প্লাস্টিক বোতলের পানি থেকে সাবধান


প্লাস্টিক বোতলের পানি থেকে সাবধান
রঙ-ঢঙ ডেস্ক

আকার আর ওজনের সুবিধা মিলিয়ে সারা বিশ্বেই প্লাস্টিকের বোতলজাত পানির কদর বেড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বোতলজাত পানি ব্যবসায়ীদের নানা বাহারি বিজ্ঞাপন। যে কারণে এটি এখন ফ্যাশনেরও অনুষঙ্গ। তবে এ বোতলজাত পানি কতটা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য উপকারী, তা নিয়ে সচেতনতাও বাড়ছে। চলছে গবেষণা, নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে অ্যালুমিনিয়াম অথবা স্টিলের বোতলে পানি খেতে। মেলবোর্ন ফ্যাশন উইকের অনুষ্ঠানেও চলতি বছর প্লাস্টিকের বোতলজাত পানি সরবরাহকে নিরুত্সাহিত করা হয়। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো প্লাস্টিকের ক্ষতিকর উপাদান কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। কাজও চলছে সেই মাফিক। অস্ট্রেলিয়ার ২০ হাজার মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের বেশির ভাগই প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়ার মতো আধুনিকতা ত্যাগ করতে সম্মত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষবিদ্যার শিক্ষক ক্রিস উইনডার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন প্লাস্টিকের বিক্রিয়া ও মানবশরীরে এর ক্ষতিকর প্রভাব। তিনি জানিয়েছেন, প্লাস্টিক বোতলের পুনর্ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াদূষণের জন্য দায়ী। প্রতিবার ব্যবহারের পর তা এমনভাবে ধুতে হবে, যেন অন্য কোনো উপাদান, যেমন- সাবান প্রভৃতি এর সঙ্গে লেগে না থাকে। তাহলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে অন্তত রেহাই মিলবে। তবে অবশ্যই তা ঠাণ্ডা পানিতে ধুতে হবে। কারণ তাপে প্লাস্টিকে ব্যবহূত রাসায়নিক পদার্থগুলো উন্মুক্ত হয়; যা শরীরের ক্ষতি করে।

প্লাস্টিক বোতল তৈরি হয় মূলত দুই ধরনের প্লাস্টিক থেকে। এর একটি পলিকার্বন, যা বিসফেনল এ (বিপিএ) থেকে উত্পাদিত এবং অন্যটি পিইটি, যা পলিইথিলিন থেকে উত্পাদিত। পলিইথিলিনকে নিরাপদ বিবেচনা করা হয়। তবে বিপিএ ক্ষতিকর। ১৯৫০ সাল থেকেই বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিক উত্পাদনে এর ব্যবহার হয়ে আসছে; যার ক্ষতিকর বিষয়গুলো এরই মধ্যে প্রমাণিত।

বিপিএ প্লাস্টিকের আধারে জমে থাকা উপাদান দ্রবীভূত করার ক্ষমতা রাখে। পানিতে এসব উপাদান মিশে যায় সহজেই। ৯৫ শতাংশ মার্কিনের মূত্রে এ রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে। এর পরিমাণ শিশুদের মধ্যেই বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

বিপিএর সঙ্গে এক প্রকার হরমোনের গাঠনিক মিল রয়েছে। এটি ওয়েসট্রোজেন মিকি হরমোন নামে পরিচিত। অধ্যাপক উইনডার জানিয়েছেন, বিপিএ নানা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ। যেমন— অনুর্বরতা, মোটা হয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, গলার ক্যান্সার, এমনকি এ উপাদান কেন্দ্রীয় সংবেদনশীলতাকেও অবশ করে দিতে পারে। স্তন ও জরায়ু ক্যান্সারের কারণও হয়ে উঠতে পারে এ বিপিএ। উইনডার আশা করছেন, মানুষ শিগগিরই এর বিপদ সম্পর্কে অবহিত হবে, ১০ বছরের মধ্যেই এ উপাদানের ক্ষতি সম্পর্কে সবাই জানবে এবং ২০ বছরের মধ্যেই প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয় পানির বোতল তৈরিতে। একবার ভাবলেই বিষয়টি উপলব্ধি করা সম্ভব। কারণ এ বোতল তৈরির ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ উত্পাদিত হয়। ক্ষতিকর উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে নিকেল, ইথাইলবেনজিন, ইথিলিন অক্সাইড, বেনজিন প্রভৃতি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দেড় হাজার পানির বোতল নিঃশেষ করা হয়। এর কারণে নষ্ট হয় ভূমির উর্বরতা ও ব্যাহত হয় জলাধারের স্বাভাবিক গতি।

আতঙ্কের আরো বিষয় হচ্ছে, প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর উপাদান দূর করার যে মানদণ্ড দেয়া হয়, বিশ্বব্যাপীই তা মানা হয় না। পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়েই অন্তত ২২ শতাংশ প্লাস্টিকের বোতলে ক্ষতিকর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। একই সঙ্গে পানির উত্স, এর বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া ও দাম বিষয়েও ঘাপলা তৈরি হয়।

সূত্রঃ বনিকবার্তা