হলিউড, লস এঞ্জেলেস এ বাদাম (BADAM) এর আত্মপ্রকাশ


হলিউড, লস এঞ্জেলেস এ বাদাম এর আত্মপ্রকাশ

একুশ নিউজ মিডিয়াঃ লস এঞ্জেলেস, ২৪ জুন: বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ ও ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার প্লাটফর্ম হিসাবে কাজ করা, সহায়তা ও পরামর্শ দিতে লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্ণিয়া, ইউ এস এ-তে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভার্সিটি আর্টস অ্যান্ড মিডিয়া (বাদাম BADAM)। স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সাংবাদিক,অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ ও সুধীজন এই আলোচনা সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে ‘বাদাম’ -এর প্রতি সম্পৃক্ততা ঘোষণা করেন।


রবিবার লিটল বাংলাদেশ এলাকায় আলাদীন রেস্তোরায় এক আলোচনা সভার মাধ্যমে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের উদ্যোক্তারা এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানান।
  প্রবাসের মূলধারায় দেশীয় বাংলা সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে দেশ-প্রবাসের কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সাংবাদিক, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদদের যোগসূত্র হিসাবে কাজ করবে এই সংগঠন। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি মাইলফলকে  আলোচনা সভা সহ অনুষ্ঠানমালা করার ঘোষণা দিয়েছে ‘বাদাম’।


সুদীর্ঘ সময় পরে হলেও নতুন প্রজন্মের সাথে আমাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির পরিচয় ও তাদেরকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে
 ‘বাদাম-নতুন প্রজন্ম’ নামে সংগঠনের একটি শাখা খোলার প্রস্তাবনা করা হয়। প্রতিমাসে একবার করে নতুন প্রজন্মদের নিয়ে স্কুলশিক্ষার আদলে ইন্টারএক্টিভ কর্মশালার প্রস্তাব করা হয়। 

কাজী মশহুরুল হুদার সঞ্চালনায় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের অতীত-বর্তমান-ভবিষৎ নিয়ে আলোচনা করেন মিজান শাহীন,কাজী রহমান, আলী আশরাফ রুনু, ডাঃ নাসির আহমেদ অপু, একতার ভূঁইয়া, সৈয়দ এম হোসেন বাবু, তারিক বাবু, ফ্রেন্ডস বাবু,দিলশাদ রহমান, মার্টিন রহমান, মিঠুন চৌধুরী, বুলবুল সিনহা, আব্দুল খালেক, স্যামী নোবেল, খাজা মইনুদ্দীন চিশতী, শহীদ আলম, পঙ্কজ দাস, শাহানা পারভীন, সাদিয়া রহমান, জাবিন হিল্টন, মাহবুবা রশীদ, শামসুন্নাহার মনি, রওনাক সালাম, ফরিদা, প্রমুখ।


ফারহানা সাঈদ সবার বক্তব্যের সারমর্ম তুলে ধরে বলেন,
 সবার বক্তব্য একই সূত্রে গাঁথা -সংস্কৃতি সার্বজনীন, বহমান সংস্কৃতিকে মূলধারার সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করে নিজ দেশের ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে হবে।


বাদাম-এর প্রধান উপদেষ্টা এম কে জামান নান্টু তার বক্তব্যে বলেন,
 লস এঞ্জেলেস এ কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সাংবাদিক,অভিনেতা, ক্রীড়াবিদদের এক অপূর্ব সম্মীলন ঘটাবে এই বাদাম। বাদাম ও স্থানীয় বাংলাদেশী ডাক্তারদের সহযোগীতায় লিটল বাংলাদেশ-এ ফ্রি সানডে ক্লিনিক খোলার ঘোষণা দেন তিনি।


নব গঠিত বাদাম’র আহ্বায়ক জাহান হাসান সভার শেষে সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন,আমেরিকায় দ্বিতীয় বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকায় এই ধরনের একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক-সামাজিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন ধরে অনুভূত হচ্ছিল। অনেক প্রবাসী তাদের নিজ নিজ অবস্থানে সমুজ্জ্বল হলেও সংস্কৃতি প্রসারে নিরপেক্ষ প্লাটফর্মের অভাবে এগিয়ে আসতে পারছেন না। তাদের অভিজ্ঞতা,
 সার্মথ্য ও দেশকে ভালবাসা বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে এই বাদাম। নিয়মিতভাবে প্রবাস ও দেশের গুণীজনদের সম্মাননা প্রদান
 করার ঘোষণা দেন তিনি।


২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে বাদাম’র কাজ শুরু করেছে। অচিরেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি পরবর্তীতে বিভিন্ন ষ্টেটে কমিটি গড়ে পর্যায়ক্রমে সারা উত্তর আমেরিকায় সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে। ঈদের পরে স্থানীয় প্রবাসীদের সামনে পূর্নাংগ কমিটি ঘোষণা করা হবে। সংগঠনের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন পর্যায়ের প্রবাসীদের সহায়তা কামনা করে জানান,
 কবি,সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদদের সমন্বয়ে সংগঠনটি গঠিত হলেও বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ ও ঐতিহ্য গড়তে কাজ করতে ইচ্ছুক
 যে কেউই এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। 


বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রবাসে শিল্পকলা প্রসারে বাদাম-এর মত সংগঠনের সাথে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সংগঠনের কয়েকজন পরিচালকের সাথে ঢাকায় এক মত বিনিময় সভায় তিনি এই কথা বলেন।
  


ছবিতে বাদাম – ক্লিক করুনঃ
http://www.facebook.com/media/set/?set=a.10150975188591897.447813.826936896&type=1&l=ca17e7ec41

 

আবাসন সমস্যা: স্বপ্নের ফ্লাট বাড়ি : আলী (রাঃ) বলেছেন চার জন মানুষ বড় অসুখী, তারা হল ‘যার সন্তান বখাটে, যার স্ত্রী বাচাল ও সন্দেহপরায়ন, যার প্রতিবেশী অসৎ, যার বাড়ী বাজারের মধ্যে’।


স্বপ্নের ফ্লাট বাড়ি
নজরুল ইসলাম টিপু

স্বপ্নের ফ্লাট বাড়ি

স্বপ্নের ফ্লাট বাড়ি




হাজার দর্শকের মন মাতাইয়া, নাচেগো সুন্দরী কমলা, প্রেমিক পুরুষ রহিম মিঞা, রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া…। মোতালেব সাহেবের মায়ের অস্থিরতা আবারো বেড়ে গেল। মা বললেন, বাবারে! মনে হচ্ছে এখনই দম বন্ধ হয়ে মারা পড়ব, হৃৎপিন্ডটি বুঝি এখনি ফেঠে পড়বে, ফ্যানটি জলদি চালু কর। মোতালেব সাহেব দৌঁড়ে গিয়ে ফ্যানের সুইচ চাপলেন, ধ্যাৎ! এখনও বিদ্যুৎ আসেনি! অগত্যা হাতপাখা দিয়েই বৃদ্ধা মায়ের মাথায় বাতাস দেওয়া শুরু করলেন। বাবারে, হাত পাখার গরম বাতাসে মুখখানা যেন পুড়ে যাচ্ছে, সহ্য হচ্ছেনা, মাথায় পানি ঢাল। মোতালেব সাহেবের স্ত্রী দৌঁড়ে গেলেন বাথরুমে, পোড়া কপাল! লাইনে এখনও পানি আসেনি। মায়ের এমন ধরপরানী দেখে মোতালেব সাহেব তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎহীন ফ্রিজ খুলে, দুটি মিনারেল ওয়াটারের বোতল বের করলেন। দুঃখের যেন শেষ নাই এই পানি মায়ের মাথায় ঢাললে পুরানা হাঁফানি আবার মাথাচাড়া দেবে। একটু সাধারন পানি জোগাড় করে ফ্রিজের ঠান্ডা পানির সাথে মিশিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে মায়ের মাথায় ঢালবেন, যোগাড় নেই। উপায়হীন মতলব সাহেব আজকের এই ছুটির দিনে পাশের প্রতিবেশীকে পূনরায় আরেক বার অনূনয়-বিনয় করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

মোতালেব সাহেব দরজা খুলে বের হতেই দেখেন ভবনের লবিতে একই ফ্লোরের আরেক ফ্লাটের প্রতিবেশীর স্কুল পড়ুয়া কিশোর ছাত্র রূপবানের কোমর দুলানোর গানের তালে তালে নিজেরাও কোমর দুলাইয়া নেচে চলছে। দেখেই মেজাঝটা আরো খারাপ হল। বলল কোন জাহান্নামে উঠেছি নিজেই জানিনা। কোন পাপের কারনে আমার উপর এত জ্বালা বুঝলাম না বলে খেদোক্তি করলেন। যাক জোড় করে মুখে একটু হাঁসি ফুঠিয়ে পাশের বাসার কলিং বেলে টিপ মারেন। একবার, দুবার, কয়েকবার! অবশেষে ঘরের ভিতর থেকে বোধোদয় হল কেউ দরজায় বেল টিপেছেন। প্রতিবেশীর কলেজ পড়ুয়া ছেলেটি হাতে লোহার চুড়ি, এককানে দুল পরিহিত অবস্থায় দরজা খুললেন। দরজা খোলা মাত্র মনে হল, পুরো ফ্লাটটি যেন শব্দ বোমায় ভাসছে! ভাবলেন এরা কিভাবে বাঁচে এই বিকট আওয়াজে! মোতালেব সাহেবকে সামনে দেখে ছেলেটি খুবই পেরেশান হল। বলুন আঙ্কেল কেন আসলেন? মোতালেব সাহেব বললেন, বাবারে এতদিন গেল নান্টু ঘটকের কথা শুইনা, অল্প বয়সে করলাম বিয়া। আর আজকে নতুন করে শুরু হল রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া। বাবারে তোমাদের দুই’পা ধরা বাকি রাখছি, আমার বৃদ্ধা মায়ের হার্টের অপারেশন হয়েছে, তিনি উচ্চস্বরের আওয়াজ শুনলে হার্টবিট বেড়ে প্রেসারে কষ্ট পায়, ডাক্তার বলেছেন এটা হলে তিনি নির্ঘাত মারা পড়বেন। তোমার হাই ভল্যূমের ড্রাম সেটের আওয়াজে আমাদের অস্থিত্ব আজ বিপন্ন হওয়ার জোগাড়।

আঙ্কেল আপনার প্রতিদিনকার ঘেনর ঘেনর আর ভাল লাগেনা। আমরা আমাদের ঘরে গান শুনছি, আপনার ঘরে বাজাচ্ছিনা। তাছাড়া কখন বাজাব? সকালে বাজাইলে আপনার সমস্যা, দুপুরে বাজাইলে আপনার মায়ের সমস্যা, সন্ধ্যায় বাজাইলে ওদের ছেলে মেয়ের লেখা-পড়ার সমস্যা, রাত্রে রাজইলে আমার মায়ের সমস্যা। আপনি কি এই পরামর্শ দিতে এসেছেন যে, গান শুনতে হলে রমনার বটমূলে চলে যাও? আমাদের যুবকদের কি কোন চাওয়া পাওয়া নেই? শুধু একটু গান বাজাইলেই দেখি আপনি আপত্তি দেন! আমি আস্তে বাজাই আর জোড়ে বাজাই সর্বদা আপনি বাধা দিচ্ছেন। আপনি যেভাবে ৪২ লাখ টাকায় আপনার ফ্লাট কিনেছেন একই ভাবে আমার পিতাও বিদেশে চাকুরী করে ৪২ লাখ টাকায় আমাদের জন্য এই ফ্লাট কিনে দিয়েছেন। আমরা আমাদের ফ্লাটে নাচব, গাইব, মারামারি করব সেটা নিয়ে আপনার আপত্তি থাকার কথা নয়। আপনি যা পারেন করেন, আমি আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই, আর কখনও আমাকে বিরক্ত করবেন না প্লিজ!

চাকুরীজিবী মোতালেব সাহেব ছোটকাল থেকেই বাবার সাথে ঢাকা শহরে বড় হয়েছেন। চাকুরীর নির্দিষ্ট টাকার আয়ে তার পিতা যেভাবে একখন্ড জায়গার মালীক হতে পারেননি। মোতালেব সাহেবেরও ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও ঢাকায় একটি প্লট কিনে বাড়ী করতে পারেননি। পুরো জীবন মানুষের কথা শুনে শুনে, অসহায়ের মত ভাড়া বাসায় থেকেছেন। তাই বন্ধুর পরামর্শে মোতালেব সাহেব যেন স্বপ্ন হাতে পান, বাবার অবসরকালীন টাকা, গ্রামের জায়গা বিক্রির টাকা ও ব্যাংক থেকে নিজের নামে কর্জ্জ নিয়ে বহুদিনের স্বপ্ন, নিজের জন্য একখানা বাড়ী হিসেবে এই ফ্লাট খানা কিনে নেন। মনে বড় আশা নিয়ে ভাড়াটিয়ার জীবন ছেড়ে নিজেদের কেনা এই বাড়ীতে উঠেন। এখন থেকে আর বাড়ী ভাড়া নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা, বাড়ী ওয়ালার বাঁকা মন্তব্য সইতে হবেনা, বেতন থেকে খাওয়া ও বাচ্চাদের লেখাপড়া বাবদ যা যায়, বাকী পুরোটাই জমানো যাবে। মা এই ফ্লাট বাড়ী নিয়ে তেমন উৎসাহী ছিলেন না, তিনি বাবার মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়িতেই থাকতে ছেয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের অব্যবহৃত বাড়ি বিক্রি না করলে, শহরের ফ্লাট বাড়ীর টাকা হচ্ছিলনা, তাই ছেলের পিড়াপীড়িতে মা বাধ্য হয়েই শহরে ছেলের সাথে থাকছেন বিগত ৫ বছর ধরে। মায়ের ভাষায় এটাতো থাকা নয়, যেন জাহান্নামের অভ্যন্তরে বসে ইটের রসগোল্লা খাওয়া!

মোতালেব সাহেবের মাথায় কাজ করছিল না, তার কি করা উচিত? কার সাহায্য চাওয়া উচিত? তিনি কি করবেন সামনের দিনগুলোতে? এ সমস্থ চিন্তায় ঘুম হারিয়েছেন দেড় বছর হল, চোখের নীচে কালি, ব্যাংকের কর্জ, মায়ের চিকিৎসা বাবদ মোটা অংকের ধার যোগ হয়েছে, মেয়ে দুটি যেন প্রতিমাসেই এক ইঞ্চি করে বাড়ছে। আরো দুঃখ হল, সামনের বাসাটি একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারকের, তিনি বহু আগে কেনা প্লট বিক্রি করে, এই ফ্লাট নিয়েছেন। বাকী টাকা ব্যাংকে রেখে সূদ খাচ্ছেন, মাসের শেষে অবসরকালীন ভাতাটা যোগ করে দিন চালাচ্ছেন। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত সাবেক বিচারক সর্বদা ঘরে শুয়েই থাকেন, বড় ছেলেটি মাস্তান ধরনের। সর্বদা দরজা খুলে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নিজেদের দরজায় বসে থাকেন। ফলে প্রাপ্ত বয়সী মেয়েদের নিয়ে হয়েছে জ্বালা। দু’একবার ঝগড়া হয়েছে, ফলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া ছাড়া কোন উপকার হয়নি। বিচারক একদা অন্যের সন্তানের বিচার করলেও আজ তিনি অসহায়, নিজেদের সন্তানের এই বেহায়পনা দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকানো ছাড়া কোন উপায় নাই। ছয়তলা এই বিল্ডিং এর প্রতি ফ্লোরে ৪টি করে পরিবার আছে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা থেকে আগত ২৪টি পরিবারের বাস এখানে। সবাই স্বচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের বাসিন্দা। কারো দরজায় টোকা দিয়ে অভিযোগ জানানো কদাচিৎ মুছিবতের কারন হতে পারে। কেউ অবসর প্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, কেউ এমপি’র আত্বীয়, কেউ সাংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব। তার পরও এই ভবনের বাসিন্দারা যেন পুরো শহরের সবচেয়ে বেশী অসুখী মানুষ; যারফলে এই ভবনের গলিতে ফার্মেসী গড়ে উঠেছে বেশী।

মতলব সাহেব সোজা ও ভদ্র প্রকৃতির মানুষ, হিসেব করে কড়ি গুনে জীবন চালান। তিনি কারো ধারে-পাছে যেতে চাননা। ফ্লাট কিনে মানুষের সাথে যতবার হট্টগোল করতে হল, ভাড়া বাসায় বিগত ৩৫ বছরেও তার কিঞ্চিত পরিমান হয়নি। সমস্যা হলে বাড়ী ওয়ালাকে জানিয়েছে, বাড়ীওয়ালার একক সিদ্ধান্ত সবাই মানতে বাধ্য ছিল। বনিবনা না হলে ফ্লাট ছেড়ে দিয়েছে, নতুন জায়গায় উঠেছে, ব্যস! সব মিটমাট। এখানেতো নতুন জায়গায় উঠার সুযোগ নাই, নিজের ঘর, নিজের বাসা, একক ক্ষমতাধর কেউ নাই, যাকে বলে সূরাহা করা যায়; এখানে সবাই বাড়িওয়ালা!

পাঁচ ও ছয় তলার ঘরের ডিজাইনগুলো নিচের চাইতে একটু ভিন্ন ধরনের। ৪র্থ তলার মতলব সাহেবের রান্না ঘরের ঠিক উপরে পড়েছে পাঁচ তলার বাথরুম। ২ বছর আগে ৪ মাত্রার ভূ-কম্পনে রান্নাঘরের ছাদে একটু ফাটল হয়েছে। সে থেকে রান্না ঘরে উপরের বাথরুম থেকে টপ টপ পানি পড়তে থাকে। মিস্ত্রী দেখিয়েছেন, তারা বলল এক সপ্তাহের কাজ আছে, উপরের বাথরুমের ফ্লোর ভাঙ্গতে হবে, তবেই ঠিক করা যাবে। উপর ওয়ালা মতলব সাহেবের এমন আবদার শুনে অট্টহাসি দিলেন। তিনি বললেন আপনি আমার বাথরুম ভাঙ্গবেন আপনার সুবিধার জন্য! আর আমরা সবাই সিটি কর্পোরেশনের টয়লেট থেকে গোসল করে আসব? সে চিন্তা বাদ দিন বরং আমার বাথরুমের পানি তবরুক হিসেবে জোগাড় করে মাথায় মাখুন আকল বাড়বে! মামা বাড়ীর আবদার পেয়েছেন। কিছুদিন আগে উপরের ভদ্রলোকের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে, ছাগলের গোশত কেটেছিল বাথরুমে, ভারী মাস্তুলের আঘাতে ফাটল আরো বাড়ে, পানি এখন অনবরত চিকন ধারায় পড়ে, ফলে রান্নঘর এখন অব্যবহৃত। তাছাড়া উপরের মালীকের বুড়ো মায়ের প্রতি ৩০ মিনিট পর পর পান খাওয়ার অভ্যাস, হামান-দিস্তায় যেভাবে গুতো মারে তাতে পান-সুপারী নয়, যেন পাথর চূর্ন চলছে।

শোনা যাচ্ছে ভবনের মাটি পরীক্ষা ঠিক হয়নি, আস্তে আস্তে অচিরেই নীচে দেবে যাবে; অথছ মাটি পরীক্ষায় এটাতে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন আছে। ভবনের খীলানগুলো নাকি বেশী গভীরে ঢুকানো হয়নি, ফলে কাৎ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ভবন বানানোর সময় মতলব সাহেব তো এখানে ছিলেন না, যে নিজের চোখে দেখে রাখবেন কতটুকু গভীরে গেছে খিলান; তাছাড়া তিনিতো প্রকৌশলী নন যে, দেখলেই ভূল ধরতে পারবেন। শুনেছিলেন ভবনের চারিদিকে ৩ ফুট রাস্তা থাকবে, পাশের ভবন উঠার সময় দেখা গেল ওটা তাদেরই জায়গা। ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বেশী দামে ফ্লাট বিক্রি করতে ৩ ফুট জায়গাও মূল ঘরের মধ্যে ঢুকিয়েছেন, শোনা যাচ্ছে সরকারী কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় এই ভবন ভাঙ্গার মধ্যে পড়েছে। এই ভবনে ফ্লাটের মালীক হিসেবে দু’একজন বড় কর্মকর্তা আছেন বলে কর্তৃপক্ষ ভাঙ্গার কাজে এখনও এখানে হাত দেয়নি। সে জন্য ক্ষমতাশালী আরেক ফ্লাটওয়ালা যথাযত ব্যক্তিকে প্রতি মাসে মাসে বকশীশ দেন, তাই ভাঙ্গা আপাতত রহিত হয়েছে। এই নতুন উৎপাতে বকশিশ বাবদ মাসের বেতন থেকে একটি নির্দিষ্ট টাকার অংক খরছ হয়।

দুঃখের যেন শেষ নাই মতলব সাহেবের ফ্লাট বাড়ীতে। ভবনের সিমেন্ট নাকি দুই নম্বরী ছিল আরো বিপদের কথা ভবনে যে বালি ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো সামুদ্রিক বালি ছিল, তাতে নাকি লবনের পরিমান অধিক। ফলে সে লবণাক্ত বালী সিমেন্ট ও ইটের গাথুনীকে আস্তে আস্তে খেয়ে ফেলছে। যার কারনে কিছু দিন পরে ভবন থেকে গোশত খসে গিয়ে, লোহার কঙ্কাল দেখা যাবে, জোড়ে নাড়া খেলে চামড়া ঝরে গিয়ে এই ভবন হিরোসীমার বিধ্বস্থ বাড়িটির মত স্থাপত্য নিদর্শন হবে। আস্তর ঝরে যাওয়ার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই প্রকাশ হচ্ছে। মতলব সাহেব বারবার জিভে কামড় দিয়ে আফসোস করছেন, ফ্লাট কিনার আগে কেন তিনি এই ভবনের চুন সূড়কি একটু মুখে দিয়ে লবন পরীক্ষা করে দেখেননি?

ফ্লাট নেওয়ার আগে মোতালেব সাহেবের ধারনা ছিল বেতন থেকে এখন শুধু জমানোর পালা। আজ তিনি আকল জ্ঞান হারিয়ে গাধাকে বাপ ডাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আধুনিক সুবিধায় পরিপূর্ন এই ভবন, ৩ বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি সহ লিফ্টের ব্যবস্থা আছে। মতলব সাহেব সর্বসাকূল্যে ১০ বার লিফ্টে চড়তে পেরেছিলেন, একবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে লিফ্টের ভিতর মই ঢুকিয়ে উদ্ধার পেয়েছিলেন। বারবার বিদ্যুতের ভেলকীবাজীতে লিফ্টের পুরো কন্ট্রোল প্যানেলই জ্বলে যায়, ফলে দীর্ঘদিন লিফ্ট ব্যবহার বন্ধ, বর্তমানে সেটাকে ভবনের সিকিউরীটি তার কাপড়-চোপড়, গামছা-জুতো ঢুকিয়ে রাখার স্থান বানিয়েছেন। কন্ট্রোল প্যানেল নাকি সার্ভিস ওয়ারেন্টির মধ্যে পড়েনা, তাই এটা বাড়ীওয়ালাদের নতুন করে জাপান থেকে কিনতে হবে। জিঞ্জিরাতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এগুলোর দুই নম্বরী এখনও দেশে চালু হয়নি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়াতে জেনারেটর বন্ধ বহুদিন ধরে। আগে জেনারেটর চালাতে গিয়ে যে খরছ হয়েছে, অনেক বাড়ী ওয়ালা এখনও তেলের দাম দেয়নি। বন্ধ জেনারেটর চালু করতে গিয়ে দেখা যায় কার্বোরেটর খারাপ হয়েছে, অনেক টাকা খরছ করে কার্বোরেটর ঠিক করার পর জানা গেল, জেনারেটরের ভিতরের প্রায় যন্ত্রপাতি নাকি চুরি হয়েছে, উপরে দেখতে জেনারেটর, তবে ভিতরে হৃৎপিন্ড, যকৃত, পাকস্থলী, মুত্রথলী সব গায়েব! সিকিউরিটিকে পিটিয়ে জেলে ঢুকানো হয়েছে; কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অনেক টাকা খরছ কার্বোরেটর ঠিক করা হয়েছে, তাও জলে গেল। তাই লিফ্ট-জেনারেটরে সমস্যার, স্থায়ী সমাধানের জন্য বাৎসরিক ইন্সুরেন্স করার পরামর্শ এসেছে।

এ সকল সমস্যা সমাধানে ফ্লাট ওয়ালাদের মাঝে ঐক্যমত দরকার, সেজন্য কমিটি গঠন করা হলো। কমিটি প্রধানের দায়িত্ব নিলেন এম, পি’র আত্বীয় পরিচয়ের আরেক মাস্তান বাড়িওয়ালা, সেক্রেটারী হলেন বিচারক সন্তান। তারা প্রয়োজনীয় সব কাজ করিয়ে নেবেন, প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর কমিটি সে টাকা তুলে নেবেন। ভবনে রং করা হলো, রঙ্গয়ের উজ্বলতা ৪ মাসও থাকেনা, কেউ বলে আস্তরের বালিতে লবনের কারনে এমন হয়, কেউ বলে রং টাই দু’নন্বর। কথা হলো পরীক্ষা করবে কে? কার কাছে কে বিচার জানাবে? ভবনে চুরি-চামারী বেড়ে যায়, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, কারো কারো ছেলে নাকি সিড়ির রুমে মাদক পান করে, কেউ লবিতে বসে সিগারেট টানে, পরিবেশ বরবাদ করে, বাচ্চারা বের হতে পারে না। কারো ছেলে নাকি বখাটে হয়েছে, কারো মেয়ের নাকি ছেলে বন্ধু বেশী; চাই আরো নিরাপত্তা। সিকিউরিটি ও ভবন পরিষ্কার করার জন্য যে মানুষ রাখা হবে, তাদের জন্য এই ভবনে কোন রুম তৈরী করা হয়নি, নিচে একটি উম্মুক্ত টয়লেট দরকার। পেটে টয়লেট চেপে রেখে ৩-৬ তলা বেয়ে উঠা সহজ নয়। তাই সবার মতামতের ভিত্তিতে ভবনের কোণায় একটি টয়লেট বানানো হল। সরকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নেয়ায়, পরিদর্শক মোটা অংকের জরিমানা করে দিলেন। অথছ পুরো ভবনটির বহু অবৈধ কাঠামো অন্যায় ভাবে গড়ে উঠেছিল, তখন দেখার কেউ ছিলনা! এ জাতীয় নানাবিধ খরছ যোগ হতে হতে মতলব সাহেবকে মাসে ৭ হাজার টাকার ইজা গুনতে হয়। অথছ তিনি যখন ভাড়ায় থাকতেন তখন ৭ হাজার টাকা দিয়ে ভাড়া বাসায়ও আলীশান ভাবে থাকতে পারতেন।

অফিস থেকে ফিরছিলেন মতলব সাহেব, মোবাইল সাইলেন্ট থাকায় ১০টি মিসকল ধরতে পারেননি, তিনি উল্টো ফোন করে মেয়েদের কান্নার আওয়াজ পান। মতলব সাহেবের মনে সন্দেহ হল, দৌঁড়ে বাসায় পৌছলেন। তিনি নির্বাক, নিরব, নিথর হয়ে যান; কিছুক্ষণ আগেই মা ইন্তেকাল করেছেন। পাশের বাসা থেকে ভেসে আসা গানের সুরে তার কান্নার আওয়াজ মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। বাহিরের মানুষ নতুন ধরনের আওয়াজ শুনে বলাবলী করছিল বাজারে এখন বুঝি কান্নারও রি-মিক্স বেরিয়েছে। মা তার পুত্রবধুকে বলে গেছেন, জিবীত কালে তো পারেননি, অন্তত মরার পরে যেন তার লাশটি যাতে, শহরের কোলাহল থেকে দুরে গ্রামের নির্জন কবরে সমাহিত করা হয়। উপদেশ দিয়ে গেছেন পারলে এই ফ্লাট নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে, এত পেরেশানী নিয়ে এই দামী ভবনে যেন না থাকে, প্রয়োজনে কম টাকায় শহরতলীর কোন বেড়ার বাসায় যেন থাকে।

ঢাকা শহরে আবারো ৪.৬ মাত্রায় ভূ-কম্পন অনূভত হয়, ভবনে দৃশ্যমান কিছু ফাটল তৈরী হয়, প্রকৌশলী বলেছেন ওটা এমন কিছু না, ভয়ের কারন নাই। যারা ভবন তৈরী করেছিলেন তাদের দূর্বলতার কারণে এমনটি হয়েছে। তারা সর্বদা ব্যবসায়ীক মনোবৃত্তিকে কাজে লাগিয়েছেন, সেবাকে গুরুত্ব দেননি। নব্বই দশকে সামান্য ভূ-কম্পনে তুরস্কে এভাবে পুরো একটি শহরই ধুলোই পরিণত হয়েছিল। ভবনে লিফ্টের জন্য নতুন কন্ট্রোল প্যানেল বসানো হয়েছে, জেনারেটর ঠিক করা হয়েছে। এ সবের বিল ও আগের বকেয়া বিল মিলে, মোতালেব সাহেবকে ১লাখ ৪০হাজার টাকা দিতে হবে। কর্জ ভারে কাহিল মোতালেব সাহেব অতিরিক্ত এই টাকা দিতে অপারগ, তাই তাঁকে রুম ছাড়তে হবে। কমিটি তার রুমটি ভাড়া দিবে, ভাড়া থেকে মাসিক সার্ভিস চার্জ ও অনাদায়ী বকেয়া টাকা আদায় করা হবে। এই সমস্যা সমাধান হয়ে মোতালেব সাহেবের বাসা ফিরে পেতে ৫০ বছর লাগবে, যদি ভূমিকম্পনে ভবন ধব্বসে না যায়।

মোতালেব সাহেব ৪২ লাখ টাকা মূল্যের স্বপ্নের ফ্লাটে মাকে একটি দিনের জন্যও শান্তিতে রাখতে পারেননি। মানুষ অশান্তিতে থাকে সন্তানের অসদাচারণের কারনে। অথছ মোতালেব সাহেব ভাল মানুষ ছিলেন, মায়ের যত্নে কখনও সামান্যতম অবহেলা করতেন না, পুত্র বধু আন্তরিক ছিলেন, নাতীনেরা খুবই ভদ্র ও দাদীর প্রতি আদরনীয় ছিলেন। এতকিছু নিজের পক্ষে থাকার পরও, শহুরে জীবনে মাকে সুখ দেখাতে সক্ষম হননি; পরের সৃষ্ট সমস্যার কারনে। আলী (রাঃ) বলেছেন চার জন মানুষ বড় অসুখী, তারা হল ‘যার সন্তান বখাটে, যার স্ত্রী বাচাল ও সন্দেহপরায়ন, যার প্রতিবেশী অসৎ, যার বাড়ী বাজারের মধ্যে’। বাজারের হিসেবের কথা বাদ দিলেও স্বপ্নের ফ্লাট বাড়ীতে অসুখী হওয়ার জন্য বাকী উপকরনের সবগুলোই ছিল। রাসুল (সাঃ) প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিতে বার বার তাগাদা দিয়েছেন। প্রতিবেশীর প্রতি গুরুত্ব বুঝানোর সময় সাহাবীরা ভাবতেন রাসুল (সাঃ) বুঝি এক্ষুনি আমাদের সম্পদে প্রতিবেশীর হক আছে এমন কথা বলে দেবেন। মোতালেবের স্বপ্নের এই ফ্লাট বাড়ীতে প্রতিবেশীর সমস্যাতো ছিলই, তাছাড়া ছিল নানা উদ্ভট ঝামেলা, যা ভুক্তভূগীরাই মূল্যায়ন করতে পারেন। তিনি সমস্যার কোনটাই মোকাবেলা করতে পারেননি, আগামী মাসেই নিজের কেনা ফ্লাট ছেড়ে দিতে হবে। মনের দুঃখে, এক বুক হতাশায়, কম দামের একটি ভাড়া বাসার সন্ধানে শহরতলীর দিকে পা বাড়ালেন…..।
—————————————————-

আবাসন সমস্যা

মাহমুদুল বাসার

কবিগুরু বলেছেন, ‘ধন নয় মান নয় এতটুকু বাসা, করেছিনু আশা।’ জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কবিতায় ‘পাখির নীড়ের মত চোখে’ কথাটি বলেছেন, তাতেও ঐ এতটুকু বাসায় ফেরার প্রগাঢ় স্বপ্ন ব্যক্ত হয়েছে। বাবুই পাখির গর্ব সে নিজের তৈরি বাসায় রাত কাটাতে পারে, পরের অট্টালিকায় থাকে না। বাংলাদেশের আধুনিক কবি আবুল হাসান বলেছেন এক কবিতায়, ইদুঁরের ও পালাবার গর্ত আছে।’ প্রাণিকুলের মধ্যে যেখানে নিজস্ব আবাস গড়ে তোলবার ব্যাকুল প্রবণতা আছে, সেখানে মানুষের একটি নিজস্ব বাড়ি, একটা ছোট্ট বাসা গড়ে তোলবার নিবিড় প্রত্যাশা হাজার হাজার বছর ধরেই আছে। ঢাকা শহরের অধিকাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে। যারা ভাড়া বাসায় থাকেন, তাদের বুকের গভীরে একটা ছোট বাসা কেনার স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে। সে স্বপ্ন খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলার সাহস তারা পান না। সাধ ও সাধ্যের মনিকাঞ্চন যোগ ঘটে না। ঢাকা রাজধানীতে এক কাঠা জমির দাম এক কোটি টাকা। আজকাল কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। তারা এক কাঠা কোন দশ কাঠাও কেনার সামথর্্য রাখে, তারা ঢাকা শহরে বাসা-বাড়ি শুধু নয়, অট্টালিকারও মালিক।

আবাসন সমস্যার আবর্তে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মধ্যবিত্তরা। পত্রিকায় দেখেছি, ঢাকা শহরের বাড়ির মালিকেরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে খেয়াল খুশিমত প্রতিবছর বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করে। এটা শুধু ঢাকায় নয়, সারাদেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বাড়ি ভাড়ার ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, ধানী জমি বিক্রি করে শহর বা উপশহর এবং পৌরসভার উপকণ্ঠে জমি কিনে রাতারাতি বিল্ডিং বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছে অনেকে। ব্যাস! আর চিন্তা নেই, প্রতিমাসে ভাড়া তোল আর ঠ্যাং ঝুলিয়ে খাও।

যারা বিদেশে যেয়ে রাতারাতি কোটিপতি হচ্ছেন, তারাও বাড়ি বানিয়ে ভাড়া ব্যবসার প্রবণতায় নিমগ্ন। ঢাকার হাটখোলা রোডের একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠ কথাশিল্পী কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, সকালে হাঁটতে বের হয়ে দেখি কেবলই ইট-বালু রড সিমেন্টের স্তূপ। আকাশ স্পর্শী বিল্ডিং হচ্ছে। ভাড়া দেবে খাবে, আরামে দিন কাটাবে, ডিশ দেখে সময় কাটাবে।

বললেন যে, আমাদের জাতি এভাবে উদ্বাস্তু মানসিকতায় পরিণত হচ্ছে। শ্রমবিমুখ, উৎপাদন বিমুখ হচ্ছে। আমাদের টাকাওয়ালাদের আত্মকেন্দ্রিক সুখ পরায়নতায় পেয়ে বসেছে। ‘লিভ এ্যান্ড লেট লিভ’ দৃষ্টি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। তাই বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ি বানিয়ে ভাড়া ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করছে। ছোট-ছোট শিল্প গড়ে তোলার কথা ভাবে না যাতে দেশের বেকারত্ব দূর হতে পারে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

১৫ নভেম্বর ড. মযহারুল ইসলামের মৃতু্য তারিখ। তিনি একজন কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক হয়েও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সেখানে শত শত লোক চাকরি করে খায়। তিনি এক কলামে বলেছিলেন যে, ‘আমাদের দেশকে কৃষিভিত্তিক, তা থেকে শিল্পভিত্তিক করে তুলতে হবে।’ কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে লক্ষ্য রেখে কথাটি বলেছিলেন ড. ইসলাম।

ঢাকায় রিহ্যাব মেলা হয়েছে পাঁচদিনব্যাপী। রিয়েল এস্টেটের মালিক এবং আবাসন ব্যবসায়ীরা এই মেলার আয়োজন করেছে। জাতীয় পত্রিকাগুলো জানাচ্ছে, রিহ্যাব মেলায় মধ্যবিত্তরাই ভীড় করেছে বেশি। ভাড়া বাড়িতে থাকার বহুমুখী যন্ত্রণা থেকে মুক্তি প্রত্যাশী মধ্যবিত্তরা মেলায় গিয়েছে একটা পস্নট কেনার, একটা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন নিয়ে। আবাসন ব্যবসায়ীরা তাদের পস্নট ও ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়াতে নানা রকম অফার দিয়েছে।

বলা হচ্ছে যে, বাজেটে অতিরিক্ত করারোপের কারণে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে গেছে। নূ্যনতম স্বস্তি নূ্যনতম প্রশস্ত-নড়াচড়ারযোগ্য একটা ফ্ল্যাট কিনতে হলে ৪০ লক্ষ টাকা লাগে। কয়জনের আছে ৪০ লক্ষ টাকা! আবার ফ্ল্যাটে বসবাসের আছে নানা রকম পাশর্্বপ্রতিক্রিয়া। আছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি। ডেভেলপাররা বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে যে বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ি নির্মাণ করে থাকেন, তাতে থাকে নির্মাণের দুর্বলতা। আবার ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে প্রতি মাসে দিতে হবে আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ৪/৫ হাজার টাকা। গ্যাস, বিদু্যৎ, পানি, বার্থ রুম, টয়লেটেরও নানারকম অসুবিধা থাকে ফ্ল্যাটে। শত অসুবিধা মাথায় নিয়েও মানুষেরা একটা ফ্ল্যাট কিনতে চায়। কারণ, শহরেতো দূরের কথা থানা লেবেলেও বাড়ি করার সুলভ জমি পাওয়া যায় না। গ্যাসের আওতাভুক্ত জায়গাতো সোনার হরিণ।

আবাসন সমস্যা নিয়ে সরকারি পর্যায়ের সুষ্ঠু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন আছে। ভাবতে হবে, এটাও জাতীয় সমস্যা। সরকারের পক্ষ থেকে যদি আবাসন ব্যবসায়ীদের একটা নীতিমালার মধ্যে এনে তাদের গাইড লাইন দিয়ে ব্যবসাটাকে পরিচালিত করা হয়, তাহলে সকল পক্ষের উপকার হয়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবে, সরকার কর আদায় করবে, ক্রেতারা সরকারি তত্ত্বাবধানে নিরাপদ আবাসন পাবে। আবাসন ব্যবসার মত, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিষয় সম্পর্কে। সরকারের সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপক্ষের যেমন নজরদারি প্রয়োজন, তেমনী দরকার প্রণোদনা।

[ লেখক:প্রাবন্ধিক, গবেষক।]