কানাডা-প্রবাসী বাংলাদেশী দুই নাগরিকের মাস্টার কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের কেনাকাটা করা হয়েছে ঢাকায়


মাস্টার কার্ড জালিয়াতি
সাকিব তনু

কানাডা-প্রবাসী বাংলাদেশী দুই নাগরিকের মাস্টার কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের কেনাকাটা করা হয়েছে ঢাকায়। প্রবাসী দুজন হলেন রহমান মোল্লা ও তার মেয়ে ফারজানা বেগম। জালিয়াতির কাজটি করেছে ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের ইমরান জুয়েলার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
রহমান মোল্লা ও ফারজানা বেগম কানাডার ব্যাংক অব মনট্রিয়লের টিডি ভিসা কার্ড এবং এমবিএনএ মাস্টার কার্ড ব্যবহার করেন। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রহমান মোল্লার কার্ডে ইমরান জুয়েলার্স ও বাটার ফ্লাই মার্কেটিং ঢাকা অফিস থেকে তিনটি লেনদেনের মাধ্যমে ২৩ হাজার ১১৫ কানাডিয়ান ডলারের পণ্য কেনা হয়। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি ফারজানা বেগমের কার্ডে একই জুয়েলার্স থেকে ১১টি লেনদেনের মাধ্যমে ৪০ হাজার ৬৯৭ কানাডিয়ান ডলারের পণ্য কেনা হয়। অথচ তারা সে সময় দেশে ছিলেন না।
বাংলাদেশে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে এ লেনদেন হয়। লেনদেন সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ইমরান জুয়েলার্সের প্রায় ২০ লাখ টাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক আটকে দিলেও তা তখন বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করেনি ব্যাংকটি। যদিও মানি লন্ডারিং আইন, ২০০৯-এর ২৫ ধারা অনুযায়ী এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্ট করার বিধান রয়েছে।
পরে প্রতারিত এ দুই গ্রাহকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মাস্টার কার্ডের বিধান অনুযায়ী তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মানি লন্ডারিং আইন লঙ্ঘন করার কারণে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কাছে জবাব চাওয়া হবে ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বায়তুল মোকাররমে একসময় ইমরান জুয়ালার্স থাকলেও বর্তমানে এ নামে কোনো দোকান নেই। ইমরান জুয়েলার্সের কর্ণধার নুরউদ্দিন ইমরান পরে বুলবুল ও একতা জুয়েলার্স নামে দুটি নতুন দোকান চালু করলেও সম্প্রতি বুলবুল জুয়েলার্স ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি একতা জুয়েলার্স ও ইমরান আর্মস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। গতকাল ইমরান আর্মসের ম্যানেজার পরিচয় দেয়া জিতু জানান, নুরউদ্দিন ইমরান ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে আছেন। কবে ফিরবেন তা তার জানা নেই।
জানা যায়, কানাডিয়ান ব্যাংক দুই গ্রাহকের কাছে যখন আর্থিক বিবরণী পাঠায়, তখন তাদের কাছে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ভুক্তভোগীরা আইনজীবীর মাধ্যমে বাংলাদেশে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কাছে গ্রাহকের আন্তর্জাতিক মাস্টার কার্ড ও ভিসা কার্ডের লেনদেনের বিবরণী চেয়ে পাঠান। ব্যাংকটি এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি। এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকেও অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইমরান জুয়েলার্সের কর্ণধার নুরউদ্দিন ইমরানের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের লোকাল শাখায় একটি হিসাব রয়েছে (নম্বর ১০১.১১০.২৮১৩১)। এ হিসাবের আওতায় তিনি ব্যাংকটির কার্ড ডিভিশনের মার্চেন্ট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং কার্ডে অর্থ পরিশোধের ইলেকট্রনিক মেশিন বা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) নেন।
২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রহমান মোল্লার কার্ড থেকে তিনটি লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে ইমরান জুয়েলার্স। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২ শতাংশ হারে কমিশন কেটে ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা ইমরান জুয়েলার্সের হিসাবে ক্রেডিট করে সেদিনই। একই দিন ইমরান জুয়েলার্স এটিএমের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা ও চেকের মাধ্যমে ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা তুলে নেয়।
২০ ফেব্রুয়ারি ইমরান জুয়েলার্সে ১১টি লেনদেনের বিপরীতে ফারজানা বেগমের কার্ড থেকে ২৬ লাখ ২ হাজার টাকা কেটে রাখে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। একই বছরের ৩ মার্চ ২ শতাংশ হারে কমিশন কেটে ইমরান জুয়েলার্সের হিসাবে ২৫ লাখ ৫০ হাজার ৮৪২ টাকা ক্রেডিট করে। একই দিন আবার ভুল বিক্রি দেখিয়ে ২০ লাখ ১৫ হাজার ৭৬২ টাকা ওই হিসাব থেকে ডেবিট করে ব্যাংকটি। ওই দিনই ইমরান জুয়েলার্স ৫০ হাজার ও পরদিন ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা তুলে নেয় তার হিসাব থেকে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ১১টি সন্দেহজনক লেনদেনের কারণ ব্যাখ্যার জন্য ইমরান জুয়েলার্সকে ১০ মার্চ একটি ই-মেইল পাঠায়। ইমরান জুয়েলার্স আজ অবধি এর কোনো জবাব দেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইমরান জুয়েলার্স হিসাব খোলার ফরমে ঘোষণা দেয়, তার সর্বোচ্চ জমা ২ লাখ এবং সর্বোচ্চ উত্তোলন ৩ লাখ টাকা হবে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি লেনদেনে ঘোষিত সীমা অতিক্রম করলেও ব্যাংকটি গ্রাহকের কাছে এর কোনো ব্যাখ্যা চায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এসএম মুনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত ঘটনা হওয়ায় বিষয়টি ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তারাই দেখছে। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। গ্রাহকও যেন কোনো হয়রানির শিকার না হন, তাও দেখা হচ্ছে।
ইদানীং মাস্টার কার্ড জালিয়াতির ঘটনা বেড়েছে। বিদেশী একটি চক্র এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে অনেকের ধারণা। এতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই পড়ছেন বিপাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের অনাস্থাও সৃষ্টি হচ্ছে। এতে গ্রাহকরা জড়িয়ে পড়ছেন আইনি জটিলতায়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই মাস্টার কার্ড জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এ জন্য ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনকে আরও মনোযোগী এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকতে হবে। মাস্টার কার্ড বীমা থাকাটাও ভালো। এতে গ্রাহক সহজেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।
প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান খসরু বলেন, এ ধরনের ঘটনা রোধ বেশ কঠিন। আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেও কম। তবে মোটেই যে ঘটছে না, তা বলা যাবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে এ জালিয়াতি রোধে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে ফোনে একাধিবার চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls


%d bloggers like this: