহের সূচনা কিভাবে ঘটলো?

আমি মনেপ্রাণে ইউরোপিয়ান চিন্তাধারায় আক্রান্ত ছিলাম। আমার বয়স যখন ২২ বছর, আমি এক রাতে বাড়ি ফিরিনি। আমার বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বাড়িতে ফিরলে না কেন? আমি বড় হয়েছি। এটা আমাদের সমাজে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে হয় না। আমার বাবা আমাকে ইটালিতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আমি ঢাকায় ফিরে আসার পর যখন কোনো চাকরি পেলাম না, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম করাচি চলে যাবো। আমি যখন কাপড়-চোপড় গোছাচ্ছি, আমার বাবা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আমাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলে না? আমি বললাম, নো, আমি গ্রোন আপ। কিন্তু ১৯৮০ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পকলা একাডেমী আমাকে জাপানে ফুকোকা সিটিতে একটি সেমিনারে পাঠালো, আমার ইন্টারপ্রেটার মেয়েটি ছিল সুন্দরী, তরুণী, বেশভুষায় আধুনিক। আমি যখন তার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম, সে কিন্তু হাত বাড়ালো না। সে তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাথাটা ঝুঁকিয়ে আমাকে অভিবাদন জানালো। এটা আমাকে ভীষণভাবে আহত করলো। আমার তখন ঈশপের গল্প মনে হলো। একটা কাক ময়ূরের পুচ্ছ পরেছিল। সে কাকও হতে পারেনি, ময়ূরও হতে পারেনি। আমার মনে হলো, বাংলাদেশ তো বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ নয়; এটি এ উপমহাদেশেরই অংশ এবং এ উপমহাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। লোকজ উপাদান ও জলবায়ুর প্রভাব থাকতে হবে কিন্তু ধারাবাহিকতা তো অস্বীকার করা যায় না। তখন আমার জানার ইচ্ছা হলো, আমি কে, আমি কী, কোত্থেকে এসেছি। এটি যখন আমার মাথায় ঢুকলো, তখন দেখা গেল আমি আসলেই আর কোনো ছবি আঁকতে পারছি না। আমি ‘৮০ থেকে ‘৮৪ পর্যন্ত কোনো ছবি আঁকিনি। সেসময় আমি নিজেকে খোঁজার জন্য এ দেশের ধর্মীয় গ্রন্থ, ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, পুরাণ-এগুলো পড়া শুরু করলাম।

তারপর ১৯৯০ থেকে ‘৯৭ এ সাতটি বছরে আমি গবেষণা করতে শুরু করলাম। আমার কাছে খুব অবাক লেগেছিল, বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে চারজন অ্যাবেসিনিয়ান। এরা এসেছিল দাস হিসেবে। এরা পরে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। আমি ওই সময় একটি বই করি, ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ নামে।

আমার মতে, ইউনিভার্সিটিগুলোর ইতিহাস বিভাগে মুদ্রাতত্ত্ব ও শিলালিপি সম্পর্কে পাঠদান করা উচিত। তাহলে এ দেশের ইতিহাস, মুদ্রা, সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। ইউনিভার্সিটি লেভেলে এগুলো পাঠ্য থাকলে সামাজিক কাঠামো বোঝা যেতো। আমরা মুখে বাঙালি বললে তো হবে না, সংস্কৃতিকে তো লালন-পালন করতে হবে।

ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চা আপনার শিল্পে কি ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে?

অবশ্যই ফেলেছে। ভবিষ্যতে আমার মনে হয়, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। যেটা আমার এখনো আসেনি, এখনো আমি একটা ফিগারের বেশি আঁকি না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে টেরাকোটা দেখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। টেরাকোটার একেকটা ফলকে যেভাবে কয়েকটা ফিগারকে অর্গানাইজ ও কম্পোজ করা হয়েছে সেগুলো আমি দেখেছি, যা আমার আঁকায় কাজে লাগবে। আধুনিক চিত্রকলায় টেক্সচার একটা এলিমেন্ট, এখানে যেহেতু কোনো রঙ ছিল না অতএব, আঁচড় কেটে শাড়ির নানারকম টেক্সচার করা হতো। এগুলো হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।

আপনি বলছিলেন যদি ৯৩ বছর বাঁচেন তবে আপনার শিল্প একটা পরিণত পর্বে পেঁৗছতে পারবে।

আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত, এ ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি শিখছি। কিন্তু সময়কে উত্তরণ করার মতো যে শিল্প, সেটা কিন্তু আমি সৃষ্টি করতে পারিনি। এই যে জ্ঞান আহরণ করছি এটা প্রয়োগ করার মতো যদি আরো বয়স আমি পাই, তাহলে আমি সফল হতে পারি। আমি আমার মাটি আমার দেশের রঙ এসব ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।

এই যে বাংলাদেশ, এর প্রকৃতি যদি দেখি, সব জেলার সব সবুজ কিন্তু এক নয়। সবুজের রঙ জায়গায় জায়গায় পাল্টে যায়। উত্তরবঙ্গের সবুজ কিন্তু একরকম, দক্ষিণবঙ্গের সবুজ অন্যরকম, আবার ডিস্ট্রিক্টওয়াইজ রমণীদের শাড়ির রঙ পাল্টে যায়। সব অঞ্চলে বেগুনি রঙ পাওয়া যাবে না। অনেক অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি আছে। সব অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি নেই। তবে কমন যে রঙ আমি সব অঞ্চলে দেখেছি, সেটা হলো নীল ও সবুজ। সিম্পল একটা দা’র ডিজাইন অঞ্চল ভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়। নৌকার শেপ, গলুই অঞ্চলভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়।

সবক্ষেত্রেই আমরা দেখছি নিজস্বতার একটা ব্যাপার কাজ করে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে উপলব্ধিটা এখন অনেক গভীরভাবে কাজ করছে। যেটা সিক্সটিজে অনুভূত হয়নি।

আমি কিন্তু এ বিষয়ে একমত নই। এখনো কিন্তু শিল্পীরা আমাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে ওইভাবে অনুসন্ধান করছে না, যতোটা আন্তর্জাতিক শিল্পকলার প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে।

এটা কেন হচ্ছে? আপনি বহুদিন শিক্ষকতা করেছেন। আপনার কি মনে হয় আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে গলদটা রয়ে গেছে? নাকি আমাদের অগ্রজ শিল্পীদের অনুসরণ করতে গিয়েই এটা হচ্ছে?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে কী পড়ানো হচ্ছে? আমরা পড়াচ্ছি ওয়েস্টার্ন আর্ট-একেবারে পৃমিটিভ থেকে লেটেস্ট পর্যন্ত। কিন্তু ওরিয়েন্টাল আমরা পড়াচ্ছি ঠিকই, সেখানে ইনডিয়ারটাতে জোর দিচ্ছি, ছুঁয়ে যাচ্ছি জাপান-চায়নাকে। আমার মতে, আমাদের পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তন করতে হবে। আমার বারোক, রকোকো বিস্তারিত জানার দরকার নেই। রেনেসাঁ জানলেই আমার জন্য যথেষ্ট। তারপর আসবো রিয়ালিস্ট পিরিয়ডে, তারপর ইমপ্রেশনিস্ট পর্বে। ইন বিটুইনগুলো আমরা টাচ করবো। আমি এশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ায় কী আর্ট হচ্ছে তা আমি জানি না। মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে কী হচ্ছে তাও আমরা জানি না। ইনডিয়ার আধুনিক আর্ট আমরা জানি না-যতোটা জানি অজন্তা, ইলোরা, রাজপুর, কাংড়া। তাও ভাসা ভাসা। ওরিয়েন্টাল আর্টের মধ্যে পার্সিয়ান আর্টকে ইমপর্টেন্স দেয়া উচিত, তারপর ইনডিয়ান আর্ট। কালীঘাট ও পাল চিত্রকলা আরো ডিটেইল পড়ানো দরকার। নেপাল, মিয়ানমার, শ্রী লংকা, থাইল্যান্ড, জাপান, চায়না-এগুলোকে ইলাবোরেটলি পড়ানো দরকার। ইউরোপিয়ানটা শিখবো শিল্পকলার ধারাবাহিকতা জানার জন্য।

পপ আর্ট নিয়ে এতো পড়ার দরকার নেই। জানার জন্য পড়বো। সাহিত্যেও একই ঘটনা, পাশর্্ববর্তী দেশের সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কিন্তু তেমন জানি না। আমাদের এখন পুরো জিনিসটার জন্য একটি ভিশন দরকার।

কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, আন্তর্জাতিক কি লোকাল ফর্ম, যে ফর্মেরই একটি ছবি তৈরি হোক, শিল্পবোদ্ধা ও রসগ্রাহীর অভাবে সেটা ব্যাপকমাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছতে বা গৃহীত হতে পারছে না। এখানে শিল্প সমালোচনার অবস্থাও খুব সুখকর নয়।

শিল্পকলার আন্দোলন বলতে যা বোঝায়, সেটা কিন্তু আমাদের এখানে দরকার নেই। এটা প্রথম যুগে দরকার ছিল। ১৯৫০ সালে যখন ঢাকা লিটন হলে ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী হলো, তখন দেখা গেছে ঘোড়ার গাড়ি করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে এসেছে। কারণ, ঢাকায় তখন বিনোদনের অভাব তাই একটা নতুন জিনিস চিত্রকলা দেখতে তারা এসেছে।

আমাদের ছাত্র অবস্থায় আমরা দর্শককে প্রাণপণে ফর্ম সম্পর্কে নানা কথা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন কেউ প্রদর্শনী দেখতে এলে তাকে আমি বোঝাই না। তার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হলো, সেটা আমি বোঝার চেষ্টা করি। আর্ট ক্রিটিসিজম বলতে যে জিনিসটি বোঝায়, সেটি আমাদের দেশে এখনো গ্রো-আপ করেনি।

বাংলাদেশের আর্ট বিকশিত করতে চাইলে সরকারের একটি প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মতো গরিব দেশে বিনোদনের অভাব। এ অভাবের কারণেই তরুণসমাজ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় যদি একটি আর্ট গ্যালারি থাকতো তাহলে ছোটবেলা থেকে বাচ্চারা আর্টের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারতো। আর্ট তো আমাদের দেশে একটি অভিনব জিনিস। সরকারের তো প্রচুর পরিত্যক্ত সম্পত্তি আছে, সেখানে হতে পারে অথবা শিল্পকলা একাডেমির একটি ঘরে হতে পারে। নিয়ম করতে হবে, এতে ছবি যারা দান করবে, সেটা হবে ইনকামট্যাক্স ফ্রি। এখানে শিল্পীদের একটি রেয়াত দিতে হবে। তাহলে আর্টিস্টরা বেনিফিটেড হবে। আজ শিল্পীদের কমপ্রোমাইজ করতে হচ্ছে, বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের জন্য ড্রয়িংরুম-বেডরুমের পর্দা ও কার্পেটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকতে হচ্ছে। এর থেকে তারা মুক্তি পেতো।

আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস, গল্পে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে পেইন্টিংয়ে তার কতোটা এসেছে? জিরো জিরো ওয়ান পার্সেন্ট। এতো বড় ভাষা আন্দোলনের কাজ কোথায়। ‘৫২ সালে আমি একটি লিনোকাট করেছি, আমিনুল ইসলাম একটি করেছেন। তারপর আর কোথায়? এগুলোর প্রতি আর্টিস্টদের আগ্রহ তৈরি হলো না কেন? আমি আগে বলতাম, আর্টিস্টরা হলো পরগাছার মতো। পরগাছা শব্দটা শুনতে খুব খারাপ লাগে। এ জন্য আমি এখন বলি আর্টিস্টরা হলো অর্কিডের মতো। অর্কিডও কিন্তু এক ধরনের পরগাছা।

আপনার সামপ্রতিক কাজগুলোর প্রসঙ্গে আসি। ডানা সিরিজ আঁকছেন আপনি এখন। এর মূল মেটাফোর প্রজাপতির ডানা। এটা কেন বেছে নিলেন?

শিল্পী হবো এটি কিন্তু কোনোদিন আমার বাসনা ছিল না। আমার আর্ট ভালো লাগে। বাসায় প্রচুর আর্টের বই ছিল। আমি ছোটবেলা থেকে এগুলো দেখতাম। কিন্তু প্যারিসে যখন পিকাসো, মাতিস, ভ্যানগগের ছবিগুলো দেখলাম, আমার মনে হলো এ ছবিগুলো আমার চেনা। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে ওগুলো দেখেছি। আর্ট শেখার জন্য কিন্তু আমি আর্ট ইন্সটিটিউটে ভর্তি হইনি। আর্টের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময়। আমি সবসময় মনে করতাম, এখনো মনে করি যে, এ সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। ফলে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে আমি বিশ্বাসী নই। যখন আমার বন্ধুরা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে চলে গেল আমি কিন্তু মনে-প্রাণে নিতে পারিনি। কিন্তু নিজেকে আবার খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমি বোধহয় আধুনিক নই। কিন্তু আমি তো সমাজকে বিশ্বাস করি। এখানে আমার মধ্যে একটা টানাপড়েন চলতে থাকলো। তখন আইয়ুব খানের সময়। দেশে একটা দমবন্ধ অবস্থা। আমি উপলব্ধি করলাম, আর্থ-সামাজিক কারণে কোথায় যেন একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। দেখলাম, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে। তখন আমি ওয়াল সিরিজ শুরু করলাম। ওয়াল সিরিজ আমি এঁকেছি ৯২টা।

যুদ্ধের সময় সপরিবারে পালিয়ে গিয়েছি প্যারিসে। সেখানে বসে আঁকলাম এপিটাফ ফর দি মারটারস। ছবিতে দেখালাম যোদ্ধারা মাঠে পড়ে আছে, আমার মনে হলো এদের কথা কেউ বলবে না। সবাই তার পার্টির লোককে নাম ফলকে আনবে। বাংলাদেশে এতো লোক মারা গেছে সবাই তো আর পার্টির লোক না; সাধারণ মানুষ। তখন এসব অজানা অচেনা শহীদদের উদ্দেশ্যে আমি ছবি আঁকা শুরু করলাম। পাথরের নুড়ি নিয়ে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো যোদ্ধা মারা যেতো, তখন তার মাথার কাছে একটা পাথর রাখা হতো। পাথরটা কিন্তু তখন আর পাথর নয়। ওটা একটা সিম্বল, উন্মুক্ত আত্মার, এটাকে মেনহির বলে। এ সিরিজ ‘৭৬ সাল পর্যন্ত আমি ৩৭টার মতো এঁকেছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু আঁকলাম। এরপরের মেজর সিরিজ উইং।

উইং শুরু করলাম ১৯৯৮ থেকে। দেখলাম মানুষের মধ্যে খুব হতাশা। মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষ যে বাংলাদেশ চেয়েছিল, সে বাংলাদেশ পায়নি। যুবক সমাজ ফ্রাস্ট্রেটেড। পত্রিকা খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই। তখন আমার মনে হলো, জীবনের জয়গান গাইতে হবে। আমি তখন দেখলাম প্রজাপতি জীবনের একটা স্পন্দন, লাইফ। যা স্ট্যাগনেন্ট নয়। এখানে ওখানে বসছে-উড়ছে। তখন আমার মাথায় এলো, প্রজাপতির অংশ আঁকার কথা। ভাইব্রেশন অফ লাইন, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান-এটিকে চিত্রায়িত করতে চাইলাম। আজ পর্যন্ত এঁকেছি ৯২টি। আমার মনে হয় ১১৫-১২০ পর্যন্ত যাবে। এরপর আমি যেটা আঁকার পরিকল্পনা করছি সেটা হলো, ওয়ালেরই আরেকটি ইন্টারপ্রেটেশন।

ওয়াল সিরিজটার মধ্যে একটা গুমোট ভাব ছিল। দমবন্ধ অবস্থা ছিল। পস্নাস্টার খসে গেছে, শ্যাওলা ধরেছে, ইট বেরিয়ে এসেছে। এখন আমার তো বয়স হয়েছে। স্মৃতি কিন্তু খুব মিষ্টি, বেদনার হলেও কিন্তু মিষ্টি। আমি মাঝখানে মেমোরি বলে কিছু কাজ করেছিলাম। এখন রেমিনিসেন্ট বলে একটা সিরিজ করবো। আমি ঢাকা, প্যারিস, ভেনিস, ফ্লোরেন্সে যে দেয়ালগুলো দেখেছি, সেখান থেকে অাঁকবো। এর মধ্যে কিন্তু হতাশা নেই। একটা বেদনা-বিধুর কথা। যেমন দেয়ালগুলোতে অনেক লেখা ছিল নানা রঙের। তারপর সাদা রঙ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় রঙগুলো দেখা যাচ্ছে। এটা আকার পস্ন্যান আছে। এটা আমি আঁকবো উইংটা শেষ করার পর। ফিগারেটিভ কাজও আমি করবো। ইস্ট-ওয়েস্টের যে মেলবন্ধন আমি করতে চেয়েছিলাম এটি পরিপূর্ণ হয়নি। একটি প্রদর্শনী আমার সব ফিগারেটিভ কাজ দিয়ে করতে চাই। বাংলাদেশের যে কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট এটা হয়তো করতে সাহস পাবে না। অবশ্য এ জন্য সুস্বাস্থ্য দরকার, আয়ু দরকার। সুস্বাস্থ্য আমার হাতে, কোনো অনিয়ম আমি করি না। কিন্তু আয়ু তো আমার হাতে নেই। আমি কী করবো?

http://30boxes.com/widget/8430731/JahanHassan/fbe55cb44992143598a6dadd06e09354/0/

রেমিটেন্স মূল্যবান হলেও প্রবাসী শ্রমিকরা মূল্যহীন


১২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা

গেল অর্থবছরে ১২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন (এক হাজার ২৮৫ কোটি) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা বা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। 
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিটেন্স সংক্রান্ত যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১১-১২ অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে আসা ১২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্সের মধ্যে জুন মাসে এসেছে ১০৭ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।
 
১২ মাসের মধ্যে মাত্র মাস দুই মাস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ একশ’ কোটি ডলারের কম ছিল। বাকি দশ মাস এসেছে একশ’ কোটি ডলারের বেশি।
 
এর মধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে জানুয়ারি মাসে আসা রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১২২ কোটি ১৪ ডলার। এক মাসের হিসাবে যা ছিল সর্বোচ্চ রেমিটেন্স।
 
রেমিটেন্স বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ৭০ কোটি ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। তবে মঙ্গলবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
 
২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারি মালিকানাধীন চার ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৩১ কোটি ডলার।
 
এ ছাড়া বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের (কৃষি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে এক কোটি ডলারের কিছু বেশি।
 
৭৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার এসেছে ৩০টি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যাধ্যমে। আর নয়টি বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণ এক কোটি ৯৫ লাখ ডলার।


রেমিটেন্স মূল্যবান হলেও প্রবাসী শ্রমিকরা মূল্যহীন

প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স আমাদের দেশে মূল্যবান হলেও প্রবাসী শ্রমিকরা বরাবরই মূল্যহীন। এরা আমাদের কাছে শুধুই শ্রমিক হিসেবে গণ্য। প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে প্রবাসীরা। অথচ তাদের কোনো মূল্য নেই আমাদের দেশে। কোনো শ্রমিক বিদেশে মারা গেলে কোম্পানির খরচে দেশে পাঠানো হলেও স্টুডেন্ট বা ভিজিট ভিসায় গমনকারীদের চাঁদা তুলেই দেশে আনার ব্যবস্থা করতে হয়।

সরকার কর্তৃক প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অবশেষে আলোর মুখ দেখেছে। এছাড়া চরম নিরাপত্তা হুমকিতে দিন কাটাতে হয় বাংলাদেশের প্রবাসীদের। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় দেশের বাইরে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছে তারা। এভাবে অনেকটা মূল্যহীন এবং অবহেলিত হয়েই প্রবাস জীবন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগীরা।অভিযোগ রয়েছে, এসব শ্রমিক দেশে এসে কোনো রকম কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না।

বিদেশে অবস্থানকালে হাইলি স্কিলড এসব জনশক্তি আমাদের দেশে এসে অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। উপরন্তু কোনো রকম প্রবাসী ফান্ড বা ট্রাস্ট নেই বলে দেশে এসে শূন্য হাতেই জীবন কাটাতে হয় তাদের। বিদেশে অবস্থান কালে চিকিৎসা সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করলেও দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রেখেও কোনো রকম রাষ্ট্রীয় সুবিধা পায় না তারা। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স জাতীয় অর্থনীতির জন্য মূল্যবান হলেও তাদের কোনো মূল্যায়ন নেই আমাদের দেশে। এছাড়া বাইরে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোনো রকম নীতিমালা বা তদারকি না থাকায় জালিয়াত চক্রের হাতে হরহামেশা প্রতারিত হচ্ছে দেশের শিক্ষিত যুবকরা। গুটিকয়েক দেশীয় চক্র উচ্চ শিক্ষার নামে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সমপ্রতি মার্কিন দূতাবাস থেকে পাওয়া এক অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি জালিয়াত চক্রের ৭ সদস্যকে আটক করেছে। তাদের কাছ থেকে ২০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির পুরনো আবেদন ফরম ও ছবিসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। এছাড়াও ইমিগ্রেশন পুলিশ জালিয়াতি করে বিদেশ পাঠানোর অভিযোগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বিভিন্ন সময় প্রায় ১ হাজার ৫শ’ যুবককে আটক করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, সমপ্রতি একটি জালিয়াত চক্র উচ্চশিক্ষার নাম করে বিদেশে পাঠানোর জন্য ৫৫ জন যুবকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে। পরে তাদের বিদেশে না পাঠিয়ে নানাভাবে প্রতারণা করে আসছে।

ইমিগ্রেশন ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, উচ্চশিক্ষা ও ভিজিট ভিসার নামে বিদেশ যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় জালিয়াত চক্র সুযোগ পেয়ে অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে ভিজিট ভিসার নামে হাজার হাজার যুবক বিদেশে যায়। সেখানে গিয়ে নানা প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিয়ে কিছু প্রতারক চক্র রোহিঙ্গাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করারও অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মধ্যে অনেককেই আটক করা হয়। কিন্তু এরপর সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও ভিজিট ভিসার নামে আদম বেপারীরা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণ-তরুণীদের বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখায়। প্রতি বছর কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার তরুণ-তরুণী বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যে গত প্রায় এক বছরে দেড় হাজার তরুণ-তরুণীকে গলাকাটা পাসপোর্টসহ নানা অভিযোগে ইমিগ্রেশনে আটক হয়েছে বলে জানা গেছে। আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই ভুয়া ছাত্র সেজে উচ্চশিক্ষার নাম করে বিদেশ যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে অন্য কাজ করে। আবার অনেকেই ধরা পড়ে দেশে ফেরত আসে। কেউ কেউ গলাকাটা পাসপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়ে দেশে ফেরত আসে।

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, সঠিক পাসপোর্ট এবং কাগজ-পত্র ভেবেই তারা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু যখন জানতে পারে পুরো বিষয়টিই ভুয়া তখন আর কিছুই করার থাকে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইমিগ্রেশন পুলিশের এক অপরাধ বিশেষজ্ঞ শীর্ষ কাগজকে জানান, এ জালিয়াত চক্র সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য দেশে রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচারণা চালানো দরকার। এয়ারলাইনসগুলোতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা না গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট মতে, উচ্চশিক্ষার নামে চটকদার বিজ্ঞাপনগুলো খতিয়ে দেখার জন্য সরকারিভাবে একটি মনিটরিং সেল থাকা প্রয়োজন

জীবনের সবচেয়ে তুখোড় সময় নারীদের ২৮ পুরুষদের ৩৩


জীবনের সবচেয়ে তুখোড় সময়
নারীদের ২৮
পুরুষদের ৩৩

যৌবনের গান কখন সবচেয়ে ভালো হয়? ব্রিটেনে  এ নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষনা। সম্প্রতি পরিচালিত এই গবেষনা দেখা গেছে, মাত্র ২৮ বছর বয়সে নারীরা তাঁদের জীবনের সবচাইতে সুখী জীবন উপভোগ করে। এ বয়সে শারিরীক মেলামেশায় তৃপ্তির স্বর্ণযুগ কাটায় বলে জানায় গবেষনায় প্রাপ্ত ফলাফল। অপরদিকে পুরুষদের জন্যে এ সুবর্ণ সময়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় আরও পাঁচটি বছর। অর্থাৎ ৩৩ বছরে পুরুষেরা দাম্পত্যের চরম তুখোড় সময় কাটায় বলে বৃটিশ গষেকরা জানান। খবর, ডেইলী মেইল।
তবে ভিন্নমতের গবেষকরা জরীপের বর্তমান ফলাফল আগেরবারের চাইতে উল্টেই বলছেন। তাঁরা সেবার বলেছিলেন মেয়েরা ত্রিশ আর ছেলেরা মাত্র আঠারোতে চরম পরিতৃপ্তির সময় পার করে।
অনলাইন সেক্স খেলনা বিক্রেতা গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত উক্ত গবেষনায় আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমে ছেলে মেয়েরা জীবনের মূল পর্বে ঢোকার আগেই যৌনতার স্বাদ নিয়ে নেয়। অর্থাৎ নির্বাচনে দেখা গেছে, ছেলেরা বাল্য বয়সে ১৮ এবং মেয়েরা ১৭ বছরেই কুমারীত্ব হারিয়ে বসলেও নারীরা ২৯ ও পুরুষেরা ২৫ এ চরম শারিরিক সুখ পায়।
যৌন সম্পর্ক বিষয়য়ে বিশেষজ্ঞ (সেক্স এন্ড রিলেশনশিপ এক্সপার্ট) ট্রেসি কক্স এ বিষয়ে বলেন, ‘আর সকল জিনিসের মত শারিরিক সম্পর্ক নিয়ে যত বেশী মেতে থাকবেন ততই এটা আর বেশী মহীরুহ হয়ে উঠবে। কাজেই পুরুষ মানুষের জন্যে কিশোর বয়সের চাইতে যৌবনের মধ্য গগনটাই অর্থাৎ ৩৩ বছরটাই হচ্ছে সবচাইতে উপযুক্ত সময়।’
ট্রেসি একটু রস করে আরও বলেন, ‘ নারীর জটিল যৌন গঠনের ব্যাপকতা বুঝতেই পুরুষদের দীর্ঘ সময় লেগে যায়। নারীদের কামনা-চাহিদা কখন নিয়ন্ত্রনের সীমা ছাড়াবে আর কতটা গভীরতায় এর ব্যাপ্তি তার সঙ্গে বয়সের অভিজ্ঞতার অবশ্যই একটা সম্পর্ক আছে।’- জানান তিনি।
‘ এই সংযোজিত নব শক্তির ব্যাপারটি আমরা সবাই জানি। কারন এটা সংখ্যাগত কোন বিষয় নয়, এটা গুনগত মানের বিষয়। সম্পর্কের শুরুতে চাওয়া-পাওয়া যখন সাধারন মাত্রায় তাকে তখনই আমরা বেশী সংখ্যায় শারিরিক মিলন করি। আর পার্টনারের সাথে যখন দীর্ঘ সম্পর্কের একটা অধ্যায় রচিত হয়, কেবল তখনই আমরা গুনগত মিানে সবচেয়ে ভাল সুখকর শারিরিক মিলন করি।’
‘পুরষের চাইতে নারীর জটিল দৈহিক গড়ন স্বত্বেও সময়ের তালে তারাও জেনে যায়, পুরুষের চেয়ে তাদের কোন বিষয়টি বেশী স্থবির কিংবা দ্রত কাজ করে’ – যোগ করেন ট্রেসি।

The best time for women to enjoy sex is at the age of 28, but men have to wait until they are 33 before they reach their sexual peak.

A new study has found that women enjoyed more sex at the age of 25 than any other, which comes eight years after losing their virginity at the age of 17.

The study also found that the average age for men to lose their virginity was 18 and that they enjoyed their peak of sexual frequency at the age of 29.

Sexual Peak: Do Women Hit Their Sex Prime at 28?

Are you in your sexual prime? If you’re around 28 years old, according to a recent survey, the answer is yes.

Through a poll of 1,281 British men and women, British sex toy company Love Honey found that women have their best sexual experiences around 28 while men “peak” at 33, the Daily Mail reported. This (unscientific survey) contradicts the oft-cited conventional wisdom that women peak sexually in their 30s, while men hit their sexual prime at 18. The poll also found that women and men both reported having the most sex in their 20s — 25 for women, 29 for men.

Relationship expert Tracey Cox told the Daily Mail that the survey’s findings make sense because it takes time to learn what you want out of sex and how to get it. “We tend to have the most sex at the start of relationships when desire is fresh, and the best sex once we’re more in tune with our bodies and our partner,” she said. “Despite the female sexual system being far more complex than a man’s, women are discovering what works and doesn’t faster than men.”

However, many have disputed that women and men even have a “sexual peak.” For starters, it’s hard to define what constitutes your “sexual prime.” In his book “Passionate Marriage,” clinical psychologist David Schnarch wrote: “The speed with which your body responds is only one measure of sexual prime. Your sexual peak has a great deal to do with who you are as a person.” Sexologist Yvonne K. Fulbright expressed similar sentiments in a 2008 article for FoxNews.com. “Peaking hormones do not necessarily make for peak performance. Furthermore, physical and sexual primes are not one in the same … Peaks vary from person to person, with most people realizing their full passion potential in their ability to feel more sexually secure with themselves and their partners,” she wrote.

The upshot, it seems, is that sex at 28 — and 33 — can be great, but individuals’ sexual experiences, personalities and levels of bodily comfort differ so much — at any age — that it’s hard (and potentially problematic) to declare one age the best period in a person’s sexual life.

Katy Perry can look forward to reaching her sexual peak when she turns 28 this October

Actor James McAvoy is in his sexual prime at 33 years of age

 

 

 

চুড়ির রিনিক ঝিনিক ও ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’


চুড়িবন্দনা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসে নারীর চুড়িপ্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যে। বুড়ো মেসতুতো ভাই জ্ঞানদার হবু বউয়ের জন্য মাসিমা দুর্গামণির হাতে অতুল যেই আকর্ষণীয় চুড়ি তুলে দিয়ে ছিলেন, তার বর্ণনা এসেছে এভাবে :

‘তাহার রং এবং কারুকার্য দেখিয়া দুর্গামণি অত্যন্ত পুলকিতচিত্তে দাতার ভূয়োঃ ভূয়োঃ যশোগান করিতে লাগিলেন। চুড়ি দুগাছি কাচের বটে, কিন্তু সেরূপ মূল্যবান বাহারে চুড়ি পাড়াগাঁয়ে কেন, কলিকাতাতেও তখনো আমদানি হয় নাই। বস্তুত তাহার গঠন, চাকচিক্য এবং সৌন্দর্য দেখিয়া মায়ের নাম করিয়া অতুল নিজের টাকাতেই বোম্বাই হইতে ক্রয় করিয়া আনিয়াছিল।’

আর বাংলা গানে এসেছে :

‘আমার চুড়ির রিনিক ঝিনিক রে

তার কাছে লাগত বড় বেশ।’

হ্যাঁ, চুড়ির আবেদন সব সময়ই ছিল। হয়তো থাকবে নানা আঙ্গিকে। তবে এক সময় শুধু শাড়ির সঙ্গেই পরত ললনারা। তারা সোনা আর কাচের চুড়ি পছন্দ করতেন। এখন সময়ের নিয়মে ‘সময়’ বদলে গেছে। তারপরও চুড়ির আবেদন কমেনি। বরং হাল ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে চুড়ি নানান ফরমেটে-ডিজাইনে। যে কোনো পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে পরা যায়Ñ এমন চুড়ি উদ্ভাবন হচ্ছে দিনকে দিন। বয়স দিয়েও এখন চুড়িকে বাঁধার সুযোগ নেই। বিশ্বায়ন সব বয়সী নারীর জন্য চুড়ির দরজা খুলে দিয়েছে। তাই কাচের চুড়ির পাশাপাশি ফ্যাশন শোকেসে জায়গা করে নিচ্ছে নানা উপাদানের চুড়ি।

তবে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ আর বাহারি রঙের মিশেলে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য। শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, পোশাক যাই হোক না কেন এখনো অনেক আধুনিক তর”ণীর পছন্দের এক বিশেষ অনুষঙ্গ হচ্ছে কাচের চুড়ি।

অবশ্য আজকাল সব কিছুতেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রচলিত ধারার বাইরে আধুনিক মানুষের আগ্রহ বেড়েছে নান্দনিকতার দিকে। তাই অতীতের সাদামাটা এক রঙের কাচের চুড়িতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শিল্পের বাহারি ডিজাইনের ছোঁয়া। কাচের চুড়ির পাশাপাশি এখন কাচের চুড়ির ওপর নানা রঙের পাথর, চুমকি, জরিসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আনা হচ্ছে নতুনত্ব।

আবার কাচের চুড়ির আধিপত্যে ধীরে ধীরে ভাগ বসাচ্ছে চৌকো, ত্রিকোণ, ডিম্বাকৃতির প্লাস্টিক ও মেটাল চুড়ি। বস্তুত বাঙালি নারীদের এক অনন্য অলঙ্কার হচ্ছে চুড়ি। এমন অনেক নারীই আছে যারা যে কোনো পোশাকেই চুড়ি পরেন। চুড়ি ছাড়া তাদের দিনই কাটে না।

তবে আধুনিকতার কল্যাণে মেটাল, সুতা, চামড়া, ব্যাকেলাইট, রবার, কাঠ, মাটি, বিডস, পুঁতি, সিটি গোল্ডসহ নানা ধরনের চুড়ির ব্যবহার বাড়ছে।

এক সময় চুড়ি প্রধানত কাচ থেকে তৈরি হতো। তবে শামুকের খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও হাতির দাঁতের চুরিও তখন ছিল।

অন্যসব উপাদান দিয়ে চুড়ি তৈরির কারণ এবং হাল ফ্যাশনের চুড়ির উপযোগিতার কথা ফ্যাশনবিদদের ঠোঁটের ডগায় লাফায়, ‘আসলে কাচের চুড়ি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অন্যান্য টেকসই উপাদানে তৈরি চুড়ির চিš—া আসছে। পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে রুচিবোধেও। কারণ পার্বতীর মতো হাত ভর্তি চুড়ি এখন সবাই পরতে চান না। আবার হাতে মাত্র বালা ধারণ করে অনেকে এখন তৃপ্তি পাচ্ছেন। আসলে কসমোপলিটন পণ্য হয়ে যাওয়ার কারণে সব বয়সের নারীই চুড়ি পরছেন।’

বাঙালি নারীর সঙ্গে চুড়ির গভীর সখ্য ঠিক কবে সৃষ্টি হয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য রেকর্ড আমাদের হাতে নেই। তবে চুড়ি পরতে ভালবাসেন সব বয়সী নারী। উৎসবের দিন জমকালো সাজের সঙ্গে চুড়ি এখন অপরিহার্য হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, হাতে চুড়ি না থাকলে সাজ ঠিক পরিপূর্ণতা পায় না। পত্রিকার বিশেষ পাতায় বিভিন্ন উৎসবের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পছন্দসই চুড়ি পরার প্রেসক্রিপশন হামেশাই চোখে পড়ে।

চুড়ির রিনিঝিনি ছন্দ মনেও দোলা দেয়। হালে ফ্যাশনের নতুন প্রবণতা হচ্ছে সুতোর চুড়ি। প্লাস্টিকের বালার ওপর নানা রঙের সুতো পেঁচিয়ে তৈরি হচ্ছে চমৎকার সব সুতো-চুড়ি। সুতো ছাড়াও কাতান কাপড়ের লেস পেঁচিয়ে বানানো হচ্ছে রং-বেরঙের চুড়ি। শাড়ি, কামিজ, ফতুয়া সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে এ ধরনের চুড়ি মানানসই বলে দাবি করা হয়।

আবার কপার, তামা, দস্তাসহ বিভিন্ন ধাতু দিয়ে তৈরি হচ্ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের চুড়ি আর বালা। মাটি বা সিরামিকের নানা রং ও নকশা করা চুড়িও পাওয়া যাচ্ছে। এসব চুড়ি নাকি দেশি সুতি বা ঁতাঁত কাপড়ের সঙ্গে বেশ মানায়।

কাঠ ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ডিজাইনের চুড়ি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। মোটা, চিকন, বাঁকা অবয়বে বিভিন্ন কাঠের চুড়ি চোখে পড়ে। কাঠ দিয়ে আবার ব্রেসলেটও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গোলাকার ছাড়াও ঢেউ খেলানো, বাঁকা, ত্রিভুজ, ষড়ভুজসহ নানা আকৃতির প্লাস্টিকের চুড়ি পাওয়া যাচ্ছে মোটা আর চিকন ডিজাইনে। স্কার্ট, টপস, ফতুয়া-জিনসের সঙ্গে ম্যাচিং করে কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি এসব চুড়ি তৈরি হচ্ছে। জয়পুরি, মাল্টি, কাসুটিসহ নানা ধরনের চুড়ির কথাও শোনা যায়। মুক্তার চুড়ির চাহিদাও বাড়ছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসও তৈরি করছে নানা ডিজাইনের ফ্যাশনেবল চুড়ি।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চুড়ির প্রচলন রয়েছে। এটা চেকে naramek, ডাচে enkelring, ফিনিশে rannerengas, জার্মানে armreif, হাঙ্গেরিয়ানে karperec, ইন্দোনেশিয়ায় gelang, ইতালিয়ানে braccialette, মালয়ে gelang, স্পেনিশে brazlete ও তুর্কিতে halhal, তামিলে ভালায়ন, মালয়ালমে ভালা আর নেপালিতে চুরা নামে পরিচিত।

ভারতীয় উপমহাদেশে চুড়ি ঠিক কবে চালু হয়েছে, তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্তিক খননকালে খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও আকিক পাথরের চুড়ি পাওয়া গেছে।

পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারোতে (যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ২৬শ বছর আগে) পাওয়া এক মূর্তিতে দেখা যায়, নৃত্যরত এক বালিকার বাম হাতে চুরি রয়েছে। সম্ভবত তখন দুহাতে চুড়ি পরার সংস্কৃতি ছিল না। অন্যদিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ি পাওয়া গেছে ভারতের তক্ষশীলায়।

হীরা, মূল্যবান পাথর আর মুক্তো বসানো চুড়ির প্রচলন এখনো ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে। এক সময় লাক্ষার তৈরি চুড়িরও বেশ প্রচলন ছিল এখানে। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশেও চুড়ির প্রচলন রয়েছে।

বিয়ের চুড়ি সাধারণত রঙিন হয়ে থাকে। লাল রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘জীবন ও আনন্দের প্রতীক’ আর সবুজ রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘উর্বরতার প্রতীক’। চুড়ি দুই হাতে পরা যায়। এক হাতে পরতেও বাধা নেই।

আধুনিক প্রজন্মের তরুণ সমাজের একটি অংশ এখন বেশ আগ্রহ নিয়েই চুড়ি পরছে। তবে তাদের এই চুড়ি ‘খাড়–’ নামে পরিচিত। এটা রবার অথবা ধাতুর তৈরি হতে পারে। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের উঠতি তরুণরা এটা পরছে।

গিফট আইটেম হিসাবেও চুড়ি বেশ আদরণীয়। কারণ নারীরা শাড়ি বা জামার সঙ্গে ম্যাচিং করে চুড়ি পরতে এখন বেশ সচেতন।

চুড়ি নিয়ে কুসংস্কারও আছে। বলা হয়, চুড়ির কারণে স্বামীর নিরাপত্তা যেমন বাড়ে, তেমনি ভাগ্যও ফেরে। আবার চুড়ি অকারণে ভেঙে গেলে স্বামীর বিপদ ঘটে।

আমাদের দেশে বৈশাখে লাল-সাদা বিভিন্ন বর্ণের রেশমি চুড়ি পরে নিজেকে নানাভাবে সাজানোর প্রবণতা নারীদের মাঝে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার তারাই ভিন্ন উৎসবের দৈনন্দিন পথচলায় দেশপ্রেমের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছেন পতাকার রং মিলিয়ে লাল-সবুজ রঙের হাত ভরা চুড়ি পরে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে প্রতিটি উৎসবেই বাঙালি নারী চুড়ি সাজের জন্য বেছে নিচ্ছে বিশেষ বিশেষ রংকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি চুড়ি।

হাতভরা চুড়ি পরা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। ফ্যাশনবিদরা বলেন, হাতের গড়নের সঙ্গে মিলিয়ে দুহাত ভরা চুড়ি হাতের সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি সাজকেও করে পরিপূর্ণ।

একবার এক মহিলা তার স্বামীর সঙ্গে শপিং করতে গেছে। এক পর্যায়ে ওই উন্নাসিক মহিলা এক সেট চুড়ি পছন্দ করল।

‘তুমি এত চুড়ি কেনো। অথচ কোনদিন পরতে দেখি না’ স্বামী অনুযোগের সুরে বলল।

‘চুড়ি পরলে ভেঙে যাবে। তাই চুড়ি পরি না, শুধু কিনি’ মহিলার চটপট জবাব।

হাতপাখাবন্দনা

হাজার হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে হাতপাখা। কবি-সাহিত্যিক, বাউল শিল্পীরা হাতপাখা নিয়ে বিভিন্ন গান, কবিতা ও গীত রচনা করেছেন এবং তুলে ধরেছেন এটার সৌন্দর্যমণ্ডিত ঐতিহ্য। হাতপাখা নিয়ে মজার মজার রূপকথা, গল্প-কাহিনীও আমাদের সমাজে প্রচলিত।

আমাদের সমাজে এক সময় হাতপাখা বলতে তালপাখাই বোঝাত। আর সংস্কৃতে তালপাখা ‘তালবৃন্তক’ নামে পরিচিত। পরে কাপড়, বাঁশ ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানানো শুরু হয়। হাতপাখায় নকশা আর ডিজাইনের নতুন মাত্রা এসেছে। পদ¥, শতফুল, উনিশকাঁটা, সঙ্কলন, বরফি, শিঙ্গারা, শক্সখ, আয়নাকোটা, শক্সখপদ¥, ঝুরিফুল, চালতা ফুল, পানপাতা, তারাফুল, চারমাছ, হাতিবান্ধা, মোরগ, চৌখুপি, চক্র নামে হাতপাখার নকশার কথা শোনা যায়। কোনো কোনো নকশার মধ্যে আয়নার টুকরোও বসানো হয়। হাতলে লাগানো হয় বাঁশের একটি নল, যাতে হাতপাখা ঘোরাতে কম বেগ পেতে হয়।

অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর ‘লোকশিল্প’ গ্রন্থে হাতপাখা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত এদেশে খর বৈশাখের দাবদাহ এবং ভাদ্রের আর্দ্রতা মিশ্রিত গরমে হাতপাখা মানুষের নিত্যসঙ্গী। সুতা, বাঁশ, চুলের ফিতা, বেত, খেজুরপাতা, নারকেলপাতা, তালপাতা, কলার শুকনো খোল, পাখির পালক, সুপারির খোল, শোলা, গমের ডাঁটা, মোটা কাগজ প্রভৃতি পাখার উপাদান। এ নিত্যব্যবহার্য বস্তুটি বিশেষ করে মেয়েদের হাত পড়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সুতা, বাঁশ, সরতা বেত ও কলার খোলের শুকনা বেতি দিয়ে পাখা বোনা হয় পাটি বা ম্যাট বোনার কায়দায়। বিভিন্ন মটিফ বা ডিজাইনে এ পাখা তৈরি হয় এবং এগুলোর বিভিন্ন নামও রয়েছে। এর মধ্যে পানগুছি, কেচিকাটা, তারাজো, পুকুই রাজো, ধানছড়ি, ফলং ঠেইঙ্গা, ফড়িংয়ের ঠ্যাং, রাবণকোডা, নবকোডা, কবুতর খোপ, মাকড়ের জাল, পদ¥জো, কামরাঙ্গা জো, ধাইড়া জো, সুজনি জো, চালতা ফুল, কাগজ কাটা, হাতি, মরিচ ফুল, আটাসান, শক্সখলতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য’।

কাপড় ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানাতে গেলে প্রথমে বাঁশের কাঠি দিয়ে বৃত্ত তৈরি করে নিতে হয়। এর ওপরেই সুতো অথবা কাপড়ের নানা বুনন। বৃত্তের পরিধিতে জুড়ে দেওয়া হয় রঙিন কাপড়ের ঝালর।

গরমে অতিষ্ঠ ইংলিশ বেনিয়ারা এ দেশে ল¤¦া কাঠের সঙ্গে লাল শালুতে কিনার মোড়ানো পাটি জুড়ে দিয়ে আংটা লাগানো আর ছাদে ঝোলানো বিশেষ পাখা উদ্ভাবন করেছিলেন। দূরে বসে দড়ি বাঁধা এই পাখা যারা মৃদুলয়ে টা

জাহান হাসান একুশ নিউজ মিডিয়া

হাতপাখা

নতেন তাদের বলা হতো ‘পাক্সখাবরদার’। এক সময় আদালতের এজলাসেও এসব পাখা দেখা যেত।

তবে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার কারণে হালে হাতপাখা পল্লীজীবন ছাপিয়ে নগরজীবনেও বেশ পোক্ত স্থান করে নিচ্ছে।

নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য এক সময় বাঁশ অথবা তালপাতার ডাঁটিতে বোনা তালপাখাই ছিল গরমে স্ব¯ি— পাওয়ার সম্বল। তবে বহনে অসুবিধা থাকায় নগরজীবনে ফোল্ডিং হাতপাখার প্রচলন বাড়ে। কথাটাকে আরো সহজভাবে বললে এভাবে বলা হয়, দৃষ্টিনন্দন চীনা হাতপাখার কাছে দেশি হাতপাখা টিকে উঠতে পারছে না। শিক্ষার্থীরাও এখন বইয়ের ঝোলায় ফোল্ডিং হাতপাখা বহন করছে। বিশেষত অসহ্য রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ব্যাগে এই জাতীয় পাখা রাখার ফায়দা অনেক। পাবলিক বাসেও এখন অনেককে হাতপাখা বুলোতে দেখা যায়।

হাতপাখায় জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যও। বৈশাখী মেলা থেকে শুরু করে যে কোনো বাঙালি উৎসবেই হাতপাখার থাকে আলাদা কদর। গরমে আরাম পাওয়াই হাতপাখার মৌল উদ্দেশ্য হলেও প্রযুক্তি ও ফ্যাশনের উৎকর্ষে এটি ধারণ করছে শৈল্পিক রূপ।

এক সময় জমিদার বাড়ির হাতপাখাগুলো হতো ঝালর লাগানো এবং বিশাল আকৃতির। সেসব পাখা রেশম বা সাটিনের কাপড়ের ওপর সুতা, জরি এমনকি সোনা-রুপা দিয়েও কাজ করা থাকত। এখন অনেকের ড্রয়িংরুমে নানা ডিজাইনের হাতপাখা শোপিস হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রাচীন কারুশিল্প হাতপাখার যাত্রা কোথায় এবং কাদের মাধ্যমে ঠিক কবে শুরু হয়েছিল সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে ভ্যাপসা গরমে হাতপাখা নাড়িয়ে বাতাসে দোলাচল সৃষ্টি গরম হাওয়া সরিয়ে অপেক্ষাকৃত শীতল হাওয়া প্রবাহের উদ্দেশ্যেই হাতপাখার ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর গরমে এটার উপযোগিতা প্রমাণিত হওয়ার পর সময়ের ব্যবধানে এটা রূপান্তরের পথ বেয়ে একটি অলঙ্করণময় শিল্পে পরিণত হয়। এখনো ধর্মীয় ও রাজকীয় অনুষ্ঠানে কারুকাজমণ্ডিত হাতপাখার প্রচলন রয়েছে।

প্রত্নতাত্তিক সাক্ষ্য থেকে ধারণা করা হয় ভারতবর্ষ, চীন, জাপানসহ প্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হাতপাখার ব্যবহার ছিল। আবার প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যে পশুর চামড়ার তৈরি অলঙ্কৃত হাতপাখার সন্ধান পাওয়া গেছে। এটার হাতলে গাছের ডালের অংশ অথবা পশুর হাড় লাগানো থাকত।

এক সময় গ্রামের ললনারা হাতপাখা তৈরি করে রঙিন সুতা দিয়ে ‘ভুলো না আমায়’ বা ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’- টাইপের ছন্দ লিখত। আবার রোদেলা দুপুরে দুরন্ত কিশোর দলের হাতে শোভা পেত কারুকাজের তালপাখা। আর মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরা গাছের ছায়ায় বসে তালপাখা হাতে বাতাস করতে করতে দূরের রাখাল ছেলেটির বাঁশির সুর শুনত।

অন্যদিকে ক্লান্তপরিশ্রান্ত কৃষক মাঠ থেকে ফেরার পর কিষাণী ব্যস্ত হয়ে পড়ত হাতপাখার শীতল পরশে তাকে জুড়িয়ে দিত।

আসলে হাতপাখার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে থাকতে পারে গ্রামীণ নারীর আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ নাম না জানা কত্ত কাহিনী। হাতপাখা বুনন ছিল আবহমান গ্রামবাংলার চিরাচরিত অতি পরিচিত দৃশ্য। প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার দাপটে নাগরিক জীবনে হাতপাখার প্রচলন এখন কমে গেছে। তারপরও ভয়াবহ লোডশেডিংকালে বিপর্যস্ত নগরবাসী ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে করেন হাতপাখার শীতল পরশ বা বাতাসের কথা। কেউ কেউ অসহ্য গরমে স্বস্তি পেতে এখনো হাতপাখার দ্বারস্থ হন।

আজকাল হাতপাখা ফ্যাশনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। তালপাখার পাশাপাশি বাহারি রং ও ডিজাইনে প্লাস্টিক, বেত, ব্যাকেলাইট, কাগজ দিয়ে হাতপাখা তৈরি করা হয়। এছাড়া অধিকাংশ হাতপাখার হাতল হিসাবে জুড়ে দেওয়া হয় বাঁশের চিকন কাঠি, বেত অথবা লাঠি। তবে আজকাল কাপড় ও সুতার কারুকার্যমণ্ডিত বাহারি ধরনের হাতপাখা পাওয়া যাচ্ছে। এতে যুক্ত হচ্ছে হরেক রকমের রং ও সুতা, ফলস, শাড়ির পাড় ও লেস।

‘আমার নাম তালের পাখা শীতকালে দেই না দেখা, গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা’- এটি আমাদের দেশের গ্রামবাংলার একটি পুরনো প্রবচন। এখনো গরমে আমরা হাতপাখার ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা থাকায় অভিজাত বুটিক বাড়ি কিংবা ফ্যাশন হাউসগুলোও নজর দিচ্ছে বাহারি হাতপাখার ওপর। এসব হাতের পাখা নানা ঢং আর রঙে চলে আসছে অভিজাত ড্রইংরুমের সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ হয়ে।

একাধিক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ জোয়ারা গ্রামের হাতপাখা এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। মান ভালো হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সৌদি আরব, জার্মানি, দুবাই, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে এখানকার পাখার চাহিদা বাড়ছে।

বোশেখের কাঠফাটা রোদে লোডশেডিং নগর জীবনে উত্তাপ বাড়ায়- দিনে রাতে সমানে। মাথার ওপর তিন পাখাওয়ালা যন্ত্রটা নিশ্চল ঝুলে থাকে। ঘামভেজা দেহটাকে এক বিন্দু স্বস্তি দিতে সবার চোখ যায় হাতপাখাটার দিকেÑহোক না তা তালপাতা, কাপড়, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত কাঠ অথবা কাগজের। অসহ্য গরমে হাতপাখাই হয়ে গেছে দিনে-রাতের সঙ্গী। হাতপাখা ছাড়া নগরজীবন চলে কী করে? ২০১১ সালের নববর্ষের একটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিতরণ। এটার মানবিক দিক থাকলেও পণ্যের বিজ্ঞাপনই ছিল মুখ্য। রমনা, চারুকলা, টিএসসি, শিল্পকলা প্রান্তর ঘুরে দেখা গেছে, সিঙ্গার, ইমাম টেলিকমসহ কমপক্ষে ১৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিলিয়েছে। এক সময় এ দেশে তালপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বাঁশ, বেত ও কাপড় দিয়েও তা তৈরি হতো। কিন্তু ঠিক কবে এ দেশে হাতপাখার প্রচলন হয়েছিল, তার কোনো লিপিবদ্ধ বা প্রত্নতাত্তিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। মুঘল আমলে হাত-টানা পাখার প্রচলন দেখে এটা অনুমান করা যেতে পারে, পরবর্তীকালে জমিদার ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে হাতটানা পাখার প্রচলন ঘটে।

পশ্চিমা বিশ্বসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে হাতপাখা ফ্যাশন সামগ্রী হলেও আমাদের দেশে তা নয়। বিদ্যুতের কল্যাণে নগরজীবন থেকে হাতপাখা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংই হাতপাখাকে নগরজীবনে ফিরিয়ে আনছে। হাতপাখা মূলত কুটির শিল্প হলেও হালে প্লাস্টিকের হাতপাখা চোখে পড়ে। তারপরও এটা সুসংঘবদ্ধ শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। তাই দেশে এ পণ্যটির চাহিদার প্রকৃত পরিসংখ্যান জানার উপায় নেই। তবে লোডশেডিং এ শিল্পের পুনরুজ্জীবনে ভমিকা রাখছেÑ এমন দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। লোডশেডিং অভিশাপ কাটানো গেলে হাতপাখা আমাদের ফ্যাশন পণ্য হয়ে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশিদের জীবনে হাতপাখার প্রচলন বাড়ছে। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়? তপ্তদেহে এক চিলতে শাšি—র পরশ বুলাতে হাতপাখার বিকল্প নেই।

বিশ্বে শিল্প, হাতির দাঁত, পশুর হাড়, মাইক, চন্দনকাঠ, মুক্তো এমনকি কচ্ছপের খোল দিয়েও হাতপাখা তৈরির প্রমাণ রয়েছে।

জাপানে হাতপাখার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অনেক। ওখানে এটা বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা ও শুভ কামনার প্রতীক। জাপানি নাচেও হাতপাখার উপস্থিতি চোখে পড়ে।

ইতিহাসে রয়েছে, ১৫শ শতকে পর্তুগিজ বণিকরা চীন ও জাপান থেকে হাতপাখা আমদানি করে পশ্চিমা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ১৬শ শতকে চীনা ভাঁজ করা হাতপাখা ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফোল্ডিং ফ্যান হাতে ব্রিটেনের রানী প্রথম এলিজাবেথের একটি প্রোর্ট্রেট এখনো রাজপরিবারে সংরক্ষিত রয়েছে। এ কারণে বলা হয়, হাতের মুঠোয় ঠাঁই পাওয়া হাতপাখাই একটি জাতির ইতিহাস, ভূগোল ইতিহাসের গল্প বলে। মিসর, ব্যবলিন, আজটেক, ইনকা, পারস্য, গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় হাতপাখার প্রচলন ছিল। তবে এটার আবিষ্কারক কারা, তা জানা যায়নি।

রেশম, পাখির পালক, হালকা ধাতু পাত দিয়েও হাতপাখা তৈরি হয়। এটাতে হ্যাড পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি পুতি, ক্রিস্টাল ও ফিতা লাগানো হয়।

হাতপাখা নিয়ে প্রচলিত কৌতুক এ রকম :

একদিন এক সর্দারজি ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। তাই সর্দারজিসহ অনেকেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে হাতপাখা কিনে বাতাস করতে লাগলেন। অথচ এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যেতে না যেতেই সবার হাতপাখা খুলে নষ্ট হয়ে গেল।

কিন্তু সর্দারজির হাতপাখাটা একদম নতুনের মতোই আছে। এটা দেখে অবাক হয়ে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘সর্দারজি, আপনার হাতপাখাটি এখনো নতুনের মতো আছে কী করে?’ সর্দারজি বললেন, ‘আরে মশাই, আমি আপনাদের মতো বোকা নাকি? টাকা দিয়ে হাতপাখা কিনেছি কি নষ্ট করার জন্য? আমি তো হাতপাখা মুখের কাছে ধরে শুধু মাথাটা নড়াচড়া করেছি।’

সূত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০

মানুষ সহজে ভুলে যেতে পারে না তার শিকড়। নিজেকে সে শক্ত এক বাঁধনে বেঁধে রাখতে চায় বিচ্ছিন্ন সেই সত্তার সঙ্গে। তার ভয় হয়, এই বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সে হয়ে পড়বে অবলম্বনহীন। -লিও টলস্টয়


লিও টলস্টয় মৃত্যুশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি
‘জীবন কী’ বলছেন টলস্টয়

Count Lev Nikolayevich Tolstoy

Count Lev Nikolayevich Tolstoy

“Boredom: the desire for desires.” Count Leo Lev Nikolayevich Tolstoy
Leo Tolstoy
Count Lev Nikolayevich Tolstoy, commonly referred to in English as Leo Tolstoy (September 9, 1828 – November 20, 1910) was a Russian novelist, writer, essayist, philosopher, Christian anarchist, pacifist, educational reformer, vegetarian, moral thinker and an influential member of the Tolstoy family.
Read Letter to a Hindu, which spurred a friendship between Tolstoy and Gandhi, one of 20 of his works available in several languages, including Tagalog, free from Project Gutenberg.

লিও টলস্টয় : জন্ম : ৯ সেপ্টেম্বর, ১৮২৮; মৃত্যু : ২০ নভেম্বর ১৯১০

আমার জীবনটা আসলে কী? পরিণত বয়সে পেঁৗছে বিশ্বখ্যাত লেখক লিও টলস্টয় নিজেই নিজেকে এমন এক কঠিন প্রশ্ন করে বসলেন। হেতু? কারণ, ততদিনে তার মনে হয়েছে, এ হলো এমন এক প্রশ্ন যার সদুত্তর না মেলা পর্যন্ত লেখালেখি দূরে থাক, জীবনটাই হয়ে পড়ে অর্থহীন।

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ যার হাত ধরে বেঁচে থাকছে এবং তার তাবৎ শক্তি ও সামর্থ্য যার পেছনে বিনিয়োগ করছে তার নাম জীবন। এ জীবনকে তারা যেভাবে উপলব্ধি করছে তার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হচ্ছে তাদের সব কর্তব্য ও করণীয়। এ বোধ থেকে তারা স্থির করে, কোন বিষয়গুলো না হলেও ভালোই দিন চলে যাবে তার, আবার কোন বিষয়গুলো না হলে আক্ষরিক অর্থেই অচল হয়ে যাবে তার জীবন। শুধু কি তাই, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যাবে বর্তমান জীবনের কোনো কোনো ঐশ্বর্য, সেগুলোও ঠিকঠাক করে দেয় জীবন সম্পর্কে তার এ অভিজ্ঞান।

জীবন সম্পর্কিত মহাগুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার শুরুতেই টলস্টয় তার ‘জীবন সম্বন্ধে’ গ্রন্থে জানিয়ে দেন, প্রতিটি মানুষ বেঁচে থাকে শুধু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য, একান্ত তার নিজের ভালোর জন্য। একজন মানুষের কাছে বেঁচে থাকার অর্থ প্রতিমুহূর্তে সর্বোচ্চ ভালো থাকার কামনা লালন করে চলা এবং পর্যায়ক্রমে সেই লক্ষ্যকে ছুঁয়ে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে আমার প্রশ্ন করতে পারি, কিসে একজন মানুষের উত্তম নিহিত? সে কি জানে না তার সব আনন্দই ক্ষণস্থায়ী এবং তার নিজের কাছে সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ_ সেই ব্যক্তিত্বেরই অবধারিত পরিণতি হচ্ছে দুর্ভোগ এবং মৃত্যু! অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে এ ব্যক্তিত্বের বাইরে অস্তিমান যে জীবন, একমাত্র তা-ই স্থায়ী। যদিও অধিকাংশ মানুষের কাছে তার ব্যক্তিগত চাওয়ার সাপেক্ষে এ ‘বহিঃস্থ জীবন’ স্রেফ অর্থহীন এক উচ্চারণ, যা আদৌ তার কাছে কোনো আবেদন বহন করে না।

অতএব একজন মানুষ যে জীবনকে তার একমাত্র জীবন বিবেচনা করে এবং স্থির বিশ্বাসে তাকে যাপন করে চলে, প্রকৃত অর্থে তা অলীক এবং অসম্ভব। বরং তার ‘বিখ্যাত’ ব্যক্তিত্বের বাইরে অস্তিমান জীবন_ যাকে সে জানে না, অনুভব করে না এবং ভালোবাসে না_ সেটাই তার প্রকৃত জীবন।’

টলস্টয় গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় গুরুগণ বিরতিহীনভাবে মানুষকে বলে বেড়ান পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব আর এর বিপরীতে ধর্মীয় আচারাদি পালনসাপেক্ষে মৃত্যু পরবর্তী উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতির কথা, অথচ অধিকাংশ মানুষ কদ্যপি তাদের বিশ্বাস করে না। তাদের এ অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ, খোদ ধর্মগুরু কিংবা পেশাজীবী ধর্মাত্মারা পার্থিব আনন্দ বর্জনের পরিবর্তে বরং আরও বেশি করে তা অর্জনের লক্ষ্যেই অধিক সচেষ্ট থাকেন। তারা ডুবে থাকেন আরও বেশি ক্ষমতা, আরও বেশি বিনোদনের লক্ষ্যে অবিরাম এক খেয়োখেয়ির মধ্যে। পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে এখানে, ইহলোকে একজন মানুষের যাপিত জীবন যদি অর্থহীনই হয়, সেক্ষেত্রে কোন যুক্তিতে অর্থপূর্ণ হতে পারে পরকালে তার যাপিতব্য জীবন?
প্রচলিত বিজ্ঞান আমাদের শেখায় দেহকোষের কার্যকলাপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত থাকে মানবজীবন। বিজ্ঞান এসব কোষের কার্যকলাপের ব্যাখ্যা সন্ধান করে। অথচ এটাই সত্য, ভালোর লক্ষ্যে নিবেদিত মানুষের বাস্তব জীবনের রহস্য উদ্ঘাটনে সে পুরোপুরি অক্ষম।

‘এবং আমাদের বেঁচে থাকতেই হবে। যাপন করে যেতে হবে এ জীবন। কিন্তু কী সেই জীবন? প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমুতে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে কৃত অজস্র কার্যকলাপের সমষ্টিই জীবন। প্রতি মুহূর্তে আমাকে যেতে হচ্ছে এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সম্ভাব্য আরও এক শো কাজের মধ্য থেকে বেছে নিতে হচ্ছে আমার কাজটি। কিন্তু আমার পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কীভাবে সম্ভব যখন আমি নিজেই জানি না কোনটি আমার জন্য ভালো আর কোনটি খারাপ।’

Divine and Human stands apart as both a landmark in literary history and a master-piece of spiritual and ethical reflection. Suppressed in turn by the tsarist and Soviet regimes, the tales contained in this book have, for the most part, never been published in English until now. Emerging at last, they offer western readers fresh glimpses of novelist and philosopher Leo Tolstoy.

Divine and Human stands apart as both a landmark in literary history and a master-piece of spiritual and ethical reflection. Suppressed in turn by the tsarist and Soviet regimes, the tales contained in this book have, for the most part, never been published in English until now. Emerging at last, they offer western readers fresh glimpses of novelist and philosopher Leo Tolstoy.

সারাজীবন আঁতিপাতি করে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছেন টলস্টয়। ধ্রুপদী দার্শনিক আর কাব্বালাদের লেখাপড়ার জন্য শিখেছেন গ্রিক এবং হিব্রু। জীবনের সংজ্ঞা জেনেছেন কনফুসিয়াস আর লাও জি, ভারতীয় বেদ, বুদ্ধের বাণী, ইহুদি ঋষি এবং যিশুখ্রিস্টের কাছ থেকে। অবশ্য সবার মাঝে খ্রিস্টের সংজ্ঞাটাই তার কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। অন্য সমস্ত সংজ্ঞাই একাকার হয়ে যায় তার এ উপলব্ধির কাছে এসে যে, জীবন হচ্ছে ঈশ্বরপ্রেম এবং তোমার প্রতিবেশীর প্রতি প্রেম। যা কিছু ভালো তা অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য।

‘ঈশ্বর’ বিষয়ক ধারণায় পেঁৗছাতে গিয়ে টলস্টয় উপলব্ধি করেছেন চৈতন্যের স্বরূপ। এ উৎস চেতনাকেই তার মনে হয়েছে মানবজীবনের প্রকৃত সার। তার মনে হয়েছে মানবজীবন আর ইতর প্রাণীর জীবন এক নয়। এ শুধু জীবনের প্রকাশ, এর উপরিকাঠামো। দৈহিক জন্ম কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে এ জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং জীবন হচ্ছে বিচিত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে চৈতন্যের এক অবিরাম প্রবাহ। প্রতি মুহূর্তে যা এক রূপ থেকে বদলে জন্ম নিচ্ছে আরেক রূপে। ‘মানুষ যতই চেষ্টা করুক কখনোই সে জানতে পারবে না কোথা থেকে তার শুরু,’ জানান টলস্টয়। এ কথার অর্থ, চৈতন্য অবস্থান করে এমন এক অবস্থানে যা সময়েরও অগম্য।

টলস্টয়ের দর্শন অনুসারে ঈশ্বরকে বুঝতে হবে সময়হীন সীমাহীন এক চৈতন্য হিসেবে। এর মধ্যেই পাওয়া যাবে জীবনের অর্থ। মানুষ যখন তার নিজের জীবনে আবিষ্কার করে এই চৈতন্য, সে তখনই উপলব্ধি করে তার নিজের ভেতরকার ঈশ্বর। এই চৈতন্য, ঈশ্বর, মূলত অখণ্ড। চেতন মানুষ কখনোই বুঝতে পারে না কোথা থেকে সে এলো। বরং সে উপলব্ধি করে বিচিত্র যত চেতনাপ্রবাহের মধ্যে মিশে থাকা তার নিজের চৈতন্য, যা তার একমাত্র জীবন।

অথচ শর্তসাপেক্ষ ছাড়া ব্যক্তিকে খণ্ডরূপে বিচার অসম্ভব। বোধগম্য, ব্যক্তিগত ভালোত্ব এক অলীক ধারণা। আমরা যদি নিজেদের ভালো প্রথমে চাই এবং তারপর অন্যের কাছ থেকে এমন ভালো আশা করি যা আমাদেরই মঙ্গল সাধন করবে_ এই চাওয়া অসম্ভব। কেননা, এ যুক্তি অনুসারে প্রতিটি মানুষ প্রথমত তার নিজের ভালোর কথাই চিন্তা করবে। এখান থেকে এ বিষয়টি অন্তত পরিষ্কার যে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে, শুধু নিজের ভালো চাওয়ার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক ভালোর উৎপাদন অসম্ভব।

এর ঠিক বিপরীত এক পরিস্থিতির জন্ম হয় যখন মানুষ এই বৃহৎ ঐক্য এবং চেতনার অবাধ প্রবাহের মধ্যে আবিষ্কার করে তার নিজের স্বরূপ। এক্ষেত্রে একজন মানুষ তার নিজের মঙ্গলকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজেকে বিনিয়োগ করে অন্যের ভালো সাধনের নিমিত্তে। এখন, এই মানুষটি আশা করতেই পারে তার দেখাদেখি অন্য মানুষটিও একই কাজে উৎসাহিত হবে। আর এমন কিছু হলে তা হবে সামগ্রিক মানবজাতির জন্যই কল্যাণকর। অন্য কারও মঙ্গলের লক্ষ্যে নিজের চাওয়াগুলো বিসর্জন দেওয়ার অর্থই হচ্ছে আমি তার মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছি এবং তাকেই ভালোবেসেছি। খ্রিস্টের মতে, এই প্রেম ভালোকে নিশ্চিত করে। এই প্রেমের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা অর্জন করে মানবজীবন।

যুক্তিটি নিতান্তই সরল এবং বোধগম্য। মানবেতিহাস এমন অজস্র মানুষ পেয়েছে যারা এ উপলব্ধিকে নিয়মিত চর্চা করে গেছেন তাদের প্রাত্যহিক জীবনে। টলস্টয়ের বিশ্বাস ছিল, অধিকাংশ মানুষ শিগগিরই তাদের প্রাণীচৈতন্য থেকে জেগে উঠে এই সত্য আবিষ্কার করবে এবং হয়ে উঠবে প্রকৃত মানুষ। আর তা ঘটলে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ সেদিন সবেগে ধাবিত হবে এক মহাউত্তরণের লক্ষ্যে।

এসব গ্রন্থ টলস্টয় রচনা করে গেছেন আজ থেকে একশ বছর আগে। অথচ বর্তমান শতকে এসেও আমরা দেখছি অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে তার অনেক ভবিষ্যদ্বাণী। টলস্টয় পরবর্তী এই গোটা সময়টা মানুষ অন্ধের মতো নিজেকে নিরত রেখেছে যুদ্ধ আর সংঘাতের মাঝে। ব্যক্তিগত চাহিদা চারিতার্থ করতে গিয়ে বাসঅযোগ্য করে তুলেছে পৃথিবীটাকে। তবু শেষ হয়নি তাদের দুর্নিবার যুদ্ধাকাঙ্ক্ষা। কেন এমন হলো? কেন তারা ব্যর্থ হলো টলস্টয়ের প্রত্যাশা পূরণে? এ সম্পর্কেও বলে গেছেন তিনি নিজেই।

একজন মানুষ কখন, জীবন কী, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়? প্রাণিসত্তা থেকে যখন তার উত্তরণ ঘটে এবং সে উপনীত হয় মানবচৈতন্যের স্তরে একমাত্র তখনই তার মধ্যে জন্ম হয় এ প্রশ্নের, জীবন কী? এটি ঘটার পর আর কোনোভাবেই সে ফিরে যেতে পারে না তার পূর্ববর্তী স্তরে। নতুন এ উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু ঘটে তার পূর্ববর্তী চৈতন্যের। যেমন, বীজ থেকে নতুন চারার প্রস্ফুটনের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় বীজের সমগ্র জীবন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠে নতুন চারাটি।

কিন্তু তবুও মানুষ সহজে ভুলে যেতে পারে না তার শিকড়। নিজেকে সে শক্ত এক বাঁধনে বেঁধে রাখতে চায় বিচ্ছিন্ন সেই সত্তার সঙ্গে। তার ভয় হয়, এই বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সে হয়ে পড়বে অবলম্বনহীন। নিজেকে রক্ষার প্রাণিজ প্রবৃত্তি তাকে তাড়িত করে এ কাজ করার জন্য। একমাত্র এ কারণেই সে তার পূর্বপুরুষের এসব অর্জনকে দেখে সন্দেহের চোখে। যদি তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে তার জন্য, তখন সে তাদের পাগল বলে উপহাস করে। কখনও অপরাধী বিবেচনায় তাকে নিক্ষেপ করে কঠিন শাস্তির মধ্যে।

নিষ্ঠুর এ নিয়তি এড়াতে পারেননি এমনকি টলস্টয়। যদিও তিনি ছিলেন সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তার বক্তব্য শুনে রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ তাকে বহিষ্কার করে। প্রবীণ বয়সে রচিত তার সবচেয়ে প্রাজ্ঞ লেখাগুলো ব্যর্থ হয় মানুষের আদর কুড়াতে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, বহু দশক ধরে খোদ রাশিয়ায় তাকে দেখা হতো অদ্ভুত এবং অবাস্তব ধারণা লালনকারী স্ববিরোধী এক বিচিত্র চরিত্র হিসেবে।

মানুষের সঙ্গে ধর্ম, বিজ্ঞান এবং সমাজের সম্পর্ক নিয়ে নিজের মতাদর্শ উদ্ঘাটন করেছেন টলস্টয়। চৈতন্যের যে স্তরে আমাদের যাবতীয় ভোগান্তি তা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দেখিয়েছেন সেই পথ যার মধ্যে নিহিত রয়েছে সর্বপ্রাণীর মঙ্গল। নিজের প্রতি সততাবশত টলস্টয় তার প্রাত্যহিক জীবনে সেই চর্চা অব্যাহত রেখেছেন যা তিনি প্রচার করেছেন অপরের উদ্দেশে_ নূ্যনতম জাগতিক চাহিদা, নিজের সেবা এবং জীবনের প্রধান যে লক্ষ্য_ সেই ভালোবাসার সেবা করে চলা। এক কথায়, ভালোবাসা বেঁচে থাকে ভবিষ্যৎ নয়, আজকের এ মুহূর্তটির মধ্যে, এক মুহূর্তের কাজের মধ্যেই তার চিরকালীন বসবাস।
অনুবাদ :মিলটন মোললা, সমকাল, কালের খেয়া ১ ডিসেম্বর ২০১০ ইস্যু
আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি, এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident bangladeshi, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,

দিবাস্বপ্নেই বেশি সময় কাটে মানুষের ; জেগে থাকার ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ সময়ই মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে


দিবাস্বপ্নেই বেশি সময় কাটে মানুষের

দিবা স্বপ্ন

দিবা স্বপ্ন Day Dreaming

জীবনে স্বপ্ন থাকা ভালো। স্বপ্ন সজীবতার লক্ষণ। স্বপ্নহীন মানুষকে আপনি গন্ধহীন গোলাপের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। গন্ধ ছাড়া গোলাপের মহিমা কোথায়, বলুন তো?

চর ঘোরে রাতের স্বপ্ন অর্থহীন ঘটনার সমাহার মাত্র। সেদিকে মন না দেয়াই ভালো। সহি সোলেমানি খোয়াবনামার পাতা উল্টে উল্টে অনর্থক সময় নষ্ট। স্বপ্ন দেখতে হয় দিনে, কাজের ফাঁকে কিংবা কর্মহীন অবসরে। এই স্বপ্নই মানুষের মনে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়; তাকে প্রাণবন্ত ও আশাবাদী করে তোলে। অফুরান প্রাণশক্তি নিয়ে নবস্বপ্নে বলীয়ান মানুষ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। গড়ে তোলে স্বপ্নে ছককাটা প্রাসাদের বাস্তব কাঠামো। তবে একটাই শর্ত—স্বপ্নটা যেন স্রেফ দিবাস্বপ্ন হয়ে না দাঁড়ায়। দিবাস্বপ্ন মানুষকে আপাত বিনোদন ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না। তবে বিষয় হলো, মানুষের দিনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় দিবাস্বপ্নের অলীক প্রভাবে মগ্ন হয়ে। এটা শুধু অলস বা বেকারদের বেলায় নয়, মহা কর্মব্যস্ত মানুষটিও তার হাতের কাজটি নিয়ে না ভেবে দিনের অর্ধেকটা সময় দিবাস্বপ্ন দেখেই কাটিয়ে দেন। একটি মার্কিন গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র ওয়েবসাইট

২ হাজার ২শ’রও বেশি মানুষ মোবাইল ফোনে ছাড়া আবেদনপত্র ডাইনলোড করে উত্তর দেন। এর ভিত্তিতে দিনরাতের বিভিন্ন সময় তাদের চিন্তা-ভাবনার ধরন জরিপ চালিয়ে দেখা হয়। বিজ্ঞানবিষয়ক এ গবেষণায় বলা হয়, এমনকি জরুরি কাজের সময়ও দিনের ৩০ শতাংশ সময় দিবাস্বপ্ন দেখে কাটিয়ে দেন অধিকাংশ মানুষ। এ ধরনেরই আরেকটি জরিপের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, মানুষের মন খুব সহজেই বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য একটি কার্যকর গবেষণা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে আইফোনকে।

এখানে অংশগ্রহণকারীরা তারা কী করছেন, তালিকা থেকে তা চিহ্নিত করার ব্যাপারে সম্মত হন এবং এতে তিনি আনন্দিত নাকি বিষণ্ন, এ বিষয়েও তথ্য দেন।
অংশগ্রহণকারীদের উত্তরগুলো একত্রিত করার পর গবেষকরা জানতে পারেন, দিনের বেলা মানুষের মন কীভাবে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়।

দুই লাখ ৫০ হাজার গবেষণা ফলাফল একত্রিত করার পর গবেষকরা এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হন যে, জেগে থাকার ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ সময়ই মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে।

গবেষকদের একজন ড. ম্যাথু কিলিংসওয়ার্থ বলেন, ‘মানুষের মনের বিক্ষিপ্ত চিন্তা তার আর সব কাজকে ছাড়িয়ে গেছে। আসলে আমাদের মানসিক জীবন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।’

তবে দিনের বিভিন্ন সময় মন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ার সঙ্গে মানুষের সুখী হওয়ার প্রবণতার সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কাজের সময় যাদের মন বেশি বিক্ষিপ্ত থাকে, তারা অসুখী জীবন কাটানোর কথাই বেশি উল্লেখ করেন বলে জানা যায়।

তবে এই যে বিক্ষিপ্ত চিন্তা, এটা মানুষের অসুখী বোধের কারণ না ফলাফল—গবেষণায় এটা এখনও পরিষ্কার হয়নি।