তৈরি পোশাক খাত:শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা:বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনছে চীনা উদ্যোক্তারা:রেমিট্যান্সপ্রবাহে বিশাল ধস নেমেছে


তৈরি পোশাক খাত
শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা
বদরুল আলম

দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প সচল রেখেছেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। তবে শিল্পমালিকরা বলছেন, এ খাতে শ্রমিক প্রয়োজন ৫০ লাখ। এ হিসাবে এখনই ১০ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যেই ঘটছে তাজরীন ফ্যাশনসের মতো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, যা কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলছে শ্রমিকদের। এর ওপর আছে মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের শ্রমিকসংকটে পড়তে যাচ্ছে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার এনে দেয়া খাতটি।
শ্রমিকসংকটের কথা স্বীকার করছেন খাতসংশ্লিষ্টরাও। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি ফারুক হাসান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামনের দিনগুলোয় ভয়াবহ শ্রমিকসংকটের আশঙ্কা করছি আমরা। এর মূল কারণ, শ্রমিকরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ আস্থার সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হবেই।’

জানা যায়, তৈরি পোশাকের মূল সরবরাহকারী চীন তাদের অবস্থান থেকে ক্রমেই ছিটকে যাচ্ছে। দেশটিতে শ্রমের মজুরি বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। কয়েক বছর আগে চীন বিশ্বের মোট চাহিদার ৪২ শতাংশ তৈরি পোশাক সরবরাহ করলেও এখন তা ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ভারতেও শ্রমের মজুরি প্রতি বছরই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে এ খাতে নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করার। তবে মজুরি ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশের অভাবে এ সুযোগ কাজে লাগানো কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
Bangladesh fire victims want old jobs back

Bangladesh fire victims want old jobs back

খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি মাসে ১৫-২০ শতাংশ শ্রমিক পোশাক কারখানা ছেড়ে যাচ্ছেন। তিন বছর আগেও এ হার ছিল ৫-১০ শতাংশ। কৃষিকাজে উপার্জনের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামে ফিরে যেতে চাইছেন অনেকেই। দিনে ৩০০-৩৫০ টাকা হিসাবে একজন কৃষি শ্রমিক মাসে ৯-১০ হাজার টাকা আয় করতে পারছেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত এ হারে আয় করতে পারবেন তারা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে অনেক কারখানা আছে, যেগুলোর শ্রমিকরা এখন মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে বাধ্য হয়েই কারখানাগুলোকে সারা বছরই শ্রমিক নিয়োগে চেষ্টা চালাতে হচ্ছে। ঢাকাসহ আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কারখানায়ই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে।

শ্রমিকদের মধ্যে পোশাক কারখানা ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনা। এর সর্বশেষ উদাহরণ আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস। এ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়ার পর আতঙ্কিত শ্রমিকদের অনেকেই এখন এ পেশা ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছেন। সংগঠনগুলো তাজরীনের পাশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের কাজের সুযোগ করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেও তাতে সাড়া মিলছে না।

তাজরীন ফ্যাশনসের অপারেটর শামসুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ কারখানায় আর কাজ করব না। অন্য কারখানায়ও যেতে চাই না। বেশির ভাগ কারখানার পরিবেশই প্রায় একই রকম। তাই কাজ পেলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে না।’

শ্রম পরিবেশ নিয়ে শ্রমিকদের অভিযোগগুলোর সত্যতা মেলে পোশাক খাত নিয়ে করা সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, পোশাক খাতের শ্রমিকপর্যায়ের ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ চাকরিই অস্থায়ী। ৮০ শতাংশ কারখানার প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই। ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ কারখানায় চিকিত্সা সুবিধা নেই। পরিবহন সুবিধা দেয় না, এমন কারখানার হার ৯১ দশমিক ৮ শতাংশ।

অবশ্য শ্রমিক প্রতিনিধিরা এ সংকট সাময়িক বলে ধারণা করছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি শিরিন আখতার বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। সাময়িকভাবে এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকসংকট সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদি যা-ই হোক, এ খাতের সার্বিক কর্মপরিবেশ উন্নয়নে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ এ খাতের মূল আকর্ষণই হচ্ছে শ্রমের সস্তা মজুরি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা খাত পরিবর্তনে বাধ্য হবেন কি না, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ ও সময়সাপেক্ষ। তবে এটাও ঠিক, তাদের হাতে খুব বেশি বিকল্পও নেই।

পোশাকশিল্প খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী, যারা শহরে এসে একসময় বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। এ পেশা ছেড়ে তারা আর আগের পেশায় ফিরে যেতে চাইবেন না। আবার গ্রামে কৃষিকাজের সুযোগ থাকলেও কায়িক শ্রম বেশি হওয়ায় পুরুষরা তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে— দেশের বাইরে চলে যাওয়া। কিন্তু সেখানেও রয়েছে নিরাপত্তার অভাব। কাজেই এ মুহূর্তে পোশাক কারখানাগুলোর উচিত কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশাল এ কর্মী বাহিনীকে ধরে রাখা।

বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনছে চীনা উদ্যোক্তারা
পোশাক শিল্পে সস্তা শ্রমের সুযোগ
সাইদুল ইসলাম

সস্তা শ্রমের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে পোশাক শিল্প কারখানা সরিয়ে আনছে বিশ্ব অর্থনীতির বৃহত্ শক্তি চীন। চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে গার্মেন্টস তৈরি করে তা নিজেদের দেশের ভোক্তাদের জন্য রপ্তানিও করছে। বর্তমানে দেশে চীনা পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও চীনের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য কম দামে পোশাক রপ্তানি করছে। জানা গেছে, চীনের স্থানীয় খোলাবাজারে সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রি প্রতিষ্ঠান ভ্যানসেল ইতিমধ্যে কিছু প্যান্ট এবং শার্টের অর্ডার বাংলাদেশকে দিয়েছে। এছাড়া পশ্চিমা ক্রেতা ওশান এবং এইচ এন্ড এম চীনা বাজারে পোশাক সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে কাজ করাচ্ছে।

বর্তমানে একজন চীনা শ্রমিকের সর্বোচ্চ বেতন প্রতিমাসে চারশ থেকে পাঁচশ মার্কিন ডলার। আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ বেতন ৭০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার। চীনা বিনিয়োগকারীদের মতে, এ পরিমাণ বেতন দিয়ে অনেক সময় কারখানা চালাতে গিয়ে উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যায়। রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক সময় পুষিয়ে উঠা সম্ভব হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে কম মূল্যে পোশাক রপ্তানি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনের সবচেয়ে বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত।

চীনের বন্দর শহর নিনগোতে একটি গার্মেন্টস কারখানা চালান সেখানকার নাগরিক রোজা দাদা। দৈনিক ইত্তেফাককে তিনি বলেছেন, চীনে কারখানা চালানো এখন দুরূহ হয়ে পড়েছে। গত দু’ বছরে শ্রমিকদের বেতন যে হারে বেড়েছে তাতে বাংলাদেশে কারখানা সরিয়ে আনা ছাড়া কোন উপায় ছিলো না। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান ফোর সিজন ফ্যাশনের জন্য কাজ করেন। রোজা দাদা আরো বলেন, তিনি শুধু পণ্য ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির জন্য ঢাকায় অফিস খোলেননি। তিনি চীনে পোশাক রপ্তানির বিষয়টিও তদারকি করছেন। চীনা উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস আমদানি করলে তাদের খরচ চীন থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম পড়ে।

বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, তারা ৯০ শতাংশ গার্মেন্টস পণ্য যেমন টি-শার্ট, জিন্স এবং স্যুয়েটারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পায়। তাদের মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত থাকলে চীনে রপ্তানি আরো বাড়বে। কয়েক বছর আগে চীনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দুই কোটি মার্কিন ডলারের মতো থাকলেও বর্তমানে তা ১৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এ রপ্তানি ৫০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করছেন।

তবে চীনা উদ্যোক্তাদের কারখানা সরিয়ে আনার খবরে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা কিছুটা শংকিত। একজন রপ্তানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেছেন, চীনা উদ্যোক্তারা এখানে ছোট একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এর আদলে তারা বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অর্ডার নিয়ে আসে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করিয়ে নিয়ে তারা পুরো মুনাফা নিজেদের পকেটে পুরছে। এছাড়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দরকারি কাঁচামাল তাদের নিজ দেশ থেকে আমদানি করার কারণে বাংলাদেশের পশ্চাত্সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মত দেন তিনি।

নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৯৮ মিলিয়ন ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক
রেমিট্যান্সপ্রবাহে যে ইতিবাচক ধারা শুরু হয়েছিল তাতে বিশাল ধস নেমেছে। গত অক্টোবরের চেয়ে ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার কম রেমিট্যান্স এসেছে নভেম্বরে। এমনকি চলতি অর্থবছরের যেকোনো মাসের চেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে নভেম্বরে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নভেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ডলার। অক্টোবরে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৫৩ মিলিয়ন, সেপ্টেম্বর ও আগস্টে ছিল ১ হাজার ১৭৮ মিলিয়ন এবং জুলাইয়ে ছিল ১ হাজার ২০১ মিলিয়ন ডলার।

নভেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার। অক্টোবরে আসে ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে নভেম্বরে এসেছে ৩০৬ মিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে আসে ৩৯৮ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে নভেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ৭১৭ মিলিয়ন ডলার, অক্টোবরে যার পরিমাণ ছিল ৯৬৯ মিলিয়ন ডলার।

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ব্যাংকাররা জানান, দুই ঈদের কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছিল। এখন জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সপ্রবাহে।
Sources: http://www.bonikbarta.com/?view=details&pub_no=162&menu_id=1&news_id=20414&news_type_id=1
http://www.bonikbarta.com/?view=details&pub_no=162&menu_id=11&news_id=20411&news_type_id=1

Advertisements

৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই


পোশাক শিল্পে আয় বেড়েছে ২ হাজার কোটি ডলার

বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা

রহিম শেখ ॥ ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১৫০ কোটি ডলার। দুই দশক পর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এই সময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিধি বাড়লেও বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তার পরিধি। শনিবার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশে ফের আলোচনায় এসেছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। পাশাপাশি উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারাখানার বিষয়টিও। তৈরি পোশাক গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সংগঠনগুলো বলছে, সাড়ে পাঁচ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কারখানাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলো। এদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

জানা যায়, পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় মূলত তিনটি বিষয় : প্রথমত, শ্রম আইন, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বশেষ মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক। দেশে তৈরি পোশাক খাতে সাড়ে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান সচল। বিজিএমইএ দাবি করে, এর মধ্যে ১ হাজার প্রতিষ্ঠানের রয়েছে শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন কারখানা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সোস্যাল কমপ্লায়েন্স ইনিশিয়েটিভের (বিএসসিআই) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাত্র ৩০০-৫০০ কারখানা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন। অধিকাংশ কারখানাই অদক্ষ শ্রমিকসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে দেশে সাব কন্ট্রাক্ট বা ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারখানাগুলোর সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এসব কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নেই। শ্রম আইনের বিষয়ে এসব কারখানাগুলোর নেই কোন জানাশোনা। এছাড়া মালিক ও শ্রমিক সম্পর্কও খুব একটা ভাল নয়। এসব কারখানায় যেখানে নিরাপত্তাজনিত যন্ত্রাংশ রাখার কথা সেখানে ঠাঁই হয় কারখানার জেনারেটর কিংবা মেশিনারিজ যন্ত্রাংশ।

ক্রেতাদের বিভিন্ন সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে আছে শ্রমিকপ্রতি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন ও অনুপস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা অবস্থার উন্নয়ন চান। তাঁরা এখন আরও বেশি রফতানি আদেশ দিতে চান। তবে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিশ্চয়তা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, একটি কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন রাতারাতি হয় না। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ক্রেতাদের উচিত এ ধরনের চাপ না দিয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা আছে এমন উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো ব্যাবিলন গ্রুপ, ফকির এ্যাপারেলস, স্টারলিং ক্রিয়েশন, ডেকো, এনভয়, হা-মীম। তবে কমপ্লায়েন্স শব্দের আড়ালে গার্মেন্টস মালিকরা মুনাফা করছেন বলে জানান টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজার গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, মালিকরা এই কমপ্লায়েন্স শব্দটি ব্যবহার করে কোটি কোটি আয় করছেন। কারখানার যে ভবনে নিরাপত্তার যন্ত্রাংশ রাখতে হয় সেখানে রাখা হয় জেনারেটর, মেশিন ইতাদি যন্ত্রাংশ। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মুনাফা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবেন না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, দেশের অর্ধেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নিরপাত্তা ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তাজরীন ফ্যাশনসের শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ‘বিব্রত’ হয়ে সব ধরনের রফতানিচুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। মঙ্গলবার ওয়ালমার্ট এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোন অনুমোদন ছাড়াই তাজরীন ফ্যাশনসকে পোশাক তৈরির কাজ দেয় (সাব-কনট্রাক্ট), যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ কারণেই তারা সব রফতানিচুক্তি বাতিল করেছে। এদিকে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হয়েছে আশুলিয়ার ইউনিটি ফ্যাশনের। জাপানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিসেন এ কারখানা পরিদর্শন করে কাজের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে শর্ত দেয়। ক্রেতার এ শর্ত পূরণে নতুন করে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় প্রতিষ্ঠানটি রফতানি আদেশ পায়নি।

এ ব্যাপারে ফকির এ্যাপারেলসের মহাব্যবস্থাপক দেবাশীষ কুমার সাহা বলেন, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বহু পুরনো। একসময় ক্রেতাদের চাহিদা ছিল, কারখানার সাইনবোর্ড থাকতে হবে। আর এ খাতের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের এসব চাহিদাও বেড়েছে। এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সঙ্গে গত সোমবার এক বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জানিয়েছেন, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

সূত্রঃ

পোশাক শিল্পে আগুন: লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা


পোশাক শিল্পে আগুন, প্রবাসীদের শোকঃ নিহতদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমবেদনা
লস এঞ্জেলেসে বাদাম-এর শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভা
লস এঞ্জেলেস, ২৭ নভেম্বর, একুশ নিউজ মিডিয়াঃ শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য অবিলম্বে সরকারকে নিরাপদ কার্যক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত শেষে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিরাপদ ভবনে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে বিল্ডিংকোড শক্তিশালী করে নিরাপত্তা পরিদর্শকদের আরও দায়িত্ববান হওয়া ও দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার বিরুদ্ধে সরকারের পূর্নদৃষ্টি দেবার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন লস এঞ্জেলেসের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশে ঘোষিত জাতীয় শোক দিবসে লস এঞ্জেলেসের প্রাণকেন্দ্র লিটল বাংলাদেশে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও প্রবাসীদের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা ও শোকসভায় এসব কথা বলা হয়। সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস অ্যান্ড মিডিয়া (বাদাম)।

আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের প্রাণহানির ঘটনা ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি ইন আর্টস এন্ড মিডিয়া (বাদাম) এক শোক সমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। বাদাম-এর আহবানে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ প্রবাসীরা এই সভায় যোগ দেন।

শোকসভায় কারখানার নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে ক্রেতা কোম্পানিগুলোর দায়বদ্বতা নিয়ে প্রবাসীরা তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। গত শনিবার সংঘটিত দেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে বৃহত্তম এবং ভয়াবহতম অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যাতে পোশাক শিল্পকে হুমকির মুখে না নিয়ে যায়, প্রবাসীরা এই ব্যাপারে সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার নিমিত্তে দল-মত নির্বিশেষে একমত পোষণ করে।

সভায় মোবারক হোসেন বাবলু স্মারকলিপি পড়ে শোনান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অ্যাঞ্জেলিনোদের মাঝে সুচিন্তিত রূপরেখাসহ বক্তব্য দেন সিরাজুল ইসলাম খোকন, ফরিদ উ আহমেদ, সোহেল রহমান বাদল, মুশফিকুর চৌধুরী খসরু, এম হোসেন বাবু, ইসমাইল হোসেন, ড্যানী তৈয়ব, এম এ বাসিত, ডঃ জয়নাল আবেদিন, তৌফিক সোলেমান খান তুহিন, মোরশেদুল ইসলাম, আবু হানিফা, ডঃ মাহবুব হাসান, ফারহানা সাঈদ, মোঃ মুরাদ হোসেন, মুজিব সিদ্দিকী ও এম কে জামান।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যেন কোন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না পড়ে তার প্রতি সতর্ক ও সচেতন দৃষ্টি দেবার জন্য সকলকে কাজ করে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান লস এঞ্জেলেসের রাজনৈতিক কর্মীরা। সভায় নিরাপত্তা পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা আর অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে প্রবাসীরা বলেন, ব্যাক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে দেশের এই বৃহত্তর শিল্পকে বিশ্বের বুকে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

This slideshow requires JavaScript.

বক্তারা জানান, কর্তৃপক্ষের অবহেলা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, তেমনি শ্রমিকদের ঘামের বিনিময়ে মুনাফার অংশ যেন শ্রমিকদের কল্যাণে সচেতনভাবে ব্যয় হয় তার প্রতি মালিক সম্প্রদায়ের দায়বদ্বতা অস্বীকার করার সুযোগও নেই। দুর্ঘটনা যেন হত্যাকাণ্ডে পরিণত না হয় তার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান সচেতন প্রবাসীরা।

গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড ও চট্টগ্রামে উড়াল সেতু দুর্ঘটনায় নিহতদের সত্যিকারের পরিচয় সংগ্রহ করে সেই সকল দুস্থ পরিবারদের সরাসরি সাহায্য করার জন্য প্রবাসীরা একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে পোশাক শিল্প কারখানায় সংগঠিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবার ও পরিজনকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানানো হয়। এ ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য লাভ কামনা করা হয়।

আলোচনা ও শোকসভায় আরো যোগ দেন সাইফুল আনসারী চপল, জহির ইউ আহমেদ, আবদুল খালেক মিয়া, রেজাউল চৌধুরী, আব্দুল কে মিয়া, জামাল হোসেন, মতিউর রহমান মার্টিন, আলী তৈয়ব, কাজী নাজির হাসিব, রেজাউল চৌধুরী, জামাল হোসেন, মশিউর চৌধুরী, আখতার ভুঁইয়া প্রমুখ।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাদাম-এর আহবায়ক জাহান হাসান। সহযোগিতায় ছিলেন পঙ্কজ দাস ও শফিউল ইসলাম বাবু।