‘আমাদের অক্ষমতা আমাদের জীবনকে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ব্যর্থ করে দিয়েছে। পরের ভালো দেখলে তাই আমরা কষ্ট পাই, বিষণ্ন হয়ে পড়ি। অক্ষম মানুষ সাধারণত ব্যর্থ হয়, ব্যর্থ মানুষ হয় পরশ্রীকাতর। পরশ্রীকাতরতা তাই আমাদের জীবনের সার্বভৌম অধীশ্বর।


ঢোলকলমি সাংবাদিকতার এই দেশে

আযম মীর

বাংলাদেশের বিল, ঝিল, পুকুর বা ডোবার পাড়ে ঢোলকলমি নামের দ্রুত বর্ধনশীল এক ধরনের গাছ জন্মে। শিকড় থেকে গাছের শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করে বলে পানি বাড়ার সাথে সাথে দ্রুত গাছও বাড়ে। কিছুটা ঝোপজাতীয় গাছ হওয়ায় মাটির ক্ষয় রোধে ঢোলকলমি বেশ সহায়ক। এ জন্য পুকুরের পাড় ভাঙা রোধ করতে অনেকেই ঢোলকলমির চারা লাগান। দ্রুত বর্ধনশীল বলে এ ঝোপ মাঝেমধ্যেই সাফ করে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার কয়েক দিনের মধ্যে শিকড় থেকে গাছ জন্মে নতুন কের ঝোপঝাড়ের সৃষ্টি হয়। জলজ উদ্ভিদ হওয়ায় নানারকম কীটপতঙ্গ ঢোলকলমির ঝোপে বাস করাটাই স্বাভাবিক। তবে কিম্ভূতকিমাকার দর্শন গায়ে কাঁটাওয়ালা ছোট একটি পোকা এ গাছের পাতায় দেখা যায়। সম্ভবত গাছের পাতা বা রস খেয়ে পোকাটি জীবন ধারণ করে থাকে।

আশির দশকের শেষ দিকে সে সময়ের একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে খবর বের হলো, ঢোলকলমি পোকার কামড়ে মানিকগঞ্জের এক গ্রামে এক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন। ঠিক দু’দিন পর অন্য এক জেলায় একইভাব আরেকজনের মৃতুø হয়েছে বলে ওই কাগজে খবর বের হয়। ব্যস এরপর থেকে ঢাকার প্রায় সব ক’টি দৈনিকে ঢোলকলমি পোকার কামড়ে একের পর এক মৃতুø সংবাদ প্রকাশ হতে লাগল প্রতিযোগিতা করে। দেশজুড়ে শুরু হলো ঢোলকলমি পোকার আতঙ্ক। যারা কোনো দিন ঢোলকলমি গাছ দেখেনি তারাও জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল। পত্রপত্রিকায় ঢোলকলমিবিষয়ক নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হতে লাগল। আতঙ্ক এতটাই ব্যাপকতা লাভ করে যে, গ্রাম-শহর সর্বত্রই ঢোলকলমি নিধনযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। বলা যায়, কয়েক দিনের মধ্যেই শিকড়বাকড়সহ ঢোলকলমি নামক উদ্ভিদটি দেশ থেকে এক প্রকার বিদায় নিলো।

ঢোলকলমি নিয়ে এ হই চই দেখে কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞরা নড়েচড়ে বসলেন। অনুসন্ধান করে দেখা গেল ঢোলকলমি পোকা বলে যে কীটকে প্রাণঘাতী বলে প্রচার করা হয়েছে, তা আদৌ প্রাণঘাতী তো নয়ই, তার কোনো বিষই নেই। এটি দেখতে শুধু কদাকার এই যা। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য পত্রিকায় ছাপার পরও পরিস্থিতির খুব পরিবর্তন হলো না। অবশেষে সে সময়ের কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক গিয়াসউদ্দিন মিলকী (মরহুম) একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। এতে ঢোলকলমি গাছ এবং কথিত পোকাটি দেখানো হলো। পোকাটি যে নেহাতই নিরীহ তার যে কোনো বিষ নেই তা প্রমাণের জন্য মিলকী ও ওই বিশেষজ্ঞ নিজেদের হাতে কয়েকটি পোকা ছেড়ে দিয়ে দেখান। তারা দিব্যি বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দংশনের চেষ্টামাত্র করেনি। এ অনুষ্ঠানটি বেশ কয়েকবার প্রচার করা হয় টিভিতে। এরপর হঠাৎ করেই ঢোলকলমি পোকার দংশনে মৃতুø গুজব বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনাটি নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল আমাদের সাংবাদিকতার মান নিয়ে। এরকম দায়িত্বহীন সাংবাদিকতাকে তখন ঢোলকলমি সাংবাদিকতা বলে কেউ কেউ আখ্যাও দিয়েছিলেন।

শুধু ঢোলকলমি পোকার কামড়ে মৃতুøর গুজবই নয়, ঝিনঝিনা রোগ ও জিনের আসরে মৃতুøর সংবাদ নিয়েও তোলপাড়ের ঘটনা নিশ্চয়ই অনেকের মনে থাকার কথা। আসল ঘটনা তলিয়ে দেখার আগেই সেনসেশন সৃষ্টির জন্য খবর বলে প্রচারের প্রবণতা এ দেশে আজো আছে। চিলে কান নিয়ে গেল রব উঠলে কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছু ধাওয়া করা বাঙালির স্বভাবজাত। একটু তলিয়ে দেখার ধৈর্যটুকু আমাদের নেই। এ প্রবণতা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সমান ক্রিয়াশীল। নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসকে নিয়ে সম্প্রতি যা হয়ে গেল তা ওই ঢোলকলমি সাংবাদিকতারই আরেক রূপ বললে কি বেশি বলা হবে?

৩০ নভেম্বর ঢাকার দু’টি অনলাইন নিউজ এজেন্সি খবর প্রচার করে, নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন-এনআরকে ‘ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করেছে। ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৯৮ সালে নোরাডসহ কয়েকটি সাহায্যদাতা সংস্থা থেকে পাওয়া সাহায্যের অর্থ ড. ইউনূসের অপর একটি সংস্থায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। গ্রামীণ কল্যাণ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে বিপুল অঙ্কের অর্থ সরিয়ে নিয়ে ড. ইউনূস অনিয়ম করেছেন। ডেনমার্কের একজন অনুসন্ধানী রিপোর্টার এ প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা। পরদিন অনলাইনের ওই সংবাদ সূত্রে ঢাকার কয়েকটি দৈনিক প্রধান শিরোনাম করে। ‘ইউনূসের কেলেঙ্কারি’ ছিল একটি কাগজের শিরোনাম। অন্য কাগজগুলোর শিরোনামও ছিল প্রায় একই রকম। এরপর শুরু হয়ে যায় প্রফেসর ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে লেখালেখির ঝড়। প্রফেসর ইউনূসের দুর্নীতি, গ্রামীণ ব্যাংকের শোষণ, ঋণগ্রহীতাদের নিপীড়ন, এমনকি ড. ইউনূসের চরিত্র নিয়ে নানারকম লেখায় পরের কিছু দিন সংবাদপত্রগুলো ছিল ভরা। টেলিভিশনগুলোর টকশোতে প্রধান আলোচনার বিষয় গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র মাহবুব উল আলম হানিফ এ সম্পর্কে প্রথম বিরূপ মন্তব্য করেন। তিনি সিলেটে সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ইউনূস যে দুর্নীতিবাজ তা আবারো প্রমাণিত হলো। আবার তিনি এ কথাও বলেন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুর্নীতিবাজ প্রমাণিত হওয়ার পর আবার তদন্ত কেন দরকার তার অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা দেননি। এরপর ছাত্রলীগ ঘোষণা দেয় ইউনূসের নোবেল পুরস্কার কেড়ে নিয়ে তা যোগ্য অন্য কাউকে দিতে। অবশ্য যোগ্য ব্যক্তিটির নাম তারা বলেনি। ইউনূস সম্পর্কে যখন সংবাদপত্রে খবর বের হয়, প্রধানমন্ত্রী তখন ১২ দিনের বিদেশ সফরে ছিলেন। দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গরিবের রক্ত চুষে খেলে একদিন না একদিন ধরা খেতেই হয়।’ তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্যান্য এনজিও’র বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র ঋণের নামে গরিব মানুষকে শোষণের কথাও বলেন। প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্যের বিষয়টি বাংলাদেশে তো বটেই গোটা বিশ্বে অন্যতম সংবাদ শিরোনাম হয়। ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নায়ক নোবেল বিজয়ী নিজ দেশের সরকারের প্রধানের চোখে রক্তচোষা’ ধরনের শিরোনাম করেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদপত্র। দেশে-বিদেশে ড. ইউনূস যখন প্রতিদিন সংবাদের শিরোনাম হ্‌িচ্ছলেন, তিনি তখন দেশের বাইরে। সামাজিক ব্যবসায় নামক নতুন এক ধারণার প্রচার নিয়ে তিনি ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যে দিন প্রকাশিত হয়, সে দিনই কোনো কোনো কাগজে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাথে তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি ছাপা হয়েছে।

গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিও’র ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম দারিদ্র্য কমাচ্ছে কি না তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের। ড. ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তি নিয়েও অনেকে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তার পরও তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এ আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে এনেছেন। বহু দেশে বাংলাদেশের নামটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে এই নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির মাধ্যমে। গ্রামীণ ব্যাংক কিংবা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে হয়তো আরো বহু বছর বিতর্ক হবে। এমনো হতে পারে, কালের পরিক্রমায় এ এনজিও কার্যক্রম হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু একজন ইউনূস যে বাংলাদেশের জন্য প্রথম নোবেল পুরস্কার নিয়ে এসেছেন তা কি ইতিহাস থেকে মুছে যাবে? অথচ ইউনূস জীবিত থাকতেই আমরা তাকে কালিমালিপ্ত করে দিলাম। তাকে অর্থ আত্মসাৎকারী বলে প্রচার করলাম। বিদেশী একজন সাংবাদিকের তৈরি করা তথ্যচিত্রের সত্যাসত্য যাচাই করার গরজটুকুও বোধ করলাম না।

তেরো বছর আগে নরওয়ের সাহায্য সংস্থা নোরাডের সাহায্য নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে তথ্যচিত্রে, খোদ নোরাডই বলেছে বিষয়টির সাথে দুর্নীতি নয়, নীতিগত প্রশ্ন জড়িত ছিল। যার নিষ্পত্তি সে সময়ই হয়ে গেছে।

এ ঘটনা যখন ঘটে, আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকও তা জানত। এত বড় অন্যায় হয়ে থাকলে সে সময় তদন্ত না করার দায় তো তাদের ওপরও বর্তায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এক বিবৃতিতে ড. ইউনূসও তদন্ত করার দাবি করেছেন। সেই তদন্ত হবে কি না দেশবাসী জানে না। তদন্ত হলে ড. ইউনূস দোষী সাব্যস্ত হবেন কি না তাও আগাম বলা যায় না। তবে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস ও তার দেশ বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর যে নেতিবাচক ধারণা জন্মালো তা দূর হবে না সহজেই। এ দেশের ভালো খবর খুব কমই প্রচারিত হয়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারো কি প্রমাণিত হলো না, ‘আমরা হুজুগে বাঙ্গাল’। কিংবা নিরোদ চন্দ্র চৌধুরীর পর্যালোচনায় যেমন আছে ‘আত্মঘাতী বাঙালি’। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার সংগঠন ও বাঙালি বইয়ে আমাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, ‘আমাদের অক্ষমতা আমাদের জীবনকে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ব্যর্থ করে দিয়েছে। পরের ভালো দেখলে তাই আমরা কষ্ট পাই, বিষণ্ন হয়ে পড়ি। অক্ষম মানুষ সাধারণত ব্যর্থ হয়, ব্যর্থ মানুষ হয় পরশ্রীকাতর। পরশ্রীকাতরতা তাই আমাদের জীবনের সার্বভৌম অধীশ্বর। অক্ষমতার কারণেই আমরা এমন নেতিবাচক। আমরা যে পরিমাণ নিষ্ফল, সেই পরিমাণেই নিন্দুক। নিন্দার ভেতর দিয়ে নিজেদের অক্ষমতার প্রায়শ্চিত্ত খুঁজি।’ কে জানে বাঙালির এই পরশ্রীকাতর ও আত্মঘাতী আচার-আচরণ দেখেই হয়তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ খেদ করে লিখে গেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালী করে মানুষ করোনি।’



Caught in Micro-Debt part 1 Original Documentary




সিএজি রিপোর্টের হিসাবে ভারতের লাইসেন্স মূল্যের ১০ ভাগেরও কম মূল্যে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে।


ভারতের টেলিকম কেলেঙ্কারি ও বাংলাদেশ
মোস্তাফা ইলিয়াস ”ওরু কিলো আরিসি ওরু রুপা, ওরু  হ্যালো ৫০ পয়সা” অর্থাৎ ”এক কেজি চাল এক রুপিতে, একটা হ্যালো ৫০ পয়সায়”-এই ছিল ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের তথাকথিত দলিত নেতা আন্ডিমুথু রাজার নির্বাচনী স্লোগান। আর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য জনগণকে কম পয়সায় কথা বলার সুযোগ করে দিতেই নাকি রাজা সাহেবকে করপোরেটদের কাছে অতিসস্তায় দুই জি লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম বিক্রি করতে হয়েছিল! তামিলনাড়ুর ডিএমকে পার্টির এই দলিত নেতা এখন ভারতের সর্ববৃহৎ আর্থিক ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির বলির পাঁঠা। তবে ভারতের কম্পোট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) বা মহাহিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক বিভাগের রিপোর্টে টেলিকম সেক্টরে ভারতের ইতিহাসের এই বৃহত্তম দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকে মনমোহন সিংয়ের দিকে আঙুল উঠানোর পর কংগ্রেস ও ইউপিএ সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য ১৪ নভেম্বর, ২০১০ রাজা সাহেবকে তার টেলিকম রাজ্য ত্যাগ করতো হলো।

মূল অভিযোগ : সিএজির রিপোর্টে টেলিকম মন্ত্রণালয় ও ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমের (ডিওটি) বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো সংক্ষেপে এ রকম :

১. টেলিকম লাইসেন্স ও ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বদলে ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। নতুন ১২২টি কোম্পানির মধ্যে ৮৫টির লাইসেন্স পাওয়ার কোনো যোগ্যতা ছিল না বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তদন্ত কমিটি।

২. ২০০৮ সালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের সময় দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণের বদলে লাইসেন্সের দাম ধরা হয়েছে ২০০১ সালের হারে। নতুন লাইসেন্স ছাড়াও পুরনো ১৩টি অপারেটরকে বাড়তি ফ্রিকোয়েন্সি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ২০০১ সালের হারে ফি নেওয়া হয়েছে।

সিএজির রিপোর্ট অনুসারে ২০০১ সালের হারে লাইসেন্স বিক্রির জন্য ভারত সরকারের ক্ষতি হয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি রুপি আর লাভ হয়েছে রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্স, টাটা টেলিসার্ভিসেস, শ্যাম টেলিলিঙ্ক, ইউনিনর, লুপ টেলিকম, এস-টেল, ডাটাকম (বর্তমানের ভিডিওকন), আলিয়ান্স ইনফ্রাটেক (যা পরবর্তীতে ডিবি-এটিসালাতের সঙ্গে একীভূত হয়েছে), সোয়ান টেলিকম ইত্যাদি দেশী-বিদেশী করপোরেট কোম্পানির। এই হলো রাজা সাহেব প্রতিশ্রুত ৫০ পয়সায় একটা হ্যালোর প্রকৃত মূল্য!

করপোরেট বলির পাঁঠা : এখন এসব অভিযোগে শুধু রাজাকে পদত্যাগ করানোর মধ্য দিয়েই কংগ্রেস ও মনমোহন সিং রক্ষা পেতে চাইছেন। এই দুর্নীতির অভিযোগটি কিন্তু আজকের নয়, এটি প্রথম ওঠে ২০০৮ সালে লাইসেন্স দেওয়ার পরপরই। রাজা তখন টেলিকমমন্ত্রী। এ সময় যখন ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে ১২২টি কোম্পানিকে নতুন লাইসেন্স ও ৩৫টি পুরনো অপারেটর কোম্পানিকে ডুয়েল টেকনোলজি (জিএসএম ও সিডিএমএ) লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হলো, তখন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, এক বছর আগেই ভারতের ইনকামট্যাক্স বিভাগ থেকে রাজার সঙ্গে ভারতের কুখ্যাত করপোরেট লবিইস্ট নিরা রাদিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য করপোরেট যেমন রতন টাটা, করপোরেট মিডিয়ার সাংবাদিক ভির সাংভি বা বারখা দত্তের কথোপকথনের একটি টেপ সিবিআইর কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। সেইসঙ্গে এই টেপের কপি মনমোহন ও সোনিয়া গান্ধীসহ আরো অনেক রথি-মহারথির কাছেও পাঠানো হয়েছিল বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তখন এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো ভারতের টেলিকম সেক্টরে বিপ্লব ঘটানোর জন্য আন্ডিমুথু রাজাকে ২০০৯ সালের নতুন মন্ত্রিসভায় আবারো টেলিকম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের নভেম্বরে জনতা পার্টির চেয়ারম্যান সুব্রামনিয়াম স্বামী টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সে অনুমতি প্রদান করেননি। এখন যখন সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে মনমোহন সিংকে কারণ দর্শাতে বলেছেন (২৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে নির্দোষ দাবি করে তার পক্ষ থেকে একটি এফিডেভিট দাখিল করা হয়েছে), যখন সংসদে উপস্থাপনের জন্য তৈরি কম্পোট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) তদন্ত রিপোর্ট ইন্টারনেট ও মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে গেছে এবং কথোপকথনের টেপের কপি আদালতেও জমা দেওয়া হয়েছে, তখন সবকিছু ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কেবল টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজাকেই পদত্যাগ করানো হলো!

স্পেকট্রাম লুট, বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত : বাংলাদেশেও মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর কাছে বিটিআরসি কর্তৃক লাইসেন্স বিক্রির প্রক্রিয়া, লাইসেন্স ও ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রামের মূল্য, সরকারের প্রাপ্য ট্যাক্সের হার ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব কোম্পানিকে শুরুতে নামমাত্র মূল্যে লাইসেন্স ও ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ঠিক কোন নীতিমালার ভিত্তিতে এবং কি কি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তখন কত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটা কখনই জনগণের সামনে পরিষ্কার করা হয়নি। এ ছাড়া এসব নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো তদন্তও হয়নি। ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সিটিসেলের ১৫ বছর মেয়াদি লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবে। জানা গেছে, এ চার বেসরকারি মোবাইল অপারেটরের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) প্রক্রিয়াধীন। বিটিআরসির কাজ শেষ হওয়ার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় তা বিবেচনা করে দেখবে। তা ছাড়া এসব কোম্পানির কাছে সামনে তিন জি (তৃতীয় প্রজন্ম) লাইসেন্সও বিক্রির কথাবার্তা চলছে। পত্রপত্রিকা মারফত জানা গেছে, লাইসেন্স নবায়ন নীতিমালায় প্রতিবছরের জন্য লাইসেন্স নবায়ন ফি মাত্র পাঁচ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং প্রতি সাড়ে সাত বছরের জন্য ফ্রিকোয়েন্সির ফি ধরা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা করে। (সূত্র : সমকাল ১৯ সেপ্টম্বর, ২০১০) ভারতের সাম্প্রতিক টেলিকম কেলেঙ্কারির বেলায় আমরা দেখি, ভারতকে মোট ২৩টি ইউনিফাইড সার্ভিস এরিয়ায় (ইউএসএ) ভাগ করে প্রতিটি এরিয়ার জন্য ২০০১ সালের হারে প্রতিটি লাইসেন্স (৪.৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামসহ) ফি রাখা হয়েছিল ২০ বছরের জন্য এক হাজার ৬৫৮ কোটি রুপি করে। কিন্তু সিএজি রিপোর্ট এটিকে বর্তমান বাজারদর হিসেবে কয়েকগুণ অবমূল্যায়িত বলে আখ্যায়িত করে। রিপোর্টটিতে ভারতের বাজারে মোবাইল টেলিকম লাইসেন্সের বর্তমান সম্ভাব্য মূল্য হিসেবে সাত হাজার ৭৫৮ কোটি থেকে নয় হাজার ১০০ কোটি রুপি অর্থাৎ  ১২ হাজার ২৫ কোটি থেকে ১৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা ধরা হয়। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত লাইসেন্স নবায়ন ও স্পেকট্রাম ফি ধরলে প্রতি ২০ বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়ন ও ৪.৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের খরচ দাঁড়াবে (৫০ কোটি + ১১৭৩ কোটি) অর্থাৎ এক হাজার ২২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সিএজি রিপোর্টের হিসাবে ভারতের লাইসেন্স মূল্যের ১০ ভাগেরও কম মূল্যে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে।

টেলিকম সেক্টর বেসরকারিকরণ ও লুটপাট : ভারত ১৯৯৪ সালে জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিমালার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে টেলিকম সেক্টর বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রাম দেশী-বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যায়। বেসরকারিকরণের পর থেকে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র কর্তৃক দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের স্বার্থে কাজ করার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম টেলিকম সেক্টর বেসরকারিকরণ শুরু করে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিকম (প্রাইভেট) লিমিটেড বা বিটিএলকে লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে এ কাজটি শুরু হয়। বাংলাদেশ এরপর আরো পাঁচটি লাইসেন্স দিয়েছে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিকে। সবার লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া, লাইসেন্স ফি, সরকারের সঙ্গে রেভিনিউ ভাগাভাগির হার, ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, কামরুল আলম এবং কেন কগহিলের ‘পলিটিক্স, একুমুলেশন অ্যান্ড মোবাইল ফোন লাইসেন্সিং-এন আনটোল্ড স্টোরি’ নামের গবেষণাপত্রে নিম্নোক্ত অস্বচ্ছ ব্যবস্থা ও দুর্নীতিগুলোর কথা উঠে এসেছে : (Politics, Accumulation and Mobile phone licensing- an untold story by Mohammad Abu Yusuf, Quamrul Alam & Coghil, http://www.buseco.monash.edu.au/mgt/research/working-papers/2010/wp3-10.pdf
[1])

এক. ১৯৮৯ সালে বিটিএলের লাইসেন্স দেওয়া হয় কোনো ধরনের নীতিমালা ও বিডিং ছাড়াই। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন সেনাশাসক তখন তার সঙ্গে বিটিএলের মালিক শাজাত আলির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ওই সময়ে তিনি লাইসেন্স পান। পরবর্তীতে Hutchison এর সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে এর নাম হয় এইচবিটিএল। এরশাদের পতনের পর বিএনপি সরকারের সময় ১৯৯৩ সালে এইচবিটিএলকে মোবাইল টেলিকম অপারেশনের লাইসেন্স মোরশেদ খানের প্যাসিফিক টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেডকে (পিবিটিএল) হস্তান্তর করা হয় এবং সেই সময় থেকে কোম্পানিটি সিটিসেল ব্র্যান্ড নাম নিয়ে ব্যবসা করছে।

দুই. ১৯৯৫ সালে বিডিং আহবান করে ১৯৯৬ সালের দিকে আরো তিনটি কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এগুলো হলো টেলিকম মালয়েশিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড (ব্র্যান্ড নাম প্রথমে একটেল, বর্তমানে রবি), সেবা টেলিকম প্রাইভেট লিমিটেড (বর্তমানের বাংলালিংক) ও গ্রামীণফোন। এই লাইসেন্সগুলো বিডিংয়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হলেও লাইসেন্স গাইডলাইন বা পলিসি প্রকাশ করা হয়নি, কোন কোন মানদন্ডের মাধ্যমে বিডিংয়ে কোম্পানিগুলো যোগ্য বলে বিবেচিত হলো সেটাও অস্বচ্ছ, লাইসেন্স ফি ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

তিন. রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটকের যাত্রার শুরুতে বাধা দেওয়া এবং পরে বিভিন্নভাবে বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানিগুলোর স্বার্থে টেলিটককে দুর্বল রাখার অভিযোগ আছে। টেলিটকের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০১-০২ সালে। কিন্তু তিন-চার বছর চেষ্টার পর তৃতীয়বারের মাথায় টেলিটককে লাইসেন্স দেওয়া হয়। বর্তমানে ইচ্ছাকৃতভাবে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে না দেওয়া, অর্থায়ন ও যন্ত্রপাতি কেনায় বিলম্ব এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ আছে।

চার. সর্বশেষ ২০০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ষষ্ঠ মোবাইল অপারেটর ওয়ারিদকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে পানির দরে। মাত্র পাঁচ কোটি ডলারের বিনিময়ে কোনো ধরনের বিডিং ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কোম্পানিটিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। এই লাইসেন্সের জন্য ওয়ারিদকে খরচ করতে হয়েছিল মাত্র এক কোটি ৫০ লাখ ডলার – যা তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ভাগাভাগি হয় বলে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে সরকারকে লাইসেন্স হস্তান্তর ফি কম দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ওয়ারিদের মূল্য মাত্র এক কোটি টাকা দেখিয়ে ভারতীয় টেলিকম জায়ান্ট ভারতী এয়ারটেল মাত্র ৭০ লাখ টাকা বা এক লাখ ডলারের বিনিময়ে ওয়ারিদ টেলিকমের ৭০ ভাগ শেয়ার কিনে নিয়েছে।

আমরা মনে করি, এ অবস্থায় ভারতের মতো বাংলাদেশেও বেসরকারি ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে মোবাইল টেলিকম লাইসেন্স বরাদ্দের যৌক্তিকতা, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া, দেশীয় কোম্পানি টেলিটককে দুর্বল ও অকার্যকর করে রাখা, লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া, মূল্য নির্ধারণ, সস্তায় ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং লুটপাট, ইত্যাদি বিষয়ে শক্তিশালী তদন্ত হওয়া দরকার। বাংলাদেশেও ভারতের মতো অস্বচ্ছ ও দুর্নীতির ঘটনাবলি ঘটেছে কি না সে বিষয় তদন্ত হওয়া জরুরি।

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছে মানুষ স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতিতে বাড়ছে ঝুঁকি


বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছে মানুষ
স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

রাজু আহমেদ ॥ গত অর্থবছরে কালো টাকার শর্তহীন বিনিয়োগের সুযোগ, গ্যাস-বিদ্যুত সঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়া এবং ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমে যাওয়ায় গত বিনিয়োগের বিকল্প ক্ষেত্রে হিসেবে পুঁজিবাজারকে বেছে নিচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসছেন। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তারল্য। এ কারণেই মার্জিন ঋণ এবং সমন্বয় (নেটিং) সুবিধা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করার পরও পুঁজিবাজারের শেয়ারের অতি মূল্যায়ন রোধ করা হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিশ্লেষকদের উদ্বেগ সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে অধিকাংশ শেয়ারের দর। আগের সপ্তাহে মাত্র একদিন সামান্য কমার পর আবারও ছুটে চলেছে শেয়ারবাজারের পাগলা ঘোড়া।

দুই কার্যদিবসেই ১২৫ পয়েন্টের বেশি বেড়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক। এর আগের সপ্তাহে সূচক বেড়েছে ১২২ পয়েন্ট। স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই শেয়ারবাজারের এই উর্ধমুখী প্রবণতাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বিভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সেই তুলনায় শেয়ারের সরবরাহ বাড়ায় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর। এ অবস্থায় শেয়ারের যোগান বাড়ানোকেই বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে বড় উপায় বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, দেশের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রায় স্থবির হয়ে থাকায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে শেয়ারের চাহিদা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এর বিপরীতে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ছে না। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে ঋণ সঙ্কোচন করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দু’বছরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে কালো টাকার সাদা করার শর্তহীন সুযোগ গ্রহণ করে গত অর্থবছরে অনেকেই বিপুল পরিমাণ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। কারণ অন্যান্য খাতের চেয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগে ঝামেলা কম, মুনাফার সুযোগ বেশি। পাশাপাশি বিদু্যত ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে শিল্প খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকেই শেয়ারবাজারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। একই কারণে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে। এসব কারণেই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে শেয়ারবাজারের লেনদেন।

সব দিক থেকেই দেশের পুঁজিবাজার এখন যে কোন সময়ের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ১৯৯৬ সালে যখন শেয়ারবাজার নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে, তখন ডিএসই বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বাজার মূলধনের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে_ যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৬ শতাংশ। মোট বাজার মূলধনের এক-তৃতীয়াংশ ধরা হলেও সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এদিকে যৌক্তিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও বাজারের অস্বাভাবিক উর্ধগতি থামাতে কার্যকর পদৰেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ কারণেই তারল্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে স্বাভাবিক সংশোধনের চেষ্টা করছে এসইসি। এর অংশ হিসেবেই মার্জিন ঋণ প্রদানের ৰেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এর আগে মার্জিন ঋণের হার কমানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছে একক গ্রাহকের জন্য ঋণ প্রদানের সর্বোচ্চ সীমা। কারণ বড় বিনিয়োগকারীদের নেয়া বিপুল পরিমাণ মার্জিন ঋণ বাজারে তারল্য বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে এসইসি। তবে বাজার বিশেস্নষকরা মনে করেন, গত দেড় বছরে নানা উৎস থেকে স্রোতের মতো টাকা ঢুকলেও এর সঙ্গে পালস্না দিয়ে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণেই পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উর্ধমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দর কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখছেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। একের পর এক পদৰেপ নিয়েও বাজারের রাশ টানতে ব্যর্থ হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে ওঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানানত্মর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো সবচেয়ে জরম্নরী হয়ে পড়েছে। চাহিদা ও যোগানের এই অসামঞ্জস্যতা কমাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে না পারলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে বলে বিশেস্নষকরা মনে করেন। তাঁদের মতে, শক্তিশালী পুঁজিবাজারকে দেশের উৎপাদনমুখী খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশে কীভাবে কাজে লাগানো যায়_ সরকারের দিক থেকে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এজন্য বিদু্যত, গ্যাসসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সরবরাহের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে_ তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারে যে হারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে সেই তুলনায় নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এর ফলে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

অনাকাঙ্ৰিত পরিস্থিতি এড়াতে এখনই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে নতুন নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে হবে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২৬টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করা হলে শেয়ারবাজারে বিপুলসংখ্যক শেয়ার যুক্ত হবে_ যা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নতুন বিদু্যত কেন্দ্রসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হলে একদিকে ভাল শেয়ারের যোগান বাড়বে, অন্যদিকে উন্নয়নে পরনির্ভরশীলতা কমবে।

ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজারে চাহিদা অনুযায়ী ভাল শেয়ারের সরবরাহ নেই। ফলে অনেক শেয়ারই অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। বিদু্যত, গ্যাসসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্পখাতকে শক্তিশালী করতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সরবরাহের প্রক্রিয়া গতিশীল করতে হবে। এৰেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে_ তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফ খানের মতে, চাহিদা অনুযায়ী শেয়ারের সরবরাহ না থাকার কারণে দেশের শেয়ারবাজারে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারের দর বাড়ছে। এই অবস্থায় শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শেয়ারের যোগান বাড়াতে হবে। সেৰেত্রে সরকার পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে একদিকে উন্নয়ন কাজে অর্থায়ন সহজ হবে, অন্যদিকে ভাল শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবীর ভুঁইয়া বলেন, বাজারে শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি কমিশনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। কমিশনের কাছে কোন আইপিও আবেদন এলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তবে এসব অনুমোদন দেয়ার ৰেত্রে আইন ও বিধি-বিধান মেনে কাজ করতে হয়। শেয়ারবাজার থেকে কোন কোম্পানি অর্থ সংগ্রহ করতে চাইলে অবশ্যই তাকে এগুলো মানতে হবে।

আট মাস ধরে স্পট মার্কেটে গ্রামীণফোন ও ম্যারিকো : পাবলিক মার্কেটের শেয়ার বিক্রি করে স্পট মার্কেটের শেয়ার কিনতে চাইলে বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষা করতে হয় ৪ থেকে ১০ দিন


আট মাস ধরে স্পট মার্কেটে গ্রামীণফোন ও ম্যারিকো
সমকাল প্রতিবেদক
শেয়ারবাজারের এক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী চট্টগ্রামের সুবিনয় সাহা। নিজের সব পুঁজি আর সমপরিমাণ ঋণ নিয়ে চলতি বছরের গোড়ার দিকে গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। এর কয়েকদিন পরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নির্দেশে কোম্পানিটিকে পাবলিক মার্কেট নামের সাধারণ বাজার থেকে স্পট মার্কেট নামের নগদ বাজারে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনাচক্রে তারপর থেকেই বাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ক্রমাগত কমছে। শেয়ারের টানা দাম বাড়ার কারণে কোম্পানিটিকে স্পট মার্কেটে সরিয়ে নেওয়া হলেও এসইসির নির্দেশনার পর এর শেয়ারের ৪০ শতাংশ দর হারানো সত্ত্বেও একে আর মূল বাজারে ফিরিয়ে আনা হয়নি। বাজারে শেয়ারের দাম যতই কমেছে ততই কমেছে ঋণের বিপরীতে সুবিনয়ের নিজস্ব মূলধন। বাধ্যতামূলক বিক্রি (ফোর্সড সেল) এড়াতে তিনি সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংকে একাধিক দফায় বাড়তি অর্থ জমা দিয়েছেন। শেয়ারের দাম আরেকটু কমলে নতুন করে বাড়তি টাকা জমা দেওয়ার মতো আর কোনো অবস্থা নেই তার। কখন মার্চেন্ট ব্যাংক সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে ঋণ সমন্বয় করে নেয় এমন ভয়ে দিন কাটছে।

সুবিনয় সাহার মতোই এমন উদ্বেগ-আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো বিনিয়োগকারীর। তাদের অনেকেই প্রায় সর্বস্বান্তের পথে। শেয়ারের দরপতনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়তি অর্থ জমা না দিতে পারায় ইতিমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী বাধ্যতামূলক বিক্রির কবলে পড়েছেন। হারিয়েছেন নিজস্ব মূলধনের পুরোটা। গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগ করে দুর্দশাগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, গ্রামীণফোনের প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিমাতাসুলভ আচরণের কারণেই তারা এভাবে সর্বস্বান্ত হতে চলেছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে নিয়ে আসা হলেও এত দীর্ঘ সময় কোনো কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে থাকতে হয়নি। তারা বলেন, শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে স্পট মার্কেটে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল এসইসি। কিন্তু স্পটে আসার পর শেয়ারের দাম ৩৭ শতাংশের বেশি কমলেও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেনি এসইসি। অন্যদিকে এ সময়ের মধ্যে বাজার মূলধন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, ৩০/৩৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির কারণে গ্রামীণফোনকে স্পট মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হলেও ১০০ শতাংশের বেশি মূল্য বৃদ্ধির পরও আর কোনো কোম্পানিকে গ্রামীণের পরিণতি বরণ করতে হয়নি।

পাবলিক মার্কেটে এ বি ও এন ক্যাটাগরির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তি হয় শেয়ার কেনা-বেচার চতুর্থ দিনে। ওই দিন ক্রেতার বিও বিনিয়োগ হিসাবে শেয়ার চলে আসে, ক্রেতা চাইলে ওইদিনই তা বিক্রি করতে পারেন। অন্যদিকে শেয়ার বিক্রির চতুর্থ দিনে বিক্রেতা তার দাম পেয়ে যান। জেড ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে এ সময় লাগে ১০ দিন। পাবলিক মার্কেটে লেনদেন নিস্পত্তিতে ৪ দিন সময় লাগে বলে একজন বিনিয়োগকারী চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সুযোগ নিয়েও এসব কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারেন। কিন্তু স্পট মার্কেটে নগদ টাকায় শেয়ার কিনতে হয়। অন্যদিকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে পাবলিক মার্কেটে একটি কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে সমপরিমাণ অর্থে অপর যে কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনা যায়। কিন্তু স্পট মার্কেটে থাকা কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ওই অর্থ দিয়ে একই দিনে অন্য কোনো শেয়ার কেনা যায় না। অন্যদিকে পাবলিক মার্কেটের শেয়ার বিক্রি করে স্পট মার্কেটের শেয়ার কিনতে চাইলে বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষা করতে হয় ৪ থেকে ১০ দিন। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণত স্পট মার্কেটে শেয়ারের দাম কমে যায়, লেনদেনও হয় কম।
চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এসইসি গ্রামীণফোন এবং ম্যারিকো বাংলাদেশ নামের অপর একটি কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ছিল ৩৮০ টাকা। গতকাল সোমবার তা ২৪২ টাকায় নেমে এসেছে। দর কমেছে প্রায় ১৪০ টাকা বা ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, গতকাল যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার কোটি। একই সময়ে ডিএসই সাধারণ সূচক ৫ হাজার ৭৬০ পয়েন্ট থেকে ৭ হাজার ৭৪০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। আট মাসের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের শেয়ারের ৩৭ শতাংশ দরপতনের বিপরীতে বাজার মূলধন ও সূচক বেড়েছে যথাক্রমে ৪২ ও ৩৪ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণফোন একটি বড় মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি হওয়ায় এর শেয়ারের অল্প দাম বৃদ্ধি সূচকের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব ফেলে। সূচকের মাধ্যমে যাতে বাজারের প্রবল ঊর্ধ্বমুখী ধারার প্রকৃত প্রতিফলন না ঘটে সে লক্ষ্যেই গ্রামীণফোনকে স্পট মার্কেটে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। তবে তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এতে করে বড় মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাছাড়া শুধু ‘সূচক ম্যানেজমেন্টের’ উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে এভাবে মূল বাজারের বাইরে রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

স্পট মার্কেটে থাকা অপর বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশের শেয়ারের দাম গ্রামীনফোণের মতো না কমলেও স্পটে আসার পর তেমন বাড়েওনি। সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে শেয়ার প্রতি আয় ছিল ২১ টাকা ৬৪ পয়সা। বাজারে এর শেয়ারের দাম ৬৩০ থেকে ৬৪০ টাকা। এ হিসাবে এর মূল্য-আয় অনুপাত দাঁড়ায় ৩১। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত এর চেয়ে বেশি। অথচ এদের কাউকেই স্পট মার্কেটে আসতে হয়নি।
কোম্পানি দুটিকে এভাবে পাবলিক মার্কেটের বাইরে রাখায় শুধু বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত নন; দেশের শেয়ারবাজারের ভাবমূর্তিও কিছুটা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দুটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রতি এমন অযৌক্তিক বিমাতাসুলভ আচরণ অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির প্রতি ভুল সংকেত পাঠাবে।

%d bloggers like this: