ব্যবসা ও ব্যবসায়ী


ব্যবসা ও ব্যবসায়ী

চিররঞ্জন সরকার

ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের দেশের মানুষের বড় বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই। তারা লাখপতি, কোটিপতি হতে পারেন, দামি গাড়ি-বাড়ি, বিপুল বিত্ত-বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হতে পারেন; কিন্তু আমাদের সমাজে ব্যবসায়ীদের ইমেজ খুব একটা ইতিবাচক নয়।

এর অবশ্য কারণও আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হতে দেখি। সত্ পথে থেকে সত্ভাবে ব্যবসা করে বড় লাভের মুখ দেখা সম্ভব নয়—এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা আমরা লালন করি। যারা ব্যবসা করেন, তারা চোরাপথে মাল কিনে, শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠকিয়ে, ভেজাল বা নিম্নমানের জিনিস গছিয়ে, ওজনে কম দিয়ে, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বড়লোক হন বলে অনেকের বিশ্বাস। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বড়লোকই হচ্ছেন ব্যবসায়ী। তারা কোনো না কোনো ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দুই নম্বরি করে তারা বড়লোক হয়েছেন—এই সন্দেহের বশে আমরা তাদের খারাপ চোখে দেখি। তবে এই খারাপ চোখে দেখার ব্যাপারটা তখন আর শুধু বড়লোক ব্যবসায়ীদের প্রতি সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ের ওপর বর্তায়।

তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কথাই হচ্ছে লাভ। যে কোনো উপায়ে লাভ করাই একজন ব্যবসায়ীর প্রধান লক্ষ্য। শুধু লাভ নয়, মহালাভ খোঁজেন তারা। লাভ করতে গিয়ে কোনো ঝুটঝামেলা, ইনকাম ট্যাক্স, সেল্স ট্যাক্স, কাস্টমস, পুলিশ, মামলা, অসন্তোষ, হরতাল, ধর্মঘটে জড়িয়ে না পড়েন—ব্যবসায়ীদের মনে এই আকাঙ্ক্ষাও প্রবলভাবে কাজ করে। তবে ব্যবসা করা সহজ কাজ নয়। অনেক ঝানু ব্যক্তি ব্যবসা করতে গিয়ে ফতুর হয়েছেন, আবার অনেক হাঁদারামও ব্যবসায় সফল হয়ে কোটিপতি বনেছেন। উভয় প্রকার উদাহরণই আমাদের সমাজে ভূরিভূরি আছে। প্রখর বুদ্ধি, কঠোর পরিশ্রম, অমিত আত্মবিশ্বাস, সেইসঙ্গে ভাগ্যদেবীর সুনজর—এসব না হলে ব্যবসায় সফল হওয়া যায় না।

হ্যাঁ, সেইসঙ্গে সততাও প্রয়োজন। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম দোকানে কাচের ফ্রেমে বাঁধানো রয়েছে—সততাই আমাদের একমাত্র মূলধন। আজকাল অবশ্য এরকম কোনো ঘোষণাপত্র কোনো দোকানে বা শোরুমের দেয়ালে দেখা যায় না। পুরো সমাজ থেকেই যেখানে সততা বিদায় হয়েছে, সেখানে দোকানে তা আর টিকে থাকবে কীভাবে? ব্যবসায় সততা বলতে যে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই তেমন নয়; সততা এখনও আছে। তবে তা ভিন্ন সংজ্ঞায়, আলাদা মানে নিয়ে। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা যাক।

এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী তার শিশু নাতিকে নিয়ে নিজের দোকানে এসেছেন। তিনি নাতিকে নিয়ে ক্যাশবাক্সের পেছনে গদিতে বসেছেন, পাশের দেয়ালেই ‘সততাই আমাদের মূলধন’ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। নাতি পড়তে শিখেছে। সে ওটা দেখে পিতামহকে প্রশ্ন করল: দাদু সততা কী? দাদু বললেন, সততা একটা খুব খাঁটি জিনিস। চট করে বোঝানো কঠিন। মনে কর আমি আর তুমি এ ব্যবসার অংশীদার। এখন একজন গ্রাহক এসে একটা জিনিস কিনে ১০ টাকা দিতে গিয়ে ভুল করে ২০ টাকার নোট তোমাকে দিয়ে চলে গেল। তুমিই ক্যাশবাক্সে বসেছ, তোমার অংশীদার আমি দোকানের অন্যদিকে রয়েছি। আমি দেখতে পাইনি যে, গ্রাহক ভুল করে ১০ টাকা বেশি দিয়েছে। এখন তুমি যদি ওই ১০ টাকা থেকে আমাকে ৫ টাকা দাও তাহলে সেটাই হলো তোমার সততা।

নাতি বললো, কিন্তু দাদু গ্রাহক. . .

দাদু বললেন, গ্রাহকের কথা ভেব না, ওটা বাদ দাও। এ ঘটনার অনেক দিন পরের কথা। বৃদ্ধ ভদ্রলোক এখন আর নিজে দোকানে যান না। তার ছেলে যায়। কিন্তু ছেলে তার মতো তুখোড় নয়। ব্যবসাপত্র বেশ মন্দ যাচ্ছে।

বৃদ্ধ সারাদিন বাসায় বসে থাকেন। সাত-পাঁচ চিন্তা করেন আর নাতির পড়াশুনা দেখেন। নাতির কৌতূহল এখনো নানা বিষয়ে অপরিবর্তিত রয়েছে। একদিন কী একটা পড়তে পড়তে দাদুকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা দাদু রসাতল কী?

দাদু শুকনো গলায় একটু খুকখুক করে কেশে জবাব দিলেন, রসাতল হলো সেই জায়গা যেখানে তোমার বাবা আমার ব্যবসাকে পাঠাচ্ছে।

ব্যবসা বড় বিচিত্র জিনিস। কিসে কত লাভ এক দোকানদার ছাড়া কেউ জানে না। যখন দোকানদার বলছে, স্যার আপনাকে আমি কেনা দামে জিনিস দিচ্ছি, তখন সে ডাহা মিথ্যা কথা বলছে। আর একটা কথা মনে রাখা উচিত, ব্যবসায়ে মিথ্যা বলা ব্যবসায়ীর কাছে মোটেও পাপ নয়, বরং সেটাই তার ধর্ম। ব্যবসার আসল কথা হলো লাভ, তা সে যেভাবেই হোক। লাভের জন্য ব্যবসায়ীরা যা বলেন, যা করেন সবই তার জন্য ‘সততা’ বা ‘ন্যায়’।

লাভ প্রসঙ্গে আর একটি গল্প বলা যাক। একটি ঘড়ির দোকানের বাইরে বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল:’এখানে লোভনীয় দামে ঘড়ি বিক্রি হয়।’ এক পথচারী সেই দোকানে ঢুকে ঘড়ির দাম কীরকম জানতে চাইল। দোকানদার বললেন, আমরা আমাদের ঘড়ি কোম্পানির কেনা দামের চাইতেও শতকরা পঁচিশ টাকা কমে বিক্রি করি। পথচারী এ কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বলল, তাহলে ঘড়ি বেঁচে তো আপনাদের ক্ষতি হয়। দোকানদার গম্ভীর হয়ে বললেন, তা হয়। পথচারী আবার প্রশ্ন করলেন, তাহলে আপনাদের দোকান চলছে কী করে?

অধিকতর গম্ভীর হয়ে দোকানদার বললেন, ক্ষতিটা ঘড়ি সারিয়ে পুশিয়ে নিই।

আমাদের দেশে গত প্রায় দুই যুগ ধরে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বেশ ভালোই লাভ করছে। লবণ, সয়াবিন তেল, তৈরি পোশাক, ঝুট কাপড়, ইয়াবা থেকে শুরু করে শেয়ার ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত নানা কারসাজিতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণের সরকারি প্রচেষ্টা কোনো কাজে দেয়নি। তবে চোরের ওপর বাটপাড়ি শুরু করেছে সরকারের আরেক আশীর্বাদ চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীচক্র। ব্যবসায়ীদের লাভের গুড়ে এই চক্র ভাগ বসাচ্ছে। বনিবনা না হলে দু’একজন মাঝারি গোছের ব্যবসায়ী খুনও হচ্ছেন। সরকার কার পক্ষ নেবে? এই দু’পক্ষই যে তাদের একান্ত আপনজন!

আগে মোটা অংকের চাঁদার বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করত। তাদের স্বার্থের পক্ষে নীতি ও আইন প্রণয়নের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হত। বর্তমানে ব্যবসায়ীরাই রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিদরাই ব্যবসায়ী। এখন আর তোয়াজ-তোষামোদের বালাই নেই। এখন তারাই সর্বেসর্বা। তারা নিজেদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন যেমন করছেন, নিজেদের প্রয়োজনে সেই আইনকে বুড়ো আঙ্গুলও দেখাচ্ছেন। দেখারও কেউ নেই আর বলারও কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রীসহ দু’চারজন ছাড়া বাকি সবাই প্রায় নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কাজেই তারাই এখন নীতি-নির্ধারক। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আমাদের মতো আমপাবলিকের হারিকেন হাতে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না।
https://i0.wp.com/i.usatoday.net/news/_photos/2012/03/13/31-dead-in-Bangladesh-ferry-crash-3L14SBFF-x-large.jpg
পুনশ্চ: আমাদের দেশে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় (বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধসের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। এসব ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হচ্ছে। এ নিয়ে মিডিয়ায় ঝড় উঠছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মালিক বা ব্যবসায়ীদের তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। সেই একই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা, অমানবিকতা, জুলুমবাজি চলছে তো চলছেই। শ্রমিকদের সমূহ ক্ষতি হলেও মালিক-কর্তৃপক্ষের কোনো ক্ষতি বা সমস্যা হচ্ছে না। হবেইবা কেন? তাদের জন্য যে ভর্তুকি নিয়ে ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি পুরানো গল্প।

ব্যাংককের পাতায়া সমুদ্র সৈকতে একটি চারতারা হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দুই সদ্য পরিচিত ব্যবসায়ী ঠাণ্ডা বিয়ার খাচ্ছেন। তাদের দু’জনের আজকেই আলাপ হয়েছে। দু’জনে পাতায়া বেড়াতে এসে একই হোটেলে উঠেছেন। এই দু’ ব্যবসায়ীর বাক্যালাপের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যাক—

প্রথম ব্যবসায়ী : আপনি কী করেন?

দ্বিতীয় ব্যবসায়ী: এখন কিছু করি না। আমার একটা কারখানা ছিল, সেটা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনা বীমার ভর্তুকি পেয়ে এখানে বেড়াতে এসেছি। ভবিষ্যতে কী করা যায় সেটাও ভেবে দেখছি আর কি। (এরপর একটু থেমে) আচ্ছা আপনি কী করেন?

প্রথম ব্যবসায়ী: ঐ আপনার মতোই আমারও একটা কারখানা ছিল।

দ্বিতীয় ব্যবসায়ী: সেটা আগুনে পুড়ে গেল?

প্রথম ব্যবসায়ী: না, তা নয়। আমার কারখানাটা বন্যায় ভেসে গেছে। দুর্ঘটনা বীমার ভর্তুকি পেয়ে এখানে বেড়াতে এলাম।

দ্বিতীয় ব্যবসায়ী: (গলা নামিয়ে, চুপিচুপি স্বরে) আচ্ছা ভাই, আগুন লাগার ব্যাপারটি তো বুঝি; কিন্তু বন্যা লাগান কী করে একটু বুঝিয়ে বলবেন?

লেখক:কলামিস্ট

৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই


পোশাক শিল্পে আয় বেড়েছে ২ হাজার কোটি ডলার

বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা

রহিম শেখ ॥ ১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি আয় ছিল ১৫০ কোটি ডলার। দুই দশক পর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এই সময়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিধি বাড়লেও বাড়েনি শ্রমিকদের নিরাপত্তার পরিধি। শনিবার আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশে ফের আলোচনায় এসেছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি। পাশাপাশি উঠে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস কারাখানার বিষয়টিও। তৈরি পোশাক গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি আদায়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সংগঠনগুলো বলছে, সাড়ে পাঁচ হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কারখানাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করা কারখানাগুলো। এদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

জানা যায়, পোশাক খাতে কমপ্লায়েন্স বলতে বোঝায় মূলত তিনটি বিষয় : প্রথমত, শ্রম আইন, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বশেষ মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক। দেশে তৈরি পোশাক খাতে সাড়ে ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান সচল। বিজিএমইএ দাবি করে, এর মধ্যে ১ হাজার প্রতিষ্ঠানের রয়েছে শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন কারখানা। অন্যদিকে বাংলাদেশ সোস্যাল কমপ্লায়েন্স ইনিশিয়েটিভের (বিএসসিআই) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাত্র ৩০০-৫০০ কারখানা কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন। অধিকাংশ কারখানাই অদক্ষ শ্রমিকসহ নানা অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে দেশে সাব কন্ট্রাক্ট বা ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারখানাগুলোর সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এসব কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই নেই। শ্রম আইনের বিষয়ে এসব কারখানাগুলোর নেই কোন জানাশোনা। এছাড়া মালিক ও শ্রমিক সম্পর্কও খুব একটা ভাল নয়। এসব কারখানায় যেখানে নিরাপত্তাজনিত যন্ত্রাংশ রাখার কথা সেখানে ঠাঁই হয় কারখানার জেনারেটর কিংবা মেশিনারিজ যন্ত্রাংশ।

ক্রেতাদের বিভিন্ন সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এর সঙ্গে আছে শ্রমিকপ্রতি অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন ও অনুপস্থিতি। এসব ক্ষেত্রে ক্রেতারা অবস্থার উন্নয়ন চান। তাঁরা এখন আরও বেশি রফতানি আদেশ দিতে চান। তবে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিশ্চয়তা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, একটি কারখানার কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন রাতারাতি হয় না। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়ে। ক্রেতাদের উচিত এ ধরনের চাপ না দিয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা আছে এমন উল্লেখযোগ্য কারখানা হলো ব্যাবিলন গ্রুপ, ফকির এ্যাপারেলস, স্টারলিং ক্রিয়েশন, ডেকো, এনভয়, হা-মীম। তবে কমপ্লায়েন্স শব্দের আড়ালে গার্মেন্টস মালিকরা মুনাফা করছেন বলে জানান টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সব মিলিয়ে দেশে সাড়ে ৫ হাজার গার্মেন্টস রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার গার্মেন্টস কারখানাতে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেন, মালিকরা এই কমপ্লায়েন্স শব্দটি ব্যবহার করে কোটি কোটি আয় করছেন। কারখানার যে ভবনে নিরাপত্তার যন্ত্রাংশ রাখতে হয় সেখানে রাখা হয় জেনারেটর, মেশিন ইতাদি যন্ত্রাংশ। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মুনাফা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। তারা শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবেন না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও শিল্প রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, দেশের অর্ধেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নিরপাত্তা ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তাজরীন ফ্যাশনসের শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর ‘বিব্রত’ হয়ে সব ধরনের রফতানিচুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। মঙ্গলবার ওয়ালমার্ট এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোন অনুমোদন ছাড়াই তাজরীন ফ্যাশনসকে পোশাক তৈরির কাজ দেয় (সাব-কনট্রাক্ট), যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ কারণেই তারা সব রফতানিচুক্তি বাতিল করেছে। এদিকে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হয়েছে আশুলিয়ার ইউনিটি ফ্যাশনের। জাপানের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিসেন এ কারখানা পরিদর্শন করে কাজের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি তুলে শর্ত দেয়। ক্রেতার এ শর্ত পূরণে নতুন করে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় প্রতিষ্ঠানটি রফতানি আদেশ পায়নি।

এ ব্যাপারে ফকির এ্যাপারেলসের মহাব্যবস্থাপক দেবাশীষ কুমার সাহা বলেন, কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ বহু পুরনো। একসময় ক্রেতাদের চাহিদা ছিল, কারখানার সাইনবোর্ড থাকতে হবে। আর এ খাতের আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের এসব চাহিদাও বেড়েছে। এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সঙ্গে গত সোমবার এক বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু জানিয়েছেন, যে সব পোশাক কারখানায় অন্তত দুটো ফায়ার এক্সিট অর্থাৎ আগুন থেকে পালানোর পথ থাকবে না, সে সব কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

সূত্রঃ