মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!


ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও। গ্রাম থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থীও ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে অনেকে।

সমাজবিজ্ঞানীরাও স্বীকার করছেন পাশ্চাত্য দুনিয়ার ওই ধারণা অনেকটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকায়। এ রকম এক জুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই বিভাগে, একই ক্লাসে পড়তেন। গভীর বন্ধুত্ব তখন থেকেই। দু’জনই মেধাবী। রেজাল্টও ভাল। বন্ধুটি এখন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বান্ধবী পিএইচডি করছেন, এখনও শেষ হয়নি। থাকছেন বনানী এলাকার একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটিও নিজেদের। লিভ টুগেদার করছেন। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে করবেন না। দু’জনই চেষ্টা করছেন ইউরোপের একটি দেশে যেতে। বিত্তবান ঘরের সন্তান তারা।

বন্ধুটির বাড়ি ছিল ফেনীতে, বান্ধবীর ঢাকায়। শাহানা তার নতুন নাম। এ নামে কেবল জর্জই তাকে চেনে। জর্জকে ওই নামে অন্য কেউ চেনে না। এটা শাহানার দেয়া নাম। একে অপরকে দেয়া নতুন নামেই তাদের বাড়ি ভাড়া নেয়া উত্তরা এলাকায়। চাকরিজীবী দু’জনই। এক সময়ে চাকরি করতেন এই সংস্থায়। সেখান থেকে পরিচয় ঘনিষ্ঠতা। এখন তারা চাকরি করছেন পৃথক দু’টি বৈদেশিক সাহায্য সংস্থায়। উচ্চ বেতনে চাকরি। অফিসের গাড়ি। শাহানা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জর্জ পড়াশোনা করেছেন ভারতের নৈনিতালে, বিজ্ঞান অনুষদের একটি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন। বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় ফিরে চাকরি নিয়েছেন। লিভ টুগেদার করছেন। বিয়ের প্রতি আগ্রহ নেই তাদের। শাহানা ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চান। সেখানে তার পরিবারের বেশির ভাগ লোক বসবাস করছে। শাহানার চিন্তা বিয়ে মানেই একটি সংসার, ছেলেমেয়ে, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি। এখনই এগুলোর কথা ভাবতে গেলে তার ক্যারিয়ার হোঁচট খাবে, বিদেশে যাওয়া না-ও হতে পারে। এ কথাগুলো সে খুলে বলেছে জর্জকে। জর্জ রাজি হওয়ায় এক সঙ্গে থাকছেন তারা চার বছর ধরে। খাওয়া-দাওয়ার খরচ দু’জনে মিলে বহন করেন। সব কিছুই হয় দু’জনে শেয়ার করে। মনোমালিন্য হয় না তা নয়, হয় আবার তা মিটেও যায়। এভাবেই চলছে চার বছর ধরে।

একটি মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন তারা। বসবাস করছেন ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটে। ছেলেমেয়ে দুজনই ধনাঢ্য পরিবারের। দু’বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন। পড়শিরা জানে, স্বামী-স্ত্রী। অন্যদের সঙ্গে সেভাবেই নিজেদের পরিচয় দেন। যশোরের একটি গ্রাম থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন ওরা। পরিচয় তাদের স্কুল থেকে। ঢাকায় এসে প্রথম দু’বছর দু’জন থাকতেন আলাদা বাড়ি ভাড়া করে। এখন দু’জন মিলে থাকছেন একই বাসায়। ভাড়া দেন দু’জনে শেয়ার করে। গত এক বছর ধরে লিভ টুগেদার করছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোর ছাত্র-শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সাধারণ কর্মচারীরা পর্যন্ত লিভ টুগেদার করছে। শোবিজে লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জাতীয় ভাবে পরিচিত শোবিজের অনেক স্টার এখন লিভ টুগেদার করছেন। দেশব্যাপী পরিচিত দু’জন নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট শোবিজে। একজন পরিচিত কণ্ঠশিল্পী গত পাঁচ বছর ধরে লিভ টুগেদারের পর আপাত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে এখন থাকছেন আলাদা। শোবিজের নাট্যাঙ্গনের চার জোড়া নতুন মুখ লিভ টুগেদার করছেন বছরখানেক ধরে। তাদের পরিচিত ও নিকটজনরা জানেন তাদের লিভ টুগেদার সম্পর্কে। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে তারা কেউ আপাতত বিয়ের কথা ভাবছেন না। শোবিজে ছেলেমেয়ে উভয়ের উচ্চাসনে যাওয়ার পথে বিয়েকে একটি বড় বাধা মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত দুই তিন বছরের মধ্যে ঢাকায় লিভ টুগেদারেরও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে লিভ টুগেদারের বেশির ভাগ ছিল সমাজের উচ্চ স্তরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। এখন লিভ টুগেদারের প্রবণতা বেড়েছে মধ্যবিত্ত সমাজে। সদ্য গ্রাম থেকে এসে ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। কেবলমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে কিন্তু তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এমন অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছে।

ঢাকার একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, তার জানা মতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কম করে হলেও এক শ’ জোড়া ছেলেমেয়ে লিভ টুগেদার করছে। বিষয়টি তাদের কাছে ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ কাউকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। ওই শিক্ষার্থী লিভ টুগেদারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তার ভাষায় দু’জনের মতের মিলেই তারা লিভ টুগেদার করে। এখানে অপরাধ কিছু নেই। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক-শিক্ষিকা লিভ টুগেদার করছেন। তাদের লিভ টুগেদারের কথা জানে তাদের অনেক ছাত্রও। ওই শিক্ষকদের একজন তার এক নিকটজনের কাছে বলেছেন, লিভ টুগেদারকে তিনি বরং গর্বের বিষয় মনে করেন।
ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন, বর্তমানে বসবাস করছেন গুলশান এলাকায়। চাকরি করেন একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায়। এর আগে তার কর্মস্থল ছিল পাপুয়া নিউগিনিতে। তিন বছর ধরে ঢাকায় আছেন। লিভ টুগেদার করছেন তারই এক সহকর্মী নারীর সঙ্গে। ওই ভদ্রলোক এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দু’জনই বাংলাদেশী। তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং হয়। এখন বাংলাদেশে আছি, এক বছর পর অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। সে কারণে আমরা দু’জনই ঠিক করেছি লিভ টুগেদার করতে।

তাছাড়া, লিভ টুগেদারের ধারণা খারাপ নয়, আমরা কেউ কারও বোঝা নই, আইনি বন্ধনও নেই। কারও ভাল না লাগলে তিনি এক সঙ্গে না-ও থাকতে পারেন। এতে কোন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে এ প্রবণতার কিছু কারণ জানা গেছে। তাদের মতে, যে সব মেয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করে, নিজেদেরকে ইউরোপ-আমেরিকা বা দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা এখনই বিয়ে করে ছেলেমেয়ের ভার নিতে চায় না। সংসারের ঘানি টানতে চায় না। ওই সব মেয়ে নিজেদেরকে বিবাহিত বলে পরিচয় দিলে তাদের ক্যারিয়ার গড়তে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে। এমন অনেক ছেলেও আছে যারা ওই সব মেয়ের মতো ধারণা পোষণ করে না তারা কেবলমাত্র জৈবিক কারণে লিভ টুগেদার করছে। অর্থবিত্তে বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত এমন অনেকে লিভ টুগেদার করছে কেবলমাত্র সমাজে তার একজন সঙ্গীকে দেখানোর জন্য, নিজের একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায়। অনেকে বিয়ের প্রতি প্রচণ্ড রকম অনাগ্রহ থেকেও লিভ টুগেদার করছে। ঢাকা শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতির কন্যা ঢাকায় লিভ টুগেদার করছেন একজন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে। ওই শিল্পপতির কন্যার প্রথম বিয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংসার জীবনের পাট চুকিয়ে এখন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ব্যাপক হারে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের লিভ টুগদোর। ওয়েস্টার্ন সোসাইটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আবেগ ও অনুকরণের পাশাপাশি জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা লিভ টুগেদার করছেন। আবার ঘন ঘন তাদের লিভ টুগেদারে বিচ্ছেদও ঘটছে। সহসা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ঘটছে খুনের মতো অপরাধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে দশটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশি অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে ওইসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল লিভ টুগেদারের বিড়ম্বনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খুনের শিকার হয়েছে মেয়েরা। দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরা বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। এক পর্যায়ে মনোমালিন্য বা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তাকে খুন করে পালিয়েছে ছেলেটি। চলতি বছর জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় খুন হয় সুরাইয়া নামের এক যুবতী। তিনি চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। তাকে খুন করে বাসায় লাশ রেখে বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে চলে যায় যুবক সুমন রহমান। পরে জানা যায়, প্রায় বছর খানেক ধরে লিভ টুগেদার করতেন সুমন ও সুরাইয়া।

এপ্রিল মাসে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের শালবন এলাকায়। পুলিশ অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরা এলাকায় একটি বাড়িতে দুই-তিন বছর ধরে এক যুবকের সঙ্গে সে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া থাকতো। মে মাসে রাজধানীর গুলশান এলাকায় বাসার ভেতরে এক তরুণীকে খুন করে পালিয়ে যায় ঘাতক। তারাও ভাড়া থাকতো স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে। মে মাসে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে এক তরুণীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ওই তরুণী লিভ টুগেদার করতো তারই এক বন্ধুর সঙ্গে। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে মনোমালিন্য শুরু হয় তাদের মাঝে। শেষে মেয়েটিকে খুন করে পালিয়ে যায় বন্ধুটি। গত ১লা নভেম্বর রর‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় ম্যারেজ মিডিয়ার দুই পার্টনার। ফরিদপুর শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে একই শহরের আরেকটি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে লিভ টুগেদার করছে। পারভীন নামের মেয়ে ও আরিফ নামের ছেলেটি অকপটে স্বীকার করেছে তারা লিভ টুগেদার করছে এবং এক সঙ্গে ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসা করছে।

ঢাকাতে লিভ টুগেদার বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে নানা ধরনের মুভি সিনেমাডকুমেন্টারি আমাদের সমাজমানসে পাশ্চাত্য জীবনের নানা দিক প্রভাব ফেলছে, অনেকে সেটা গ্রহণ করছে। তার সঙ্গে আমাদের সমাজে ইন্ডিভিজ্যুয়াল বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের চিন্তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে লিভ টুগেদারের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়াও অনেক যুবক-যুবতী এখন ফ্যামিলিকে একটা বার্ডেন মনে করে, বিয়েকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্তরায় মনে করে। দেখা যাচ্ছে, এরা বিয়ের চেয়ে লিভ টুগেদারকে বেশি পছন্দ করছে। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও পাচ্ছে। তারা সুখে দুঃখে একজন আরেক জনের সঙ্গী হচ্ছে। মধ্যবিত্তদের লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে ওঠা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এখন বাড়ি ভাড়া একটি বড় সমস্যা। বাইরে থেকে পড়তে আসা বা চাকরি করতে আসা যুবক বা যুবতীকে বাড়ির মালিক আলাদা আলাদা বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সে ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক সঙ্গে থাকছেন, লিভ টুগেদার করছেন। এতে তাদের জৈবিক চাহিদাও মিটছে আবার সামাজিক নিরাপত্তাও থাকছে। আবার অনেক ছেলেমেয়ে মনে করছে লিভ টুগেদার করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা আবার অবিবাহিত পরিচয়ে সমাজে ফিরে যাবে যাতে সমাজে তাদের মর্যাদা ঠিক থাকে। তিনি বলেন, তবে এতে সমস্যা হচ্ছে সমাজে এক ধরনের ক্রাইম তৈরি হচ্ছে, কোন কারণে বনিবনা না হলে খুন হয়ে যাচ্ছে মেয়ে বা ছেলেটি।
http://allsharenews.com/

গাছের গুঁড়ির কান্না কষ্ট দেখে বিরহী বাতাস হুহু করছে, বেদনার্থ বৃষ্টি ঝরছে ঝির ঝির, শোকার্ত পাখি আতঙ্কে চলে যাচ্ছে নিরাপদ নগরে। বাতাস অভিশাপ দিচ্ছে, বৃক্ষ ঘৃণিত-ঘাতককে দেবে না অক্সিজেন।


মানুষ এতো নির্মম নিকৃষ্ট কেনো?

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

Beyond The Mango Juice

Beyond The Mango Juice

প্রবাসী জীবনে নানা কারণে মন খারাপ হয়। সত্যি কয়েকদিন যাবৎ মন খারাপ। ক’বছর পর এবার ঢাকায় ফিরে ধাক্কা খেয়েছি! একী হাল আমার প্রিয় শহরের! গোলাম মোর্তুজা উপস্থাপিত চ্যানেল আই-এর সংবাদপত্র প্রতিদিন অনুষ্ঠানে সেই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভিজে যাচ্ছিল।

দেশের একটি ভালো সংবাদ শুনলে মনটা যেমন আনন্দে ভরে উঠে! আর তেমনি মন্দ সংবাদে বিষণ্ণতা কাজ করে। গত বছর প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা বললেন, ‘একটি বাড়ি একটি খামার।’ হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই তাই। যদি আমরা আরো সচেতন এবং যত্নবান হই, তাহলে এই শ্লোগান বাস্তবায়ন করা মোটেও কঠিন নয়। কারণ, পরিবেশ নিয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক হয়েছে। সেই আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত এবং ছোঁয়া পাওয়া নানাভাবে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছিলেন, গাছেরও প্রাণ আছে। তাই তাদেরকেও খুন করা হয়। আর সেই খুনের কথা ভেবেই মনটা বিষণ্ণ। যদি সবুজ হত্যার তান্ডবের শাস্তি ৩ বছর এবং ৫০ হাজার অর্থ জরিমানার বিধান পাস হয়েছে। তা-ও মন তৃপ্তি পায় না।
এটিএন বাংলা অথবা এনটিভিতে গত ১৬ নভেম্বর খবরে দেখলাম, উত্তরাঞ্চলে রাতের আঁধারে উঠতি আমের বাগান কেটে সর্বনাশ করে দেয়া হয়েছে। শত শত গাছ ‘লাশ’ হয়ে উপুড় হয়ে মাথা থুবড়ে আছে। বেঁচে থাকলে দু’বছর পর ফলন দিতো।

কোনো মর্মান্তিক এই নিষ্ঠুরতা? মানুষ কেনো এতো নির্মম আর নিকৃষ্ট প্রাণী! এটা কীসের প্রতিহিংসা? এ প্রতিহিংসা ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক?

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

The mango is considered the king of fruits and the fruit of kings

রাজনৈতিক প্রশ্নটি এ জন্যই জাগলো যে, ওই বৃক্ষ হত্যার মাত্র একদিন আগেই আম গাছকে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা দেয়া হয়। ১৫ নভেম্বর ২০১০-এ মন্ত্রিসভার বৈঠকে কদম, তমাল, পলাশ, শিমুল, তাল, হিজলকে ছাড়িয়ে ‘আম গাছ’ জাতীয় মর্যাদায় স্বীকৃতি পেলো। যেমন জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় পাখি দোয়েল, তেমনি আম এখন জাতীয় বৃক্ষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর দৃষ্টান্ত আছে। উদাহরণ স্বরূপ- কানাডার মেপল, জাপানে শাকুরা, ভারতে বট, ভূটানে সাইপ্রেস, পাকিস্তানে সেড্রাস ডিওড়ব, লেবাননে সেডর, শ্রীলঙ্কার নাগেশ্বর, সৌদীতে খেঁজুর, কিউবায় রয়েল পাম, আয়ারল্যান্ডে ভূঁইচাপা সারিতে স্থান করে নিলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী আম গাছ। ( দ্র: দৈনিক আমার দেশ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)

নানাভাবে আম গাছকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ- মূল্যায়ণ করা হয়। যেমন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্তগামী হয়েছিল, আবার মেহেরপুর আম বাগানে ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠিত হয়ে উদিত হয়েছে আরেক সূর্য, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতেও আম গাছের উল্লেখ আছে, উল্লেখ আছে বাল্মিকীর রামায়ন, কালিদাসের মেঘ দূতসহ প্রচলিত ছড়ায়- ঝড়ের দিনে মামার বাড়ি আম কুড়াতে সুখ। এসব ঐতিহাসিক, সামাজিক বিবেচনায় স্বাধীনাতার ৩৯ বছর পর আজ আম গাছ স্বীকৃতি অর্জন করলো। দুঃখজনক হলেও, সত্য তার পরের দিনই আম গাছ নিহত হলো শত্রুর হাতে। মানুষ হয়ে আমরা মিলেমিশে থাকতে পারিনা, অথচ ‘আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাঁড় যেন। মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’ কবি বন্দে আলী মিয়ার এই পঙক্তি থেকে আমরা কী কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করবো না?

শুধু আম গাছের বেদনাই নয়, ঈদের পর পত্র-পত্রিকা নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলাম প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের দুঃসংবাদ!
যেমন: ক॥ ফের গাছ কাটছে জাবি প্রশাসন,
খ॥ ভালুকায় এক হাজার আকাশ মনি কর্তন,
গ॥ বিষ প্রয়োগে ২০০ কবুতর মৃত,
ঘ॥ সরকারি গাছ কেটে সাবাড় করেছে দুবৃর্ত্তরা,
ঙ॥ সুন্দরবনের বাঘ শিকার করছে দুবৃর্ত্তরা।

মন খারাপের মাত্রা কানাডার শীতের মতো বৃদ্ধি পেয়ে মাইনাসে চলে গেল।
প্রথম খবরটি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত সড়ক দ্বীপের ঝাঁউ-দেবদারুসহ ৩০ প্রজাতির গাছ ঈদের ছুটি ফাঁকে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে, কেটে ফেলা হয়েছে শহীদ মিনারে পাশের বট ও কড়ই গাছটিও! (দ্র: বাংলা নিউজ ২৪ ডটকম, ২১ নভেম্বর ২০১০)
‘বৃক্ষহত্যাকারী’ মাননীয় ভিসি শরীফ এনামুল কবির বলেছেন, গাছ নয়, আগাছা কেটেছি! বাহ কী চমৎকার বাজে কথা। তাঁর এক কথার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই।

...maybe global warming needed a simple solution!

...maybe global warming needed a simple solution!

দ্বিতীয় সংবাদটি উৎসস্থল ময়মনসিংহের ভালুকার নারাঙ্গী গ্রামে বিরোধপূর্ণ প্রতিহিংসায় প্রায় হাজার খানেক আকাশ মনি কেটে সাবার করে দিয়েছে প্রতিপক্ষের। (দ্র: গাছের দোষ কী?… দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২০ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা) অর্থাৎ বাড়া ভাতে ছাই। অপরদিকে যশোরের মনিরামপুরে বিভিন্ন সড়কের পাশের ৭ লক্ষ টাকার গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তেরা (দ্র: দৈনিক সমকাল, ২২ নভেম্বর, ২০১০, ঢাকা)।

অপর সংবাদটি বৃক্ষ নিয়ে নয়, গৃহপালিত পাখি, কবুতর নিয়ে। নওগাঁর রানী নগর গ্রামে এক ইমাম সাহেব সরিষার সাথে বিষ মিশিয়ে তা খেতে বপন করেছেন এবং তা খেয়ে ২০০ কবুতর গণহারে মারা গেছে। কিন্তু তিনি তা গ্রামবাসীকে পূর্বে অবহতি করেন নি। (দ্র: শীর্ষ নিউজ, ২১ নভেম্বর ২০১০, ঢাকা)। এখন বিশ্ব বাঘ সম্মেলন হচ্ছে। বাঘের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অপরদিকে প্রতিনিয়ত শিকার করে শেষ করা হচ্ছে বাঘ। এ সম্পর্কে নাইবা বললাম। মনে পড়লো,ছোটবেলার কথা। আমাদের গ্রামের আশে পাশে ফলন্ত তরতাজা বেগুন গাছ, সজিব মরিচ ক্ষেত রাতে দুবৃত্তরা কেটে সাবার করে দিতো। ভোর বেলা সেই মৃত বেগুন ক্ষেত দেখে মনটা হু হু করে উঠতো। সে তো পাকিস্তান আমলের কথা। এখন তো আমার সোনার বাংলা। সোনার দেশের মানুষেরা পশুর চেয়ে অধম হচ্ছে কেনো? সেই জন্যই কী রবি ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেছেন; রেখেছ বাঙালি করে/ মানুষ করো নি! আমরা কবে প্রকৃত মানুষ হবো?

আরো একটি বিষয় মনে পড়লো,একবার স্থানীয় দুর্বৃত্ত কসাই চামড়ার লোভে আমাদের দু’টো গরুকে রাতের আঁধারে গোয়ালঘরে বিষ মিশানো কাঠালপাতা খাইয়ে মেরে ফেলে। আমরা তা বুঝতে পেরে গরু দু’টো কসাইকে না দিয়ে, চামড়া কেটে কেটে মাটিতে পুতে রাখি। ২ বছর আগে সিলেটের শাহজালাল মাজারে পুকুরের পুরনো কচ্ছপ, শোল, গজার মাছগুলোও কে বা কারা বিষ প্রয়োগ করে মেরেছিল। এসব ঘটনার তো শেষ নেই। আরো পিছিয়ে গেলে দেখবো,স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসে মিন্টু রোডের এবং শের-এ বাংলা নগরের বিশাল বিশাল অপূর্ব সবুজতায় পূর্ণ পুরনো বৃক্ষগুলো কেটে সাবার করে দিয়ে ছিলেন। কথিত আছে এরশাদকে গাছ থেকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। তাই বৃক্ষ কর্তন উৎসব!

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

Lesser Kiskadee on Bird Vine growing on a mango tree

বৃক্ষের প্রতি দুর্বলতা আমার আজন্মের। তাই ‘একি কান্ড! পাতা নেই’ শীর্ষক পরিবেশ বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করি ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫-এ। এছাড়াও গাছ নিয়ে আমার অনেক কবিতা আছে। আমার মিরপুরস্থ বাসার ‘নীমগাছ এবং কাকবন্ধু’ (দ্র: নীড়ে, নীরুদ্দেশে, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৮, স্বরব্যঞ্জন, ঢাকা) এবং ‘নিমগাছ’ (দ্র: ঘৃণিত গৌরব, প্রকাশকাল এপ্রিল, ২০০৫ জাগৃতি প্রকাশনী,ঢাকা)-কবিতা দু’টো নানা কারণে আমার প্রিয় কবিতা।
আমি ২০০৪-এ ফ্রাস্কফোর্ট বইমেলা থেকে বার্লিন গেছি কবি দাউদ হায়দারের সাথে দেখা করার জন্য। তখন ঢাকায় আমার বাড়ি নির্মাণের কাছ চলছে। হঠাৎ মনে পড়লো, ডেভলপার গাছটি কেটে ফেলবে। আমি দ্রুত বার্লিন থেকে ফোন করে অনুরোধ করি, যেন নিমগাছটি না কাটা হয়। এখনো নীম গাছটি বেঁচে আছে।

হাসিনা সরকার যখন প্রথমবার ক্ষমতায়, তখন বন ও পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী ছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তাঁর প্রটোকল অফিসার হিসেবে কয়েক মাস কাজ করেছি। সে সময় সচিব ছিলেন আহবাব আহমদ। তিনি প্রায়ই আমার পরিবেশ বিষয়ক কবিতা আবৃত্তি করতেন, বলতেন-‘একদিন আমরা সবুজ ছেড়ে বাতাসের ওপারে চলে যাবো।’

হ্যাঁ, বৃক্ষ যে নির্মল বাতাস দিচ্ছে অর্থাৎ অক্সিজেন দিচ্ছে, তার জন্য কী আমাদের কিছুই করার নেই। জিয়া উদ্যান নামান্তরে চন্দ্রিমা উদ্যানের অনেকগুলো গাছ কেটে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। তখনও রাতের আঁধারে সবুজগাছের প্রাণ হরণ করা হয়েছিল। পরদিন প্রাত: ভ্রমণে গিয়ে মতি ভাই অর্থাৎ প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বৃষ্টি ভেজা সকালে করুন দৃশ্য দেখেন এবং পরদিন তাঁর দৈনিকে প্রথম পাতায় একটি মর্মস্পশী প্রতিবেদন লিখেছেন। যা আমাকেও স্পর্শ করে হৃদয়ে নাড়া দেয়। সেই সময় লিখেছিলাম ‘বৃক্ষ কর্তনের পঙক্তি’ শীর্ষক একটি কবিতা। কবিতাটি নিন্মরূপ-
বৃক্ষ কর্তনের শোকে বাতাসগুলো এলোমেলো, পাখিগুলোর মন খারাপ, ছায়াগুলো আর সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে হবে না লিলিপুট কিংবা গালিভার। চন্দ্রিমার স্বর্গীয় জোছনায় পরিরা এসে খুঁজে পাবে না মায়াবী রাত্রির ছায়ার স্নিগ্ধতা। বৃষ্টিগুলো বোনের মনের মতো, রোদগুলো ভাইয়ের মতো ‘ভাই-বোন’ খেলবে না পাতাগুলোর সাথে, সবুজ ছাতা হাতে। বাতাস, বৃষ্টি, পাখি, রোদ, ছায়াসমূহ, আর কখনো কানামাছি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুটের আনন্দে মাতবে না চন্দ্রিমা উদ্যান।

গাছের গুঁড়ির কান্না কষ্ট দেখে বিরহী বাতাস হুহু করছে, বেদনার্থ বৃষ্টি ঝরছে ঝির ঝির, শোকার্ত পাখি আতঙ্কে চলে যাচ্ছে নিরাপদ নগরে। বাতাস অভিশাপ দিচ্ছে, বৃক্ষ ঘৃণিত-ঘাতককে দেবে না অক্সিজেন। আজ আর কবিতায় নয়। আজকের কন্ঠের প্রতিফলন ঘটালাম এই সামান্য গদ্যটির মাধ্যমে। লেখাটির সমাপ্তি টানার পূর্বে শুধু একটি প্রশ্ন করতে চাই- রাজশাহীর আম গাছ হত্যাকারীকে নয় বা ভালুকার আকাশমনির খুনীকে নয়, অথবা নওগাঁর কবুতর নিধনকারীকে নয়, প্রশ্নটি শুধু মাননীয় জাবির উপাচার্যকে- স্যার, আপনি কী ভাবে রাতের আঁধারে নিষ্ঠুরভাবে খুন করলেন গাছগুলোকে ?
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল (কানাডা থেকে)

Saifullah Mahmud Dulal

Saifullah Mahmud Dulal

God has cared for these trees, saved them from drought, disease, avalanches, and a thousand tempests and floods. But he cannot save them from fools ~ John Muir আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?


রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক