চুড়ির রিনিক ঝিনিক ও ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’


চুড়িবন্দনা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসে নারীর চুড়িপ্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যে। বুড়ো মেসতুতো ভাই জ্ঞানদার হবু বউয়ের জন্য মাসিমা দুর্গামণির হাতে অতুল যেই আকর্ষণীয় চুড়ি তুলে দিয়ে ছিলেন, তার বর্ণনা এসেছে এভাবে :

‘তাহার রং এবং কারুকার্য দেখিয়া দুর্গামণি অত্যন্ত পুলকিতচিত্তে দাতার ভূয়োঃ ভূয়োঃ যশোগান করিতে লাগিলেন। চুড়ি দুগাছি কাচের বটে, কিন্তু সেরূপ মূল্যবান বাহারে চুড়ি পাড়াগাঁয়ে কেন, কলিকাতাতেও তখনো আমদানি হয় নাই। বস্তুত তাহার গঠন, চাকচিক্য এবং সৌন্দর্য দেখিয়া মায়ের নাম করিয়া অতুল নিজের টাকাতেই বোম্বাই হইতে ক্রয় করিয়া আনিয়াছিল।’

আর বাংলা গানে এসেছে :

‘আমার চুড়ির রিনিক ঝিনিক রে

তার কাছে লাগত বড় বেশ।’

হ্যাঁ, চুড়ির আবেদন সব সময়ই ছিল। হয়তো থাকবে নানা আঙ্গিকে। তবে এক সময় শুধু শাড়ির সঙ্গেই পরত ললনারা। তারা সোনা আর কাচের চুড়ি পছন্দ করতেন। এখন সময়ের নিয়মে ‘সময়’ বদলে গেছে। তারপরও চুড়ির আবেদন কমেনি। বরং হাল ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে চুড়ি নানান ফরমেটে-ডিজাইনে। যে কোনো পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে পরা যায়Ñ এমন চুড়ি উদ্ভাবন হচ্ছে দিনকে দিন। বয়স দিয়েও এখন চুড়িকে বাঁধার সুযোগ নেই। বিশ্বায়ন সব বয়সী নারীর জন্য চুড়ির দরজা খুলে দিয়েছে। তাই কাচের চুড়ির পাশাপাশি ফ্যাশন শোকেসে জায়গা করে নিচ্ছে নানা উপাদানের চুড়ি।

তবে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ আর বাহারি রঙের মিশেলে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য। শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, পোশাক যাই হোক না কেন এখনো অনেক আধুনিক তর”ণীর পছন্দের এক বিশেষ অনুষঙ্গ হচ্ছে কাচের চুড়ি।

অবশ্য আজকাল সব কিছুতেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রচলিত ধারার বাইরে আধুনিক মানুষের আগ্রহ বেড়েছে নান্দনিকতার দিকে। তাই অতীতের সাদামাটা এক রঙের কাচের চুড়িতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শিল্পের বাহারি ডিজাইনের ছোঁয়া। কাচের চুড়ির পাশাপাশি এখন কাচের চুড়ির ওপর নানা রঙের পাথর, চুমকি, জরিসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আনা হচ্ছে নতুনত্ব।

আবার কাচের চুড়ির আধিপত্যে ধীরে ধীরে ভাগ বসাচ্ছে চৌকো, ত্রিকোণ, ডিম্বাকৃতির প্লাস্টিক ও মেটাল চুড়ি। বস্তুত বাঙালি নারীদের এক অনন্য অলঙ্কার হচ্ছে চুড়ি। এমন অনেক নারীই আছে যারা যে কোনো পোশাকেই চুড়ি পরেন। চুড়ি ছাড়া তাদের দিনই কাটে না।

তবে আধুনিকতার কল্যাণে মেটাল, সুতা, চামড়া, ব্যাকেলাইট, রবার, কাঠ, মাটি, বিডস, পুঁতি, সিটি গোল্ডসহ নানা ধরনের চুড়ির ব্যবহার বাড়ছে।

এক সময় চুড়ি প্রধানত কাচ থেকে তৈরি হতো। তবে শামুকের খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও হাতির দাঁতের চুরিও তখন ছিল।

অন্যসব উপাদান দিয়ে চুড়ি তৈরির কারণ এবং হাল ফ্যাশনের চুড়ির উপযোগিতার কথা ফ্যাশনবিদদের ঠোঁটের ডগায় লাফায়, ‘আসলে কাচের চুড়ি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অন্যান্য টেকসই উপাদানে তৈরি চুড়ির চিš—া আসছে। পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে রুচিবোধেও। কারণ পার্বতীর মতো হাত ভর্তি চুড়ি এখন সবাই পরতে চান না। আবার হাতে মাত্র বালা ধারণ করে অনেকে এখন তৃপ্তি পাচ্ছেন। আসলে কসমোপলিটন পণ্য হয়ে যাওয়ার কারণে সব বয়সের নারীই চুড়ি পরছেন।’

বাঙালি নারীর সঙ্গে চুড়ির গভীর সখ্য ঠিক কবে সৃষ্টি হয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য রেকর্ড আমাদের হাতে নেই। তবে চুড়ি পরতে ভালবাসেন সব বয়সী নারী। উৎসবের দিন জমকালো সাজের সঙ্গে চুড়ি এখন অপরিহার্য হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, হাতে চুড়ি না থাকলে সাজ ঠিক পরিপূর্ণতা পায় না। পত্রিকার বিশেষ পাতায় বিভিন্ন উৎসবের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পছন্দসই চুড়ি পরার প্রেসক্রিপশন হামেশাই চোখে পড়ে।

চুড়ির রিনিঝিনি ছন্দ মনেও দোলা দেয়। হালে ফ্যাশনের নতুন প্রবণতা হচ্ছে সুতোর চুড়ি। প্লাস্টিকের বালার ওপর নানা রঙের সুতো পেঁচিয়ে তৈরি হচ্ছে চমৎকার সব সুতো-চুড়ি। সুতো ছাড়াও কাতান কাপড়ের লেস পেঁচিয়ে বানানো হচ্ছে রং-বেরঙের চুড়ি। শাড়ি, কামিজ, ফতুয়া সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে এ ধরনের চুড়ি মানানসই বলে দাবি করা হয়।

আবার কপার, তামা, দস্তাসহ বিভিন্ন ধাতু দিয়ে তৈরি হচ্ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের চুড়ি আর বালা। মাটি বা সিরামিকের নানা রং ও নকশা করা চুড়িও পাওয়া যাচ্ছে। এসব চুড়ি নাকি দেশি সুতি বা ঁতাঁত কাপড়ের সঙ্গে বেশ মানায়।

কাঠ ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ডিজাইনের চুড়ি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। মোটা, চিকন, বাঁকা অবয়বে বিভিন্ন কাঠের চুড়ি চোখে পড়ে। কাঠ দিয়ে আবার ব্রেসলেটও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গোলাকার ছাড়াও ঢেউ খেলানো, বাঁকা, ত্রিভুজ, ষড়ভুজসহ নানা আকৃতির প্লাস্টিকের চুড়ি পাওয়া যাচ্ছে মোটা আর চিকন ডিজাইনে। স্কার্ট, টপস, ফতুয়া-জিনসের সঙ্গে ম্যাচিং করে কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি এসব চুড়ি তৈরি হচ্ছে। জয়পুরি, মাল্টি, কাসুটিসহ নানা ধরনের চুড়ির কথাও শোনা যায়। মুক্তার চুড়ির চাহিদাও বাড়ছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসও তৈরি করছে নানা ডিজাইনের ফ্যাশনেবল চুড়ি।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চুড়ির প্রচলন রয়েছে। এটা চেকে naramek, ডাচে enkelring, ফিনিশে rannerengas, জার্মানে armreif, হাঙ্গেরিয়ানে karperec, ইন্দোনেশিয়ায় gelang, ইতালিয়ানে braccialette, মালয়ে gelang, স্পেনিশে brazlete ও তুর্কিতে halhal, তামিলে ভালায়ন, মালয়ালমে ভালা আর নেপালিতে চুরা নামে পরিচিত।

ভারতীয় উপমহাদেশে চুড়ি ঠিক কবে চালু হয়েছে, তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্তিক খননকালে খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও আকিক পাথরের চুড়ি পাওয়া গেছে।

পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারোতে (যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ২৬শ বছর আগে) পাওয়া এক মূর্তিতে দেখা যায়, নৃত্যরত এক বালিকার বাম হাতে চুরি রয়েছে। সম্ভবত তখন দুহাতে চুড়ি পরার সংস্কৃতি ছিল না। অন্যদিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ি পাওয়া গেছে ভারতের তক্ষশীলায়।

হীরা, মূল্যবান পাথর আর মুক্তো বসানো চুড়ির প্রচলন এখনো ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে। এক সময় লাক্ষার তৈরি চুড়িরও বেশ প্রচলন ছিল এখানে। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশেও চুড়ির প্রচলন রয়েছে।

বিয়ের চুড়ি সাধারণত রঙিন হয়ে থাকে। লাল রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘জীবন ও আনন্দের প্রতীক’ আর সবুজ রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘উর্বরতার প্রতীক’। চুড়ি দুই হাতে পরা যায়। এক হাতে পরতেও বাধা নেই।

আধুনিক প্রজন্মের তরুণ সমাজের একটি অংশ এখন বেশ আগ্রহ নিয়েই চুড়ি পরছে। তবে তাদের এই চুড়ি ‘খাড়–’ নামে পরিচিত। এটা রবার অথবা ধাতুর তৈরি হতে পারে। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের উঠতি তরুণরা এটা পরছে।

গিফট আইটেম হিসাবেও চুড়ি বেশ আদরণীয়। কারণ নারীরা শাড়ি বা জামার সঙ্গে ম্যাচিং করে চুড়ি পরতে এখন বেশ সচেতন।

চুড়ি নিয়ে কুসংস্কারও আছে। বলা হয়, চুড়ির কারণে স্বামীর নিরাপত্তা যেমন বাড়ে, তেমনি ভাগ্যও ফেরে। আবার চুড়ি অকারণে ভেঙে গেলে স্বামীর বিপদ ঘটে।

আমাদের দেশে বৈশাখে লাল-সাদা বিভিন্ন বর্ণের রেশমি চুড়ি পরে নিজেকে নানাভাবে সাজানোর প্রবণতা নারীদের মাঝে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার তারাই ভিন্ন উৎসবের দৈনন্দিন পথচলায় দেশপ্রেমের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছেন পতাকার রং মিলিয়ে লাল-সবুজ রঙের হাত ভরা চুড়ি পরে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে প্রতিটি উৎসবেই বাঙালি নারী চুড়ি সাজের জন্য বেছে নিচ্ছে বিশেষ বিশেষ রংকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি চুড়ি।

হাতভরা চুড়ি পরা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। ফ্যাশনবিদরা বলেন, হাতের গড়নের সঙ্গে মিলিয়ে দুহাত ভরা চুড়ি হাতের সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি সাজকেও করে পরিপূর্ণ।

একবার এক মহিলা তার স্বামীর সঙ্গে শপিং করতে গেছে। এক পর্যায়ে ওই উন্নাসিক মহিলা এক সেট চুড়ি পছন্দ করল।

‘তুমি এত চুড়ি কেনো। অথচ কোনদিন পরতে দেখি না’ স্বামী অনুযোগের সুরে বলল।

‘চুড়ি পরলে ভেঙে যাবে। তাই চুড়ি পরি না, শুধু কিনি’ মহিলার চটপট জবাব।

হাতপাখাবন্দনা

হাজার হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে হাতপাখা। কবি-সাহিত্যিক, বাউল শিল্পীরা হাতপাখা নিয়ে বিভিন্ন গান, কবিতা ও গীত রচনা করেছেন এবং তুলে ধরেছেন এটার সৌন্দর্যমণ্ডিত ঐতিহ্য। হাতপাখা নিয়ে মজার মজার রূপকথা, গল্প-কাহিনীও আমাদের সমাজে প্রচলিত।

আমাদের সমাজে এক সময় হাতপাখা বলতে তালপাখাই বোঝাত। আর সংস্কৃতে তালপাখা ‘তালবৃন্তক’ নামে পরিচিত। পরে কাপড়, বাঁশ ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানানো শুরু হয়। হাতপাখায় নকশা আর ডিজাইনের নতুন মাত্রা এসেছে। পদ¥, শতফুল, উনিশকাঁটা, সঙ্কলন, বরফি, শিঙ্গারা, শক্সখ, আয়নাকোটা, শক্সখপদ¥, ঝুরিফুল, চালতা ফুল, পানপাতা, তারাফুল, চারমাছ, হাতিবান্ধা, মোরগ, চৌখুপি, চক্র নামে হাতপাখার নকশার কথা শোনা যায়। কোনো কোনো নকশার মধ্যে আয়নার টুকরোও বসানো হয়। হাতলে লাগানো হয় বাঁশের একটি নল, যাতে হাতপাখা ঘোরাতে কম বেগ পেতে হয়।

অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর ‘লোকশিল্প’ গ্রন্থে হাতপাখা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত এদেশে খর বৈশাখের দাবদাহ এবং ভাদ্রের আর্দ্রতা মিশ্রিত গরমে হাতপাখা মানুষের নিত্যসঙ্গী। সুতা, বাঁশ, চুলের ফিতা, বেত, খেজুরপাতা, নারকেলপাতা, তালপাতা, কলার শুকনো খোল, পাখির পালক, সুপারির খোল, শোলা, গমের ডাঁটা, মোটা কাগজ প্রভৃতি পাখার উপাদান। এ নিত্যব্যবহার্য বস্তুটি বিশেষ করে মেয়েদের হাত পড়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সুতা, বাঁশ, সরতা বেত ও কলার খোলের শুকনা বেতি দিয়ে পাখা বোনা হয় পাটি বা ম্যাট বোনার কায়দায়। বিভিন্ন মটিফ বা ডিজাইনে এ পাখা তৈরি হয় এবং এগুলোর বিভিন্ন নামও রয়েছে। এর মধ্যে পানগুছি, কেচিকাটা, তারাজো, পুকুই রাজো, ধানছড়ি, ফলং ঠেইঙ্গা, ফড়িংয়ের ঠ্যাং, রাবণকোডা, নবকোডা, কবুতর খোপ, মাকড়ের জাল, পদ¥জো, কামরাঙ্গা জো, ধাইড়া জো, সুজনি জো, চালতা ফুল, কাগজ কাটা, হাতি, মরিচ ফুল, আটাসান, শক্সখলতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য’।

কাপড় ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানাতে গেলে প্রথমে বাঁশের কাঠি দিয়ে বৃত্ত তৈরি করে নিতে হয়। এর ওপরেই সুতো অথবা কাপড়ের নানা বুনন। বৃত্তের পরিধিতে জুড়ে দেওয়া হয় রঙিন কাপড়ের ঝালর।

গরমে অতিষ্ঠ ইংলিশ বেনিয়ারা এ দেশে ল¤¦া কাঠের সঙ্গে লাল শালুতে কিনার মোড়ানো পাটি জুড়ে দিয়ে আংটা লাগানো আর ছাদে ঝোলানো বিশেষ পাখা উদ্ভাবন করেছিলেন। দূরে বসে দড়ি বাঁধা এই পাখা যারা মৃদুলয়ে টা

জাহান হাসান একুশ নিউজ মিডিয়া

হাতপাখা

নতেন তাদের বলা হতো ‘পাক্সখাবরদার’। এক সময় আদালতের এজলাসেও এসব পাখা দেখা যেত।

তবে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার কারণে হালে হাতপাখা পল্লীজীবন ছাপিয়ে নগরজীবনেও বেশ পোক্ত স্থান করে নিচ্ছে।

নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য এক সময় বাঁশ অথবা তালপাতার ডাঁটিতে বোনা তালপাখাই ছিল গরমে স্ব¯ি— পাওয়ার সম্বল। তবে বহনে অসুবিধা থাকায় নগরজীবনে ফোল্ডিং হাতপাখার প্রচলন বাড়ে। কথাটাকে আরো সহজভাবে বললে এভাবে বলা হয়, দৃষ্টিনন্দন চীনা হাতপাখার কাছে দেশি হাতপাখা টিকে উঠতে পারছে না। শিক্ষার্থীরাও এখন বইয়ের ঝোলায় ফোল্ডিং হাতপাখা বহন করছে। বিশেষত অসহ্য রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ব্যাগে এই জাতীয় পাখা রাখার ফায়দা অনেক। পাবলিক বাসেও এখন অনেককে হাতপাখা বুলোতে দেখা যায়।

হাতপাখায় জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যও। বৈশাখী মেলা থেকে শুরু করে যে কোনো বাঙালি উৎসবেই হাতপাখার থাকে আলাদা কদর। গরমে আরাম পাওয়াই হাতপাখার মৌল উদ্দেশ্য হলেও প্রযুক্তি ও ফ্যাশনের উৎকর্ষে এটি ধারণ করছে শৈল্পিক রূপ।

এক সময় জমিদার বাড়ির হাতপাখাগুলো হতো ঝালর লাগানো এবং বিশাল আকৃতির। সেসব পাখা রেশম বা সাটিনের কাপড়ের ওপর সুতা, জরি এমনকি সোনা-রুপা দিয়েও কাজ করা থাকত। এখন অনেকের ড্রয়িংরুমে নানা ডিজাইনের হাতপাখা শোপিস হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রাচীন কারুশিল্প হাতপাখার যাত্রা কোথায় এবং কাদের মাধ্যমে ঠিক কবে শুরু হয়েছিল সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে ভ্যাপসা গরমে হাতপাখা নাড়িয়ে বাতাসে দোলাচল সৃষ্টি গরম হাওয়া সরিয়ে অপেক্ষাকৃত শীতল হাওয়া প্রবাহের উদ্দেশ্যেই হাতপাখার ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর গরমে এটার উপযোগিতা প্রমাণিত হওয়ার পর সময়ের ব্যবধানে এটা রূপান্তরের পথ বেয়ে একটি অলঙ্করণময় শিল্পে পরিণত হয়। এখনো ধর্মীয় ও রাজকীয় অনুষ্ঠানে কারুকাজমণ্ডিত হাতপাখার প্রচলন রয়েছে।

প্রত্নতাত্তিক সাক্ষ্য থেকে ধারণা করা হয় ভারতবর্ষ, চীন, জাপানসহ প্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হাতপাখার ব্যবহার ছিল। আবার প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যে পশুর চামড়ার তৈরি অলঙ্কৃত হাতপাখার সন্ধান পাওয়া গেছে। এটার হাতলে গাছের ডালের অংশ অথবা পশুর হাড় লাগানো থাকত।

এক সময় গ্রামের ললনারা হাতপাখা তৈরি করে রঙিন সুতা দিয়ে ‘ভুলো না আমায়’ বা ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’- টাইপের ছন্দ লিখত। আবার রোদেলা দুপুরে দুরন্ত কিশোর দলের হাতে শোভা পেত কারুকাজের তালপাখা। আর মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরা গাছের ছায়ায় বসে তালপাখা হাতে বাতাস করতে করতে দূরের রাখাল ছেলেটির বাঁশির সুর শুনত।

অন্যদিকে ক্লান্তপরিশ্রান্ত কৃষক মাঠ থেকে ফেরার পর কিষাণী ব্যস্ত হয়ে পড়ত হাতপাখার শীতল পরশে তাকে জুড়িয়ে দিত।

আসলে হাতপাখার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে থাকতে পারে গ্রামীণ নারীর আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ নাম না জানা কত্ত কাহিনী। হাতপাখা বুনন ছিল আবহমান গ্রামবাংলার চিরাচরিত অতি পরিচিত দৃশ্য। প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার দাপটে নাগরিক জীবনে হাতপাখার প্রচলন এখন কমে গেছে। তারপরও ভয়াবহ লোডশেডিংকালে বিপর্যস্ত নগরবাসী ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে করেন হাতপাখার শীতল পরশ বা বাতাসের কথা। কেউ কেউ অসহ্য গরমে স্বস্তি পেতে এখনো হাতপাখার দ্বারস্থ হন।

আজকাল হাতপাখা ফ্যাশনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। তালপাখার পাশাপাশি বাহারি রং ও ডিজাইনে প্লাস্টিক, বেত, ব্যাকেলাইট, কাগজ দিয়ে হাতপাখা তৈরি করা হয়। এছাড়া অধিকাংশ হাতপাখার হাতল হিসাবে জুড়ে দেওয়া হয় বাঁশের চিকন কাঠি, বেত অথবা লাঠি। তবে আজকাল কাপড় ও সুতার কারুকার্যমণ্ডিত বাহারি ধরনের হাতপাখা পাওয়া যাচ্ছে। এতে যুক্ত হচ্ছে হরেক রকমের রং ও সুতা, ফলস, শাড়ির পাড় ও লেস।

‘আমার নাম তালের পাখা শীতকালে দেই না দেখা, গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা’- এটি আমাদের দেশের গ্রামবাংলার একটি পুরনো প্রবচন। এখনো গরমে আমরা হাতপাখার ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা থাকায় অভিজাত বুটিক বাড়ি কিংবা ফ্যাশন হাউসগুলোও নজর দিচ্ছে বাহারি হাতপাখার ওপর। এসব হাতের পাখা নানা ঢং আর রঙে চলে আসছে অভিজাত ড্রইংরুমের সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ হয়ে।

একাধিক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ জোয়ারা গ্রামের হাতপাখা এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। মান ভালো হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সৌদি আরব, জার্মানি, দুবাই, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে এখানকার পাখার চাহিদা বাড়ছে।

বোশেখের কাঠফাটা রোদে লোডশেডিং নগর জীবনে উত্তাপ বাড়ায়- দিনে রাতে সমানে। মাথার ওপর তিন পাখাওয়ালা যন্ত্রটা নিশ্চল ঝুলে থাকে। ঘামভেজা দেহটাকে এক বিন্দু স্বস্তি দিতে সবার চোখ যায় হাতপাখাটার দিকেÑহোক না তা তালপাতা, কাপড়, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত কাঠ অথবা কাগজের। অসহ্য গরমে হাতপাখাই হয়ে গেছে দিনে-রাতের সঙ্গী। হাতপাখা ছাড়া নগরজীবন চলে কী করে? ২০১১ সালের নববর্ষের একটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিতরণ। এটার মানবিক দিক থাকলেও পণ্যের বিজ্ঞাপনই ছিল মুখ্য। রমনা, চারুকলা, টিএসসি, শিল্পকলা প্রান্তর ঘুরে দেখা গেছে, সিঙ্গার, ইমাম টেলিকমসহ কমপক্ষে ১৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিলিয়েছে। এক সময় এ দেশে তালপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বাঁশ, বেত ও কাপড় দিয়েও তা তৈরি হতো। কিন্তু ঠিক কবে এ দেশে হাতপাখার প্রচলন হয়েছিল, তার কোনো লিপিবদ্ধ বা প্রত্নতাত্তিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। মুঘল আমলে হাত-টানা পাখার প্রচলন দেখে এটা অনুমান করা যেতে পারে, পরবর্তীকালে জমিদার ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে হাতটানা পাখার প্রচলন ঘটে।

পশ্চিমা বিশ্বসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে হাতপাখা ফ্যাশন সামগ্রী হলেও আমাদের দেশে তা নয়। বিদ্যুতের কল্যাণে নগরজীবন থেকে হাতপাখা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংই হাতপাখাকে নগরজীবনে ফিরিয়ে আনছে। হাতপাখা মূলত কুটির শিল্প হলেও হালে প্লাস্টিকের হাতপাখা চোখে পড়ে। তারপরও এটা সুসংঘবদ্ধ শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। তাই দেশে এ পণ্যটির চাহিদার প্রকৃত পরিসংখ্যান জানার উপায় নেই। তবে লোডশেডিং এ শিল্পের পুনরুজ্জীবনে ভমিকা রাখছেÑ এমন দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। লোডশেডিং অভিশাপ কাটানো গেলে হাতপাখা আমাদের ফ্যাশন পণ্য হয়ে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশিদের জীবনে হাতপাখার প্রচলন বাড়ছে। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়? তপ্তদেহে এক চিলতে শাšি—র পরশ বুলাতে হাতপাখার বিকল্প নেই।

বিশ্বে শিল্প, হাতির দাঁত, পশুর হাড়, মাইক, চন্দনকাঠ, মুক্তো এমনকি কচ্ছপের খোল দিয়েও হাতপাখা তৈরির প্রমাণ রয়েছে।

জাপানে হাতপাখার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অনেক। ওখানে এটা বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা ও শুভ কামনার প্রতীক। জাপানি নাচেও হাতপাখার উপস্থিতি চোখে পড়ে।

ইতিহাসে রয়েছে, ১৫শ শতকে পর্তুগিজ বণিকরা চীন ও জাপান থেকে হাতপাখা আমদানি করে পশ্চিমা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ১৬শ শতকে চীনা ভাঁজ করা হাতপাখা ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফোল্ডিং ফ্যান হাতে ব্রিটেনের রানী প্রথম এলিজাবেথের একটি প্রোর্ট্রেট এখনো রাজপরিবারে সংরক্ষিত রয়েছে। এ কারণে বলা হয়, হাতের মুঠোয় ঠাঁই পাওয়া হাতপাখাই একটি জাতির ইতিহাস, ভূগোল ইতিহাসের গল্প বলে। মিসর, ব্যবলিন, আজটেক, ইনকা, পারস্য, গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় হাতপাখার প্রচলন ছিল। তবে এটার আবিষ্কারক কারা, তা জানা যায়নি।

রেশম, পাখির পালক, হালকা ধাতু পাত দিয়েও হাতপাখা তৈরি হয়। এটাতে হ্যাড পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি পুতি, ক্রিস্টাল ও ফিতা লাগানো হয়।

হাতপাখা নিয়ে প্রচলিত কৌতুক এ রকম :

একদিন এক সর্দারজি ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। তাই সর্দারজিসহ অনেকেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে হাতপাখা কিনে বাতাস করতে লাগলেন। অথচ এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যেতে না যেতেই সবার হাতপাখা খুলে নষ্ট হয়ে গেল।

কিন্তু সর্দারজির হাতপাখাটা একদম নতুনের মতোই আছে। এটা দেখে অবাক হয়ে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘সর্দারজি, আপনার হাতপাখাটি এখনো নতুনের মতো আছে কী করে?’ সর্দারজি বললেন, ‘আরে মশাই, আমি আপনাদের মতো বোকা নাকি? টাকা দিয়ে হাতপাখা কিনেছি কি নষ্ট করার জন্য? আমি তো হাতপাখা মুখের কাছে ধরে শুধু মাথাটা নড়াচড়া করেছি।’

সূত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০

ওবামার চীন আতঙ্ক : যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে ইসলাম এবং বিকাশমান চীনকে ভয় করছে। এশীয় অঞ্চলে জাপান ঐতিহ্যগতভাবে ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে থাকলেও এখন জাপান আর সে ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এশিয়ায় চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে ভারতকে কাছে টানা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিকল্প নেই।


ওবামার চীন আতঙ্ক
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

President Barack Obama met with Chinese President, Hu Jintao

President Barack Obama met with Chinese President, Hu Jintao

এক শতাব্দী আগে জার্মানি যেভাবে সমৃদ্ধ, বিকশিত ও সম্প্রসারিত হয়ে ইউরোপ তথা বিশ্বের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র চীনের অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধিকে ঠিক একইভাবে দেখছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাম্প্রতিক ভারত সফর শুধু দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে কিছু চুক্তি সম্পাদনের জন্য ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ হল, কিভাবে এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে সামাল দেবে। মার্কিন নেতৃবৃন্দ মুখে যতই ইসলামকে ‘মহান ধর্ম’ এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশকে ‘মডারেট’ বলে সার্টিফিকেট দিক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে ইসলাম এবং বিকাশমান চীনকে ভয় করছে। এশীয় অঞ্চলে জাপান ঐতিহ্যগতভাবে ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে থাকলেও এখন জাপান আর সে ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সে কারণে এশিয়ায় চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে ভারতকে কাছে টানা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিকল্প নেই।

ওবামার ভারত সফর নিঃসন্দেহে দেশটির নেতৃবৃন্দের নৈতিক মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘকাল ভারত কোনো পরাশক্তিকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পায়নি, বরং চীনের ‘শীতল হুমকি’র মুখোমুখি ছিল; যে হুমকি এখনো বিদ্যমান বলে ভারত মনে করে। গত ২২ অক্টোবর চীন সরকারিভাবে যে অনলাইন ম্যাপিং সার্ভিস চালু করেছে তাতে ভারতের অরুণাচল, হিমাচল ও লাদাখের আকসাই চীন এলাকাকে চীনের ভূখণ্ড হিসেবে দেখিয়েছে। এটা চীন যে শুধু এবারই দেখাল তা নয়, পুরো এলাকাকে তারা দীর্ঘ দিন ধরে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। তাদের মতে, অরুণাচল প্রদেশ আসলে দক্ষিণ চীন, যা ভারতের জবরদখলে রয়েছে। ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শংকর রায় চৌধুরী সম্প্রতি দি এশিয়ান এজ-এ এক নিবন্ধে চীনের দাবিকে অরুণাচলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সমস্যা বলে উল্লেখ করেছেন। ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ভি কে সিং গত ১৯ অক্টোবর দিল্লিতে এক সেমিনারে চীন ও পাকিস্তানকে ভারতের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি বলে উল্লেখ করেন। সে কারণে ভারত নিজের নিরাপত্তার জন্য তিব্বতকে বাফার জোন হিসেবে দেখতে চায়। ভারত তিব্বতের স্বাধীনতার পক্ষে, আর চীন তিব্বতকে নিজ ভূখণ্ডের অংশে পরিণত করেছে। এ বিরোধ অনেকটাই নিষ্পত্তির অতীত।

যুক্তরাষ্ট্র চীনের মোকাবেলায় ভারতকে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দেখতে চায় এবং ওবামা ভারত সফরকালে ঘোষণা করেছেন, এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে পূর্ণ সমর্থন দেবে। এ ঘোষণার আগে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কাছে যুক্তরাষ্ট্র নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য বৃদ্ধি করতে হলে জাতিসঙ্ঘের কাঠামোতে যে সংস্কার করতে হবে সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে যে, এটা জাতিসঙ্ঘের নিজস্ব ব্যাপার। তারা যে প্রক্রিয়ায় অন্যান্য বিষয়ে সংস্কার করে থাকে, এ ক্ষেত্রেও একইভাবে সংস্কার করবে। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে শুধু চীন এখন পর্যন্ত ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের ব্যাপারে কোনো মতামত ব্যক্ত করেনি। অনেকে মনে করেন, ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রস্তাবে চীন ভেটো দেবে, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের জোরালো সমর্থন ঘোষণার পর চীন এখন পর্যন্ত নেতিবাচক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি; বরং চীনের বক্তব্য ও পদক্ষেপ অনেকটাই ভারতকে আশাবাদী করার মতো। ওবামার ঘোষণার পর চীন নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত Zhang Yan-কে ভাইস মিনিস্টারের পদে উন্নীত করেছে, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রে নিয়োজিত চীনের রাষ্ট্রদূতরা ভাইস মিনিস্টারের পদমর্যাদা ভোগ করে থাকেন।

U.S. businesses say China's currency is undervalued and puts them at a big competitive disadvantage

U.S. businesses say China's currency is undervalued and puts them at a big competitive disadvantage

এ ছাড়া চীনের পররাষ্ট্র দফতর থেকে ওবামার ঘোষণার পর যে প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়েছে, সেটিও যথেষ্ট ইতিবাচক বলে ধরে নেয়া যায়। চীনা পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘China understands New Delhi’s aspirations to play a bigger role in the United Nations and is ready for consultation with it over reforms of the world body. China values India’s status in the international affairs and is ready to keep contact and consultations with India and other member states on the issue of Security Council reform. China supports reasonable and necessary reform of the United Nations Security Council and will maintain priority to giving more representation to developing countries at the UN Security Council, so that they can play bigger role in the Security Council.’

চীনের এই সদিচ্ছা সত্ত্বেও ভারত ও চীনের মধ্যে যে সীমান্ত বিরোধ বিদ্যমান, তা শিগগিরই দূর হবে, এমনটি আশা করা বোধহয় সঠিক হবে না। ১৯৬২ সালে সীমান্ত সংঘর্ষের পর উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন পর্যন্ত যে শীতল সম্পর্ক ছিল, তা কিছুটা উষ্ণ হলেও ঘনিষ্ঠতার পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। চীন যেমন ভারতকে তার ভূখণ্ডের দখলদার হিসেবে বিবেচনা করছে, ভারতও অনুরূপ চীনের দিক থেকে হামলার আশঙ্কামুক্ত হতে পারছে না। সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় অস্ত্র মজুদ করার পাশাপাশি ভারত তার এশীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও আর গোপন রাখছে না। Indian Defence Journal-এর সম্পাদক মি. ভরত বর্মা সম্প্রতি এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘India wants to control the politics of the whole Asian region, like the role of the United States of America playing in the global politics. And to achieve the goal it is not sufficient to patronize a section of pro-Indian intellectuals and politicians of other countries. It is necessary to develop infrastructures in order to facilitate supply of troops and logistics, side by side setting up big embassies, ensuring use of port facilities and also developing intelligence network in those countries. Even, if necessary, military aggression could be an alternative to this end. Afghanistan was not occupied by the Americans only due to the presence of people like Hamid Karzai, the Americans had to set up cantonments, air fields and build road infrastructures. Besides, they are fighting there without a ceasefire.’

President Obama touring the Badaling section of the Great Wall

President Obama touring the Badaling section of the Great Wall

ভারতের এমন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বিপরীতে চীন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে, এমনটি ধারণা করা ঠিক হবে না। গত বছর (৭-৮ আগস্ট ২০০৯) নয়াদিল্লিতে যখন ভারত-চীন সীমান্ত বৈঠক চলছিল, তখন বেইজিং ভিত্তিক China-Centric Asian Strategy Institute-এর জার্নালে ‘If China takes a little action, the so called great Indian federation can be broken up’ শীর্ষক নিবন্ধে গবেষক Zhan Lue Gang বলেন, “এশিয়ায় নয়াদিল্লির ভারত-কেন্দ্রিক নীতি বাস্তবে হিন্দুস্থান-কেন্দ্রিক নীতি। কিন্তু ‘হিন্দুস্থান’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই এবং দেশটির অনেক রাজ্যে বহুসংখ্যক ‘স্থানীয় কেন্দ্র’ বিদ্যমান। বহুবিধ স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে তথাকথিত ভারতীয় জাতিকে প্রকৃতপক্ষে এক জাতি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ইতিহাসে এমন ভারতীয় জাতির অস্তিত্ব কখনো ছিল না। মুসলিম ও ব্রিটিশ শাসনাধীনে একীভূত দেশটি বর্তমানে ‘ভারত’ নামে পরিচিত।”

নিবন্ধকারের মতে, ভারত যদি ঐক্যের জন্য কোনো কিছুর ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে সেটি হলো হিন্দু ধর্ম, ১৯৪৭ সালে যার ভিত্তিতে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল। সে হিসেবে ভারতকে একটি ‘হিন্দু ধর্মীয় রাষ্ট্র’ বলা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, হিন্দু ধর্ম একটি ক্ষয়িষ্ণু ধর্ম, এতে বর্ণ ও জাতগত প্রতারণা ও শোষণ রয়েছে; যা দেশটির আধুনিকতার পথে বড় অন্তরায়। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেছেন যে, চীনের উচিত তার নিজের স্বার্থে এবং এশিয়ার অগ্রগতির স্বার্থে ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী যেমন­ অসমিয়া, বাঙালি, নকশাল, মারাঠি, পাঞ্জাবি, তামিল ও কাশ্মীরিদের সাথে মিলিত হয়ে এবং তাদেরকে সমর্থন দিয়ে ভারতের বাইরে তাদের নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা।

নিবন্ধে আরো বলা হয়, ‘China so that Assam realizes its national independence… For Bangladesh, the biggest threat is from India, which wants to develop a great Indian empire extending from Afghanistan to Myanmar. India is also targeting China with support to Vietnam’s efforts to occupy Nansha group of islands in South China Sea. This is why China should strengthen its alliance with Bangladesh, a country with which the US and Japan are also improving their relations to counter China. China should also open secret contacts with pro-independence groups fighting Indian rule in at least 13 states inside India.’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতকে বিভাজন করার লক্ষ্যে চীন তার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানকে সাথে নিয়ে আসামের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ULFA-কে এবং তামিল, নাগা ও কাশ্মীরিদের মতো জাতি-গোষ্ঠীগুলোর আকাঙ্ক্ষা পূরণে সাহায্য করতে পারে, …এবং সবশেষে ভারত কর্তৃক অবৈধভাবে দখলকৃত দক্ষিণ তিব্বতের ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা, যাকে তারা অরুণাচল প্রদেশ নামে অভিহিত করে, সেই ভূখণ্ড উদ্ধার করতে পারে।’

ভারতকে ইউরোপের মতো ২০ থেকে ৩০টি জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত করার আশা ব্যক্ত করে নিবন্ধকার উপসংহার টেনেছেন যে, ভারতের জাতি-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যদি সচেতনতা জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক সংস্কার ও পরিবর্তন আনয়ন এবং বর্ণভেদ দূরীকরণের মাধ্যমে সমগ্র এলাকাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

এই অবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিপরীতে ভারতকে তার প্রভাববলয়ে নেয়ার ফলে এশিয়ায় উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বরং বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। ওবামার ভারত সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তার বাইরেও এ সফরের আরেকটি অগ্রাধিকার ছিল ভারতের কাছে ২৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক উপকরণ বিক্রয়, যার সূচনা হয়েছিল ২০০১ সালে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারে ১৪৫টি Howitzer কামান, ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে ১০টি হেভি লিফট এয়ারক্রাফট, ২ বিলিয়ন ডলারে আওয়াকস রিফুয়েলিং সিস্টেম, ৮৮০ মিলিয়ন ডলারে ক্লাস্টার বোমা ক্রয় করবে। এ ছাড়া ভারতের সামরিক ক্রয় তালিকার মধ্যে আগামী ১০ বছরে ১২ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যে ৬০০ হেলিকপ্টার আর তিন হাজার ৬০০ কামান রয়েছে। গত বছর ভারত ২.১ ডলার মূল্যে লং রেঞ্জ মেরিটাইম রিকনাইসেন্সের অর্ডার দিয়েছে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বজায় রাখার প্রস্তুতি হিসেবে।

ওবামার সফরের মধ্যে ‘না বলা’ অনেক কিছু রয়ে গেছে, যা প্রাথমিকভাবে উপমহাদেশের জন্য এবং ব্যাপকভাবে এশিয়ার জন্য বিপদের বার্তা বয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘এশীয় কূটনীতির কেন্দ্রে’ পরিণত করার নামে দেশটিকে যেভাবে অস্ত্রসজ্জিত করছে, তা ইতোমধ্যে ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানকে ক্ষুব্ধ করেছে। পঞ্চাশের দশক থেকে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে যে মৈত্রী ছিল, তা সোভিয়েত ব্লকে থাকা ভারতের জন্য ছিল ঈর্ষণীয়। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্যদের বিতাড়নে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে এবং বর্তমানে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে আগামী শতকের ‘Indispensable Partner’ হিসেবে ঘোষণা করায় পাকিস্তান হতাশ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার রাজনীতিতে মেতে উঠেছে, যার নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই’।

ভারত-মার্কিন সম্প্রীতি এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হলে কারো আপত্তি থাকার কথা ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক আলামতই বলে দিচ্ছে যে, এর ফলে এ অঞ্চলে অস্থিরতা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতাই শুধু বৃদ্ধি পাবে।
লেখকঃ সাংবাদিক
আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info,