দ্য আদার আমেরিকা: ‘দারিদ্রের সংস্কৃতি’


মার্কিন দারিদ্রে্র পুনরাবিষ্কার

বারবারা এরেনরিচ

আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে গরিবরা না হলেও অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সচ্ছল মানুষ জানতে পেরেছিল যে, তাদের মধ্যেও দরিদ্র মানুষ রয়েছে। এই আবিষ্কারের জন্য মাইকেল হ্যারিংটনকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কারণ তার লেখা দ্য আদার আমেরিকা বা অন্য আমেরিকা বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরই শ্রেণীহীন সামাজিক অবস্থা ও সম্পদের সুখসাগরে ভাসতে থাকা একটি জাতি আকস্মিক একটি ধাক্কা খায়। হ্যারিংটনের দেওয়া তথ্য মতে, সে সময় এক-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিকই দারিদ্রে্যর মধ্যে বসবাস করছিল।

এদের বেশির ভাগই নগরকেন্দ্রের কৃষ্ণাঙ্গ, পাশ্চৎপদ শ্বেতাঙ্গ, খামার শ্রমিক এবং বয়স্ক মার্কিনি।

বইটিতে লেখক দারিদ্র সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন তাতে মনে হয়েছে আরাম আয়েসে থাকা মানুষের জন্যই আরো বেশি আয়েস যোগানো দরকার। বলা হয়েছে দরিদ্ররা অন্যান্য মার্কিনির চেয়ে একেবারেই আলাদা। আর এই আলাদা হওয়ার কারণ যে কেবল তারা বঞ্চিত, পশ্চাৎপদ, নিম্নমানের ঘরবাড়িতে বসবাস করে কিংবা নিম্নমানের আহার গ্রহণ করে থাকে তা নয়। তাদের আবেগ-অনুভূতি, ভাবনা-চিন্তাও আলাদা ধরনের। তাদের জীবনযাত্রার মধ্যে স্থূলতা আছে এবং রয়েছে একটা বেপরোয়াভাবও।

হ্যারিংটনের ভাষায়, ‘দরিদ্রদের নিজস্ব একটি ভাষা আছে, মনস্তত্ত্ব আছে এবং ভিন্ন ধরনের একটি বিশ্ববীক্ষাও পোষণ করে তারা। দরিদ্র হওয়ার অর্থই হলো সমাজের মূল স্রোত থেকে ছিটকেপড়া এমন একটি সংস্কৃতির মধ্য বেড়ে ওঠা যা সমাজের মূল ধারা থেকে একেবারেই আলাদা।’ তবে ১৯৬৩ সালে আমি যখন প্রথম তার বইটি পড়ি আমি কিন্তু সেখানে আমার পূর্বপুরুষ এবং আমার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই আলাদা মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। একথা ঠিক যে, মধ্যবিত্তের মানদন্ডে বিচার করলে তারা হয়তো কিছুটা বিশৃঙ্খল জীবন যাপন করেছে, পানে আসক্ত থেকেছে, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়েছে কিংবা বিবাহ-বহির্ভূত সন্তান জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তারাও যে পরিশ্রমী ছিল, তাদের মনেও যে উচ্চাশা উঁকি দিতো তা কিন্তু হ্যারিংটন উল্লেখ করেননি। এসব ভালো গুণ তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছলদের জন্যেই তুলে রেখেছেন। তার মধ্যে দরিদ্রদের যা আলাদা করে চিহ্নিত  করে তা হলো ‘দারিদ্র্য সংস্কৃতি’। এই ধারণাটি তিনি নৃতত্ত্ববিদ অসকার লুইসের মেক্সিকোর বস্তিবাসীদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপ থেকে ধার নিয়েছিলেন। এই ধারণাটির সংযোজন বইটির একটি তাত্ত্বিক মূল্য তৈরি করেছে। তবে এখানে ‘আমরা’ শব্দটি দিয়ে মার্কিন সমাজের সেই সব সচ্ছল বিত্তবানদের কথাই বলা হয়েছে, যারা সবসময় গরিব জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য লাঘবের চেষ্টা চালিয়ে থাকে।

কিন্তু একটি বিষয় বোঝা উচিত যে, এই দারিদ্রে্যর মধ্যে এমন কিছু সমস্যা রয়েছে যেগুলো কেবল সরাসরি সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব নয়। একবার ভাবুন সেই ব্যক্তিটির কথা যিনি একজন ভিক্ষুককে দেখে দয়াপরবশ হয়ে পড়েন কিন্তু তার হাতে একটি কানাকড়িও ছুড়ে দেন না। কারণ তার ধারণা টাকা-পয়সা হাতে গেলেই সে তা মদের পেছনে খরচ করে ফেলবে। হ্যারিংটন অবশ্য তার গ্রন্থের কোথাও একথা বলেননি যে, গরিব মানুষ তাদের স্বভাব বৈশিষ্ট্যের কারণেই দরিদ্র। তবে ধারণাটি নিয়ে বিতর্ক তৈরির দরজাটি তিনি খুলে দিয়েছিলেন। এরই সূত্র ধরে হ্যারিংটনের একসময়কার আড্ডার সঙ্গী ড্যানিয়েল প্যাট্রিক মইনিহানের একটি প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে রোনাল্ড রিগান প্রশাসনের উপদেষ্টা এডওয়ার্ড-সি ব্যানিফিল্ড মন্তব্য করেছেন, ‘নিম্নশ্রেণীর একজন মানুষ মুহূর্তের হিসেবে বেঁচে থাকে। শরীরিক প্রবণতাই তার আচরণের  নিয়ামক। এ কারণেই সে এতটা নিঃস্ব। যেটা তার ভোগে আসে না সেটাকেই সে অর্থহীন মনে করে। সে ভঙ্গুর প্রকৃতির এবং তার আত্মশক্তি নিঃশেষিত। রিগান আমলেই ‘দারিদ্রের সংস্কৃতি’ রক্ষণশীল আদর্শের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। এই আদর্শ মনে করে যে, কম মজুরি কিংবা কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতার কারণে দারিদ্রে্যর সৃষ্টি হয় না। বরং দারিদ্রে্যর কারণ হচ্ছে জীবনের প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গী ও ত্রুটিপূর্ণ জীবনাচরণ। গরিবরা নৈতিকদিক থেকে স্খলিত এবং উচ্ছৃঙ্খল, নেশা ও অপরাধের প্রতি আসক্ত। তারা কৃতজ্ঞতাবোধ বিবর্জিত। টাকা-পয়সা দিয়ে তাদের মোটেই বিশ্বাস করা যায় না।

তাদের বৈষয়িকভাবে সাহায্য করা মানেই হচ্ছে তাদের নৈতিক স্খলনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া।

এ কারণেই ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় দলেরই মনে হয়েছে, দারিদ্র্যময়, বরং দারিদ্রে্যর সংস্কৃতিই দূর করতে হবে। ১৯৯৬ সালে ক্লিনটন প্রশাসন এ লক্ষ্যে একটি আইনও প্রণয়ন করেছিল যার মাধ্যমে গরিবদের জন্য আবাসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়। একদশক সময় পেরিয়ে আজকের দিনেও এবং মার্কিন অর্থনীতির নিম্নগতির কারণে মধ্যবিত্তরা ক্রমশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও ‘দারিদ্র্য সংস্কৃতি’র ধারণা ও কার্যক্রম অভিন্নই থেকে গেছে। দরিদ্র মানুষকে এখনো সংশোধনের মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয় থেকে সুবিধা পেতে হলে তাকে স্বভাব বৈশিষ্ট্য ও মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। কারণ দারিদ্র্য সংস্কৃতি তত্ত্ব বলছে, গরীবরা স্বভাবতই অপরাধ প্রবণ। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে কোনো ধরনের সুবিধা পেতে এমনকি তাদের আঙ্গুলের ছাপ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়। তাদের কোনো অপরাধে জড়িত থাকার নজির আছে কিনা কম্পিউটার থেকে তাও খুঁজে বের করা হয়। বেকারত্ব এখনো দারিদ্রে্যর একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত। গত বছরও যুক্তরাষ্ট্রের ১২টি অঙ্গ রাজ্যে বেকারদের চাকরি দেওয়ার আগে মূত্রপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মিট রমনি এবং নেট গিনরিচও বলেছেন, একজন বেকারকে চাকরি পেতে হলে কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলায় থেকে কোনো সুবিধা পেতে হলে তাকে অবশ্যই মাদক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

মাইকেল ক্যারিংটন যেই ‘দরিদ্র সংস্কৃতি’কে জনপ্রিয় করার জন্য এত চেষ্টা করেছিলেন সেই ‘দারিদ্র্য-সংস্কৃতি’কে এখন যেভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে তা দেখে তিনি কী বলতেন? ১৯৮০-এর দশকে তার সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি কোনোদিনই ‘দারিদ্রে্যর সংস্কৃতি’ নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

আজ পঞ্চাশ বছর পর নতুন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য আবিষ্কার করতে হলে শহরতলীর দরিদ্র মানুষ, চাকরিচ্যুত শ্রমিক এবং দেশটির বিশাল আকারের খেটে খাওয়া গরিব মানুষের অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদেরও বুঝতে হবে যে, সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি কিংবা চারিত্রিক ত্রুটিই দারিদ্রে্যর জন্মদাতা নয়। দারিদ্র্য হচ্ছে অর্থের অভাব।
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

http://budhbar.com/?p=8200
Cheap International Calls

Remembering the Other America


March marks the 50th anniversary of one of the most important books ever published about poverty in the United States. Michael Harrington, born and raised in St. Louis, wrote of a population invisible to most Americans.

“These, then, are the strangest poor in the history of mankind,” Harrington wrote in The Other America. “They exist within the most powerful and rich society the world has ever known. Their misery has continued while the majority of the nation talked of itself as being ‘affluent’ and worried about the neuroses in the suburbs. In this way tens of millions of human beings became invisible. They dropped out of sight and out of mind; they were without their own political voice.”

Harrington wrote that researchers had concluded that there were 50 million poor living in the United States in the early 1960s, but admitted that he too had trouble believing the figures because they went against the popular perception of the United States as a prosperous society.

Though Harrington sprinkled in policy prescriptions throughout The Other America—mostly calls for a more active federal government—his main goal was to make American poverty visible to a people so removed from its effects that they often thought it had disappeared.

In many respects, he succeeded. The Other America not only became an immediate bestseller, it also had an impact at the highest levels of the government. Both John F. Kennedy and Lyndon Johnson were early readers of the book, and Harrington has often been credited with influencing Johnson’s “War on Poverty.”

Harrington believed that poverty must be at the top of the political agenda and challenged those who argued that American poverty wasn’t comparable to the poverty faced by those in other countries. “What shall we tell the American poor, once we have seen them? Shall we say to them that they are better off than the Indian poor, the Italian poor, the Russian poor? That is one answer, but it is heartless,” Harrington wrote. “I want to tell every well-fed and optimistic American that it is intolerable that so many millions should be maimed in body and in spirit when it is not necessary that they should be. My standard of comparison is not how much worse things used to be. It is how much better they could be if only we were stirred.”

Harrington continued to write books following the publication of The Other America, but none of his subsequent books caught the public’s attention in the same way.  Many of his other books, articles, and lectures dealt with socialism, a political philosophy that he believed offered a corrective to American capitalism, which he thought put too much power in the hands of unelected business leaders.

The Other America remains the St. Louis native’s defining work, and continues to be a touchstone for many who believe the issues of inequality remain invisible. Since its original publication in 1962, more than 1 million copies have been sold.

Not long before he died in 1989, friends and colleagues, including Cesar Chavez and Edward Kennedy, honored Harrington for his commitment to America’s poor at a ceremony in New York.

“I see Michael Harrington as delivering the Sermon on the Mount to American,” then Senator Kennedy said to the assembled. “Among veterans in the War on Poverty, no one has been a more loyal ally when the night was darkest.”

—Jody Sowell, Public Historian

 ***

Other books about poverty with St. Louis connections

The Other American: The Life of Michael Harrington (Maurice Isserman)

This excellent biography of Harrington examines his evolution as a social justice activist and includes details of his personal life, including his early days in St. Louis.

One Nation, Underprivileged: Why American Poverty Affects Us All (Mark Rank)

Mark Rank, a professor of social welfare at Washington University, is one of the country’s preeminent scholars of poverty and inequality. This book is an accessible entry into many of the statistics about American poverty and its wide-reaching effects.

Savage Inequalities: Children in America’s Schools (Jonathan Kozol)

Few have written as urgently about American poverty’s impact on children as has Jonathan Kozol. Kozol visited more than 30 schools, including schools in East St. Louis, for this 1992 examination of inequalities seen in classrooms. Though it is now 20 years old, many of the same issues remain—as Kozol’s later work has proved.

Mapping Decline: St. Louis and the Fate of the American City (Colin Gordon)

This book examines the ways that poverty and urban decline have affected one city—St. Louis. It is a deep examination of the country’s urban crisis through the lens of one city, and is worth a read for the graphics alone.


 

অপরাধ ব্যবসা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতি


জাতিসংঘের ভাষ্য : প্রধান ২০ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ১টি অপরাধমূলক ব্যবসা

বিশ্বের প্রধান ২০টি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি হচ্ছে অপরাধ-সম্পর্কিত ব্যবসা। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিচার কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) ২০০৯ সালের বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
এ তথ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য হুমকি বলে মনে করেন ইউএনওডিসির নির্বাহী পরিচালক ইউরি ফেদোটোভ। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অপরাধ ব্যবসা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ অর্থনীতির কাতারে চলে এসেছে। এখন তা প্রধান ২০টি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি।
অপরাধ দমন ও বিচার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিসিপিসিজে) সপ্তাহব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে বক্তব্য রাখার সময় ফেদোটোভ জানান, এ পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করার আগে আরও বিশ্লেষণের কথা জানান তিনি।
ফেদোটোভের মতে, দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর ৪ হাজার কোটি ডলার লোকসান হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর। আবার আদম পাচারের মতো অবৈধ ব্যবসা থেকে অপরাধীরা আয় করছে ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের মতো।
অন্য এক বক্তব্যে ফেদোটোভ বলেন, ‘এক হিসাব অনুযায়ী, গড়ে ২৪ লাখ মানুষ আদম পাচারের শিকার হচ্ছে। এ হচ্ছে আধুনিক দাসত্বের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ।’
তিনি জানান, অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলেও বিশাল অঙ্কের অর্থ আয় করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতিসংঘের এ কর্মকর্তা আরও জানান, ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল)’ অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে সংঘটিত অপরাধ, অবৈধ আদম ব্যবসা, উগ্রবাদ ও দুর্নীতি। ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বের দরিদ্রতম মানবগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন ও স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০০ সালে আন্তর্জাতিকভাবে এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল।
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আরেকটি সম্মেলনে জাতিসংঘের প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ব্রায়ান নিকোলাস জানান, আইনের ফাঁকফোকর বের করে নিজেদের টিকিয়ে রাখা ও মুনাফা লোটার নিত্যনতুন উপায় বের করতে অপরাধীদের জুড়ি নেই। তিনি বলেন, আগের দিনের পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত শ্রেণীভিত্তিক অপরাধীদের সঙ্গে এখনকার অপরাধ চক্রগুলোর কোনো মিল নেই বললেই চলে।
তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের বদলে এখনকার অপরাধচক্রগুলো শিথিল ও অপ্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত। এখনকার অপরাধীরা নিজেদের সুবিধামতো উপায়ে যোগাযোগ করে আর তাদের কার্যপরিধিও অনেক বিস্তৃত।’
নিকোলাস অবশ্য ইউএস ব্যুরো অব ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিকস অ্যান্ড ল এনফোর্সমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গেও যুক্ত।
তিনি জানান, এখনকার সন্ত্রাসী দলগুলোও অর্থায়নের জন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। নিকোলাস বলেন, এমনও দেখা গেছে, নিজেদের সুবিধার জন্য সন্ত্রাসীরা অপরাধ উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছে।
[বণিক বার্তা ডেস্ক]
একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com Visit us on FaceBook

Cheap International Calls


http://www.unodc.org/documents/data-and-analysis/Studies/Illicit_financial_flows_2011_web.pdf
April 23, 2012 11:03 AM

U.N.: Crime
is one of world’s “top 20 economies”

(CBS/AP)

(CBS/AP) VIENNA – Criminality worldwide generates proceeds in the trillions of dollars each year, making crime one of the world’s “top 20 economies,” a senior U.N. official said Monday

With the scope of global crime — and particularly organized crime — threatening emerging economies and fomenting international instability, Yury Fedotov called for concerted world action to combat the trend.

“We need to recognize that the problem requires a global solution,” Fedotov, the head of the U.N. Office on Drugs and Crime, told reporters outside an international conference focused on preventing the exploitation of illegal migrants and other crimes linked to human trafficking. “No country can handle this problem alone.”

Fedotov said that “criminal business” earns those behind it $2.1 trillion — nearly 1.6 trillion euros — a year, which he said is equivalent to nearly 7 percent of the size of the global economy.

Complete speech by Yury Fedotov, Executive Director, UNODC

In a recent UNODC report, global gross proceeds were calculated from such illicit activities as money-laundering (US$1.6 trillion in 2009) and cocaine trafficking (US$84 billion for 2009).

Other criminal enterprises which added to UNODC’s $2.1 trillion estimate were counterfeiting; human trafficking; and trafficking in oil, wildlife, timber, fish, art and cultural property, gold, human organs, and small and light weapons). (Criminal proceeds within a national sector, such as burglaries, fraud, loan sharking or protection racketeering, were not included.)

Transnational crime threatens Millennium Development Goals (UNODC)

In separate comments inside the meeting, Fedotov said that as many as 2.4 million people may be victims of human trafficking worldwide at any given time, calling it “a shameful crime of modern-day slavery.”

Corruption is another concern of the meeting. Fedotov told the opening session that estimates put the amount of money lost through corruption in developing countries at $40 billion annually.

U.S. delegate Brian A. Nichols said the changed face of organized crime makes prosecution more difficult than in the past.

“Today, most criminal organizations bear no resemblance to the hierarchical organized crime family groups of the past,” he told the meeting.

“Instead, they consist of loose and informal networks that often converge when it is convenient and engage in a diverse array of criminal activities, including the smuggling of counterfeit goods, firearms, drugs, humans, and even wildlife to amass their illicit profits.”
http://www.cbsnews.com/8301-202_162-57418890/u.n.-crime-is-one-of-worlds-top-20-economies/

পুলিশের অপরাধ সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ


১লাখ ৫০ হাজার অভিযোগ: মানুষের কাছে আইনরক্ষাকারীরা এখন আতঙ্ক

পুলিশের অপরাধ সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ

ঢাকা প্রতিনিধি: পুলিশকে রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। সমাজের অপরাধ দমনের জন্য। এই অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের, সেই পুলিশ দিনদিনই অপরাধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। দিনদিনই হয়ে উঠছে বেপরোয়া। ঘুষ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, নির্যাতন, ব্লাকমেইলিংয়ের পাশাপাশি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে এ ধরনের ১ লাখ ৫০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে আছে।তবে প্রকৃত অপরাধের ঘটনা আরো অনেক বেশী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া আদালতেও পুলিশের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলাও ঝুলে আছে। ্তবে পুলিশ সদস্যদের শাস্তি পেতে হয় না। বাদীপক্ষকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা উঠিয়ে নিতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ আছে। এ অবস্থায় পুলিশ-সদস্যরা ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠছে। পুলিশ এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য।

পুলিশ সদর দফতরে সূত্রে জানা যায় ২০১০ সালে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে প্রায় ১১ হাজার পুলিশের শাস্তি হয়েছে। এসব শাস্তির মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুতি, বরখাস্ত, পদাবনতি, ইনক্রিমেন্ট বাতিলসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ব্যবস্থা। মোট অভিযোগের তুলনায় শাস্তির ঘটনা খুবই নগন্য।

ট্রন্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল, বাংলাদেশের জরীপে পরপর দুবার পুলিশকে দেশের সবচেয়ে দূনীতিবাজ বাহিনী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপরেও এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ যেমন ডাকাতি, ছিনতাই, খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়েছে, তেমনি ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকারও হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় অর্থের লোভে পুলিশ এ অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে বলে বলা হচ্ছে। গত পাঁচ মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অপরাধ সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তবে এসব অপরাধের জন্য অল্পসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকেই শাস্তি পেতে হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, খোদ রাজধানীতেই পুলিশ সদস্যদের নানা অপরাধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মাসে ঢাকার দয়াগঞ্জ মোড় থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তিন যুবককে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত তিনজনেরই দুই হাত পেছনে ও পা গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। এ ছাড়া দুজনের শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। রাজধানীর উপকণ্ঠ আমিনবাজারে ছয় কলেজছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করর ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে মাদক ব্যাবসায়ী ও পুলিশের যোগসাজসে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। পরে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পুলিশ নিহত ছয় ছাত্রকে ডাকাত প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠে। পুলিশের সহায়তায় পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে গাড়ি ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতারের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরে আঘাত করা হয়। পরে ওই ঘটনায় আদালতের নির্দেশে ওসিসহ তিন পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

মিরপুর থানার ওসিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা হয়েছ। আবদুল কাদের মিয়া নামে একজন বাদী হয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলাটি করেন। মিরপুর থানার সাবেক ওসি জাকির হোসেন মোল্লা, উপ-পরিদর্শক আবদুল আজিজ ও আবু বকরের বিরুদ্ধেও ঢাকার সিএমএম আদালতে ঘুষ গ্রহণ, বাড়িঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগে মামলা হয়।। মতিঝিল থানার ওসিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মামলা হয়। থানায় অপহরণের মামলা করতে গেলে মতিঝিল থানার পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা নিলেও আসামি গ্রেফতার না করে উল্টো বাদীকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয় পুলিশ। এদিকে আরেক ঘটনায় রামপুরা থানার ওসির বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে কোতোয়ালি থানা পুলিশের বিরুদ্ধেও। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য রাখার অভিযোগও রয়েছে একই থানার পুলিশের বিরুদ্ধে। পল্টন থানার পুলিশের বিরুদ্ধে ফুটপাতে চাঁদাবাজিসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। মগবাজারের সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী বাবুল গাজীকে হত্যার অভিযোগে রমনা থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ, দুই সোর্সসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা হয়েছে। পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক ইয়াকুব ও সহকারী উপ-পরিদর্শক আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন পল্লবীর ফুটপাতের এক কাপড়-বিক্রেতা। কদমতলী থানাধীন দনিয়া বাজারে চাঁদার টাকা আনতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হন তিন পুলিশ কনস্টেবল। কেরানীগঞ্জ থানায় আটক হাজতিকে মারধর করে হত্যার অভিযোগে ওসি ও দুই উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে মামলা হয় ঢাকার সিএমএম আদালতে। ২০০৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কমার্স কলেজের ছাত্র মোমিনকে তাদের উত্তর ইব্রাহীমপুরের বাসার সামনে খুনের ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামসহ তিনজনকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত।

নিরীহ তরুণকে ডাকাত বানিয়ে গণধোলাইয়ের মাধ্যমে হত্যা করে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ। হত্যা ও হত্যাকান্ডে সহযোগিতার অপরাধে পুলিশসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করে নোয়াখালীর ২ নম্বর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা হয়েছে। পরে পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক উল্লাহকে ক্লোজড, এসআই আকরাম শেখ এবং দুই কনস্টেবল আবদুর রহিম ও হেমারঞ্জন চাকমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

গত মাসে ঢাকার দয়াগঞ্জ মোড় থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তিন যুবককে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত তিনজনেরই দুই হাত পেছনে ও পা গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। এ ছাড়া দুজনের শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। রাজধানীর উপকণ্ঠ আমিনবাজারে ছয় কলেজছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে মাদক ব্যাবসায়ী ও পুলিশের যোগসাজসে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। পরে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পুলিশ নিহত ছয় ছাত্রকে ডাকাত প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠে। পুলিশের সহায়তায় পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে গাড়ি ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতারের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরে আঘাত করেন খিলগাঁও থানার ওসি হেলাল উদ্দিন। পরে ওই ঘটনায় আদালতের নির্দেশে ওসিসহ তিন পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পুলিশ সদস্যরা ডাকাতি করতে যেয়ে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী তাদের ঘেরাও করে গণধোলাই দিয়ে আটক করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। আহত পুলিশ সদস্যদের ছাড়িয়ে আনাকে কেন্দ্র করে থানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, পুলিশের এসপি ও জেলার ডিসিকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটে।

এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজি এস এম শাহজাহান বলেন, অপরাধের দায়ে সাধারণ মানুষের চেয়ে পুলিশের শাস্তি বেশি হওয়া উচিত। কারণ পুলিশকে রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখন তাদের শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা মনে করেন, পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বন্ধ না হলে তাদের অপরাধও বন্ধ হবে না।

পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন যা ঘটেছে তা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি অবশ্য বলেন দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে আমি ভাবে মনে করি না।

পুলিশ সদর দফতরের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ জমা পড়ে, সেগুলোর তদন্ত পুলিশই করে থাকে। যে কারণে অভিযোগের তদন্ত সঠিকভাবে হয় না। পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার পর শাস্তি হয়েছে, এমন নজির কম। এসব ক্ষেত্রে কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের শাস্তি পেতে হয় বেশি।

এ কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগীরা পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে না পেরে আদালতের আশ্রয় নেয় মানুষ। আদালতে মামলা হলেও পরে তা আর বেশি দূর এগোয় না। পুলিশের চাপে ভুক্তভোগীরা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা শাস্তি না পাওয়ায় পুলিশ বেপরোয়া হতে থাকে।

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ

Visit us on FaceBook

একুশ নিউজ মিডিয়া এখন ফেস বুক এ Video News: www.EkushTube.com

নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা তাদের নেতা-কর্মীদের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করছেন : রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সেকাল-একাল


রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সেকাল-একাল
“১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি”

১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি

১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি


আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারছে না। প্রায়ই প্রভাব খাটিয়ে আইনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা আইনের শাসনের কথা বললেও বাস্তবে নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। অভিযোগ আছে জোট ও মহাজোট উভয় সরকারই প্রভাব বিস্তার করে দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলা থেকে বের করে এনেছে এবং আনছে। এতে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক মামলার নামে কীভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন

রাজনৈতিক মামলার নামে অরাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের হিড়িক পড়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের হয়ে এসব মামলা প্রত্যাহারের তদবির করা হয়েছে। দিনেদুপুরে গুলি করে মানুষ খুন, শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে ধরা পড়ার মামলাও রাজনৈতিক মামলা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ রকম অনেক চাঞ্চল্যকর মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। বেশকিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। হত্যা-ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের অনেক মামলাও প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক মামলা নাম দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নিচ্ছে ছিঁচকে চোর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের উপঢৌকন দিয়ে চিহ্নিত অনেক অপরাধী মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। তাদের মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ মিলছে না। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

দলীয় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিতে নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়াও রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে সরকার।

দলীয় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিতে নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়াও রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে সরকার।

সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় মালিবাগ হত্যাকা- মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এ মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী শওকত হোসেন হিরণ, লন্ড্রি দুলাল, কিরণ ও শাওন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।

মালিবাগ হত্যাকা-ের ঘটনা ছাড়াও সরকার গঠিত কমিটি রাজধানীর বাড্ডার শরীফ হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসমি কাউসার ওরফে গালকাটা কাউসার নিজেকে স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে এবং তা ঢাকা জেলা প্রশাসকের সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ সংক্রান্ত নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা-১-এর সহকারী সচিব মোঃ আবু সাইদ মোল্লার কাছে রয়েছে। শরীফ হত্যা মামলার বাদী মাহবুবুর রহমান এ তথ্য উল্লেখ করে নৃশংস এ খুনের মামলা যাতে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত না নেয়া হয় সে জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

যশোরের ত্রাস, রিপন হত্যা মামলার আসামি আনিসুর রহমান লিটন ওরফে ফিঙ্গে লিটন যশোর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার সুপারিশ নিয়ে দলীয় নেতা সেজে সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। যশোর আওয়ামী লীগের ওই নেতা ফিঙ্গে লিটনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কুষ্টিয়ায় উদীচীর বোমা হামলা মামলার অন্যতম আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসানের ছোট ভাই মিজান স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকে উপঢৌকন দিয়ে তার বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে দায়েরকৃত অস্ত্র মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ক্রসফায়ারে সে মারা যায়। ফলে ঐ প্রক্রিয়া স্থাগিত হয়ে যায়।

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মোবারক হোসেন হত্যা মামলা নিয়েও শুরু হয়েছে ষড়যন্ত্র। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশে ওই হত্যাকা- ঘটানো হয়। জিসানকে ধরতে ইন্টারপোলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। ওই মামলার ৬ কিলার ধরা পড়েছে। জিসান রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমানে এ মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় এনে তা প্রত্যাহারের তোড়জোড় চলছে।
রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাৎ। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আবেদন করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করার জন্য একটি পক্ষ তৎপর রয়েছে।

মডেলকন্যা তিন্নি হত্যার নায়ক সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভি। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। হঠাৎ করে দেশে ফিরে আসার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন তিনি। তার রাজনৈতিক গডফাদার তিন্নি হত্যা মামলাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে অভিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেছেন। ধানমন্ডি থানার শীর্ষ সন্ত্রাসী ব্যাঙ বাবু। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি মামলার ২টি থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অব্যাহতি নিয়েছেন।

সারাদেশে এখন রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার ছড়াছড়ি। রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত ব্যক্তির নামে মামলা হচ্ছে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

সারাদেশে এখন রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার ছড়াছড়ি। রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত ব্যক্তির নামে মামলা হচ্ছে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।


নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী হোসেন চেয়ারম্যানÑ বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের পাঁচ বছর বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা করা হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার ছত্রছায়ায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা থেকে অব্যাহতি পান। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা উৎকোচ নিয়ে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আসাদুজ্জমান আসাদ। পরকীয়া করতে গিয়ে প্রেমিকা খুন করে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। সম্প্রতি ওই মামলা রাজনৈতিক দেখিয়ে তা প্রত্যাহার করিয়ে নেয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
নাটোরে চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সারাদেশ থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট কমিটি এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৮শ ৬৩টি মামলা গ্রহণ করে। এর মধ্যে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণসহ দ বিধির বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা মামলা রয়েছে ৫ হাজার ৫শ ৪৮টি। বাকি ৩ হাজার ৩শ ১৫টি মামলা দুদকের। ইতিমধ্যেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর কমিটির ২২তম সভায় রাজনৈতিক বিবেচনায় ১০৫টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৫ জুলাই কমিটির ২০তম সভায় ৪শ ৫৭টি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ওই বৈঠকে ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল্যকর মালিবাগ হত্যাকা-ের মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঘটনার দিন ডা. এইচবিএম ইকবালের একটি মিছিল থেকে বিএনপির মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এতে এক পুলিশসহ ৫ জন খুন হন। রাজনৈতিক বিবেচনায় মালিবাগ হত্যাক-ের মতো মামলা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ২০০০ কে বলেন, ২০০১ সালে ডা. এইচবিএম ইকবাল ও নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা ফাইনাল রিপোর্ট দেন। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে তারা আদালত থেকে অব্যাহতি পান। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এ মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে। তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে ড. ইকবাল ও শাওনকে হেনস্থা করার চেষ্টা করে। তাই বর্তমান মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ১০ জুন। প্রথম বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১২টি মামলাসহ ৬২টি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রত্যাহারের তালিকায় পল্টন থানার একটি হত্যা মামলাও ছিল। প্রথম দিনই শেখ হাসিনা ছাড়াও মামলা প্রত্যাহারের তালিকায় এক মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে উপদেষ্টাম-লীর সদস্য তোফায়েল আহমেদের ৯টি, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ১টি সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ৬টি, গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খানের ১টি, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ২টি, কামাল আহমেদ মজুমদার এমপির ১৩টি, বাহাউদ্দিন নাছিমের ৪টি ও সাবেক এমপি হাজি মকবুল হোসেনের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২১ জুন দ্বিতীয় বৈঠকেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ৪৬টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১ জুলাই তৃতীয় বৈঠকে দুদকের ১১ মামলাসহ ৬৬টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৫ জুলাই চতুর্থ বৈঠকে ৬৯টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৫ আগস্ট পঞ্চম বৈঠকে ১২১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২৬ আগস্ট ষষ্ঠ বৈঠকে ১২০টি, ১৬ সেপ্টেম্বর সপ্তম বৈঠকে ১২৩টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই বৈঠকে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১৩ অক্টোরব অষ্টম বৈঠকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের ১টি ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা তাদের নেতা-কর্মীদের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করছেন। বড়মাপের নেতা বাদে সাধারণ নেতাকর্মীদের নাম গোপন রাখা হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহার বিষয়ে জেলা পিপিরা রমরমা বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ আছে।

জোট আমলে যা হয়েছে
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলার নামে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, রাজহানি, অপহরণ মামলা থেকে আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সারাদেশে খুন ধর্ষণের রেকর্ড করা হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। এসব মামলার আসামি ছিল বিএনপি-জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। ১৯৯৬-২০০১ চাঞ্চল্যকর কিছু মামলার আসামিদের রাজনৈতিক মামলার ব্যানারে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৪১ জন হুজি সদস্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া অবস্থায় ধরা পড়ে।

এদের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে ফেরা শীর্ষ মুজাহিদরা ছিলেন। অস্ত্র আইনে তাদের সাজা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই মামলাকে রাজনৈতিক দেখিয়ে সব সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শীর্ষ জঙ্গি আবু সুফিয়ান, সিদ্দিকুল ইসলাম ছিলেন। পরে তারা সারাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
একইভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী আহমদ্যা, গিট্টু নাসিরকে কারাগার থেকে বের করে এনে আওয়ামী লীগ দমনে ব্যবহার করা হয়। পরে অবশ্য র‌্যাবের ক্রসফায়ারে তারা মারা যায়। রাজধানীর টপটেরর আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগরের মামলাকে রাজনৈতিক দেখিয়ে তা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের নায়ক তৌহিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও রাজনৈতিক বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। পরে সে পালিয়ে দুবাই চলে যায়।

রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে ড. হুমায়ুন আজাদ ও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার হোসেন চৌধুরী হত্যাচেষ্টা মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যার নায়ক নুরুল ইসলাম সরকারকে বাঁচানোর নানা চেষ্টা করা হয়। পরে বিষয়টি মিডিয়ার চলে এলে তা বানচাল হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার আসামি মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানকে বের করে এনে মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত করা হয়।

রাজনৈতিক মামলার নামে দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণ মামলা আলোর মুখ দেখেনি। পূর্ণিমা ও রীতা ধর্ষণ মামলায় উল্টো বাদী পক্ষের লোকজনকে আসামি করে চিহ্নিত আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইভাবে ঝিনাইদহের সর্বহারা ত্রাস সিদ্দিক মোল্লা ও গণমুক্তি ফৌজ নেতা আনোয়ার হোসেন দেবু রাজনৈতিক ছাত্রছায়ায় কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন।
মাদারীপুর জেলার নিরঞ্জন বাগচী ১২০ কেজি ওজনের কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে র‌্যাব-৮ হাতে ধরা পড়েন ২০০৭ সালে। র‌্যাবের মতে ওই মূর্তির বাজার দাম ১২ কোটি টাকা। আলোচিত এ মামলা থেকে নিরঞ্জন বাগচী রেহাই পেয়েছেন রাজনৈতিক তদবিরের বদৌলতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জামাল উদ্দিন অপহরণ, গোপাল কৃষ্ণ মহুরী হত্যা, সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা, সাংবাদিক শামছুর রহমান, হুমায়ূন কবীর বালু, গৌতম বিল্লাল হত্যা মামলা রাজনৈতিক তদবিরের কারণে কোনো গতি পায়নি। বাঁশখালী হত্যাকা-, ফাহিমা ধর্ষণ, বুশরা হত্যাকা-, অ্যাডভোকেট কালিদাস বড়াল হত্যাকা-, ভোলার ওবায়দুল হত্যাকা-, অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর, যুবদল নেতা সাগির, নাটোরের মমতাজ হত্যা রাজনৈতিক তদবিরের কারণে স্থবির হয়ে গেছে। চিহ্নিত অপরাধীরা রাজনৈতিক মদদে পার পেয়ে গেছে। পুরনো ঢাকার লোমহর্ষক হত্যাকা- ব্যবসায়ী সামছুল আলমকে ৫৬ টুকরা করার নায়ক রফিকুল ইসলাম কাজলের রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি।
রাজনৈতিক মামলা ও তদবিরের প্রভাব খাটিয়ে বুয়েটে সাবেকুন্নাহার সনি হত্যায় ছাত্রদল নেতারা বেরিয়ে এসেছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। খুলনার অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, তেজগাঁওয়ের অ্যাডভোকেট খোরশেদ, চট্টগ্রামে প্রফেসর ইউনুস হত্যার আসামিরা বিএনপির রাজনীতি করার সুবাদে সে সময় পার পেয়ে গেছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই নব্বইয়ের আন্দোলনে শহীদ ডা. মিলন, নূর হোসেন হত্যাকা-ের বিচার হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ মার্ডারের হোতা বর্তমান জাগপা প্রধান শফিউল আলম প্রধানকে কারাগার থেকে বের করে ৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার ঘটনাও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রসূত।

বিশিষ্টজনের মতামত
রাশেদ খান মেনন, এমপি, সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি
রাজনৈতিক মামলার নামে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক মামলার নামে সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শুরু করেছিল। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছে। এই ধারা রাজনীতিতে সুফল বয়ে আনবে না।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এমপি, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
রাজনৈতিক মামলার নামে সরকার যেসব মামলা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে তাতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। চিহ্নিত অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া সরকারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। আগের সরকারের আমলে কিছু অপরাধীকে বিএনপির দলীয় পরিচয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও বর্তমান মহাজোট রাজনৈতিক মামলার নামে যেসব মামলা প্রত্যাহার করেছে তাতে সমাজে অপরাধীদের অপরাধ করার প্রবণতা বাড়বে। রাজনৈতিক মামলার মোড়কে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি মামলা প্রত্যাহারের অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের রাজনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না।

ড. কামাল হোসেন, বিশিষ্ট আইনজীবী
আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে বলে সে মাফ পেয়ে যাবে এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তবে অপরাধ না করে শুধু রাজনীতি করার জন্য হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া দোষের কিছু দেখি না।

খন্দকার মাহবুব হোসেন, সভাপতি
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন
যেভাবে খুন ধর্ষণ মামলার আসামিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে না যে দেশে আইন বলে কিছু আছে। দেশে রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার আশু পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ধারা চলতে থাকলে আবার আমরা অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হব।

ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ, আইনজীবী
বিএনপি-জামায়াতের দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ের করা জোর জবরদস্তির মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। খুন-ধর্ষণের মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছেÑ এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। রাজনৈতিক কারণেই এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’ একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।


রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’
বেলাল বেগ

রাজনীতি

রাজনীতি

লাগুক বা না লাগুক, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আওয়ামী লীগের উদ্দেশে একটি শব্দ গুলতি ছুড়েছেন। আওয়ামী লীগ নাকি সারা দেশটাকেই ‘ইভ টিজিং’ করছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, বেড়ে বলেছেন তো! রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোকদীপ্তিকে আরণ্যক অন্ধকার বানিয়ে নিশাচর হিংস্র পশুর মতো আচরণ করে যে রিপুতাড়িত বখাটের দল, সেটাই তো ইভ টিজিং। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুষ্কৃতকারীদের আচরণ এক ধরনের রাজনৈতিক ইভ টিজিং বটে। চকিতে মনে এল তারেক-কোকো, খাম্বা-মামুন, হাওয়া ভবনের প্যান্ডোরার বাঙ্রে কথা। জামায়াত-বিএনপির ওই যুগের তুলনায় আওয়ামী লীগ ভাঙিয়ে খাওয়া এসব কুলাঙ্গার তো নস্যি। আমার চিন্তাস্রোত হাসিনা-খালেদা, আওয়ামী-বিএনপির শৈবালধামে আটকা পড়ে যাচ্ছিল। আমার মনেই হয়নি, আবদুল্লাহ আল নোমান এই জাতির সাংস্কৃতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজানো ইভ টিজিং সমস্যাটাকে খেলো বানিয়ে দিয়েছেন।

ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল মদাসক্ত আছেন বলে জাতির কোনো মর্মান্তিক সমস্যার যাতনা বিএনপি নেতাদের অন্তরে দাগ কাটে না। বখাটেদের কামলোলুপ হিংস্রতার মুখে সুন্দর এই পৃথিবীর দিকে চোখের পাপড়ি মেলে ধরার আগে ‘প্রতিকারহীন শক্তি’র অপরাধে যে কিশোরী আত্মহননের পথ বাছাই করল, তার অভিশাপে পুরো সমাজটাই দগ্ধ হতে পারে_এই বোধটা থাকলে ইভ টিজিংকে এমন ফালতু রাজনৈতিক মশকারা বানাতেন না সমাজসচেতন কোনো নেতা। এটা বলার আগে তাঁর একবারও মনে হলো না, অন্তত ইভ টিজিং সমূলে ধ্বংসের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির হাত মেলানো উচিত ছিল। কেতাবি গণতন্ত্রীরা অভ্যাসবশত এটা আশা করলেও আমরা জানি, জাতির সুখ-দুঃখের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া বা থাকা এই দুটি দলের জন্য সম্ভব নয়।

প্রথমে বিএনপির কথা ধরা যাক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুরা, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, ১৯৭৫ সালে তারা একজোট হয়ে বঙ্গবন্ধু এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে বাংলাদেশ দখল করে এবং কালবিলম্ব না করে গোপনে রাষ্ট্রটির চরিত্র বদলে এটাকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন চিরস্থায়ী করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লে বিএনপির জন্ম হয়। বলা বাহুল্য, সেই সময় জনগণের মাঝে জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা থাকলে বিএনপির হয়তো জন্মই হতো না। যাহোক, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ধ্বংসই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করাও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জানত, সুযোগ পেলে বিএনপি তাদের ধ্বংস করবে। এ কাজটি তারা করে উঠতে পারছিল না গণতন্ত্রের মুখোশ পরে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-ভীতির কারণে। তার পরও শেষ পর্যন্ত গেরিলা কায়দায় বোমা হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে স্বাধীনতাবিরোধীরা। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির অবিরাম ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা এবং তা প্রতিরোধে পরিচালিত আওয়ামী লীগের মরিয়া সংগ্রাম স্বাধীনতার পরদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার পরিবেশকে সংঘাতময়, হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও অসহনীয় করে রেখেছে। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ঐতিহাসিক বাঙালি সমাজ ভেঙে খান খান হয়ে গেল। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি থেকে বস্তির নিঃস্ব ব্যক্তি পর্যন্ত যে কেউ যখন খুশি আইন হাতে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাজুল ইসলাম ছয়টি সন্তানসহ বিরজাবালাকে কেটে টুকরা টুকরা করে তাতে লবণ মিশিয়ে ড্রামে ভরে বিলের নিচে পুঁতে রেখেছিল। সংস্কৃতি চলে গেল বলিউড, মধ্যপ্রাচ্য ও ইয়াংকি মুলুকে, শিক্ষা চলে গেল হুজুরদের জুব্বার নিচে মক্তব-মাদ্রাসায়, ব্যবসা চলে গেল কালোবাজারে এবং মুক্তবাজার বিদেশিদের হাতে। ক্ষমতা রূপ নিল দখলদারিত্বে। পত্রিকার হেডলাইন পেতে লাগল সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে খুনিরা। দুর্নীতির আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতা চলল রাজনীতিতে, প্রশাসনে, পুলিশে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, কাস্টমসে, ইনকাম ট্যাঙ্_েকোথায় নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রইল বেশ কয়েক বছর। যেখানে সভ্যতাবিরোধী পরিবেশে রাজাকার-আলবদররা দেশের মন্ত্রী হতে পারে, খুনের বিচার হয় না, খুনিকে পুরস্কৃত করা হয়, সেখানে অল্প বয়সী অর্থ-অস্ত্র-উন্মাদ, ড্যাম কেয়ার বন্য তরুণটির ইভ টিজার হওয়াটাই তো একটা বাহাদুরি ছিল।

ইভ টিজিং_এসিড নিক্ষেপ, গুম, জোড়া খুন, সিরিয়াল কিলিং, নাবালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, অগি্নসংযোগ, ভাড়ায় খুন প্রভৃতির মতো একটি অপরাধ। একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।

বাংলাদেশ নষ্ট করার মিশন নিয়ে যেহেতু বিএনপির জন্ম, সেহেতু বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির সবকিছু নষ্ট করাই তার লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রধান দোষ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা বিএনপি-জামায়াতকে প্রথম দিন থেকেই প্রতিহত না করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেওয়া। যে জনগণ একাত্তরের নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংসের শিকার হয়েও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছে, দেশের ঘোর বিপদের দিনে জনগণের নিজ সংগঠন আওয়ামী লীগ তাদেরই ডাকল না। তারা দেশের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গিয়ে ক্ষমতা ভোগের রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ল। বিএনপি আমাদের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নষ্ট করল, আওয়ামী লীগ এর প্রতি নীরব সমর্থন জানাল। অনেকে বলাবলি শুরু করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অসহযোগিতামূলক বন্ধুত্ব তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আঁস্তাকুড় বানালে আমাদের বহু যুগের লালিত সব স্বপ্ন ও আদর্শ তিরোহিত হয়। সংক্ষেপে এই হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের পচা অতীতের আরণ্যক সমাজের গন্ধ ব্যবচ্ছেদ। এই সময়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ‘প্রতিকারহীন’ অসভ্য শক্তি ডাকাতির মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ঘোর বর্ষায় একটানা মেঘ-বৃষ্টির পর একটা ঝলমলে দিনের মতো আশা, উদ্দীপনা এবং প্রেরণা নিয়ে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে। এই প্রথম জনগণ ২০২১ সালে পেঁৗছানোর জন্য একটি গন্তব্যের ঠিকানা পেল, পেল পথের দিশা ডিজিটাল বাংলাদেশ। পরিচ্ছন্ন মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, কৃষি ও কৃষকদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারণ, বন্ধ্যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে (ইভ টিজিংয়ের অন্যতম কারণ) ঝাঁকি দিয়ে জাগানো, পার্লামেন্ট চালু রাখা, সংকট ও জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা_এ রকম অসংখ্য উদ্যোগ জনগণের চোখে পড়েছে। সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা দৃঢ়। কিন্তু তার পরও একটি জাগ্রত জনতার দেশের মতো গতিশীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ নেই বাংলাদেশে। একটি কারণ হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্যহারা বিএনপির ভাড়াটে নেতাদের দিন-রাত ‘বাঘ পড়েছে’, ‘বাঘ পড়েছে’ বলে চিৎকার করে জনগণকে সন্ত্রস্ত রাখা। এটি অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না কারণ কোকো-তারেক-মামুন-বাবর আর হাওয়া ভবন বিএনপিকে যে কফিনে শুইয়েছিল, তাতে পেরেক ঠুকে দিয়েছে খালেদা জিয়ার বাড়ি রক্ষা আন্দোলন। বিএনপি কখনো জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল ছিল না, তবে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী হওয়ার মতো এমন ন্যক্কারজনক অবস্থায় আগে কখনো পড়েনি। সরকারকে সমর্থন করা সত্ত্বেও জনগণ কেন সক্রিয়ভাবে সমাজ গঠনে এগিয়ে আসছে না, এটিই হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল ভাবনা। কারণ এতকালের নষ্ট সমাজ ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণ করার অনুপযোগী।

সমাজ এখনো জেগে না ওঠার কারণ, চেতনার ক্ষেত্রে সরকার ও দলের মধ্যে যোজন যোজন মাইল দূরত্ব রয়েছে। সরকার যেখানে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, দল সেখানে পচা অতীতের ক্ষমতা দখল রাজনীতির ফেনসিডিল নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সরকার যেখানে নদী উদ্ধার, ভূমি উদ্ধার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি চাচ্ছে, দল সেখানে নদী দখল, চর দখল, ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চাকরি দখল, টেন্ডার দখল ইত্যাদি খাই খাই রোগে আক্রান্ত। জনগণ দলকে চেনে, সরকার চেনে না। তাই তো তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দলকে ছাড়িয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার যে শর্ত গতিশীলতা, যোগ্যতা ও ধনুকভাঙ্গা পণ, তার প্রতিবন্ধতা হচ্ছে, প্রশাসনের মস্তিষ্কে বড় হওয়া আমলাতন্ত্রের টিউমার।

সমাজ ন্যায়-নীতির মাঝে গতিশীল ও কর্মময় না হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ জনগণ কর্তৃক পার্লামেন্টে পাঠানো তাদের ৩০০ নেতা নিজেরাই এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট কী এবং কেন তা একেবারেই অপরিহার্য। অথচ নতুন সমাজ গঠনের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হলে প্রথম সারিতে দাঁড়াতে হবে তাঁদেরকেই।

নতুন সমাজ গঠনে জনজোয়ার এলে ‘ইভ টিজিং’ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, ভেসে যাবে ফালতু রাজনীতির পচা অতীত।
লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?


রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক

প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?


প্রতিহিংসার সংস্কৃতির দিকেই কি জাতি চালিত হচ্ছে?

মঈনুল আলম

আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘ক্ষমা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে আইনমন্ত্রী বলেন, অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর হয় তো জানা নেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে তার শাসনামলের শুরুর দিকেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এ জাতিকে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’তে প্রবেশ করিয়েছিলেন। তারপর এ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক প্রয়োগ করেছে আওয়ামী লীগ।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র সর্বাধিক চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দেখিয়ে অতি সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান খুনের অপরাধে মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্ত এবং সর্বোচ্চ আপিল আদালতে সে মৃতুøদণ্ড বহাল থাকা অবস্থায় ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমা করে তাদের মুক্তি দিয়ে ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার’ অপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মুক্তিপ্রাপ্ত মৃতুøদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে তাদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র প্রতি আওয়ামী লীগের উচ্ছ্বসিত সমর্থনের প্রকাশ্য প্রদর্শন বা ‘পাবলিক ডিসপ্লে’ করে। এর দেড়-দুই মাসের মাথায় মহাজোটের আইনমন্ত্রী ‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দেয়ার’ কথা বললেন কেন? এতে ১৬ মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্তকে ক্ষমাকারী মহান ব্যক্তিটির মনে কি এমন প্রশ্ন আসবে না যা মধ্যযুগীয় এক কবি এই পদ দিয়ে ব্যক্ত করেছেনঃ ‘আমি গাই কী, আর আমার সারিন্দা বলে কী?’ ২৪ অক্টোবর নয়া দিগন্ত-এ প্রকাশিত আমার ‘মহাজোট সরকারের সুমতি হচ্ছে?’ শীর্ষক লেখাটিতে বলেছিলাম, ‘এই আইনমন্ত্রী প্রায় নিজেই বোঝেন না তিনি কী বলছেন।…’ আইনমন্ত্রীর উপরোল্লিখিত বয়ান থেকে অনেকেই আমার মন্তব্যটিকে সঠিক বলেই ধরবেন।

‘অপরাধ করলে তা মার্জনা করার সংস্কৃতি’র অনুসরণে মহাজোট সরকার এ বছরের প্রথম দিকে খুন ও অন্যান্য জঘন্য অপরাধে বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগরত কয়েক হাজার দাগি অপরাধীর অবশিষ্ট কারামেয়াদ ক্ষমা করে দিয়ে তাদের মুক্ত করে দিয়েছে। মিডিয়াতে সে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি হতে দেশে হত্যা, গুম, ডাকাতি, ভূমিদখল, শিক্ষক পেটানো, সাংবাদিক পেটানো, অ্যাডভোকেট পেটানো, পুলিশ পেটানো, ইভটিজিং ইত্যাদি অপরাধ দারুণভাবে বিস্তার লাভ করেছে। মহাজোট সরকারের কারাগার থেকে হাজারে হাজারে কয়েদি ছেড়ে দেয়াকে দেশে ব্যাপকভাবে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

‘ক্ষমা সংস্কৃতি’র এমন সব অপূর্ব দৃষ্টান্তের পর বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী হঠাৎ ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে আনার তাগিদের কথা বললেন কেনো? ভাষার ভাবধারায় ‘ক্ষমা’র বিপরীত শব্দ হচ্ছে ‘প্রতিশোধ’ অথবা ‘প্রতিহিংসা’। ‘ক্ষমা সংস্কৃতি’ থেকে জাতিকে বের করে এনে তিনি কি তার বিপরীত সংস্কৃতি অর্থাৎ ‘প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার সংস্কৃতি’র দিকে জাতিকে চালানোর ইশারা দিলেন?

বাকশালে ফিরে আসার ইঙ্গিত?
আইনমন্ত্রী বারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ফলে ‘সামরিক শাসন ও মার্শাল ল’ বলতে কিছু নেই। এ রায়ে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় আসাকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।’ কিন্তু ক্ষমতায় আসীন আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে যে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, সেই চতুর্থ সংশোধনীর কী হলো?

সেই কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী বাতিল না করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে যাওয়া যায় না। সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবীসহ একাধিক আইনজীবী বলেছেন, হাইকোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও চতুর্থ সংশোধনীর বাকশাল ব্যবস্থা পুনর্বহাল বা নাবহাল সম্পর্কে কিছু বলেননি। ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের সাথে সাথে ’৭২ সালের আদি সংবিধান পুনঃস্থাপিত হয়েছে। এতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এসেছে’ বলে কতৃর্êস্থানীয় মহল থেকে যা বলা হচ্ছে, পর্যবেক্ষক ও আইন-অভিজ্ঞ মহল তাকে অত্যন্ত ‘সরলীকৃত’ উক্তি বলে মনে করছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, আপিল বিভাগের রায়ে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটি কি বাতিল হয়ে গেছে? নাকি সামরিক বিধির যে ধারাগুলোকে জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে বলে রায়ে বলবৎ রাখা হয়েছে, তাতে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধি ধারাটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? রায়ের যতটুকু মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে, তাতে এ ব্যাপারটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ‘বাকশালের চিন্তা-চেতনা ও দর্শনকে আমরা এখনো ধারণ করি। একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে বাকশালের চিন্তা-ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা কাজ করতে চাই’ বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে তা দেশ ও জাতির জন্য অশুভ সঙ্কেত রূপে প্রতিভাত হচ্ছে।

আপিল বিভাগের রায়ের ফলে বাকশাল বিলোপকারী সামরিক বিধিটিও বাতিল হয়ে গেছে, যার ফলে দেশে ‘থিওরিটিক্যালি’ বাকশাল ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, যদিও মহাজোট সরকার এখন প্রকাশ্যে তা বলছে না। ক্ষমতাসীন মহল থেকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে গেছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা দেশবাসীকে একটি ভ্রান্তিতে রাখার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, আসল উদ্দেশ্য হলো­ সময় ও সুযোগ বুঝে সংবিধানে একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মহাজোট পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে দেশে বাকশালীয় ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে­ এই যুক্তি দেখিয়ে বাকশালের অনুরূপ একটি শাসনব্যবস্থা জারি করতে পারে দেশে।

দেশবাসী ভোলেনি, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র­ এই চারটি আদর্শের ওপর প্রণীত বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাতারাতি পার্লামেন্টারি পদ্ধতির গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির একদলীয় বাকশাল সরকার প্রবর্তন করে দেশের পদাসীন প্রেসিডেন্টকে বরখাস্ত করে নিজে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রেসিডেন্ট হন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানটির এমন অভাবিত লাঞ্ছনা দেখে সেদিন জাতি হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

একই সাথে দেশে শুধু একটিমাত্র রাজনৈতিক দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে গেল! বাকশাল নামীয় নবগঠিত দলটির সদস্যরা ব্যতীত বাংলাদেশের আর কোনো নাগরিকের জন্য রাজনীতি করা বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানিতে হিটলার যেমন তার দল নাৎসি পার্টিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে এবং ইতালিতে মুসোলিনি তার দলটিকে দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল করে দেশে ফ্যাসিস্টিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একনায়কত্ব কায়েম করেছিলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার তৃতীয় উদাহরণ স্থাপন করল।

বিধান জারি হয়েছিল, জাতীয় সংসদের তৎকালীন কোনো সদস্য প্রস্তাবিত বাকশাল দলটিতে যোগদান না করলে তাদের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের মৌল গণতান্ত্রিক অধিকারের কী জঘন্য লঙ্ঘন!!
এই ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কার্যকর করার ব্যাপারে কোনো বিচার করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের থাকল না এবং এ ব্যবস্থার পর্যালোচনা অথবা সমালোচনা করার কোনো অধিকার সংসদের থাকল না। কী অকল্পনীয়ভাবে বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং সংসদের সার্বভৌমত্বকে হরণ করা হলো!

আরো বিধান করা হয়েছিল, বাকশালব্যবস্থার কোনো সমালোচনা করা যাবে না। তার পরও অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনা-সমালোচনার সব পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য সরকারের মালিকানায় চারটি দৈনিক সংবাদপত্র রেখে দেশের সব সংবাদপত্র ও পত্রপত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল! কী বিবেকবর্জিত আঘাতে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধূলিসাৎ করা হলো!

একই সময়ে আদেশ-নির্দেশ দিয়ে এবং বাকশালী ‘দালাল’দের দিয়ে ভয় দেখিয়ে অথবা প্রলোভন দিয়ে সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যদের, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের, শিক্ষায়তনের শিক্ষক ও কর্মচারীদের এবং ছাত্রছাত্রীদের, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকর্মীদের, শিল্পকারখানা ও পরিবহন শিল্প ইত্যাদির শ্রমিক-কর্মচারীদের, কৃষিজীবীসহ সব পেশাজীবীকে বাকশালের সদস্য হতে বাধ্য করা হয়েছিল। বস্তুত আওয়ামী লীগের এসব কর্মকাণ্ড দিয়ে দশ কোটি মানুষের ত্যাগে অর্জিত প্রাণের বাংলাদেশ বাস্তবে ‘বাকশালদেশ’-এ পরিণত হয়েছিল।

সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সত্য হলো, সামরিক শাসন এবং তার অনুসরণে একাধিক স্বৈরশাসনের বদৌলতে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে, সংবাদপত্র ও মিডিয়া প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বিচার বিভাগ তার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে, যার ফলে হাইকোর্ট আজ এই রায়ে সামরিক শাসনগুলো অবৈধ ছিল বলে রায় দিতে পেরেছেন। বাকশাল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সামরিক শাসন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ এবং ‘ফেইট অ্যাকমপ্লি’র যুক্তিতে অপরিহার্য হয়েছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আপিল বিভাগের রায়ে সামরিক বিধির যে ধারাগুলো জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে, সেগুলোকে বলবৎ রাখা হয়েছে। বাকশাল শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটানো কি জনস্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল না? রায়ে এ প্রশ্নটির উত্তর দেখা যায় না। সামরিক শাসন যদি সব সময়েই অবৈধ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যাতে সামরিক শাসন আসতে না পারে তার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত বিধান আনতে হবে। যেটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে তা হলো­ কোনো রাজনৈতিক সরকার যেন কোনোভাবেই এবং কোনো অজুহাতেই নির্যাতনকারী স্বৈরশাসন অথবা চরম নিপীড়নকারী একনায়কত্ব অথবা একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারে, সংবিধানে তার কার্যকর নিষেধ-বিধান থাকতে হবে। পাশাপাশি যে রাজনৈতিক সরকার দেশে একনায়কত্ব অথবা বাকশাল নামে একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা জারি করেছিল, তাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করে এমনভাবে শাস্তি দিতে হবে, যাতে তাদের মুখে বাকশাল ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা আর উচ্চারিত না হয়।
লেখকঃ প্রবীণ সাংবাদিক, ও কলামিস্ট