বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে : টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা


সিডনির মেলব্যাগ

টিজিং, সমাজ বিনির্মাণ ও প্রবাসী অভিজ্ঞতা
অ জ য় দা স গু প্ত

eve-teasing

eve-teasing

বাংলাদেশের ইভটিজিং ও তার পরিণতি নিয়ে প্রবাসেও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এখানকার বাঙালী তথা বাংলাদেশীদের মধ্যে এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার বিস্তারও লক্ষণীয়। এ বিষয়ে এখানকার তারুণ্য অর্থাৎ ভিন দেশে বড় হওয়া প্রজন্মের মতামত জানাটা মন্দ কিছু নয় বরং জরুরী বটে। এ দেশের মতো পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও খোলামেলা দেশে বেড়ে ওঠা তরুণ-তরুণীদের সম্পর্ক অবারিত। টিজিংয়ের মতো প্রাগৈতিহাসিক বিষয়ের চর্চা চলে না এখানে। তাই বলে এটা ভাবা ঠিক নয়, টিজিং নেই এদেশে। আছে, তবে তা কখনই বিশাল বা মহামারী আকার ধারণ করতে পারে না।

কেন পারে না? সমাজ শৃঙ্খলার প্রশ্নে উদার ও অবারিত জীবন ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনও আছে তার যোগ্য ভূমিকায়। গেল হপ্তান্তে আমরা গিয়েছিলাম বিশ্বখ্যাত বন্ডাই বিচে। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের টু্যরিস্টে ঠাসা সৈকত। সমুদ্র সৈকত হলেও আয়তনে এক ফালি। কক্সবাজারের তুলনায় শিশু। ওই এক খণ্ড সৈকতে হামলে পড়া সৈকতচারীদের দেখেই বোঝা যায় মানুষ এখানে আসতে কতটা উদগ্রীব। আধুনিক দেশের বিচ কালচার যা, তাই আছে, তারই রেওয়াজ চলছে পূর্ণ মাত্রায়। নগ্ন বক্ষিকা থেকে স্বল্পবাস। কিন্তু কোথাও মানা পেরুনোর অভিপ্রায় বা লক্ষণ দেখা যায় না। আমাদের সাথে ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত এক আত্মীয়। আবুধাবিতে জীবনের সিংহভাগ কাটিয়ে দেয়া মানুষটি মূলত রৰণশীল সমাজের প্রত্যক্ষদর্শী। অথচ সে তিনিই নীরবতা ভেঙ্গে মতামত রাখলেন। মুরুব্বি ও অভিভাবক ভদ্রলোকটিকে নিয়ে আমরা কিঞ্চিৎ বিব্রতবোধ করছিলাম। হাজার হোক বাঙালী রক্ত, বাংলা সংস্কৃতির শেকড়ে বসবাস আমাদের। চোখের সহ্য ক্ষমতা পরিমিত, দর্শনের অভিজ্ঞতাও সীমিত। কিন্তু আধুনিক মনস্ক অভিভাবকটি তাঁর যৌক্তিক ব্যাখ্যায় বুঝিয়ে দিলেন সময়ানুগামী হতে বয়স কোন বাধা হতে পারে না। তাঁর মতে, উদারতার চর্চা আর খোলা হাওয়া বইতে দিলে অন্ধকার বাসা বাঁধতে পারে না। ভয় পায় আঁধারের জীব, ঠিক তাই, সে কারণেই চোখ সওয়া এ সমাজে আক্রমণ ও আগ্রাসনের হার কম। বিচ কালচারে অভ্যসত্ম হতে আগত ষোড়শী থেকে বালিয়াড়িতে চোখ বুজে রোদ শুষে নেয়া বৃদ্ধটি নিরাপদ, নিরাপদ টিনএজ শিশু-কিশোর বা কিশোরী। অবস্থা এমন কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।

আমি জানি, এতটা উদারনৈতিক সমাজ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আমাদের কৃষ্টি সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যের সাথেও তা যায় না। কিন্তু হাজার বছরের পুরনো ধ্যান-ধারণাও এখন অচল। সে যুগ যেমন বিগত তেমনি তার প্রভাবও এখন বিলীয়মান। মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি ও সভ্যতা এখন গলাগলি সম্পর্ক। তারা চলছে পরস্পরের হাত ধরে। ঘরে ঘরে উঁকি দেয়া, জানালা-দরজা খুলে ঢুকে পড়া বিশ্বায়নে পৃথিবী এসেছে হাতের মুঠোয়। এরও দুটো দিক। একদিকে বিজ্ঞান ও আধুনিকতা অন্য প্রান্তে অন্ধকার আশ্রিত বাণিজ্য। দেশের তারুণ্য দুটোকেই গ্রহণ করছে। শেষেরটার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণও তাই স্বভাবধর্ম। এ স্বভাবকে বাগে আনতে হলে, পোষ্য করে রাখতে হলে তাকে আধুনিক জীবনের প্রতি যত্নবান ও উৎসাহী করে তোলার বিকল্প দেখি না। পঞ্চাশ ষাট দশকের পুরনো সমাজও রৰণশীলতার আবরণে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট যাপিত জীবন যেমনি অসম্ভব, তেমনি অবাস্তব।

এ জায়গাটিতে প্রবাসী প্রজন্মের উদাহরণ অবশ্যই সাহায্য যোগাতে পারে। এদের প্রথম দর্শনে উদভ্রান্ত, বিভ্রান্ত, শৃঙ্খলাহীন, অতি খোলামেলা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এদের সংস্পর্শ, সংযোগ ও কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলে এ ধারণা বদলে যেতে বাধ্য। সিংহভাগই ছুৎ বাই ছেলেমেয়ের প্রভেদ রেখাসহ কুসংস্কার মুক্ত মুক্তমনের তরম্নণ-তরম্নণী। এদের বন্ধুত্ব নির্মল, সখ্য পাপহীন, পাপহীন বলেই তারম্নণ্য ভেদ জানে না। এক সাথে ঘুরে বেড়ায়, এক পাতে আহার করে, এক টিকেটে উড়ে বেড়ায়। দেশে যা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। সবকিছু হচ্ছে, হবেও। তবু একটা দেয়ালের মধ্যেই বসবাস করে চলেছে তারা। সে দেয়ালটির অনেক নাম, কখনও সে সমাজ, কখনও সে রাজনীতি, কখনও ইভটিজিং, কখনও বা আত্মহনন।

সমাজ বিনির্মাণ বা ভেঙে গড়ার কাজটি যাদের হাতে সেই সব খ্যাতিমান ও তালেবর ব্যক্তিরা বিদেশে আসেন, দেখে যান, কিন্তু তা কাজে লাগাতে চান না অথবা অনিচ্ছুক। সে প্রয়োজনও নেই তাঁদের। এঁদের সন্তান-সন্তুতি মূলত প্রবাসী। উদার দেশের উষ্ণতা নিয়ে বড় হওয়া ভিনদেশী বাঙালী, সমস্যার জায়গা অর্থাৎ মাতৃভূমিতে বড় হওয়া তারুণ্য উচ্ছন্নে গেলেও কি ভাল পথে থাকলেই বা কি! কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, চলেও না। জাতিগত পরিচয়, জন্ম, পিতা-মাতা বা অন্য যে কোন সূত্রে অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ দেশ ও প্রবাসী প্রজন্মের মতবিনিময়, ভাব বিনিময় ও ঐক্য আজ জরুরী। এরা এক সাথে মিললে ইভটিজিংয়ের মতো দৈত্য পরাভূত হতে বাধ্য। সহজ হয়ে উঠবে অনেক সমস্যার সমাধান, মেলানোর দায়িত্বটা কি কেউ নেবেন?