স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

‘দোয়েল’ এখন ডিজিটাল দুঃস্বপ্ন


বর্তমান মহাজোট সরকার ডিজিটাল শব্দের প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল ২০০৮ সালে। বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড করার ছিল মহাপরিকল্পনা। এই ডিজিটালাইজড পরিকল্পনায় দেশের তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও এ খাতটিকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করার কথা ছিল। আর তাই পরের বছর ২০০৯ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়ার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ল্যাপটপ উত্পাদনের ঘোষণা দেয়। যথারীতি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ল্যাপটপ উত্পাদন করার জন্য একটি দেশি ও একটি বিদেশি কোম্পানি নিয়ে তাদের উত্পাদন কার্যক্রম শুরু করে। ১০ হাজার টাকা মূল্যে দেশে উত্পাদিত ল্যাপটপ দেশের মানুষকে দেয়ার কথা থাকলেও তার প্রত্যেকটি অংশ তৈরি করা হয় চীন থেকে। চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শেয়ার ট্রনিক কর্পোরেশনের মাধ্যমে সব যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। টেশিসের গাজীপুর কারখানায় তা শুধু সংযোজন করা হয়। যদিও দোয়েলের উদ্বোধনের দিন টেশিসের তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইসমাইল বলেছিলেন, এর ৬০ শতাংশ যন্ত্রপাতিই দেশে উত্পাদন করা হবে; বাকি ৪০ শতাংশ চীন, কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে আমদানি করা হবে। কিন্তু তার কিছুই করা হয়নি। টাকার অভাবে দোয়েল নির্মাণ বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলেও সমপ্রতি দোয়েল তৈরি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আর ওপর দিকে শুধু নামমাত্র ডিজিটাল স্বপ্ন দেখেই দায়িত্ব শেষ করেছেন সরকারের শীর্ষ মহল। তাই দোয়েল এখন একটি ডিজিটাল দুঃস্বপ্নের নাম। ডিজিটাল পাখায় বাঁধা এ পাখি নিজেও জানে না সে কখনও উড়তে পারবে কি-না!

৪ মডেলের দোয়েল
২০১১ সালের ১১ অক্টোবর জাতীয় পাখি দোয়েলের নামানুসারে
দোয়েল ল্যাপটপ-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে ৪টি মডেলে তৈরি করা হয় দোয়েল ল্যাপটপ। এক. বিজয় দিবস স্মরণে অ্যাডভান্স মডেল-১৬১২, দুই. ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মরণে দোয়েল প্রাইমারি মডেল-২১০২, তিন. স্বাধীনতা দিবস স্মরণে দোয়েল স্ট্যান্ডার্ড মডেল-২৬০৩ এবং চার. বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্মরণে দোয়েল বেসিক মডেল-০৭০৩ ল্যাপটপ তৈরি করা হয়। বৈশিষ্ট্য ভেদে এগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়। যেমনদোয়েল প্রাইমারি নেটবুকের দাম ১০ হাজার টাকা, বেসিক নেটবুকের দাম ১৩ হাজার ৫০০ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড নেটবুকের দাম ১৬ থেকে ২২ হাজার এবং অ্যাডভান্স নেটবুকের দাম ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকা।

বিড়ম্বনার নাম দোয়েল ল্যাপটপ
মহাজোট সরকারের ইশতেহারে বাংলাদেশকে ডিজিটাল করার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেশে দোয়েল ব্যান্ডের ল্যাপটপ তৈরির ঘোষণা দেয়া হয়। সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন করার জন্য গত ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর দোয়েলের উদ্বোধন করা হয়। এরপর তার চারদিন পর ১৫ অক্টোবর বাজারে আসে বহুল কাঙ্ক্ষিত দোয়েল ল্যাপটপ। দাম কম বলে আশা করা হচ্ছিল খুব শিগগিরই সারাদেশে এই ডিজিটাল ল্যাপটপটি সয়লাব হয়ে যাবে। কিন্তু না, বাংলার মানুষের সবার হাতে একটা করে ল্যাপটপ পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আসা দোয়েল এরই মধ্যে মুখথুবড়ে পড়েছে। বরং এরই মধ্যে যারা দোয়েল কিনেছেন তারা চরম বিরক্ত প্রকাশ করেছেন। কারণ এই ল্যাপটপ কেনার কিছুদিনের মধ্যেই বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ
দেশীয় পণ্য বলে তারা এই ল্যাপটপ কিনেছেন। কিন্তু আর কিছু টাকা বেশি দিয়ে যদি অন্য ব্র্যান্ড নিতেন তাহলে এত সমস্যায় পড়তে হতো না। ক্রেতাদের অভিযোগের মধ্যে ল্যাপটপের গতি নিয়ে সমস্যা বেশি। তাছাড়া এর পাওয়ার ব্যাকআপ নিয়েও রয়েছে অনেক সমস্যা। মানুষ এই ল্যাপটপ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখলেও পরে শুধুই বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন।

আর্থিক সমস্যা প্রধান কারণ!
হয়তো অনেকেই কথাটি শুনে অবাক হতে পারেন। দেশে কোনো কিছুর নাম পরিবর্তন করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার জোগান দিতে পারলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে! আর তাই দেশীয় এই ডিজিটাল ল্যাপটপ দোয়েল উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই উত্পাদন বন্ধের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় সরকার। কারিগরি ও আর্থিক সমস্যাই এর কারণ বলে তখন জানানো হয়। ল্যাপটপ তৈরিতে প্রাথমিকভাবে ১৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের টাকা বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান থিম ফিল্ম ট্রান্সমিশনের (টিএফটি) তরফ থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু বাংলাদেশ সরকার টাকা দিয়েছে। ফলে ল্যাপটপ তৈরির কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। টেশিস সূত্রে জানা গেছে, আপাতত রিভলভিং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন। অথচ ল্যাপটপ তৈরির নামে দুর্নীতির অভিযোগে বলা হচ্ছে, ল্যাপটপের যন্ত্রাংশ কেনার জন্য দেড় লাখ ডলারের পণ্যের মূল্য ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৪০ ডলার দেখিয়ে দুর্নীতি করা হয়েছে। আবার এই দুর্নীতি যারা করেছেন তারাই বলছেন আর্থিক সমস্যার কারণে দেশের এই সম্ভাবনাময় একটি খাত ডুবে যাচ্ছে।

দোয়েলে শুধুই সমস্যা
দোয়েল ল্যাপটপ অনেক সম্ভাবনার কথা বললেও সেখানে শুধুই সমস্যা আর সমস্যা। হাতেগোনা কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছানো হয়েছে এই দোয়েল ল্যাপটপ। যারা ল্যাপটপ পেয়েছেন তারাই অভিযোগ করে বলেছেন, খুবই হালকা প্লাস্টিক ধরনের আবরণ দিয়ে ল্যাপটপ তৈরি করা হয়েছে। ব্যাটারির ক্ষমতা কম। অপারেটিং সিস্টেমে ঠিকমত কাজ করা যায় না। এছাড়া লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে (এলসিডি) মনিটর ঘোলা। টেশিসের হিসেবে দোয়েল প্রাইমারি মডেল-২১০২ মাত্র ৮-১০টি উপহার হিসেবে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দেয়া হয়েছে। ৪ হাজার ৭০০ জন দোয়েল বেসিক নেটবুক ব্যবহার করেন। আর দোয়েল স্ট্যান্ডার্ড নেটবুক এবং দোয়েল অ্যাডভান্স নেটবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা হাজার খানেক। এসব সমস্যার সমাধানে এরই মধ্যে যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে টেশিস সূত্রে জানা গেছে। ওই সূত্র আরও জানায়, দেশের বেশিরভাগ ব্যবহারকারী উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে অভ্যস্ত হওয়ায় তারা দোয়েল মডেলগুলোয় ঠিকমত কাজ করতে পারছেন না। প্রাইমারি নেটবুকে অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি ৩টি নেটবুক চলে লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে। কিন্তু যে সিস্টেমেই চলুক না কেন, সব ল্যাপটপেই রয়েছে ভয়ঙ্কর সব সমস্যা।

স্বদেশী পণ্য নাকি প্রতারণা?
দোয়েল বাংলাদেশে চালু হওয়ার পর থেকেই
দোয়েল কি স্বদেশী পণ্য নাকি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা? এ নিয়ে বিতর্ক ছিল। কারণ সরকার মাত্র ১০ হাজার টাকায় দেশে উত্পাদিত ল্যাপটপের স্বপ্ন দেখালেও এর প্রতিটি অংশ চীনের তৈরি। চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শেয়ার ট্রনিক কর্পোরেশনের মাধ্যমে সব যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। টেশিসের গাজীপুর কারখানায় তা শুধু সহযোজন করা হয়। এছাড়া অনেকেই তখন প্রশ্ন করেছিল, দোয়েল ল্যাপটপের র্যাম, মাদার বোর্ড, প্রসেসর, হার্ডডিস্ক, সাউন্ড সিস্টেম, এলসিডি, কিবোর্ড, ওয়েবক্যাম, ইউএসবি, ডিভিডি, ওয়াইফাই ইত্যাদি কি বাংলাদেশের তৈরি? বাংলাদেশে দোয়েল ল্যাপটপের কোন অংশটি তৈরি হয়েছে? যদি কোনো অংশই দেশে তৈরি না হয়ে থাকে তাহলে কীভাবে এটি একটি স্বদেশী পণ্য হবে? যদি তা দেশের বাইরে থেকে এনে এখানে সহযোজন করা হয় তাহলে একটি লোগো লাগিয়ে দিলে স্বদেশী পণ্য হয়ে যাবে? বাংলাদেশের অধিকাংশ ডেস্কটপ বাইরে থেকে যন্ত্রাংশ এনে এখানে সহযোজন করা হয়, কিন্তু কেউ যদি কম্পিউটারের ওপর একটি লোগো লাগিয়ে দিয়ে কি বলতে পারেন এটি স্বদেশী পণ্য?

১০ হাজার টাকার ল্যাপটপ বিক্রি মাত্র ৫০টি!
বিপুল সম্ভাবনাময় তথাকথিত বাংলাদেশে উত্পাদিত দোয়েল ল্যাপটপ বাজারে আসার আগে প্রচুর চাহিদা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। অনেকেই ল্যাপটপ পাওয়ার জন্য এবং ব্যবসা করার জন্য অগ্রিম বিভিন্নভাবে মন্ত্রী পর্যন্ত লবিং করে রেখেছিলেন। কিন্তু দোয়েল কি জানত তার ডানা মেলার সময় হলেও নিজে স্বাধীন মতো উড়তে পারবে না? গেল বছর ২০১১ সালের ১১ অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোয়েল ল্যাপটপটি উদ্বোধন করেন। এরপর থেকেই তার ভাগ্যের চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকটা উড়ার আগেই থুবড়ে পড়ল দোয়েল! কারণ গত বছরের অক্টোবরে দোয়েল ল্যাপটপ বাজারজাতকরণ শুরু হলেও পরে ছয় মাসেও ১০ হাজার টাকার ল্যাপটপ উত্পাদন করতেই পারেনি টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস)। অথচ টেশিসের প্রচার হয়েছে ১০ হাজার টাকাতেই পাওয়া যাবে স্বপ্নের দোয়েল ল্যাপটপ। সমপ্রতি সাড়ে ১০ হাজার টাকা মূল্যের দুই হাজার ল্যাপটপ সহযোজন করা হলেও তার ৫০টিও বিক্রি হয়নি। টেশিসের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রাইমারি মডেলের ল্যাপটপ উত্পাদনে যেতে তাদের কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ক্রেতাদের আগ্রহও অনেক কম বলে তারা জানান। প্রথম দফায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকার বেসিক মডেল এবং ২৬ হাজার ৫০০ টাকার অ্যাডভান্স মডেলের ল্যাপটপ সহযোজন করে টেশিস। প্রতিটি গ্রুপে ৫ হাজার করে ল্যাপটপ সহযোজন করা হয়। এর মধ্যে এক বছরে ১৫ হাজার ল্যাপটপ বিক্রি হয়েছে বলে টেশিস থেকে দাবি করা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, এই ১৫ হাজারের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সেনাবাহিনীই নিয়েছে ৭ হাজার ল্যাপটপ। ফলে বাইরের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি এক বছরে মাত্র ৮ হাজার। জানা গেছে, ১০ হাজার টাকার প্রাইমারি মডেলের ল্যাপটপ সাড়ে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া অ্যাডভান্স মডেলের মূল্য আগে ২৬ হাজার রাখা হলেও এখন তা সাড়ে ২৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। তবে টেশিসের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টাকা না থাকায় এখন দোয়েল ল্যাপটপ উত্পাদন বন্ধ রয়েছে।

দোয়েল উত্পাদনে হরিলুট!
বাংলাদেশে স্বপ্নের ল্যাপটপ দোয়েল উত্পাদনে আর্থিক সঙ্কটের কথা বলা হলেও এখানে রেকর্ড পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত ল্যাপটপের যন্ত্রাংশ আমদানি করার নামে এখানে হরিলুট হয়েছে। হাজার ডলারের যন্ত্রপাতির মূল্য লাখ ডলার দেখিয়ে আমদানি করা হয়েছে দোয়েল ল্যাপটপের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। সে কারণে দেড় লাখ ডলারের পণ্যের মূল্য দেখানো হয় ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৪০ ডলার। ৩শ
শতাংশ বেশি মূল্য দেখিয়ে আমদানি করা অর্থের ভাগবাটোয়ারা হয়েছে মালয়েশিয়ার পেনাং এবং নিউইয়র্কে। সমপ্রতি বাংলাদেশের কিছু সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে এ নিয়ে বেশ চাঞ্চল্য তৈরি হয়।
সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এইচএসবিসি ব্যাংক ও নিউইয়র্কের টিডি ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্টে পৌনে ৪ লাখ ডলার লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে, যার পুরোটাই ঘুষ হিসেবে দিয়েছে দোয়েল ল্যাপটপের তখনকার মালয়েশিয়ান অংশীদার টিএফটি টেকনোলজি গ্রুপ। উপরি আয়ের একটি বড় অংশ তখনকার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুও পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন টিএফটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ওয়াং বলে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে। টেশিসের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ল্যাপটপ উত্পাদনে লুটপাট হয়েছে। বিষয়টি অনেক পরে ধরতে পেরেছেন তারা। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এইচএসবিসি ব্যাংকে (হিসাব নম্বর ৩৭১২৭১৭৪৩৭১০) মোহাম্মদ ইকবালের নামে দুই লাখ ৯৯ হাজার ডলার জমা করে টিএফটি। গত ২০১১ সালের ১১ জুলাই এ ডলার জমা করা হয়। একইভাবে নিউইয়র্কের টিডি ব্যাংকে সুইফট কোড পদ্ধতিতে (হিসাব নম্বর ০৩১১০১২৬৬) জমা করা হয় আরও ৭৫ হাজার ডলার। এ টাকা জমা হয় চৌধুরী অ্যাসোসিয়েটসের নামে। পৌনে চার লাখ ডলার দেয়ার পর সেটি অবহিত করে একটি চিঠিও মোহাম্মদ ইকবালের ঢাকার অফিসে পাঠান মাইকেল ওয়াং। চিঠিতে মোহাম্মদ ইকবালকে ঢাকার মিলেনিয়াম হোল্ডিং লিমিটেডের এমডি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দিন যতই যাচ্ছে ততই দোয়েল ল্যাপটপ নিয়ে ডিজিটাল দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসছে।

Source: http://71.18.24.199/?cat=3

যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন


যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন
২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র আধিপত্য
চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেল গুগল

—————————————————-

যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিয়েলসেনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ছিলেন ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে অ্যান্ড্রয়েডচালিত স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। খবর টেকক্রাঞ্চের।

নিয়েলসেনের জরিপে আরও জানা যায়, দেশটির ভোক্তাদের মধ্যে অ্যাপল আইফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন ৩২ শতাংশ। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যক্তি স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন। সে বিচারে ২০১২ সালের মার্চে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন শতাংশ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে কতজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন তা-ও বের করেছে নিয়েলসেন।

সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে এশিয়ান আমেরিকানরা সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। তাদের মধ্যে দশমিক ৩ শতাংশ স্মার্টফোনকে তাদের মূল সেলফোন হিসেবে ব্যবহার করেন। স্মার্টফোন ব্যবহারকারী হিস্পানিকদের সংখ্যা ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে কম, মাত্র ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। নারীদের মধ্যে ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ আর পুরুষদের মধ্যে ৫০ দশমিক ১ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজ সবচেয়ে এগিয়ে আছে। ২৫-৩৪ বছর বয়সী তিনজন ব্যক্তির দুজনই স্মার্টফোন ব্যবহার করেন।

২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম
২০২০ সাল নাগাদ স্মার্টফোনই হবে লেনদেনের মূল মাধ্যম ২০২০ সালে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটারের মাধ্যমে লেনদেন করবে বেশির ভাগ মানুষ। নগদ অর্থ ও ক্রেডিট কার্ড দুটোই তখন দুর্লভ বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। গত মঙ্গলবার পিউ রিসার্চের একটি জরিপ থেকে জানা গেছে এ তথ্য। খবর এএফপির।

ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটার যে ভবিষ্যতে জনপ্রিয় হবে, তা তথ্যপ্রযুক্তির স্টেকহোল্ডার ও সমালোচকদের ৬৫ শতাংশই স্বীকার করেছেন। পিউ রিসার্চ ও ইলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমাজিনিং দি ইন্টারনেট সেন্টার ডিজিটাল ওয়ালেটসংক্রান্ত জরিপটি চালিয়েছিল। ১ হাজার ২১ জন এ জরিপে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের বেশির ভাগের মতে, নিরাপত্তা এবং সুবিধা দুটোই পাওয়া যায় বলে মানুষ এখন অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।


যারা স্মার্টফোনকে আগামীর ওয়ালেট হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তাদের অনেকেই ভেবেছিলেন, বিষয়টি এত জনপ্রিয় হবে না। নিরাপত্তা লঙ্ঘিত হবার আশঙ্কা, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং বর্তমান ব্যবস্থায় লাভজনক ব্যবসা বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবাদের আশঙ্কা এর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হলেও নগদ অর্থ এবং ক্রেডিট কার্ড যে একেবারেই হারিয়ে যাবে না সেটাও পিউয়ের জরিপের অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন। সামাজিক পরিবর্তনে ধীরগতি এবং আর্থিক সুবিধা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিরোধের কারণে ডিজিটাল ওয়ালেট অর্থ পরিশোধের উপায়গুলোর অন্যতম বলে বিবেচিত হবে। পিউ রিসার্চের অ্যারন স্মিথ এমনটাই মনে করেন।

ডিজিটাল পেমেন্ট সম্পর্কে গুগলের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাল ভারিয়েন বলেন, ২০২০ সাল যদিও খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি লক্ষ্য, তবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট কম্পিউটারকে যে ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তা বলাই বাহুল্য। ওয়ালেটে পরিচয়, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং অর্থ হবে। খুব জলদি সেগুলো মোবাইল ডিভাইসেও সুন্দর মতো এঁটে যাবে। গুগল গত বছরই ওয়ালেট নামে একটি সার্ভিস চালু করে। অ্যান্ড্রয়েডচালিত মোবাইল ফোনগুলো দিয়ে এ সার্ভিসটির মাধ্যমে কেনাকাটা করা যায়। পুরো ব্যবস্থাকেই সংক্ষেপে বলা হয় ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র আধিপত্য

বার্লিন, ৭ মে: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সবসময়ই আলোচনার বিষয়৷ নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এখনো বাধা রয়েছে৷ এই সীমাবদ্ধতার কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠছে বিকল্প ‘সোশ্যাল মিডিয়া’৷

গত বছরের আরব বসন্তের কথাই ধরা যাক৷ মিশর, লিবিয়া, টিউনিশিয়ার মতো দেশগুলোর গণমাধ্যম ঠিক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতো না৷ স্বৈরশাসকদের অস্ত্রের নলের মুখে মূলধারার গণমাধ্যম ছিল অসহায়৷ কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা সত্ত্বেও ফুঁসে উঠল এসব দেশের সাধারণ মানুষ৷ তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিল স্যোশাল মিডিয়াকে৷ আরো সহজ করে বললে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব’কে৷ এসব সোশ্যাল মিডিয়া আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ করে দিল৷ ইন্টারনেটে যে স্বাধীনতা তারা পেয়েছে, সেটির প্রতিফলন ঘটেছে রাজপথে৷ হোসনি মুবারক, বেন আলী কিংবা গাদ্দাফিরা আজ আর ক্ষমতায় নেই৷ পতন ঘটেছে স্বৈরতন্ত্রের, এখন গণতন্ত্রের হাওয়া বইছে মিশর, টিউনিশিয়া এবং লিবিয়ায়৷

ইন্টারনেটভিত্তিক স্বাধীন বিকল্প মিডিয়ার সন্ধান মানুষ পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে কি প্রচলিত গণমাধ্যম পরাধীনতার শিকলে বাঁধা থাকবে? এমনটা আসলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা নয়৷ যে কারণে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ধারাকে উৎসাহিত করতে, প্রতি বছরের তেসরা মে উদযাপন করা হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস৷ ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷

এখনো বিশ্বের কয়েক ডজন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই৷ মুক্তভাবে মত প্রকাশের অধিকার নেই৷ এখনো সাংবাদিক, সম্পাদকরা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন, নিহত হচ্ছেন৷

বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক৷ মাত্র কয়েকদিন আগে দৈনিক সমকাল পত্রিকার সম্পাদক গোলাম সারোয়ারকে একটি প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে হুমকি প্রদান করা হয়েছে৷ গোলাম সারোয়ার এই ঘটনার পর থানায় জিডি করেছেন৷ এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার এবং মেহেরুন রুনি৷

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী ও ব্লগার ড. শহীদুল আলম বলেন, ”আগে যতটা স্বাধীনতা ছিল, এখন তার চেয়ে বেশি আছে৷ আগে আমরা অনেক কিছু বলতে পারতাম না৷ এখন বলার সুযোগ আছে৷ কিন্তু সেটার সঙ্গে আবার যে হুমকিগুলো এখন দাঁড়িয়ে গেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার কারণ নেই৷ বাংলাদেশে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে৷ এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখানো হয়েছে৷”

প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইন্টারনেটভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, মনে করেন চীনের ব্লগার আইস্যাক মাও৷ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ”চীনের প্রচলিত গণমাধ্যম পুরোপুরি সরকার নিয়ন্ত্রিত৷ ফলে নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য তরুণ প্রজন্ম নতুন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে৷ যদিও চীনে ইন্টারনেটের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তারপরও তরুণ প্রজন্ম তথ্য আদানপ্রদানের বিভিন্ন উপায় বের করছে৷ এভাবেই তারা সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে খুব দ্রুত সংঘবদ্ধ হতে পারছে, যা চীনের শাসক গোষ্ঠীর জন্য সুখবর নয়৷”

প্রতি বছর অসংখ্য সাংবাদিক প্রাণ হারাচ্ছে পেশাগত কারণে৷ রিপোর্টার্স উইদাআউট বডার্স’র হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ১৯৷ এছাড়া কারাবন্দি রয়েছেন ১৬১ সাংবাদিক এবং ১২১ নেটিজেন৷ সূত্র: ডয়চে ভেলে।

চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেল গুগল

ইন্টারনেট সার্চ জায়ান্ট গুগল পেল চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স। এই গাড়ি চালানোর জন্য আলাদা করে কোন চালকের প্রয়োজন হবে না। বরং গাড়ি চলবে নিজেই৷ রাস্তায় অন্য গাড়িকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে৷ এমনকি কোন রাস্তায় কোন জটিলতা দেখা দিলে আপনা থেকেই গাড়িটি বেছে নেবে নিজের সুবিধাজনক জায়গা৷ গুগল এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে এই প্রযুক্তি৷ সেটা গাড়িতে জুড়ে চলছে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ আর এবার, আবার আরো একধাপ এগিয়ে গেল সংস্থাটি৷ কারণ সোমবার আমেরিকার নেভাদা রাজ্য কর্তৃপক্ষ গুগলকে এই গাড়ির লাইসেন্স দিয়েছে৷ লাইসেন্স পাওয়ার পর গুগল প্রথম যে চালকবিহীন গাড়িটি রাস্তায় নামাচ্ছে, সেটি টয়োটা কোম্পানির৷ প্রিয়াস মডেলের গাড়িতে চালকবিহীন প্রযুক্তি যোগ করছে গুগল৷ আরো অনেক গাড়ি কোম্পানি অবশ্য নেভাদায় চালকবিহীন গাড়ির লাইসেন্স পেতে আবেদন জানিয়েছে৷ চালকবিহীন গাড়িতে থাকছে ভিডিও ক্যামেরা, রাডার সেন্সর এবং লেজার রেঞ্জ ফাইন্ডার৷ এসব ব্যবহার করে রাস্তায় থাকা অন্যান্য গাড়ি এবং বস্তুর অবস্থান সনাক্ত করবে চালকবিহীন গাড়িটি৷ গুগলের ইঞ্জিনিয়াররা এরই মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় এই গাড়ি পরীক্ষা করেছে৷ তখন অবশ্য গাড়ির মধ্যে একজন অভিজ্ঞ চালক ছিলেন৷ বাড়তি সতর্কতা হিসেবে তাকে রাখা হয়েছিল৷ গুগল সফটওয়্যার যদি কোন কারণে কাজ না করে তাহলে যাতে চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন সেজন্যই রাখা হয়েছিল একজন দক্ষ চালক৷ বলাবাহুল্য, পরীক্ষামূলক এই চালনায় কোন ধরনের বড় জটিলতা ধরা পড়েনি৷ গুগলের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সেবাস্টিয়ান থ্রুন এই বিষয়ে বিবিসিকে বলেন, কোন ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই চালকবিহীন গাড়িটি এক লাখ চল্লিশ হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছে৷ এই চলার পথে শুধুমাত্র একবার ট্রাফিক সিগন্যালে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দিয়েছিল চালকবিহীন গাড়িটিকে৷ নেভাদার মোটর ভেহিক্যালস বিভাগের পরিচালক ব্রুস ব্রেসলো মনে করেন, চালকবিহীন গাড়ি হচ্ছে ভবিষ্যতের গাড়ি৷ রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ি চলাচলের অনুমতি দিতে গত মার্চ মাসে আইন পরিবর্তন করে নেভাদা৷ ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষকে এই গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার কথাও ভাবছে রাজ্যটি৷


‘কিভাবে সফল জুটি গড়বেন’


আধুনিক ঘটক

Published On 12-04-2012

‘কিভাবে সফল জুটি গড়বেন’ সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা প্রশ্নটির বিজ্ঞাননির্ভর উত্তর নিয়ে এসেছে বলে দাবি ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলোর। কিন্তু তারা কী সত্যি সেটা পারছে?  অন্যরা বাদ সাধবে জেনেও ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ায় মানুষ। আর এই অন্যদের মধ্যে মা-বাবা, ধর্ম, বন্ধুসহ আমলাতন্ত্রও রয়েছে। তাদের সবার উদ্দেশ্য কমবেশি একইরকম। তারা মনে করে, জোড় বাঁধা মানুষগুলোর চেয়ে, আগের মানুষটিকে তারা বেশি চিনত-জানত।

তবে, তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে ইন্টারনেটের দুনিয়াতেও পাওয়া যায় ঘটক। পুরনো ঘটকের সঙ্গে তুলনায়, অন্তত দু’ভাবে এই ঘটকরা আলাদা। প্রথমত, তাদের প্রথম উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন করা। দ্বিতীয়ত, যারা একক থেকে দ্বৈত হতে চান তাদের মনে ঘটকের নানা আচরণে বিরক্তি আসলেও সেটাকে অগ্রাহ্য করে তাদের অপেক্ষা করতে হয়। ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছে সাধারণত দুটো প্রতিশ্রুতি নিয়ে উপস্থিত হয়। একটি হলো, তারা আসলে ঘটক বলতে যা বোঝায় তা নয়, এমনকি পথে-ঘাটে ছড়িয়ে থাকা কোনো সুযোগ-সন্ধানীও নয় তারা। সম্ভাব্য জীবন সঙ্গীনিকে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে একজনকে বাছাইয়ের সুযোগ থাকছে এখানে। এছাড়াও, সমমনা একজনকে খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে এবং ‘চিরসুখী’ হওয়ার প্রত্যয়ে ঘর বাঁধার বিষয়টি যে তারা বাড়িয়ে তোলে তাও বিজ্ঞানসম্মত।

সঙ্গীনিকে বাছাই করার ক্ষেত্রে অনেক থেকে একজনকে পছন্দ থাকার সুযোগটি প্রশ্নাতীত। কিন্তু এটা কী প্রকৃতার্থেই ভালো কোনো ফল বয়ে আনছে? বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এই অ্যালগরিদম কী আসলেই ক্রিয়াশীল কিংবা বিয়েপূর্ব সম্পর্কের ক্ষেত্রে (অন্তত ভালোবাসার নামে প্রতারণা) কী ভালো কিছু বয়ে আনতে পারছে? এই প্রশ্নগুলো রেখেছেন ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনরোগ বিশেষজ্ঞ দলপ্রধান এলি ফিনকেল। ভালোবাসা দিবসের প্রাক্কালে ‘সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স ইন দ্য পাবলিক ইন্টারেস্ট’-এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯৫ সালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য তৈরি ঘটক সাইট ম্যাচ.কম-এর পর্যালোচনা করেই এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। ড. ফিনকেল ও সহকর্মীরা বহু কোটি ডলারের এই ঘটক সাইটটি বেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, যা আসলে প্রচন্ড সন্দেহ উদ্রেককারী।

পাক্কা জীবনসঙ্গীর নীলনকশা? : এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষকদের প্রথম পর্যবেক্ষণে তারা আসলে যেসব উপাত্ত যোগাড় করেছেন, তা যথার্থভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন। এমনকি, তারা দেখাতে পারেনি এসব ঘটক সাইটের মাধ্যমে ঘরবাঁধা দুজনের অ্যালগরিদম ঠিকমত কাজ করছে কিনা।

অবশ্য, বাণিজ্যিকভাবে এটি যথেষ্ট ঝামেলামুক্ত। জনগণের কাছ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বুদ্ধিভিত্তিক সম্পত্তিকে বাণিজ্যিক কারণে গোপন রাখছে। কিন্তু এদের মধ্যে কেন ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো নেই, সে বিষয়ের প্রশ্ন তোলার কারণ নেই। এখানে স্বাধীন বিজ্ঞাননির্ভর কোনো প্রমাণ নেই, যার ফলে জানা যাবে, জোড়া বেঁধে ফেলার পর তরুণ-তরুণীরা পুনরায় ওয়েবসাইটগুলোতে ঢু মারছে কিনা। আর এ বিষয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা লিখেছে কোম্পানির ভেতরকার লোক, যারা আসলে কখনোই প্রকাশ করবে না তাদের কর্মীরা কম্পিউটার প্রোগ্রামগুলো নিয়ে কিভাবে কাজ করছে।

কঠিন কাজ হলেও এটা নির্ণয় করা সম্ভব যে, উপযুক্ত চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের বিচারেই একে অপরের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে কিনা তা খুঁজে দেখার বিষয়টি। কোনো সন্দেহ নেই, তারা সেটা করে। তারা যেটা করে সেটা হচ্ছে, বিষয়ভিত্তিক কিছু প্রশ্ন দিয়ে একটি আবেদনপত্র পূরণ করিয়ে নেওয়া হয়। যা আসলে অনুমাননির্ভর, কিন্তু প্রমাণিত নয়। যদিও এটা ভালো যে, দু’জনের মধ্যে মিল থাকলে তারা সফল দম্পতি হতে পারবেন। আর এই অংশটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই ২০১০ সালে প্রকাশিত নিউইয়র্কের হোবার্ট অ্যান্ড উইলিয়াম স্মিথ কলেজের ড. পোর্শিয়া ডাইরেনফোর্থের একটি নিবন্ধের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ড. ফিনকেল। অন্তত হাজার বিশেক মানুষের কাছে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন এবং তাদের ব্যক্তিত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন ডেরেনফোর্থ। যেসব দম্পতির চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বের মিল রয়েছে তাদের অন্যদের তুলনায় সুখী বলে নিজের গবেষণায় উল্লেখ করেন ডেরেনফোর্থ। কিন্তু সেই ব্যবধান যে অনেক বেশি তা কিন্তু নয়। সেই পরিমাণ ছিল মাত্র ০.৫ শতাংশ। ড. ফিনকেল বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দাবি করে, তাদের অ্যালগরিদম একটি সম্পর্ক তৈরি ও তা স্থায়ীকরণের সুযোগ তারা বাড়িয়ে দিতে পারে, তখন আমি খুব একটা সমস্যা দেখি না। কিন্তু আমি তখনই অাঁতকে উঠি যখন প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে দেখি, আমরা আপনার জন্য আপনার আত্মার সঙ্গীকে তুলে এনে খুঁজে বের করে দেব।’

নিশ্চিতভাবে, সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো পছন্দ থেকে বাছাই করে নেওয়ার বিষয়টি জাদুকরি হলেও কিন্তু সেখানে কিছু বিষয় আছে, যা আসলে যতটা সহজ মনে হয়, আদতে ততটা সহজ নয়।

কিছু ডেটিং সাইটের অ্যালগরিদমের অবশ্য উচ্চ-বাচ্য ‘আমরাই সবার সেরাটা জানি’ এধরনের কোনো ভাব থাকে না। বরং তাদের ক্রেতা অর্থাৎ কোনো পুরুষ অথবা নারীকে তাদের পছন্দের নারী কিংবা পুরুষকে পছন্দ করার জন্য, ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত ওই ব্যক্তির তথ্য জানার সুযোগ দেয়। এটা অনেকটা যেন, সঙ্গী নির্বাচন করতে তাদের সুবিধা হয় এমন।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ আসলে ভাবে তারা সেটাই চায়, যা তাদের অবশ্যই প্রয়োজন। এটা সত্য যে, প্রত্যেক ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে মূলত অনুমান শক্তিই কাজ করে। কিন্তু ইন্টারনেটে বসে একটি বই কিংবা ওয়াশিং মেশিন পছন্দ করেও সেটি সম্পর্কে মনের বদল ঘটলে সেটা যেমন অপরাধের বিষয় নয়, ঠিক তেমনি ইন্টারনেটে বসা পছন্দ করা জীবনসঙ্গী সম্পর্কেও মনের বদল ঘটলে, সেটাও প্রতারণা হবে না। তার ওপর, গবষেণা বলছে, মানুষ আসলে কি চায়, সেই সম্পর্কে মানুষের আসলে অত ভালো ধারণা নেই। ফিনকেলের নিজস্ব একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন ইন্টারনেটে বসে ডেটিংয়ের জন্য সঙ্গী বাছাই করে, এবং শুরুতে যেসব আচরণ করে, তা আসলে কখনোই তাদের প্রকৃত চাওয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে না বা সঙ্গতিপূর্ণ হয় না।

এছাড়া, পছন্দের অনেক বেশি সুযোগ থাকাটাও একটা বড় সমস্যা। ক্রেতাদের পছন্দের ওপর তৈরি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, চকোলেট থেকে শুরু করে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া পর্যন্ত বিষয়গুলোতে তারা বেশ চিন্তায় পড়ে যায়, কোনটা ছেড়ে কোনটা গ্রহণ করবে। বরং ৩০ থেকে ৪০টি পছন্দের সুযোগ থাকলে সেখান থেকে একটি বাছাই করা যতটা কঠিন, কোনো পণ্যের পরিমাণ ছয় থেকে ১২ হলে সেটার মধ্যে একটি বাছাই করাটা ততটাই সহজ। আর ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো তাদের ক্রেতাদের জন্য অল্পসংখ্যক পছন্দ কখনোই রাখে না, বরং থাকে হাজারো সুযোগ। আর সমস্যাটা হয় এখানেই।

ভালোবাসার সুপার মার্কেট :
বহুল মানুষের ভিড় থেকে নিজের পছন্দের মানুষটি বেছে নেওয়া কিন্তু সহজ বিষয় নয়। ইন্টারনেট ডেটিংয়ের প্রেক্ষাপটে, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর ড. ফিনকেলের গবেষণায় নেই। কিন্তু স্পিডডেটিং এ বিষয়ে একটি উত্তর দিতে পারে। যেখানে তিনি খুঁজে পেয়েছেন, অনেক পছন্দের মুখে পড়ে যখন একজন ব্যক্তি কাউকে খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি কম গুরুত্ব দেয়, বরং পছন্দের মানুষ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের উচিত চিন্তা-ভাবনার মধ্য দিয়ে পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা বিষয়ে বাস্তব ধারণা নেওয়া। অন্যভাবে বলতে গেলে, পছন্দ করতে গিয়ে মানুষের মনের ক্ষমতাও কখনো নিষ্প্রভ হয়ে ওঠে।

ড. ফিনকেলের প্রতিবেদনে যে কথাটা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সেটা হলো, অন্য সবক্ষেত্রের মতো ইন্টারনেটে বসেও ভালোবাসার সন্ধান পাওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়। এটা ব্যবহার করতে না জানাটা কোনো কারণ নয়। বরং, সৌভাগ্যবান হলেও আপনার কাছের কোনো রেস্তোরাঁতেও আপনি পেয়ে যেতে পারেন প্রিয় মানুষটিকে। কিংবা, পথের ধারে কাউকে এক পলকে ভালো লেগে গেলে, সে যদি অচেনাও হয়, ছুটে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলুন। কিন্তু মাউস ক্লিক করে যদি ইন্টারনেট থেকে আপনি কাউকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, তবে একদিন দেখবেন, কিউপিডের তীরটি ছুটে এসে আপনার বুকেই বিঁধবে।

আল-জাজিরায় ঘটক পাখি ভাই


বিশ্ব ভালবাসা দিবসে মধ্যপ্রাচ্যের প্রখ্যাত টিভি নেটওয়ার্ক আল-জাজিরার বিশেষ রিপোর্ট। শিরোনাম ‘দ্য সাকসেসফুল ম্যাচ মেকার অব বাংলাদেশ।’ তিনি আর কেউ নন, ঘটক পাখি ভাই। সফল জুটি মেলানোর গোপন সূত্র সম্পর্কে পাখি ভাই বলেন, বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা। কোন বিষয় লুকিয়ে না রাখা। পাখি বলেন, আমি পাত্র ও পাত্রী পক্ষকে সব খুলে বলি। উভয় পরিবারের পরিচয় করিয়ে দিই। আমার কাজ শেষ। তারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে সব ঠিক করেন। পছন্দ হলে বিয়ে হয়। না হলে হয় না। আর এভাবেই খ্যাতি পেয়েছেন ভালবাসার গুরু হিসেবে। জুটি মেলোনোর সফল কারিগর তিনি। পাখি ভাই। ঘটক। এখন পর্যন্ত জুটি মিলিয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি। মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তার পরিবারে বিয়ে দিয়েছেন। নায়ক-নায়িকা, ফ্যাশন মডেলের বিয়ে দিয়েছেন। বা-মা তাদের সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিরও বিয়ে হয়েছে পাখি ভাইয়ের মাধ্যমে। একটি পরিবারে ২৬টি পর্যন্ত বিয়েতে ঘটকালি করেছেন। দাম্পত্য জীবনে সুখ মন্ত্র হিসেবে তিনি বলছেন, বিশ্বাস আর সততা।
তবে তার আসল নাম কিন্তু পাখি নয়। কাজী আশরাফ হোসেন। অবশ্য এ নামে গত ৪০ বছরে কেউ তাকে ডাকেনি। নিজের আসল নামটা ভুলেই গেছি- বললেন পাখি ভাই। কেন তার নাম পাখি হলো? অকপট উত্তর- পাখির মতো এখানে সেখানে ছুটে বেড়াতাম। কেউ পাত্র বা পত্রী খুঁজছে জানতে পারলেই ছুটতাম তার বাড়ি। এ থেকেই মানুষ আমার নাম দিল পাখি। আমি হলাম ঘটক পাখি ভাই। এ নামেই এখন আমার কোম্পানির নাম। ‘ঘটক পাখি ভাই প্রাইভেট লিমিটেড।’
কোন ধরনের বিয়ে দিয়ে বেশি আনন্দ পান জানতে চাইলে তিনি বলেন- যখন একটা কালো, মোটা, শ্রীহীন মেয়ের জুটি মিলিয়ে দিতে পারি তখন আনন্দ হয়। মনে হয়, একটা ভাল কাজ করতে পারলাম। পাখি বলেন, মানুষের আসল সৌন্দর্য মনে। বাইরের সৌন্দর্য মেকি। তারপরও বেশিরভাগ মানুষ সুন্দর বউ চায়। বলে সুন্দর বউ না হলে বাইরে মুখ দেখানো যাবে না। কিন্তু সুন্দর বউ নিয়েই ঝামেলা বেশি।
সুখী সংসার কেমন জানতে চাইলে পাখি ভাই বলেন- কম টাকা, কম চাহিদা, একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভালবাসা যদি থাকে তবে সেটাই সুখের সংসার। এমন সংসারের স্বাদ যে একবার পেয়েছে সে শুধু জানে জীবনে সে কি পেয়েছে। আর স্বামী যদি মদ খায়, নাইট ক্লাবে যায় তবে সংসারে অশান্তি অনিবার্য। একইভাবে স্ত্রী যদি পর পুরুষের সঙ্গে ঘোরে। ডিস্কোতে নাচে, মদ খায়, সিগারেট টানে তবে সুখ তাদের কাছ থেকে পালায়। সংসার থাকে নামে মাত্র। তারা দু’জনেই জানে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অভিনয় করে চলেছে। জীবনভর এ অভিনয় করতে হয়। আবার পাত্রের যদি লোভ থাকে। শ্বশুরের কাছ থেকে অনেক কিছু নেবে- এমন মনোভাব থাকে তবে সে ঠকতে বাধ্য। আবার পাত্রীর মধ্যে যদি হাই-ফাই ভাব থাকে। অহঙ্কার-বড়াই থাকে তবে সেও ঠকবে।
সফল দাম্পত্য জীবনের মন্ত্র কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানেও বিশ্বাস। স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন তবে সে সংসার কখনই ভাঙবে না। কিন্তু তারা যদি ক্রমাগত একে অপরকে মিথ্যা বলেন, কথা গোপন করেন তবে সে সম্পর্ক ভাঙতে বাধ্য। সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সম্পর্ক না ভাঙলেও দাম্পত্য জীবনের মৃত্যু ঘটবে। সুখ-শান্তি থাকবে না। তখনই মানুষ হয়ে যায় বাহির মুখী। সুখের খোঁজে মানুষ নদীর ওপারের পানে চেয়ে থাকে।
ঘটকের মাধ্যমে পাত্র-পাত্রী কারা চায় জানতে চাইলে পাখি ভাই বলেন, যে সব মেয়ে জিন্স প্যান্ট পরে, চুলে রং করে রাত-বিরেতে ঘোরে তাদের পাত্রের অভাব হয় না। তাদের অনেকের ৩-৪ বার করেও বিয়ে হয়। কিন্তু যারা নম্র, ভদ্র, লাজুক। যারা প্রেম করতে জানে না বা প্রেম করার ফুরসত পায়নি তারাই আমার পাত্রী। ছেলেদের ক্ষেত্রেও একই। আবার সংসার ভেঙে গেছে এমন পাত্র-পাত্রীও আছে অনেক।
ঘটক পাখি ভাইয়ের কাছে প্রতি মাসেই শ’ শ’ মানুষ আসে জুটি মিলিয়ে নেয়ার জন্য। এতসব মানুষের নাম, ঠিকানা, পছন্দ মনে রাখা কঠিন। তাই একটি কম্পিউটারে বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন তিনি। প্রতিটি ক্লায়েন্টের জন্য দেয়া হয় একটি পাসওয়ার্ড। পাসওয়ার্ড টিপলেই ক্লায়েন্টের সব তথ্য চলে আসে। অবশ্য পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। চাইলেই যে কেউ যে কোন পাত্র বা পাত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য জানতে পারে না। চাহিদা অনুযায়ী উপযোগী পাত্র-পাত্রীর ছবি, তথ্য জানানো হয়।
জুটি মেলাতে গিয়ে কখনও কোন ঝামেলা হয়েছে কি না জানতে চাইলে পাখি বলেন, একবার একটা বিয়ে নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। এক থানার ওসি আমাকে অনেক রাতে ফোন করেছিল। ঘুমের মধ্যে ওসির সঙ্গে একটু খারাপ ব্যবহার হয়ে গিয়েছিল। পরে ওসি আমাকে থানায় ডেকেছিল। হয়রানি হয়েছিল খুব।
৪২ বছর ধরে চলছে পাখি ভাইয়ের ঘটক জীবন। ঘটকালি করতে কেমন লাগে জানতে চাইলে পাখি বলছেন, এটা এখন আমার নেশা। পেয়ার, মহব্বতের কাজ। তাই শুক্রবারও অফিস করি। প্রচণ্ড জ্বর নিয়েও অফিসে বসেছি। একদিন অফিসে না এলে আমার দিন কাটে না। যখন আমার মাধ্যমে একটা বিয়ে হয় তখন শুকরিয়া আদায় করি। মনে হয় একটা সওয়াবের কাজ করলাম। দিনভর ব্যস্ত থাকেন পাখি ভাই। শ’ শ’ ফোন রিসিভ করতে হয়। এজন্য তিনি বেশ ক’জন সহকারী নিয়োগ করেছেন।
পাখির বাড়ি বরিশাল জেলার সদর থানায়। বাড়ি গেলে মানুষ আপনাকে কেমন চোখে দেখে? বাড়ি গেলে অনেকেই এগিয়ে এসে হাত মেলায়। সম্মান দেয়। আমার ছেলেমেয়েদের খোঁজ রাখে। তারা ভাবে আমি ভাল কাজ করি। মানুষের উপকার করি। জুটি মিলিয়ে দিতে পারলে কত টাকা পান? আমার কাছে টাকা বড় নয়। অনেক বিয়ে দিয়েছি যেখানে একটি টাকাও নিইনি। গরিব পরিবারের বিয়ে। আবার একটা বিয়ে দিয়েই ৪ লাখ টাকা পেয়েছি। ১-২ লাখ টাকা তো অহরহ পাই। সেদিনও একটা বিয়ে দিয়ে ২ লাখ টাকা পেলাম। এ আয় দিয়েই আমার সংসার চলে। বাড়ি-গাড়ি করতে পারিনি। তবে ডাল-ভাতের অভাব আমার সংসারে নেই। এখন পর্যন্ত কেমন পরিবারের বিয়ে দিয়েছেন? বিয়ে দিয়েছি মন্ত্রী-এমপির ছেলেমেয়ের, তাদের আত্মীয়দের। পুলিশ কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, সাংবাদিক, বড় সরকারি চাকুরের বিয়ে দিয়েছি অসংখ্য। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ইউকেসহ বিশ্বের বহু দেশে বাস করা লোকজনের বিয়ে দিয়েছি। বাংলাদেশের এমন কোন জেলা নেই যে জেলায় আমি বিয়ে দিইনি। আবার এমনও আছে বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছে আমার হাতে। এখন তাদের ছেলেমেয়ে এমনকি নাতি-নাতনিরও বিয়ে দিয়েছি। একটি পরিবারের ২৬টি পর্যন্ত বিয়ে দিয়েছি। অনেক পরিবার আমাকে তাদের পরিবারেরই সদস্য মনে করে। আচারে অনুষ্ঠানে ডাকে। আবার এমন ঘটনা অহরহ হয় যে আমার মাধ্যমে পরিচয় হয়েছে, পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমাকে বলে পছন্দ হয়নি। কিন্তু পরে জানতে পারি আমাকে ফাঁকি দিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে। তখন তাদের গিয়ে ধরি। বলি আমার পারিশ্রমিকটা দেন। এ সেদিনও এমন ঘটনা জানতে পেরে লোকজন নিয়ে হাজির হলাম এক কমিউনিটি সেন্টারে। তখন বলল, ভুলে গেছিলাম। সুড় সুড় করে টাকা বের করে দিল। অনেকে আবার আমার মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে এটা লুকাতে চায়। আমাকে বলে বিয়েতে যাবেন না। কাউকে বলবেন না।
পাখি ভাইয়ের অফিসে তার সহকারী হিসেবে সুশ্রী অনেক তরুণী কাজ করছেন। পাত্রী খুঁজতে এসে এসব তরুণীদের কেউ পছন্দ করে ফেলেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে যেসব মেয়েকে আমি কাজ দিই তারা সবাই বিবাহিত। তারা আমার মেয়ের মতো। ১০-১২ বছর ধরে আমার এখানে অনেকেই কাজ করছেন। সম্পূর্ণ পেশাদারি মনোভাব নিয়েই কাজ করে তারা। পাখি ভাইকে নিয়ে দেশে তো বটেই বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, গার্ডিয়ান পত্রিকায় ফলাও করে ফিচার ছাপা হয়েছে তাকে নিয়ে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ বিশ্ব ভালবাসা দিবসে আল জাজিরা তাকে নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট প্রচার করেছে। আল জাজিরায় পাখিকে দেখা যায় ফুল হাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন পার্কে, লেকের ধারে। আসলেই কি এত সুখের সংসার তার? পাখি বলছেন, আমি বিয়ে করেছি দুটো। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। তিনি এখনও আমার ঘরে আছেন। তবে ২৭ বছর ধরে তিনি অসুস্থ। পরে আরেক মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রেমই বলতে পারেন। তবে তাতে আমার পরিবার বা তার পরিবারের কোন অসম্মতি ছিল না। প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে পারিবারিকভাবেই তাকে বিয়ে করেছি। আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলেমেয়েদেরও বিয়ে দিয়েছি আমি। পাখি বলেন, আমার দুই স্ত্রী। কিন্তু দু’জনেই আমার কাছে সমান। প্রয়োজনের তাগিদে আমি আরেকটি বিয়ে করেছি। কিন্তু আমার সংসারে সুখের কমতি নেই। আল জাজিরায় রিপোর্ট প্রকাশের পর কেমন লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো লেখাপড়া বেশিদূর জানি না। তাই জানতাম না আল জাজিরা কত বিখ্যাত টিভি। ওরা ৪ দিন ধরে স্যুটিং করল। রিপোর্ট প্রচারের পর বিশ্বের কত দেশ থেকে ফোন আসছে। সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমার স্ত্রী যারপরনাই খুশি। কোটি টাকা দিয়েও তো এ সম্মান পেতাম না। পাখি ভাই বলেন, ১৯৭৩ সালে ঢাকায় এসেছি। তখন হেঁটে, বাসে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। পরে পুরনো ঢাকায় অফিস নিলাম। সেখান থেকে ইস্টার্ন প্লাজা। এখানে আছি ২২ বছর ধরে। মানুষের ভালবাসা আর বিশ্বাস না থাকলে এতদিন টিকে থাকতে পারতাম না। পাখি ভাই বলেন, তবে সবাই এক নয়। ম্যারেজ মিডিয়ার নামে অনেকে প্রতারণার ব্যবসা খুলে বসেছেন। তাদের কারণে এ পেশার দুর্নাম হচ্ছে। ঘটক পাখি ভাইয়ের বয়স এখন
  ৭০ ছুঁই ছুঁই। ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক তিনি।  দু’ছেলে ও দু’মেয়ের ভাল ঘরে বিয়ে দিতে পেরেছি বললেন পাখি। আরও বললেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কাজই করে যেতে চাই।
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls

জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে


সামাজিক যোগাযোগ :ফেসবুকের এপিঠ-ওপিঠ

মো. আবদুল হামিদ

যুবসমাজের মাথা বিগড়ে দেয়া ‘ফেসবুক’-এর অকল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্নদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে এবং বেশ ইতিবাচক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক জরিপে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলে মনটা হালকা হয় বলে ফুরফুরে মেজাজে চলমান কাজে অধিকতর মনোযোগী হওয়া যায়। সে গবেষণায় ফেসবুকবিমুখদের মনোযোগের লেভেল ব্যবহারকারীদের তুলনায় কম বলেও প্রতীয়মান হয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতে, ফেসবুক তাদের আত্মবিশ্বাসের লেভেল বাড়াতে সাহায্য করে। কানেক্টিভিটির এ যুগে দীর্ঘ সময় নিকটজনের খোঁজখবর না পেলে বা নিজে কোথায়, কী করছে তা ঘনিষ্ঠজনদের জানাতে না পারলে কেমন যেন অস্বস্তি কিংবা উদ্বিগ্নতা কাজ করে। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য হলেও একবার ঢুঁ মারতে পারলে অনেকটা সময় নিশ্চিন্ত মনে কাজে ডুব দেয়া যায়। ফেসবুক বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত সোস্যাল নেটওয়ার্ক। কে জানত পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের জন্য জাকারবার্গ যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন (২০০৪ সালে নিজেরা শুরু করলেও উন্মুক্ত হয় ২০০৬ সালে) তা মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সম্প্রসারণশীল সাইটে পরিণত হবে! কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করে ২৫ কোটির বেশি ইউজার, যাদের গড়ে ১৩০ জনের বেশি বন্ধু রয়েছে এবং মাসে ৭০ হাজার কোটি মিনিটের বেশি ফেসবুক ব্যবহার হয়। মোট ব্যবহারের ৭০ শতাংশ নন-আমেরিকান এবং পর্নো পেজ ও গ্রুপগুলো ভিজিট হয় সবচেয়ে বেশি। আইফোন ও অন্যান্য সেল ফোনে ইন্টারনেট চালু হওয়ায় ফেসবুক ব্যবহারের প্রবণতা গোটা বিশ্বেই ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুরু থেকেই ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ, উন্নত দেশগুলোয় যা কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাজ্যে অন্য এক স্টাডিতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের (২১ থেকে ২৯ বছর বয়সী) পাশাপাশি মানসিক চিকিত্সায় নিয়োজিত কিছু বিশেষজ্ঞের মতামতও নেয়া হয়েছে। অধিকাংশের মতে, পরিমিত মাত্রায় ফেসবুকের ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। কোনো স্ট্যাটাস দেখে উচ্চ স্বরে হেসে ওঠা, ভালো লাগা এমনকি সাময়িক কষ্ট পাওয়া মস্তিষ্ককে সচল করে এবং আগের তুলনায় বেশি কনসেনট্রেট করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় এক জরিপে দেখা যায়, যারা বাস্তব জীবনে সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বজায় রাখতে কম দক্ষ, তারাও ফেসবুকে সফলভাবে যোগাযোগ করতে পারেন। অর্থাত্ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা যারা ঘরকুনো বলে অবহেলিত তারাও অন্যদের মতো এ মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষায় সক্ষম। তবে সবচেয়ে ভালো দিক হলো বন্ধুরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাক (এমনকি স্থান বদলের পরও), যোগাযোগের ঠিকানা জানতে বা পরিবর্তন করতে হয় না। এক ক্লিকেই তথ্য, ছবি, ভিডিও সব পাওয়া যায় এবং প্রায় বিনা খরচে। তবে সুফলের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রযুক্তির অপব্যবহারের শঙ্কাও বাড়ছে; যেমন— আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সেদিন শিক্ষকের লেকচার ভালো লাগছিল না বলে ক্লাসরুমে বসেই ফেসবুকে এ সম্পর্কে স্ট্যাটাস দেয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা তার জবাবে নানা ধরনের প্রতিমন্তব্য করে, যার শেষটা মোটেই সুখকর ছিল না। কয়েক মাস আগে জাবি ও বুয়েটের দুই শিক্ষককে আদালত তলব করেন স্ট্যাটাস ও কমেন্ট লেখার কারণে। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ফেসবুক নিয়ে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের মাত্রাও দিন দিন বাড়ছে।
হতাশ হওয়ার মতো অনেক তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ২০০৯ সালে যত বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে তার ২০ শতাংশই ছিল সরাসরি ফেসবুকজনিত কারণে। অর্থাত্ স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ফলো করত, তারপর পাসওয়ার্ড নিয়ে নজরদারি; একপর্যায়ে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে এবং কোর্টের মাধ্যমে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তারা। অনেক দেশে এটাকে অ্যালকোহল বা কোকেনের মতোই ভয়াবহ মনে করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য যেমন শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে একটানা বেশি সময় ফেসবুক ব্যবহার তেমনি ক্ষতিকর। শরীরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা করা, ঘাড় বা পিঠে ব্যথা, হাতের ও হাঁটুর গিটগুলোয় ব্যথা অনুভব করা, মাথা ধরে থাকা প্রভৃতি উপসর্গ প্রায়ই লক্ষ করা যায়। তা ছাড়া খাবার খেতে অনিয়ম করা ফেসবুক অ্যাডিক্টদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তারা ফাস্টফুড ও শুকনাজাতীয় খাবারে বেশি আগ্রহী হয়, যা সুষম খাদ্য সরবরাহ করে না এবং শরীরচর্চা না করায় মোটা হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ক্রিকেট খেলার বিরোধিতা করেছিল এ যুক্তিতে যে খেলোয়াড়, আয়োজক, দর্শক সবারই দিনের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয় খেলার পেছনে; ফলে তারা কাজ করবে কখন? সে দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক ব্যবহারে কত শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয় তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সে কারণেই হয়তো চীন ও ইরানের মতো দেশগুলো এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এক গবেষণা সংস্থা বলেছে, বাংলাদেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। তারা যদি দিনে গড়ে ১০ মিনিট করে ফেসবুক ব্যবহার করে, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার কর্মচারীর এক মাসের শ্রমঘণ্টার চেয়েও বেশি পণ্ডশ্রম হচ্ছে প্রতিদিন আমাদের মতো গরিব দেশে!
ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকার অধিকাংশই বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে অথবা গত কয়েক বছরে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। ফলে তরুণদের ফেসবুক ব্যবহার প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার বেশ সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ের উল্লেখ মনে হয় প্রাসঙ্গিক হবে, মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ঐশ্বরিয়া রাইকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ধরা যাক তার সামনে দুটি অপশন আছে: কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ হওয়া অথবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা— আধুনিক তরুণী হিসেবে সে কোনটাকে বেছে নেবে এবং কেন? ঐশ্বরিয়া বেছে নিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষা; কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এটি জানা থাকলে কম্পিউটার শেখাটা সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু কম্পিউটার শিক্ষা ভাষার মান বাড়াতে পারবে না। তা ছাড়া অনেক পেশা আছে, যেখানে কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ না হয়েও ভালো ইংরেজি জ্ঞান দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব। হলভর্তি দর্শক জোরে হাততালি দিয়ে তার জবাবকে সমর্থন করেছিলেন, আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম তাত্ক্ষণিক ওই কথায়। কয়েক বছর আগে যখন তরুণদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে, তখন খুব আশাবাদী হয়েছিলাম যে, এ অসিলায় অন্তত আমাদের তরুণরা ইংরেজি ভাষাটা ভালোভাবে রপ্ত করবে। কিন্তু ভয়ঙ্কর কিছু ব্যাপার তারা ফেসবুক ভাষায় ব্যবহার করছে, যা তাদের অধঃপতনই ত্বরান্বিত করছে; কল্যাণ নয়। একটি হলো ইংরেজি অক্ষরের মাধ্যমে বাংলা লেখা। এতে আগে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে সে যা বলতে চাইছে তার ইংরেজি শব্দটা বা বাক্যটা জানার চেষ্টা করত এখন তার প্রয়োজন শেষ হয়েছে। ফলে নতুন কোনো ইংরেজি শব্দ না শিখেও তারা অনায়াসে মেসেজ পাঠাচ্ছে, মন্তব্য করছে। আরেকটি বিষয় হলো, তারা বড় ও জটিল শব্দগুলোকে সংক্ষিপ্ত করছে। বড় শব্দকে ছোট লিখতে গিয়ে তারা প্রকৃত বানানটা ভুলে যাচ্ছে। অনেকেই যখন বানান নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়, তখন মাঝের দু-তিনটা অক্ষর বাদ দিয়ে শব্দটা লেখে। তাতে সঠিক বানান না জানার দুর্বলতাও গোপন করা যায়; আবার স্মার্টনেসও দেখানো হয়। এর কুপ্রভাব সাম্প্রতিক কালে পরীক্ষার উত্তরপত্রেও লক্ষ করা যাচ্ছে, বানান ভুলের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। সংক্ষেপ হলেই স্মার্ট হয়— এ ভয়াবহ ধারণাটি আমাদের তরুণদের এখানেও আক্রান্ত করেছে। উন্নত দেশের যে মেয়েটি মিনি স্কার্ট পরে সে কিন্তু ক্লাসরুমেও অল্প কথায় মূল মেসেজটি সবার সামনে তুলে ধরতে পারে। দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাদের পোশাকের ঢঙটাই নকল করতে চেষ্টা করে, জ্ঞানের উত্কর্ষতা নয়।
ক্যারিয়ার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ থাকায় চেষ্টা করি এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে। আমাদের তরুণরা হয়তো এখনো ভাবতে শুরু করেনি, তার ফেসবুক প্রোফাইল ও স্ট্যাটাস চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধক হতে পারে। ইউরোপের বিখ্যাত একটি ফাইভ স্টার হোটেল চেইনের হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের প্রধান সেদিন জানালেন, সিভিতে প্রদত্ত ই-মেইল আইডি ব্যবহার করে ফেসবুক ও অন্যান্য সোস্যাল নেটওয়ার্কে চাকরিপ্রার্থীর অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করেন। সিভিতে যেসব দিক উল্লেখ থাকে, প্রার্থী বাস্তব জীবনে তার কতটা চর্চা করেন— তা বুঝতে চেষ্টা করেন! প্রশ্ন করা হয়েছিল, অনেকের অ্যাকাউন্ট তাদের বন্ধু ছাড়া কেউ দেখতে পারে না, সে ক্ষেত্রে কীভাবে দেখেন? তিনি বলেন, বড় বিজ্ঞাপনদাতা হওয়ায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় অ্যাকাউন্টগুলোয় ঢুকতে পারেন। সেখানে বিশেষভাবে খেয়াল করেন প্রার্থী ফেসবুকে আসক্ত কি না। তা ছাড়া সে কী ধরনের স্ট্যাটাস দেয়, তার বন্ধুদের তালিকায় থাকা অধিকাংশ লোক কোন প্রকৃতির, দিনের কোন অংশে পোস্ট দেয়ার প্রবণতা কেমন, কমেন্টগুলো কতটা বুদ্ধিদীপ্ত প্রভৃতি। ফলে স্ট্যাটাস লেখার সময় সতর্ক হতে হবে। কারও কমেন্টের একটি বাক্যে তিনটি ভুল (বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যের গঠন) যখন চোখে পড়ে, তখন তার বিদ্যার দৌড় সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যায়। ফলে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাস্তব একটি ঘটনা বলে শেষ করতে চাই। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত এক ভদ্রলোক অসুস্থতার অজুহাতে অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি ম্যানেজ করেন। বাসায় ফিরেই ফেসবুকে লিখলেন, ‘ওহ কী শান্তি…!’ পরবর্তী সময়ে দিনে কয়েকবার করে স্ট্যাটাস আপডেট দেন, যার প্রতিটিই ছিল হাসি-আনন্দসম্পর্কিত এবং ছুটিকালীন শরীর খারাপ, হাসপাতাল, চিকিত্সা, চিকিত্সক নিয়ে একটি স্ট্যাটাসও ছিল না। এমনকি ফ্যামিলি নিয়ে যেসব স্থানে ঘুরতে গেছেন তার ছবিও আপলোড করেছেন। তিনি খেয়ালই করেননি যে, তার কলিগ ও বস ফেসবুকের বন্ধু হিসেবে সব দেখছেন। ছুটিশেষে যেদিন কর্মক্ষেত্রে ফিরলেন সেদিন তাকে বলা হলো, যারা ব্যক্তিজীবনে অসত্ এবং অফিসের কাজ উপভোগ করেন না. তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ফলে অফুরন্ত শান্তির জন্য আপনাকে চাকরি থেকে বিদায় দেয়া হলো! তাই সাবধান। বস, সহকর্মী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী সবাই কিন্তু আপনাকে দেখছে ফেসবুকের জানালা দিয়ে। আর সোস্যাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে গিয়ে নিজে যেন ছোট্ট স্ক্রিনে বন্দি হয়ে না যান। তাহলে সবার সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বাড়লেও পরিবার ও চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়বে, যা আদৌ কল্যাণকর নয়।

লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক
mahamud.biz@gmail.com

http://www.bonikbarta.com/2012-05-04/news/details/30351.html
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls

%d bloggers like this: