About Mend-Ooyo

‘All Shining Moments’ সব উজ্জ্বল মুহূর্ত

অন্ধকার থেকেই কেবল উজ্জ্বলতম আলো আসে
এবং গোধূলিকালেই রমণী সুন্দর।
সন্ধ্যাবেলায় কানের দুল উজ্জ্বল
এবং রাত্রিতে অশ্বপৃষ্ঠের গদির পেরেক।
গুমুদা ফুলগুলো সন্ধ্যায় ফোটে
ঘরমুখো অশ্বগুলোর দিনশেষে হ্রেষাধ্বনি

গোধূলি আলোর গান
মানুষের মেজাজকে উজ্জীবিত করে
বস্ত্তত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা থেকেই
অধিক আলো আসে; মেঘের ফাঁক দিয়ে
যে-সূর্যালোক – সেটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল।
এবং কর্ম (karma) সত্যের প্রাণরস
ধূমকেতুর ছটায় আলোর অপূর্ব উদ্ভাসন
এবং একটি পুত্রসন্তানের জন্মের ভেতর দিয়েই
বিশ্বব্রহ্মান্ড আলো ছড়ায়।
আমি যতটা নিঃসঙ্গ

আমার মনে হয় পৃথিবীর আহবানেই আমি স্বর্গচ্যুত হয়েছি
আমার বিশ্বাস, আকাশের উজ্জ্বল কালপুরুষ থেকেই আগুনের সৃষ্টি,
এবং নক্ষত্রের গল্প পৃথিবীর স্বপ্ন থেকেই নেওয়া
আমি একাকী নিঃসঙ্গ, আমি কেবল নিজ সত্তা নিয়েই ভাবি।

আমি যতটা একাকী, ততটাই আমি নিজেকে স্পষ্ট দেখি।
আমি যতটা একাকী – ততটাই আমি অন্যের নিঃসঙ্গতা অনুধাবন করি।
আমি যতটা একাকী – ততটাই আমি কোনো অদৃশ্য সত্তায় মিশি
আমি যতটা একাকী – ততটাই আমি শ্রবণাতীত সংগীত শুনি
বস্ত্ত একাকিত্বের এই স্বাধীনতা আমার উপভোগের বিষয়।

একমাত্র জার (ger)*, যদিও অস্পষ্ট
কিন্তু তা স্টেপে সমতলের ওপর শাদা হয়ে দেখা দিয়েছে;
একমাত্র পাখি – যদিও স্পষ্ট, দৃশ্যগোচর, তবু মেঘমুক্ত আকাশে চক্কর খায়
একমাত্র ঘোড়া – দিগন্ত থেকে আমার দিকে ছুটে আসে।
এবং এইসব স্বর্গীয় কবিতাই আমার অভিজ্ঞতা।

আমি যতটা নিঃসঙ্গ – ততটাই আমি ঘাসের গভীরে প্রবেশ করি
আমি যতটা নিঃসঙ্গ – ততটাই আমি আমার পূর্বপুরুষের সত্তায় মিশি
আমি যতটা নিঃসঙ্গ – ততটাই আমি অনাসৃষ্টি জ্ঞানকে আহরণ করি,
আমি যতটা নিঃসঙ্গ – ততটাই আমি উজ্জ্বল শাম্ভালার (shambhala) নৈকট্যে পৌঁছুই
কারণ নিঃসঙ্গতা শক্তির ভেতরই আমি উষ্ণতাকে খুঁজি পাই।

জি মেন্ড উয়োর কবিতা

(উৎসর্গ : শিরিণ, কল্যাণীয়াসু)

ভূমিকা ও অনুবাদ : তিতাশ চৌধুরী

[‘আমি মঙ্গোলিয়ার যাযাবরদের সন্তান। আমরা অতি প্রত্যুষে বেরিয়ে পড়তাম। শৈশবে আমি একটি ডালিতে করে পণ্যবোঝাই উটের গাড়িতে চড়তাম। উটের মন্থরগতির থপ থপ করে চলার ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সকালের সূর্যকে স্বাগত জানাতাম। সম্ভবত সে-কালেই আমার ভবিষ্যতের কবিতাগুলোর ছন্দ কেমন হবে – তা অনুভব করতাম।’ এই কথাগুলো মঙ্গোলিয়ান কবি জি মেন্ড উয়োর।
জি মেন্ড উয়ো (G Mend-Ooya) মঙ্গোলিয়ার বর্তমান প্রধান কবিকণ্ঠ। তিনি মূলত এবং প্রধানত শেকড়-সন্ধানী ও ঐতিহ্যাশ্রয়ী কবি। তাঁর কবিতায় মঙ্গোলিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। ফলে এ-কবিতাগুলো পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের কবিতা থেকে স্পষ্টত ভিন্ন। কবি বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। ফলে বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন তাঁর কবিতাকে অনেক ক্ষেত্রেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আবার তিনি শেকড়-সন্ধানী। তাই তিনি ধর্ম-দর্শনের মতো অনবরত নিজেকে খোঁজেন, আবিষ্কার করেন স্টেপের আলো-বাতাসে। সেখানেই তিনি সহজ, অবাধ। শহরে কর্মকোলাহল তাঁকে শান্তি দেয় না, স্বস্তিতে রাখে না, তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। নিজের মধ্যে, নিজের পরিবেশের মধ্যে এবং নিজের প্রকৃতির মধ্যে তিনি সতত সুখ অনুভব করেন। তাঁর নিজেকে খোঁজার এই যে অদম্য একাগ্রতা, সেই উপাদানই তাঁর কবিতাকে গতিময় ও ছন্দমুখর করে তুলেছে। পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনও তাঁর কবিতার ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে। তাঁর কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষাও অল্প দেখা যায় না। চিত্রকল্পও তাঁর কবিতাকে ঘের দিয়ে আছে। ‘নক্ষত্রের জীবনচক্র ও মানুষের পথচলা’ কবিতাটির চিত্রকল্পগুলো অসাধারণ দ্যোতনায় ও ব্যঞ্জনায় অপূর্ব। মূলত এই কবি আপন বলয়েই অধিকতর দীপ্তিমান ও উজ্জ্বল।
কবি উয়ো প্রধানত মঙ্গোলিয়ান জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে তাঁর কবিতার উপজীব্য করেছেন। মঙ্গোলিয়ার ভাষার যে একটি চমৎকারিত্ব আছে, সুর ও ছন্দ আছে, – আছে ধ্বনি-মাধুর্য, তাও তিনি তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেছেন।
উয়োর কবিতা ইংরেজি, জাপানি, হাঙ্গেরিয়ান, রুশ ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সাহিত্যের জন্য তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন।
কবি উয়ো ১৯৫২ সালে মঙ্গোলিয়ার দরিগঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০-এ প্যাডাগুজিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৯৯৬ সালে মঙ্গোলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব আর্টস অ্যান্ড কালচার থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড কালচার থেকে তিনি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ২০০২ সালে। তিনি Arts and Culture at the Institute of International Studies, Mongolian Academy of Sciences-এর অধ্যাপক।
১৯৮০ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় – Birds of Thought নামে। এ-যাবৎ তাঁর ১৪টির মতো কাব্য, আলোচনা ও অন্যান্য গ্রন্থ বের হয়েছে। Golden Hill শীর্ষক তাঁর একটি কাব্য-ফিকশনও প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। তিনি বর্তমানে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাতরে বসবাস করছেন।
আমি এখানে জি মেন্ড উয়োর ছয়টি কবিতা অনুবাদ করেছি। এগুলো হলো : ক. ‘In search of myself’ (নিজেকে খুঁজি), খ. ‘All Shining Moments’ (সব উজ্জ্বল মুহূর্ত), গ. ‘The more I am alone’ (আমি যতটা নিঃসঙ্গ), ঘ. ‘Paradise and Swallows’ (স্বর্গ এবং দোয়েল পাখি), ঙ. ‘The Cycle of the life of stars and the way of men’, (নক্ষত্রের জীবনচক্র এবং মানুষের পথচলা) এবং চ. ‘Song of the Moon’ (জ্যোৎস্নাসংগীত কিংবা চাঁদের গান)। এই কবিতাগুলো জি মেন্ড উয়োর A Patch of White Mist কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করা হয়েছে।]

Source: http://www.kaliokalam.com/2012/06/07/%E0%A6%9C%E0%A6%BF-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1-%E0%A6%89%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%8B%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE/

Advertisements

ভাইব্রেশন অফ লাইফ, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান


একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন
 

মুর্তজা বশীর

চিত্রশিল্পী

পেইন্টিং, মুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার নানা ফর্মে কাজ করেছেন মুর্তজা বশীর। বাংলাদেশের চিত্রকলায় অগ্রগণ্য অবস্থান তার। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। উর্দু মুভি ‘কারোয়া’র চিত্রনাট্য লিখেছেন। হুমায়ুন কবীরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আলমগীর কবিরের মুভি ‘নদী ও নারী’তে কাজ করেছেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। গবেষক হিসেবে মদ্রা ও শিলালিপির আলোকে রচনা করেছেন বাংলার হাবশি সুলতানদের ইতিহাস। শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন চিটাগং ইউনিভার্সিটিতে। এতো কিছুর পরও ফটোগ্রাফি, ডাকটিকেট সংগ্রহের মতো শখের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অবিরাম পাঠ করে চলেছেন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বইপত্র। তারুণ্যের দীপ্তি তাকে রাখে সদাচঞ্চল। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী শিল্পী চান ৯৩ বছরের জীবন। নির্মাণ করতে চান চারটি ডকুমেন্টারি মুভি। দ্রুত ঘুরে আসতে চান বাংলাদেশের কয়েকটি প্রত্নস্থল। তার জন্ম ঢাকায়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট, আশুতোষ মিউজিয়াম, ফ্লোরেন্সের দ্যেল বেলেস্ন আরটি, প্যারিসের ইকোলে ন্যাশনাল সুপিরিয়র দ্য বোজার্ট ও আকাদেমি গোয়েৎস-এ। ভ্রমণ করেছেন নানা দেশ, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলার লোকশিল্প। ১৯৯৮ সালে চিটাগং ইউনিভার্সিটি থেকে অবসর নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় থাকছেন। কর্ম উদ্যোগী এ শিল্পী কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। দু’দফায় আয়োজিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন নিজের শিল্প, জীবন ও নন্দনতত্ত্ব ভাবনা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা ও আমি মাহবুব মোর্শেদ। ২০০৭ সালে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি এখানে পুনর্মুদ্রিত হলো।

সাধারণভাবে আমরা জানি মুখ্যত বেঙ্গল স্কুলের মাধ্যমেই বাংলায় আধুনিক চিত্রকলা চর্চার সূচনা ঘটেছে। বেঙ্গল স্কুলের পর পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে বঙ্গীয় শিল্পধারা বলে কি কিছু তৈরি হয়েছে?

এ প্রসঙ্গে একটি কথা সর্বপ্রথম বলা উচিত যে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্পী মনে করেন, শিল্পকলার ভাষা হলো আন্তর্জাতিক। অতএব, আন্তর্জাতিকতা তার শিল্পে থাকতে হবে। এখানে একটি জিনিস আমার কাছে বেখাপ্পা লাগে, আন্তর্জাতিক ভাষা আমি স্বীকার করি, কিন্তু সে ভাষায় তো মাটির গন্ধ থাকতে হবে। আমরা আমেরিকার অ্যাবস্ট্র্যাক্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের কাজ দেখি, তারা রঙ ছিটিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে, রাগের সঙ্গে চওড়া ব্রাশ দিয়ে ইচ্ছামতো আঁকাজোকা করেছে। কেন? আমেরিকার সোসাইটি ছিল ভাঙনমুখী। বাবা ছেড়ে চলে গেছে, মা ছেড়ে চলে গেছে। এই যে টোটাল একটা এলিয়েনেটেড সমাজ। মানুষ সেখানে অনেকটা যন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়েছে। ভেতরের এ রাগের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি শিল্পীদের রঙ ব্যবহারে, সেটার মধ্যে এক ধরনের অ্যাঙ্গার প্রকাশিত হচ্ছে। সাইড বাই সাইড আমরা দেখছি ওই সময় সাহিত্য ক্ষেত্রে বিট জেনারেশন। বিলেতে অ্যাংরি ইয়াং ম্যান। জন অসবর্ন বিলেতে লুক ব্যাক ইন অ্যাংগার লিখলেন। সঙ্গে আরো অনেকে জন ওয়াইন, ফিলিপ লারকিন, কিংসলি অ্যামিস। পাশ্চাত্যের ওই সেন্সে এখনো কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ এলিয়েনেটেড হয়নি, এখনো যৌথ পরিবার। বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে থাকে। টোটালি এলিয়েনেটেড মানুষের পার্সেন্টেজ খুব কম। এখানে শিল্পকলার আন্তর্জাতিক ভাষার চিন্তাধারার ফলে দেখা গেল, এসব চিত্রকলায় মাটির গন্ধ আর দেশজ রঙ থাকলো না।

এর আরেকটি কারণ হলো, শিল্প সংগ্রাহক বলতে যা বোঝায়, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। শিল্প সংগ্রাহকরা যতোক্ষণ না আর্টকে একটি পণ্য হিসেবে লগি্ন করবে, ততোক্ষণ এখানে আর্ট ওইভাবে বিকশিত হবে না। এখানে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আমাদের দেশে আর্ট সংগ্রাহক গড়ে ওঠেনি। এখানে ছবির বেশিরভাগই বিক্রি হচ্ছে অনেকটা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন হিসেবে। ঘরের দেয়ালের রঙ, পর্দার রঙ, কার্পেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ফলে শিল্পীদের কাজেও উজ্জ্বল রঙের প্রয়োগ আমরা দেখি না।

বাংলার নিজস্ব ঘরানা গড়ে ওঠেনি, কারণ আমরা কথায় বলি আমরা বাঙালি, কিন্তু বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমরা কতোটুকু জানি? এটার জন্য অনেক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে ছোটবেলাতেই যোগসূত্র স্থাপন করে দিতে হবে।

তারপরও আমাদের এখানে যে একেবারেই কাজ হচ্ছে না, তা নয়। আমাদের কামরুল হাসান লোকশিল্প, কালীঘাটের চিত্রকলা ইত্যাদির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। রশীদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রির ফর্ম আমাদের নিজস্ব লোকশিল্প লক্ষ্মীর সরা থেকে নিচ্ছেন। আবার কাইয়ুম চৌধুরীকে আমরা দেখলাম, একদিকে কালীঘাট থেকে নিচ্ছেন, অন্যদিকে তার মধ্যে জ্যামিতিক যে বিন্যাস আমার মতে, সেটা অনেকটা জামদানি শাড়ির মতো। এরকম হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ বোধ করছেন বলে তো আমি দেখছি না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ইউরোপিয়ান ঘরানার শিল্পী ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, আমার শিল্পকলায় মাটির গন্ধ নেই, দেশের গন্ধ নেই তখন আমার মনে হলো, একজন কৃষকের প্রধান কাজ হলো জমিটাকে চেনা। জমিটাকে চিনলেই সে সঠিক বীজটা রোপণ করতে পারবে। একজন শিল্পীকে কৃষক হতে হবে, তাকে বুঝতে হবে, আমার মাটি কেমন।

ঐতিহ্যে হাত দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার আগে দুজন অলরেডি সেখানে হাত দিয়ে কাজ করেছেন। একজন যামিনী রায়, আরেকজন কামরুল হাসান। আমার কাছে মনে হলো, এরা বিরাট দুটি পাহাড় এবং এ পাহাড়কে অতিক্রম করার মতো শক্তিশালী শিল্পীসত্তা আমার নেই। দেখলাম, আমার কাজে যদি কামরুল হাসান বা যামিনী রায়ের গন্ধ থাকে, তবে সেটা একজন আত্মম্ভরী শিল্পীর জন্য প্রশংসার কথা নয়। ঠিক করলাম, আমার পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা ও আমার ঐতিহ্যকে যদি মেলবন্ধনে আনতে পারি, তাহলে আমি ওদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো এবং আমি সেভাবে বেশকিছু ফিগারেটিভ কাজ ২৫ বছর পর ১৯৯৩-তে শুরু করি। তবে এখনো মনে হয়, বাংলাদেশে আমরা ছবি আঁকছি ঠিকই, কিন্তু নামটা যদি মুছে ফেলা যায় তবে শিল্পীর আইডেন্টিটি দেখা খুব মুশকিল। এখানে মূল ব্যাপার হলো, আমার ঐতিহ্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আমার ঐতিহ্যকে জানতে হবে, তার মধ্যে অবগাহন করে যদি শিল্প সৃষ্টি করা হয়, তাহলেই একটি নিজস্ব শিল্পধারা গড়ে উঠবে।

আমাদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়গুলো গভীর অভিনিবেশে পাঠ করেন। এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণামূলক কাজও করেছেন। একজন শিল্পী হিসেবে ইতিহাসের মতো বিষয়ের প্রতি আপনার আগ্রহের সূচনা কিভাবে ঘটলো?

আমি মনেপ্রাণে ইউরোপিয়ান চিন্তাধারায় আক্রান্ত ছিলাম। আমার বয়স যখন ২২ বছর, আমি এক রাতে বাড়ি ফিরিনি। আমার বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি বাড়িতে ফিরলে না কেন? আমি বড় হয়েছি। এটা আমাদের সমাজে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে হয় না। আমার বাবা আমাকে ইটালিতে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। আমি ঢাকায় ফিরে আসার পর যখন কোনো চাকরি পেলাম না, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম করাচি চলে যাবো। আমি যখন কাপড়-চোপড় গোছাচ্ছি, আমার বাবা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আমাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করলে না? আমি বললাম, নো, আমি গ্রোন আপ। কিন্তু ১৯৮০ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার ও শিল্পকলা একাডেমী আমাকে জাপানে ফুকোকা সিটিতে একটি সেমিনারে পাঠালো, আমার ইন্টারপ্রেটার মেয়েটি ছিল সুন্দরী, তরুণী, বেশভুষায় আধুনিক। আমি যখন তার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম, সে কিন্তু হাত বাড়ালো না। সে তাদের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মাথাটা ঝুঁকিয়ে আমাকে অভিবাদন জানালো। এটা আমাকে ভীষণভাবে আহত করলো। আমার তখন ঈশপের গল্প মনে হলো। একটা কাক ময়ূরের পুচ্ছ পরেছিল। সে কাকও হতে পারেনি, ময়ূরও হতে পারেনি। আমার মনে হলো, বাংলাদেশ তো বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ নয়; এটি এ উপমহাদেশেরই অংশ এবং এ উপমহাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। লোকজ উপাদান ও জলবায়ুর প্রভাব থাকতে হবে কিন্তু ধারাবাহিকতা তো অস্বীকার করা যায় না। তখন আমার জানার ইচ্ছা হলো, আমি কে, আমি কী, কোত্থেকে এসেছি। এটি যখন আমার মাথায় ঢুকলো, তখন দেখা গেল আমি আসলেই আর কোনো ছবি আঁকতে পারছি না। আমি ‘৮০ থেকে ‘৮৪ পর্যন্ত কোনো ছবি আঁকিনি। সেসময় আমি নিজেকে খোঁজার জন্য এ দেশের ধর্মীয় গ্রন্থ, ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, পুরাণ-এগুলো পড়া শুরু করলাম।

তারপর ১৯৯০ থেকে ‘৯৭ এ সাতটি বছরে আমি গবেষণা করতে শুরু করলাম। আমার কাছে খুব অবাক লেগেছিল, বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে চারজন অ্যাবেসিনিয়ান। এরা এসেছিল দাস হিসেবে। এরা পরে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। আমি ওই সময় একটি বই করি, ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ নামে।

আমার মতে, ইউনিভার্সিটিগুলোর ইতিহাস বিভাগে মুদ্রাতত্ত্ব ও শিলালিপি সম্পর্কে পাঠদান করা উচিত। তাহলে এ দেশের ইতিহাস, মুদ্রা, সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। ইউনিভার্সিটি লেভেলে এগুলো পাঠ্য থাকলে সামাজিক কাঠামো বোঝা যেতো। আমরা মুখে বাঙালি বললে তো হবে না, সংস্কৃতিকে তো লালন-পালন করতে হবে।

ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চা আপনার শিল্পে কি ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলেছে?

অবশ্যই ফেলেছে। ভবিষ্যতে আমার মনে হয়, কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। যেটা আমার এখনো আসেনি, এখনো আমি একটা ফিগারের বেশি আঁকি না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে টেরাকোটা দেখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। টেরাকোটার একেকটা ফলকে যেভাবে কয়েকটা ফিগারকে অর্গানাইজ ও কম্পোজ করা হয়েছে সেগুলো আমি দেখেছি, যা আমার আঁকায় কাজে লাগবে। আধুনিক চিত্রকলায় টেক্সচার একটা এলিমেন্ট, এখানে যেহেতু কোনো রঙ ছিল না অতএব, আঁচড় কেটে শাড়ির নানারকম টেক্সচার করা হতো। এগুলো হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমার কাজে লাগবে।

আপনি বলছিলেন যদি ৯৩ বছর বাঁচেন তবে আপনার শিল্প একটা পরিণত পর্বে পেঁৗছতে পারবে।

আমি মনে করি, এখন পর্যন্ত, এ ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমি শিখছি। কিন্তু সময়কে উত্তরণ করার মতো যে শিল্প, সেটা কিন্তু আমি সৃষ্টি করতে পারিনি। এই যে জ্ঞান আহরণ করছি এটা প্রয়োগ করার মতো যদি আরো বয়স আমি পাই, তাহলে আমি সফল হতে পারি। আমি আমার মাটি আমার দেশের রঙ এসব ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।

এই যে বাংলাদেশ, এর প্রকৃতি যদি দেখি, সব জেলার সব সবুজ কিন্তু এক নয়। সবুজের রঙ জায়গায় জায়গায় পাল্টে যায়। উত্তরবঙ্গের সবুজ কিন্তু একরকম, দক্ষিণবঙ্গের সবুজ অন্যরকম, আবার ডিস্ট্রিক্টওয়াইজ রমণীদের শাড়ির রঙ পাল্টে যায়। সব অঞ্চলে বেগুনি রঙ পাওয়া যাবে না। অনেক অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি আছে। সব অঞ্চলে ডুরেকাটা শাড়ি নেই। তবে কমন যে রঙ আমি সব অঞ্চলে দেখেছি, সেটা হলো নীল ও সবুজ। সিম্পল একটা দা’র ডিজাইন অঞ্চল ভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়। নৌকার শেপ, গলুই অঞ্চলভেদে চেঞ্জ হয়ে যায়।

সবক্ষেত্রেই আমরা দেখছি নিজস্বতার একটা ব্যাপার কাজ করে। শিল্পকলার ক্ষেত্রে উপলব্ধিটা এখন অনেক গভীরভাবে কাজ করছে। যেটা সিক্সটিজে অনুভূত হয়নি।

আমি কিন্তু এ বিষয়ে একমত নই। এখনো কিন্তু শিল্পীরা আমাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতিকে ওইভাবে অনুসন্ধান করছে না, যতোটা আন্তর্জাতিক শিল্পকলার প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে।

এটা কেন হচ্ছে? আপনি বহুদিন শিক্ষকতা করেছেন। আপনার কি মনে হয় আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে গলদটা রয়ে গেছে? নাকি আমাদের অগ্রজ শিল্পীদের অনুসরণ করতে গিয়েই এটা হচ্ছে?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে কী পড়ানো হচ্ছে? আমরা পড়াচ্ছি ওয়েস্টার্ন আর্ট-একেবারে পৃমিটিভ থেকে লেটেস্ট পর্যন্ত। কিন্তু ওরিয়েন্টাল আমরা পড়াচ্ছি ঠিকই, সেখানে ইনডিয়ারটাতে জোর দিচ্ছি, ছুঁয়ে যাচ্ছি জাপান-চায়নাকে। আমার মতে, আমাদের পাঠ্যক্রমকে পরিবর্তন করতে হবে। আমার বারোক, রকোকো বিস্তারিত জানার দরকার নেই। রেনেসাঁ জানলেই আমার জন্য যথেষ্ট। তারপর আসবো রিয়ালিস্ট পিরিয়ডে, তারপর ইমপ্রেশনিস্ট পর্বে। ইন বিটুইনগুলো আমরা টাচ করবো। আমি এশিয়ান, ইন্দোনেশিয়ায় কী আর্ট হচ্ছে তা আমি জানি না। মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে কী হচ্ছে তাও আমরা জানি না। ইনডিয়ার আধুনিক আর্ট আমরা জানি না-যতোটা জানি অজন্তা, ইলোরা, রাজপুর, কাংড়া। তাও ভাসা ভাসা। ওরিয়েন্টাল আর্টের মধ্যে পার্সিয়ান আর্টকে ইমপর্টেন্স দেয়া উচিত, তারপর ইনডিয়ান আর্ট। কালীঘাট ও পাল চিত্রকলা আরো ডিটেইল পড়ানো দরকার। নেপাল, মিয়ানমার, শ্রী লংকা, থাইল্যান্ড, জাপান, চায়না-এগুলোকে ইলাবোরেটলি পড়ানো দরকার। ইউরোপিয়ানটা শিখবো শিল্পকলার ধারাবাহিকতা জানার জন্য।

পপ আর্ট নিয়ে এতো পড়ার দরকার নেই। জানার জন্য পড়বো। সাহিত্যেও একই ঘটনা, পাশর্্ববর্তী দেশের সাহিত্য সম্পর্কে আমরা কিন্তু তেমন জানি না। আমাদের এখন পুরো জিনিসটার জন্য একটি ভিশন দরকার।

কিন্তু এ কথাও তো ঠিক যে, আন্তর্জাতিক কি লোকাল ফর্ম, যে ফর্মেরই একটি ছবি তৈরি হোক, শিল্পবোদ্ধা ও রসগ্রাহীর অভাবে সেটা ব্যাপকমাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছতে বা গৃহীত হতে পারছে না। এখানে শিল্প সমালোচনার অবস্থাও খুব সুখকর নয়।

শিল্পকলার আন্দোলন বলতে যা বোঝায়, সেটা কিন্তু আমাদের এখানে দরকার নেই। এটা প্রথম যুগে দরকার ছিল। ১৯৫০ সালে যখন ঢাকা লিটন হলে ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী হলো, তখন দেখা গেছে ঘোড়ার গাড়ি করে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে এসেছে। কারণ, ঢাকায় তখন বিনোদনের অভাব তাই একটা নতুন জিনিস চিত্রকলা দেখতে তারা এসেছে।

আমাদের ছাত্র অবস্থায় আমরা দর্শককে প্রাণপণে ফর্ম সম্পর্কে নানা কথা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু এখন কেউ প্রদর্শনী দেখতে এলে তাকে আমি বোঝাই না। তার মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হলো, সেটা আমি বোঝার চেষ্টা করি। আর্ট ক্রিটিসিজম বলতে যে জিনিসটি বোঝায়, সেটি আমাদের দেশে এখনো গ্রো-আপ করেনি।

বাংলাদেশের আর্ট বিকশিত করতে চাইলে সরকারের একটি প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মতো গরিব দেশে বিনোদনের অভাব। এ অভাবের কারণেই তরুণসমাজ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় যদি একটি আর্ট গ্যালারি থাকতো তাহলে ছোটবেলা থেকে বাচ্চারা আর্টের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারতো। আর্ট তো আমাদের দেশে একটি অভিনব জিনিস। সরকারের তো প্রচুর পরিত্যক্ত সম্পত্তি আছে, সেখানে হতে পারে অথবা শিল্পকলা একাডেমির একটি ঘরে হতে পারে। নিয়ম করতে হবে, এতে ছবি যারা দান করবে, সেটা হবে ইনকামট্যাক্স ফ্রি। এখানে শিল্পীদের একটি রেয়াত দিতে হবে। তাহলে আর্টিস্টরা বেনিফিটেড হবে। আজ শিল্পীদের কমপ্রোমাইজ করতে হচ্ছে, বিত্তবানদের মনোরঞ্জনের জন্য ড্রয়িংরুম-বেডরুমের পর্দা ও কার্পেটের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ছবি আঁকতে হচ্ছে। এর থেকে তারা মুক্তি পেতো।

আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র, উপন্যাস, গল্পে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে পেইন্টিংয়ে তার কতোটা এসেছে? জিরো জিরো ওয়ান পার্সেন্ট। এতো বড় ভাষা আন্দোলনের কাজ কোথায়। ‘৫২ সালে আমি একটি লিনোকাট করেছি, আমিনুল ইসলাম একটি করেছেন। তারপর আর কোথায়? এগুলোর প্রতি আর্টিস্টদের আগ্রহ তৈরি হলো না কেন? আমি আগে বলতাম, আর্টিস্টরা হলো পরগাছার মতো। পরগাছা শব্দটা শুনতে খুব খারাপ লাগে। এ জন্য আমি এখন বলি আর্টিস্টরা হলো অর্কিডের মতো। অর্কিডও কিন্তু এক ধরনের পরগাছা।

আপনার সামপ্রতিক কাজগুলোর প্রসঙ্গে আসি। ডানা সিরিজ আঁকছেন আপনি এখন। এর মূল মেটাফোর প্রজাপতির ডানা। এটা কেন বেছে নিলেন?

শিল্পী হবো এটি কিন্তু কোনোদিন আমার বাসনা ছিল না। আমার আর্ট ভালো লাগে। বাসায় প্রচুর আর্টের বই ছিল। আমি ছোটবেলা থেকে এগুলো দেখতাম। কিন্তু প্যারিসে যখন পিকাসো, মাতিস, ভ্যানগগের ছবিগুলো দেখলাম, আমার মনে হলো এ ছবিগুলো আমার চেনা। কারণ আমি ছোটবেলা থেকে ওগুলো দেখেছি। আর্ট শেখার জন্য কিন্তু আমি আর্ট ইন্সটিটিউটে ভর্তি হইনি। আর্টের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো ফোর্থ ইয়ারে পড়ার সময়। আমি সবসময় মনে করতাম, এখনো মনে করি যে, এ সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। ফলে অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে আমি বিশ্বাসী নই। যখন আমার বন্ধুরা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টে চলে গেল আমি কিন্তু মনে-প্রাণে নিতে পারিনি। কিন্তু নিজেকে আবার খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমি বোধহয় আধুনিক নই। কিন্তু আমি তো সমাজকে বিশ্বাস করি। এখানে আমার মধ্যে একটা টানাপড়েন চলতে থাকলো। তখন আইয়ুব খানের সময়। দেশে একটা দমবন্ধ অবস্থা। আমি উপলব্ধি করলাম, আর্থ-সামাজিক কারণে কোথায় যেন একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। দেখলাম, কোথায় যেন একটা অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে। তখন আমি ওয়াল সিরিজ শুরু করলাম। ওয়াল সিরিজ আমি এঁকেছি ৯২টা।

যুদ্ধের সময় সপরিবারে পালিয়ে গিয়েছি প্যারিসে। সেখানে বসে আঁকলাম এপিটাফ ফর দি মারটারস। ছবিতে দেখালাম যোদ্ধারা মাঠে পড়ে আছে, আমার মনে হলো এদের কথা কেউ বলবে না। সবাই তার পার্টির লোককে নাম ফলকে আনবে। বাংলাদেশে এতো লোক মারা গেছে সবাই তো আর পার্টির লোক না; সাধারণ মানুষ। তখন এসব অজানা অচেনা শহীদদের উদ্দেশ্যে আমি ছবি আঁকা শুরু করলাম। পাথরের নুড়ি নিয়ে। কারণ প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন কোনো যোদ্ধা মারা যেতো, তখন তার মাথার কাছে একটা পাথর রাখা হতো। পাথরটা কিন্তু তখন আর পাথর নয়। ওটা একটা সিম্বল, উন্মুক্ত আত্মার, এটাকে মেনহির বলে। এ সিরিজ ‘৭৬ সাল পর্যন্ত আমি ৩৭টার মতো এঁকেছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু আঁকলাম। এরপরের মেজর সিরিজ উইং।

উইং শুরু করলাম ১৯৯৮ থেকে। দেখলাম মানুষের মধ্যে খুব হতাশা। মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষ যে বাংলাদেশ চেয়েছিল, সে বাংলাদেশ পায়নি। যুবক সমাজ ফ্রাস্ট্রেটেড। পত্রিকা খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই। তখন আমার মনে হলো, জীবনের জয়গান গাইতে হবে। আমি তখন দেখলাম প্রজাপতি জীবনের একটা স্পন্দন, লাইফ। যা স্ট্যাগনেন্ট নয়। এখানে ওখানে বসছে-উড়ছে। তখন আমার মাথায় এলো, প্রজাপতির অংশ আঁকার কথা। ভাইব্রেশন অফ লাইন, জীবনের স্পন্দন, জীবন যে সুন্দর, বিচ্ছুরিত হচ্ছে জীবনের জয়গান-এটিকে চিত্রায়িত করতে চাইলাম। আজ পর্যন্ত এঁকেছি ৯২টি। আমার মনে হয় ১১৫-১২০ পর্যন্ত যাবে। এরপর আমি যেটা আঁকার পরিকল্পনা করছি সেটা হলো, ওয়ালেরই আরেকটি ইন্টারপ্রেটেশন।

ওয়াল সিরিজটার মধ্যে একটা গুমোট ভাব ছিল। দমবন্ধ অবস্থা ছিল। পস্নাস্টার খসে গেছে, শ্যাওলা ধরেছে, ইট বেরিয়ে এসেছে। এখন আমার তো বয়স হয়েছে। স্মৃতি কিন্তু খুব মিষ্টি, বেদনার হলেও কিন্তু মিষ্টি। আমি মাঝখানে মেমোরি বলে কিছু কাজ করেছিলাম। এখন রেমিনিসেন্ট বলে একটা সিরিজ করবো। আমি ঢাকা, প্যারিস, ভেনিস, ফ্লোরেন্সে যে দেয়ালগুলো দেখেছি, সেখান থেকে অাঁকবো। এর মধ্যে কিন্তু হতাশা নেই। একটা বেদনা-বিধুর কথা। যেমন দেয়ালগুলোতে অনেক লেখা ছিল নানা রঙের। তারপর সাদা রঙ দিয়ে সেটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় রঙগুলো দেখা যাচ্ছে। এটা আকার পস্ন্যান আছে। এটা আমি আঁকবো উইংটা শেষ করার পর। ফিগারেটিভ কাজও আমি করবো। ইস্ট-ওয়েস্টের যে মেলবন্ধন আমি করতে চেয়েছিলাম এটি পরিপূর্ণ হয়নি। একটি প্রদর্শনী আমার সব ফিগারেটিভ কাজ দিয়ে করতে চাই। বাংলাদেশের যে কোনো অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টিস্ট এটা হয়তো করতে সাহস পাবে না। অবশ্য এ জন্য সুস্বাস্থ্য দরকার, আয়ু দরকার। সুস্বাস্থ্য আমার হাতে, কোনো অনিয়ম আমি করি না। কিন্তু আয়ু তো আমার হাতে নেই। আমি কী করবো?

http://30boxes.com/widget/8430731/JahanHassan/fbe55cb44992143598a6dadd06e09354/0/

অনবদ্য কবিতা সন্ধ্যা ২০১২


Bangladesh Reders & Writers Forum
Kobita Shondha in Los Angeles 2012
Full Program:

কবিতার ভাষা হোক সমাজ বদলের হাতিয়ার।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অপ-সংস্কৃতির মোকাবেলা করার শপথে লস এঞ্জেলেস এ বাংলাদেশ রিডার্স এন্ড রাইটার্স ফোরামের অনবদ্য কবিতা সন্ধ্যা

Picture Link:

Visit us on FaceBook একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ