আইপিওতে এনআরবি কোটা দ্বিগুণ করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন


আইপিওতে এনআরবি কোটা দ্বিগুণ করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন

মনির হোসেন
শেয়ারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) অনিবাসী বাংলাদেশীদের (এনআরবি) কোটা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশন মনে করছে, প্রবাসীদের পাঠানো অথের্র (রেমিট্যান্স) বিশাল একটি অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায়, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করে। ফলে রেমিট্যান্স উৎপাদনশীল খাতের এ ব্যবহারের জন্য এ সুপারিশ করেছে কমিশন। সম্প্রতি সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কমিশন এ সুপারিশ করেছে। কোটা বাড়ানোর ব্যাপারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী মনে করেন, বড় পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে এনআরবিদের কোটা বাড়ানো যেতে পারে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের এ সুপারিশের সঙ্গে একেবারেই এক মত নন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ। তার মতে, আইপিওতে কারও কোটা বাড়ানো নয়, বরং সিস্টেম তুলে দেয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, এনআরবিদের বিনিয়োগ একান্তই বাড়ানো জরুরি হলে মিউচুয়াল ফান্ডের কোটা কমিয়ে এনআরবিদের কোটা বাড়ানো যেতে পারে। অপরদিকে শেয়ারবাজারের ব্যাপারে সুপারিশ করা পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বের বাইরে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

জানা গেছে, আইপিও বিধিমালা অনুসারে বর্তমানে একটি কোম্পানি যে পরিমাণ শেয়ার বাজার ছাড়ে তার ১০ শতাংশ এনআরবিদের জন্য, ১০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ড এবং বাকি ৮০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বরাদ্দ দেয়া হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক শেয়ারের জন্য লটারির মাধ্যমে আবেদন করেন এবং প্লেসমেন্টের শেয়ার কোম্পানির ইচ্ছা অনুসারে ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দেয়া হয়। এক্ষেত্রে এনআরবিদের ১০ শতাংশ কোটাও লটারির মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে এনআরবিদের কোটা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করে বাকি ৮০ শতাংশ অন্যান্য খাতে বিতরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন মনে করছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তার অন্যতম কারণ হল রেমিট্যান্স। কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ তাদের স্বজনদের হাতে চলে যাচ্ছে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। কিন্তু আইপিওর মাধ্যমে এনআরবিদের এ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হলে তা উৎপাদনশীল খাতে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতিতে চাপ কমবে।

অপরদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রেমিট্যান্সের টাকা জমি এবং স্বর্ণ ক্রয়ে চলে যাচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে রেমিট্যান্সের অর্থ শিল্প খাতে বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইনসেনটিভ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ৮৩ কোটি ডলার মূল্যমানের রেমিট্যান্স এসেছে। এই রেমিট্যান্সের অধিকাংশ বিলাসী সামগ্রী ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের এ সুপারিশকে তাদের দায়িত্বের অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ খান যুগান্তরকে বলেন, পরিকল্পনা কমিশনও এখন শেয়ারবাজারের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ শুরু করেছে। তিনি বলেন, প্রাইভেট সেক্টরে কি ঘটবে এ ব্যাপারে মাথা ঘামানো পরিকল্পনা কমিশনের কাজ নয়। এখানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নামে স্বাধীন একটি কমিশন আছে।

অপরদিকে এর আগে গত বছর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পাঠানো এক সুপারিশে আইপিওতে এনআরবিদের কোটা পাঠানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ডিএসইর প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী যুগান্তরকে বলেন, এনআরবিরা শেয়ারবাজারে এলে ফরেন কারেন্সি বাড়বে। তার মতে, ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি এলেই কেবল এই কোটা বাড়ানো যেতে পারে। কারণ ছোট কোম্পানিগুলো এমনিতেই ওভার সাবসক্রিপশন হয়। তাই ছোট ইসুøতে কোটা বাড়ানোর দরকার নেই।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিদুøৎ ও জ্বালানি সেক্টরে এনআরবিদের কোটা বাড়ানো দরকার। কারণ এ দুই খাতেই ফরেন কারেন্সি দরকার। এনআরবিদের অংশগ্রহণ বাড়লে ফরেন কারেন্সির সরবরাহ বাড়বে। তিনি বলেন, আইপিওতে কোটা বাড়ানো হলে একদিকে এনআরবিদের দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, অপরদিকে সরকারও ব্যাপক লাভবান হবে।

তবে এ মতের একেবারেই বিরোধিতা করেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ। তার মতে, আইপিওতে কোটা সিস্টেমই বাদ করে দেয়া উচিত। কারণ যেখানে দেশের মানুষের হাতে প্রচুর টাকা রয়েছে। বর্তমানে একটি কোম্পানির আইপিও ছাড়লে তার ২০ থেকে ২৫ গুণ বেশি আবেদন জমা পড়ে। এখানে কারো জন্য কোটা বাড়ানোর প্রশ্ন আসে না। তিনি বলেন যেখানে এখন তারল্য কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সেখানে এনআরবিদের টাকা এনে তারল্য বাড়িয়ে লাভ কী? তাই তিনি মনে করেন, কোটা পদ্ধতি বাদ দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে শেয়ার বিতরণ করা উচিত। তবে তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য এনআরবিদের কোটা বাড়ানোর প্রয়োজন হলে মিউচুয়াল ফান্ডের কোটা কমিয়ে এনআরবিদের কোটা বাড়ানো যেতে পারে। কারণ মিউচুয়াল ফান্ডের টাকা কোথায় যাচ্ছে, তারা কী করছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার স্বচ্ছতা নেই। কিন্তু কোনভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ কমানো যাবে না।