স্ক্রিননির্ভর জীবন


স্ক্রিননির্ভর জীবন

  

সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে ঘরে ফিরে আবার বসছেন টিভি স্ক্রিনের সামনে। রিমোটের নব ঘুরছে, একটার পর একটা চ্যানেল আসছে, কোথাও মন বসছে না। বেডরুমের টিভিতে গৃহকর্ত্রী তখন বুঁদ হয়ে আছেন হিন্দি সিরিয়ালে। পাশের রুমে মেয়ের খোলা দরজায় চোখ রেখে দেখলেন কম্পিউটারে ফেসবুকে নিমগ্ন মেয়ে। ছোট ছেলেটি পড়ার টেবিলে বসেই ভিডিও গেমের বাটন টিপে যুদ্ধজয়ের ভার্চুয়াল নেশায় উত্তেজনায় কাঁপছে। একই ছাদের নিচে নানা স্ক্রিনে চোখ রেখে চার আপনজন হয়ে উঠেছেন চার পৃথিবীর বাসিন্দা। এক অদ্ভুত একা, নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও যে যার মতো খুঁজে নিচ্ছেন আপন আপন জগৎ। আমরা বাঁধা পড়ছি এক নতুন জীবনচক্রে। এক দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও তৈরি হচ্ছে যোজন যোজন দূরের পৃথিবী। কখনো তা সুখ আনছে কখনো তা ডাকছে দুঃখ। কিন্তু এ থেকে যেন মুক্তি নেই। নিত্যদিনের জড়িয়ে যাওয়া এই নয়া পৃথিবীই যেন আমাদের নয়ানিয়তি। লিখেছেন শুভ কিবরিয়া

ভদ্রলোকের এক ছেলে এক মেয়ে। বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে কাজ করেন। সকালে যখন অফিসে বের হন গাড়িতে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনেই জেনে নেন সেদিনের দৈনিক সংবাদের শিরোনাম। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে লম্বা সময় ধরে নিউজপ্রিন্টের সংবাদপত্র পাঠের ধকল আর সামলাতে হয় না তাকে। সংবাদ পাঠের মাঝেই দ্রুত নিজের পারসোনাল ই-মেইল চেক করে নেন। একবার উত্তরও দেন প্রয়োজনমতো মোবাইলের বাটন টিপে। মুঠোফোনের প্রতি এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে ওঠে। এক মোবাইল ফোন কত কাজের সুবিধা দিচ্ছে। 
অফিসে পৌঁছেই ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রাখেন। আজকাল আর কাগজের বালাই নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনেই ব্যাংকিং জগতের গোটা দুনিয়ার খবর। প্রথম যখন পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন তখনও টেবিলজুড়ে কাগজপত্র থাকত। দ্রুত কাগজের অফিস হারিয়ে গেল। ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে এসব ভাবতে ভাবতেই মুঠোফোনের এসএমএস অ্যালার্ট বেজে ওঠে। মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের মেসেজ। আগামী সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে, তার খবর। ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন, দুই স্ক্রিনের এই চালাচালির মাঝেই দ্রুত অফিসের জরুরি মিটিংগুলো সারতে থাকেন। মিটিংয়ে থাকার সময় মুঠোফোন সাইলেন্স মুডে থাকে। মিটিং শেষে মুঠোফোন খুলে মেসেজ, মিসকলগুলোর দিকে তাকান। একটা নম্বর অচেনা মনে হয়। রিং করতেই ওপার থেকে তাকে মনে করিয়ে দেয়া হয় আজ রাত সাড়ে আটটায় মেডিসিনের প্রফেসরের সঙ্গে তার অ্যাপয়েনমেন্টের কথা। ছেলেকে নিয়ে যাবেন। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রিকনফার্ম করা হলো আজকের অ্যাপয়েনমেন্ট।
ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে। দেখতে দেখতে কী লম্বা হয়ে গেল। দেশের খ্যাতনামা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র সেকশনে পড়ছে। দেখতে অনেকটা দাদার মতো হয়েছে। আজকাল ছেলের মুখের দিকে তাকালে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। কাজের ভিড়ে বাবার কথা মনেই পড়ে না। বাবা কি মিষ্টি আদর করতেন, আর প্রয়োজনে কি কড়া শাসন ছিল তার! নিজের ছেলের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্কটা অন্যরকম। প্রায় বন্ধুর মতো। যদিও কর্মব্যস্ততার কারণে আস্তে আস্তে ছেলের সঙ্গে শেয়ার করার সময় কমে যাচ্ছে। ছেলে আর বাবা, দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে আলগোছে কাছে টেনে নেন নোটবুক। নোটবুকের টাচস্ক্রিনে দেখতে থাকেন নিজের বাবার ছবি। ফিরে আসতে থাকে স্মৃতি, শৈশব, ধূসর দিনের বহু উজ্জ্বল আনন্দঘন সময়ের কথা। একসময় দেখেন চোখের কোণে পানি জমেছে। একটু অবাক হয়েই পড়েন। আজ কি হলো? নোটবুক বন্ধ করে, মুঠোফোনে স্ত্রী এবং ছেলেকে মেসেজ পাঠান, আজ বিকেলে ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েনমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। স্ত্রীর তাৎক্ষণিক পাল্টা মেসেজ, ওকে, থ্যাংকস। মুচকি হাসতে থাকেন। বিয়ের আগে বছর দেড়েকের প্রেম ছিল। দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আজকাল দুজনের দেখা এবং কথা হয় যত, তার চেয়ে স্ক্রিনেই যোগাযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক এক এনজিওতে দ্রুত ওর উন্নতি হচ্ছে। ক্যারিয়ারের প্রতি যত
œবান স্ত্রী, আজকাল ট্রেনিং, সেমিনার এসব নিয়ে বিদেশেই থাকেন বেশি। দেশে থাকলেও বেশির ভাগ সময় কাটে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রামে। খাবার টেবিলে মাঝেমধ্যে তাই ছেলেটি রসিকতা করে মাকে বলে, মা এ মাসে কদিন তুমি দেশে থাকবে? ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবার মতো মায়ের যোগাযোগের বড় মাধ্যমও হয়ে উঠছে মুঠোফোন, মেইল, স্কাইপিÑ হরেক রকম স্ক্রিন।

২.
যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করা হলো, এরকম এক জীবনের মধ্যে দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে উঠতি মধ্যবিত্ত। ছোট সংসারের, কর্মব্যস্ত, বৈষয়িক উন্নতির প্রতি ধাবমান এই নয়াপ্রজন্ম বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ষাটের দশকীয় মূর্তি ভেঙে দ্রুত ওপরে উঠছেন। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ ভ্রমণ, অফিসনির্ভর জীবনের মাঝে পরিবার, সন্তান, স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে স্ক্রিন। মুঠোফোন, আইফোন, ল্যাপটপ, নোটবুক
Ñ এই ই-জগতের মাধ্যমেই পরিবার, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে থাকছে নেটওয়ার্ক। এক অর্থে এই নেটওয়ার্ক এখন বড় হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-বন্ধুদের যাদের সঙ্গে একসময় বছরে একবারও দেখা হতো না, চিঠি চালাচালি ঘটত না, এখন তাদের সঙ্গে চলছে নিত্য যোগাযোগ। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইয়াহু, জি-মেইলÑ কত নিত্য পথে প্রতিদিন জানা হয়ে যাচ্ছে সবার খবর। 
এটা শুধু উঠতি মধ্যবিত্তের জীবনেই যে ঘটছে তা নয়। আমাদের সবার ঘরে, কোনো না কোনো কর্মে স্ক্রিনের উপস্থিতি নিত্য বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগের শক্তি আছে তারা তো বটেই, যাদের সেসব নেই তারাও ঘরের মধ্যে স্ক্রিনের চৌহদ্দিতে আটকে থাকছেন। টেলিভিশনের স্ক্রিন এখন তাদের জীবনের বড় অংশ। হিন্দি, বাংলা সিরিয়াল, কৌতুকের রিয়েলিটি শো, গানের প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস শো, নিউজ, প্রকৃতি হরেক রকম চ্যানেলের
  বহুবিচিত্র অনুষ্ঠান আমাদের ঘরের জীবনকে আটকে রেখেছে স্ক্রিনের কয়েক ইঞ্চির সীমানায়।

৩.
রাজনীতি কি স্ক্রিনের বাইরে? যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের ক্যামেরার সামনের হুড়োহুড়ি খেয়াল করলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। টেলিভিশন ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে নেতা হবার রাজনৈতিক ইঁদুর দৌড় এখন প্রবল। যারা আরেকটু সৌভাগ্যবান, যাদের সামাজিক যোগাযোগ আরেকটু গতিময়, তাদের জন্য রয়েছে টেলিভিশনের টকশো। বিরোধী দল গত চার বছরে যা করতে পারেনি, এক টকশোই তার চেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে সরকারি দলের ওপর। টেলিভিশন স্ক্রিনের মধ্যরাতের টকশো খোদ প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিরক্ত করছে। মিডিয়ায় তিনি সেই বিরক্তি প্রকাশও করেছেন। স্ক্রিনে জনগণ তাই দেখছে।
শুধু বুর্জোয়া রাজনীতির দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়, আগে যারা সমাজ বদলের কথা ভাবতেন, সেই বামপন্থি রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক কর্মীদের ভরসাও এখন স্ক্রিন। ফেসবুকে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কে কখন কোথায় কোন বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে যাচ্ছেন। ছোট স্ক্রিনে বার্তা রাখছেন, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির।
 
সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ফেসবুকের স্ক্রিন যে বড় শক্তি অর্জন করেছে, তার প্রমাণ মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত। বাংলাদেশেও তার স্বপ্নপ্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে। স্ক্রিন যে কত শক্তিশালী, কখনো কখনো কত আত্মধ্বংসী তার প্রমাণ মিলেছে রামুর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়। এর উপাদান, প্রণোদনা, প্ররোচনা ঘটিয়েছে মোবাইল আর কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে আসা কোরান অবমাননার ছবি।

৪.
শিক্ষার্থীদের জীবনে স্ক্রিনের প্রভাব বড় হয়ে উঠছে। আগে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে সিনেমা হলে যেত ছবি দেখতে। এখন কম্পিউটার স্ক্রিনেই তা সারছে। জ্ঞানভাণ্ডার এখন গুগল আর ইন্টারনেটের স্ক্রিন চৌহদ্দিতে ঢুকে যাওয়ায় ম্যানুয়াল লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। শিশুরাও এখন আর মাঠে যায় না, খোলা আকাশের দেখা পায় না। মাঠ কমছে, আকাশ হারিয়ে গেছে বলেই হয়ত শিশুদের খেলার জগৎ আর স্বপ্নপৃথিবী হচ্ছে স্ক্রিন। ডোরেমন তাদের এক নয়া অ্যাডিকশনের নাম। কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন তাদের দিনরাত্রি কেড়ে নিচ্ছে। টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বসেই ভিডিও গেমসে তৈরি হচ্ছে তার স্বপ্নজগৎ। ফার্মভিল তাকে শেখাচ্ছে কল্পিত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির ফার্ম তৈরির কথা। স্পোর্টস রাইডে চড়ে সে চলে যাচ্ছে তার অনন্ত স্বপ্নের ভার্চুয়্যাল জগতে। স্ক্রিন অ্যাডিকশনে খেলাধুলা, দৌড়াদৌড়ি কম
  বলে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। সেই সমস্যা সমাধান করতে আবার এগিয়ে আসছে স্ক্রিন। ভার্চুয়্যাল জগতে শিশুদের খেলাধুলা, ব্যায়াম নিয়ে আসছে এক্সবক্স। টিভির মনিটরে চোখ রেখে দুরন্ত সব অ্যাডভেঞ্চারে মাতছে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা।

৫.
স্ক্রিনের প্রভাব কি নেই তৃণমূলের জীবনে? যে কোনো বস্তি এলাকায় গেলে দেখা যাবে, ঘরে ঘরে চলছে টেলিভিশন, ভিডিও। মোবাইল ফোন তো সবার হাতে। গ্রামের ছোটবড় দোকানগুলো ছিল একসময় সামাজিক আড্ডার বড় কেন্দ্র। দোকান ঘিরে অবসর কাটত গল্প আড্ডায়। ধূমায়িত চায়ের সঙ্গে চলত রাজনীতির উজির-নাজির মারা। এখন সে জায়গারও দখল নিয়েছে স্ক্রিন। ছোটবড় প্রায় প্রতিটি দোকানে ডিভিডি চলছে সর্বক্ষণ। যার যার পছন্দমতো বাংলা কিংবা হিন্দি ছায়াছবি কিংবা গানের ট্রেলর চলছে। দোকানঘরের সব ক্রেতা কিংবা অবসর কাটানো আড্ডাপ্রিয় মানুষের চোখ আর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে টিভির কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিন।
স্ক্রিন আমাদের সব দিচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে রিয়েলিটি শো হয়ে ন্যুড জগতের তাবৎ জিনিস পেয়ে যাচ্ছি আমরা স্ক্রিনে। এক স্ক্রিন থেকে অন্য স্ক্রিনে স্থানান্তরের সহজ প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞানের জগৎ, সুশীল জগতের যেমন বিস্তার বাড়ছে, সহজগম্যতা ঘটছে, ঠিক তেমনি বাড়ছে অপরাধপ্রবণতাও।
পর্নোগ্রাফির প্রসার থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নয়াজগতের আবির্ভাব এখন এই স্ক্রিনেই। বাংলাদেশেই কোরবানির গরু কেনা যাচ্ছে অনলাইনের ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখেই।

৬.
দেশে কি সুশাসন আসবে? দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? এই শাসনগত প্রশ্নের সমাধানেও এগিয়ে এসেছে স্ক্রিন। কথা উঠেছে, ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার। ই-টেন্ডারিংয়ের। এই ই-জগৎ এখন সুশাসনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়গান চলছে। অফিস-আদালত সর্বত্র ডিজিটালাইজেশন হবার কথা উঠছে। সর্বত্রই ই-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনদুনিয়ার পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ এক স্ক্রিন সাম্রাজ্য এখন আমাদের আরাধ্য। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন তাই আসলে স্ক্রিন দুনিয়ার নয়ারাজ প্রতিষ্ঠার নামান্তর।

৭.
আমাদের ভাবনা, চিন্তা, কর্ম, বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা, স্বপ্ন
Ñ সর্বত্রই স্ক্রিনের উপস্থিতি বড় হয়ে উঠছে। এর ভালো দিক যেমন আছে মন্দ দিকও তেমনি আছে। ঘরের কোণে রাতের পর রাত যে মেধাবী ছেলেটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে আউটসোর্সিং করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কেউ কেউ খুঁজে নিচ্ছে আল-কায়েদার যোগসূত্রও। গ্লোবাল পৃথিবীর এই নয়া স্ক্রিনরাজ তাই এখন এক বড় বিপদের নামও। এর হাত ধরে আমরা যেমন আবিষ্কার করতে পারি জ্ঞানের সমুদ্র ঠিক তেমনি ডুবে যেতে পারি সন্ত্রাসের, পর্নোগ্রাফির নিষিদ্ধ জগতেও। ছোট একটা স্ক্রিন যেমন আমাদের জীবনে আনতে পারে অনেক আনন্দের সংবাদ, ঠিক তেমনিই এই স্ক্রিনেই ভেসে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ। কিন্তু স্ক্রিন থেকে মুক্তি নেই। আধুনিক দুনিয়ার এই নয়া আবিষ্কার আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। পুঁজি আর বাণিজ্যের দুনিয়াবি সিন্ডিকেট তাতে দিয়েছে তা। কাজেই স্ক্রিন জগতেই এখন আমাদের নিত্যবাস।
এই ঈদে হরেক চ্যানেলে হাজার রকমের অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন চলছে। এই ছোট স্ক্রিনের নানান অনুষ্ঠান কেড়ে নেবে আমাদের ঈদজীবন। এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলের নব ঘুরিয়ে স্ক্রিনের মাহাত্ম্যেই হয়ত আমরা ভুলে যাব আমাদের সামাজিক আড্ডার কথা, আত্মীয় সম্মিলনের কথা। কিংবা হয়ত ফেসবুকে, মুঠোফোনে ঝালিয়ে নেব আমাদের আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব ।
সূত্র ঃ http://www.shaptahik.com/v2/?DetailsId=7428

বাংলা ভাষায় প্রতিনিয়ত ঢুকছে বিদেশি শব্দ


বাংলা ভাষায় নতুন আড়াই হাজার বিদেশি শব্দ

রফিকুল বাসার
#
  প্রয়োজন ছাড়াই ঢোকানো হয়েছে অনেক বিদেশি শব্দ
#
  বাদ পড়ছে প্রচলিত অনেক যুত্সই বাংলা শব্দ
#
  পরিভাষা যথার্থভাবে প্রণয়নের পক্ষে বিশেষজ্ঞরা

বাংলা ভাষায় প্রতিনিয়ত ঢুকছে বিদেশি শব্দ। এর ফলে অনেক প্রচলিত শব্দ বাদ যাচ্ছে দৈনন্দিন ব্যবহারের তালিকা থেকে। মানুষের মুখে মুখে যেমন উচ্চারিত হচ্ছে বিদেশি শব্দ, তেমনি সরকারিভাবেও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেক বিদেশি শব্দ আত্তীকরণ করা হয়েছে। গত ১৮ বছরে বাংলায় সরকারিভাবে দুই হাজার ৫০০ নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার সবকটিই বিদেশি। মান বা প্রমিত বাংলার বাইরে অঞ্চলভেদে বৃহত্ জনগোষ্ঠীর নিত্যব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা থেকে একটি শব্দও নতুন সেই তালিকায় স্থান পায়নি।

ভাষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রয়োজনীয় শব্দ আত্তীকরণ না করা ভালো। বিদেশি শব্দকে গ্রহণ করতে হবে; কিন্তু দেখতে হবে সেই শব্দটি আমাদের জন্য কতটা জরুরি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ (বাবাকো) প্রশাসনিক পরিভাষা তৈরি করে। ১৮ বছর পর বাবাকো নতুন করে প্রশাসনিক পরিভাষা প্রকাশ করেছে গত বছরের অক্টোবরে। এর আগে ১৯৯৪ সালে প্রশাসনিক পরিভাষা প্রকাশ করেছিল তারা। নতুন পরিভাষা কোষটির প্রকাশনা বিষয়ক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘অনেক নতুন শব্দ নতুন কলেবরে প্রশাসনিক পরিভাষায় অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় প্রায় ২৫০০ নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত করে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ প্রশাসনিক পরিভাষা পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করেছে।’

পরিভাষা কেমন হওয়া উচিত জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে পরিভাষা প্রয়োজন আছে। তবে তা করতে হবে যথেষ্ট বিচার- বিবেচনা করে। যত্নের সাথে এটা করা উচিত। ভাষাকে চলমান করতে, ভাষার গতি ঠিক রাখতে পরিভাষা যথার্থভাবে প্রণয়ন করতে হবে। যেনতেন করে পরিভাষা করলে ভাষায় তার খারাপ প্রভাব পড়বে।

বাবাকো’র নতুন প্রশাসনিক পরিভাষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যেসব বিদেশি শব্দ পরিভাষায় আনা হয়েছে, সেসবের অনেকগুলোরই বিকল্প হিসেবে যথেষ্ট যুত্সই বাংলা শব্দ রয়েছে। সেগুলো বহুল প্রচলিতও বটে। শুধু অভিধানে নয়, মানুষের মুখে মুখেও সেসব শব্দ চালু আছে। তবু সেসব শব্দ বাদ দিয়ে সরাসরি ইংরেজি শব্দটিকে বাংলায় স্থান দেয়া হয়েছে। যেমন, ‘স্টক এক্সচেঞ্জ’ শব্দটিকে বাংলায় আনা হয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে ‘শেয়ার বাজার’ শব্দটি। বাংলা আর ইংরেজি মিশিয়ে এটি করা হয়েছে। কিন্তু বহুল প্রচলিত ‘পুঁজি বাজার’ শব্দটিকে রাখা হয়নি পরিভাষায়। এমন আরো অনেক ইংরেজি শব্দ হুবহু বাংলা হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। যেমন—মেডিকেল অফিসার, পাসওয়ার্ড, সিকিউরিটি, সিভিল সার্ভিস ইত্যাদি। কিন্তু এসবের প্রত্যেকটির প্রচলিত বাংলা শব্দ রয়েছে। যেমন—মেডিকেল অফিসার> চিকিত্সা কর্মকর্তা, পাসওয়ার্ড>গোপন নম্বর, সিকিউরিটি>নিরাপত্তা, সিভিল সার্ভিস>জনপ্রশাসন ইত্যাদি।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পরিভাষা নিয়ে বলেন, ‘আমাদের চেষ্টা করা উচিত পরিভাষা তৈরি করা। বিজ্ঞান বিষয়ক যদি কিছু হয়, তবে তা আলাদা কথা। বিজ্ঞানের অনেক শব্দ আছে যার হয়তো প্রায়োগিক ও যুত্সই বাংলা করা সম্ভব নয়। সেটা আমরা সরাসরি নিতে পারি। কিন্তু যে শব্দগুলো তৈরি করা সম্ভব তা সরাসরি না নিয়ে তৈরি করা উচিত। আর এটিই ঠিক পথ। আঞ্চলিক শব্দ থেকেও মূল ধারায় শব্দ আনা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘প্রচলিত শব্দ থাকলে সেটিই প্রথম নেয়া উচিত। প্রচলিত শব্দ কোনভাবেই বাদ দেয়া ঠিক নয়। আর প্রশাসনিক পরিভাষা অবশ্যই ভালোভাবে করা উচিত। কারণ এখান থেকেই মানুষ প্রথম এবং বেশি শেখে।’

নতুন কলেবরে বের করা পরিভাষায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজি ও বাংলা দুইটি শব্দই পাশাপশি রাখা হয়েছে। ব্যবহারকারী তার ইচ্ছেমতো যেকোনটিই ব্যবহার করতে পারবে। যেমন ‘একটিং প্রেসিডেন্ট’-এর দুইটি বাংলা করা হয়েছে। ‘অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট’ ও ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’। এ ধরনের আরো শব্দ রাখা হয়েছে। যেমন—মর্গ/শবাগার, বাসা/কোয়ার্টার, প্রতিবেদক/রিপোর্টার, সিদ্ধান্ত/রুলিং, সাইরেন/সংকেত বাঁশি, স্টক/মজুদ, এক্স-রে রিপোর্ট/রঞ্জন রশ্মি প্রতিবেদন, উড়োজাহাজ/বিমান, ব্যাংক জামানত/ ব্যাংক গ্যারান্টি, অঙ্গন/ ক্যাম্পাস, ক্যাপশন/ পরিচয়জ্ঞাপক বিবরণ, সার্টিফিকেট/ সনদ, ডেসপাচ/প্রেরণ করা, ডাউনপেমেন্ট/ক্রয়মূল্যের প্রাথমিক পরিশোধযোগ্য অংশ, এন্ট্রি ফি/প্রবেশ মূল্য, ইরেজার/মুছিয়া ফেলা, নিশ্চিহ্ন করা, দ্রুত টেলিগ্রাম/তারবার্তা, প্রধান কার্যালয়/প্রধান অফিস, হাইজ্যাক/ছিনতাই, হট লাইন/সরাসরি লাইন, হাইব্রিড/সংকর, জেলখানা/কারাগার, এজমালি/যৌথ ভূসম্পত্তি/জয়েন্ট ইস্টেট, জার্নাল/পত্রিকা ইত্যাদি। কিছু ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে শব্দ করা হয়েছে। যেমন—ব্যাংকের পাসবই, বাণিজ্যিক এজেন্ট, কাউন্টার বিলি, তলবী ড্রাফট, জরুরী ওয়ার্ড ইত্যাদি।

যেসব বিদেশি শব্দ প্রশাসনিক পরিভাষায় সরাসরি ঢুকিয়ে বাংলায় আত্তীকরণ করা হয়েছে সেগুলো হলো এডহক, অ্যাডমিরাল এজেন্সি, ব্যাংক ড্রাফট, ব্যাংক নোট ব্যানার, বার কাউন্সিল, ব্যারিস্টার, ব্যাটেলিয়ান, ব্যাটারি, ব্যাটারি চার্জ, বিল, ব্রীফকেস, ব্রডব্যান্ড, বাজেট, ক্যাডেট, ক্যাডার, ক্যাডার সার্ভিস, ক্যাম্প, ক্যাপ্টেন, কপি, ক্যাশবই, সিনিয়র ক্যাম্প রেজিষ্টার, ক্যাসেট, চার্টার অ্যাকাউন্টান্ট, চেক/ব্যাংক চেক, সিভিল, সিভিল সার্ভিস, সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট, ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার, কমিশন এজেন্ট, কমনওয়েল্থ, কম্পাউন্ডার, কম্পিউটার, কনফারেন্স, কনস্টেবল, কনসাল, কনসাল অফিস, কন্টেইনার সার্ভিস, কর্পোরেশন, কালভার্ট, ডিজিটাল, ডিপ্লোমা, ডিভিশন বেঞ্চ, ই-মেইল, এস্টাব্লিসমেন্ট, ম্যানুয়াল, ইস্টেট, এক্সচেঞ্জ ফি, ফেলোসিপ ফাউন্ডেশন, গ্যালারি, গ্যারেজ, ব্রড গেজ, মিটার গেজ, গেজেট, গেজেটেড অফিসার, গার্ল গাইড, গ্রেড, গার্ড ফাইল, হার্ডডিস্ক ইনবক্স, ইনস্টিটিউট, ইন্টারনেট, কিটবক্স, লেবেল, ল্যাপটপ লে-অফ, লে-আউট, লেভেল ক্রসিং, লাইসেন্স, লাইফ ভেস্টা, লাইন, লক আউট, মেসার্স, মেইলবক্স, মেইন ট্রেন, ম্যানহোল, মাস্টার রোল, মিটার, মিল, মিস্ড কল, মিশন, মিকচার, মোবাইল ফোন, মডেম, মানিঅর্ডার, মনিটর, মনোগ্রাম, মাদারবোর্ড, মাউস, নোটারী পাবলিক, নোট শীট, নোটিশ, অফিসিয়েলিং আউটবক্স, ওভারড্রাফট, প্যাকেট, প্যানেল, পার্শেল, পাসওয়ার্ড, পে-অর্ডার, পে-রোল, পে-স্লিপ, পারমিট, পেট্রোল, ফোন, ফটো, ফটোপ্রিন্ট, ফটোকপি, পিকেটিং প্লাকার্ড, প্লাস্ট, প্লাটফর্ম, প্লাটুন, পোর্টফোলিও, পোস্টাল অর্ডার পাওয়ার অব এটর্নি, প্রেসক্লিপিং, প্রেসকাটিং, প্রাইজবন্ড, প্রমিসরি নোট, প্রটোকল, রাডার, লটারী, রেস পুলিশ, র্যালি, রেকর্ড, রেফারী, রিমান্ড, রোটারী ক্লাব, রয়্যালটি, রবার স্ট্যাম্প, রানওয়ে, সেলুন, স্কেল, স্কল, সার্চ লাইট, সীট-বেল্ট, সেক্টর, সিনেট, সেপটিক ট্যাংক সার্ভিস, সার্ভিস চার্জ, সেটেলমেন্ট, শেয়ার সার্টিফিকেট, শেয়ার হোল্ডার, শুটিং, শর্ট সার্কিট, শো-রুম সাটস ট্রেন, স্লিপ প্যাড, স্লোগান, স্লুইস গেইট, সলিসিটর, স্পীড বোট, স্পাইরাল বাইন্ডিং, স্পন্সর, স্টেডিয়াম, স্ট্যাম্প, স্টেশন, স্ট্রং-রুম, সাব-পোস্ট অফিস, সাব-এজেন্সি, সিম্পোজিয়াম, সিন্ডিকেট, সিনথেটিক, ট্যাগ, ট্যানারি, টেলিগ্রাম মনিঅর্ডার, টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, টেলেক্স, টেরেস্ট্রিয়াল, টেস্ট, টেস্ট রিলিফ, টাইমস্কেল, টিস্যু পেপার, টয়েলেট, ট্রেড-ইউনিয়ন. ট্রফি ট্রান্সফর্মার, ট্রলার, ট্রেজারি বিল, ট্রাইব্যুনাল, ট্রাংক কল, ট্রাস্ট, টাইফয়েড, ইউনিয়ন, ইউনিট, ভল্ট, ভাইস চেয়ারম্যান, ভিটামিন, ভোল্ট, ভাউচার, ওয়েবসাইট ইত্যাদি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইকবাল মাহমুদ বইটির ভূমিকায় বলেছেন, ‘পরিভাষা কমিটি প্রতিটি শব্দের বুত্পত্তি, মূল অর্থ, ব্যবহূত অর্থ ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিচারপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’

মানুষের মুখে মুখে নতুন শব্দ
গত দুই বা তিন দশকে অনেক ইংরেজি শব্দ বাংলাভাষী মানুষের মুখে মুখে মিশেছে, যার প্রতিটির প্রচলিত বাংলা রয়েছে। যেমন—প্রফেসর (অধ্যাপক), হাই (সালাম/আদাব/নমস্কার), সরি (দুঃখিত), মর্নিং ওয়াক (সকালের ব্যায়াম বা হাঁটা), দাঁত ব্রাশ (দাঁত মাজা), বাথরুম (গোসলখানা), টয়লেট (পায়খানা), লাঞ্চ (দুপুরের খাবার), ডিনার (রাতের খাবার), কিচেন (রান্নাঘর), ড্রইং রুম (বৈঠক ঘর), বেডরুম (শোবার ঘর), ডাইনিং রুম (খাবার ঘর), টিচার (শিক্ষক), ক্লাস লেকচার (শ্রেণী বক্তৃতা), হোম ওয়ার্ক (বাড়ির কাজ), ক্লাশ ওয়ার্ক (শ্রেণীর কাজ), ক্লাশ রুম (শ্রেণী কক্ষ), ড্যাডি (বাবা), মাম (মা), আঙ্কেল (চাচা, মামা, খালু, ফুফু), আন্টি (চাচি, খালা, মামি, ফুফু), ফ্রেন্ড (বন্ধু), গেস্ট (অতিথি, মেহমান), ওকে (ঠিক আছে), থ্যাঙ্কস (ধন্যবাদ), প্লিজ (দয়া করে), ওয়েলকাম (স্বাগতম), প্রিন্ট মিডিয়া (সংবাদপত্র) ইত্যাদি।

কিছু বিকৃত শব্দ

হালে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা মৌখিকভাবে যে ভাষা ব্যবহার করছে তা না আঞ্চলিক, না প্রমিত। শুদ্ধ-অশুদ্ধের মিশেলে সে এক অন্য ভাষা। যেমন—প্রমিত বাংলায় ‘এসেছ’, শিক্ষার্থীরা বলছে ‘আসছ’। এভাবে ‘করেছিস’-কে ‘করছিস’, ‘তাহলে’-কে ‘তাইলে’, ‘পাঁচটা’-কে ‘পাসটা’, ‘খরচ’-কে ‘খরছ’, ‘ধরে’-কে ‘ধইরা’, ‘কেন’-কে ‘ক্যা/ক্যান/কিয়াল্লাই’, ‘কাকে’-কে ‘কারে’, ‘কোথায়’-কে ‘কই’, ‘ওটা’-কে ‘ওইটা’, ‘ওগুলো’-কে ‘ওইগুলা’ বলছে শিক্ষার্থীরা।

তরুণ প্রজন্ম বিকৃত করে শব্দ উচ্চারণ করছে বেশি। শুধু আধুনিকতার দোহাই দিয়ে তারা এটা করছে। এতে গণমাধ্যমের প্রভাব বেশি। টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, নাটক ও চলচ্চিত্রে বিশেষ করে বিকৃত ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের কথা যেমন—’খাইলেই দিশ খোশ’, ‘এক্সট্রা খাতির’, ‘আবার জিগায়’ ইত্যাদি এখন তরুণ-তরুণীদের মুখে মুখে। কিছু নাটকের নাম এবং সংলাপে দেখা যাচ্ছে বিদেশি শব্দের ছড়াছড়ি। যেমন—ফার্স্ট ডেট, হাইজফুল, ছাইয়্যা ছাইয়্যা, লাভ ডট কম, সিটি বাস ইত্যাদি। নাটকের সংলাপে বলা হচ্ছে, মাইরের মধ্যে ভাইটামিন আছে, ফাইস্যা গেছি মাইনকার চিপায়, ফিল্মি কথা বাদ দাও, এক্সটা খাতির নাই, ফিল্মি ডায়ালগ মারতাছ।

বেসরকারি রেডিওগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে বিকৃত বাক্য ও শব্দ ব্যবহার করে। কথাবন্ধু (রেডিও জকি) নামে একটি চরিত্র তৈরি হয়েছে, যারা এই বিকৃতি করছে। এদের বাংলা উচ্চারণ ইংরেজির মতো। উদাহরণ—’হ্যালো…ও…ও…ফ্রেন্ডস, কেমন আছ তোমরা? হোপ দিস উইকে তোমরা ম্যানি ম্যানি ফান করেছ, উইথ লটস অফ মিউজিক। অ্যনিওয়ে, এখন তোমাদের সাথে আছি কুল ফ্রেন্ড জারা অ্যান্ড আছে জোশ সব মিউজিক ট্রাক অ্যান্ড লটস আড্ডা, সো ফ্রেন্ডস ঝটপট জয়েন করে ফেলো আমাদের আড্ডায় এন্ড ফেবারিট গান শুনতে মোবাইলের ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে লিখো….।’ অন্য এক ‘কথাবন্ধু’ বলছে, ‘ডিয়ার ফ্রেন্ডস এখন প্লে করছি ২১শে ফেব্রুয়ারির স্পেশাল ট্রাক—আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি… তো শুনতে থাকো আর এনজয় করো অ্যান্ড অফ কোর্স একুশের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করো।’

অবজ্ঞা ও বিরক্তি প্রকাশে তরুণ-তরুণীরা নতুন নতুন শব্দযুগল ব্যবহার করছে। যেমন—মাঞ্জা মারা, হুদাই প্যাচাল, তেলবাজ, চালবাজ, পল্টিবাজ, কুফালাগা, গুষ্ঠি কিলাই, তারছিড়া, বেইল নাই, মাইনকাচিপা, আরে মামু, প্যাচগি মারে, সুইসাইড খামু, আল্টামডান, কইছে তরে, যাইগা বাদ দে, কঠিন চেহারা, ঠ্যাক দিছে ইত্যাদি।

Source: http://banglabarta.dk/details.php?cid=1&id=2864

%d bloggers like this: